irabotee.com,নারী দিবস

প্রাচ্য পুরাণে নারীর অবস্থান: সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নবরূপায়ণ । পূরবী বসু

Reading Time: 12 minutes

পুরাণের নারীচরিত্রগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, হয় তারা খুব দয়াবতী, সৎ, অত্যন্ত সহজ-সরল, কিন্তু দুর্বল, প্রতিবাদহীন, অথবা প্রচন্ড দাপটের, কৌশলী, হিংসুটে, ষড়যন্ত্রকারী, অন্যের ক্ষতিকারক, ক্ষমতালোভী, পরশ্রীকাতর। দুটোর অবস্থানই প্রান্তিক। যাঁরা ভালো, সবদিক দিয়েই ভালো – যেমন, সীতা, সাবিত্রী, অরুন্ধতী। যাঁরা দুষ্ট প্রকৃতির, তাঁরা চালাক, মন্দ চরিত্রের এবং কুটিল ও প্রতিশোধপরায়ণ, অর্থাৎ তাঁরা সবদিক দিয়েই খারাপ ও স্বার্থান্বেষী, যেমন – মন্থরা, কুন্তি বা সুপর্ণখা। তার মানে, হয় খুবই ভালো, না হয় নিতান্তই মন্দ, যা অধিকাংশ চরিত্রকে মানবিক করে তোলে না। ভালো-মন্দতে মেশানো স্বাভাবিক মানুষের মতো মনে হয় না তাঁদের। মহাভারতে অবশ্য একটি চরিত্র দেখা যায়, যিনি সাহসী, কিন্তু দয়াবতী ও স্নেহশীল, তিনি রাবণের অনুচর অসুরকন্যা ত্রিজাতা, যাঁকে সীতার পাহারায় রেখেছিলেন রাবণ। সীতাকে রাজি ও বশ করার জন্যে প্রয়োজনে সীতার ওপর অত্যাচার করার অধিকার দিলেও ত্রিজাতা সীতার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তাঁর সঙ্গে শত্রুতার পরিবর্তে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। এভাবে পুরুষদের মধ্যে যত যুদ্ধবিবাদই চলুক না কেন, সম-অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাওয়ার কারণে কখনো কখনো কিছু মেয়েতে-মেয়েতে প্রকৃত বন্ধুত্ব বা sisterly love গড়ে ওঠে, ত্রিজাতা-সীতা ছাড়াও কুন্তির সঙ্গে গান্ধারীর, দ্রৌপদীর সঙ্গে সত্যভামার, সীতার সঙ্গে মন্দোদরীর এমনকি সতীন হওয়া সত্ত্বেও, দ্রৌপদীর সঙ্গে সুভদ্রার সখ্য। সীতা পৌরাণিক চরিত্রের মধ্যে আদর্শ বলে পরিগণিত। কিন্তু কেন? আসলে যতক্ষণ নারী পুরুষের বেঁধে দেওয়া গন্ডির ভেতর চলাচল করে, ততক্ষণ সে খুবই গ্রহণযোগ্য ও অনুসরণীয়। কিন্তু পুরুষের ধারণা, মত বা বিশ্বাসের পরিপন্থী কিছু করলে বা বললেই, বিশেষ করে তাদের সমালোচনা বা প্রচলিত কোনো রীতিনীতির প্রতিবাদ করলেই, সে-নারী পুরুষ ও সমাজ কর্তৃক পরিত্যক্ত হয়।

ভারতবর্ষের প্রাচীন শাস্ত্রে একদিকে যেরকম দেখা যায় নারীর শাশ্বত রূপ, অর্থাৎ তার মধ্যে কতগুলো বিশেষ মানবিক গুণের সমাহার – যেমন, দয়ামায়া, স্নেহ, সেবা, ক্ষমাশীলতা, ধৈর্য, সহ্যশক্তি ইত্যাদি, তেমনি দেখা যায় মারামারি, দাঙ্গাবাজি, খুন বা যুদ্ধে প্রায়শই নারীর সরাসরি অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকা, সেইসঙ্গে আবার কোনো কোনো নারীর ভেতর দেখা যায় কুটিলতা, জটিলতা, হিংসা, লোভ, প্রতিশোধস্পৃহার প্রবল উপস্থিতি। মহাভারতের মতো কালজয়ী বিশাল গ্রন্থে স্বার্থান্বেষী, ব্যবসায়ী মনোভাবাপন্ন সত্যবতীকে যেমন দেখা যায়, সততা, স্নেহ, নিরপেক্ষতা ও সহমর্মিতার উদাহরণ গান্ধারীকেও দেখা যায়।

আদিকালে বেশ কিছু নারী ছিলেন, যেমন গার্গি, মৈত্রেয়ী, অপলা, লোপামুদ্রা, যাঁরা যথেষ্ট বিদুষী ছিলেন। দর্শন রচনা ও চর্চা করতেন তাঁরা, জ্যোতিষ ও জ্যোতির্বিদ্যায় ছিলেন পারদর্শী, তাঁদের আয়ত্তে ছিল তীর-ধনুক চালনা, জাদুবিদ্যা, শিক্ষকতা ও গুরুর দায়িত্ব পালন করা। সাধারণ ও বিশেষ জ্ঞানে পুরুষদের সমকক্ষ ছিলেন তাঁরা এবং পুরুষদের সঙ্গে প্রকাশ্য সভায় বসে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা, তর্ক-বিতর্কে অংশগ্রহণ করার উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের কারো কারো বেশ কিছু শিষ্যও ছিল। ফলে আদিকালে নারীরা কেবল গুরুপত্নীই নন, সাক্ষাৎ গুরুও ছিলেন।

অসুরের উৎপাতে সমস্ত মর্ত যখন রসাতলে যাচ্ছে, সকল দেবতা মিলে সবচেয়ে শক্তিশালী যে-দেবতাকে পৃথিবী রক্ষার জন্যে পাঠালেন তিনি দশ হাতে একই সঙ্গে দশটি কর্ম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সমর্থ এক নারীদেবী। একাধারে স্নেহশীল আবার অতিশয় বুদ্ধিমতী, কৌশলী, শত্রুবিনাশিনী দুর্গা (শক্তি দেবী), সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী যাঁর বারবার রূপ বদলায় (উমা, রমা, পার্বতী, সতী, কালী, অপর্ণা ইত্যাদি)।

সেই সময় সমাজে মায়ের মোটামুটি উঁচু ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল। প্রাণত্যাগের পূর্বে ভীষ্ম ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে অনুনয় করে বললেন, যেন মৃত্যুর পরে ভগবানের চরণে তাঁর ঠাঁই হয়। শ্রীকৃষ্ণ উত্তরে বললেন, একজন ভক্ত হিসেবে ভগবানের কাছে ভীষ্মের পাওনা আরো অনেক বেশি। ভীষ্ম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ভক্তের কাছে ভগবানের চরণে ঠাঁই পাওয়ার চাইতে আর কি বেশি পাওনা থাকতে পারে? উত্তরে শ্রীকৃষ্ণ বললেন, ‘মায়ের কোল। মায়ের কোল সন্তানের কাছে ঈশ্বরের চরণযুগলের চেয়েও অনেক বেশি পবিত্র।’ প্রতিশ্রুতি- মতো ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভীষ্মকে তাঁর মা অর্থাৎ দেবী গঙ্গার কোলে চিরঠাঁই দিলেন। এছাড়া কুন্তির কথা ‘যা এনেছ পাঁচ ভাই সমানভাবে ভাগ করে নাও’ শুনে পঞ্চপান্ডব সকলে মিলে দ্রৌপদীকে বিয়ে করেন। তবে আসল কথা হলো, দ্রৌপদীর পূর্বজন্মের পাঁচবার করে স্বামী পাওয়ার বরের কথা যদি বাদও দিই, শুধু ঘরের ভেতর থেকে কিছু না দেখে, না বুঝেই মায়ের সেই আজ্ঞার জন্যেই কেবল এটি ঘটেছে, তা সর্বাংশে সত্য নাও হতে পারে। কেননা, আদেশ শুনেও সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা দ্রৌপদী যে কোনো বস্ত্ত নয়, রক্তমাংসের একটি মানুষ, যাঁর আবার বিবাহ হয়েছে এক পান্ডবের (অর্জুন) সঙ্গে, সেটা মাকে বুঝিয়ে বলতে পারতেন। আসলে খোদ স্বয়ংবর-সভা থেকেই অাঁচ পাওয়া যাচ্ছিল, কেবল অর্জুন নয়, অন্য চার পান্ডবও দ্রৌপদীর প্রতি যৌনাকাঙ্ক্ষা বোধ করতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির – যার জন্যে তিনিই এই ধরনের একটি বিবাহের প্রস্তাবক ও সম্পন্নকারী। আসলে এই বিষয়ে দ্রৌপদীরও যে ইচ্ছা-অনিচ্ছার একটা ব্যাপার থাকতে পারে, সেটা যাচাই করার কথা কারো মনেই উদিত হয়নি। জননীর প্রতি ভক্তিতে গদগদ হয়ে সব ভাই মিলে একটি কন্যাকে বিবাহ করেন। মায়ের প্রতি এত ভক্তি থাকা সত্ত্বেও দেখা যায় নারীদের বুদ্ধি-বিবেচনার প্রতি কটাক্ষ পুরাণের সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে।

ধর্ম সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতনতা থাকলেও যৌনতার ব্যাপারে তেমন রক্ষণশীল ছিল না সেই সমাজ। বিশেষত পুরুষদের বেলায়। তবে নারীদের কৌমার্য ও সতীত্বকে তখনো বড় করে দেখা হতো। অবিবাহিত অবস্থায় মাতৃত্ব অর্জন বা বিয়ের আগে কৌমার্য হারানো মোটেই গ্রহণীয় ছিল না। যার জন্যে সত্যবতী ও কুন্তির মতো শক্তিশালী, সাহসী এবং যথেষ্ট কৌশলী নারীদেরও বিবাহের পূর্বে সন্তান ধারণ করার পর সমাজের এবং পুরুষের প্রত্যাশা মেটাতে আবার দেবতার দাক্ষিণ্য নিয়ে কুমারী সাজতে হয়েছে – আদায় করতে হয়েছে বর, যাতে দেহের কোথাও কৌমার্যহানির চিহ্ন না থেকে যায়। এ যেন বর্তমান সময়ে কোনো কোনো আফ্রিকান ও আরব দেশে বিবাহযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার জন্যে এবং সামাজিক চাহিদা মেটানোর প্রত্যাশায় অবিবাহিত মেয়েদের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সতীচ্ছদ মেরামত করে পুনরায় কুমারী সেজে ফেরার চেষ্টা। কেবল বিয়ের আগে সন্তানের জন্ম হয়েছে বলেই ব্যাস যেমন সত্যবতীর মতো মায়ের দ্বারা জন্মের পরেই পরিত্যক্ত হন, তেমনি কর্ণও কুন্তিকে দিয়ে পরিত্যক্ত হন একই কারণে। দ্রৌপদীকে প্রতিবার এক স্বামীর কাছ থেকে অন্য স্বামীর কাছে যাওয়ার আগে আগুনের মধ্য দিয়ে হেঁটে গিয়ে নতুন করে সতীত্ব ও পবিত্রতা অর্জন করতে হতো। সীতাকেও রামের কাছে সতীত্ব প্রমাণ করতে আগুনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে হয়েছে। কিন্তু দেবতা, মুনি, ঋষি থেকে শুরু করে মানুষ এমনকি রাক্ষসপুরুষকেও এইভাবে শুদ্ধ বা পবিত্র হতে হয়নি এক নারীর শয্যা থেকে উঠে গিয়ে অন্য নারীর সঙ্গে শয়ন করতে যাওয়ার কালে। অথবা যখন ঘরে পরমা সুন্দরী ও আকর্ষণীয় স্ত্রী দ্রৌপদীকে রেখে অর্জুন ব্রহ্মচর্যের জন্যে বনবাসে গিয়ে তিন তিনটি বিয়ে করে ঘরে ফেরেন। নিয়োগ-পদ্ধতির বৈধতা এবং বংশ অথবা সিংহাসন রক্ষা করার জন্যে নিয়োগ-পদ্ধতির প্রয়োগ যথেষ্ট চালু তখন। নিকটাত্মীয়দের মধ্যে যৌন সম্পর্ক এবং বিবাহ-বহির্ভূত যৌন সম্পর্কেরও অজস্র উদাহরণ রয়েছে, এবং সেসব সম্পর্ক তেমন সমাজ-বহির্ভূত বা নিন্দনীয় ছিল বলেও মনে হয় না। অর্জুন, ভীমসহ পঞ্চপান্ডবের সকলেই বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক থেকে জন্মগ্রহণ করলেও সেটি নিন্দনীয় হয়নি। তবে তখনকার দিনে অগ্রহণীয় ব্যাপার ছিল ভিন্ন শ্রেণি বা বংশের নরনারীর মধ্যে যৌন সম্পর্ক স্থাপন। যার জন্য অম্বিকা ও অম্বালিকার দাসীর সঙ্গে ব্যাসের সঙ্গমের ফলে উৎপন্ন বিদূর সম্পূর্ণ সুস্থ ও সবচেয়ে বুদ্ধিমান হওয়া সত্ত্বেও ধৃতরাষ্ট্র বা পান্ডুর মতো কখনো হস্তিনাপুরের রাজা হওয়ার জন্য বিবেচিত হননি। একইরকমভাবে কর্ণ যদিও সূর্যদেবের সঙ্গে অবিবাহিত কুন্তির সম্পর্কের ফসল, বিবাহের পূর্বে জন্মগ্রহণ করার লজ্জায় পিতা-মাতা দুজনেই তাঁকে পরিত্যাগ করেছিলেন। এক রথচালক ও তাঁর স্ত্রীর মতো নিচু জাতের মা-বাবার দ্বারা লালিত-পালিত হওয়ায় এবং তাঁদের সন্তানের পরিচয়েই পরিচিত হওয়ায় দ্রৌপদী কর্ণকে তাঁর স্বয়ংবর-সভায় সম্ভাব্য পাত্র হিসেবে বিবেচনা করেননি। কারণ, ‘কর্ণ সূতপুত্র’, যদিও প্রকৃতপক্ষে তিনি তা ছিলেন না। একই কারণে কর্ণ হস্তিনাপুরের সিংহাসনের জন্যও স্বাভাবিক অবস্থায় বিবেচিত হননি।

তখনকার দিনে মুনি-ঋষি থেকে শুরু করে দেবতারা সকলেই যেন, মনে হয়, সার্বক্ষণিকভাবে কামার্ত থাকতেন। সুন্দরী যুবতী নারীকে দেখামাত্র দেবতা ও ঋষিদের অতি সহজেই ধ্যানভঙ্গ হয়ে যেত, আর সঙ্গে সঙ্গে কামচেতনার সৃষ্টি হতো। আর তখন বিনা সংকোচে তাঁরা নারীদের কাছে তাঁদের সঙ্গম-সম্ভোগের ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। প্রথমে রাজি না হলেও (কখনো কখনো আবার শুরুতেই রাজি, যেমন ইন্দ্রের আহবানে বিবাহিত অহল্যার সম্মতি) প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরে নারীরা রাজি হতো। এই রাজি হওয়া সবসময়ে স্বেচ্ছায় না অভিশাপের ভয়ে হতো, নাকি এটা ঘটতো দেবতা বা মুনি-ঋষিদের শ্রেষ্ঠত্বের কাছে বিগলিতচিত্তে নিজেকে সঁপে দিতে কিংবা বলি দিতে, ধন্য হতে, অর্থাৎ উত্তম-অধমের মনস্তাত্ত্বিক সংকটের কারণই এর জন্যে দায়ী ছিল, বলা শক্ত। তবে, এত শত বিবাহ-বহির্ভূত যৌনমিলনের কথা মহাভারতে থাকলেও রাবণ কর্তৃক তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রের সঙ্গে মিলিত হতে উদ্যত অপ্সরী রম্ভাকে ধর্ষণ ছাড়া জোর করে সঙ্গমের তেমন উল্লেখ নেই কোথাও। রাবণের এই কর্মের শাস্তিস্বরূপ তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রের দেওয়া অভিশাপে রাবণ আর কখনো কাউকে ধর্ষণ করতে সমর্থ হননি। এই অভিশাপের ফলেই কি না কে জানে, অশোকবনে এত দীর্ঘকাল বন্দি থাকা সত্ত্বেও সীতার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক গড়ে তুলতে সমর্থ হননি রাবণ।

স্বামীর যৌনক্ষমতা না থাকলেও কিংবা তা প্রয়োগে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও (বেশির ভাগ সময়েই কোনো অভিশাপে) সে অনায়াসে এবং প্রবল উৎসাহে ও প্রতাপে পছন্দমতো বিয়ে করতো তখন, কখনো একাধিকবার পর্যন্ত। যেমন, পান্ডুর দুই স্ত্রী ছিল – কুন্তি ও মন্দ্রা। নারীর অবদমিত বাসনা, তার শারীরিক চাহিদা কারো বিবেচনার বিষয় ছিল বলে মনে হয় না। নপুংসক স্বামীর সঙ্গে সুস্থ যৌবনবতী নারীর বিয়ে ভেঙে যাওয়ারও কোনো সম্ভাবনা বা উপায় ছিল না। কখনো দেখা গেছে, একাধিক স্ত্রী থাকলেও কেবল কোনো বিশেষ স্ত্রীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক থাকে স্বামীর, আর অন্য স্ত্রীরা মুখ বুজে কেবল স্বামীসেবা করে যায়। যেমন পরের দিকে দ্বিতীয় স্ত্রী কৈকেয়ী ছাড়া রাজা দশরথ কৌশলা বা সুমিত্রার সঙ্গে কখনো শারীরিক সম্পর্কে যেতেন না।

সন্তানের প্রতি তখন পিতার জাগতিক বা নৈতিক কোনো দায়িত্ব ছিল বলে মনে হয় না। সন্তান-উৎপাদনে কেবল বীর্যদান করা ছাড়া বহু পিতার আর কোনো ভূমিকা দেখা যায় না। বিশেষ করে মুনি-ঋষিদের বেলায়। তাঁরা নিজেদের জৈবিক তাড়নায় মাঝে মাঝে তপস্যা থেকে সাময়িকভাবে বিরতি নিতেন। কখনো সুন্দরী কোনো যুবতী অপ্সরী বা অন্য কোনো আকর্ষণীয় নারী যদি পাশ দিয়ে যেতে থাকতো, সঙ্গে সঙ্গে মুনি-ঋষিদের তপস্যা ভেঙে যেতো। (শিশুদের দিবানিদ্রার চাইতেও মনে হয় পাতলা ও তরল ছিল তাঁদের তপস্যার তন্ময়তা ও একাগ্রতা)। আর সঙ্গে সঙ্গে যৌনকাতর হয়ে পড়তেন মুনি এবং একবার তাঁর শারীরিক ক্ষুধা মিটলেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে সেখানে থেকে চলে যেতেন। সেই গর্ভবতী নারীর বা তাঁর অনাগত সন্তানের কোনো সংবাদ পর্যন্ত আর নিতেন না। এটাই ছিল প্রচলিত রীতি। সন্তানের সব দায়িত্বই পড়ত মায়ের ঘাড়ে। শুধু মুনি-ঋষি কেন, স্বয়ং অর্জুন চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে তাঁর যে-সন্তান জন্মে, তার কোনো খোঁজখবর নেওয়া দূরে থাক, স্ত্রী-পুত্র উভয়কেই বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন প্রাসাদে ফিরে এসে। ঘরে স্ত্রী রেখে আরো তিনটি বিয়ে করতে পারেন যে-লোক ব্রহ্মচর্যের জন্যে বনে গিয়ে এবং চার স্ত্রীর ঘরেই যখন সন্তান আসে, তখন সুবিধামতো একটি স্ত্রীর ব্যাপারে স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এভাবে প্রাণেশ্বরী শকুন্তলাকেও ভুলে গিয়েছিলেন দুষ্মন্ত। রক্তমাংসের একটি মানুষকে ভুলে গেলেও একটি বস্ত্ত, দামি একখানি অঙ্গুরীয়, দেখে স্ত্রীর কথা মনে পড়ে তাঁর যতদিনে তাঁদের পুত্রও যথেষ্ট বড় হয়ে গিয়েছে, যাকে দুষ্মন্ত আগে দেখেননি আর তাই চিনতে পারেননি প্রথমে।

বহুবিবাহ সমাজে খুবই প্রচলিত রীতি ছিল। স্বামী যতগুলো খুশি বিবাহ করতে পারে। বিয়ে করার ক্ষেত্রে তখনকার দিনের দেবতারা এবং পুরুষমানুষরা ছিলেন অত্যন্ত বেপরোয়া। তাই এই বহুবিবাহ এবং তাৎক্ষণিক বিবাহের ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কেননা, তাঁদের জীবনী লক্ষ করলে দেখা যায়, তাঁরা একজন নারীকে নিয়ে কখনোই সুখী হতেন না, একের অধিক বিয়েই ছিল দেবতা ও পুরুষদের বৈশিষ্ট্য। শান্তনু, ভীম, অর্জুন, দশরথ, পান্ডুর, বিচিত্রবীর্য, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পিতা বাসুদেবই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। ফলে, বোঝা যায়, বহুবিবাহ পুরুষদের জন্যে সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য ছিল। এমনকি কোনো কোনো নারীর জন্যেও সেটা নিন্দনীয় ছিল না, যেমন দ্রৌপদী, একাই পাঁচজন পুরুষের স্ত্রী ছিলেন। তবে প্রধান পার্থক্য হলো, পুরুষ বহুবিবাহ করতো তার নিজের অভিলাষে, যৌন তাড়নায়। নারী যদি তা করতো কখনো, সেটা বিয়ে অথবা শারীরিক সম্পর্ক যা-ই হোক না কেন, হয় তা থাকতো পুরুষ কিংবা দেবতা দ্বারা পূর্বনির্ধারিত অথবা পুরুষের বা দেবতার সাময়িক ইচ্ছায়, কিংবা বংশ বা সিংহাসন রক্ষার খাতিরে। তার নিজের ইচ্ছা প্রায় কখনো মুখ্য ভূমিকা নেয়নি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দ্রৌপদীকে কি কেউ জিজ্ঞেস করেছিল এমন অস্বাভাবিক বিবাহে তাঁর সম্মতি আছে কি না? সে যাই হোক, polygamy ও polyandry দুটোই চালু ছিল তখন। ফলে আজকের দিনে কীটপতঙ্গ, পশুপাখি এবং মানুষের ওপর গবেষণা করে যা আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা, সেই আদিকালেই তা জানা ছিল আর সেটা হলো, monogamy is neither common nor natural among males as well as females in most species. তবে polyandry-র তুলনায় polygamy অনেক বেশি চালু ছিল। কেবল পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার উপস্থিতির জন্যেই নয়, আদি যুগে শিশুমৃত্যুর হার খুব বেশি থাকায় পুরুষদের জন্যে বহুবিবাহ নারীদের জন্য বহুবিবাহের চাইতে সামাজিকভাবে শ্রেয় মনে করা হতো, যাতে মনুষ্যজাতি সংখ্যায় পর্যাপ্ত থাকে। একজন স্বামীর একাধিক স্ত্রী থাকলে তার সন্তানের সংখ্যা বেশি হওয়া স্বাভাবিক। তবে সন্তানটি যে তার আসলেই নিজের সন্তান সে-ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে এবং সম্পত্তি যাতে তারই উত্তরাধিকারীর হাতে যায় সেটা স্থির করতে স্ত্রীদের অন্তঃপুরে রাখার পক্ষপাতি ছিলেন স্বামীরা – তা পরবর্তীকালে নারীদের পর্দাপ্রথা ও গৃহের অভ্যন্তরে বন্দি হওয়ার পথ খুলে দেয়। সন্তানের প্রতি, মানে পুরুষসন্তানের প্রতি, তীব্র আসক্তি ও আকাঙ্ক্ষা পদে পদে লক্ষ করা যায়। সন্তান মানেই যেন পুরুষসন্তান, আর অলৌকিকভাবে প্রাপ্ত প্রায় সব সন্তানই পুরুষ।

সহমরণ বা সতীদাহ প্রথার মতো অমানবিক আচারের উল্লেখ রয়েছে মহাভারতে ও রামায়ণে, তবে সেটির প্রচলন বা কার্যকরতা খুব সর্বজনীন বা সচল ছিল বলে মনে হয় না। পান্ডু মারা গেলে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মন্দ্রা সহমরণে যান; কিন্তু কুন্তি, তাঁর প্রথম স্ত্রী, সহমরণে যান না। ইন্দ্রজিৎ (মেঘনাদ) নিহত হলে প্রমীলা সহমরণে যান, কিন্তু রাবণের মৃত্যুর পর মন্দোদরী সহমরণে যান না। এছাড়া অন্য অনেক উল্লেখযোগ্য নারীচরিত্রকে সহমরণে স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় যেতে দেখা যায় না। সত্যবতী ও শান্তনুর পুত্র বিচিত্রবীর্য তাঁর দুই স্ত্রী অম্বিকা ও অম্বালিকা নামক দুই সহোদরাকে রেখে মৃত্যুবরণ করেছিল। বিচিত্রবীর্য সন্তানহীন অবস্থায় মারা যাওয়ায় তাঁর সঙ্গে এই দুই বিধবাবধূও যদি সহমরণে যেতেন, তাহলে সত্যবতীর এতো সাধের হস্তিনাপুরের সিংহাসনে তাঁর নিজের বংশের কারো বসার মতো কেউ থাকতো না। কেননা, সত্যবতী তো আগেই চুক্তি করে তাঁর বিবাহপূর্বকালে জন্মানো ঋষি পরাশরের সঙ্গে প্রাপ্ত পুত্র ব্যাস এবং শান্তনু গঙ্গার পুত্র ভীষ্মকে উত্তরাধিকারের অধিকার থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। সেই দুই অবহেলিত পুত্রই তখন তপস্যায় মগ্ন ছিলেন। ফলে সহমরণের পরিবর্তে নিয়োগ-পদ্ধতিতে যদি সত্যবতী সেই দুই পুত্রবধূর জটাধারী রক্তচক্ষু ব্যাস দ্বারা (পিতার কাছে ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা-অনুযায়ী তিনি কোনো নারীসঙ্গে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন) পুত্রবতী না করতেন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের অনেক আগেই কুরু-পান্ডবদের বংশের সমাপ্তি ঘটতো। প্রত্নতাত্তিক গবেষণায় জানা যায়, কেবল ভারতবর্ষে নয়, মিশরসহ প্রাচীন আফ্রিকার বহু দেশেও রাজা বা ওইরকম বড় কেউ মারা গেলে কেবল তার স্ত্রী নয়, প্রিয় ও নিকটাত্মীয় ও দাস-দাসীদেরও সহমরণে যেতে হতো, যাতে পরকালে গিয়ে জীবনধারণ করতে কোনো বেগ পেতে না হয় সেই রাজা বা নেতার – যাতে কোনো কষ্টই না হয় তাঁদের। এই উপমহাদেশেও, শোনা যায়, একসময়ে রাজারা পরলোকে এই জীবনের ধারাবাহিকতা প্রত্যাশা করতেন, তাই প্রাচীন মিশরের মতো এখানেও কেবল স্ত্রী নয়, সবচেয়ে পছন্দের দাসী, অলংকার, বাসনপত্র সব সঙ্গে দেওয়া হতো চিতায় – যাতে পরজন্মে কোনো অসুবিধা না হয়। তবে কুন্তি যেখানে সহমরণে গেলেন না, মন্দ্রা গেলেন, তাতে মনে হয়, স্বামীভক্তির চাইতে মন্দ্রার ওই ইচ্ছামরণের পেছনে অপরাধবোধ কাজ করেছে বেশি। হরিণের রূপধারী মিথুনে ব্যস্ত ঋষি ও তাঁর স্ত্রীকে না জেনে শিকার করে ফেলায় পান্ডু যে ভয়ংকর অভিশাপ পেয়েছিলেন, স-অনুযায়ী যে-কোনো নারীর সঙ্গে রতিক্রিয়া করতে গেলে অবধারিতভাবে পান্ডুর মৃত্যু হবে। এটা জানা সত্ত্বেও মন্দ্রা ও পান্ডু সেদিন সেই নিষিদ্ধ দেহজ খেলায় মেতে উঠেছিলেন। ফলে সঙ্গে সঙ্গে পান্ডুর মৃত্যু হয়। এত বড় ক্ষতি, এত বড় অপরাধের পর, স্বর্গে যেতে হলে এই সহমরণ ছাড়া আর কোনো গতি ছিল বলে হয়তো মন্দ্রার জানা ছিল না। মন্দ্রার মৃত্যুর পর তাঁর দুই অনাথ যমজ সন্তান সহদেব আর নকুলকে কুন্তি নিজের সন্তানের মতোই বড় করে তোলেন। ফলে, মনে হয়, সহমরণ তখন বাধ্যতামূলক ছিল না। অনিবার্য স্বর্গলাভের জন্যে ওটা ছিল ঐচ্ছিক। বনবাসে থাকাকালে নিজের হাতে উত্তরাকে নৃত্যবিদ্যা শিখিয়ে অর্জুন উত্তরার সঙ্গে অর্জুনের পুত্র (সুভদ্রার সঙ্গে) অভিমন্যুর বিয়ে দেন। কিন্তু বিয়ের মাত্র কিছুদিন পরেই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে অভিমন্যু নিহত হন। তখন উত্তরা সহমরণে যেতে প্রস্ত্তত হলে কৃষ্ণ এসে তাঁকে বাধা দেন। কেননা, উত্তরা তখন গর্ভবতী ছিলেন এবং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর ভূমিষ্ঠ এই সন্তান, পরীক্ষিতই, হবে কুরুপান্ডব বংশের একমাত্র জীবিত উত্তরাধিকারী এবং হস্তিনাপুরের সিংহাসন তাঁকেই গ্রহণ করতে হবে।

সেই সময়ে নারীর ভাগ্য ও করণীয় সবই পুরুষদ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো। একটি নারী নগরবধূ হবে না গৃহবধূ হবে পুরুষ স্থির করে দিতেন। আম্রপালী অভূতপূর্ব সুন্দরী হওয়ায় সকলেই যখন তাঁকে পেতে চাইছে, রাজ্যের ভেতর আম্রপালীকে নিয়ে রেষারেষি দ্বন্দ্ব-শত্রুতা যখন শুরু হয়ে গিয়েছে, তখন রাজ্যের শান্তিরক্ষার্থে এবং সকল পুরুষকে শান্ত করার জন্যে সবচেয়ে সহজ উপায় বলে আম্রপালীর কোনো মতামত না নিয়ে তাঁকে নগরবধূ করে দেওয়া হলো। আম্রপালীই হয়তো একমাত্র নারী যাকে রাষ্ট্র বারবনিতা বানালো। তাঁর একমাত্র অপরাধ ছিল তিনি অতি সুন্দরী। দ্রৌপদী নিজে কেবল এক স্বামী, অর্জুনকে, চাইলেও তাঁকে পঞ্চস্বামীর ঘর করতে হয়। দ্রৌপদীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা এখানে বিবেচনার বিষয় নয়। দ্রৌপদীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে প্রতিভা বসু লিখেছেন, ‘নারীদেহ তো নয় যেন খেলার বল। একের কাছ থেকে যাচ্ছে অপরের কাছে।’ রাবণকে বধ করার পর রামের ইচ্ছায় বিভীষণ ভ্রাতৃবধূ, রাবণের বিধবা স্ত্রী মন্দোদরীকে বিয়ে করেন। অথচ রাবণের সঙ্গে রামের যুদ্ধে মন্দোদরী সরাসরি স্বামীর সঙ্গে রামের বিরুদ্ধে অস্ত্রচালনা করেন। ভাই হওয়া সত্ত্বেও বিভীষণ রাবণের বিরুদ্ধে যেরকম বিশ্বাসঘাতকতা করে রামের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন, তাতে মন্দোদরীর এই বিয়েতে মত ছিল কি না সন্দেহ আছে। কিন্তু সেটা রাম বা বিভীষণের কাছে কোনো বিবেচ্য বিষয় হয়নি।

নারীর প্রায় কখনো নিজস্ব কোনো ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি বা মতামত ছিল না। পুরুষ অথবা দেবতার কাছ থেকে শক্তি বা ক্ষমতা ধার করে সে শক্তিময়ী হয়ে উঠতো। অথবা প্রয়োজনে পুরুষ বা দেবতা সেই শক্তি ধার দিত নারীকে কোনো একটি বিশেষ কর্ম বা কর্তব্য সম্পাদনের জন্য। এক্ষেত্রে প্রাচ্য-পুরাণের পুরুষ ও নারী আকাশে উদিত সূর্য ও চন্দ্রের মতো। সূর্যের নিজস্ব আলো আছে, তেজ আছে, উত্তাপ আছে। আর চাঁদ কেবল সূর্য থেকে আলো ধার করে আলোকিত হচ্ছে, অথবা অন্ধকারেই পড়ে থাকে। তার নিজস্ব কোনো জ্যোতি নেই। আদি ও মধ্যযুগের বেশিরভাগ নারীর অবস্থাও তাই ছিল। আর তাই দেখা যায়, অধিকাংশ সময়ে পৌরাণিক পুরুষেরাই অভিসম্পাত কিংবা বর দিচ্ছেন নারীকে। এর উলটোটির উদাহরণ খুব বেশি চোখে পড়ে না।

পুরাণের ছত্রে ছত্রে নারীবিদ্বেষ, নারীর অধস্তনতা ও তাদের প্রতি কটাক্ষ লিপিবদ্ধ রয়েছে। যত পুরনো দিনের ধর্মগ্রন্থ, সাধারণত তত বেশি ও তত খোলাখুলি ছিল এই বিদ্রূপ আর কটাক্ষ। যে তিনজন পুরুষ বিশেষ করে অত্যন্ত গর্হিতভাবে, প্রকাশ্যে, খোলাখুলিভাবে নারীবিদ্বেষী এবং অযৌক্তিকভাবে যারা নারীর বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তাঁরা হলেন, ধর্মাবতার আজীবন কুমার, নারী সংস্রবহীন তপস্বী ভীষ্ম, ধর্মে ও সত্যবাদিতায় অবিচল বলে সুপরিচিত যুধিষ্ঠির যিনি নিজের স্ত্রীকে বাজি রেখে পাশা খেলেছেন এবং একটিবারও তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেননি বা স্ত্রীর অপমানের প্রতিবাদ করেননি, এবং সকলের জানা প্রচন্ড নারীবিদ্বেষী মুনি মনু ঋষি।

মহাভারতে ভীষ্ম বলেছেন : স্ত্রীলোককে কুমারী অবস্থায় পিতা, যৌবনে স্বামী ও বৃদ্ধাবস্থায় পুত্র রক্ষা করবে। তাদের স্বাতন্ত্র্য প্রদান করা বিধেয় নয়। তিনি আরো বলেন : ইহলোকে স্ত্রীলোক অপেক্ষা পাপশীল পদার্থ আর কিছুই নেই। প্রজ্বলিত আগুন, ক্ষুরধার, বিষ, সাপ ও মৃত্যু এইসব ভয়াবহ জিনিসের সঙ্গে তাদের তুলনা করা যায়। মৃত্যুপথযাত্রী ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বলেন : নারীর চেয়ে অশুচি আর কিছু নেই। পূর্বজন্মের পাপের ফলে নারীজন্ম হয়। সাপের মতো নারীকেও কখনো বিশ্বাস করা উচিত নয়। নারীর কাছে মিথ্যা বললে পাপ হয় না। তাঁর মতে, ছটি বস্ত্তকে সর্বক্ষণ চোখে চোখে না রাখলে সেগুলো নষ্ট হয়ে যায় : গাভী, সেনা, কৃষি, স্ত্রী, বিদ্যা এবং শূদ্রসংসর্গ। যে-ভীষ্ম কোনোদিন বিবাহ করেননি, নারীসঙ্গ ভোগ করেননি, তিনি কেমন করে নারীর যৌনতা সম্পর্কে অবলীলায় বলে যান, ‘উহাদের মতো কামোন্মত্ত আর কেহই নাই। কাষ্ঠরাশি দ্বারা যেমন অগ্নির, অসংখ্য নদীর দ্বারা যেমন সমুদ্রের, সংহার দ্বারা অন্তকের তৃপ্তি হয় না, তদ্রূপ অসংখ্য পুরুষসংসর্গ করিলেও স্ত্রীলোকের তৃপ্তি হয় না।’ মহাভারতে রাজা যযাতির পুত্র দ্রুহু্য নারীকে ভোগ্যবস্ত্তরূপে চিহ্নিত করেছেন। পুরাণে আরো বলা হয়েছে : পুত্র হলো সর্বোচ্চ স্বর্গের প্রদীপ আর কন্যা হলো দুঃখের কারণ। স্মৃতিশাস্ত্রের প্রধান প্রবক্তা মনু নারীকে মিথ্যার মতোই অপবিত্র বলেছেন এবং তাদের বেদপাঠের অধিকার হরণ করেছেন। মনুর মতো নারীবিদ্বেষী ঋষি আর দ্বিতীয়টি দেখা যায়নি। নারীনিন্দার ব্যাপারে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরও কম ছিলেন না। কুন্তির মতো যাঁর মা, দ্রৌপদীর মতো যাঁর স্ত্রী, কৌরব-পান্ডবদের মধ্যে এই প্রজন্মের সর্বজ্যেষ্ঠ সন্তান যিনি, সদা সত্যবাদী বলে যাঁর সুনাম চতুর্দিকে, তিনি যে কেন এমন নারীবিদ্বেষী হলেন, বোঝা কঠিন। তিনি নারীকে সর্বপাপের দ্বার বলে অভিযুক্ত করেছেন। তাঁর ভাষায় : গাভী যেমন নতুন নতুন তৃণ ভক্ষণ করতে অভিলাষ করে, সেরকম নারীরাও নিত্যনতুন পুরুষের সঙ্গে সংসর্গ করতে বাসনা করে থাকে। যুধিষ্ঠির আরো বলেন, স্ত্রীজাতি কোনো বিষয়কেই কখনো গোপন রাখতে পারে না। রোমান্টিক প্রেমিক অর্জুনও স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে জন্মানো তাঁর আপন পুত্রকে চিনতে না পেরে তাঁকে লাথি দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে তাঁর মায়ের নামে অযথা কটু ও নিষ্ঠুর মন্তব্য করেন। পঞ্চতন্ত্রে বলা হয়েছে : মেয়েরা তখনই কেবল সতী হয়, যখন নিভৃতি নেই, সুযোগ নেই আর প্রার্থীপুরুষ নেই। স্মৃতিশাস্ত্রে রয়েছে পুরুষের প্রভুত্ব আর নারীর দাসত্বের কথা। প্রাচ্য পুরাণে নারী-পুরুষের শাস্তির বিধানও ছিল ভিন্ন। স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কে যৌন-শুচিতার ক্ষেত্রে প্রচন্ড বৈষম্য লক্ষ করা যায়। অসতী স্ত্রী বিনাশর্তে, বিনাবিচারে পরিত্যাজ্য, পক্ষান্তরে ব্যভিচারী স্বামীর প্রায়শ্চিত্তে নিষ্কৃতি। সতীত্ব সর্বদা নারীরই পালনীয়। অন্যদিকে একমাত্র অজাচার কিংবা অগম্য-গমন ব্যতীত পুরুষের যে-কোনো স্খলন বা ব্যভিচারের বিধান কেবল প্রায়শ্চিত্ত। পরনারী, রজঃস্বলা ও গর্ভবতী স্ত্রীলোকের সঙ্গে যৌনসংসর্গ করলে শুধুমাত্র প্রায়শ্চিত্ত ছাড়া অন্য কোনো শাস্তির প্রয়োজন নেই পুরুষের। অর্জুনের মতো শক্তিধর লোকদের তাও করতে হয় না। অর্জুন যখন প্রথম সহবাস করে তাঁর চতুর্থ স্ত্রী উলুপীর সঙ্গে, উলুপী তখন অন্যত্র বিবাহিত ছিলেন। তাই অর্জুনের বহুদিন লাগে মনস্থির করতে উলুপীকে আদৌ স্ত্রীর মর্যাদা দেবেন কি দেবেন না। কিন্তু ইতোমধ্যে আরো তিনটি স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও উলুপীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখায় এবং তাঁর সঙ্গে আরেকটি পুত্রের পিতা হওয়ায় অবশেষে অর্জুন উলুপীকে স্ত্রীর মর্যাদা দেন। উপনিষদের প্রখ্যাত ঋষি যাজ্ঞবল্ক নারীকে নিজের দেহের অধিকার থেকেও বঞ্চিত করেছেন। বৃহদারণ্যক উপনিষদে তিনি বলেন : সম্ভোগে অনিচ্ছুক স্ত্রীকে প্রথমে মিষ্টি কথা বলতে হবে, তাতেও সম্মত না হলে বস্ত্র এবং অলংকার দিয়ে তাকে রাজি করাতে হবে। তাতেও সম্মত না হলে হাত দিয়ে বা লাঠি দিয়ে তাকে প্রহার করতে হবে। ভীষ্মের অনুশাসন বলে : ব্যভিচারিণী স্ত্রীকে স্বামীগৃহের মধ্যে বন্ধ করে শুধু বেঁচে থাকার জন্যে একান্ত জরুরি এবং যৎসামান্য খাদ্য দিয়ে রাখবে। কিন্তু স্ত্রী যদি স্বামীকে পরিত্যাগ করে নিকৃষ্ট জাতির সঙ্গে সংসর্গ করে, তবে শাস্ত্রের বিধান-অনুযায়ী স্বামীর উচিত সেই স্ত্রীকে প্রকাশ্যে কুকুর দিয়ে খাওয়ানো। অন্যদিকে পুরুষ অকুলীন পত্নীতে গমন করলে অথবা অন্য স্ত্রী-সংসর্গ করলে, দুই-তিন বছর ব্রহ্মচর্য পালন করার পর দুই তিনদিন স্বল্পাহার করে দিনের শেষে অগ্নিতে আহূতি দিলেই সব পাপ মোচন হয়ে যাবে।

ফলে দেখা যাচ্ছে, সাধারণভাবে বর্ণপ্রথার মতোই লিঙ্গবিভেদও সেকালে বড়ই প্রখর ছিল। নারীর অধস্তনতা পুরাণের পরতে পরতে লিপিবদ্ধ। জৈবিক বাসনা-চরিতার্থ করতে এবং গৃহকর্মের জন্যে নারীর প্রয়োজন হলেও পরিবার বা সমাজে তার প্রতি পুরুষের ছিল গভীর অনাস্থা, অশ্রদ্ধা, অবজ্ঞা। যে-যুগে পুরুষ যত খুশি বিয়ে করতে পারতো, সেই যুগে নারীদের সর্বদা ব্যস্ত ও তটস্থ থাকতে হতো তাদের সতীত্ব ও কুমারীত্ব আগলে রাখার জন্যে। শক্তি বা ক্ষমতা যদি কিছু তাদের থাকতো, যদি নিজেদের সিদ্ধান্ত বা মতামত দেওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো, তাহলে দেখা যেতো অবধারিতভাবেই নারী সেটা অর্জন করেছে কঠিন তপস্যার মাধ্যমে কোনো দেবতার মন গলিয়ে অথবা বর মেগে, কিংবা কোনো কামার্ত মানুষ বা দেবতার সঙ্গে সম্ভোগের বিনিময়ে সেই বিশেষ অধিকার বা ক্ষমতার জন্যে দরকষাকষি করে বা সন্ধি স্থাপন করে। আর তাই আজকের লেখক পুরাণের নারীকে নবরূপায়ণে দেখতে চান (যেমন রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা), তাঁর ক্ষমতায়ন কল্পনা করেন। বাংলা সাহিত্যের দেড়শো বছরের ইতিহাসে এমন লেখকের সংখ্যা একেবারে কম নয়, যারা নারীর এই প্রগাঢ় অবমূল্যায়নে ক্রুদ্ধ, ব্যথিত ও সহানুভূতিশীল ছিলেন, এবং তাঁদের সৃজনশীল রচনাতে তা বারেবারে বিধৃত হয়েছে। আশা করা যায়, প্রাচ্য পুরাণের নারী এবং আজকের প্রাচ্যের নারী উভয়েই আমাদের সাহিত্যে-সংস্কৃতিতে সামাজিক মূল্যবোধে-জীবনচর্চায় যথাযোগ্য স্থানে প্রতিষ্ঠিত হবেন। অন্তত লেখকের চিন্তার স্বাধীনতায়, তাঁদের কল্পনায় এবং স্বপ্নে সেটা প্রতিনিয়ত প্রতিফলিত হবে।

       

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>