Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,নির্ঝর

ইরাবতী ধারাবাহিক:ফুটবল (পর্ব-৪) । দেবাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

Reading Time: 4 minutes

অষ্টম শ্রেণির দুই বন্ধু রাজ আর নির্ঝর। রাজ আর অনাথ নির্ঝরের সাথে এইগল্প এগিয়েছে ফুটবলকে কেন্দ্র করে। রাজের স্নেহময়ী মা ক্রীড়াবিদ ইরার অদম্য চেষ্টার পরও অনাদরে বড় হতে থাকা নির্ঝর বারবার ফুটবল থেকে ছিটকে যায় আবার ফিরে আসে কিন্তু নির্ঝরের সেই ফুটবল থেকে ছিটকে যাবার পেছনে কখনো বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নির্ঝরের জেঠু বঙ্কু। কখনো বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় বঙ্কু ও তার ফুটবলার বন্ধু তীর্থঙ্করের বন্ধুবিচ্ছেদ। কিন্তু কেন? সবশেষে নির্ঝর কি ফুটবলে ফিরতে পারবে? রাজ আর নির্ঝর কি একসাথে খেলতে পারবে স্কুল টিমে? এমন অনেক প্রশ্ন ও কিশোর জীবনে বড়দের উদাসীনতা ও মান অভিমানের এক অন্য রকম গল্প নিয়ে বীজমন্ত্রের জনপ্রিয়তার পরে দেবাশিস_গঙ্গোপাধ্যায়ের নতুন কিশোর উপন্যাস ফুটবল আজ থাকছে পর্ব-৪।


 

স্কুল খুলে গেছে বেশ কিছুদিন। এখন আবার রাজের অবস্থা যে কে সেই। নিয়ম করে পড়া শুরু হয়েছে। তবে ইদানিং  পড়ার উন্নতি হয়েছে। ফার্স্ট টার্মের রেজাল্টে  অঙ্কে সে প্রায় নব্বই পার্সেন্ট পেয়েছে। মা খুশীটা চেপে রাখতে পারেন নি।আসলে কোনবারই রাজ অঙ্ক ভালো  করে না, এবার তা করায় মা খুব খুশি।রাজ নিজেও খুব আনন্দ পেয়েছে। তার রেজাল্ট ভাল হবার পেছনে অল্প হলেও নির্ঝরের কৃতিত্ব আছে। নির্ঝরেরবাড়িতে হাজাররকম সমস্যা,তার জেঠু  আজকাল নাকি তার সঙ্গে আরো বেশী খারাপ ব্যবহার  করতে শুরু করেছে,কিন্তু শত অসুবিধা সত্ত্বেও সে পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়,সে বরাবরের মত রেজাল্টও ভাল করছে। নির্ঝর  ওকে বলছিল,“তোর অঙ্কে খুব ভয় না রে?”

সে বলছিল,“হ্যাঁ রে।খুব ভয় লাগে।“

“স্যারদের কাছে বুঝতে পারিস না?”

ক্লাসে স্যাররা বোঝান ঠিকই।এ ছাড়াও তার বাড়িতে মাষ্টার আছে।তবুও তার মাথায় অঙ্ক ঢোকে না। সে বলে,“অল্প অল্প বুঝি। আসলে কি জানিস অঙ্ক আমার একদম ভাল লাগে না।“

“ওইজন্যই তো। তুই ভালবাসলে দেখতিস তুই পারবি।আমারও আগে হত।“

“কি করলি তারপর?”

“না পারলেও করতাম।স্যারদের দ্যাখাতাম।“

রাজ এটা খেয়াল করেছে। নির্ঝর পড়ার ব্যাপারে নাছোড়বান্দা। সে এমনিতে কথা বলে না কিন্তু  কিছু না বুঝলেই সে ষ্টাফরুমে দৌড়ে যায়। কোন  কোন স্যার দেখিয়ে দেন।কেউ আবার বিরক্ত হয়ে চলে যান। কিন্তু নির্ঝর কিছুতেই ছাড়ে না। পরের দিনও তা বোঝার জন্য সে স্যারকে বলে। রাজ কোনসময় এটা পারবে না। স্যারদের সঙ্গে কথা বলতে গেলেই সে কেমন যেন হয়ে যায়।  মুখ থেকে কথা ফোটে না। সে বলে,-“ও আমার দ্বারা হবে না।“

নির্ঝর  বলে,“তুই আমার কাছে বুঝে নিতে পারিস।“

“তোর কাছে?”

“হ্যাঁ। অফ পিরিয়ডে বা টিফিনে অসুবিধা হলে বলিস।“

তাই থেকে দুজন মিলে বেশ একটা ব্যবস্থা হয়েছে। সে যেমন অঙ্কে কাঁচা। নির্ঝর ইংরাজীতে। দুজন মিলে এ ওকে সহযোগিতায় সুবিধা হতে শুরু করেছিল।নির্ঝর এবার ইংরাজীতে আগের চেয়ে ভাল নম্বর পেয়েছে।

রাতে খুশী খুশী মেজাজেই রাজরা সবাই মিলে খেতে বসল।এ সময়টাই বাবা একটু সময় পান।নইলে বাবার  সঙ্গে কথা বলার অবসর থাকে না। তাছাড়া ঘরে থাকলেও বাবার হাতে মোবাইল,বা কমপিউটার নিয়ে দিনরাত নানা কাজে ব্যস্ত। বাবার ফোন রাজ হাতে পায় না। মায়ের ফোন সে সময় পেলে দ্যাখে।তবে মায়ের টাইম দেওয়া আছে। তারমধ্যেই এক-আধটা গেম  খ্যালে রাজ।

খাওয়াদাওয়ার পররাজ শোবার ঘরে ঢুকতে যেতে মা বললেন,  “এই  রবিবারে নির্ঝরকে আসতে বলিস।“

বাবার খাওয়া হয়ে গেছিল। টেবিলে তবু  ছোটমামার সঙ্গে গল্প করছিলেন। মায়ের কথা শুনে তিনি বললেন,“নির্ঝর মানে ওই ছেলেটা?”

মা বললেন,“হ্যাঁ।ভারি ভাল ছেলে। কিন্তু খুব গরীব। শুনেছি ওর জেঠু নাকি ওকে পড়তে দিতে চায় না।এখুনি কাজে নামিয়ে দিতে চায়। ওইটুকু ছেলে।আমি তো সারাদিন চিন্তা করি।  রাজের সাথে ওর খুব ভাব।“

“ভাল তো।“

“ছেলেটা কিন্তু একটু অন্যরকম জানো।পড়াশুনো করে আবার খেলাতেও বেশ।“

“বা!”

“কিন্তু ও একদম খেলতে চায় না।“

“কেন?”

“কি জানি! রাজ জানে।“

রাজ কি বলবে তা ভেবে পেল না। সত্যি কথা বলতে নির্ঝর কেন খেলতে চায় না সে নিজেই জানে না। গরমের ছুটির সময় ওকে  খেলাতে নামানোর জন্য তার ঘাম ছুটে গেছিল। অনেক কষ্টে তাকে নামিয়েছিল তারা। নির্ঝর বল-ব্যাট কিছুই করে নি।তবে ওর দৌড় দেখে সবার তাক লেগে গেছিল। সাঁই-সাই বেগে ও দৌড়ায়।রাজ বলল, “হ্যাঁ। গো বাবা। ও যে কি ভাল দৌড়ায় বিশ্বাস করতে পারবে না। স্কুলে কোনদিন খেলায় নাম দেয় নি ও। এবার আমি জোরজার করে একশ মিটার ইভেন্টে নাম দিয়েছিলাম।“


আরো পড়ুন: ফুটবল (পর্ব-৩) । দেবাশিস গঙ্গোপাধ্যায়


বাবা কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“খেলায় কি হল?”

“কি আবার হবে!নির্ঝর ফাষ্ট। আমাদের গেমটিচার  মৈনাকস্যার  জেতার পর ওকে খপ করে ধরলেন।বললেন,- “তুই কোথায় প্র্যাকটিশ করিস রে? এত ভাল দৌড়াস!” নির্ঝর বলল সে কোথাও খেলে না । স্যার বিশ্বাস করলেন কিনা কে জানে। ওকে বললেন,- “শোন। তুই খেলা ছাড়িস না। তোর হবে।“

বাবা বললেন,“ বাহ!”

রাজ বিমর্ষভাবে বলল,“সে ঠিক কথা বাবা। কিন্তু স্যার চলে যাবার পর ওর একই কথা। আমি খেলব না রে। আমার নাম তোরা আর দিস না। আমি জিজ্ঞেস করলাম,-“কেন? নির্ঝর মাথা নাড়ল।কিছু বলল না। এত চাপা না!“

বাবা আর কথা বাড়ালেন না।কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন,“হয়ত ওর কোন সমস্যা আছে।তাছাড়া পড়াশুনোয় ভাল। তাই সময় নষ্ট করতে চাইছে না। কি আর করা যাবে?  তা সে তো ভাল কথা। বন্ধুর কথা বললি।  খেলায় কি তুই নাম দিস নি?”

ছোটমামা এতক্ষন চুপ করে ছিলেন।এখন তিনি ফস করে বললেন,“হ্যাঁ। দিয়েছিল তো।আমি দেখতে গেছিলাম। রাজও দৌড়েছিল। ও সেকেন্ড হয়েছে।“

“বা। এত ভাল খবর। আগে বলিস নি তো?সেই থেকে  বন্ধুর কথা বলে যাচ্ছিস।“

“বারে! ওর কথা বলব না! ও  আমার থেকে কত কষ্ট থাকে বাবা।আমি ওর বাড়ি গেছিলাম। খুব দুঃখী জান ।আচ্ছা, বাবা। ও যদি আরো খেলতে চায় তুমি ওকে সাহায্য করবে?”

বাবা একমুহুর্ত কি বলবেন ভেবে পেলেন না। রাজের কোমল মন দেখে তাঁর মন  আনন্দে ভরে গেল। কিন্তু তিনি নির্ঝরের জন্য কতদুর কি করবেন তা বলা এমুহুর্তে  খুব শক্ত। কিন্তু রাজকে দমাতে তাঁর ইচ্ছে করল না। বাবা বললেন,“আগে ও খেলবে না পড়বে তা ঠিক করুক।আমরা না হয় চেষ্টা করব।কি বল ইরা?

মা বললেন,“সে হবেখন। আগে ও রবিবার আসুক। তারপর দেখি ওর মন কি চায়।“

রাজ  শোবার ঘরে ঢুকে পড়ল। সে শুনতে পেল বাবা নীচুস্বরে মাকে বলছেন,“ইরা। ছেলের মন খুব ভাল। সে দয়ালু। বন্ধুর জন্য ভাবে। সব ঠিক কথা।কিন্তু নিজের কথাও ভাবতে হবে। নইলে পরে তো ঠকতে হবে।“

মা শিউরে উঠে  বললেন,“এ কি বলছ তুমি?এমন মন পাওয়াও তো বড় ব্যাপার। ও যদি ঠকে ঠকবে।খবরদার বাধা দিও না।  নিষ্ঠুর ছেলে আমি  তৈরী করতে পারব না।“

বাবা বললেন,“আ!আমি কি তাই বলেছি!”

বাদবাকি কথা আর রাজ শুনতে পেল না। সে এখন  নির্ঝরের কথা ভাবল। ও যদি খ্যালে ওর কত যে নাম হবে। রাজ ঠিক করল স্কুলে গিয়ে সে নির্ঝরকে  খেলার জন্য রাজি করাবে।

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>