| 13 এপ্রিল 2024
Categories
শারদ সংখ্যা’২২

শারদ সংখ্যা গল্প: জোয়ার-ভাঁটা ।  রিমা দাস

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

 

দুপুর তিনটে, বড়বাজারের ‘আরোগ্য’ নামের ওষুধের দোকানে ভীড় তখন কিছুটা কম। একজন যৌবন অতিক্রান্ত মধ্য চল্লিশের পুরুষ নির্মাল্য,ঠিক তেমনি বিগতা যৌবনা তিরিশের শেষ ধাপের এক মহিলা রত্না যে যার মায়ের জন্য ওষুধ নিতে এসেছে। দোকানটায় হেন ওষুধ নেই যা পাওয়া যায়না সাথে এই দোকানে মোট বিলের উপর দু’পার্সেন্ট ছাড় পাওয়া যায়। ফলে দোকান সবসময়য় মানুষজনে ভর্তি।  টাকা পয়সা মিটিয়ে কাউন্টারের ছেলেটির হাত থেকে ওষুধ নিয়ে নির্মাল্য শুনতে পায় অন্যপ্রান্তে কাউন্টারের আরেকটি ছেলে রত্নাকে বলছে-দিদি আপনার সব সুদ্ধু বাইশশো বিয়াল্লিশ টাকা হয়েছে। ওষুধগুলো একবার মিলিয়ে নিন।   

সেকি! এত্তোও!  এত কেন হলো?                                

দুটো ওষুধ আছে তার দামই তো বারশো টাকার উপর। 

রত্না একটু থতমত খেয়ে তাকিয়ে থাকে। এতগুলো টাকা সে ভাবতে পারেনি। বোকামো তার। ভাবা  উচিত ছিল মার নতুন দুটো ওষুধ যোগ হয়েছে। সেই বুঝে বাবার থেকে টাকা নিয়ে আসার প্রয়োজন ছিল। একটু কাত হয়ে সবার থেকে আড়াল করে পয়সার ব্যাগ খুলে দেখে অসম্ভব তার ব্যাগে কুড়িয়ে কাচিয়ে হাজার বারশো তেরশো টাকার বেশী হবেনা। এখন কোন ওষুধ ছেড়ে কোন ওষুধ নেয় সে। ছেলেটি কে কি বলবে বাকী টাকা পরের বার দিয়ে দেব। যদি ছেলেটি না বলে সে এক ভয়ঙ্কর লজ্জার ব্যাপার হবে। রত্নার দোনোমনা অবস্থা দেখে কাউন্টারের ছেলেটি জিজ্ঞাসা করে– কার্ড আছে?   

না,ব্যবহার করিনা। 

তবে এক কাজ করুন দিদি যে ওষুধগুলো না হলেই নয় সেগুলো নিয়ে যান, বাকীগুলো না হয় পরে এসে নিয়ে যাবেন।

মার যে  প্রতিদিন প্রতিটাই  দরকার। রত্না কাঁদোকাঁদো। তার বাড়ি, বড়বাজার থেকে সে যাবে আর চট করে আসবে তেমন দূরত্বেও নয়। নির্মাল্য এতক্ষণ চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল। এইবার সে মধুসূদন হয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।

কিছু মনে করবেননা আমি আপনাদের কথা শুনছিলাম। মাফ করবেন এক্ষেত্রে উপযাচক হয়ে আমি কিছু বলতে চাই। রত্না হতভম্ব হয়ে অচেনা পুরুষটির দিকে তাকায়। নির্মাল্য দেখল বড় করুণ বড় অসহায় সে দৃষ্টি।এইরকম অবস্থায় অচেনা মহিলাটির প্রতি তার খুব মায়া হল। সে বল্লো- আমি বাকী টাকাটা দিয়ে দিচ্ছি। আপনি ওষুধগুলো নিয়ে যান। পরে আমায় দিয়ে দেবেন। 

না, না সেকী করে হয়। আমি আপনার টাকা নেব কেন?   

আমি তো আপনাকে একবারও টাকা নিতে বলেনি। একপ্রকার ধার দিচ্ছি। তাই তো বলেছি পরে ফেরত  দিয়ে দেবেন। ওষুধের গুরুত্ব দিয়ে বোঝাবার পর অগত্যা রত্না রাজী হয়। বলা চলে বাধ্য হয়ে  অনুরোধের ঢেঁকি গেলে। নির্দিষ্ট দিনে রত্না  টাকা নিয়ে এসে নির্মাল্যকে ফেরত দিয়ে যায়। নির্মাল্যও নিজের কথানুযায়ী বিনা বাক্য ব্যয়ে সেই টাকা ফেরত নেয়। রত্না স্বস্তিবোধ করে এবং কৃতজ্ঞ চিত্তে নির্মাল্য কে ধন্যবাদ জানায়। এই সূত্রপাত ধরে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে তাদের একে অপরকে চেনা, বিস্তারিত ভাবে পরিবারের কথা জানা এবং দৃঢ় হতে থাকে নিজেদের পরিচিতির বন্ধন। অবেলায় অদৃশ্য থেকে মুচকি হেসে কিউপিড তীর ছোঁড়ে তাদের দিকে।

*******

নির্মাল্য বড়বাজারে এক ছোটখাট মাড়োয়ারীর দোকানের কর্মচারী। বিধবা মা ও নিজেকে নিয়ে তার দুজনার সংসার। যখন সে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী তখন এক সন্ধ্যায় কারখানা থেকে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ পথ দুর্ঘটনায় তার বাবার মৃত্যু হয়। সাতবছরের দুই যমজ বোন ও মাকে নিয়ে সেই সময় থেকে নির্মাল্যর বটগাছের শীতল ছায়ার দিন বদলে যায় গ্রীষ্মের মধ্য দুপুরের প্রখর খরতাপে। সিমেন্টের দোকান, মুদির দোকান বহুজায়গায় কাজ করে কোনরকমে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার বেড়া ডিঙ্গোবার পর পাড়ার মোহিতকাকু তার মালিকের ভাইয়ের বড়বাজারে রাজা-কাটরায় কাপড়ের দোকানে তাকে হিসাবের খাতা দেখার কাজ জুটিয়ে দিয়েছিল। সেও দেখতে দেখতে বছর সাতাশ আঠাশ হতে চল্লো। ধীরে ধীরে বিশ্বস্ততা অর্জন এবং দীনেশ পালের থেকে কাজ শিখে এখন সে ‘কাপাডিয়া আন্ড সন্স’-এর চীফ আ্যকাউনটেন্ট। অফিসিয়াল পোস্টের নামটি গাল ভরা হলে কি হবে মাসের শেষে বেতন উল্লেখনীয় কিছু নয়। নিজের লেখাপড়ায় বাধ্য হয়ে ইতি টানতে হলেও নির্মাল্য দুই বোনকে উচ্চমাধ্যমিকের পর গ্রাজুয়েশন এবং এম একমপ্লিট করতে শুধু আর্থিক নয় সর্বাঙ্গীনভাবে সাহায্য করে উপযুক্ত সময়ে ভাল স্বচ্ছল পরিবারে পণ দিয়ে তাদের পাত্রস্থও করেছে।এর জন্য চক্রবৃদ্ধি হারে সুদের ধারদেনার বোঝা সিন্ধবাদের মতো তার কাঁধে চেপে রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে । সে নিজেও জানেনা এই ঋণ থেকে কবে পরিত্রাণ পাবে । কিংবা কোনদিন আদৌ পাবে কিনা ।একসময় আর দশটা মানুষের মত বয়সকালে তারও শরীর মন কোন নারীসংগ লাভে সংসারের সুখস্বপ্ন দেখত ।সেই স্বপ্নে সংসারের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হয়ে বিরাজ করত তার স্বপ্ন-মানসী।নিরালা কল্পনায় আশা ছিল স্বামী স্ত্রীর যৌথ প্রেম ভালবাসা রমণে তাদেরঘরের কোণটি হয়ে উঠবে সুখী গৃহকোণ ।কিন্তু দুঃখের কথাসংসারের যাতাকলে পিষে যাওয়া মানুষটির জীবনেস্বাদ-আহ্লাদ বলে যে কিছু থাকতে পারে তার  স্বজনরা যেমন কোনদিন সেই বিষয়ে ভেবে দেখবার ফুরসৎ পায়নি তেমনি সংসারের দায়িত্বের বাইরে কল্পনা ভেঙ্গে নিজেরশখ ,ইচ্ছানিয়ে দৃঢপদক্ষেপউঠাবারসাহসসেনিজেওযুগিয়েউঠতেপারেনি।যেন নিজেকে আত্মহুতি দেবার জন্যইতার এই পৃথিবীতে আসা । এহেন নির্মাল্যর জীবনে অসময়ে হঠাত রত্নার আগমনে তার নিরস শুষ্ক জীবন পল্লবিত হয়ে নতুন সবুজ পাতার বাহারে ভরে উঠল ।

                    রত্না বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান ।তার পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থাও আহা মরি বলার মত কিছু নয়।প্রায় বাইশবছর তার মা একপ্রকার বিছানায় শয্যাশায়ী । এক বৃষ্টির দিনে ছাদ থেকে নামবার সময়  অসাবধানবশতঃসে পা পিছলে সিঁড়ি গড়িয়ে নীচে পড়ে যায় ।ফলে মাথায় গুরুতর আঘাতে ব্রেনের একাংশ শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হয়্না রক্তক্ষরণের কারণে ভিতরে রক্ত জমাট বাঁধে ।ব্রেন অপারেশনও মানুষটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারেনা । সেই থেকে রত্নার মায়ের জড়ভরত অবস্থায় ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো দিন মাস পেরিয়ে বছরগুলো এক এক করে কেটে যাচ্ছে । তার বাবা মিঞা বাগান বস্তিতে ছোটখাটো এক মুদির দোকানের মালিক ।নিরীহ শান্ত মানুষটি বস্তির লোকজনের কাছে প্রিয় শঙ্কর ভাইয়া নামে । এই প্রিয় ভাইয়ার দোকান থেকে বস্তিবাসীরা যত না নগদ দিয়ে জিনিসপত্র কেনে তার থেকে ধারেই তাদের কাজকারবার চলে বেশী ।ফলে আস্ত একটা দোকানের মালিক হয়েও দিন আনি দিন খাই অবস্থায় তার দিনযাপন । স্ত্রীর আকস্মিকএই ঘটনায়চব্বিশঘন্টা সেই রুগীর পরিচর্যা, মাস গেলে তার ওষুধের খরচা উপরন্তু সংসারের উনকোটি ঝামেলায় রত্নার বাবা দিশাহারা হয়ে যায় । রত্নার তখন দুই বিনুনী ঝুলিয়ে পাড়ার মহামায়া বিদ্যায়াতনে ক্লাসইলেভেনে যাতায়াত ।সংসারের গনগণে আঁচ তাকেও স্পর্শ করে। পারিবারিক কারণে অনিচ্ছাস্বত্তে পড়াশুনায় জলাঞ্জলি দিয়ে অসময়ে গৃহকর্তীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয় সেই কিশোরীকে ।সেইরত্নার বয়সএখন পাথর ডিঙ্গোতে ডিঙ্গোতে মরা নদীতে অনেকদূর চলে এসেছে। চোখের নীচে তার ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। মুখের চামড়ায় লাবণ্যহীন শুষ্কতা। একসময় বয়সকালে যে অযত্নের চেহারায়ও তারউন্নত দুইস্ফীত বক্ষ,তরুলতা শরীর পুরুষ হৃদয়ে হিন্দোল তুলতো, যে বসন্ত বাতাসে তার উচাটন মনে জলতরঙ্গের ঢেউ খেলে যেত,তা এখন স্থির । নদীর প্রতিটি বাঁকে গ্রাস করেছে হিমশীতলতা। এখন যেন সে ক্ষীণ ধারার এক শুষ্ক নদী। তবুও অসতর্ক মুহূর্তে ক্লান্ত মন কোন কোনসময়ে বিদ্রোহী হয়ে একান্ত সঙ্গী খোঁজে, চায় বলিষ্ঠ কাঁধে আত্মসমর্পন। তার জন্মদাতা, আত্মীয় পরিজন কোন মানুষেরই তার কথা ভাববার অবসর হয়নি। আর মা? সে তো থেকেও তার নেই। গতানুগতিক একঘেয়েমির জীবনে নির্মাল্য এখন তার ডানা মেলার একটুকরো উন্মুক্ত আকাশ।

পারিবারিক দায়িত্ব, অপরিসীম ক্লান্তির মাঝে নির্মাল্য ও রত্না একে অপরের পরিপূরক হয়ে আবার নতুন করে জীবনের রঙ রূপ আবিষ্কার করতে থাকে। দুজনের পক্ষেই ঘনঘন দেখা সাক্ষাৎ সম্ভব নয় ফলে ফোনেই তাদের কথা হয় বেশী। মাসে একবার কি দুবার ক্ষাণিকটা সময় চুরি করে সাধারণ মানের কোন রেস্টুরেন্টে চা,সিঙ্গারা খেয়ে নিজেদের মত কিছুটা সময় কাটায় তারা। খাওয়ার অছিলায় লোকচক্ষু বাঁচিয়ে কখনও দু জোড়া হাতের তালু একে অপরের নিবিড় বন্ধনে নিজেদের ভালবাসা ব্যক্ত করে, কখন একে অপরের পায়ের আঙ্গুলের স্পর্শের খেলায় শরীরের উষ্ণতা মেপে নেয়। দুজনারই ভীষণ ইচ্ছা করে অল্পবয়সীদের মত আরো অনেক কিছু… কিন্তু বয়স, পারিবারিক পরিস্থিতি তাদের মাঝখানে পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মুখে না প্রকাশ করলেও তারা নিজেরাও সন্দিহান কোনদিন এই পাহাড় পেরিয়ে তাদের সম্পর্ক কি উভয়কে কোন আইনত পরিচিতি এনে দিতে পারবে?

নির্মাল্য একদিন সব বাঁধা ভেঙে রত্নাকে বলে – একবেলার জন্য কি আমরা কোথাও ঘুরতে যেতে পারিনা ?সকালে গিয়ে বিকেলেই ফিরে আসব । একদিন সব ভুলে শুধু নিজেদেরকে নিয়ে কিছুটা সময় নিজেদের মত কাটাব ।কোন ক্ষতি তো এতে নেই ।রত্না বিহ্বল, বিভোর।এই বয়সে এমন ভাবে ভালবেসে কেউ তাকে আহ্বান জানাবে এ তার কল্পনাতীত ।কিন্তু বাস্তব তার মনের দরজায় আগল দিতে চায়। নিজের মায়ের সারাদিনের তত্বাবধান সাথে বয়স জনিত সংকোচে সে রাজি হয়না। অনেক কথার আদান প্রদান,মান অভিমান, দ্বিধা সংকোচ কাটিয়ে অবশেষে মনের সব  জড়তা সরিয়ে রত্না রাজি হয়। প্রতিবেশী বেলা মাসীকে মার ওষুধপত্র বুঝিয়ে বাইশ বছর পর নির্দিষ্ট দিনে নিজের জন্য একবেলার ছুটি নেয় রত্না।

নির্মাল্য অনেক ভেবে চিন্তে ডায়মন্ডহারবারে যাওয়া মনঃস্থ করে। সেইখানকার একটি সাধারণ মানের হোটেলে নির্দিষ্ট দিনের জন্য একটি রুম বুক করে। দুটি ভিন্ন মানুষের অভিন্ন গোপন মনবাসনা…ট্রেনে একসাথে দুজনে বেশ কিছুটা রাস্তা পাড়ি দেওয়া, সাগরের জলে পা ভিজিয়ে পাশাপাশি দুজনে বালুকার তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া মনের ইচ্ছেগুলো এক এক করে মেলেধরা। মাঝে ক্লান্ত হয়ে পড়লে হোটেলে ঢুকে হাত মুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম নিয়েআবার বিকেলে ঠিক সময়ে ট্রেন ধরে যে যার বাড়ির চক্রবুহ্যে ঢুকে পড়া…এইটুকুই তাদের ইচ্ছে ,এইটুকুই তাদের চাওয়া। 

সময় মতো রত্না ও নির্মাল্য পৌঁছে যায় হাওড়া স্টেশনে। দুজনের মুখেই চাপা উত্তেজনা। কে কার কাছে কী লুকোবে। আজ যেন তারা অল্প বয়সী হংসযুগল। নির্মাল্যর ইচ্ছায় রত্না পরেছে তার হাল্কা সবুজরঙের তাঁতের শাড়িটি। চোখে হাল্কা কাজল, দুই ভুরুর মাঝখানে জলজল করছে মেরুন রঙের টিপ। ঠোঁটে নরম লাল রঙের ছোঁয়া। পিঠ বেয়ে নিতম্ব ছুঁয়েছে লম্বা বিনুনি। ঘাড়ের কাছে তাতে শোভা পাচ্ছে লাল টকটকে কাঞ্চন ফুলের থোকা। নির্মাল্য মোহিত হয়, বলে–বাঃ, তোমায় দেখতে ভারী মিষ্টি লাগছে। দেড় বছরে এমনভাবে কখন সাজতে দেখিনি–বলে অপলক দৃষ্টিতে সে মুগ্ধ হয়ে রত্নার দিকে তাকিয়ে থাকে। নির্মাল্যর সেই সর্বনাশা চুম্বক দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকতে পারেনা রত্না। তার গালে লাগে ডালিমের লাল রঙ। যাঃ কি যে বলো–লজ্জায় নির্মাল্যর বশীকরণ দৃষ্টি থেকে নিজের চোখ সরিয়ে নেয় সে। ট্রেনের ফাঁকা কামরায় পাশাপাশি বসতে যায় রত্না। নির্মাল্য মাথা নেড়ে উল্টো দিকের সিটে তাকে বসতে ইশারা করে। রত্না অবাক চোখে তাকালে নির্মাল্য মুচকি হেসে বলে-পাশাপাশি বসলে আমার মহারানী কে দেখব কি করে? রত্নার মুখমন্ডলে রক্তিম আভায় ছড়িয়ে পড়ে হোলির রঙ। কপট ভর্তসনায় নির্মাল্যকে বলে-কি ছেলেমানুষি করছ। চারিদিকে লোকজন শুনলে কি ভাববে বলতো। ট্রেন ছুটে চলে তার গন্তব্যে। দুটি মানুষের হৃদয় আজ নদীর মতো বাধা বন্ধনহীন।রত্না আজ যেন চঞ্চল ঝর্ণা। ষ্টেশনে ট্রেন থামলে কখন চা কখন চিনাবাদাম কখন ঝালমুড়ির আবদার জানায় তার কাঙ্খিত মানুষটির কাছে। সেও রত্নার সব ইচ্ছা পূরণ করতে আজ আলাদীনের চিরাগ। গন্তব্যে পৌঁছে আরব সাগরের দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশির সামনে রত্না নিজেকে আর লুকিয়ে রাখতে পারেনা। আবেগ তাড়িত হয়ে বহুবছর বাদে আবার নিজেকে উজাড় করে সে গান গেয়ে ওঠে। একসময় স্কুলে আবৃত্তিকার হিসাবে সুনাম ছিল নির্মাল্যর। কতযুগ পরে পুরুষালি জলদগম্ভীর স্বরে সে উচ্চকন্ঠে রত্নার সাথে তাল মিলিয়ে আবৃত্তি করে চলে। নগ্ন পায়ে একহাতে পায়ের চটি অন্য হাতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বালুতট ধরে এগিয়ে যেতে থাকে তারা। দুটি মানুষের অনাবিল এই আনন্দে সামিল হয়ে উদ্ধত ঢেউ নতমস্তকে উচ্ছল ফেনিল সাদা লোনা জলরাশি নিয়ে আছড়ে পড়তে থাকে  তাদের পায়ে। ভিজিয়ে যেতে থাকে রত্না নির্মাল্যর পায়ের পাতা,শাড়ি,প্যান্ট। অনভ্যাসের দৌঁড়ঝাপ দূরন্তপনায় একসময় তাদের শরীর ক্লান্ত হয়ে একটু বিশ্রাম নিতে চায়। শ্লথ পায়ে দুজনে সমুদ্র তীরবর্তী তাদের পূর্ব নির্ধারিত হোটেলের দিকে রওনা হয়। একটা ঘরে শুধু দু’জন, রত্নার অজানা ভয়ে, ভাল লাগায় বুক দুরুদুরু। নির্মাল্য প্রাথমিক সাহস দেখালেও এখন কিঞ্চিৎ নার্ভাস।হোটেলের অফিসিয়াল ফর্মালিটির পর অল্প বয়সী একটি ছেলে তাদের তিনতলায় নিয়ে এসে কামরার দরজা খুলে দিলে কোথা থেকে এক পাগল হাওয়া নির্মাল্যর চুল ওলোট পালট করে রত্নার আঁচল উড়িয়ে নিয়ে যাবার উপক্রম করে। নির্মাল্য নিজের চুল ও রত্না নিজের আঁচল সামলাতে সামলাতে দেখে সমুদ্র মুখী ঘরের খোলা জানালা দিয়ে বাতাস বয়ে এসে সব লন্ডভন্ড করে দিতে চাইছে ।

হোটেলের ছেলেটি বলে– অফ সিজিন তাই এই ঘরটা পেলেন। সিজিনে এটার দ্বিগুন ভাড়া হয়। জানালাটা কি বন্ধ করে দেব?

রত্না সাথে সাথে চেঁচিয়ে উঠে- না না বন্ধ করার দরকার নেই। হাওয়া আসছে আসুক না। কেমন ঘর থেকে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। এইবার নির্মাল্য ও সে ভাল করে ঘরটির দিকে তাকায়। আয়তনে বেশ ছোট। দেওয়ালের একদিকে একটি খাট পাতা। দুটি মাথার বালিশ ও তষোকে হালকা নীল রঙের পিলো কভার ও পরিষ্কার চাদর বিছান। বিছানার পাশে রয়েছে প্লাস্টিকের একটি টেবিল ও একটি চেয়ার। টেবিলের উপর জগে রাখা আছে খাবার জল।

আপনাদের এখন কিছু লাগবে? ছেলেটি অন্য কিছুর ইঙ্গিত করে। নির্মাল্য বুঝে নিয়ে বলে উঠে–না ভাই। ওসব কিছুর দরকার নেই। একটু বিশ্রাম নিয়ে খাবার খেয়ে নেব।

ঠিক আছে, ভাত,ডাল,মাছ সব পেয়ে যাবেন। ঐ যে বেলটা আছে ওটা টিপলেই আমি এসে যাব। ছেলেটি দরজা টেনে দিয়ে চলে যায়।

ধীরে ধীরে রত্না জানালার ধারে এসে দাঁড়ায়। প্রায় ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে বালিয়াড়ি। আর কিছুটা গড়িয়ে সমুদ্র। মধ্য দুপুরে সে এখন তীর ছাড়িয়ে অল্প দূরে চলে গেলেও ভেসে আসছে তার গর্জন। মাঝে মধ্যে এক দুজন নুলিয়া ছাড়া সমুদ্র সৈকত এখন বেশ নিরিবিলি। আহা সারাজীবন যদি এমন ভাবেই কেটে যেত। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে রত্নার। ঘাড়ের কাছে নির্মাল্যর শ্বাস, তাড়া দেয়– কি হল। স্ট্যাচু হয়ে গেলে যে। তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে নাও। এরপর খাবারের অর্ডার দেব।

*******

বল্গাবিহীন দুটি প্রাণীর গল্পগুজবে সময় বয়ে চলে। কথা তাদের শেষ হয়না। এতকাল যে আকাশ কুসুম স্বপ্ন তারা নিজেদের বুকে্র ভিতর সঙ্গোপনে আড়াল করে রেখেছিল আজ তা আলোকিত হয়ে একসময় ধীরে ধীরে শারীরিক খেলায় নিমগ্ন হতে থাকল। নির্মাল্যর হাতের ছোঁয়ায় বিনুনি খুলে বালিশে এলিয়ে পড়লো রত্নার একঢাল কালো চুল। খুলে যেতে লাগল তার শরীরে জড়িয়ে থাকা সূতোর এক এক প্রস্তর। দুটি সভ্য মানুষ আদিম চেহারায় নিজেদের কাছে আত্মসমর্পণ করল। দুজনার মূর্ছনায় হাল্কা নীল রঙের চাদরের বিছানার শান্ত সমুদ্রে তখন উঠেছে তুফান। যেন খোলা জানালা দিয়ে রত্নার শরীরে ধেয়ে এসেছে গভীর গর্জনে সমুদ্র।নির্মাল্য সেই উদ্দাম ঢেউএ এক দুর্নিবার সাঁতারু। গভীর সমুদ্রে ডুব দেবার প্রাক্বালে তার মনে পড়ে যায় ‘ছোট পিসি গত মাসে নাতি নাতনি সহ সপরিবার তাদের বাড়ি ঘুরতে এসেছিল। অতিথিদের আদর আপ্যায়নের খরচায় সেই মাসে সুদের টাকা দিয়ে উঠতে পারেনি সে। এখন দুই মাসের সুদ জমে গেছে। এমাসেও ঘুরতে আসার দরুন কিছুটা টাকা খরচা হয়ে গেল। মাসের বাকী দিনগুলো কোনরকমে কাটাতে হবে। এই অবস্থায় ঝুনঝুনওয়ালাজী টাকাটা নিতে আজ আবার রাতে বাড়ি এসে না হাজির হয়। আর রত্নার হঠাৎ মনে পড়ে যায় আজকের দিনটি একে অপরের সান্নিধ্য উপভোগ করবার উত্তেজনায় সে একটি মারাত্মক ভুল করে এসেছে-‘ ইশ, আসবার আগে বেলা মাসীর হাতে মার ইমার্জেন্সী ওষুধটি দিয়ে আসা হয়নি। বাবার নিজের দরকারে মহাজনের বাড়ি যাওয়ার কথা। পাশের বাড়ির বাবলু, টুকু, কাকু সব তো এখন অফিসে। কাকীমা বা বেলা মাসিকে ও ফোন করে লাভ নেই কারণ তাদের পক্ষে ইংরাজী তে ওষুধের নাম পড়া সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে মার যদি আজই সেই প্রবলেম দেখা দেয়’…আর ভাবতে পারছে না রত্না। সমুদ্রে জোয়ারের জলচ্ছাসের আভাসের দুটি শরীরের জলস্ফীতি হঠাৎ করে ভাটার টানে শান্ত হয়ে নীলাভ চাদরের বিছানায় দুদিকে ছিটকে যায়।

নিস্তব্ধ গাঢ় দীর্ঘশ্বাসে সময় এগিয়ে চলে…   

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত