| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য নাটক: মহাভার । তৃষ্ণা বসাক

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট


 
(ব্যাকগ্রাউন্ডে ভেসে আসে)
নীলা -রনো রনো, অত দূরে যেও না।
রনো-মা আর একটু প্লিজ
নীলা-না রনো , না সোনা অত দূরে নয়, চলে এস
রনো-কত বড় ঢেউ মা, প্লিজ আর একটু
নীলা-না, না,না
(আস্তে আস্তে ‘না’ দূরে সরে যায়)
                     
অমিতেশ- বেশ লাগছে না বিকেলটা? কী শান্ত সমুদ্র দেখো নীলা। ওই ছেলেমেয়েগুলো এইমাত্র এল কলকাতা থেকে। আর এসেই স্নান করতে নেমে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে, স্নান নয়, স্নানের সঙ্গই ওদের ভেজাচ্ছে বেশি। বাড়িতে তো সবাই একা একা স্নান সারে নিজস্ব স্নান ঘরে।
কী হল? কথা বলছ না কেন? ভালো লাগছে না তোমার? এই তো বলছিলে হাঁপিয়ে উঠেছ চার দেওয়ালের মধ্যে।
নীলা- ভাল লাগবে না কেন? ভালো লাগছে তো।
অমিতেশ- কেমন ভালো?
নীলা- দূরে এলে যতটা ভালো লাগে। কিন্তু একটা কথা মনে হয় আজকাল
অমিতেশ- কী?
নীলা- আমরা যথেষ্ট দূরে যাই না কখনো , ওরা যতটা গেছে, রনোরা, ততদূরে কেন যেতে পারি না আমরা?
অমিতেশ- (দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) বয়স হয়েছে তো, খুব দূরে কি যেতে পারা যায়?
নীলা- যখন তত বয়স হয়নি, তখনো কই যেতে পারলাম দূরে, খুব দূরে? তোমার বড় চাকরি, আমার ছোট সংসার। রনোর স্কুল, সাঁতার, আঁকা, অ্যাবাকাস। এসব করে তখনো দূরে কোথাও যাওয়া হয়নি আমাদের।  এখানেই আসা হয়েছিল মনে আছে?
অমিতেশ- মনে আছে। অনেক কষ্টে সেবার দিন দুয়েকের ছুটি ম্যানেজ করেছিলাম। তুমি তো জানই আমার চাকরির চাপ কেমন ছিল। আবার সেইসময় সামনে একটা প্রোমোশন ঝুলছিল। সোমবার আমাকে অফিস জয়েন করতেই হত। এর বেশি দূরে গেলে রবিবার সন্ধের মধ্যে ফেরা যেত না।
নীলা- এখন , কি আশ্চর্য দেখো, ফিরে যাওয়াটা জরুরি নয় তত। আসার ওপরই যত জোর। দিন যত এগিয়ে আসে, উত্তেজনা তত ঘন হয়। দরজার চৌকাঠ পেরোলেই যেন ওদের মুখগুলোকেও পেরিয়ে যাওয়া যাবে।
অমিতেশ- তাই তো দেখি, একই ব্যাগ দশবার গুছোও তুমি।
নীলা- যা বলেছ। জামাকাপড় অত লাগে না আর জানো। ওষুধ আর টুকিটাকি বেশি। হট প্যাড, নি-ক্যাপ, ক্রেপ  ব্যান্ডেজ, ইনহেলার। ফেরার সময় কিন্তু এগুলো গুছিয়ে নেবার তেমন তাগিদ নেই।
অমিতেশ- হ্যাঁ, সবই তো দোকানে পাওয়া যায়।
নীলা- আরও সুবিধে আছে জানো কিছু ফেলে যাবার। কী কী ফেলে আসা হয়েছে, তার তালিকা করতে অনেকটা সময় লাগে, কিনতে গিয়ে আরও খানিকটা সময়। ততক্ষণে বাইরেটাকে আরেকটু আটকে রাখা গেল ঘরে।
অমিতেশ- তাই বুঝি প্রতিবার এত কিছু ফেলে যাও হোটেলের ঘরে?
নীলা-আসলে হোটেলের ঘরে জিনিস ফেলে যেতে ভালো লাগে আমার। দামী কিছু না, টুকিটাকি সব জিনিস। বেড়াতে গিয়ে এসব মানুষের কত কাজে লাগে বলোতো? একপাতা টিপ, ক্লিপ, অ্যান্টাসিড কিংবা সেফটিপিন। দেখবে মেয়েরা এসব নিয়ে যেতে ভুলে যায়। আমি তো খুব ভুলে যেতাম। আবার কত কী পেয়েও যেতাম ড্রয়ারে , আলমারির তাকে। তবে যা ফেলে যেতাম তাই তাই নয়। অন্য সব জিনিস। ক্লিপের বদলে ফলস খোঁপা, সেফটিপিনের জায়গায় পেটিকোটের দড়ি।
অমিতেশ- কাল কি পেলে মনে আছে?
নীলা (স্বগত)- কি যে হয়ে যাচ্ছে লোকটা। কাল আলমারিতে ওই গোলাপি প্যাকেটটা হাতে নিয়ে এমনভাবে তাকিয়ে ছিল যেন একটা গোলাপ ফুল ধরে আছে। কোন ইয়াং কাপল ফেলে গেছে নির্ঘাত।
অমিতেশ- ওটা আমরা কোনদিন ব্যবহার করিনি, তাই না?
নীলা(রাগত স্বরে)- না
অমিতেশ- তুমি শুনেছ নামটা?
নীলা(রাগত স্বরে)-বিজ্ঞাপনে তো দেখায়
অমিতেশ- বিজ্ঞাপনে তো কত কিছু দেখায়। দাদু নাতি বল খেলছে, বৌমা শাশুড়ির হাঁটু মালিশ করে দিচ্ছে। ভালো কথা, তোমার হাঁটু ভালো আছে তো?
নীলা- উঃ হাঁটু আর হাঁটু। হাঁটু ভালো থাকলেই যেন সব ঠিক আছে। আমি তো শুধু একটা হাঁটু নই, যে একটা মেটাল প্লেট বসালেই সব সচল হয়ে যাবে। এইখানে , এই বুকের তলায়, ৩৮ বছর আগের সেই নড়াচড়া….
অমিতেশ- ঝালমুড়ি খাবে?
নীলা- নাহ, যা হাওয়া, মুড়ি খালি ছড়িয়ে যায়। যত সন্ধে হচ্ছে, তত হাওয়া বাড়ছে।
অমিতেশ- দেখো দেখো কীরকম চাঁদ উঠেছে। বাচ্চাদের ড্রয়িং খাতার মতো
নীলা- রনো আঁকত এরকম। হয়তো ওদের ছেলে ঋষিও এরকম আঁকে। চলো উঠি। পা ব্যথা করছে, চাঁদের টানেই হয়তো।
অমিতেশ- এখনি? সবে তো সন্ধে হল।
নীলা- আমার কষ্ট হচ্ছে।
অমিতেশ- জ্যোৎস্না আর একটু ঘন হোক না। মানে সি বিচে ফুল মুন সচরাচর দেখা হবে কি আর?
নীলা- আদিখ্যেতা। ফুল মুন! দেখ তুমি বসে বসে। আমি হাঁটছি। বালির ওপর হাঁটাও যায় না দূরছাই! উঃ!
নীলকণ্ঠ- খুব লাগল মা?
অমিতেশ- ওঃ বারণ করলে শুনবে না। হড়বড় করে হাঁটার রোগ আর গেল না। নাও হাত ধরো।
নীলকণ্ঠ- বাবুরা এখানে কবে এসেছেন? সব দেখা হয়ে গেছে?
অমিতেশ (একটু ভয় পাওয়া গলায়)- তুমি, তুমি কে? বালি ফুঁড়ে বেরোলে নাকি?
নীলকণ্ঠ- ভয় পাবেন না, আমি নীলকণ্ঠ বাবু। ভ্যান চালাই। বলছিলাম আপনাদের কি সব দেখা হয়ে গেছে?
অমিতেশ-কি আর দেখব? আগেও তো এসেছি। এ বয়সে দেখার বাকি থাকে কিছু?
নীলকণ্ঠ- হেনরি আইল্যান্ডে যাবেন? নতুন হয়েছে। কিরণ সি-বিচ, ম্যানগ্রোভ প্রোজেক্ট। ভ্যানে করে সব ঘুরিয়ে আনব, ফেরার পথে ফ্রেজারগঞ্জ।
 
অমিতেশ- নাও গাড়িতে উঠে বোস। কষ্ট হচ্ছে তোমার । (নীলকণ্ঠকে) আচ্ছা, গাড়িতে যাওয়া যাবে তোমার ওই হেনরি দ্বীপে?
নীলকণ্ঠ- কেন যাওয়া যাবে না? অনেক আরামেই যাওয়া যাবে। ভ্যানে পা ঝুলিয়ে বসতে মার নিশ্চয়ই কষ্ট হবে। তার ওপর মাথায় রোদ উঠে যাবে। যত ভোরেই বেরোন না কেন, রোদ লাগবেই।
অমিতেশ- কত ভাড়া তোমার ভ্যানের?
নীলকণ্ঠ- তিনশ টাকা বাবু
অমিতেশ- কখন বেরোতে হবে?
নীলকণ্ঠ- যত ভোরে বেরতে পারবেন। ধরুন যদি ছটায় আসি
অমিতেশ- কোথায় আসবে জেনে নাও আগে।
অপু- না, না, গাড়ি ছেড়ে ভ্যান চড়ে কেউ?
নীলকণ্ঠ- ওই তো বাবু হোটেল বে-ভিউ, কুমুদরানী লজের উল্টোদিকে। চমকে গেলেন মা? আসলে এত বড় গাড়ি নিয়ে আপনাদের মতো একা একা কেউ আসেনি এবার। কাল থেকে দেখছি তো গাড়িটা হোটেলের সামনে।
নীলা- উঠে এসো। দেখো তো অপুও বলছে সাহেবের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? এত দামী গাড়ি নিয়ে এসে ওর লজঝড়ে ভ্যানে করে ঘুরবেন?
অমিতেশ- আরে দাঁড়াও না। আচ্ছা ঠিক ছটা তাহলে, কি যেন নাম বললে, নীলকণ্ঠ। অপু একটু দাঁড়াও, সামনের ট্যুরিস্ট লজটা দেখে যাই।
নীলা- উঃ, দিনদিন তোমার সাহেব অসহ্য হয়ে যাচ্ছে, বুঝলে অপু। একটা হোটেলে উঠবে আর পাঁচটা ঘুরে ঘুরে দেখবে। কমোড আছে কিনা, খাবার কেমন, বারান্দা থেকে সমুদ্র দেখা যায়?
অপু – যা বলেছেন মেমসাহেব
নীলা- যেন এগুলো সত্যিই খুব জরুরি ব্যাপার। আগে দুদিন থাকা হত, এখন না হয় কিছু বেশি। হয়তো অনেক ঘন ঘন। তবু তো শেষ অব্দি এটা বেড়াতে আসা, বলো? যার শেষে ঠিক ফিরে যাওয়া জড়িয়ে থাকে।
অপু- সে তো সত্যি কথা মেমসাহেব
নীলা- আসার আগে আমি একটু বেশিই উত্তেজিত থাকি, গোছগাছ নিয়ে মাতামাতি করি। কিন্তু জানো অপু, পৌঁছে যাবার পর সব থিতিয়ে যায়। সব একরকম। সেই ডাবল বেড, কমোড, এসি। সেই ঝিনুক, রোদ চশমা, ঠিকানা বিনিময়। ওঃ দেখছ কিসব বকছি। দেখো দেখো ওই লোকটা তোমার সাহেবের পেছন পেছন চলেছে।
অপু- টাকা খেঁচার তাল। সাহেব তো কথা শোনেন না।
নীলা- খুব বড় না হোটেলটা?
অপু- সরকারি তো। ওদের বাউন্ডারিটাই কত বড়!
নীলা বাচ্চাদের কলকলানি শুনতে পাচ্ছ অপু?
অপু- হ্যাঁ মেমসাহেব। ভেতরে বাচ্চাদের পার্ক আছে বড়। ঢেঁকি, দোলনা। শুনছেন না বাচ্চাগুলো চেঁচিয়ে মাকে বলছে- আরও জোরে, আরও জোরে ঠেলো।
 
নীলা- আমি কি খুব জোরে ঠেলেছিলাম অপু? নইলে ওরা আর ফিরে এল না কেন ?
অপু-  ওসব ভাববেন না মেমসাহেব। এইকদিন একটু আনন্দ করুন। ওই যে সাহেব ফিরে আসছেন।
অমিতেশ (দূর থেকে)- কাল তাহলে ঠিক ছটা নীলকণ্ঠ, মনে থাকবে তো?
নীলকণ্ঠ- আলো ফোটার আগেই এসে বসে থাকব বাবু, আপনারা বেশি দেরি করবেন না।
 

 
নীলকণ্ঠ- ওই যে দেখে আসুন বাবু
অমিতেশ- কী?
নীলা- পা মুড়ে বসতে পারি না, আবার ঝুলিয়ে রাখলে ফুলে যাবে, উঃ কি যে জ্বালা। কই কী আছে এখানে? একটা মজা ডোবা, খানকতক গাছ।
নীলকণ্ঠ-আছে মা, খুব আশ্চর্জ জিনিস আছে, ওই দেখুন ১৬ মাথাওলা খেজুর গাছ, ওই যে।
নীলা- না বাব, এই দেখার জন্যে নামব না। ও তোমার বাবু গেছে যাক।
নীলকণ্ঠ- আপনারা কলকাতা থেকে এসেছেন মা, কত কি জানেন, কত কি দেখেছেন, এত সামান্য একটা খেজুর গাছ। তবে কি জানেন মা, এগিয়ে দেখলে কত আশ্চর্জ জিনিস চোখে পড়ে সংসারে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর অর্জুন ভাবলেন এত পাপ জমেছে, যাই গঙ্গাস্নান করে আসি। তো যেয়ে বললেন কৃষ্ণকে ‘ সখা, অনেক তো পাপ করলাম, ভাবছি গঙ্গাস্নান করে আসি’
কৃষ্ণ মুচকি হেসে বললেন ‘ যাও দেখো যদি তোমার জ্বালা জুড়োয়,’ তো অর্জুন বেরিয়ে পড়লেন।
অমিতেশ- দেখাবার আর জিনিস পেলে না। চলো চলো।
নীলকণ্ঠ- পথে বেরিয়ে অর্জুন প্রথমে দেখলেন একটা মড়া পড়ে আছে। একটা শেয়াল মড়াটার সারা গা শুঁকে দেখল, তারপর মুখে পেচ্ছাপ করে চলে গেল।
অমিতেশ-  ওসব বাজে কথা রাখো। হেনরি আইল্যান্ডে পৌঁছতে কতক্ষণ লাগবে তাই বলো।
নীলকণ্ঠ- এই তো বাবু এসে গেছি প্রায়। তারপর শুনুন মা, অর্জুন তো দেখে শুনে আশ্চর্জ হয়ে গেছেন। মড়া পেয়ে শেয়াল ছেড়ে দিল? এমন কাণ্ডও ঘটে! তিনি ছুটে গিয়ে শেয়ালটাকে জিজ্ঞেস করলেন – তুমি মড়াটাকে খেলে না কেন? শেয়াল হেসে বলল ‘দূর দূর ওটাকে কি খাব? ওর চোখ শুঁকলাম। দেখলাম হরিনাম শুনে কোনদিন ও চোখে প্রেমবারি নামেনি। কপাল শুঁকলাম, দেখলাম ওই কপাল কোনদিন কোন কৃষ্ণমন্দিরের চৌকাঠে মাথা ঠেকায়নি। পা দুটো খাব ভাবলাম, শুঁকে দেখলাম-
নীলা- উঃ হাঁটুটা বড্ড জ্বালাচ্ছে!
অমিতেশ- বকবক না করে জোরে চালাও, রোদ চড়ছে
নীলকণ্ঠ- জোরে চালাবার উপায় নেই বাবু। দেখছেন না সামনে পেছনে সারি দিয়ে ভ্যান। সবাই তো যাবে। এখানে আমরা কেউ কাউকে ওভারটেক করি না।
অমিতেশ- ওভারটেক করি না! হুঁ ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির সব। কলকাতার রাস্তায় ছেড়ে দিলে যুধিষ্ঠিরগিরি বেরিয়ে যেত।
নীলকণ্ঠ- ভালো মনে করিয়েছেন বাবু। যুধিষ্ঠির। আচ্ছা বলুন তো, এই গল্পটা কেন যুধিষ্ঠিরের বয়ানে বাঁধা হল না? তিনি তো ধর্মপুত্র। জল খেতে গিয়ে বকের কাছে কত ধর্মকথা শুনেছিলেন।
নীলা ( উত্তেজিত গলায়)- সত্যিই তো? কেন?
নীলকণ্ঠ- তা তো জানি না মা। শুধু জানি অর্জুন শেয়ালকে ছাড়িয়ে আর একটু এগিয়ে গেলেন।
অমিতেশ- ওঃ সেই ভ্যাজর ভ্যাজর। ওই যে সামনে একটা চায়ের ঝুপড়ি। থামাও থামাও। চা খেতে হবে।
নীলকণ্ঠ- থামাচ্ছি বাবু। নামবেন না মা। আপনার চা এনে দিচ্চি আমি।
নীলা- বাব্বা, দেখো তোমার বাবুর তাড়া দেখো। এত গরম চা নিমেষে শেষ। সারাজীবন এত তাড়াহুড়ো করে কি যে লাভ হল?
অমিতেশ- এই জঘন্য চা পাঁচটাকা করে নিল! ওঃ এখনও শেষ হয়নি তোমার? দেরি হয়ে যাচ্ছে।
নীলা- থামো তো। তোমার মতো গরম চা হুশহুশ করে খেয়ে জিভ পোড়াতে পারব না আমি। হ্যাঁ বল নীলকণ্ঠ, এবার কী দেখলেন অর্জুন?
নীলকণ্ঠ- বলছি মা। এবার অর্জুন দেখলেন একটা ছুঁচ। যার ফুটো দিয়ে বিশাল একটা হাতি গলে যাচ্ছে, কিন্ত একটা ইঁদুর আটকে যাচ্ছে।
নীলা- সে আবার কী! এর মানে কি নীলকণ্ঠ?
নীলকণ্ঠ- মানে বুঝলেন না মা? মানে ঘোর কলিকাল। লোকে নিজের ফূর্তির জন্যে লাখ লাখ টাকা খরচা করবে, কিন্তু গরিবকে দশ টাকা দিতে বুক ফেটে যাবে।
অমিতেশ (খেপে উঠে)- মহাভারতের নামে গুলগল্প মারছ? এসব কোথায় লেখা আছে?
নীলকণ্ঠ (খুব আস্তে আস্তে) – আছে, বাবু আছে। হয়তো কেউ লিখে যায়নি। কিন্তু গোটা দেশ জুড়ে আছে।
অমিতেশ- হুঃ যতসব! ওরে বাবা। কি রাস্তা! এ যে দেখছি মহাপ্রস্থানের পথ! আর লোকে পারেও বটে। যা খেয়েছে, সবকিছুর স্মৃতিচিহ্ন ছড়াতে ছড়াতে গেছে। চিপ্সের প্যাকেট, চকোলেটের রাংতা, কোল্ড ড্রিংক্সের টেট্রা প্যাক, গুটখা। যেন সীতার অলংকার!
নীলা (স্বগত)- সত্যি তো। কেন যুধিষ্ঠির নয়, কেন অর্জুন দেখলেন এসব?
নীলকণ্ঠ-নেমে পড়ুন মা। আস্তে। আস্তে। হেনরি আইল্যান্ড এসে গেছে।
অমিতেশ- কি, উঠতে পারবে তো? না  পারলে তো ভিউ পাবে না।
নীলকণ্ঠ- চিন্তা করবেন না বাবু। আপনি এগোন, আমি মাকে ধরে ধরে ঠিক ওয়াচ টাওয়ারের ওপরে তুলে দেব।
নীলা- দেখো তো আবার কার ঘরে ঢুকে গেল। মানুষটাকে নিয়ে আর পারা যায় না। কি হল? তিনতলায় চলো। ভিউ তো সেখানে। এখানে কেন ঢুকলে? দেখছ তো ভেতরে লোক রয়েছে।
অমিতেশ (ঘরের ভেতরে ঢুকে )-এক্সকিউজ মি, আপনাদের বাথরুমটা একটু দেখতে পারি? কমোড আছে তো?
একটি ছেলে (জড়িত গলায়)- দাদুর কি পটি পেয়ে গেছে? (সমবেত হাসির শব্দ)
নীলা- দেখলে নীলকণ্ঠ, কোন আক্কেল নেই লোকটার? দেখছে ভেতরে ইয়াং ছেলেরা মদের বোতল নিয়ে বসে আছে, সেখানে গিয়ে অপমান না হলে চলছিল না।
নীলকণ্ঠ-বাদ দিন মা। চ্যাংছাবালদের ব্যাপার। এরা বড়দের সম্মান করতে জানে না। এই দেখুন কথা বলতে বলতে তিনতলায় চলে এসেছেন।
নীলা- আহ কি সুন্দর! সবুজের মাঝে মাঝে ওই যে নীল ব্রাশের টান, ওটা নিশ্চয় সমুদ্র।
নীলকণ্ঠ- হ্যাঁ মা।
নীলা- বাবু কোথায় গেল বলো তো?
নীলকণ্ঠ- ওই তো ছবি তুলছে।
নীলা-  তোমার গল্প শেষ হয়ে গেছে? না বাকি আছে?
নীলকণ্ঠ- মা, মহাভারতের গল্প কোনদিন শেষ হয়? তারপর শুনুন কি হল। একজায়গায় হঠাৎ দেখলেন কি আশ্চর্জ, কোথায় পুকুরের চারপাশ আল দিয়ে আটকে রাখা হয়, এখানে আলের চারপাশ পুকুর দিয়ে আটকানো।
নীলা- মানে?
নীলকণ্ঠ- মানেটা বুঝলেন না মা? ঘোর কলিকাল। ছোট এখন বড় হবে, বড়কে নেমে আসতে হবে ছোটর জায়গায়। কেউ কারো সম্মান করবে না। দেখলেন না, নিচের ছেলেগুলো বাবুর সঙ্গে কিরকম ব্যবহার করল?
নীলা-বাবু সেটা বুঝলে তো। দেখো দেখো এখন আবার একটা বাচ্চা মেয়ের ছবি তুলছে। ওর মা আবার কি মনে করবে?
নীলকণ্ঠ- কি ফুটফুটে মেয়েটা মা! কি আবার মনে করবে একটা ছবি তুললে?
নীলা (হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠে) না, না তুমি জান না, এখনকার মায়েরা…
নীলকণ্ঠ- মায়েদের আবার এখন তখন কি? নতুন মায়েরাও তো পুরনো হবে,বুড়ো হবে।
নীলা( ঝাঁঝিয়ে উঠে)- এসব ভালো লাগে না আমার। পরের বাচ্চাকে নিয়ে আদিখ্যেতা। নিজের নাতিকে…
চলো নিচে যাই। উনি যখন খুশি আসবেন। আর দাঁড়াতে পারছি না।
নীলকণ্ঠ- ওই তো বাবুও নেমে এসেছেন।
অমিতেশ- এবার তো কিরণ সি বিচ, পুরোটা নাকি ভ্যান যাবে না। অনেকটা হাঁটা। তুমি পারবে তো?
নীলা – এমন জায়গায় আসো কেন যেখানে দুজনে যাওয়া যায় না?
নীলকণ্ঠ- থাক মা, না-ই গেলেন। ফ্রেজারগঞ্জে পুরো বিচের ওপর ভ্যান নিয়ে যাব।
নীলা- যাও, যাও। আমি এখানে বসে আছি। আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।
নীলকণ্ঠ- এখানে বসুন মা। বাবুকে ছেড়ে চলে আসছি এখুনি। (চলে যায়)
 
নীলা- যাও যাও। কিন্তু, দেখেছ, জলের বোতলটা ভ্যানে রয়ে গেছে। তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে। উঃ। এই যে শুনছ, কিছু মনে কর না মা, তোমার কাছে একটু জল হবে?
বাচ্চার মা- ওমা জল চাইলে আবার কি মনে করব? নিন মাসীমা জল খান
নীলা –আঃ, বাঁচালে।
বাচ্চার মা- আপনারা কোথা থেকে এসেছেন মাসীমা? (নীলকণ্ঠ ফিরে আসে)
নীলা- সল্ট লেক। তোমরা?
বাচ্চার মা- পাটুলি। একা এসেছেন?
নীলা- একা কোথায়? মেসোমশাই আর আমি। বিচে গেলে না?
বাচ্চার মা- যা দুষ্টু মেয়ে, সামলানো মুশকিল। ওর বাবা গেছে।
নীলা-  মেয়েকে কে দেখে? তুমি  নিশ্চয়ই চাকরি করো।
বাচ্চার মা- করতাম। এই মেয়ের জন্যে ছেড়ে দিলাম। সবসময় একে নিয়েই রয়েছি। মনে রাখবে বড় হয়ে, বলুন?
নীলা- উঃ মাগো। আর দাঁড়াতে পারছি না। এই ওয়াচ টাওয়ারের সিঁড়িতেই বসি একটু। একটু যদি কাণ্ডজ্ঞান থাকে, জলের বোতলটা পর্জন্ত নিয়ে গেছে।
নীলকণ্ঠ- ওই যে বাবু এসে গেছেন। উঠুন মা। ফ্রেজারগঞ্জ ঘুরিয়েই হোটেলে পৌঁছে দেব। আপনার কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারছি।
অমিতেশ-এবার রাস্তা দেখছি আরও খারাপ। দাঁড়াও দাঁড়াও, এই চায়ের ঝুপড়িটার সামনে রাখো। বাব্বা, সেবার এসে তবু অনেককিছু দেখেছিলাম, এবার তো প্রায় সবই বালির তলায়। শুধু ওই ভাঙ্গা মন্দিরটা আর তার চাতালে চরে বেড়ানো ছাগলগুলো একইরকম আছে। ওই , ওই যে ফ্রেজার সাহেবের বাংলো। মনে পড়ছে তোমার?
নীলা- পড়ছে। বাংলোটা আরও একটু ডুবে গেছে, তাই না? ভাবতে কেমন লাগে, তাই না? একসময় এই পোড়ো বাড়িটাই গমগম করত, গান ছিল, প্রান ছিল…
অমিতেশ- আমরাও সেবার সবাই এসেছিলাম, মনে আছে তোমার? তখনো বাংলোটা এতটা ডোবেনি। মনে পড়ে?
(ব্যাকগ্রাউন্ডে ভেসে আসে)
নীলা -রনো রনো, অত দূরে যেও না।
রনো-মা আর একটু প্লিজ
নীলা-না রনো , না সোনা অত দূরে নয়, চলে এস
রনো-কত বড় ঢেউ মা, প্লিজ আর একটু
নীলা-না, না,না
 
নীলা- থাক ওসব কথা। তুমি বোস, আমি দেখি ঝিনুক পাই কিনা।
অমিতেশ- কেন কষ্ট করে যাবে আবার? চুপ করে বোস দেখি
নীলা- না, না অনেক বসেছি। আবার হোটেলে গিয়ে তো বসেই থাকব। আর তারপর বাড়ি, আরও আরও বসে থাকা। চলো নীলকণ্ঠ, একটু ঝিনুক কুড়িয়ে আসি।
নীলকণ্ঠ- চলুন মা। কিন্তু এত গরম বালির ওপর দিয়ে আপনি কি হাঁটতে পারবেন? ওকি! অত ঝুঁকছেন কেন? আমি কুড়িয়ে দিচ্ছি।
নীলা (স্বগত)- আমি তো ঝিনুক কুড়োচ্ছি না, নিজেকেই কুড়োনোর চেষ্টা করছি। নীলকণ্ঠ কি করে জানবে গরম বালি কত ভালো?  নিমেষে চোখের জল শুষে নেয়।
নীলকণ্ঠ- এবার শেষ গল্পটা শুনুন মা
নীলা- থাক নীলকণ্ঠ, ভালো লাগছে না।
নীলকণ্ঠ- মা, মহাভারতের কথা অমৃতসমান।  অমৃত পেয়ে ছেড়ে দেবেন?। শুনুন না। অর্জুন তো হেঁটে চলেছেন। হাঁটতে হাঁটতে সামনে দেখলেন একটা কুয়ো। কয়েকজন রমণী কুয়ো থেকে জল ভরছে। মজার কথা কি জানেন, একটা কলসির জল ছটা কলসিকে কানায় কানায় ভরিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু ছটা কলসি মিলেও একটা কলসি ভরতে পারছে না। তাজ্জব ব্যাপার।  
ওকি মা, এর মানে জানতে চাইলেন না তো? অত জোরে হাঁটবেন না, পড়ে যাবেন।
নীলা (দূর থেকে) আর আমার মানে জানার দরকার নেই । তুমি চুপ করো। দোহাই তোমার।
নীলকণ্ঠ (দৌড়ে কাছে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে) মানেটা শুনবেন না মা? এই ঘোর কলিতে একটা  মা তার ছয় সন্তানের প্রতিপালন করতে পারে, কিন্তু ছয় সন্তান মিলেও একটা মার দেখাশোনা করতে পারে না।
নীলা (ডুকরে কেঁদে ঊঠে)- কেন? কেন এমন হয় নীলকণ্ঠ ? আমি কি মহাভার? কেন চার বছরে একবারও ওরা…
নীলকণ্ঠ-কাঁদবেন না মা, কাঁদবেন না।
নীলা- দেখো দেখো তোমার বাবুকে, যেন আরেকটা ভাঙ্গা বাড়ি। সারাজীবন দৌড়ে আর সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে এখন একটা পোড়ো বাড়ির মতো বসে আছে।
(হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠে) নীলকণ্ঠ!
নীলকণ্ঠ- কি মা, কি হয়েছে?
নীলআ- আমি বুঝতে পেরেছি নীলকণ্ঠ।
নীলকণ্ঠ- কি বুঝতে পেরেছেন মা?
নীলা- কেন যুধিষ্ঠির নয়, কেন অর্জুনের বয়ানে এ গল্প। আমাদের মতো অর্জুনও যে পাখির চোখ ছাড়া কিছু দেখতে শেখেনি সারা জীবন। তাই তো তার যাত্রাপথেই ছড়িয়ে থাকে শেয়াল, মড়া, ছুঁচ আর শূন্য কলসির আশ্চর্য কথামালা। অর্জুনের সন্তানের নাম যে অভিমন্যু!

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত