| 23 জুলাই 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য প্রবন্ধ: পুরাণের পক্ষী-মানবেরা ।দেবলীন রায়চৌধুরী

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

 

পাখিদের বুদ্ধি বা ক্ষমতাকে মানুষ কখনোই তুচ্ছ জ্ঞান করেনি। সভ্যতার প্রাক্কাল থেকেই প্রকৃতির কাছে মানুষ মাথা নত করেছে। প্রকৃতির রহস্যকে  অনুসন্ধান করার তীব্র ইচ্ছা ও প্রকৃতির দুর্দমনীয় শক্তির প্রতি সম্ভ্রম অনেক কিছুই সৃষ্টি করার উপাদান হয়ে উঠেছে। প্রাচীন কাল থেকেই পাখিদের উড়ানের ক্ষমতা , একই স্থানে ফিরে আসার ক্ষমতাকে মানুষ কাজে লাগিয়েছে তাদের সুবিধার্থে।  কথা বলার ক্ষমতা।  খাদ্য সংগ্ৰহ করা বা প্রয়োজন মাফিক বাসা নির্মাণের কারিগরি বিদ্যা, পরিযায়ী পাখিদের প্রকৃতির পরিবর্তিত অবস্থার সাথে মানিয়ে নেওয়ার শক্তি , শাবকদের লালন ও স্বনির্ভর করে তোলার ক্ষমতা পাখিদের বিশেষত্ব প্রদান করেছে।  পুরাণ থেকে রূপকথা , লোককথা থেকে বিজ্ঞান, শিল্প কিংবা সাহিত্য সব ক্ষেত্রেই পাখিদের একটা বিশেষ স্থান লক্ষ্য করা যায়। আর তার থেকে অবতরণা হয়েছে যে বিষয়টির তা ভারী আকর্ষণীয় – বিশ্ব পুরাণে এভিয়ন হিউমনোইডস বা পাখি-মানবদের রূপকল্প বা কাল্পনিক কিন্তু লক্ষণীয় অস্তিত্ব।

 

গ্রীক পুরাণ গাথায় পাওয়া যায় এরকম কিছু জীবের কথা। হার্পি (Harpy) নামের এক পক্ষী-মানবীর ব্যাপারে জানা যায় ভার্জিলের ‘এনিড’, এস্কাইলেসের ‘ইউমেনাইডস’ ও হেসিয়ডের লেখা ‘থীওগনি’ বইতে। পাখির মতো শরীর এবং মানুষের মতো মুখ এই জীবকে ভয়াল , ক্ষুধার্ত ও মানুষের অহিতকারী   বলা হয়েছে। প্রাক অলিম্পিয়ান সমুদ্রের দেবতা তাওমাস ও এক সমুদ্রপরী ইলেক্ট্রার সন্তান হলো এই হার্পি। এরা নারী। তীক্ষ্ণ নখরযুক্ত, ডানাওয়ালা, ক্ষুধাজর্জর অদ্ভুত জীব এরা। মূলত প্রবল ঝোড়ো হাওয়ার সাথে এদের সংযোগ। বজ্র-বিদ্যুতের দেবতা জিউসের দূত বলেও এদের পরিচয় দেওয়া হয়। কাহিনীও অনেক এদের নিয়ে। গ্রিক মিথলজিতে আছে সাইরেনদের (Siren) কথা। এদের সুরেলা মিহি গলার মিষ্টি গানে আকৃষ্ট হতেন হতভাগ্য নাবিকের দল। আসলে বালির সমুদ্রের বুকে যেমন মরীচিকার আভাস থাকে, অগাধ জলরাশিও নিজের অন্তরে লুকিয়ে রাখে অযুত রহস্য। সেইসব রহস্যেরই একটা টুকরো হল সাইরেন বা পক্ষীমানবী। প্রাচীন গ্রিসে প্রচলিত একটি কাহিনীতে দেবরাজ (Zeus) জিউস-পত্নী হেরা (Hera) মিউসেসদের (Muses) সাথে সাইরেনদের গানের একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। মিউস অর্থাৎ শিল্পকলার দেবীরাই জয়ী হন। হেরা নাকি সাইরেনদের গায়ের পালক উপরে নিজের মুকুটে লাগিয়ে নিয়েছিলেন শাস্তিস্বরূপ। আর লজ্জায়, যন্ত্রণায় সাইরেনরা ডুব দেয় সমুদ্রে। বেছে নিয়েছিল তারা দিগন্তের ঠিকানায় কোন এক ছোট্ট পাথুরে দ্বীপ। গান গেয়ে আকর্ষণ করত নাবিকদের। সুরের টানে বিপদের সম্মুখীন হত এই নাবিকের দল। মৃত্যু নেমে আসত – এমনই বিশ্বাস। আবার অন্য একটি কাহিনীতে বলা আছে, দিমেতর (Demetor) তার কন্যা প্রসারপাইনকে (Proserpine/Persephone) খেয়াল রাখতে সাইরেনদের নিযুক্ত করেন। কিন্তু প্রাণাধিক প্রিয় মেয়ের হেডেস (Hades) কর্ত্তৃক অপহরণের পর দিমেতর অভিশাপ দেন সাইরেনদের। সেই থেকে তাদের দুর্গতি। আর তারপর অভিশপ্তের অভিশাপ নেমে আসে সমুদ্রযাত্রীদের উপর। হেসিওড (Hesiod) , এপিমেনাইডস (Epimenides) হোমার (Homer) থেকে ইউরিপিডিসের (Euripedes) লেখাতেও পাওয়া যায় এদের কথা। ওডিসির (The Odyssey) নায়ক বীর ইউলিসিস (Ulysses) নাকি সাইরেনদের দ্বীপ পেরিয়ে আসার সময় তার সঙ্গীদের কান মোম দিয়ে বুজিয়ে দেন, আর নিজেকে শক্ত করে বেঁধে রাখেন মাস্তুলের সাথে। যাতে শুনতে পান কিন্তু মোহগ্রস্থ হয়ে সেদিকে চলে না যান। গ্রীকদের প্রাচীন বিশ্বাসে আরও একটি প্রাণীর কথা পাওয়া যায় – আল্কিওনি। অভিদ ও ভার্জিলের লেখাতেও পাওয়া যায় এই পক্ষী-মানবীর কথা।  আল্কিওনি ছিলেন এওলিয়ার রাজকন্যা। ট্র্যাচিসের রাজা সেইকসকে বিয়ে করেন।  দুজনের মধ্যে অটুট ভালোবাসা ছিল।  লোকজন তাদের প্রেমকে উদাহরণ হিসেবে ধরতো।  জিউস ও হেরার চেয়েও এই যুগলের গুণগান করতো। এতে এই দেব-দম্পতি ত্রুদ্ধ হন। এবং শাস্তিস্বরূপ বজ্রের আঘাতে সেইকসকে হত্যা করেন। এ সংবাদ পেয়ে শোকাহত আল্কিওনি উত্তাল সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যু বরণ করে। অন্যান্য দেবতারা এই অসম্পূর্ন প্রেমগাঁথায় ব্যথিত হয়ে এই দম্পতিকে হ্যালসিওন বা মাছরাঙা জাতীয় পাখিতে পরিণত করেন। মেটামরফোসিসে অবশ্য রয়েছে সামুদ্রিক ঝরের আঘাতে মৃত্যু হয় সেইকসের। এবং আল্কিওনি এ কথা না জেনে স্বামীর অপেক্ষা করতে থাকেন ও হেরার কাছে প্রার্থনা করতে থাকেন তার প্রত্যাবর্তনের আশায়। অভিদের লেখায় এমনও আছে যে আত্মহত্যার আগে তার স্বামীর মৃতদেহ ভেসে আসতে দেখে। তারপর হয় তাদের রূপান্তর।

 

আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দের সময় থেকে স্লাভিক সভ্যতার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। গ্রীক পুরাণগাঁথার এই  আল্কিওনি মিথ থেকে প্রভাবিত হয়ে প্রাচীন স্লাভিক সভ্যতায় সৃষ্টি হয় আলক্যানস্টদের (Alkonost) কাহিনি। এরাও একই রকম পক্ষী-মানবী। তারা মৃতলোকের বাসিন্দা। তাদের একটি বিশেষ গুণ হলো যে তারা অপূর্ব সুরেলা গলায় গান করতে পারে।  আকৃষ্ট করতে পারে যে কোন মানুষকে। তাদের মনোমুগ্ধকর গান শুনে যে কেউ বিভ্রান্ত হতে পারে। এবং বিস্মৃত হয় তার অতীত বর্তমান। মুছে যায় তাদের জীবনের সমস্ত আশা আকাঙ্খা। এদেরও ডেরা ছিল জলভাগেই – ইউফ্রেটিসের (Euphrates) স্রোতের মাঝেই কোথাও। সম্ভবত পার্সিয়ার বানিজ্যিকরাই কিয়েভে নিয়ে এসেছিল এই গাঁথা। রারোগ বা আগুনে শ্যেন পাখির সহোদর এই আলক্যানস্টরা সমুদ্রের ধারে জলাভূমিতে বাসা করে ডিম পারে। স্লাভিক বিশ্বাস যে এই ডিম যখন ফোটে তখন প্রবল সামুদ্রিক ঝড় ওঠে। এরা যেমন অশুভ শক্তি বা অমঙ্গলজনক অস্তিত্ব ঠিক তেমনই এদের একটি প্রতিরূপের কথা পাওয়া যায় স্লাভিক লোকবিশ্বাসে। গামায়ুন নামে পরিচিত এরাও পক্ষী-মানবী। এদের পা বা নখর থাকে না। পাখির মতো দেহ , ডানা বিশিষ্ট ও মুখ নারীদের মতো। এরা জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও ধীশক্তির প্রতীক। গ্যামায়ুনরা ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারতো বলে বিশ্বাস ছিল।

 

প্রাচীন গ্রীসের স্ফিঙ্কসের কথা না বললেই নয়। অদ্ভুত এক জীব এই স্ফিঙ্কস (Sphinx)। কাইমেরা নামক এক ভয়ংকর দানবের সন্তান এবং নিমিয়ান লায়নের বোন স্ফিঙ্কস।  তার দেহ সিংহের মতো ,মুখটি মানবীর ও পিঠে বিরাট দুই ডানা। কথিত আছে যে এই প্রাণীটি থাকতো থিব্স নগরীর অতন্দ্র পাহারায়।  এ নগরে খরা , বন্যা প্রভৃতি সৃষ্টি করে নগরবাসীর জীবন দুর্বিষহ করে তোলে সে।  কোন অপরিচিত ব্যক্তির আগমন হলেই তাকে প্রশ্ন করতো।  কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে তাকে গিলে নিত সে। এমনই একবার অয়দিপাউসের সাথে মুখোমুখি হয় সে। তার প্রশ্ন – কোন প্রাণী সকালে চার পায়ে , দুপুরে দুই পায়ে, বিকেলে তিন পায়ে হাটে – এর সঠিক উত্তর (মানুষ) তিনি দিয়ে দেন। তাতে স্ফিঙ্কস পাহাড়ের উপর থেকে ঝাঁপ দেয়, মতান্তরে নিজেই নিজেকে গিলে ফেলে ধ্বংস করে। মেসোপটেমিয়া ও মিশরের মিথেও স্ফিঙ্কসের কথা পাওয়া যায় কিন্তু সেখানে এই প্রাণীকে ভয়াল দেখানো হয়নি। মিশরীয় স্ফিঙ্কস নারী নয় , পুরুষ এবং হিতকরী।

 

মিশরীয়দের এক গুরুত্বপূর্ণ দেবতা  ছিলেন হোরাস। এই দেবতার শরীর মানবদেহের মতো হলেও মাথাটা বাজপাখির। প্রাচীনকালে প্রকৃতির বিভিন্ন সত্তাকে পুজো দেওয়ার প্রচলন নতুন নয়।  অজানার প্রতি ভয় , প্রকৃতির শক্তিকে বশ করতে না পারার দরুণ এই ভীতি ,আর তার থেকেই পূজার সূচনা। বাজপাখির উড়ান, প্রখর দৃষ্টির জন্য হোরাসের সাথে মিলিয়ে ভাবা হয়েছে তাকে। স্বাভাবিকভাবেই হোরাসকে মানা হতো আকাশ ও যুদ্ধের দেবতা। পরবর্তীকালে হোরাসের গুরুত্ব বেড়ে যায় যখন তাকে আইসিস ও অসিরিসের পুত্র হিসেবে দেখানো হয়। কাহিনি অনুসারে তিনি যখন ছোট ছিলেন ,অসিরিসের ভাই সেথ নিজের দাদা অসিরিসকে হত্যা করেন। প্রকৃতপক্ষে রূপকের মাধ্যমে যা দেখানো হয়েছে তা হলো মৃত্যু, শুষ্কতা জীবনকে ধ্বংস করে – কারণ, অসিরিস উর্বরাশক্তি প্রতীক এবং সেথ দুর্ভিক্ষ , খরা , মৃত্যুকে প্রতীকায়িত করে। হোরাস একটু বড়ো হয়ে প্রতিশোধ নেন এবং অসিরিসকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলেন। অর্থাৎ প্রতীকীভাবে জীবনীশক্তিকে বাঁচিয়ে তোলেন। তাই হোরাস গোটা মিশরের পূজিত ছিলেন এবং শুভশক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। মিশরের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ও পরিচিত দেবতা হলেন থোট। ইনি মিশরীয়দের চন্দ্রের দেবতা হওয়ার সাথে সাথে পবিত্র সব পুঁথি, ধর্মগ্রন্থ , হায়রোগ্লিফ, বিজ্ঞান, অঙ্ক, ইন্দ্রজাল এবং তথ্য সংরক্ষণের দেবতা। থোটের মুখটি ইবিস পাখির মতো। ইবিস সারস জাতীয় পাখি। ইবিস ধৈর্য্য , গ্রহণযোগ্যতা, মনোসংযোগের প্রতীক।  ইবিসের বাঁকা ঠোঁট চন্দ্রকলার মতো দেখায় বলে এবং তার বেঁকে থাকার সাথে নমনীয়তার ধারণা সংযুক্ত হয়েছে বলেই মনে করা হয়। তাই থোটের দেবতা হিসেবে তাৎপর্য খুব বেশি। একটি কাহিনি অনুসারে তার জন্ম হয়েছিল দেবতা রা-এর মুখ থেকে।  অন্য একটি কাহিনি অনুসারে যিনি স্বয়ম্ভু, অর্থাৎ এর কোন সৃষ্টিকর্তা নেই এবং ইনি একটা ডিম পেড়েছিলেন যার থেকে বিশ্ব সৃষ্টি হয়। Concept of cosmic egg – এর ধারণা এখানে সুস্পষ্ট। যেহেতু চাঁদের দেবতা , মিশরীয় বিশ্বাস অনুসারে ইনি বর্ষপঞ্জি বা ক্যালেণ্ডারের জনক। মৃতলোকেও এই দেবতার যথেষ্ট প্রতিপত্তি লক্ষ্য করা যায়। 

 

দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়ার ফিলিপাইনের লোকবিশ্বাসে এরকম প্রাণীর কথা আছে। একেক (Ekek) নামের এক অদ্ভুত প্রাণীর কথা পাওয়া যায় যা অধের্ক মানুষ , অর্ধেক পাখি, ঠোঁটের জায়গায় আছে বড় একখানা চঞ্চু। এছাড়াও এই ধরনের দুইটি প্রাণীর নাম পাওয়া যায়, ওয়াকওয়াক (Wakwak) ও মানানাংগল (Mananangal)। এরা প্রত্যেকেই আধা মানুষ , আধা পাখি। ওয়াকওয়াক-এর ধারালো নখর ও বাদুড়ের মতো ডানা। নখরের ব্যবহারে তারা চিরে ফেলতে পারে অসহায় মানুষের বুক। মানানাংগল নারীসদৃশ। নিজের দেহকে সে প্রয়োজনে  বিভক্ত করতে পারে দুইভাগে। বাদুড়ের মতো ডানা এবং  লম্বা সূঁচালো জিভ তার।  অন্তঃসত্ত্বা , নব্য দম্পতির রক্ত পান করার জন্য তারা ঘুরে বেড়ায় রাতের অন্ধকারে। লোকবিশ্বাস মতে নুন, রসুন ও ছাই ছিটিয়ে দিলে এরা তা সহ্য করতে পারে না এবং এদের অস্তিত্বের সমাপ্তি ঘটে। বাকি দুটি প্রাণীও নিশাচর। এই তিনটি প্রাণীকেই রাতের বিভীষিকা হিসেবে দেখানো হয়েছে। আমেরিকার একটি আদিবাসী সংস্কৃতি যারা আবেনাকি নামে পরিচিত তাদের লোকবিশ্বাসে পামোলা (Pamola) নামের এক প্রাণীর কথা পাওয়া যায় ,  যাকে বজ্রের দেবতা মনে করা হতো।

 

পুরাণে অত্যন্ত পরিচিত চরিত্র হলো গরুড় ঋষি কাশ্যপের ঔরসে দক্ষকন্যা বিনতার গর্ভে কনিষ্ঠ সন্তান হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন গরুড়। তার অগ্রজ হলেন সূর্যের সারথি অরুণ। দেবরাজ ইন্দ্রের ঠাট্টার জন্য বালখিল্য মুনিরা ক্রুদ্ধ হয়ে ইন্দ্রকে অপসারণ করে তার চেয়েও শক্তিশালী ইন্দ্রের জন্মের জন্য যজ্ঞ শুরু করেন। ঋষি কশ্যপ ইন্দ্রের হয়ে অনুরোধ করায় মুনিরা খুশি হয়ে কশ্যপকে শক্তিশালী দুই পুত্র প্রাপ্তির আশীর্বাদ দেন।  বিনতার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন অরুণ ও পক্ষীন্দ্র গরুড়। বিষ্ণুর বাহন তিনি।  গরুড়ের দেহ এক শক্তিশালী মানবদেহের মতো যার সাথে বিরাট দুই ডানা সংযুক্ত। মুখটি ঈগলের মতো। নাগ ও গরুড়ের শত্রুতা সর্বজনবিদিত। পুরাণ মতে তিনিই প্রথম সাপের বিষের প্রতিষেধকের ব্যাপারে মানবজাতিকে অবহিত করেন। গরুড় শক্তির প্রতীক। এছাড়াও ভক্তি , মর্যাদা , সদ্ধর্মের প্রতীক হলেন তিনি। বিনতা ও কদ্রুর বিবাদে , নিজের মায়ের দুরবস্থা দেখে তার প্রতিকার করার জন্য অমৃতের সন্ধানে যেমন গিয়েছিলেন, তেমনই , ক্ষুধায় কাতর গরুড় যখন ঋষি কশ্যপের  কথামতো এক সরোবর থেকে তার এক নখরে বিরাট কচ্ছপ ও অন্য নখরে বিশাল গজ নিয়ে উড়ে এসে এক অতিকায় বটগাছে বসে এবং তার ভারে ভেঙে পড়া ডাল ঠোঁটে ধরে তপস্যারত বালখিল্যমুনিদের বাঁচান। মাতৃসত্য পালন ও মায়ের কথা শোনা, অতিশয় শক্তিশালী হলেও তার  বিনয় ও নম্রতার উদাহরণ আমরা পুরাণ , হরিবংশ , মহাভারতে বারবার পেয়েছি। জাপানের বৌদ্ধ মিথলজিতে আবার কারুর বলে এক প্রাণীর কথা পাওয়া যায়। নামে ও রূপে গরুড়ের সাথে তার সাদৃশ্য বলা বাহুল্য।

 

বাঙালি জাতির প্রাচীনতম প্রত্নস্থল পাণ্ডু রাজার ঢিবি। যা গঙ্গারিডাই সভ্যতা নামে পরিচিত। গাঙ্গেয়ভূমির এই সভ্যতায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রচলন ছিল যার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেছে। স্বভাবতই সমুদ্রযাত্রার ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই সভ্যতার প্রাচীন শিল্পীরাও এঁকে গেছেন পক্ষী-মানবীর মূর্তি। নারীদেহের সাথে দেখা যায় প্রকান্ড দুটি ডানা। সেখানে বলাকা মাতৃকার পুজো হত, প্রসঙ্গত এই পাণ্ডু রাজার ঢিবি বা গঙ্গারিডি সভ্যতা চার হাজার বছর আগে গড়ে ওঠে। অর্থাৎ তা অন্তিম হরপ্পা সভ্যতার সমসাময়িক।  প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে হরপ্পা সভ্যতাতেও মাতৃশক্তির পূজার প্রচলন ছিল বলাকা বা পাখি রূপে। বৈদিক আর্যরা এই প্রাচীন সভ্যতার মানুষদের বয়াংসি বলেছেন।  শব্দটির অর্থ হলো পক্ষীজাতীয়। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এ বঙ্গবাসীদের ‘বয়াংসি’ বা পক্ষীজাতীয় বলা হয়েছে কারণ তারা পক্ষীমাতৃকার উপাসক। মা কালীর পঞ্চদশ নিত্যার একজন হলেন বলাকা। কালিদাস মা কালীকে বলাকিনী বলেছেন। দশ মহাবিদ্যার অন্যতম মা বগলামুখী আদিতে ছিলেন মা বলাকামুখী। বগলা কথাটি বগুলা বা বক থেকে এসেছে। মা কালীর মণ্ডলে বলাকা, কাক , শুক বা টিয়াপাখির উপস্থিতি আমরা লক্ষ্য করি।  দশমহাবিদ্যার ধূমাবতীর সাথে দাঁড়কাক , মাতঙ্গির সাথে শুকপাখি দেখা যায়। শৃগাল ও পক্ষী দুইই মায়ের মণ্ডলে থাকে এবং মা দুই রূপই ধারণ করেন। অধ্যাপক তমাল দাশগুপ্তের মতে, “বলাকামাতৃকা কৈবল্যের প্রতীক, তাঁর অসীম ডানায় মোক্ষ প্রদান করেন”। রূপকশাস্ত্র অনুযায়ী , ডানা হলো সক্ষমতা, মুক্তি ও কল্পনার প্রতীক। স্বাভাবিকভাবেই ডানার সাথে ‘মোক্ষ’-এর প্রতীকী সাযুজ্য দেখা হয়েছে। মা কালী বাঙালি জাতির আদিতমা মাতৃকা। মাতৃকধর্মের মুলে আছে ভক্তরুপি সন্তানকে  অসীম মমতায় রক্ষা করার কর্ম। তিনি আমাদের রক্ষা করেন, ঠিক যেমন পাখি মা তার শাবকদের রক্ষা করে। তিনি অসীম ক্রোধে আমাদের শত্রুদের ধ্বংস করেন, তাঁর লেলিহান জিহ্বা ও দন্তবিকাশ করে সমস্ত বিপদ ও আক্রমণকে গ্রাস বা দমন করার চেষ্টা করেন। তাই বাঙালির মাতৃধর্ম তথা পৌরাণিক আখ্যানেও পাখি ও মানুষের মেলবন্ধনেই বেশ আলোকময় উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

এই বিষয়টি অত্যন্ত আকর্ষণীয় যে পাখির সাথে মানুষের অস্তিত্ব মিলিয়ে এমন সব অদ্ভুত প্রাণীর কল্পনা করা হয়েছে প্রাচীনকালে; এবং সমগ্র পৃথিবীর বুকেই সদৃশ ভাবনার স্ফুরণ দেখা গেছে। ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন দেশে ও ভাষার মানুষের মধ্যেও দেখা গেছে এই অনন্য় চিন্তার প্রকাশ ও প্রসার। তবে কি এ নিছক কল্পনাই? নাকি অচেনা অদেখা কোন ভয় যার অমোঘ টানে মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বার বার – যে সব অদেখা ভীতির কল্পরূপ হয়ে উঠেছে এই সাইরেন, আলকোনস্ট, মানানাংগল বা তেঙ্গু। নাকি মানুষের এই বিপুলা প্রকৃতিকে স্পর্শ করার তীব্র উচ্চাঙ্খার ফলে এই পাখি-মানুষের অবতারণা হয়েছে? মানুষ স্থলচর। প্রাচীন কালে জলেও নিজের চেষ্টায় গমন করতে পেরেছে, পারেনি  আকাশে নিজের নিশান উড়াতে। অনেক পরে যন্ত্রের সাহায্যে তা সম্ভবপর হয়েছে। কিন্তু উড্ডয়নের প্রতি তীব্র বাসনা বা ইচ্ছে ছিল বরাবরই। প্রকৃতিকে অনুসন্ধান করার প্রবল প্রচেষ্টা। পাখির উড়ান বা তাদের বুদ্ধি, তাদের কারিগরিবিদ্যা, ক্ষমতা প্রভৃতি অবাক করেছে মানুষের বোধকে। কল্পনার বীজ হয়তো নিহিত আছে। আবার গর্ভাবস্থায় থাকা ভ্রূণও তো বিভিন্ন অবস্থার মধ্যে দিয়ে গিয়ে মানুষের রূপ পায়। সেই সব অবস্থার মধ্যে একটি কিন্তু খেচর প্রজাতির মতো দেখতে। এই কল্পনার বাস্তবতার শিকড় সন্ধান এখনও চলছে। পাখি-মানবদের রূপকল্প প্রকৃতপক্ষে কী থেকে তা জোর দিয়ে বলা যায় না। তা মানুষের অপরিনত অবস্থায় জন্মানো কোন বিচিত্র অস্তিত্ব নাকি কৃপ্টোজুলজিস্টদের (Cryptozoologist) মতানুসরে এরাও সেই থীওরির অন্তর্গত যেখানে কোন ভিন্ন প্রজাতির মিলনের ফলে সৃষ্ট অদ্ভুত প্রকার বা স্পিসিস যারা পৃথিবীর বুকে দৈবাৎ জন্মায়, অজানা ভীতি হয়ে কিছু সময়ের জন্য বেঁচে থাকে, তারপর আগামী পৃথিবীর জন্য অবাক করা কল্পনার রসদ রেখে আচমকাই হারিয়ে যায় – তা বলা যায় না।  তবে যেটা অবশ্যই বলা যায় তা হলো, মানুষের প্রকৃতির সাথে একটা প্রবল যোগ।  এ যেন নাড়ির টান যা ছিন্ন হয়না।  ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে অস্তিত্বের সাথে। শুধু এভিয়ন হিউমানোইডস নয় , অন্যান্য  অস্তিত্বের সাথেও – যেমন বিভিন্ন পশু, মাছ, উদ্ভিদ ও পতঙ্গের সাথেও অন্যান্য প্রাণীকে জুড়ে কাল্পনিক সত্তা সৃষ্টি হয়েছে বারবার। গোটা পৃথিবীর প্রাচীনতম ধর্ম হলো প্রকৃতির ধর্ম আর তাই প্রকৃতির সাথে প্রাণীর এই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের রূপকল্প যাই হোক , তার মূলে আছে প্রকৃতিমনষ্কতা বা সুদৃঢ় নির্ভরশীলতার তত্ত্ব।

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত