| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: দ্বন্দ্ব । পলি শাহীনা

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

মাটির ব্যাংকে জমানো সিকি-আধুলির ঝনঝন শব্দের মতো, জীবনের বড়বেলায় শৈশব- কৈশোর- যৌবনে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিরা আওয়াজ তোলে মনের গহীন অন্দরে। এই যে সোনাইমুড়ী জননী বাস স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি, এটি আমার ফেলে আসা সময়ের খুব প্রিয় জায়গা। দুই যুগ পর এসেছি এই স্থানটিতে। হলুদ সাইনবোর্ডের গায়ে কালো হরফে লেখা স্টেশনের নামটি দেখে মনে হলো, অনেকদিন পর প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলো। অগণিত স্মৃতি জড়িয়ে আছে আমার এই স্টেশনের পরতে পরতে। পরিত্যক্ত স্মৃতিঘরে ঢুকতেই যেন বন্ধুদের হইহই রব স্পষ্ট শুনতে পাই। অচেনা পথচারীদের গায়ের বাতাসে হারিয়ে ফেলা বন্ধুদের পরশ যেন লাগছে গায়ে এসে। কলেজ শেষে স্টেশন থেকে কয়েক হাত দূরে ওই ছাতার মতো ছায়াদায়ী বড় বট গাছটার ছায়ায় এসে আমরা জড়ো হোতাম। গাছে হেলান দিয়ে লবণ -মরিচ মাখিয়ে পেয়ারা খেতাম, আর যতদূর চোখ যেত তাকিয়ে মানুষের সৌন্দর্য দেখতাম, খোলা আকাশ দেখতাম, খৈ ফোটার মতো গল্প করতাম, জলের শব্দের মতো হা হা হো হো হাসতাম। আমাদের দেখে ততক্ষণে টকটকে লাল শার্ট পরা আইসক্রিমওয়ালা, খাকি পোশাকের আচারওয়ালা এসে হাজির হতো। তাঁরা আমাদের চিনতেন এবং জানতেন, সপ্তাহের ছয়দিনই আমরা ওই একই জায়গায় একই সময়ে দলবেঁধে হাজির হবো। তাঁদের এবং আমাদের মাঝখানে কোন ব্যবধান ছিল না, ছিল সম্মান, সৌহার্দ, ভালোবাসা। তাঁরা আমাদের নাম জানতেন, আমরা তাঁদের মামা বলে সম্বোধন করতাম। আচার বিক্রেতা মামার হাতে একদা প্রেমপত্রও পেয়েছিলাম। চিঠিটি আমি হাতে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিলের মতো চোঁ মেরে শিলা নিয়ে যায়। ও শব্দ করে পড়া শুরু করতেই ওই মামাই বাঁধ সেধেছিলেন। তাঁর বোধ জ্ঞান বিষয়টি ভেবে আজো বিস্মিত হই। আমার বন্ধুবৃত্ত ছিল খুব হাসিখুশি, প্রাণবন্ত, দৃঢ। আমাদের মধ্যে টক-ঝাল-মিষ্টি ধরণের আন্তরিকতা, অভিমান, জেদ, আব্দার, সবই ছিল। আমরা একে অপরকে বিশ্বাস করতাম মন থেকে। বাড়ি থেকে আনা খাবার সকলে মিলে ভাগ করে খেতাম। অংকে আমার বন্ধু শিলা চৌকস ছিল, আমি বরাবর দূর্বল ছিলাম। দূর্বল হলে কী হবে, আমার আত্মবিশ্বাস ছিল শিলার বদৌলতে পরীক্ষায় টেনেটুনে আমি তেত্রিশ, অর্থাৎ পাশ মার্ক পাবোই। পরীক্ষার দিন আমার পাশ মার্ক নিশ্চিত করে পরে শিলা নিজের পরীক্ষার খাতায় মন দিতো। তুমুল হিসেব কষতে জানা শিলা শুনেছি খামখেয়ালিভাবে জীবনের বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, অনেক চেষ্টা করেও ওর কোন খোঁজ আর পাই নি। যে মানুষটি হিসেবে এত নির্ভূল ছিল সে মানুষটি জীবনে কেমন করে এত বড় ভুল করলো, জানার সুযোগ হয় নি। ওর কথা মনে পড়ে ভীষণ কষ্ট হয়, একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। খুব পাশ ঘেঁষে যাওয়া মোটরসাইকেলের বাজখাঁই শব্দে স্মৃতির অরণ্য থেকে বেরিয়ে নিজস্ব নীরবতার করিডোর পেরিয়ে পুনরায় গাড়িতে উঠে বসি। 

আপা, কী দেখছিলেন এত সময় নিয়ে এই জনারণ্যে? 

স্মৃতি খুঁজছিলাম…

পেলেন কিছু? 

ফেলে আসা সময় ফিরে পাওয়া যায় না রে… 

হুম, আপনার অগোছালো পায়চারি দেখছিলাম, কখনো হাসছেন, কখনোবা চুপ হয়ে যাচ্ছেন।

হ্যাঁ, এই অবেলায় যৌবনে ফেরা যায় না, কিন্তু স্মৃতির ঝনঝন শব্দে কিছুটা আনন্দ ফিরে পাওয়া যায়, সেটাই অনুভব করছিলাম। 

শাঁই শাঁই শব্দ তুলে আমার গাড়ি এগিয়ে চলছে। চালককে বললাম একটু আস্তে গাড়ি চালাতে। বিকেলের সূর্য তখন সোনারঙ ছড়িয়ে দিগন্তের ওপাড়ে ধীরে ধীরে ডুবতে শুরু করেছে। সোনার কুচির সঙ্গে সিঁদুর লালের মাখামাখি, মুগ্ধ হয়ে দেখছি। নদনা বাজার, বাংলা বাজার, জুনুত পুর, আমকি বাজার, থানার হাট বাজার, একের পর এক স্টেশন আসছে আর আমি উদাস হয়ে পড়ছি। প্রতিটি স্টেশন আমার হাতের রেখার মতো চেনা, ওদের সঙ্গে আমার কত মায়া জড়িয়ে আছে, তা জানি আমি আর জানে ওই স্টেশনগুলো। পৃথিবীর পথে পথে কত স্টেশনে ঘুরেছি, এই নামগুলোর স্টেশনে যত ভালোলাগা কাজ করে অন্য কোন স্টেশনে তত ভালো লাগে নি। এই স্টেশনগুলো যেন আমার ভাইবোনের মতো অতি আপন, আনন্দময়। ওদের পেছনে ফেলে যেতে বুক মুচড়ে উঠছে, বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে ওদের দেখি। অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে বাড়ির পথের শেষ স্টেশনে নামি। স্টেশনগুলোর নাম না বদলালেও দৃশ্যগুলো বদলে গেছে। কেমন আছি, কেউ জানতে চাইলো না আগের মতো। বেশ কয়েকটি নারীর দল চোখে পড়লো, তাঁরা হাঁটছেন, গল্প করছেন, কিন্তু তাঁদের চোখ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাই নি বলে চিনতে পারলাম না। তাঁদের দিকে চেয়ে থেকে ভাবছি, এই এলাকায় সত্তুরের দশকে আমিও একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বেড়ে উঠেছিলাম, তখনকার নারিরা তো এভাবে কালো কাপড়ে নিজেদের বেঁধে রাখতো না। তাঁরাও পর্দা মানতেন, নামাজ পড়তেন, ধর্মানুরাগী ছিলেন। চোখে ভাসছে এখনো, তাঁরা শাড়ির উপর সুন্দর কারুকার্যময় উড়না পরতেন। কেউবা বোরকা পরতেন, তবে তখন তো তাঁদের চিনতে পারতাম মুখ দেখে, এঁদের কারো মুখ দেখা যায় না, চিনবো কেমন করে? আগের দিনের মতো কেউ যেচে কথাও বলছেন না, পরিচয় করছেন না। নিজেকে কেমন ভিনগ্রহ থেকে আগত কোন প্রাণী মনে হলো। অসহায় লাগছে ভেতরে। আমি হাঁ মুখে সকলকে দেখতে দেখতে গুটি গুটি পায়ে বাড়ির পথে হাঁটছি। গ্রামের সেই চৌচালা টিনের ঘর, মাটির ঘর, বড় গাছ, গাছের ছায়া, কিছুই নেই। গ্রামের বেশভূষা বদলে গেছে। চতুর্দিকে সব আকাশচুম্বী অট্রালিকা। একটু একটু করে জীবন থেকে কত কী যে হারিয়ে গেছে, টের পেলাম না পর্যন্ত। আমার শৈশব-কৈশোর- যৌবনের হারিয়ে যাওয়া অমূল্য জিনিসগুলো নিশ্চয়ই কোথাও মেদুর হাওয়ায় ভাসছে, আমি হণ্যে হয়ে সেসব খুঁজছি। ভাসমান সবকিছু কী মাটিতে আছড়ে পড়ে, ক্লান্ত হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করি। না, কোন উত্তর পাই না। বাতাসও কেমন ঘাপটি মেরে আছে, ধু ধু তেপান্তরে। 

বাড়ির প্রবেশ দ্বারের বাঁ দিকটায় পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মা শুয়ে আছেন পাশাপাশি। তাঁদের মাথার পাশে দাঁড়িয়ে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। হু হু হাওয়ায় ঝরে পড়া কোমল শিউলির স্পর্শ মুছে দেয় কিছুটা যন্ত্রণা। ওদের আঁজলা ভরে কুড়াতে গিয়ে চোখ আটকে যায় মায়ের নাম খোদাই করা সাদা মার্বেল পাথরে। শব্দ করে মায়ের নাম পড়ি। আমি কখনো অপ্সরা দেখি নি, কিন্তু কল্পনা করি আমার মা দেখতে অপ্সরার মতো ছিলেন। তাঁর সাজগোছ ছিল শিল্পের মতো পরিপাটি। সদা টিপটপ থাকা, চোখে কাজল টানা মাকে দেখতে স্বর্গের অপ্সরার মতো লাগতো। তাঁর ব্যক্তিত্ব, রুচিবোধ ছিল অনুকরণীয়। তাঁর মতো এমন সুন্দর মানুষটার নাম প্রথমে হারিয়ে যায় আমার বাবার মধ্যে, এরপর আমাদের ভাইবোনের ভীড়ে। স্পষ্ট মনে পড়ে মাকে প্রতিবেশীরা ডাকতেন অমুকের বউ কিংবা অমুকের মা বলে। আব্বা মাকে ডাকতেন ‘এই ‘ বলে, আমরা ডাকতাম আম্মা বলে। তাঁর কাছের মানুষগুলো থেকে শুরু হয়ে দূরের মানুষ পর্যন্ত সর্বত্র এমনি করে আমার মায়ের নামটি মুছে গেছে। আমার মায়ের বাবা-মা’র দেয়া আদরের নামটি হারিয়ে যাওয়ায় মায়ের কী মন খারাপ হতো? পরিবার, ছেলেমেয়ের বাইরে আমার মায়ের কী অন্য কোন জগৎ ছিল? কি জানি। তবে আমার মা গভীর রাতে চোখ বুঁজে রেডিওতে গান শুনতেন, নাটক শুনতেন। কখনো সখনো দেখেছি আয়নার সামনে বসে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকতেন, তখন তাঁর মন, দৃষ্টি ছিল অন্য কোন ছায়ার দিকে, তখন না বুঝলেও আজ তা খুব বুঝতে পারি। কী খুঁজতেন তিনি ওই ছায়ায়? তাঁর নিজস্ব সত্ত্বা, নাকি হারিয়ে ফেলা ছোটবেলার স্মৃতি, ঠিক আজকের আমার মতন, কিছুই জানি না। ভাবনার গহীনে ডুবে বাবা-মা’র মুখোমুখি চুপচাপ অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে থাকি। 

পায়ের ব্যথায়, পেটের ক্ষুধায় বাড়ির ভেতর প্রবেশ করি। অন্ধকার ততক্ষণে বেশ বয়স্ক হয়ে উঠেছে। কোমরের ব্যথাটা অজগরের মতো ফণা তুলে ছুঁয়ে যায়। মাথাটাও ঝিমঝিম করছে। মকবুল মামা চা, নাশতা দিতে চাইলে না করলাম, বললাম, ভাত খাব। গত প্রায় তিন দশক ধরে দেশের বাইরে থাকলে কী হবে, ভাত চিরকালই আমার প্রধান খাদ্য। ‘ভেতো বাঙালি ‘ বলে বিশ্বে আমাদের বদনাম আছে। ভাত ছাড়া দুনিয়ার অন্য কোন খাবারে বাঙালির তৃপ্তি মিটে না। ঢাকা থেকে রওনা দেয়ার আগেই মামিকে ফোন দিয়ে বলেছি,  আতপ চালের ভাতের সঙ্গে মুগ ডাল, ভর্তা, শাক, ছোট মাছ রান্না করার জন্য। খাবারের মৌ মৌ ঘ্রাণে ক্ষুধাটা আরো বেড়েছে। দরজার সামনে খোলা বারান্দায় শীতল পাটি বিছিয়ে মামি খাবার পরিবেশন করেন। মামা-মামীর মাঝখানে বসে খাওয়া শেষে মনে হলো, মাথা ঝিমঝিম, ক্লান্তি, ব্যথা, সব কেটে গেছে। ভাত কী তবে বাঙালির শরীরে প্রাণদায়ী এবং শক্তি সঞ্চারী! সে যা-ই হোক খানাপিনার পর চোখজোড়া বুঁজে আসছে আপনা হতেই। চিন্তায় পড়ে যাই, এই ভাতঘুম ভেঙে ভোরে উঠে আমার প্রিয় বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রভাতফেরিতে অংশ নিতে পারব তো? চার দশক পর অতিথি হিসেবে যাব আমার স্মৃতির আঙিনায়, ভাবতেই হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়। মোবাইলে এলার্ম সেট করতে করতে মামাকে জিজ্ঞেস করি, বাড়ির ছেলেমেয়েরা সব গেলো কই? কোথাও কোন শব্দ নেই, ফুল চুরির উৎসব নেই। উত্তরে মামা বললেন, ‘ এই প্রজন্ম অনেক অস্থির রে মা, সূর্য ডুবতেই সব স্ক্রিনে আটকে আছে বোবা হয়ে, এভাবে চলবে মধ্যরাত বা শেষ রাত অবধি, এরা ভোর দেখে না, এই প্রজন্ম বেড়ালের মতো অস্থির পায়চারি করে শুধু স্ক্রিনে, আর এক চ্যানেল হতে অন্য চ্যানেলে। এরা কী করতে চায়, কী হতে চায়, নিজেরাও জানে না, এদের কোন কিছু ভালো লাগে না। এরা বুঝতে চায় না সময়ের মূল্য, এরা সময় নামক অমূল্য বস্তুটিকে রোজ উড়িয়ে দেয় ধোঁয়ার মতন। ‘ মামার কথাগুলো আমার ভেতরে বেশ জোরে ধাক্কা দেয়। আমি নির্বাক তাঁর দিকে চেয়ে রই আর আপনমনে বিড়বিড় করি, রাতের খাবার শেষে এই সময়টায় উঠোনে খোলা আকাশের নিচে বসে দাদার পুঁথি পাঠ শুনতাম, গল্প করতাম। বাড়ির অন্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে কানামাছি খেলতাম, দৌড়াদৌড়ি করতাম। আমাদের চিৎকারে পুরো বাড়ি গমগম করতো। অথচ, এখন মনে হচ্ছে বাড়িজুড়ে গোরস্থানের নি:স্তব্ধতা বইছে। মাথার ভেতর ভজঘট পাকিয়ে যাচ্ছে, সবকিছু এলোমেলো লাগছে, আমি কোন হিসেব মেলাতে পারি না দেখে শেষমেশ ঘুমের কোলে ঢলে পড়ি। 

ভোরে ঘুম ভেঙে ফ্রেশ হয়ে প্রিয় বর্ণমালা খচিত সাদা-কালো শাড়িটি শরীরে জড়াতে জড়াতে টের পাচ্ছিলাম বুকের ভেতর টিপটিপ আনন্দ, ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটার মতো শব্দ করে যাচ্ছে। আমি আজ কচিকাঁচাদের ভীড়ে ফিরে যাব আমার ফেলে আসা সোনালী অতীতে। কী আনন্দ! উচ্ছ্বসিত আমি ঘর ছেড়ে বাইরে পা রাখতেই সেই পুরনো ধাক্কা, সেই গতরাতের মতো অসীম নি:স্তব্ধতা। একুশের প্রথম প্রহর তো এই রকম হওয়ার কথা না। আমার ছোটবেলায় তো এরকমটা দেখি নি। সেই সময় প্রায় প্রতিটি বাড়ি হতে আবালবৃদ্ধবনিতা ফুল হাতে ছুটে যেত শহীদ মিনারের দিকে, ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে। বাজারের মাইক হতে, স্কুল-কলেজ থেকে, পাড়ার দোকান থেকে, প্রায় প্রতিটি বাড়ি থেকে কানে ভেসে আসতো একুশের গানগুলো। আজ একুশে ফেব্রুয়ারি, অথচ কোথাও একুশের সুর নেই। আমি কী ভুল দেখছি? চশমাটা খুলে ভালোমতো মুছে পুনরায় এঁটে নিলাম। খানিক আগের বুকের উচ্ছ্বাস হাহাকারে রুপ নেয়। আমার দেখাশোনা হয়ত অসম্পূর্ণ এই ভেবে উচ্ছ্বাসহীন আমি নির্ধারিত গন্তব্য আমার বিদ্যালয়ের পথে এগোতে থাকি। পথে যে দৃশ্যটি চোখে পড়ে তা দেখে আমি রীতিমতো বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। দেখি, ছোট একদল শিশু, বয়স চার কী পাঁচ হবে, ওদের আপাদমস্তক কালো বোরকায় ঢাকা। ওরা ঠিকমতো হাঁটতেও পারছে না পোশাকটি সামলিয়ে। ওদের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, ওরা কোন একটি অদৃশ্য পাহাড় টেনে নিয়ে যাচ্ছে সামনে, পাহাড়টি টানতে টানতে ওরা বড় ক্লান্ত হয়ে উঠেছে। মনে পড়ে ঠিক ওদের বয়সে নয় আরেকটু বড় হয়ে আমিও ভোরে মক্তবে যেতাম আরবী পড়তে, তবে ওদের মতো পাহাড় টেনে নয়, প্রজাপতির মতো উড়তে উড়তে মনের আনন্দে সালোয়ার কামিজ পরে, মাথায় উড়না দিয়ে যেতাম। দেশজুড়ে কী দেখছি এসব? ঢাকা সহ আরো কয়েকটি জায়গায় ভ্রমণের সময় এমন দৃশ্য চোখে পড়েছে বৈকি, তুমুল ব্যস্ততার মধ্যে তখন অতটা ভাবনার উদয় হয় নি। এসব কীসের আয়োজন? ধর্ম এবং সংস্কৃতি দু’টো আলাদা বিষয়। বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি, উৎসব, ঐতহ্য, আনন্দ কী কোথাও খোয়া গেছে? নাকি কেউ চুরি করেছে? আমার ছেলেবেলার মতো কেন আজ কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না? আমার দেখা এবং বুঝায় কী কোন ভুল আছে? অনেক প্রশ্ন মাথায় কিলবিল করতে থাকে, উত্তর পাই না। একটা বিপন্নতা আমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। যে আনন্দে অবগাহন করব বলে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি সে আনন্দ কোন এক অচেনা অন্ধকারে ডুবে যেতে থাকে।

বুঝতে পারি, আমার আনন্দ- উচ্ছ্বাস একদম হারিয়ে যায়। আনন্দ বিষয়টাই স্বতঃস্ফূর্ত, জোর করে কিংবা আয়োজন করে তো হয় না। আমি দেশে যে পরিবেশে বড় হয়েছি তার লেশমাত্র খুঁজে না পেয়ে আনন্দ করবো কী করে? বিদ্যালয়ের সামনের মাঠে পৌঁছে স্মৃতির স্পর্শে প্রাণ কেঁপে উঠলো। প্রভাতফেরিতে মেয়েদের সারিতে একা বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছি, আর এদিক ওদিক এই বিদ্যালয়ের যে শিক্ষক বন্ধুটি আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে তাকে খুঁজছি। বোকার মতো বলছি এজন্য যে আমি ছাড়া অন্যসব মেয়েদের চেনার কোন উপায় নেই, বোরকার সঙ্গে এখানে যুক্ত হয়েছে চশমা। আমি ওদের দিকে তাকিয়ে আছি আর ফ্ল্যাশব্যাকে নিজেকে দেখছি। দেখি, সাদা সালোওয়ার -কামিজ, নেভি ব্লু ক্রস উড়না সঙ্গে দুই বেণি দুলিয়ে ফুল হাতে প্রভাতফেরিতে হাঁটছি, ‘ আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কী ভুলিতে পারি’  সুর করে গাইছি। আমার ভাবনায় ছেদ পড়ে বন্ধুর উষ্ণ সম্ভাষণে আর উচ্চকিত হাসিতে। এত বছর পর প্রিয় বিদ্যাপীঠে বন্ধুকে পেয়ে আনন্দের বদলে মনের ভাঁজে ভাঁজে জমা হওয়া হাজারো প্রশ্নে শীতের মধ্যেও ঘামতে থাকি। অশান্ত মনে একবার ওর মুখের দিকে তাকাই তো পুনরায় এদিক – ওদিক দেখি। আমার অস্থিরতা দেখে বোধ করি আমার মনের অবস্থা বন্ধুটি বুঝতে পেরেছে। এরমধ্যে বিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল আমার বন্ধু। ওরা আমার সঙ্গে হাত মেলালো, কোলাকুলি করলো। বিদ্যালয়ের একজন প্রবীণ ছাত্রীর সঙ্গে নবীনের দেখা হওয়ার পর, পরিচয়ের পর, ওদের মুখের ঔৎসুক্য, অভিব্যক্তি, আনন্দটাই দেখতে পেলাম না। সৌন্দর্য তো শক্তি। একের মুখের একটু হাসি অন্যের মন ভালো করে দেয়। ওদের হাসিমুখ হয়ত এখন আমার মনের সমস্ত মেঘ সরিয়ে প্রাণশক্তিতে ভরিয়ে দিতে পারতো, যে শক্তি অনুসরণ করে আমি আবারও আনন্দ ফিরে পেতাম।  আমি বন্ধুটির মুখের দিকে নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে তাকাই, একটু অপ্রস্তুত মনে হলো তাকে। বন্ধুকে অস্বস্তি থেকে মুক্ত করতে এবার আমি হাসি, বলি, মনে পড়ে আমরা একসঙ্গে এই মাঠের সবুজ ঘাসের উপর বসে আড্ডা দিতাম, বিতর্ক করতাম, আসমান – জমিন কাঁপিয়ে রবীন্দ্র -নজরুল সংগীত গাইতাম, নাটকের রিহার্সেল করতাম, নোট লিখতাম। কী সৃষ্টিশীল আর নির্ভার আনন্দময় ছিল আমাদের জীবন, তাই না রে! লক্ষ্য করলাম, আমার স্মৃতিচারণে বন্ধুটি একটি ঘোরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এরমধ্যে প্রভাতফেরি রেলগাড়ির মতো চলতে শুরু করেছে, আমিও তাল মিলিয়ে সামনে পা ফেলি, কিন্তু গলা দিয়ে ছোটবেলার ওই সুরটা আর আসছে না। কে বা কারা যেন আমার গলা চেপে ধরেছে, আমার কন্ঠ রোধ হয়ে গেছে, ওদের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করে আমি ওদের চেনার চেষ্টা করি, চিনতে পারি না। বুঝতে পারি, মনের ভেতর তীব্র সংঘর্ষ বইছে, তাই এসব দুর্ভাবনা আসছে। বাতাসের অভাব বোধ হয়, হাসফাস করতে থাকি। যেদিকে তাকাই সবকিছু অস্বাভাবিক ঠেকে, হতাশ লাগে, কোন হিসেব মেলাতে পারি না, আমার শুধু বিভ্রম ঘটে, মনের দ্বন্দ্ব উত্তরোত্তর বেড়েই চলে। ভয়, অস্বস্তি খুব চেপে ধরলে দলছুট হয়ে অদ্ভুত এক বিষাদ বুকে মুমূর্ষু মনটা টানতে টানতে গন্তব্যে হাঁটা ধরি। 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত