| 20 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প পুনঃপাঠ সাহিত্য

ভূত চতুর্দশীর গল্প: তারানাথ তান্ত্রিকের গল্প ।  বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় 

আনুমানিক পঠনকাল: 19 মিনিট

সন্ধ্যা হইবার দেরি নাই। রাস্তায় পুরোনো বইয়ের দোকানে বই দেখিয়া বেড়াইতেছি, এমন সময়ে আমার এক বন্ধু কিশোরী সেন আসিয়া বলিল— এই যে, এখানে কী? চলো চলো, জ্যোতিষীকে হাত দেখিয়ে আসি। তারানাথ জ্যোতিষীর নাম শোনোনি? মস্ত বড়ো গুণী।

হাত দেখানোর ঝোঁক চিরকাল আছে। সত্যিকারের ভালো জ্যোতিষী কখনো দেখি নাই। জিজ্ঞাসা করিলাম— বড়ো জ্যোতিষী মানে কী? যা বলে তা সত্যি হয়? আমার অতীত ও বর্তমান বলতে পারে? ভবিষ্যতের কথা বললে বিশ্বাস হয় না?

বন্ধু বলিল— চলোই না। পকেটে টাকা আছে? দু-টাকা নেবে, তোমার হাত দেখিও। দেখ না বলতে পারে কি না।

কাছেই একটা গলির মধ্যে একতলা বাড়ির গায়ে টিনের সাইনবোর্ডে লেখা আছে—

তারানাথ জ্যোতির্বিনোদ

এই স্থানে হাত দেখা ও কোষ্ঠীবিচার করা হয়।

গ্রহশান্তির কবচ তন্ত্রোক্ত মতে প্রস্তুত করি।

আসুন ও দেখিয়া বিচার করুন।

বড়ো বড়ো রাজা-মহারাজার প্রশংসাপত্র আছে। দর্শনী নামমাত্র।

বন্ধু বলিল— এই বাড়ি।

হাসিয়া বলিলাম— লোকটা বোগাস। এত রাজা-মহারাজা যার ভক্ত, তার এই বাড়ি?

বাহিরের দরজায় কড়া নাড়িতেই ভিতর হইতে একটি ছেলে বলিয়া উঠিল— কে?

কিশোরী জিজ্ঞাসা করিল— জ্যোতিষীমশায় বাড়ি আছেন?

ভিতর হইতে খানিকক্ষণ কোনো উত্তর শোনা গেল না। তারপর দরজা খুলিয়া গেল। একটা ছোটো ছেলে উঁকি মারিয়া আমাদের দিকে সন্দিগ্ধ চোখে খানিকক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল— কোথা থেকে আসছেন?

আমাদের আসিবার উদ্দেশ্য শুনিয়া সে আবার বাড়ির ভিতর চলিয়া গেল। কিছুক্ষণ কাহারও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।

আমি বলিলাম— ব্যাপার যা দেখছি, তোমার জ্যোতিষী পাওনাদারের ভয়ে দিনরাত দরজা বন্ধ করে রাখে। ছেলেটাকে পাঠিয়ে দিয়েছে আমরা পাওনাদার কি না দেখতে। এবার ডেকে নিয়ে যাবে।

আমার কথা ঠিক হইল। একটু পরেই ছেলেটি দরজা খুলিয়া বলিল— আসুন ভেতরে।

ছোটো একটা ঘরে তক্তাপোশের উপর আমরা বসিলাম। একটু পরে ভিতরের দরজা ঠেলিয়া একজন বৃদ্ধ প্রবেশ করিল। কিশোরী উঠিয়া দাঁড়াইয়া হাত জোড় করিয়া প্রণাম করিয়া বলিল— পণ্ডিতমশায় আসুন।

বৃদ্ধের বয়স ষাট-বাষট্টির বেশি হইবে না। রং টকটকে গৌরবর্ণ, এ-বয়সেও গায়ের রঙের জৌলুস আছে। মাথার চুল প্রায় সব উঠিয়া গিয়াছে। মুখের ভাবে ধূর্ততা ও বুদ্ধিমত্তা মিশানো, নীচের চোয়ালের গড়ন দৃঢ়তাব্যঞ্জক। চোখ দু-টি বড়ো বড়ো, উজ্জ্বল। জ্যোতিষীর মুখ দেখিয়া আমার লর্ড রেডিং-এর চেহারা মনে পড়িল— উভয় মুখাবয়বের আশ্চর্য সৌসাদৃশ্য আছে। কেবল লর্ড রেডিং-এর মুখে আত্মপ্রত্যয়ের ভাব আরও অনেক বেশি, আর ইহার চোখের কোণের কুঞ্চিত রেখাবলির মধ্যে একটু ভরসা-হারানোর ভাব পরিস্ফুট;অর্থাৎ যতটা ভরসা লইয়া জীবনে নামিয়াছিলেন, এখন তাহার যেন অনেকখানিই হারাইয়া গিয়াছে— এই ধরনের একটা ভাব।

প্রথমে আমিই হাত দেখাইলাম।

বৃদ্ধ নিবিষ্টমনে খানিকটা দেখিয়া আমার মুখের দিকে চাহিয়া বলিল— আপনার জন্মদিন পনেরোই শ্রাবণ, তেরো-শো পাঁচ সাল। ঠিক? আপনার বিবাহ হয়েছে তেরো-শো সাতাশ সালে, ওই পনেরোই শ্রাবণ। ঠিক? কিন্তু জন্মমাসে বিয়ে তো হয় না, আপনার হল কেমন করে? এরকম তো দেখিনি!

কথাটা খুব ঠিক। বিশেষ করিয়া আমার দিন মনে ছিল এইজন্য যে, আমার জন্মদিন ও বিবাহের দিন একই হওয়াতে বিবাহের সময় ইহা লইয়া বেশ একটু গোলমাল হইয়াছিল। তারানাথ জ্যোতিষী নিশ্চয়ই তাহা জানে না, সে আমাকে কখনো দেখে নাই, আমার বন্ধু কিশোরী সেনও জানে না। তার সঙ্গে আলাপ মোটে দু-বছরের, তাও এক ব্রিজ খেলার আড্ডায়, সেখানে ঘনিষ্ঠ সাংসারিক কথাবার্তার কোনো অবকাশ ছিল না।

তারপর বৃদ্ধ বলিল— আপনার দুই ছেলে, এক মেয়ে। আপনার স্ত্রীর শরীর বর্তমানে বড়ো খারাপ যাচ্ছে। ছেলেবেলায় আপনি একবার গাছ থেকে পড়ে গিয়েছিলেন, কিংবা জলে ডুবে গিয়েছিলেন— মোটের উপর আপানর মস্ত বড়ো ফাঁড়া গিয়েছিল, তেরো বছর বয়সে।

কথা সবই ঠিক। লোকটার কিছু ক্ষমতা আছে দেখিতেছি। হঠাৎ তারানাথ বলিল— বর্তমানে আপনার বড়ো মানসিক কষ্ট যাচ্ছে, কিছু অর্থ নষ্ট হয়েছে। সে টাকা আর পাবেন না, বরং আরও কিছু ক্ষতিযোগ আছে।

আমি আশ্চর্য হইয়া উহারা মুখের দিকে চাহিলাম। মাত্র দু-দিন আগে কলুটোলা স্ট্রিটের মোড়ে ট্রাম হইতে নামিবার সময় পাঁচখানা নোটসুদ্ধ মানিব্যাগটি খোয়া গিয়াছে। লজ্জায় পড়িয়া কথাটা কাহাকেও প্রকাশ করি নাই। তারানাথ বোধ হয় থট-রিডিং জানে। কিন্তু আরও ক্ষতি হইবে তাহা কেমন করিয়া বলিতেছে? এটুকু বোধ হয় ধাপ্পা। যাই হোক, সাধারণ হাত দেখা গণকের মতো মন বুঝিয়া শুধু মিষ্টি মিষ্টি কথাই বলে না।

আমার সম্বন্ধে আরও অনেক কথা সেদিন সে বলিয়াছিল। লোকটার উপর আমার শ্রদ্ধা হইল। মাঝে মাঝে তার ওখানে যাইতাম। হাত দেখাইতে যে যাইতাম তাহা নয়, প্রায়ই যাইতাম আড্ডা দিতে।

লোকটার বড়ো অদ্ভুত ইতিহাস। অল্পবয়স হইতে সাধু-সন্ন্যাসীর সঙ্গে বেড়াইতে বেড়াইতে সে এক তান্ত্রিক গুরুর সাক্ষাৎ পায়। তান্ত্রিক খুব ক্ষমতাশালী ছিলেন, তাঁর কাছে কিছুদিন তন্ত্রসাধনা করিবার ফলে তারনাথও কিছু ক্ষমতা পাইয়াছিল। তাহা লইয়া কলিকাতায় আসিয়া কারবার খুলিল এবং গুরুদত্ত ক্ষমতা ভাঙাইয়া খাইতে শুরু করিল।

শেয়ার মার্কেট, ঘোড়দৌড়, ফাটকা ইত্যাদি ব্যাপারে সে তাহার ক্ষমতা দেখাইয়া শীঘ্রই এমন নাম করিয়া বসিল যে, বড়ো বড়ো মাড়োয়ারির মোটর গাড়ির ভিড়ে শনিবার সকালে তার বাড়ির গলি আটকাইয়া থাকিত— পয়সা আসিতে শুরু করিল অজস্র। যে-পথে আসিল, সেই পথেই বাহির হইয়াও গেল। হাতে একটি পয়সাও দাঁড়াইল না।

তারানাথের জীবনে তিনটি নেশা ছিল প্রবল— ঘোড়দৌড়, নারী ও সুরা। এই তিন দেবতাকে তুষ্ট রাখিতে কত বড়ো বড়ো ধনীর দুলাল যথাসর্বস্ব আহুতি দিয়া পথের ফকির সাজিয়াছে, তারানাথ তো সামান্য গণৎকার ব্রাহ্মণ মাত্র। প্রথম কয়েক বৎসরে তারানাথ যতটা পয়সা করিয়াছিল, পরবর্তী কয়েক বৎসরের মধ্যে তাহা কর্পূরের ন্যায় উবিয়া গেল, এদিকে ক্ষমতার অপব্যবহার করিতে করিতে ক্ষমতাটুকুও প্রায় গেল। ক্ষমতা যাইবার সঙ্গেসঙ্গে সত্যকার পসার নষ্ট হইল। তবুও ধূর্ততা, ফন্দিবাজি, ব্যাবসাদারি প্রভৃতি মহৎ গুণরাজির কোনোটিরই অভাব তারানাথের চরিত্রে না-থাকাতে, সে এখনও খানিকটা পসার রাখিতে সমর্থ হইয়াছে।

কিন্তু বর্তমানে কাবুলি তাড়াইবার উপায় ও কৌশল বাহির করিতেই তারানাথের দিবসের অধিকাংশ সময় ব্যয়িত হয়, তন্ত্র বা জ্যোতিষ আলোচনার সময়ই-বা কই?

আমার মতো গুণমুগ্ধ ভক্ত তারানাথ পসার নষ্ট হওয়ার পরে যে পায় নাই, একথা খুব ঠিক। আমাকে পাইয়া তাহার নিজের উপরে বিশ্বাস ফিরিয়া আসিয়াছে। সুতরাং আমার সঙ্গে তারানাথের কেমন একটা বন্ধুত্ব জন্মিল।

সে আমায় প্রায়ই বলে— তোমাকে সব শিখিয়ে দেবো। তোমাকে শিষ্য করে রেখে যাব, লোকে দেখবে তারানাথের ক্ষমতা কিছু আছে কি না। লোক পাইনি এতকাল যে তাকে কিছু দিই।

একদিন বলিল— চন্দ্রদর্শন করতে চাও? চন্দ্রদর্শন তোমায় শিখিয়ে দেবো। দুই হাতের আঙুলে দুই চোখ বুজিয়ে চেপে রেখে দুই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দিয়ে কান জোর করে চেপে চিত হয়ে শুয়ে থাক। কিছুদিন অভ্যেস করলেই চন্দ্রদর্শন হবে। চোখের সামনে পূর্ণচন্দ্র দেখতে পাবে। ওপরে আকাশে পূর্ণচন্দ্র আর নীচে একটা গাছের তলায় দু-টি পরি। তুমি যা জানতে চাইবে, পরিরা তাই বলে দেবে। ভালো করে, চন্দ্রদর্শন যে অভ্যেস করেছে, তার অজানা কিছু থাকে না।

চন্দ্রদর্শন করি আর না-করি, তারানাথের কাছে প্রায়ই যাইতাম। লোকটা এমন সব অদ্ভুত কথা বলে, যা পথে-ঘাটে বড়ো একটা শোনা তো যায়ই না, দৈনন্দিন খাটিয়া-খাওয়ার জীবনের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কও নাই। পৃথিবীতে যে আবার সে-সব ব্যাপার ঘটে, তাহা তো কোনোদিন জানা ছিল না।

একদিন বর্ষার বিকাল বেলা তারানাথের ওখানে গিয়াছি। তারানাথ পুরাতন একখানা তুলোট কাগজের পুথির পাতা উলটাইতেছে, আমাকে দেখিয়া বলিল— চলো বেলেঘাটাতে একজন বড়ো সাধু এসেছেন। দেখা করে আসি। খুব ভালো তান্ত্রিক শুনেছি। তারানাথের স্বভাবই ভালো সাধু-সন্ন্যাসীর সন্ধান করিয়া বেড়ানো; বিশেষ করিয়া সে সাধু যদি আবার তান্ত্রিক হয়, তবে তারানাথ সর্বকর্ম ফেলিয়া তাহার পিছনে দিনরাত লাগিয়া থাকিবে।

গেলাম বেলেঘাটা। সাধুর ক্ষমতার মধ্যে দেখিলাম, তিনি আমাকে যেকোনো একটা গন্ধের নাম করিতে বলিলেন; আমি বেলফুলের নাম করিতেই তিনি বলিলেন— পকেটে রুমাল আছে? বার করে দেখো।

রুমাল বার করিয়া দেখি তাহাতে বেলফুলের গন্ধ ভুর-ভুর করিতেছে। আমি সাধুর নিকট হইতে পাঁচ-ছয় হাত দূরে বসিয়াছি এবং আমার পকেটে কেহ হাত দেয় নাই। ঘরে আমি, তারানাথ ও সাধু ছাড়া অন্য কেহই নাই, রুমালখানাতে আমার নামও লেখা— সুতরাং হাত-সাফাইয়ের সম্ভাবনা আদৌ নাই।

কিছু যে আশ্চর্য না-হইলাম এমন নয়, কিন্তু যদি ধরিয়াই লই সাধুবাবাজি তান্ত্রিক শক্তির সাহায্যেই আমার রুমালে গন্ধের সৃষ্টি করিয়াছেন, তবুও এত কষ্ট করিয়া তন্ত্রসাধনার ফল যদি দুই পয়সার আতর তৈরি করায় দাঁড়ায়, সে-সাধনার আমি কোনো মূল্য দিই না। আতর তো বাজারেও কিনিতে পাওয়া যায়।

ফিরিবার সময় তারানাথ বলিল— নাঃ, লোকটা নিম্ন শ্রেণির তন্ত্রসাধনা করেছে, তারই ফলে দু-একটা সামান্য শক্তি পেয়েছে।

তাই বা পায় কী করিয়া? বৈজ্ঞানিক উপায়ে কৃত্রিম আতর প্রস্তুত করিতেই তো অনেক তোড়জোড়ের দরকার হয়, মুহূর্তের মধ্যে একজন লোক দূর হইতে আমার রুমালে যে বেলফুলের গন্ধ চালনা করিল— তাহার পিছনেও তো একটা প্রকাণ্ড বৈজ্ঞানিক অসম্ভাব্যতা রহিয়াছে, কনট্যাক্ট অ্যাট এ ডিসট্যান্স-এর গোটা সমস্যাটাই ওর মধ্যে জড়ানো। যদি ধরি হিপনটিজম, সাধুর ইচ্ছাশক্তি আমার উপর ততক্ষণ কার্যকর হইতে পারে, যতক্ষণ আমি তাহার নিকট আছি। তাহার সান্নিধ্য হইতে দূরেও আমার উপর হইতে যে হিপনটিজমের প্রভাব অক্ষুণ্ণ রহিয়াছে, সে প্রভাবের মূলে কী আছে— সেও তো আর-এক গুরুতর সমস্যা হইয়া দাঁড়ায়।

তারানাথের সঙ্গে তাহার বাড়িতে গিয়া বসিলাম। তারানাথ বলিল— তুমি এই দেখেই দেখছি আশ্চর্য হয়ে পড়লে, তবুও তো সত্যিকার তান্ত্রিক দেখনি। নিম্ন শ্রেণির তন্ত্র এক ধরনের জাদু, যাকে তোমরা বলো ব্ল্যাক-ম্যাজিক। এক সময়ে আমি ও-জিনিসের চর্চা যে না-করেছি তা নয়। ও আতরের গন্ধ আর এমন একটা কী, এমন সব ভয়ানক ভয়ানক তান্ত্রিক দেখেছি, শুনলে পরে বিশ্বাস করবে না। একজনকে জানতুম সে বিষ খেয়ে হজম করত। কিছুদিন আগে কলকাতায় তোমরাও এ-ধরনের লোক দেখেছ। সালফিউরিক অ্যাসিড, নাইট্রিক অ্যাসিড খেয়েও বেঁচে গেল, জিভে একটু দাগও লাগল না। এসব নিম্ন ধরনের তন্ত্রচর্চার শক্তি, ব্ল্যাক-ম্যাজিক ছাড়া কিছু নয়। এর চেয়েও অদ্ভুত শক্তির তান্ত্রিক দেখেছি। কী হল জানো? ছেলেবেলায় আমাদের দেশে বাঁকুড়াতে এক নামকরা সাধু ছিলেন। আমার এক খুড়িমা তাঁর কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন, আমাদের ছেলেবেলায় আমাদের বাড়ি প্রায়ই আসতেন। তিনি আমাদের খুব ভালোবাসতেন, আমাদের বাড়ি এলেই আমাদের নিয়ে গল্প করতে বসতেন, আর আমাদের প্রায়ই বলতেন— দুই চোখের মাঝখানে ভুরুতে একটা জ্যোতি আছে, ভালো করে চেয়ে দেখিস, দেখতে পাবি। খুব একমনে চেয়ে দেখিস। মাস দুই-তিন পরে আমার একদিন জ্যোতি দর্শন হল। মনে ভাবলাম— চন্দ্রদর্শনের মতো নাকি? মুখে জিজ্ঞাসা করলাম— কী ধরনের জ্যোতি?

—ঠিক নীল বিদ্যুৎশিখার মতো। প্রথম একদিন দেখলাম সন্ধ্যার কিছু আগে বাড়ির পিছনে পেয়ারাতলায় বসে সাধুর কথামতো নাকের উপর দিকে ঘণ্টা খানেক চেয়ে থাকতাম; সবদিন ঘটে উঠত না, হপ্তার মধ্যে দু-তিন দিন বসতাম। মাস তিনেক পরে প্রথম জ্যোতি দর্শন হল নীল, লিকলিকে একটা শিখা, আমার কপালের মাঝখানে ঠিক সামনে খুব স্থির; মিনিট খানেক ছিল প্রথম দিন।

এইভাবে ছেলেবেলাতেই সাধু-সন্ন্যাসী ও যোগ ইত্যাদি ব্যাপারে আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। বাড়িতে আর মন টেকে না, ঠাকুরমার বাক্স ভেঙে একদিন কিছু টাকা নিয়ে পালিয়ে গেলাম একেবারে সোজা কাশীতে।

একদিন অহল্যা বাইয়ের ঘাটে বসে আছি, সন্ধ্যা তখন উত্তীর্ণ হয়নি, মন্দিরে আরতি চলছে, এমন সময় একজন লম্বা চওড়া চেহারার সাধুকে খড়ম পায়ে দিয়ে কমণ্ডলু-হাতে ঘাটের পৈঠায় নামতে দেখলাম। তাঁর সারাদেহে এমন কিছু একটা ছিল, যা আমাকে আর অন্যদিকে চোখ ফেরাতে দিলে না। সাধু তো কতই দেখি। চুপ করে আছি, সাধুবাবাজি জল ভরে পৈঠা বেয়ে উঠতে উঠতে হঠাৎ আমার দিকে চেয়ে খাসা বাংলায় বললেন— বাবাজির বাড়ি কোথায়?

আমি বললাম— বাঁকুড়া জেলায়, মালিয়াড়া রুদ্রপুর।

সাধু থমকে দাঁড়ালেন। বললেন— মালিয়াড়া রুদ্রপুর? তারপর কী যেন একটা ভাবলেন খুব অল্পক্ষণ, একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন। তারপর বললেন— রুদ্রপুরের রামরূপ সান্যালের নাম শুনেছো? তাদের বংশে এখন কে আছে জানো?

আমাদের গ্রামে সান্যালেরা এক সময়ে খুব অবস্থাপন্ন ছিল; খুব বড়ো বাড়ি-ঘর, দরজায় হাতি বাঁধা থাকত শুনেছি; কিন্তু এখন তাদের অবস্থা খুব খারাপ। কিন্তু রামরূপ সান্যালের নাম তো কখনো শুনিনি! সন্ন্যাসীকে সসম্ভ্রমে সে-কথা বলতে তিনি হেসে উঠলেন— তোমার বয়েস আর কতটুকু? তুমি জানবে কী করে! খেয়াঘাটের কাছে শিবমন্দিরটা আছে তো?

খেয়াঘাট! রুদ্রপুরে নদীই নেই, মজে গিয়েছে কোন কালে, এখন তার ওপর দিয়ে মানুষ গোরু হেঁটে চলে যায়। তবে পুরোনো নদীর খাতের ধারে একটা বহু প্রাচীন জীর্ণ শিবমন্দির জঙ্গলাবৃত হয়ে পড়ে আছে বটে। শুনেছি সান্যালদেরই কোনো পূর্বপুরুষ ওই শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু এসব কথা ইনি কী করে জানলেন?

বিস্ময়ের সুরে বললাম— আপনি আমাদের গাঁয়ের কথা অনেক জানেন দেখছি!

সন্ন্যাসী মৃদু হাসলেন, এমন হাসি শুধু স্নেহময় বৃদ্ধ পিতামহের মুখে দেখা যায়, তাঁর অতিতরুণ অবোধ পৌত্রের কোনো ছেলেমানুষি কথার জন্য। সত্যি বলছি, সে-হাসির স্মৃতি আমি এখনও ভুলতে পারিনি। খুব উঁচু না-হলে অমন হাসি মানুষে হাসতে পারে না। তারপর খুব শান্ত সস্নেহ কৌতুকের সুরে বললেন— বাড়ি থেকে বেরিয়েছিস কেন? ধর্মকর্ম করবি বলে?

আমি কিছু উত্তর দেবার আগেই তিনি আবার বললেন— বাড়ি ফিরে যা, সংসারধর্ম করগে যা। এ-পথ তোর নয়, আমার কথা শোন।

বললাম— এমন নিষ্ঠুর কথা বলবেন না! কিছু হবে না কেন? আমার সংসারে মন নেই। সংসার ছেড়েই এসেছি।

তিনি হেসে বললেন— ওর নাম সংসার ছাড়া নয়। সংসার তুই ছাড়িসনি, ছাড়তে পারবিওনি। তুই ছেলেমানুষ, নির্বোধ; কিছু বোঝবার বয়েস হয়নি। যা বাড়ি যা। মা-বাপের মনে কষ্ট দিসনে।

কথা শেষ করে তিনি চলে যাচ্ছেন দেখে আমি বললুম— কিন্তু আমাদের গাঁয়ের কথা কী করে জানলেন বলবেন না? দয়া করে বলুন—

তিনি কোনো কথার উত্তর না-দিয়ে জোরে জোরে পা ফেলে চলতে লাগলেন— আমিও নাছোড়বান্দা হয়ে তাঁর পিছু নিলাম। খানিক দূর গিয়ে তিনি আমাকে দাঁড়িয়ে বললেন— কেন আসছিস?

—আপনাকে ছাড়ব না। আমি কিছু চাই নে, শুধু আপনার সঙ্গ চাই।

তিনি সস্নেহে বললেন— আমার সঙ্গে এলে তোর কোনো লাভ হবে না। তোকে সংসার করতেই হবে। তোর সাধ্য নেই অন্য পথে যাবার। যা চলে যা— তোকে আশীর্বাদ করছি সংসারে তোর উন্নতি হবে।

আর সাহস করলুম না তাঁকে অনুসরণ করতে। কী একটা শক্তি আমার ইচ্ছা সত্ত্বেও যেন তাঁর পিছনে পিছনে যেতে আমায় বাধা দিলে। দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ পরে সামনের দিকে চেয়ে দেখি তিনি নেই। বুঝতে পারলুম না কোন গলির মধ্যে তিনি ঢুকে পড়েছেন বা কোনদিকে গেলেন।

প্রসঙ্গক্রমে বলে নিই, অনেক দিন পরে বাড়ি ফিরে এসে দেশের খুব বৃদ্ধ লোকদের কাছে খোঁজ নিয়েও রামরূপ সান্যালের কোনো হদিশ মেলাতে পারলাম না। সান্যালদের বাড়ির ছেলে-ছোকরার দল তো কিছুই বলতে পারে না। ওদের এক শরিক জলপাইগুড়িতে ডাকঘরে কাজ করতেন, তিনি পেনশন নিয়ে সেবার শীতকালে বাড়ি এলেন। কথায় কথায় তাঁকে একদিন প্রশ্নটা করাতে তিনি বললেন— দেখো, আমার ছেলেবেলায় বড়োজ্যাঠামশায়ের কাছে একখানা খাতা দেখেছি, তাতে আমাদের বংশের অনেক কথা লেখা ছিল। বড়োজ্যাঠামশায়ের ওই সব শখ ছিল, অনেক কষ্ট করে নানা জায়গায় হাঁটাহাঁটি করে বংশের কুলজি জোগাড় করতেন। তাঁর মুখে শুনেছি চার-পাঁচ পুরুষ আগে আমাদেরই বংশের রামরূপ সান্যাল নদীর ধারে ওই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। রামরূপ সাধক-পুরুষ ছিলেন, বিবাহ করেছিলেন, ছেলেমেয়েও হয়েছিল; কিন্তু সংসারে তিনি বড়ো একটা লিপ্ত ছিলেন না। রামরূপের বড়ো ভাই ছিলেন রামনিধি, প্রথম যৌবনেই অবিবাহিত অবস্থায় তিনি সন্ন্যাসী হয়ে গৃহত্যাগ করেন, আর কখনো দেশে ফেরেননি। অন্তত দেড়-শো বছর আগের কথা হবে।

জিজ্ঞাসা করলুম— ওই শিবমন্দিরটা ওরকম মাঠের মধ্যে বেখাপ্পা জায়গায় কেন?

—তা নয়। ওখানে তখন বহতা নদী ছিল। খুব স্রোত ছিল। বড়ো বড়ো কিস্তি চলত। কোনো নৌকো একবার ওই মন্দিরের নীচের ঘাটে মারা পড়ে বলে ওর নাম লা-ভাঙার খেয়াঘাট।

প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলুম— খেয়াঘাট?

তিনি অবাক হয়ে আমার দিকে চেয়ে বললেন— হ্যাঁ জ্যাঠামশায়ের মুখে শুনেছি, বাবার মুখে শুনেছি, তা ছাড়া আমাদের পুরোনো কাগজপত্রে আছে, শিবমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল লা-ভাঙার খেয়াঘাটের ওপর। কেন বলো তো, এসব কথা তোমার জানবার কী দরকার বল? বই-টই লিখছ না কী?

ওদের কাছে কোনো কথা বলিনি, কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস হল এবং সে বিশ্বাস আজও আছে যে, কাশীর সেই সন্ন্যাসী রামরূপের দাদা রামনিধি নিজেই। কোনো অদ্ভুত যৌগিক শক্তির বলে দেড়-শো বছর পরেও বেঁচে আছেন।

বাড়ি থেকে কিছুদিন পরে আবার সাধু-সন্ন্যাসীর সন্ধানে বেরই। বীরভূমের এক গ্রামে শুনলাম সেখানকার শ্মশানে এক পাগলি থাকে, সে আসলে খুব বড়ো তান্ত্রিক সন্ন্যাসিনী। পাগলির সঙ্গে দেখা করলাম নদীর ধারে শ্মশানে। ছেঁড়া একটা কাঁথা জড়িয়ে পড়ে আছে, যেমন ময়লা কাপড়চোপড় পরনে, তেমনই মলিন জটপাকানো চুল। আমাকে দেখেই সে গেল মহা চটে। বলল— বেরো এখান থেকে, কে বলেছে তোকে এখানে আসতে?

ওর আলুথালু বিকট মলিন চেহারা দেখে মনে যে ভাব এসেছিল, সেটাকে অতিকষ্টে চেপে বললাম— মা, আমাকে আপনার শিষ্য করে নিন, অনেক দূর থেকে এসেছি, দয়া করুন আমার ওপর!

পাগলি চেঁচিয়ে উঠে বললে— পালা এখান থেকে! বিপদে পড়বি! আঙুল দিয়ে গ্রামের দিকে দেখিয়ে বললে— যা—

নির্জন শ্মশান, ভয় হল ওর মূর্তি দেখে, কী জানি মারবে-টারবে নাকি— পাগল মানুষকে বিশ্বাস নেই। সেদিন চলে এলাম, কিন্তু আবার গেলাম তার পরদিন।

পাগলি বললে— আবার কেন এলি?

বললাম— মা, আমাকে দয়া করো—

পাগলি বললে— দূর হ— দূর হ— বেরো এখান থেকে—

তারপর রেগে আমায় মারলে এক লাথি। বললে— ফের যদি আসিস তবে বিপদে পড়বি, খুব সাবধান!

রাত্রে শুয়ে শুয়ে ভাবলাম, না, এখান থেকে চলে যাই, আর এখানে নয়। কী এক পাগলের পাল্লায় পড়ে প্রাণটা যাবে দেখছি কোনোদিন।

শেষ রাত্রে স্বপ্ন দেখলাম, পাগলি এসে যেন আমার সামনে দাঁড়িয়েছে। সে চেহারা আর নেই, মৃদু হাসি-হাসি মুখ, আমায় যেন বললে— লাথিটা খুব লেগেছে, না রে? তা রাগ করিসনে, কাল যাস আমার ওখানে।

সকালে উঠেই আবার গেলাম। ওমা, স্বপ্ন-টপ্ন সব মিথ্যে, পাগলি আমায় দেখে মারমূর্তি হয়ে শ্মশানের একখানা পোড়া কাঠ আমার দিকে ছুড়ে মারলে! আমিও তখন মরিয়া হয়েছি, বললাম— তুমি তবে রাত্রে আমায় বলতে গিয়েছলে কেন স্বপ্নে? তুমিই তো আমায় আসতে বললে, তাই এলাম।

পাগলি খিলখিল করে হেসে উঠল। তোকে বলতে গিয়েছিলাম, স্বপ্নে? তোর মুণ্ডু চিবিয়ে খেতে গিয়েছিলাম! হি— হি— হি— যা বেরো—

কেন জানি না, এই পাগলি আমাকে অদ্ভুতভাবে আকৃষ্ট করেছে, আমি বুঝলাম তখনি সেখানে দাঁড়িয়ে। এ-যতই আমাকে বাইরে তাড়িয়ে দেবার ভান করুক, আমার মনে হল ভেতরে ভেতরে এ-আমায় এক অজ্ঞাত শক্তির বলে টানছে।

হঠাৎ সে বললে— বোস এখানে।

আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলে। তার আঙুল তুলে দেখিয়ে দেবার ভঙ্গিটা যেন খুব রাজা-জমিদারের ঘরের কর্ত্রীর মতো। তার সে হুকুম পালন না-করে যে উপায় নেই।

কাজেই বসতে হল।

সে বললে— কেন এখানে এসে এসে বিরক্ত করিস বল তো? তোর দ্বারা কী হবে, কিছু হবে না। তোর সংসারে এখনও পুরো ভোগ রয়েছে।

আমি চুপ করেই থাকি। খানিকটা বাদে পাগলি বললে— আচ্ছা কিছু খাবি? আমার এখানে যখন এসেছিস, তার ওপর আবার বামুন, তখন কিছু খাওয়ানো দরকার। বল কী খাবি?

পাগলির শক্তি কত দূর দেখবার জন্য বড়ো কৌতূহল হল। এর আগে লোকের মুখে শুনে এসেছি, যা চাওয়া যায় সাধু-সন্ন্যাসীরা এনে দিতে পারে। কলকাতার গন্ধ-বাবাজির কাছে খানিকটা যদিও দেখেছি, সে আমায় ততটা আশ্চর্য বলে মনে হয়নি। বললাম— খাবো অমৃতি, জিলিপি, ক্ষীরের বরফি আর মর্তমান কলা।

পাগলি এক আশ্চর্য ব্যাপার করল। শ্মশানের কতকগুলো পোড়া কয়লা পাশেই পড়ে ছিল, হাতে তুলে নিয়ে বললে— এই নে খা, ক্ষীরের বরফি—

আমি তো অবাক! ইতস্তত করছি দেখে সে পাগলের মতো খিলখিল করে কী একরকম অসম্বদ্ধহাসি হেসে বললে— খা— খা— ক্ষীরের বরফি খা—

আমার মনে হল এ তো দেখছি পুরো পাগল, কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। এর কথায় মড়া-পোড়ানো কয়লা মুখে দেবো— ছিঃ ছিঃ; কিন্তু আমার তখন আর ফেরবার পথ নেই, অনেক দূর এগিয়েছি। দিলুম সেই কয়লা মুখে পুরে, যা থাকে কপালে! পরক্ষণেই থু-থু করে সেই বিশ্রী, বিস্বাদ চিতার কয়লার টুকরো মুখ থেকে বার করে ফেলে দিলুম। পাগলি আবার খিলখিল করে হেসে উঠল।

রাগে-দুঃখে আমার চোখে তখন জল এসেছে। কী বোকামি করেছি এখানে এসে— এ পাগলই, পাগল ছাড়া আর কিছু নয়; বদ্ধ উন্মাদ, পাড়াগাঁয়ের ভূতেরা সাধু বলে নাম রটিয়েছে।

পাগলি হাসি থামিয়ে বিদ্রূপের সুরে বললে— খেলি রাবড়ি, মর্তমান কলা? পেটুক কোথাকার! পেটের জন্যে এসেছ শ্মশানে আমার কাছে? দূর হ জানোয়ার— দূর হ! আমার ভয়ানক রাগ হল। অমন নিষ্ঠুর কথা আমায় কখনো কেউ মুখের ওপর বলেনি। একটিও কথা না-বলে আমি তখনই সেখান থেকে উঠে চলে এলাম। বললে বিশ্বাস করবেন না, আবার সেদিন শেষরাত্রে পাগলিকে স্বপ্নে দেখলাম, আমার শিয়রে দাঁড়িয়ে হাসি-হাসি মুখে সে বলছে— রাগ করিসনে। আসিস আজ, রাগ করে না, ছিঃ—

এখনও পর্যন্ত আমার সন্দেহ হয় পাগলিকে স্বপ্নে দেখেছিলাম, না জাগ্রত অবস্থায় দেখেছিলাম!

যাহোক জেগে উঠে আমার রাগ রইল না। পাগলি আমায় জাদু করলে নাকি?

গেলাম আবার দুপুরে। এবার কিন্তু তার মূর্তি ভারি প্রসন্ন। বললে— আবার এসেছিস দেখছি। আচ্ছা নাছোড়বান্দা তো তুই!

আমি বললাম— কেন বাঁদর নাচাচ্ছ আমায় নিয়ে? দিনে অপমান করে বিদেয় করে আবার রাতে গিয়ে আসতে বলো! এরকম হয়রান করে তোমার লাভ কী?

পাগলি বললে— পারবি তুই? সাহস আছে? ঠিক যা বলব তা করবি?

বললাম— আছে। যা বলবে তাই করব। দেখোই না-পরীক্ষা করে। সে একটা অদ্ভুত প্রস্তাব করলে। সে বললে— আজ রাত্রে আমায় তুই মেরে ফেল। গলা টিপে মেরে ফেল। তারপর আমার মৃতদেহের ওপর বসে তোকে সাধনা করতে হবে। নিয়ম বলে দেবো। বাজার থেকে মদ কিনে নিয়ে আয়। আর দুটো চাল-ছোলা ভাজা। মাঝে মাঝে আমার মৃতদেহ হাঁ করে বিকট চিৎকার করে উঠবে যখন, তখন আমার মুখে এক ঢোক মদ আর দুটো চাল-ভাজা দিবি। ভোর রাত পর্যন্ত এমন মড়ার ওপর বসে মন্ত্রজপ করতে হবে। রাত্রে হয়তো অনেকরকম ভয় পাবি। যারা এসে ভয় দেখাবে, তারা কেউ মানুষ নয়। কিন্তু তাতে ভয় করিস না। ভয় পেলে সাধনা তো মিথ্যা হবেই, প্রাণ পর্যন্ত হারাতে পারিস। কেমন, রাজি?

ও যে এমন কথা বলবে তা বুঝতে পারিনি। কথা শুনে তো অবাক হয়ে গেলাম। বললাম— সব পারব, কিন্তু মানুষ খুন করা আমার দিয়ে হবে না। আর তুমিই-বা আমার জন্যে মরবে কেন?

পাগলি রেগে বললে— তবে এখানে মরতে এসেছিলি কেন মুখপোড়া? বেরো দূর হ—

আরও নানারকম অশ্লীল গালাগালি দিলে। ওর মুখে কিছু বাধে না, মুখ বড়ো খারাপ। আমি আজকাল ওগুলো আর তত গায়ে মাখিনে, গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে। বললাম— রাগ করছ কেন? একটা মানুষকে কু করা কী মুখের কথা? আমি না ভদ্রলোকের ছেলে?

পাগলি আবার মুখ বিকৃত করে বললে— ভদ্দরলোকের ছেলে? তবে এ-পথে এসেছিল কেন রে, ও অল্পপ্পেয়ে ঘাটের মড়া? তন্ত্র-মন্ত্রের সাধনা ভদ্রলোকের ছেলের কাজ নয়— যা, গিয়ে কামিজ চাদর পরে হৌসে চাকরি কর গিয়ে— বেরো—

বললাম— তুমি শুধু রাগই করো। পুলিশের হাঙ্গামার কথাটা তো ভাবছ না! আমি যখন ফাঁসি যাব, তখন ঠেকাবে কে?

মনে মনে আবার সন্দেহ হল, না এ নিতান্তই পাগল, বদ্ধ উন্মাদ। এর কাছে এসে শুধু এতদিন সময় নষ্ট করেছি ছাড়া আর কিছু না।

তখনই মনে পড়ল পাগলির মুখে শুদ্ধ সংস্কৃত শ্লোক শুনেছি, তন্ত্রের কথা শুনেছি। সময় সময়ে সত্যই এমন কথা বলে যে, ওকে বিদুষী বলে সন্দেহ হয়।

সেইদিন থেকে পাগলি আমার ওপর প্রসন্ন হল। বিকেলে যখন গেলাম, তখন আপনিই ডেকে বললে— আমার রাগ হলে আর জ্ঞান থাকে না, তোকে ও-বেলা গালাগালি দিয়েছি, কিছু মনে করিস নে। ভালোই হয়েছে, তুই সাধনা করতে চাসনি। ওসব নিম্ন তন্ত্রের সাধনা। ওতে মানুষের কতকগুলো শক্তি লাভ হয়, তা ছাড়া আর কিছু হয় না।

বললাম— কী ভাবে শক্তি লাভ হয়? পাগলি বললে— পৃথিবীতে নানারকম জীব আছে, তাদের চোখে দেখতে পাওয়া যায় না। মানুষ মরে দেহ শূন্য হলে চোখে দেখা যায় না, আমরা তাদের বলি ভূত। এ ছাড়া আরও অনেকরকম প্রাণী আছে, তাদের বুদ্ধি মানুষের চেয়ে কম, কিন্তু শক্তি বেশি। এদেরও দেখা যায় না। তন্ত্রে এদের ডাকিনি, শাঁখিনি এইসব নাম। এরা কখনো মানুষ ছিল না, মানুষ মরে যেখানে যায়, এরা সেখানকার প্রাণী। মুসলমান ফকিরেরা এদের জিন বলে। এদের মধ্যে ভালো-মন্দ দুই-ই আছে। তন্ত্রসাধনার বলে এদের বশ করা যায়। তখন যা বলা যায় এরা তাই করে। করতেই হবে, না-করে উপায় নেই। কিন্তু এদের নিয়ে খেলা করার বিপদ আছে। অসাবধান তুমি যদি হয়েছ, তোমাকে মেরে ফেলতে পারে।

অবাক হয়ে ওর কথা শুনছিলাম। এসব কথা আর কখনো শুনিনি। এর মতো পাগলের মুখেই এ-কথা সাজে। আর যেখানে বসে শুনছি, তার পারিপার্শ্বিক অবস্থাও এই কথার উপযুক্ত বটে। গ্রাম্য শ্মশান, একটা বড়ো তেঁতুলগাছ আর এক দিকে কতকগুলো শিমুল গাছ। দু-চার দিন আগের একটা চিতার কাঠকয়লা আর একটা কলসি জলের ধারে পড়ে আছে। কোনোদিকে লোকজন নেই। অজ্ঞাতসারে আমার গা যেন শিউরে উঠল।

পাগলি তখনও বলে যাচ্ছে। অনেক সব কথা, অদ্ভুত ধরনের কথা।

—এক ধরনের অপদেবতা আছে, তন্ত্রে তাদের বলে হাঁকিনি। তারা অতি ভয়ানক জীব। বুদ্ধি মানুষের চেয়ে অনেক কম, দয়া-মায়া বলে পদার্থ নেই তাদের। পশুর মতো মন। কিন্তু তাদের ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। এরা যেন প্রেতলোকের বাঘ-ভালুক। ওদের দিয়ে কাজ বেশি হয় বলে যাদের বেশি দুঃসাহস, এমন তান্ত্রিকেরা হাঁকিনিমন্ত্রে সিদ্ধ হবার সাধনা করে। হলে খুবই ভালো, কিন্তু বিপদের ভয়ও পদে পদে। তাদের নিয়ে যখন-তখন খেলা করতে নেই, তাই তোকে বারণ করি। তুই বুঝিস নে, তাই রাগ করিস।

কৌতূহল আর সংবরণ করতে না-পেরে জিজ্ঞাসা করলাম— তুমি তাহলে হাঁকিনি মন্ত্রে সিদ্ধ, না? ঠিক বলো!

পাগলি চুপ করে রইল।

আমি তাকে আর প্রশ্ন করলাম না, বুঝলাম পাগলি এ-কথা কিছুতেই বলবে না। কিন্তু এ-বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ রইল না।

পরদিন গ্রামের লোক আমাকে পাগলির সম্বন্ধে অনেক কথা বললে। বললে— আপনি ওখানে যাবেন না অত ঘন ঘন। পাগলি ভয়ানক মানুষ, ওর মধ্যে এমন শক্তি আছে, আপনার একেবারে সর্বনাশ করে দিতে পারে। ওকে বেশি ঘাঁটাবেন না মশায়। গাঁয়ের কোনো লোক ওর কাছেও ঘেঁষে না। বিদেশি লোক, মারা পড়বেন শেষে?

মনে ভাবলাম, কী আমার করবে, যা করবার তা করেছে। তার কাছে না-গিয়ে থাকবার শক্তি আমার নেই।

তারপরে একদিন যা হল, তা বিশ্বাস করবেন না। একদিন সন্ধের পরে পাগলির কাছে গিয়েছি, কিন্তু এমনভাবে গিয়েছি, পাগলি না-টের পায়। পাগলির সেই বটতলায় গিয়ে হঠাৎ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

বটতলায় পাগলি বসে নেই, তার বদলে একটি ষোড়শী বালিকা গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে সামনের দিকে চেয়ে রয়েছে। চোখের ভুল নয় মশায়, আমার তখন কাঁচা বয়েস, চোখে ঝাপসা দেখবার কথা নয়, স্পষ্ট দেখলাম।

ভাবলাম, তাই তো! এ আবার কে এল? যাই, কী না-যাই?

দু-এক পা এগিয়ে সংকোচের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম— মা, তিনি কোথায় গেলেন?

মেয়েটি হেসে বললে— কে?

—সেই তিনি, এখানে থাকতেন।

মেয়েটি খিলখিল করে হেসে বললে— আ মরণ, কে তার নামটাই বল না, নাম বলতে লজ্জা হচ্ছে নাকি?

আমি চমকে উঠলাম। সেই পাগলিই তো! সেই হাসি, সেই কথা বলবার ভঙ্গি। এই ষোড়শী বালিকার মধ্যে সেই পাগলি রয়েছে লুকিয়ে। সে এক অদ্ভুত আকৃতি— ভেতরে সেই পরিচিতা পাগলি, বাহিরে এক অপরিচিতা রূপসী ষোড়শী বালিকা।

মেয়েটি হেসে ঢলে পড়ে আর কী। বললে— এসো না, বসো না, এসো পাশে— লজ্জা কী? আহা, আর অত লজ্জায় দরকার নেই! এসো—

হঠাৎ আমার বড়ো ভয় হল। মেয়েটির রকম-সকম আমার ভালো বলে মনে হল না। তা ছাড়া আমার দৃঢ় বিশ্বাস হল এ পাগলিই, আমায় কোনো বিপদে ফেলবার চেষ্টায় আছে।

ফিরে চলে যাচ্ছি, এমন সময় পরিচিত কণ্ঠের ডাক শুনে থমকে দাঁড়ালাম। দেখি, বটতলায় পাগলি বসে আছে— আর কেউ কোথাও নেই।

আমার তখনও ভয় যায়নি। ভাবলাম আজ আর কিছুতেই এখানে থাকব না, আজ ফিরে যাই।

পাগলি বললে— এসো, বসো।

বললাম— তুমি ও-রকম ছোটো মেয়ে সেজেছিলে কেন? তোমার মতলবখানা কী?

পাগলি বললে— আ মরণ, ঘাটের মড়া আবোল-তাবোল বকছে!

বললাম— না, সত্যি কথা বলছি, আমায় কোনো ভয় দেখিও না। যখন তোমায় মা বলে ডেকেছি।

পাগলি বললে— শোন তবে। তুই সে-রকম নোস। তন্ত্রের সাধনা তোকে দিয়ে হবে না, অত সাধু সেজে থাকবার কাজ নয়। থাক, তোকে দু-একটা কিছু দেবো, তাতেই তুই করে খেতে পারবি। একটা মড়া চাই। আসবে শিগগির অনেক মড়া, এই ঘাটেই আসবে। ততদিন অপেক্ষা কর। কিন্তু যা বলে দেবে তাই করবি। রাজি আছিস? শবসাধনা ভিন্ন কিছু হবে না।

তখন আমি মরিয়া হয়ে উঠেছি। আমি ভীতু লোক ছিলাম না কোনোকালেই, তবুও কখনো মড়ার উপরে বসে সাধনা করব— এ-কল্পনাও করিনি। কিন্তু রাজি হলাম পাগলির এই প্রস্তাবে। বললাম— বেশ, তুমি যা বলবে তাই করব। কিন্তু পুলিশের হাঙ্গামার মধ্যে যেন না-পড়ি। আর সব তাতে রাজি আছি।

একদিন সন্ধের কিছু আগে গিয়েছি। সেদিন দেখলাম পাগলির ভাবটা যেন কেমন কেমন। ও আমায় বললে— একটা মড়া পাওয়া গিয়েছে, চুপি চুপি এসো।

জলের ধারে বড়ো একটা পাকুড় গাছের শেকড় জলের মধ্যে অনেকখানি নেমে গিয়েছে। সেই জড়ানো-পাকানো জলমগ্ন শেকড়ের মধ্যে একটা ষোলো-সতেরো বছরের মেয়ের মড়া বেধে আছে। কোনো ঘাট থেকে ভেসে এসেছে বোধ হয়।

—তোল মড়াটা, শেকড় বেয়ে নেমে যা। জলের মধ্যে মড়া হালকা হবে। ওকে তুলে শেকড়ে রেখে দে। ভেসে না-যায়।

তখন কী করছি জ্ঞান ছিল না। মড়ার পরনে তখনও কাপড়, সেই কাপড় জড়িয়ে গিয়েছে শেকড়ের মধ্যে। আমাকে বিশেষ বেগ পেতে হল না, অল্প চেষ্টাতেই সেটা টেনে তুলে ফেললাম।

পাগলি বললে— মড়ার ওপর বসে তোকে সাধনা করতে হবে— ভয় পাবিনে তো? ভয় পেয়েছ কী মরেছ!

আমি হঠাৎ আশ্চর্য হয়ে চিৎকার করে উঠলাম। মড়ার মুখ তখন আমার নজরে পড়েছে। সেদিনকার সেই ষোড়শী বালিকা। অবিকল সেই মুখ, সেই চোখ; কোনো তফাত নেই।

পাগলি বললে— চেঁচিয়ে মরছিস কেন, ও আপদ!

আমার মাথার মধ্যে কেমন গোলমাল হয়ে গিয়েছে তখন। পাগলিকে দেখে তখন আমার অত্যন্ত ভয় হল। মনে ভাবলাম, এ অতি ভয়ানক লোক দেখছি! গাঁয়ের লোক ঠিক-ই বলে!

কিন্তু ফিরবার পথ তখন আমার বন্ধ। পাগলি আমায় যা-যা করতে বললে, সন্ধে থেকে আমাকে তা করতে হল।

শবসাধনার অনুষ্ঠান সম্বন্ধে সবকথা তোমায় বলবারও নয়। সন্ধের পর থেকেই আমি শবের ওপর আসন করে বসলাম। পাগলি একটা অর্থশূন্য মন্ত্র আমাকে বললে— সেটাই জপ করতে হবে অনবরত। আমার বিশ্বাস হয়নি যে এতে কিছু হয়। এমনকী, ও যখন বললে— যদি কোনো বিভীষিকা দেখো তবে ভয় পেয়ো না, ভয় পেলেই মরবে— তখনও আমার মনে বিশ্বাস হয়নি।

রাত্রি দুপুর হল ক্রমে। নির্জন শ্মশান, কেউ কোনোদিকে নেই, নীরন্ধ্র অন্ধকারে দিকবিদিক লুকিয়েছে। পাগলি কোথায় গেল, তাও আমি দেখিনি।

হঠাৎ একপাল শেয়াল ডেকে উঠল নদীর ধারে একটা কষাড় ঝোপের আড়ালে। শেয়ালের ডাক তো কতই শুনি, কিন্তু সেই ভয়ানক শ্মশানে এক টাটকা মড়ার ওপর বসে সেই শেয়ালের ডাকে আমার সর্বাঙ্গ শিউরে উঠল।

ঠিক সঙ্গেসঙ্গে একটা ব্যাপার ঘটল। বিশ্বাস করা আর না-করা তোমার ইচ্ছে; কিন্তু তোমার কাছে মিথ্যে বলে আমার কোনো স্বার্থ নেই। আমি তারানাথ জ্যোতিষী, বুঝি কেবল পয়সা— তুমি আমাকে এক পয়সা দেবে না। সুতরাং তোমার কাছে মিথ্যে বলতে যাবো কেন?

শেয়ার ডাকার সঙ্গেসঙ্গে আমার মনে হল শ্মশানের নীচে নদীজল থেকে দলে দলে সব বউ-মানুষরা উঠে আসছে— অল্পবয়সি বউ, মুখে ঘোমটা টানা, জল থেকে উঠে এল অথচ কাপড় ভিজে নয় কারও। দলে-দলে— একটা, দুটো, পাঁচটা, দশটা, বিশটা—

তারা সকলে এসে আমায় ঘিরে দাঁড়াল— আমি একমনে মন্ত্র জপ করছি। ভাবছি— যা হয় হবে!

একটু পরে ভালো করে চাইতে গিয়ে দেখি, আমার চারপাশে একটাও বউ নয়, সব কররা পাখি, বীরভূমে নদীর চরে যথেষ্ট হয়। দু-পায়ে গম্ভীরভাবে হাঁটে, ঠিক যেন মানুষের মতো।

এক মুহূর্তে মনটা হালকা হয়ে গেল— তাই বল! হরি হরি! পাখি!

চিন্তাটা আমার সম্পূর্ণ শেষ হয়নি— পরক্ষণেই আমার চারপাশে মেয়েগলায় কারা খলখল করে হেসে উঠল।

হাসির শব্দে আমার গায়ের রক্ত আরও হিম হয়ে জমে গেল যেন। চেয়ে দেখি তখন একটাও পাখি নয়, সবই অল্পবয়সি বউ। তারা তখন সবাই একযোগে ঘোমটা খুলে আমার দিকে চেয়ে আছে। আর তাদের চারদিকে, সেই বড়ো মাঠের যেদিকে তাকাই, অসংখ্য নরকঙ্কাল দূরে, নিকটে, ডাইনে, বাঁয়ে, অন্ধকারের মধ্যে সাদা সাদা দাঁড়িয়ে আছে। কত কালের পুরোনো জীর্ণ হাড়ের কঙ্কাল, তাদের অনেকগুলোর হাতের সব আঙুল নেই, অনেকগুলোর হাড় রোদে-জলে চটা উঠে ক্ষয়ে গিয়েছে, কোনোটার মাথায় খুলি ফুটো, কোনোটার পায়ের নলির হাড় ভেঙে বেঁকে আছে। তাদের মুখও নানাদিকে ফেরানো— দাঁড়াবার ভঙ্গি দেখে মনে হয়, কেউ যেন তাদের বহু যত্নে তুলে ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। কঙ্কালের আড়ালে পেছন থেকে যে-লোকটা এদের খাড়া করে রেখেছে, সে যেই ছেড়ে দেবে অমনি কঙ্কালগুলো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে গিয়ে জীর্ণ ভাঙাচোরা তোবড়ানো নোনাধরা হাড়ের রাশি স্তূপাকার হয়ে উঠবে। অথচ তারা যেন সবাই সজীব, সকলেই আমাকে পাহারা দিচ্ছে, আমি যেন প্রাণ নিয়ে এ-শ্মশান থেকে পালাতে না-পারি। হাড়ের হাত বাড়িয়ে একযোগে সবাই যেন আমার গলা টিপে মারবার অপেক্ষায় আছে।

সোজা দৌড় দেবো ভাবছি, এমন সময় দেখি আমার সামনে যেন এক অতিরূপসী বালিকা আমার পথ আগলে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে। এ আবার কে? যাহোক, সবরকম ব্যাপারের জন্যে আজ প্রস্তুত না-হয়ে আর শবসাধনা করতে নামিনি। আমি কিছু বলবার আগে মেয়েটি হেসে হেসে বললে— আমি ষোড়শী, মহাবিদ্যাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, আমায় তোমার পছন্দ হয় না?

মহাবিদ্যা-টহাবিদ্যার নাম শুনেছিলাম বটে পাগলির কাছে, কিন্তু তাঁদের তো শুনেছি অনেক সাধনা করেও দেখা মেলে না, আর অত সহজে উনি…বললাম— আমার মহা সৌভাগ্য যে এসেছেন। আমার জীবন ধন্য হল।

মেয়েটি বললে— তবে তুমি মহাডামরী সাধনা করছ কেন?

—আজ্ঞে, আমি তো জানিনে কোন সাধনা কীরকম? পাগলি আমায় যেমন বলে দিয়েছে, তেমনি করছি।

—বেশ, মহাডামরী সাধনা তুমি ছাড়। ও মন্ত্র জপ করো না। যখন দেখা দিয়েছি, তখন তোমার আর কিছুতেই দরকার নেই। তুমি মহাডামরী ভৈরবীকে দেখনি— অতিবিকট তার চেহারা, তুমি ভয় পাবে। ছেড়ে দাও ও মন্ত্র।

সাহসে ভর করে বললাম— সাধনা করে আপনাদের আনতে হয় শুনেছি, আপনি এত সহজে আমাকে দেখা দিলেন কেন?

—তোমার সন্দেহ হচ্ছে?

আমার মনে হল এই মুখ আগে কোথাও দেখেছি, কিন্তু তখন আমার মাথার গোলমাল হয়ে গিয়েছে, কিছুই ঠিক করতে পারলাম না। বললাম— সন্দেহ নয়, কিন্তু বড়ো আশ্চর্য হয়ে গিয়েছি। আমি কিছুই জানিনে কে আপনারা! যদি অপরাধ করি মাপ করুন, কিন্তু কথাটার জবাব যদি পাই—

বালিকা বললে— মহাডামরীকে চেন না? আমাকেও চেন না? তাহলে আর চিনে কাজ নেই। এসেছি কেন জিজ্ঞেস করছ? দিব্যেঘ পথের নাম শোনোনি তন্ত্রে? পাষণ্ডদলনের জন্যে ওই পথে আমরা পৃথিবীতে নেমে আসি। তোমার মন্ত্রে দিব্যেঘ পথে সাড়া জেগেছে। তাই ছুটে দেখতে এলাম।

কথাটা ভালো বুঝতে পারলাম না। ভয়ে ভয়ে বললাম— তবে আমি কি খুবই পাষণ্ড?

বালিকা খিলখিল করে হেসে উঠল।

বললে— তোমার বেলা এসেছি সম্প্রদায় রক্ষার জন্য, অত ভয় কীসের! আমি না তোমাকে লাথি মেরেছি? শ্মশানের পোড়া কাঠ ছুড়ে মেরেছি? তোমাকে পরীক্ষা না-করে কি সাধনার নিয়ম বলে দিয়েছি তোমাকে?

আমি ভয়ানক আশ্চর্য হয়ে গিয়েছি, বলে কী?

মেয়েটি আবার বললে— কিন্তু মহাডামরীর বড়ো ভীষণ রূপ, তোমার যেমন ভয়, সে তুমি পারবে না— ও ছেড়ে দাও—

—আপনি যখন বললেন তাই দিলাম।

—ঠিক কথা দিলে?

—দিলাম। এ-সময়ে যে-শবদেহের উপর বসে আছি, তার দিকে আমার নজর পড়ল। পড়তেই ভয়ে ও বিস্ময়ে আমার সর্বশরীর কেমন হয়ে গেল।

শবদেহের সঙ্গে সম্মুখের ষোড়শী রূপসীর চেহারার কোনো তফাত নেই। একই মুখ, একই রং, একই বয়েস।

বালিকা ব্যঙ্গের হাসি হেসে বললে— চেয়ে দেখেছ কী?

আমি কথার কোনো উত্তর দিলাম না। কিছুক্ষণ থেকে একটা সন্দেহ আমার মনে ঘনিয়ে এসেছিল, সেটা মুখেই প্রকাশ করে বললাম— কে আপনি? আপনি কী শ্মশানের পাগলি নাকি?

একটা বিকট বিদ্রূপের হাসিতে রাত্রির অন্ধকার চিরে-ফেঁড়ে চৌচির হয়ে গেল।

সঙ্গেসঙ্গে মাঠময় নরকঙ্কালগুলো হাড়ের হাতে তালি দিতে দিতে এঁকে-বেঁকে উদ্দাম নৃত্য শুরু করলে। আর অমনি সেগুলো নাচের বেগে ভেঙে ভেঙে পড়তে লাগল। কোনো কঙ্কালের হাত খসে গেল, কোনোটার মেরুদণ্ড, কোনোটার কপালের হাড়, কোনোটার বুকের পাঁজরাগুলো— তবুও তাদের নৃত্য সমানেই চলেছে। এদিকে হাড়ের রাশি উঁচু হয়ে উঠল, আর হাড়ে হাড়ে লেগে কী বীভৎস ঠক-ঠক শব্দ!

হঠাৎ আকাশের এক প্রান্ত যেন জড়িয়ে-গুটিয়ে গেল কাগজের মতো, আর সেই ছিদ্রপথে যেন এক বিকটমূর্তি নারী উন্মাদিনীর মতো আলুথালু বেশে নেমে আসছে দেখলাম। সঙ্গেসঙ্গে চারপাশের বনে শেয়ালের দল আবার ডেকে উঠল, বিশ্রী মড়া-পচার দুর্গন্ধে চারদিক পূর্ণ হল, পেছনের আকাশটা আগুনের মতো রাঙা মেঘে ছেয়ে গেল, তার নীচে শকুনি উড়ছে সেই গভীর রাত্রে। শেয়ালের চিৎকার ও নরকঙ্কালের ঠোকাঠুকি শব্দ ছাড়া সেই ভয়ানক রাত্রে বাকি সব জগৎ নিস্তব্ধ, সৃষ্টি নিঝুম।

আমার গা শিউরে উঠল আতঙ্কে। পিশাচীটা আমার দিকেই যেন ছুটে আসছে। তার আগুনের ভাঁটার মতো জ্বলন্ত দু-চোখে ঘৃণা, নিষ্ঠুরতা ও বিদ্রূপ মেশানো; সে কী ভীষণ ক্রুর দৃষ্টি! সে পূতিগন্ধ, সে শেয়ালের ডাক, সে আগুন রাঙা মেঘের সঙ্গে পিশাচীর সেই দৃষ্টিটা মিশে গিয়েছে একই উদ্দেশ্যে— সকলেই তারা আমায় নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করতে চায়।

যে শবটার ওপর বসে আছি সে শবটা চিৎকার করে কেঁদে উঠে বললে— আমায় উদ্ধার করো, রোজ রাত্রে এমনি হয়— আমায় খুন করে মেরে ফেলেছে বলে আমার গতি হয়নি— আমায় উদ্ধার করো! কতকাল আছি এই শ্মশানে! ছাপ্পান্ন বছর…কাকেই বা বলি? কেউ দেখে না!

ভয়ে দিশেহারা হয়ে আমি আসন ছেড়ে উঠে দৌড় দিলাম। তখন পুবে ফরসা হয়ে এসেছে।

বোধ হয় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। জ্ঞান হলে চেয়ে দেখি আমার সামনে সেই পাগলি বসে মৃদু-মৃদু ব্যঙ্গের হাসি হাসছে…সেই বটতলায় আমি আর পাগলি, দু-জনে বসে আছি।

পাগলি বললে— যা, তোর দৌড় বোঝা গিয়েছে! আসন ছেড়ে পালিয়ে ছিলি না?

আমার শরীর তখনও ঝিমঝিম করছে। বললাম— কিন্তু আমি ওদের দেখেছি! তুমি যে ষোড়শী মহাবিদ্যার কথা বলতে, তিনিই এসেছিলেন!

পাগলি মুখ টিপে হেসে বললে— তাই তুই ষোড়শীর রূপ দেখে মন্ত্রজপ ছেড়ে দিলি! দূর, ওসব হাঁকিনিদের মায়া! ওরা সাধনার বাধা। তুই ষোড়শীকে চিনিস না, শ্রীষোড়শী সাক্ষাৎ ব্রহ্মশক্তি।

‘এবং দেবী ত্র্যক্ষরী তু মহাষোড়শী সুন্দরী।’

ক-হাদি সাধনা ভিন্ন তিনি প্রকট হন না। ক-হাদি উচ্চতন্ত্রের সাধনা। তুই তার জানিস কী? ওসব মায়া।

আমি সন্দিগ্ধ সুরে বললাম— তিনি অনেক কথা বলেছিলেন যে; আরও এক বিকটমূর্তি পিশাচীর মতো চেহারার নারী দেখেছি।

আমার মাথার ঠিক ছিল না; তারপরেই মনে পড়ল, পাগলির কথাও কী একটা তার সঙ্গে যেন হয়েছিল— কী সেটা?

পাগলি বললে— তোর ভাগ্য ভালো। শেষকালে যে বিকটমূর্তি মেয়ে দেখেছিস, তিনি মহাডামরী মহাভৈরবী— তুই তাঁর তেজ সহ্য করতে পারলিনে— আসন ছেড়ে ভাগলি কেন?

তারপরে সে হঠাৎ হি-হি করে হেসে উঠে বললে— মুখপোড়া বাঁদর কোথাকার! উনি দেখা পাবেন ভৈরবীদের! আমি যাদের নাম মুখে আনতে সাহস করিনে— হাঁকিনিদের নিয়ে কারবার করি! ওরে অলপ্পেয়ে, তোকে ভেল্কি দেখিয়েছি! তুই তো সবসময় আমার সামনে বসে আছিস বটতলায়। কোথায় গিয়েছিলি তুই? সকাল কোথায় এখন, যে সারারাত সাধনা করে আসন ছেড়ে এলি? এই তো সবে সন্ধে…

—অ্যাঁ!

আমার চমক ভাঙল। পাগলি কী ভয়ানক লোক! সত্যিই তো সবেমাত্র সন্ধ্যা হয় হয়। আমার সব কথা মনে পড়ল। এসেছি ঠিক বিকেল ছ-টায়। আষাঢ় মাসের দীর্ঘ বেলা। মড়া ডাঙায় তোলা, শবসাধনা, নরকঙ্কাল, ষোড়শী, উড়ন্ত চিল-শকুনির ঝাঁক…সব আমার ভ্রম!

হতভম্বের মতো বললাম— কেন এমন ভোলালে আর মিথ্যে এত ভয় দেখালে?

পাগলি বললে— তোকে বাজিয়ে নিচ্ছিলাম। তোর মধ্যে সে-জিনিস নেই, তোর কর্ম নয় তন্ত্রের সাধনা। তুই আর কোনোদিন এখানে আসবার চেষ্টা করবি নে! এলেও আর দেখা পাবিনে।

বললাম— একটা কথার শুধু উত্তর দাও। তুমি তো অসাধারণ শক্তি ধরো। তুমি ভেল্কি নিয়ে থাকো কেন? উচ্চতন্ত্রের সাধনা করো না-কেন?

পাগলি এবার একটু গম্ভীর হল। বললে— তুই সে বুঝবি নে। মহাষোড়শী, মহাডামরী, ত্রিপুরা, এঁরা মহাবিদ্যা। ব্রহ্মশক্তির নারীরূপ। এঁদের সাধনা একজন্মে হয় না— আমার পূর্বজন্মও এমনি কেটেছে, এজন্মও গেল; গুরুর দেখা পেলাম না। যা তুই ভাগ, তোর সঙ্গে এ-সব বকে কী করব, তোকে কিছু শক্তি দিলাম, তবে রাখতে পারবি নে বেশিদিন। যা পালা—

.

চলে এলাম। সে আজ চল্লিশ বছরের কথা। আর যাইনি, ভয়েই যাইনি। পাগলির দেখাও পাইনি আর কোনোদিন।

তখন চিনতাম না, বয়েস ছিল কম। এখন আমার মনে হয় যে পাগলি সাধারণ মানবী নয়। সংসারের কেউ ছিল না সে, লোকচক্ষুর আড়ালে থাকবার জন্যে পাগল সেজে কেন যে চিরজন্ম শ্মশানে-মশানে ঘুরে বেড়াত, তুমি আমি সামান্য মানুষ তার কী বুঝব? যাক সে-সব কথা। শক্তি পাগলি দিয়েছিল, কিন্তু রাখতে পারিনি। ঠিকই বলেছিল, আমার মনে অর্থের লালসা ছিল, তাতেই গেল। কেবল চন্দ্রদর্শন এখনও করতে পারি। তুমি চন্দ্রদর্শন করতে চাও? এসো, চিনিয়ে দেবো। দুই হাতো বুড়ো আঙুল দিয়ে…

আমি দেখিলাম তারানাথের বকুনি থামিবে না, যতক্ষণ এখানে আছি। উঠিয়া পড়িলাম, বেলা বারোটা বাজে। আপাতত চন্দ্রদর্শন অপেক্ষাও গুরুতর কাজ বাকি। তারানাথের কথা বিশ্বাস করিয়াছি কি না জিজ্ঞাসা করিতেছেন? ইহার আমি কোনো জবাব দিবো না।

পৌষ ১৩৪৩, প্রবাসী

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত