| 18 এপ্রিল 2024
Categories
কবিতা সাহিত্য

পাণ্ডুলিপির কবিতা: দ্রাঘিমালণ্ঠন । সাজ্জাদ সাঈফ

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট
প্রচ্ছদ শিল্পী- তাইফ আদনান

 

১৫.
একটা কবিতা লিখে আমি ভাত খেতে বসি। একটা কবিতা লিখে ফেলে রাখি বুকে, ডিনারের পর এঁকে শেষ করব বলে; একটা কবিতা লিখে ধীর-থির দেখি, দাঁড়িয়ে রয়েছি নিজ জানাজা-কাতারে।
একটা কবিতা অপূর্ণ রেখে কুশল জেনে রাখি আম্মার। দু’পাশে জংলী ফুলেরা স্নাত। দু’হাত পেতে পাহাড়ও লুফে নিচ্ছে রোদের সমীহ। আম্মা অদূরবর্তী, ভোর-পাখিময়!

একটা সম্পূর্ণ কবিতা আমাকে স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নে ধরে বসে অসংখ্য প্রশ্নের ধাঁধা, সকল প্রশ্নের উপর গায়ে গায়ে সবুজ মেখে বসে আছে বন জঙ্গল!

ভিতরে ফাটল নিয়ে আমাদের ব্যর্থ হাত, ব্যর্থ নিয়তি হেসে বরণ করেন বাবা।

এখন বলো তো কতদিন আগে দেখা তবু তুমি প্রাত্যহিক চেনাজানা পথের মতন ডানে বামে ঢুকে গেছো বুকে। একটা কবিতা লিখে আমি সেই পথে যাব, শাপলাপাতার নিচে এক ব্যাঙ, ওপর-ওপর বৃষ্টি হচ্ছে দেখো।

১৬.

মনে হয় শেকড়-বাকড় হয়ে মাটিতে ডুবিয়ে রাখি বুক। একটা শ্যাওলাবর্ণ পুকুর সামনে নিয়ে সারাদিন বসে আছি আর ফুল ধরেছে বলে সে আনন্দে হাসবে তুমি এক সবুজ চাহনি ছুঁড়ে, ছড়াবে অনুপ্রাস-

তোমার সামনে এসে সমস্ত চিতার আগুন বুকে ধরে বসে আছি। সমস্ত কল্পনাকে জড়িয়ে ধরেছে অসুখ, আর আমার কেবলই কানে এসে বাজে মার্বেল ফেলার শব্দ ও মাটির ঝিরি, যত দূর থেকে সাইরেন শুনে ফেলে বাস্তুহারা শিশু, তত দূর রুগ্ন প্রবাসে মা আমি ডাকছি তোমাকে, শোনো?

যেন কতদিন স্কুলছুটি নেই, মাঠ নেই, ঘুঘুঅলা নেই। খাঁচার দরোজা খোলা। জ্বর গায়ে নিয়ে একটা শালিক হাঁটে!

মনে হয় সমস্ত দিন পুরনো প্লেয়ার ছেড়ে তোমাকে শুনিয়ে যাবো কান্নাভর্তি স্বরবৃত্ত!৷ শরতে শর্তহীন হাওয়ার বৃত্তে বসে কত না প্রশ্ন তুমি করবে আমাকে, মা!

১৭.

জোছনা ছুঁতে চেয়ে এলোপাতাড়ি উড়ছে জোনাই, এই দৃশ্যে মানুষ নেহাৎই পুতুল, যে-রকম সবকিছু অদেখা ঈশারায় প্রাঞ্জল।

এতসব খরতপ্ত দিনে আমাদের বিশ্রাম নেই কারো, অবিশ্রান্ত খোদাও!

পায়ায় টেবিল দাঁড়াচ্ছে না, পথের পাথর ভুল বলেনি, পথিক হতে পাথর মনের বিকল্প নেই!

১৮.

তোমার জীবন তুমি দু’হাতে ছিঁড়েছো হেসে, চারদিকে চাকচিক্য, মানুষের মনুমেন্ট;

তোমার জীবন নিয়ে গভীর কূয়ার নিচে হাবুডুবু তুমি আর সামাজিক মস এসে পেঁচিয়ে ফেলছে ধীরে কলিজা তোমার; চারদিকে হুল্লোড়, পিতার ভৎর্সনা।
তোমার কবিতা হতে উঁকি দেয় মেহেদি বাগান, সরু চোখে চায় ডোরাকাটা সাপ; যেন, আকাশের বুক চিরে গহনার মত চাঁদ, ভাসছে ও হাসছে জননীর চেনা হাসি!

অথচ নরকবাস্তবতা সারা দুনিয়ায় তার হাত-পা ছড়িয়ে থির; বলিকাঠে গর্দান রেখেই বেঁচে থাকা চর্চা করছে সজ্ঞান মানুষেরা, তোমার কবিতারা কি বাংলাদেশ? গাঙ্গেয় অববাহিকা?

যেন কেউ দরোজায় অপেক্ষমান, যেন কেউ নক করে, লিফলেট, বিপ্লব, মৌন মিছিল, ফিরবে নাকি তুমি?

১৯.
মিথ্যাকে হাসতে দেখে রেলে কাটা মানুষের মত ছটফট করি নিজের ভিতর। এত ধুলাবালি ওড়া গ্রামের আবহ ছেড়ে, এত হাসাহাসি খোলা শহর-বকুল ফেলে, লোহার গোধুলি, দুর্মূল্য, বন্ধু ও স্বজন-বাঁধন ফেলে চলে যাব বলে সত্য ও নীতির মূল্য আমি কি জানি না ভাবো?

২০.
কিছু লিখতে গেলেই বুকে রক্ত, চোখে রক্ত, মগজে দপদপ করে রক্তশিখা, আমি আর প্রকৃতস্থ থাকি না, এইভাবে দিন কেটে যাচ্ছে, ব্রক্ষ্মাণ্ডের সকল পশুই পেট ভরে খাচ্ছে ক্ষুধিত মানুষকে দেখিয়ে!এই শতাব্দী অমাবস্যা, এরই ভিতর মানুষের খোঁয়াড় হতে ব্যস্ত সমাজ, এতটাই যে নিমেষে জান্তব লাগে বাইকের হর্ন। আমাদের ঘাটবাঁধা পুকুরগুলি কই মা! ম্যাপ সাইজের ঘরগুলি কই জনতার বুকের ভিতর! কারো রা’ নাই তবু, টু শব্দটি নাই, মসজিদ-মন্দিরে দৃশ্যমান ভোগের বাতাস। যেন আজকেও বাজারে এসে কারো নাই হা-হুতাশ পকেটে!অথচ কবিতায় দরজা বন্ধ, জানালা বন্ধ, হাওয়া নাই, আলো নাই, দিশা নাই তাই ধবংসস্তুপের কবিতা বানাই!

২১.
বাস্তবিকই সত্য হতে দূরে দূরে আছে আমাদের ঘুম, লতা-পাতা-জঙলে ডোবায় কেউ দেখে ফ্যালে ডোরাকাটা সাপ, বারান্দায় বৃষ্টি ঢুকেছে, খাঁচার ভিতর ডুকরে ওঠে রাঙাঠুঁটি পাখি- এখন তিনটা বেজে দশ, দুয়ার খোলা রাত; বাতাস উত্তরে গেছে, রুহের মধ্যে উইঢিঁবি আর ইঁদুরের উৎপাত নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখছে মানুষ৷ আমার লেখার গোচরে ঝরে আছে কুল বরইয়ের পাতা, রোদ লেগে খলবল করে স্বপ্নেরা, যেন এক্ষুণি পাতাসি মাছের পোনা আইলের গলি উপচে এসে ভাসবে হৃদয়ে, লেখাগুলা বিদ্যুতে কম্পমান, স্বভাবে বাদকধ্বনি৷

চিত্তরূপ ভায়োলিন থেকে সুর পেয়ে ঘাসে ঢেকে যাচ্ছে বসন্ত, তার ধারে সুবিল, তার ধারে শোকগ্রস্ত মানুষের চোখ একযোগে ঝলসে উঠছে প্রায়ই৷

২২.

মুভির ভূতের মত শব্দ করে চলে গেল অনতিদূর ট্রেনের বগি, পাবে মেঘমাখানো আকাশের দেখা, সম্পর্কের ক্ষত নিয়ে কত নির্জন বুকে চলে কাঠচেরাইয়ের কল, কত বুক মহাশূন্য!

আর নিজ বিষয় আশয় ফেলে এসে দূর মফঃস্বলে ঘর যে বেঁধেছে হাওয়ায়, তাঁকে পাবে নিঃসম্বল যৌবনে। অথচ তাঁহার শব্দ জমানো ঝোঁক আর বইপত্রে ঠাসা মস্তিষ্কে ছিলো শন বাঁধা গেরস্থালি, সামান্য আলোয় ফোটা এক ফুল দুই পত্রের প্রেম, একদিন, কোনো একদিন প্রেমে!

মুভির ভূতেরা যেন খামচে ধরেছে গলা, শোক নেই, প্রতিরোধ নেই, শুধু কবিতার ছলে বুনে রাখা আছে জীবনাবৃত্তি!

প্রেম এক সুজলা প্রার্থনা, কখনো সে পাপ। যেন রক্তও ছাড়ে না রক্তরে পণ গুনে প্রেমের মাশুল চেয়ে!


আরো পড়ুন: পান্ডুলিপির কবিতা : দ্রাঘিমালণ্ঠন । সাজ্জাদ সাঈফ


২৩.
যারা প্রকৃত কবিতা লেখে তারা ভাবে কেউই শত্রু নয় এক জীবনে, তারা ভাবে তাবড় হরপ্পা এসে তাদের বুকে আয়েশ পেয়ে ঘুমায়, তিস্তাবাধের ওপর দ্বন্দ্ব সমাস বসে রৌদ্র পোহায়!

চোখের ভিতর মেন্দি পাতার ঝিরি, মাথার ভিতর মাঘের শুকনো খাল! গরুকে ঘাসের মহাল বুঝিয়ে দিয়ে, ঘুমিয়ে পড়েছে রাখাল; নাকি মহাকাল সে? মেঘ থেকে নেমে আসা সবুজ টিলার বাঁকে মানুষের অজস্র ভনিতা সয়ে এসে, যার চোখ তন্দ্রায় বুঁজে গেছে!

২৪.
এসেছি পাথরপ্রবণ প্রাণ, নদীর অনেক নিচে, লুকিয়ে ডুবিয়ে শ্রবণ। এই নদী উজান ব্যকুল তার থই নাই, তল নাই আর দুই ঘরে পাথর জমিয়ে দেখো ভারি হলো হৃদপিণ্ড! এ নদী অনেক অনেক ফুলে রাঙা হলো মুক্তবেণী।

বিচূর্ণ মেঘের ধারে হেলে দুলে থেমেছে দিগন্ত, হাত নাড়ে, ডাক দেয় আর বেদেনীর ঝাঁপির মতো কম্পিত মহাকাশ যেন হাঁপিয়ে উঠেছে নাগিন, এই রোদে, পাঁজরে কাহার আজ?

তুমি গাও মৃত্তিকা রাগ, আমি শুনি মাটির কোরাস! এই ধারা দ্বিধাপুষ্পের; নিজের ছায়াকে বুকে নিয়ে ধীর কোনো কাঠবিড়ালী, খুঁজে নেয় পাতার আড়াল; কিছু পাতা প্রদাহে পেলব লাগে, এ-ই ইহকাল!
এক জন্মে কতটা নীরব হলে ব্যক্তিত্বে কালিমা লাগে না কারো?

২৫.
এখন স্বপ্নেরা যুদ্ধশিশুর মত চায় মানুষের অবাধ করুণা, আমি আর আমার ছায়া মিলে অপেক্ষা করছি শীতের, মানুষের নয়ছয় সইতে সইতে ক্লান্ত হচ্ছে ইচ্ছাশক্তি। যেদিকে তাকাবে বহুতল শেষে দানবের অভিব্যক্তি নিয়ে ব্যস্ত নগরী। অথচ কোন সকাল সকাল উঠে বালিশচাপা দিয়ে এলে ঘুম যেন কোনো ফুলের জন্য প্রতীক্ষা তোমাকে নান্দনিক করে আর এইদিকে সারা গায়ে ঘাসের ঢেউ নিয়ে রমণীরা আইফোনে ডুবু। এভাবে নিজের জগত এঁকে রাখছি বুকে, স্বপ্নকে চালিয়াত বন্ধুর সাথে গলাগলি বেরোতে দেখে একটা রাক্ষসের গল্প মনে পড়ে যায়। এতসব নির্ভাবনা জুড়ে তুমি কি নিখিল ট্যুরিস্ট নাকি? জলঘোলা সয়ে গেছে সব?

২৬.
আমাকে আঘাত করছে মেঘ
হসন্ত খোলা রোদ, তোমার দোয়া়ত চোখ।
হেমন্ত ফুরানো ডালে পাতা হয়ে দোল খায় অনুজের ভৎর্সনা।

আর শূন্যতা বুকে নিয়ে যে কোনো দরজায় কড়া নাড়া জগতের কঠিনতম যুদ্ধ। যে সব আঘাতের দাগ ভনিতা করতে শেখায় আর সে-রকম ভাষার লাবণ্যে তুমিও কাজলটানা চোখ, আজ সেইসব মনুষ্য ভনিতার কাছে এসে আমি শূন্য ও পরাহতপ্রায়!

অথচ সব শেষে মানুষের চাই ফুল, তাজা ফুল নিজ নিজ কফিনে।

২৭.

নদী শুকিয়ে পাটকাঠি লাগে এইখানে, বাতাসে টের পাবে সিসা, এ-রকম পৃথিবীতে বেঁচে আছো যে সব গলির শেষে একটা করে নর্দমা সমাবেশ। মিথ্যা বলছি না, আলাওল পূর্বসূরি আমাদের, ঘুমানোর আগে আসে কাজলরেখার পায়ের শব্দ কানে, আয়না ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কপালে টিপ পড়ছে কাজলা দিদি।

সত্য হতে আমরা আলোকবর্ষ দূরের বাসিন্দা। ক্ষেতের কাকরোলে নেমে ঠোকর দিচ্ছে পাখি। তোমার কলমে এসে ধাক্কা দিচ্ছে গুরুত্বহীন নিন্দারা, যাতে ভর করে দরবারে এসেছিলো আবুল ফজলের কর্তিত মস্তক।

২৮.

আমাদের ঘর ভরে গেছে ফসলি ধুলায়। তুমি উদ্বিগ্ন। কাছেই প্রাণের ফসিল হয়ে প্রাচীন বৃক্ষেরা আজতক পাখির আশ্রয়। এখানে আগুন বধির। মানুষের রাগ বলে কিছু নেই, ক্ষোভ গেছে পালিয়ে। টিভিতে প্রতিদিন দেখো যুদ্ধের রিয়ালিটি শো। তুমি হতাশাগ্রস্ত। চারদিকে সৌরস্নিগ্ধ গ্রাম। সুদূর বিস্তৃত ধানের মঞ্চ থেকে হাত নেড়ে ডাকে যৌবন। তবুও মানুষ নিজেকে কেন্দ্রে রেখে নিঃশেষে বিভাজ্য আজ। তুমি বিব্রত। ভাবছো তোমার এপিটাফ নিয়ে।
ভাবছো তোমার কীর্তিই বা কী!
অসংখ্য গ্রামকে ঘিরে ফেলেছে দৈত্যপুরী নগরসভ্যতা। বিদেশি বিনিয়োগে বিষাক্ত অরণ্যপথ।
আর তোমার কবরে বিলাসিতা স্পষ্ট শুধু সমাধিফলকে লিখে গেছে কারা – ‘এই লোক কোনোদিন প্রতিবাদ করেনি, মস্ত ফেরেব্বাজ ছিলো’!

২৯.

লিখি অনিশ্চয়ের ভাষা, গাছের শেকড়ে লিখে রাখি নদীস্পর্শ। লিখে রাখি নীড়ের ভিতর হতে পাখা আর হেমন্ত পরিচিতি- কত পথ পারি দিয়ে আজ দ্বিধা এসে ফুল। শতমুখী ফুল, অযুত ভঙ্গিতে ফোটে!

তিরবিদ্ধ বুক মেলে কাছে ডাকছে সমুদ্র আর বুকের ক্ষতস্থানে নেমে রক্তকে ঢাকছে মেঘ, চারদিকে ঘনবসতি পেয়ে সেই দু-নলা মেঘ খোশগল্প করে, যেন রূপকথার জ্যোছনা মাটির নিকটে নেমে এসে পেয়ে গেছে নিজের দেখা;

সেইদিকে পানের বরজ, ঘোড়াশাল পেয়ে জাগে; যেন পয়সার পিঠে নৃত্য করে স্বপ্ন, মুদ্রায় আঁকা রাজায় উজিরে হাঁটে অন্তহীন ঘাসের ওপর। কথারা পোশাক ছেড়ে বেরিয়ে এসে, নিজ নিজ মনে ভাঙে মানুষের খোয়াবের মানে, চোখে লিখে রাখে স্বপ্নের বর্ণালী!

৩০.
যত রাত নামে তত চুপ হয় ঘর, স্বর চুপ হয় মানুষের, একটা কাশির শব্দ স্মৃতির ভিতর শুয়ে ঘেমে উঠছে, অথচ বাবার মুখটা ভুলতে না পেরে আমি নির্ঘুম, হাতে লেখা চিঠির মতই বিরল সব মুখ চারপাশে ভীড় করে; ‘ফ’ থেকে ফুল যেখানে, ‘ম’ থেকে মাঠ শোভা পায়, এমনই গ্রীস্মকাল!

রাত বাড়লেই দীর্ঘ বাক্যের মত একটা নদী ফুসফুস হতে ছুটি পেয়ে, জাগ্রত বাতাস পেয়ে চঞ্চলতর।
এদিকে অসহায়ত্ব বোধ, এলোমেলো হচ্ছে ঘুম, তোমার ছোঁয়াকে আনন্দ জ্ঞান করি! যেন অলোক পৃথিবীতে নেমে এসে তুমি আর আমি পাশাপাশি, মাতৃভাষার দুটি অক্ষর!

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত