| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: ফোনালাপ । পারভেজ হোসেন

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

‘দিলরুবার খবর কিছু জানো, ফয়সল ?’ অবসন্ন স্বরে জানতে চায় পারুল।

‘হ্যাঁ, রিয়াজ কাক্কু জানালো তো। শুনলাম দুপুরের দিকে ওর স্বামী মারা গেছে। সম্পর্ক ভালো ছিল না। আলাদা থাকত।’

পারুল বলে, ‘স্বামীর সাথে ওর সম্পর্ক কেমন আছিল আমিও জানতাম না একদম। খবরটা পাওয়ার পর যোগাযোগও করি নাই। কিছুক্ষণ আগেই তো জানলাম। ভাবলাম তোমারে আগে জানাই।’

প্রায় মাস দেড়েক পর আমাকে পারুলের এই ফোন। জানি ও সহজে ছাড়বে না তাই শোবার ঘরের বাতিটা জ্বালিয়ে খাটের পাখায় হেলান দিয়ে বসি। দিলরুবার স্বামীর মৃত্যুর খবরটা এত ঘটা করে আমাকে জানাবার কি দরকার তা আমার চেয়ে আর বেশি কে জানে। ঠাণ্ডা গলায় বললাম, ‘ভালো করেছ জানিয়ে। রিয়াজ কাক্কু ছাড়া এই খবর জানাবার আর কে আছে বলো ?’

‘কী হইছিল তার, রিয়াজ তোমারে কইছে কিছু ?’

‘কেনো, তুমি জিজ্ঞাসা করো নাই ?’

‘না, তড়িঘড়ি খবরটা দিয়াই তো ফোন ছাইড়া দিল।’

আমি বলি, ‘লিভার সিরোসিসে ভুগছিল। সমস্যাটা জেনেও মদ খেতো রোজ। তাছাড়া…’

আমার কথা শেষ না হতেই পারুলের মুখ ঝামটা ভেসে আসে ফোনের স্পিকারে, ‘ও আচ্ছা, বেটা তা হইলে দেবদাসগিরিতেই গেছে।’

আমিও ওর কথায় হেসে ফেলি কিন্তু ভারাক্রান্ত স্বরে বলি, ‘এমন সময় এভাবে বলে কেউ!’  

‘সাধু সাজার দরকার নাই। কী করবা এখন ? যাবা ?’ কণ্ঠে কর্তৃত্বের ভঙ্গি নিয়ে জিজ্ঞেস করে পারুল। আমি অবাক হয়ে যাই, কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকি। ও আবার বলে, ‘তোমার কিন্তু যাওয়া উচিত মেয়েকে নিয়া।’

মনে হলো পেছন থেকে সে আমাকে ঠেলছে। যাতে আমি ঘর থেকে এক্ষুনি বের হই। বলি, ‘মেয়ে যদি যেতে চায় যাবে তার মতো। আমি আর গিয়ে কী করব। কী বলব ওকে ঢং করে ? ভালো হয়েছে সব ল্যাঠা চুকেছে। একেবারেই নিজের মতো জীবন-যাপন করতে পারবে এখন। তেমনটাই তো চেয়েছিল, নাকি ? যৌথ জীবন একবার যদি কারো অসহ্য হয়ে যায়, কোথাও গিয়ে সেই একই জীবন, বুঝলে, কেউ আর মানিয়ে নিতে পারে না। দিলরুবাও পারেনি। মাঝখান থেকে ওই ভদ্রলোকের সর্বনাশটা করল। যা-ই হোক তিনি তো একেবারেই নিস্কৃতি পেয়েছেন।’

‘ওর হাত থেকে মনে হয় তুমিও পাইছিলা নিস্কৃতি ? তোমার বেলায় কী হইছিল ?’

পারুল যেন এবার জেরা করছে তেমনি করে বলে, ‘আগেও বলছি তোমারে, একতরফা দিলরুবার দোষ দিও না, ফয়সল। একমাত্র সন্তান রাইখা ও ঘর ছাড়ত এই কথা কখনোই মনে হয় নাই আমার। নিজের বিচারটা কি একবারও করছ তুমি ? অহমিকা দেখাইছ। তার ওই হ্যাংলা কলিগটারে নিয়া খামোখা চূড়ান্ত সন্দেহ বাতিকেও ভুগছিলা তুমি। আর তা কোথায় গিয়া ঠেকল পরে ?’  

পারুলকে চটাই না আমি। বলি, ‘আমার মেয়ে বলত কি জানো ? বলত, বাবা, ভালোই হয়েছে মা তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে। না হলে তোমরা একজন আর একজনকে খুন করে ফেলতে।’

পারুল হাসতে হাসতে বলে, ‘মেয়ে কি ভুল বলছে কিছু ? কী মনে হয় তোমার ? একদম ভুল বলে নাই। ভব্যতার সীমা ছাড়াইছিলা তোমরা। শ্রদ্ধা-সম্মানের ছিটাফোঁটাও আছিল না তোমাদের মধ্যে।’

কথাটা সত্যি। বিয়ের বছর দুয়েকের মধ্যেই আমাদের এই ঝামেলা শুরু হয়ে যায়। তেমন কিছুই না। সবই চলছিল ঠিকঠাক। মাঝে মধ্যে ঝগড়াঝাটি আবার আনন্দ-ফুর্তি, ঘোরাঘুরি। মেয়েটা বড় হচ্ছেÑএই বলে আমরা পরস্পরের হাত ধরে প্রতিজ্ঞাও করেছি এমন যেন আর না হয়। তবুও হতো।

সে একটা সময় গেছে বটে। আমরা দুজনই সরকারি চাকরিজীবী। আমার মেয়ে তখন ক্লাস ফোরের ছাত্রী। বয়সের তুলনায় বুদ্ধিটা যথেষ্ট পাকা। টপাটপ কথা বলেÑচোখ গোল করে। গলার স্বর নামিয়ে, আম্মু এদিকে আসো তো, বলে কাছে ডাকলে ছুটে আসে কিন্তু তৎক্ষণাৎ দৌড়ে পালায় পিঠের ওপর লম্বা বেণি দুলিয়ে। ডাকার ধরন শুনেই কী বলব তা যেন বুঝে ফেলে সে বলার আগেই, তাই মুখোমুখি হতে চায় না। হবেই বা কী করে ? কার পক্ষ নেবে সে ? যত পাকাই হোক ওইটুকু তো বয়স।

পারুল কে বলি, ‘ঠিকই বলেছ তুমি, ওর সামনে আমাদের মধ্যে যখন হাতাহাতি হতো দূরে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপত মেয়েটা। রান্না ঘরে গিয়ে বুয়ার বুকের মধ্যে লুকিয়ে থাকত। অনেক কথা তোমার সঙ্গেও বহুবার হয়েছে সেসব নিয়ে। মনে করতে চাই না আর। এত যে জানা-বোঝা, এত তর্ক, এই যে লেখাপড়া, আর্ট-কালচার আমাদের, কোন বালের জন্যে ? মাথায় রাগ উঠলে আমার যে জ্ঞান থাকত না, পারুল।’

মনে পড়ে ওরকম ঘটনার পর বাসা থেকে বের হয়ে পারুলের ওখানেই তো যেতাম। গরম পানি দিয়ে মুছে খামটির দগদগে আঁচড়গুলোতে মলম মাখিয়ে দিত সে। তার দুটো ছেলেমেয়ে আর স্বামী আদনান ভাই। সবার সঙ্গেই আমার সম্পর্ক ভালো, শুধু ভালো নয়, খুবই ভালো। বিশ্ববিদ্যালয়ের একই ডিপার্টমেন্টে পড়তাম আমরা। এমএ পড়তে এসে পারুল ভালোবেসে ফেলেছিল আমাকে। সে আর এক পাগলামো। পরে পারিবারিকভাবে আদনান ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় ওর। কিন্তু কী করে যেন আজও পারুলের বন্ধুই রয়ে গেছি আমি।

ওই সময়ে আলেয়াকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম আর দিলরুবাকে নিয়ে। ওরা অন্য ডিপার্টমেন্টের, আমাদের দুই বছরের জুনিয়ার। রিয়াজ কাক্কু ছিল দিলরুবার চাচা। ও পড়ত আমাদের সাথে। সেই উছিলায় সকলের কাক্কু বনে গিয়েছিল রিয়াজ। আলেয়া অস্ট্রেলিয়ায় চলে গেলে চাকরি পেয়ে বছর তিনেকের মধ্যে বিয়ে করি দিলরুবাকে। বন্ধুর বিয়েতে উপস্থিত থেকে পারুল-আদনান মিলে হেন কাজ নেই যা তারা করে দেয়নি। কিন্তু আমি জানি পারুলের অন্তর ছিল না তাতে। ওসব সময় আমার পাশে থাকতে চেয়েছে, এটুকুই। সেই থেকে আমাদের দুই পরিবারের চলাফেরায়, মেলামেশায়, সুখে-দুঃখে কোনওরকম বাঁধাও হয়ে দাঁড়ায়নি সে।

ফোনের স্পিকারে হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ পাচ্ছি এখন। কানে ফোন লাগিয়ে পারুল হয়তো রান্নাঘরে কিছু করতে করতেই কথা বলছে। কাকে যেন নাম ধরে ডেকে, যা এবার, বলে তাড়ালো। তারপর বলল, ‘স্যরি, ফয়সল। শুনতে পাচ্ছ ?’

‘হ্যাঁ পাচ্ছি।’

‘তোমার মেয়ে তো জাহাঙ্গীরনগর ভার্সিটির হোস্টেলেই আছে, তাই না ? ওরে জানাইছ কিছু ?’

‘না, জানাইনি তবে চলে আসতে বলেছি আজ। বলেছে আসতে রাত হবে।’

‘ঠিক আছে, আসলে পরে ওকে নিয়া যাও। গিয়া দেখো দিলরুবা কী কয়।’

‘আট বছর পরে দেখা হলে এ অবস্থায় আর কী বলবে। কিছুক্ষণ ন্যাকামো হবে। নাটক হবে। নাটকটা আমার ভালো লাগবে না, ভাই।’

খুব শান্ত কণ্ঠ পারুলের। বলে, ‘মেয়ের জন্যই যাবা। এতে ন্যাকামির কী আছে।’

ওদের টিভির সাউন্ড একেবারে চড়াৎ করে উঠল। এই সাউন্ড কমা তোরা, বলে অধিক চড়ে গেল পারুলের গলা। আমার উদ্দেশে নয়, বুয়ারা সিনেমা দেখছে। সিনেমার মাঝখানে বিজ্ঞাপন আসাতে এই অবস্থা।

আবারও সেই মৃদু শান্ত কণ্ঠস্বর পারুলের, ‘এই দুনিয়াতে এখন মেয়েই তো তোমার সব, তাই না, ফয়সল ? আফসোস বড় দেরিতে বুঝছ। ব্রোকেন ফেমিলির বাচ্চাদের মনোগঠনের যে কী দশা হয় সেই আন্দাজ তোমার আছিল না তখন।’

ও আমার দুর্বলতাটা জানে। অথচ এই আমিই একসময় তা জানিনি। বিষয়টা পাত্তাই দেইনি। মেয়েটার সামনে, বুয়ার সামনে প্রতিদিন আমাদের উত্তেজনার কোনও লাগাম ছিল না। কে কাকে কি বলছি না বলছি কোনও সীমা ছিল না সেসবের। দিলরুবাকে তো একটা বেশ্যা বানিয়ে ছেড়েছিলাম আমি! আমাকে চুপ থাকতে দেখে পারুল হ্যালো, হ্যালো করে উঠতেই বললাম, ‘হ্যাঁ, বলো শুনতে পাচ্ছি।’

পারুল বলে, ‘মনে মনে খেপতেছ নাকি আমার ওপড় ? খেইপো না বন্ধু।’

‘আরে না, খেপব কেনো! তুমি বলো আমি শুনছি।’

‘তোমার তো রিটায়ারমেন্টের সময় চইলা আসছে, তাই না ? আদনান চাকরিটা না ছাড়াইলে আমারও তা-ই হইতো। এতদিন তোমারে একটা কথা বলি নাই, আজ বলি শোনো। ঘরকন্না করতে করতে এই বয়সে আইসা এইটুক বুঝছি যে একসঙ্গে থাকতে গেলে পরস্পরকে সহনশীল হইতে হয়। কিছুটা ছাড় দিতে হয়। আমি কিন্তু জিদ করতে পারতাম, হয়তো উচিতও আছিল কিন্তু সন্তানদের কথা ভাইব্বা ও যখন জোড়াজুড়ি শুরু করল, আমি মেনে নিছি। ক্যারিয়ারটা গেছে বইলা আত্মার কষ্টটা নিরবে হজম করছি। একেকবার মনে হইতো এই বালের সংসার ছাইড়া বাচ্চাকাচ্চা ফালাইয়া চইলা যাই। থিতু হইছি, সবই কিন্তু শিশু দুইটার মুখের দিকে তাকাইয়া। তোমার মতো অতো উঁচু দরের মানুষ আমি না, তবু বলি, স্বামী-স্ত্রী-শরীর-সংসার একটা খেলাঘর। এর বাইপ্রোডাক্ট যারা, তারাই কিন্তু সব। তারাই সমাজের ভবিষ্যৎ। এদেরই তো এই দুনিয়াতে রাইখা যামু আমরা, তাই না ?’

পারুলের সস্তা এই মুখস্ত কথায় অন্য সময় হলে বিরক্ত হতাম কিন্তু আজ ও নিজের কথা না বলে হঠাৎ সমাজ নিয়ে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে কথা বলছে দেখে বিষয়টা ভাবিয়ে তুলল আমাকে। কিন্তু ভাবনার সময় দিল না পারুল। বলল, ‘নব্য এই পুঁজিবাদি সমাজের মানুষের মনোজগৎ বুঝি ছোট হইয়া আসছে ফয়সল, না হইলে এত ঘৃণা এত প্রতিশোধের আগুন জ্বলতেছে কেন সকলের অন্তরে।’

‘আশ্চর্য! তুমি তো দেখি দার্শনিক হয়ে উঠেছ বন্ধু।’

‘একটা কথা কইলাম আর খোঁচাইতে শুরু করলা ? এই না হইলে পুরুষ!’

এরই মধ্যে কলিংবেল বেঁজে উঠল ওদের। একটু ধরো, বলে হয়ত গেটের দিকে গেল পারুল। এই ফাঁকে ফোনটা লাউড স্পিকারে রেখে আমিও ঢুকে পরি ওয়াশ রুমে। বেরিয়ে আসতেই শুনি ওর গলা, ‘জ্বালাইতেও পারে এই লোকগুলান, বুঝছ। আরে, আমাদের ড্রাইভার। বলতেছে কাল সে আসতে পারবে না। বউ নিয়া হাসপাতালে যাইব। দুইটা বাচ্চা আছে, এবার তিন নম্বরটা আসি আসি করতেছে।’

আমি বলি, ‘দেশটা তো মানুষে মানুষে ছয়লাব হয়ে যাচ্ছে পারুল!’

‘যাইবই তো। মানুষের কোনও কাণ্ডজ্ঞান আছে ? কয়, মুখ দিছে যে খাওয়াইবেও সে। আল্লার আর খাইয়া-দাইয়া কাম নাই।’

ওর কথা শুনে ভাবি, আরও একটা সন্তান হোক আমিও তো চেয়েছিলাম। কিন্তু তখন এরকম কথা দিলরুবাও বলত। তাতে আমার সন্দেহ বাড়ত আরও। কী আবোলতাবোল ভাবতাম সেসব নিয়ে। খোলামেলা স্বভাবের চাকরিজীবী বউ হলে যে বিপদটা হয়, হোক না তা প্রেমের বিয়ে, একটা খটকার মধ্যে হাবুডুবু খেতে থাকে মন। মনের এই চরিত্রের গঠন তখনও পড়ে উঠতে পারিনি। পারুলের অমোঘ অনুধাবনের মতো এই আট বছরে এখন অনেক কিছুই পরিস্কার হয়ে উঠেছে। সমাজ সংসার নিয়ে ভাবনাটা কিছুটা হলেও তো থিতু হয়েছে।

পারুল বলে, ‘তুমি তো আরও একটা সন্তান নিতে পারতা, ফয়সল। পারতা না ? সন্তানদের প্রতি দায়িত্বটা দুইজনারই পোক্ত হইত। খালি ডানা খুইলা বেড়াইতে চাইছ। সেই ডানা কই গুটাইয়া গেলো কও! ত্যানা ত্যানা বানাইয়া ফেললা জীবনটারে!’

ডানা আমার গুটিয়েছে ঠিক, জীবনটাও ত্যানা হইছে কিন্তু পারুলের এই অব্যাহত তিরস্কারের একটা উত্তর তো দেওয়া লাগে। না হলে ও ক্রমাগত কচলে চলবে, তাই বললাম, ‘সন্তান সে একটা কী এক ডজন, দায়িত্ব কি তাতে বাড়ে বা কমে ? কী যে বলো না তুমি! যে যাওয়ার সে এমনিতেই যেত। এতকিছুর পরও আমি কিন্তু ওকে ছাড়িনি। পরিস্থিতি যে রকমই হউক ছাড়াছাড়ির ভাবনা আমার মাথায় কিন্তু আসেনি তখন। ও আর একটা বিয়ে না করলে মেয়েটাকেও তো আমার কাছে পেতাম বলে মনে হয় না। তাছাড়া চলে যাওয়াটা সে প্লান করেই করেছে। যাওয়াটাকে উত্তম ভেবেছে। কিন্তু নতুন সেই জীবনও শেষ পর্যন্ত তেলেজলে মেশেনি এই আর কী!’

‘কিন্তু পাগলা মাথায় তুমি যে কলঙ্কটা রটাইছিলা কোনও নারী কিন্তু তা সহ্য করে না। কই, সেই কলিগের লগে তো সে ভাগে নাই! হইতে পারে মানষিকভাবে তখন ওই হ্যাংলাটার আশ্রয় তার দরকার আছিল। তোমারে তো পই পই কইরা বুঝাইছিলাম। একবার ভাবোও নাই যে মাইয়ালোকটা তোমার মেয়ের মা। যা কিছুই ঘটুক, চইলা যাউক, তবু সেই মায়ের সম্মান রক্ষার একটা দায়িত্ব কিন্তু তোমার উপড়ে বর্তায়। শুধু শরীর কি সবকিছু মাপনের একটা যন্তর হইল ? আর শরীরের কথাই যদি তুলবা তাইলে তুমি পুরুষটাও তো সাধু না।…’

পারুলের এই কথায় অন্তর খসে পড়তে চাইল আমার। মনে পড়ে গেল সেদিন অফিসে বের হবার আগে দিলরুবার টাকায় কেনা আমাদের ফ্ল্যাটের সামান্য লোনের কিস্তির টাকা দেওয়া নিয়ে অল্প কথাকাটাকাটিতেই আচমকা খেপে গেল দিলরুবা। রান্নাঘর থেকে বটি নিয়ে তেড়ে আসতে উদ্যত হলোÑ আমার কেনা ফ্ল্যাটে থাকবি আবার আমারে যা তা শুনাবি, কুত্তার বাচ্চা তোরে খুনই কইরা ফালামু। সে-কী অগ্নিমূর্তি তার!         

বুয়া ওকে জাপটে ধরেছে। পা পিছলে পড়ে গেলাম আমি। ডাইনিং টেবিলের কোণায় লেগে মাথা ফেটে রক্ত গড়াতে শুরু করল। গেট খুলে বেরিয়ে পড়ি। কিন্তু যাব কোথায়। রিক্সা নিয়ে পারুলের বাসায়ই ছুটলাম। দারোয়ান দেখেই বলে, কী হয়েছে স্যার ? বললাম, তেমন কিছু না। রিকশা থেকে পড়ে গেছি।

আদনান ভাই চট্টগ্রামে, বুয়া বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলে। পারুলও সেজেগুজে কোথাও বেরোবার জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিল। দরজা খুলে আমাকে রক্তাক্ত দেখে সে তো হতভম্ব। সামান্যই কেটেছে কিন্তু রক্ত গড়ালে তার একটা প্রভাব তো পড়েই। আমি ওদের ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসি।

ফ্যান ছেড়ে দিয়ে স্যাভলন, গরম পানি, মলম নিয়ে একেবারে বেদিশা হয়ে পড়ে পারুল। শুশ্রƒষা চলাকালে ওর ভারি স্তন বারবার আমার নাক ঘসে যায়। ওই অবস্থায় পারুলের শরীরের গন্ধে কী যেন হয় আমার। রক্ত মুছে নিয়ে নিবিষ্ট হয়ে চুলের মধ্যে মলম মাখতে থাকে পারুল। ওর ওই গন্ধ ধরে আমিও ফিরে যাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সেই কানা গলিতে। ক্রমাগত ঘুরপাক খাইÑ তখন পারুল আমাকে প্রায় জোর করেই আজ এখানে তো কাল ওখানে নিয়ে যায়। আড়ালে আবডালে একটু-আধটু আদর করে দেয়। সুযোগ পেলে আমিও চুমু খেতে শুরু করি। ও আপত্তি তোলে না। আমার দিক থেকে পুরোটাই শরীরের চাওয়া কিন্তু এক পর্যায়ে খেয়াল করলাম পারুল আমার উপর দাবি খাটাতে শুরু করেছে। একদিন তো বলেই ফেলল। কিন্তু আমি তখন আলেয়া আর দিলরুবার পেছনে হন্যে হয়ে আছি। আমার নিরবতায় পারুল কতটা ব্যথিত হয়েছিল জানি না। 

চুলের গোড়ার কাটা জায়গাটায় আঙুল লাগাতেই উঁ করে উঠি। পারুল পরিহাস করে বলে, সামান্য কাটছে, এইটারে তো কাটাকাটি কওন যায় না। এই কাটা দিয়া তো আর থানা-পুলিশ হইবো না।

ওর গায়ের সেই পুরনো গন্ধটা খামচে ধরে আমাকে। ব্যথা-ট্যাথা ভুলে নাক ঘসতে থাকি ওর কোমল বুকে। পারুল আলগোছে নিজেকে সরিয়ে নেয়। আমিও দাঁড়িয়ে মুহূর্তে দুই বাহুর মধ্যে বেধে ফেলি ওকে। ঘাড়ে চুমু দেই। সে আস্তে আস্তে সেই বাধন আলগা করে দিতে দিতে নিলিপ্ত গলায় বলে, ‘প্লিজ, পাগলামো করো না, ফয়সল’। ওই আসক্তিহীন ‘না’ এর মধ্যে যে কোনও ‘আহ্বান’ নেই তা বুঝতে সময় লাগে না আমার। খুবই বিব্রত হই। আমাকে সহজ করার জন্যই কিনা কে জানে ও রান্নাঘরে গিয়ে চা করে আনে।

… আমি মানুষটাও তো সাধু নই, এমন কথার পর আমার দিক থেকে কিছুক্ষণ কোনও শব্দ না পেয়ে পারুল হয়ত ধরেই নেয় আমি আহত হয়েছি। কিন্তু ওকে আশ্বস্ত করে বলি, ‘আমি জানি হারিয়ে যাওয়া সময় আর মানুষ কখনোই ফিরে পাওয়া যায় না, পারুল। আর এই দুই জিনিসের জন্য মানুষের কতই না আকুতি! ইদানিং মনে হয় আবারও ফিরে যাই ভার্সিটির ডিপার্টমেন্টে। মনে হয় বোটানিক্যাল গার্ডেনে আবার যাই। তোমাদের বাড়ির সেই ছাদে না হয় কোনও নদীর পথে যাই। যেদিকে খুশি চলে যাই। জীবনটাকে সমাজের গণ্ডির মধ্যে এভাবে আটকে রেখে কী আনন্দ, কী-ই-বা সুখ বলো ?’

‘সুখ তোমার আর হইব না, ফয়সল। তবে…’

‘তবে কী ?’

‘না আজ থাক, সময় হইলে কমুনে একদিন।’

আমাদের কথাবার্তার মধ্যেই কখন যে বৃষ্টি শুরু হয়েছে টের পাইনি। কে যেন ঘনঘন কলিংবেল টিপে যাচ্ছে। আমি দরজার দিকে যেতে যেতে বলি, ‘সেই সময় হয়ত আর হবে না কোনওদিন, পারুল। একটা সময় পার হলে আর হয় না কিছু।’

‘কে কইছে তোমারে ? সুখ না হউক নির্মল আনন্দ পাওয়ার অনেক কিছুই তো বাকি আছে জীবনে। আমার তো মনে হয় এদ্দিনে তার সন্ধান পাইয়া গেছ তুমি।’

কানে ফোন চেপে ধরে দরজার দিকে এগিয়ে যাই। ছিটকিনি নামিয়ে কপাট খুলতেই দেখি আমার মেয়ে ভিজে চুপচুপা হয়ে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছে। পারুলকে আর কিছু বলা হয় না। লাইনটা কাটার কথা ভুলে গিয়ে বৃষ্টিভেজা বিমর্ষ কন্যাকে জড়িয়ে থাকি। বলি, ‘তুই কি কিছু জেনেছিস ?’

শিশুর মতো বুকের মধ্যে লেপ্টে থেকে কান্নাধরা গলায় বলে, ‘ভেবেছিলাম ওদের ঝামেলা মিটিয়ে দেব, ওরা আবার একসঙ্গে থাকবে কিন্তু মায়ের আর সেই সুখ হলো না, বাবা।’

কী বলব আমি ভেবে পাই না। বাইরে জোর হাওয়া দিয়ে বৃষ্টির বেগটা বেড়ে গেছে। চড়াৎ চড়াৎ বাজ পড়ছে আকাশ আলো করে। আমাকে জড়িয়ে ধরে একটানা ফুঁপিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত