| 26 মে 2024
Categories
ধারাবাহিক

ইরাবতী ধারাবাহিক: খোলা দরজা (পর্ব-১৬) । সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

আমার এখনও মনে পড়ে, ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বলে উঠেছে। দৌড়োদৌড়ির খেলা থামিয়ে আমরা বাড়ির দিকে হাঁটা দিয়েছি। আর পাড়ার সবচেয়ে বড় রকটায় বসে আছেন সাবালক বেশ কিছু মানুষ। পোস্টের নিভু নিভু আলোয় জোর গলায় কী নিয়ে যেন আলোচনা করছেন তারা। রকের নীচে, রাস্তা্‌য়, পাড়ার কুকুরগুলো তাদের আওয়াজ থামিয়ে চুপ করে , অলস ভঙ্গিতে বসে, হয়ত সেই আড্ডার মৌতাত উপভোগ করছে।

পাড়াকে সেভাবে দেখা না গেলেও বোঝা যেত অনায়াসেই। পাড়ায় ছিল বেশ কিছু মানুষের পাশাপাশি বাস,যদিও ঘর আলাদা,উঠোন আলাদা।

পাঁচিল দিয়ে ঘেরা না ঘেরা সারসার ঘরবাড়ি,সকালের উনুনের ধোঁওয়ার এবাড়ির পাঁচিল টপকে অনায়াসে অন্য বাড়িতে ঢুকে পড়া। বিকেলে কখনো সখনো মাঠে খেলা  চলাকালীন খেলুড়েদের বলের দলছুট হয়ে  কাঁচের শার্সি ভাঙা। সন্ধের নিত্য শাঁখের এবাড়ি ওবাড়িতে, কখনো কখনো একসঙ্গে বেজে ওঠা। বইপত্তর খুলে ছেলেমেয়েদের পড়ার জোর আওয়াজ।অনুরোধের আসর বা রেডিও নাটকের সুরেলা কন্ঠস্বর শুনতে কোন বাড়ির মাদুরের জমায়েতে অন্যদের টুকটাক ঢুকে পড়া।পাশের বাড়ির শুকনোলঙ্কা আর পাঁচফোরনের ঝাঁজে নাকাল হওয়া। পাড়া মানে আরো অনেককিছু। সব মিলিয়ে ‘আমরা সবাই,আমাদের সবাই’ এর মত একটা সৎ ভাবনাকে বুকের মধ্যে জমিয়ে রাখা। আর মাঝে মাঝে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করা।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


পাড়া থেকে মাঝেমাঝেই দলবেঁধে বেড়ানোর আয়োজন চলত। কোন মেলায়,অথবা ঠাকুরতলায় সবাই যেত একসঙ্গে। ছুটির দিন হলে চাতরার শীতলা পুজোয় ঠাকুমাদের দলে ঢুকে আমরাও গিয়েছি পিছু পিছু। নদী পেরিয়ে শ্যামনগরের মূলোজোড়ের মেলায়, মায়েদের হাতা খুন্তি কেনার ভিড়ে, কখনো কখনো সামিল হয়েছি।আমার মতই মা কাকিমাদের লেজুড় ধরে এসেছে অনেকে। সাদা কাঠির আইস ক্রীম, শালপাতার টকঝাল ঘুঘনি, জিলিপি আর গরম গরম বেগুনী বা কচুরি খাইয়ে ক্লান্ত শ্রান্ত আমাদের বারবার সন্তুষ্ট করা হয়েছে। ফেরার পথে মায়েদের গৃহস্থালির জন্য কেনা কড়াই, হাতা, খুন্তি, বেলুন, চাকি, আমরা হাতে হাতে  বয়ে এনেছি।

মেলায় ঘুরতে ঘুরতে পাড়ার সব বাচ্চারা দল বেঁধে চেপেছি ছোট নাগরদোলায়,হাতি ঘোড়ার ‘মেরি গো রাউন্ডে’। অবস্থাপন্ন ঘরের মুখার্জী জ্যেঠি আমাদের সবার বাড়তি প্রমোদের পয়সা মিটিয়েছেন। তখন এমন ছিল। কেউ কিছু করলে তাকে ‘ধন্যবাদ’ বলার রেওয়াজ ছিলনা। তিনিও ঘরে যত্নে রাঁধা মোচা ঘন্ট বা ধোঁকার ডানলা হাত পেতে নিতেন জানলার ফাঁক দিয়ে, তাঁর কম অবস্থার বোনেদের কাছ থেকে,কোন দ্বিধা না করেই। আমার মনে আছে কতসময় পাড়ার কাকি জ্যেঠিদের দেয়ানেয়ার সাক্ষী হতে হয়েছে আমায়। অসময়ে বাড়িতে অতিথি এসে গেলে মা বা কাকিরা বলতেন, “যা তো রিঙ্কুদের বাড়ি থেকে চারটে ডিম আর তিনটে পিঁয়াজ নিয়ে আয়।”আমরাও একছুটে গিয়েছি,এবাড়ি ওবাড়ির কুড়িয়ে বাড়িয়ে আনা সৌজন্যে অতিথি খুশি হয়ে ফিরে গিয়েছেন।কখনো বা সেসব ধার শোধ হয়েছে,কখনো হয়নি। কিন্তু ঋণের বোঝা বাড়েনি।


আরো পড়ুন: খোলা দরজা (পর্ব-১৫) । সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়


পাড়ায় পাড়ায় তখন মেয়ে দেখতে আসার জোর রেওয়াজ ছিল। বারবার ঘুরে ঘুরে মেয়ে দেখার জন্য এতটুকু লজ্জা না পেয়ে, প্রতিষ্ঠিত বা অল্প প্রতিষ্টিত ছেলের বাবা মায়েরা তাঁদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের দল নিয়ে মেয়ে দেখতে বেরিয়ে পড়তেন। সেই বিরাট দলের যথাযোগ্য আপ্যায়নে  পাড়ার অন্য সব বাড়ির মানুষেরাও কোমর বেঁধে নামতেন। মেয়েটির সেদিনের পরার উজ্জ্বল রঙের শৌখিন শাড়ি, উপযুক্ত গয়না ছাড়াও, অতিথিসেবার চায়ের কাপডিস, জলখাবারের বাহারি কাঁচের পাত্র এবাড়ি ওবাড়ি থেকে অবলীলায় যোগাড় করা হত। সে নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগার কোন ব্যাপার ছিল না। পাড়ার মেয়ের বিয়ে মানে পাড়ার দায়, এটুকু আমদানী রপ্তানী তো খুবই স্বাভাবিক। এমন একটা স্বাচ্ছন্দ্যের ফুরফুরে বাতাসে কত বিয়ে উতরে যেত। বিয়ের সময় সব রকমের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ছেলে এবং মেয়ের বাড়ির যে অলিখিত প্রতিযোগিতা চলত, তাতে পাড়ার মানুষের সকৌতুক নেপথ্য ভূমিকা ছিল খুবই স্বাভাবিক।

একটা বাড়ির সঙ্গে অন্য বাড়ির এই যে বিনিসুতোর পাড়াতুতো সম্পর্ক,একে ভাষায় ব্যাখ্যা করলেও কিছু কম পড়ে যায়। অবাক লাগত না পাড়ার ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে পাড়ার তথাকথিত দাদাদের রক্ষাকর্তার ভূমিকা দেখে।

স্কুলে,কলেজে,বাজারে এমনকী খেলার মাঠেও তারা নিজের দায়ীত্বেই খেয়াল রাখত তাদের পাড়ার মেয়েদের যেন কোন অসম্মান না হয়।ছোট ছেলেপুলেদের যেন অন্যপাড়ার কেউ মারধোর না করে।সেই নিরাপত্তা বলয়ের ঘেরাটোপে ছোটবেলাটা অনেকেই একটু বেশি আহ্লাদে, নিরাপদে, পার করে দিত।

  

  

   

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত