| 20 মে 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প ধারাবাহিক

মহানগরের নয়জন নিবাসী (পর্ব-২২) । ডঃ দীপক কুমার বরকাকতী

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comমিজোরামের আইজল শহরের পদার্থ বিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডঃ দীপক কুমার বরকাকতী (১৯৪৮) অসমিয়া সাহিত্যের একজন সুপরিচিত এবং ব্যতিক্রমী ঔপন্যাসিক। আজ পর্যন্ত আটটি উপন্যাস এবং দুটি উপন্যাসিকা, অনেক ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাছাড়া শিশুদের জন্য দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তারই ইংরেজি ভাষার একটি নতুন দিল্লির চিলড্রেন বুক ট্রাস্ট থেকে ১৯৯২ সনে প্রকাশিত হয়। দেশ-বিভাজন, প্রব্রজন, ভেরোণীয়া মাতৃত্ব (ভাড়াটে মাতৃত্ব), ধর্ম এবং সামাজিক বিবর্তন ইত্যাদি তাঁর উপন্যাসের মূল বিষয়। আলোচ্য ‘মহানগরের নয়জন নিবাসী’উপন্যাসে ১৯৩২ সনে স্টালিনের বিরুদ্ধে লেলিনগ্রাডের নয়জন টলস্টয়বাদী গান্ধিজির অহিংসা নীতির দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে করা আন্দোলনের ছবি ফুটে উঠেছে। তাঁর ইংরেজি ভাষায় অনূদিত গ্রন্থ দুটি হল From Valley to Valley (Sahitya Akademi, New Delhi, 2010) এবং The Highlanders (Blue Rose Publishers, New Delhi, 2010)। বাংলা ভাষায় অনূদিত গ্রন্থ ‘স্থানান্তর’ (অর্পিতা প্রকাশন, কলকাতা, ২০০৭)। বাসুদেব দাসের অনুবাদে ইরাবতীর পাঠকদের জন্য আজ থাকছে মহানগরের নয়জন নিবাসীর পর্ব-২২।


পিটার যেলেনক’ভ ভ্লাডিমিরভেলিক্স এবং য়ুরিফমিসেভের সঙ্গে ভেসিলিদের অঞ্চলে টলস্টয়বাদের অহিংসা নীতি গান্ধীবাদেরনিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের কথা চাষিদের মধ্যে ব্যাখ্যা করে থাকার সময়েই নাডিয়ার বান্ধবী মারিয়াএন্টন’ভনারডিমিট্রিগরিনের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল। নাডিয়া প’পভনাবিয়েতেগিয়েছিল যদিও দাদা মিখাইল ভেসিলিয়েভ এবং দাদার বন্ধু লিঅ’নিড এডলার নিজের নিজের অঞ্চলে ব্যস্ত হয়ে থাকায় যেতে পারেনি। কন্যা মারিয়ার বোন ষোড়শী মারিনানাডিয়া প’পভনার কাছ থেকে পাকেপ্রকারে তার দাদাদের কথা জানার চেষ্টা করল। নাডিয়া বুঝতে পারল সে তার বিশেষ করে তার দাদা মিখাইলের কথা জানতে চাইছে। সে কথার পৃষ্ঠে বলল–’ সে এলে এতো ভালো লাগত।’

                        নাডিয়া বিয়ে বাড়ি থেকে যখন ফিরে এল তখন দেখল ওদেরবৈঠকখানা ঘরে শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে লিঅ’নিড বসে আছে। সেদিন ভিক্টর একছুর্স্কি এবং নিকোলাইচের্নভ আসতে না পারায়চমন’ভ মুচি এবং দর্জি খুদ্রিক’ভের সঙ্গে আশেপাশের অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সে তার প্রচারকার্য চালিয়ে গিয়েছিল। তাই তার ক্লান্ত লাগছিল । তবু চেয়ারটা থেকে সামনের দিকে হেলান দিয়ে সামনের বেটে টেবিলটায় থাকা একটা কাগজ পড়ছিল। বিয়ে খেয়ে এসে নাডিয়াজাঁকজমক পোশাক নিয়ে যখন ঘরে প্রবেশ করল সে মাথা তুলে তাকাল। তার মনে হল ভেতরে যেন একটা আলো প্রবেশ করছে । তার অনেকটা ক্লান্তি দূর হয়ে গেল । তার দুচোখ উজ্জ্বল হল এবং চেয়ারে সোজা হয়ে বসল। দূরের রান্নাঘরে মাথায়কাপড় বেঁধে ব্যস্ত হয়ে থাকা মাছারমানভ’না যেন শুনতে না পায়সেভাবেনাডিয়াকে বলল – তোমাকে একজন কনের মতো মনে হচ্ছে।’ 

স্বল্পভাষী লিঅ’নিডের কথা শুনে নাডিয়া মজা পেল। সেও অনুচ্চ কন্ঠে বলল–’ সেরকম সৌভাগ্য আমার কখনও হবে কি?’

লিঅ’নিড কোনো উত্তর দিল না। তার চোখের দিকে কেবল তাকিয়েরইল।

রান্না করতে গিয়ে দুকাপ কফি নিয়ে আসতে থাকা মাছারমানভ’না তাকে দেখে বলল–’ তুই এসেগেছিস? বিয়েটা ভালোভাবে হয়ে গেছে?’

‘বড় স্ফুর্তি করলাম মা। এরা যায়নি বলে মানুষগুলি বারবার জিজ্ঞেস করছিল।’                                                        

বন্ধু ডিমিট্রিগরিনের বিয়েতে যেতে না পেরে লিঅ’নিড দুঃখ প্রকাশ করল–’ হ্যাঁ, যেতে পারলাম না। একদিন খবর করার জন্য যেতে হবে।’

সাতমাইল দূরের অঞ্চলে সাইকেল চালিয়ে প্রচার করতে যাওয়া মিখাইল ফিরে আসতে সময় লাগল। সন্ধ্যেহয়েছিল যদিও লিঅ’নিড তার সঙ্গে কিছু কথা আলোচনা করতে লাগল। ঘরের একপাশে দাবা খেলার ছক সাজানো ছিল। ওরা কথা বলায় এত মগ্ন হয়ে পড়ল যে সেদিকেওদের চোখই পড়ল না। 

রাত হয়ে পড়ায়লিঅ’নিডমিখাইলেরবাইসাইকেলটানিয়েশহরের উদ্দেশ্যে ছায়া ঘেরা পথটা দিয়ে ফিরে গেল। সে অনুভব করল লেনিনগ্রাডের আগাম শীতকাল আরম্ভ হল। সে বেরিয়ে যাওয়ার সময় এটিকে থাকা শোবার ঘর থেকে যে নাডিয়া তার দিকে উষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সে কথা  সে জানতে পারল না ।

ভেসিলিদের অঞ্চলটা ছিল পনেরো মাইল দূরে। সেখানে বাইসাইকেলনিয়েগেলেওসময় এবং ক্লান্ত লাগে। ঘোড়ায় চড়ে গেলেও যাওয়া যায়, কিন্তু ঘোড়াটাকে যত্ন করতে হয়। প্রচন্ডশীতকালে অবশ্য ঘোড়ায় টানা দুজনের- চারজনেরস্লেজগাড়িতে দ্রুত যাওয়া যায় । সেরকম দিন আসতে সময় লাগবে । তাই পিটার যেলেনক’ভ দুয়েকদিন আসা যাওয়া করার পরে ভেসিলিদের গ্রামে থেকে যাওয়া মনস্থকরলেন।তাঁর সঙ্গের ভ্লাডিমিরভেলিক্স এবং য়ুরিফমিসেভ ও সেখানেই বাসর পাতলেন। তাঁরা আলাদা আলাদা করে রইলেন, যাতে সেই পরিবার থাকা প্রতিবেশী মানুষগুলিকে তাদের অহিংসা প্রতিরোধের কথা বোঝতে পারে।‌

পিটার যেলেনক’ভ মহাশয়ের কথা জানতে পেরে আশেপাশের অঞ্চলের নেতাদের মতো দুই একজন শিক্ষিত মানুষ তাদের কাছে আসতে শুরু করল। রুশদেশীয়গোড়াগির্জাঘরের বিশপ জাতীয় একজন উচ্চ ধর্মগুরুও এলেন। টলস্টয়েরজীবিতাবস্থায় তাদের গির্জা এবং গির্জার অফিসাররা অনেক সমালোচনা করেছিল যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে টলস্টয়বাদেরনিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের কথা ধর্মগুরুটিরমনঃপুত হল এবং ভ্লাডিমিরভেলিক্স এবং য়ুরিফমিসেভের সঙ্গে সরকারি শক্তিকে কীভাবে বাধা দেবে তার কথা সাধারণ চাষিদের বোঝাতে লাগল।


আরো পড়ুন: মহানগরের নয়জন নিবাসী (পর্ব-২১) । ডঃ দীপক কুমার বরকাকতী


সময়সীমা পার হয়ে যাবার পরেও পিটার যেলেনক’ভ মহাশয়ের দলটি সরকারি পক্ষ দখল করার জন্য আসবে বলেকয়েকদিন অপেক্ষা করতে হল। কিন্তু যেদিন এল তারা ঘোড়ায় উঠে আসা ১০ জনের একটি সশস্ত্র দল দেখতে পেল । দলটি যেন শত্রু পক্ষের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য সমুখ  সমরে বেরিয়ে এসেছে। গরম কাপড় পরা আরক্ষীদের পিঠে লম্বা লম্বা বন্দুকের সামনে ঝলমল করছিল বেয়নেটগুলি। কোমরে ছিল দীর্ঘ তরোয়াল এবং ঘোড়ার গদির সামনের দিকে জিনে ঝুলছিল এক একটি দীর্ঘ লাঠি। 

পিটার যেলেনক’ভ,তাঁর সঙ্গের টলস্টয়বাদীরা এবং ধর্ম গুরুর মতো অন্যান্য নেতারা, দলবেঁধে থাকা মাটির মালিক এবং চাষীদের সামনে দাঁড়িয়েরইল। ভাবতে না পারা ধরনের সমরসজ্জা দেখে ওদের মুখ শুকনো হয়ে পড়ল। বলশেভিকদের আন্দোলনকে বাধা দেবার জন্য জারবাহিনীও এভাবেই সুসজ্জিত হয়ে এসেছিল। এখন ওদের নিজের সরকারই ওদের সামনে সামরিক বাহিনী দাঁড়করিয়েছে।

খোলা জায়গাটাতেবয়ে চলা ঠান্ডা বাতাস কয়েকজনের টুপি উড়িয়েনিয়ে যাবার মতো ব্যবস্থা করেছিল। দুঃখের ব্যাকুলতা ঢেকে এক হাতে টুপি ধরে মাঝের কয়েকজন এক একটি ফলক তুলে ধরল। তাতে লেখা ছিল– আমাদের মাটির আমরাই মালিক। আমাদের স্বত্ব অন্যকে দেব না। আমরাও দেশকে ভালোবাসি।

আরক্ষীরদলটির সামনে অনেকগুলি ধাতুর তারার চিহ্ন থাকা বোতাম থাকা একজন অফিসার একটা মেগাফোননিয়ে এসেছিল। তিনি চারপাশের পরিবেশ দেখে সেই ধ্বনিবর্ধকচোঙাটা হাতে নিয়ে জোরে জোরে ঘোষণা করেছিলেন–’১৯২৮ সনের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুসারে এই অঞ্চলের জমিতে সমবায় ভিত্তিতে কৃষির যৌথপাম স্থাপন করা হবে। ব্যক্তিগত মালিকানা স্বত্ব থাকবে না। আপনারা সরে যান এবং আমাদের মাটির দখল নিতে দিন।’

পঞ্চাশ জনের মতোচাষি মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পিটার যেলেনক’ভ এবং অন্যান্য টলস্টয়বাদীরা ধীর-স্থিরভাবেদাঁড়িয়েরইল। ফলক নিয়ে থাকা তিনজন মানুষ ফলকগুলিকে আরও ওপরে তুলে ধরল।

মেগাফোননিয়ে থাকা অফিসারটি আরও দুবার ঘোষণা করল এবং মাঝেমধ্যেবাহাতেমোছে তাও দিতে থাকা কাছের স্বল্পভাষীআরক্ষী অফিসার একজনের দিকে তাকাল। তিনি দুজন অশ্বারোহীকে সঙ্গে নিয়ে ধীরে ধীরে মানুষগুলির কাছে এগিয়ে গেল । মানুষ গুলির মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। পিটার যেলেনক’ভ মানুষগুলির দিকে ঘুরে তাকিয়ে জোরে জোরে বললেন–’ আপনারা ভয় পাবেন না। শান্তভাবে জায়গাতে বসে পড়ুন। আপনারা বসে পড়ুন।’

ধর্মযাজকটিও উল্টে মানুষগুলিকে বললেন–’ বসে পড়ুন।’

তারা সবাইকে হাতের ইশারায় বসার নির্দেশ দিলেন।

লোকগুলি বসে পড়ল যদিও শান্ত হতে সময় লেগেছিল।

মানুষগুলির সামনের সারিতে পিটার যেলেনক’ভের কাছে ভ্লাডিমিরভেলিক্স বসে ছিলেন। তিনি দেখলেন মাঝেমধ্যেমোছেহাতবোলানো আরক্ষী অফিসারটি যেন তার পরিচিত ।সে তরতাজা – ত্রিশের গন্ডি পার হয়েছে কি না দৃষ্টি প্রখর । তিনি অন্য দুজনকে সঙ্গে নিয়েঘোড়ার সঙ্গে ধীরে ধীরে মানুষগুলির সামনে উপস্থিত হলেন। তারপরে প্রথম সারির মানুষগুলিকে একজন একজন করে দেখে ঘোড়াটা সামনের দিকে চালিয়ে যেতে লাগলেন। মধ্যবয়সীভ্লাডিমিরভেলিক্সের সামনে পৌঁছাতেই তিনি অল্প সময়ের জন্য ঘোড়াটাদাঁড় করালেন এবং তার দিকে একদৃষ্টেতাকিয়েরইলেন ।

অফিসারের চোখ থেকে নির্গতহওয়া বিদ্যুতের চমক ভ্লাডিমিরভেলিস্কের দুচোখের মধ্য দিয়ে যেন বুকে প্রবেশ করল। অফিসারটি অভ্যাসবশত বা হাতটা মোছের কাছে তুলে ধরল। কিন্তু মোছে তাও না দিয়ে মাথার টুপিটা নাড়িয়েকিছুটা ঠিক করে নিল। তারপর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে সরে এসে সমবেত হওয়া মানুষের সামনের সারির শেষ পর্যন্ত গেল। সেখান থেকে তিনি ঘোড়াটা কদমে চালিয়ে ঘোষণা করা অফিসারের কাছে সঙ্গের দুজনের সঙ্গে দ্রুত এগিয়ে গেলেন।

তিনি মেগাফোন নিয়ে থাকা অফিসারের সঙ্গে দু’একটি কথা বললেন। মেগাফোনের ঘোষণা পুনরায় শোনা গেল–’ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুসারে–’

ঘোষণার শেষেও মানুষগুলির অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হল না। মেগাফোননিয়ে ঘোষণা করা অফিসারটি মোছে তাও দেওয়া অফিসারটির দিকে তাকিয়ে বলল–’ সার্জেন্ট নিকোলাইয়াগুটকিন এখন আপনার কাজ।’

‘ হ‍্যাঁ,মহাশয়।’

নিকোলাইয়াগুটকিনঘোড়ার পিঠে বসে অফিসারের আদেশ মাথা পেতে নিল।

সার্জেন্ট পাঁচজনঅশ্বারোহীকে সামনে আসতে আদেশ দিলেন। তাদের পিঠে চক চক করতে থাকা বেয়নেটযুক্ত বন্দুক ছাড়াও কোমরে থাকা তরোয়াল এবং বসে থাকা স‍্যাডেলের কাছে পিঠে এক একটি লাঠি ছিল।লাঠি গুলি হাতে নিয়ে তারা ঘোড়াগুলি কদমে মানুষের সারির দিকে চালিয়ে নিয়েগেল।মানুষ গুলির মধ্যে উত্তেজনার ঢেউ ছড়িয়েগেল।সামনের সারিতে নিথর হয়ে বসে থাকা টলস্টয়বাদীদের কাছ থেকে সার্জেন্ট নিকোলাইঘোড়া গুলিকে তক্ষুনি ঘুরিয়ে পুনরায় আগের স্থানে নিয়ে গেল এবং সেখান থেকে প্রত্যেকেই তীব্র গতিতে ঘোড়া চালিয়ে মানুষের মাঝখানে লাফিয়ে ঢুকে গেল।

পিটার যেলেনক’ভের সঙ্গে কয়েকজন হাত তুলে বাধা দিতে চেষ্টা করল যদিও ঘোড়াগুলি তাদের উপর দিয়েলাফিয়েপেছনের মানুষগুলির ওপরে পড়ল।ঘোড়ার ক্ষুর অথবা লাঠির আঘাতে মানুষ আহত হতে লাগল।রক্তের ধারা বইতে লাগল।আহত মানুষগুলি উঠে এদিকে ওদিকে দৌড়াতেলাগল।আহত মানুষগুলি লেংচেলেংচে সরে পড়তেলাগল।কিছুক্ষণের মধ্যে মানুষগুলি ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল।রক্তে মাখামাখি হয়ে চারজন চাষি মাঠেই গড়িয়ে পড়ল।

টলস্টয়বাদীকয়েকজন তখনও সেখানে দাঁড়িয়েছিলেন।তারা কম বেশি পরিমাণে আহত হয়েছিলেন যদিও দুজন তাদের হাতের ফলক গুলি তুলে ধরেছিলেন।কাঁধে তারা চিহ্ন এবং বাহুতে লাল রঙের রিবন ঘেরা অফিসারটি তাদের কাছে এল এবং ফলকগুলি ছিনিয়েনিয়েঘোড়ার পিঠ থেকে হাতের লাঠিটা পিটার যেলেনক’ভের দিকে দেখিয়ে বলল–’এখন ও প্রতিরোধ করবেন কি?’

পিটার যেলেনক’ভ বললেন–’হ্যাঁ ,মহাশয়।আমরা ভূমি দখলের নীতির অহিংস প্রতিরোধ করেই যাব।’

অফিসারের মুখে একটা শ্লেষ যুক্ত হাসি ছড়িয়ে পড়ল। 

তখনই দূরের একটা বাড়ির কাছে হুলুস্থূল শোনা গেল।আরক্ষী অফিসারদের সঙ্গে দুজন অসামরিক অফিসারও এসেছিলেন।তারাদুই একটি বাড়ির দখল নিতে শুরু করেছিল।তাদের সাহায্য করছিল আরক্ষীঅফিসাররা।সেই সময়ে অনর্থ ঘটল।একটা ঘরের ভেতরে স্তূপ করে রাখা লম্বা লম্বা নালের চাষের সূঁচলো সরঞ্জাম নিয়ে কুড়িজনেরমতোচাষিউত্তেজিত হয়ে আরক্ষী অফিসারদের আক্রমণ করতে লাগল।পাঁচজন অফিসারকে ওরা আহত করল।তার দুজন ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে পড়ল।তাদেরইএকজনকেখুঁচিয়ে মারার জন্য একজন হৃষ্টপুষ্ট চাষি দৌড়ে এল।আরক্ষীরাপিঠের বন্দুক সামনে এনে লক্ষ্যস্থির করে গুলিবর্ষণ করতে লাগল।ওদের বন্দুকের সামনে থেকে ধোঁয়া উড়তে লাগল।

কয়েকজন চাষি ঢলে পড়ল।

দূর থেকে দেখতে থাকা পিটার যেলেনক’ভ অবশ হয়ে জায়গাতেই বসে পড়লেন।

সন্ধ্যের মধ্যে আরক্ষী এবং সরকারি অফিসারের দল অঞ্চলটিরপ্রায়গুলি বাড়ি দখল করে ফেলল।কোনো একটি খালি ঘরে আঘাত পাওয়া কয়েকজন মানুষের সঙ্গে পিটার যেলেনক’ভ বসে ছিলেন।তিনি নিজেও ডান হাতে আঘাত পেয়েছিলেন এবং হাতটা কাপড়ে বেঁধে গলা থেকে ঝুলিয়েরেখেছিলেন।তিনি বললেন-‘হিংসা হিংসাকে আহ্বান করে।আপনারা চাষের সরঞ্জাম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করলে আমাদের চারজন মানুষকে হারাতে হত না।’

‘কিন্তু’-তখনও উত্তেজিত হয়ে থাকা একজন চাষি বলল-‘তার আগেই লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আমাদের বেশিরভাগ লোককে ওরা আঘাত করেছিল।সঙ্গেপাঁচজনকে ধরাশায়ী করেছিল।তারইতিনজনবাঁচল যদিও দুজনের মৃত্যু হল।’

উত্তেজিত মানুষটির প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে পিটার যেলেনক’ভ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন।তাঁরগান্ধীর কথা মনেপড়ল।নিষ্ক্রয় প্রতিরোধ শব্দদুটিগান্ধীর দুর্বল অস্ত্র হিসেবে বড় সংকীর্ণ গণ্ডির বলে মনে হচ্ছিল।যেন কোনো ঘৃণার ভাবের দ্বারা এই শব্দদুটির উদ্রেক হয়েছিল এবং হিংসাই যেন তার পরিণতি।

পিটার যেলেনক’ভগান্ধীর এই ধারণার বাস্তব পরিণতিতেমনে মনে অবাক হলেন।এখানকার মানুষগুলি এই সত্যাগ্রহ আন্দোলনকে কীভাবে নিয়েছে?ভূমিস্বত্ব রক্ষা করাটাই যে আন্দোলনেরলক্ষ্য এবং সত্যতা সে কথা হয়তো বেশিরভাগ মানুষই উপলদ্ধি করে নি।তাঁরা হয়তো ঘৃণার ভাবের বশবর্তী হয়ে সত্যাগ্রহ করেছে এবং শেষে আন্দোলনের মধ্যে এই অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

পিটার যেলেনক’ভ কিছু সময় চুপ করে রইলেন।তারপরে বললেন-হিংসা আমাদের পথ নয়।হত্যা রোধ করার জন্য হত্যা করাটা টলস্টয়বাদনয়।অহিংসার পথে ভূমিস্বত্ব রক্ষা করাটাই আমাদের লক্ষ্য।আর সেটাই আমাদের আন্দোলনের সত্যতা।

তাঁর পুনরায় গান্ধীর কথা মনে পড়ল।তিনি বললেন-গান্ধী বলেছিলেন অহিংসা আমাদের কর্তব্য।আমরা তা সম্পূর্ণভাবে জীবনাদর্শেপ্রদ্রর্শন করতে না পারলেও দার্শনিক সারমর্মউপলদ্ধি করার জন্য চেষ্টা করা উচিত এবং হিংসাজনিত কার্য সংঘটিত করা থেকে বিরত থাকা উচিত।তিনি বলেছিলেন-‘একটা চোখের বিনিময়ে অন্য একটি চোখ কেড়ে নিলে একসময় গোটা পৃথিবী্টা অন্ধ হয়ে পড়বে।’

মানুষগুলির মাঝখানের আধপাকা দাড়ি থাকা কয়েকজন অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

এই পরিস্থিতির মধ্যে ভেসিলিকে যে জীবিত বা মৃত কোনো অবস্থাতেই অঞ্চলটিতে পাওয়া গেল না সে কথা কেউ মনে করল না।

দশদিন পরে নাডিয়াপ’পভনার বাড়ি থেকে সাত মাইল দূরের অঞ্চলটিতে টলস্টয়বাদী ভলকভরিয়া জনভের নেতৃ্ত্বে,সঙ্গে শ্বিগানকঝুঝু’পভ এবং মিখাইল ভেসিলিয়েভের সহযোগে যখন গান্ধীবাদী আন্দোলনের প্রচার একটা বড় মাত্রা পেয়ে গেল,তখন সেখানে ভেতরের অঞ্চল থেকে আগত একজন কুলাক এবং দুজন ক্যাথলিক যাজকওএসে তাতে যোগ দিলেন।

জন মিক্সিম’ভিছ নামের একজন কুলাক ছিলেন সম্পদশালী কৃ্ষক। তাঁর কুলাকের জন্য নির্ধারিত চব্বিশ একরের চেয়ে অনেক বেশি মাটি ছিল এবং সঙ্গে ছিল মাটিতে চাষ করার জন্য কয়েকটি চাষিপরিবার।তাঁর মাটি সম্পত্তি যৌথ পামের জন্য গেল।সঙ্গে গেল সামাজিক প্রতিপত্তি এবং সম্মান।তাছাড়া তাঁর গরু গাই,ঘোড়া ইত্যাদি গৃহপালিত জন্তু জানোয়ার,সৌখিনবাসনপত্র থেকে সাধারণ হাতা পর্যন্ত সরকারি পক্ষ ক্রোক করে নিয়ে গেল।নিজের স্থিতির জন্য মানুষের সাহায্য চেয়ে চেয়ে তিনি হতাশ হলেন।কেননা সরকারের পক্ষ থেকে তাকে সাহায্য করায় নিষেধাজ্ঞাছিল।মলিন হয়ে পড়া আগের মূল্যবান কাপড় পরিহিত অবিন্যস্ত চুলের কুলাকটি জন মেক্সিম’ভিছ মানসিক ভারসাম্য কিছুটা হারিয়ে একই কথাগুলি বারবার বলতে লাগল।তিনি তার মধ্যে একটি কথা বলেন-‘এরকম অবস্থা যেন পরম শ্ত্রুরও না হয়,তার জন্য কিছু করতে পারি কিনা ভেবে আমি আপনাদের কাছে এসেছি।’

আঘাতপ্রাপ্ত হলেও পিটার যেলেনক’ভ অন্য দুজন সহযোগী নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন।তিনিভলক’ভরিয়াজনভ’কে বললেন –’ভেসলিদের ওখানে হওয়া ভুল যাতে এখানে সংঘটিত না হয়। মানুষগুলি যাতে চাষের সরঞ্জামকে অস্ত্র হিসেবে নিয়েআরক্ষীর সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ না হয় ।’

তিনি ভেসিলিদের  অঞ্চলে তিন দিন অনশন ধর্মঘট করে এসেছেন। চাষিদের  প্রতি আক্রমণের পরে তাঁর মনে পড়ছিলমহাত্মা গান্ধী আফ্রিকায় থাকার সময় তাঁর স্থাপিত ফিনিক্সফার্মে থাকা দুজন যুবক ছেলের চারিত্রিক স্খলনে অখুশি হয়ে এক সপ্তাহের জন্য প্রথম অনশন করার কথা। তারপরে গান্ধী চার মাস পর্যন্ত একবার আহার করেছিলেন।তাঁর এই অনশন চারিত্রিক স্খলন কার্যের গম্ভীরতা এবং গান্ধীর মনে লাগা আঘাতের কথা সেই দুইজন যুবক ছেলেকে নয় সমূহ ফিনিক্স  ফার্মবাসীকে মনে রেখাপাত হওয়ারমতো  বুঝিয়ে দিয়েছিল। সেই কথা মনে পড়েই পিটার যেলেনক’ভ ভেসিলিদেরএকদলচাষবাসের সরঞ্জাম নিয়ে করা আক্রমণের বিরোধিতা করে আরক্ষী এবং অফিসার দখল করা অঞ্চলের মধ্যে তিন দিন অনশন করেছিল। ঘুরে বেড়ানো দু’একটি চাষিও তাঁর কাছে এসে কিছু সময় কিছুই বুঝতে না পেরে বসেছিল। তার মধ্যে আক্রমণে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া দুজন কৃষক ও ছিল।

ওদের পিটার যেলেনক’ভ বলেছিলেন-‘ আক্রমণ করাটা হিংসার প্রতীক। কিন্তু আমাদের প্রতিরোধ অহিংস। আমাদের এখানে যে হিংসার কার্য হল তার জন্যই আমি অনশন করছি। এটাই আপনাদের করা পাপ কাজের জন্য আমার প্রায়শ্চিত্ত।’

তাঁর কাছে এসে ভ্লাডিমিরভেলিক্স এবং য়ুরিফমিশেভও এসে বসে ছিলেন।তাঁরাও কাছে আসা মানুষদের কথাগুলি বুঝিয়ে বলছিলেন। বেশিরভাগ মানুষই কিন্তু কথাগুলি বুঝতে পারছিল না। মাঝেমধ্যে আগত আরক্ষী এবং অফিসাররা হিংসা এবং হত্যার বিরোধ করা তারা কোন পক্ষের বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে তাকাচ্ছিল এবং ফিসফিস করে কথা বলছিল ।

শ্বিগান’ক ঝুঝুপ”ভ এবং মিখাইল ভেসিলিয়েভযেলেনক’ভের উপদেশ মেনে চাষের সরঞ্জামগুলি সরিয়ে রাখার জন্য বিশেষভাবে চেষ্টা করলেন। মানুষগুলিকে বললেন– আপনারা যেন কোনো অস্ত্র হাতে তুলে না নেন। আমাদের অহিংস আন্দোলনে হিংসার কোনো স্থান নেই। আমাদের লক্ষ্য ভূমিস্বত্ব। সেটাই সত্য এবং তার জন্যই আমাদের সত্যাগ্রহ।’

আরক্ষী এবং অফিসারের  দল সেই অঞ্চলটির মাটি দখল করার জন্য আসার দিন ভলক’ভ রিয়াজন’ভ  পিটার যেলেনক’ভ এবং অন্যান্য সহযোগীদের সঙ্গে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সর্বস্বান্তহওয়াকুলাকটি এবং ক্যাথলিক ধর্ম যাজকদুইজনও তাদের সঙ্গে ছিল।ভেসিলিদের অঞ্চলে যোগ  দেওয়ারুশদেশীয় গির্জার দীর্ঘ পাকা দাড়িরধর্মগুরুটিও হাতে একটা লাঠি নিয়েটলস্টয়বাদীদের  সঙ্গে এক সারিতে দাঁড়িয়েছিলেন। তাছাড়া আগেরবার বিদ্রোহ করা তিন জন চাষিও এসে তাদের শোভাযাত্রায় যোগ দিয়েছিল।

জনসমাবেশএকশো  জনের মতো বৃদ্ধি পেতে  দেখে পিটার যেলেনক’ভের ভালো লাগলো এবং ভলক’ভ রিয়জনভের দিকে  সন্তুষ্ট মনে তাকালেন।

ক্রোক করতে আসা আরক্ষীদের সংখ্যা আগের চেয়েবেশি ছিল । ওরা আগের মতোই ধ্বনিবর্ধকমেগাফোনে ঘোষণা আরম্ভ করল। ঘোড়ায় দুবার শক্তি প্রদর্শন করল। কিন্তু প্রথম সারিতে অপেক্ষা করতে থাকা টলস্টয়বাদীদের আশ্বাসে মানুষগুলি অস্থির হলেও এক জায়গায় বসে রইল। হাতে নিয়ে আসা ফলকের সংখ্যা এবার বেশি ছিল। তাদের কয়েকজন ফলকগুলি তুলে ধরল।

কেউ একজন স্লোগান দিল–’ আমাদের মাটির–’

জনা পাঁচেক সায় দিয়ে চিৎকার করল–’ আমরাই মালিক।’

অন্য কেউ একজন চিৎকার করল–’ আমাদের স্বত্ব –’

অন্যেরাসায় দিল – ‘অন্যকে দেব না।’ 

অন্য একজন শ্লোগান দিল–’ আমরাও দেশকে–’

সমস্বরে বলতে শোনা গেল–’ ভালোবাসি।’

শোভাযাত্রার সামনে অশ্বারোহীঅরক্ষীর টহল বেশি হল। শোভাযাত্রার শ্লোগান ধ্বনি  বেশি হতে দেখে আরক্ষী  ঘোষক পুনরায় শেষবারেরমতো জনতাকে সরে যাবার জন্য ঘোষণা করলেন এবং কিছুক্ষণ পরে অশ্বারোহীর দল শোভাযাত্রার মধ্যে ঢুকে পড়ল।

মুহূর্তের মধ্যে হুলুস্থুল  লেগে গেল। মানুষগুলি এদিকে ওদিকে ছুটে পালাতে লাগল। ধীরে ধীরে মানুষগুলি মুক্ত মাঠ এবং মাঝে মধ্যে থাকা ঝোপের বনানীতে অদৃশ্য হল। আঘাতপ্রাপ্ত দুই একজন মানুষ খোলা মাঠের এখানে সেখানে পড়েরইল।

শোভাযাত্রা বসা জায়গায় টলস্টয়বাদী কয়েকজন যাজক দুজনের সঙ্গে বসেছিলেন।তাদের কয়েকজনের আঘাত লেগেছিল।তারা সবাই কাছাকাছি চলে এল।অশ্বারোহী ঘোষক এবং সার্জেন্ট নিকোলাইয়াগুটকিন তাদের কাছাকাছি চলে এল।তাদের চারপাশে দুজন ধীরে ধীরে ঘোড়া চালিয়ে ঘুরতে লাগল।নিকোলাই নামে সার্জেন্টটি তার মধ্যে সুযোগ বুঝে অভ্যাসবশতঃ হাতের লাগামটার সঙ্গে মোছে হাত তুলল।তারপরে ডানহাতের লাঠি নয় উন্মুক্ত তরবারি একটা নিয়ে মাঠের ঘাসে বসে থাকা মানুষগুলির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল-‘এখনও তোমরা বাধা দেবে নাকি?’

পিটার যেলেনক’ভ দুর্বল হলেও স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন-‘হ্যাঁ,আমরা আমাদের দাবি জানাতে থাকব।প্রতিরোধ করতে থাকব-‘

‘প্রতিরোধ?’-মেগাফোন হাতে আরক্ষী অফিসারটি চিৎকার করে উঠলেন-‘কত অস্ত্র-শস্ত্র আছে তোমাদের?’

‘আমাদের অস্ত্র অহিংসা।তাঅদৃশ্য।কিন্তু আমরা তার দ্বারাই প্রতিবাদ করব।তা দিয়েই প্রতিরোধ করব-।’

দুজন অশ্বারোহী মানুষগুলির চারপাশে দুটো ঘোড়া চালিয়ে হাসতে লাগল।তারপর ঘোষক আরক্ষী অফিসারটি বললেন-‘প্রতিরোধ করতে থাক।‘

তিনি জোরে হেসে উঠলেন এবং ঘোড়াটা সরিয়ে অন্যজনের সঙ্গে অসামরিক অফিসার দুজনকে নিয়ে অন্য কিছু কাজের তদারক করার জন্য সরে গেলেন।

টলস্টয়বাদী দলটা শুকনো মনে সেখানে বসে রইল।

সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত কারও মৃত্যুর খবর এল না।ইতিমধ্যেআরক্ষীদের তত্ত্বাবধানে এখানে সেখানে থাকা ভালো ঘরগুলিতে অফিসাররা ঢুকে কার্যালয় স্থাপন করার শলা পরামর্শ করতে লাগল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত