পিনাকী

পুনঃপাঠ গল্প: আমার বন্ধু পিনাকী । সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

Reading Time: 8 minutes

পিনাকীর মৃত্যুর খবর এল বিকেল পাঁচটা নাগাদ। আর ঠিক আড়াই ঘণ্টা পরে ওর আমাকে ফোন করার কথা। মাত্র গতকালই কথা হয়েছিল, আজ সন্ধেবেলাটা আমরা লেক ক্লাবে বসব। ও যেন গেটে দাঁড়িয়ে থাকে। ঠিক আটটার সময়। যখন আমি যাব।

‘তা হলেও। ফোন করে নিস একবার।’ আমি বলেছিলাম ওকে।

‘ক-টায়?’

‘তুই তো জানিস সব। আমি ক-টায় হেঁটে ফিরব। কখন বাথরুমে যাব। কখন চা নিয়ে বসব।’ ‘সাড়ে সাতটায়?’

‘এগজ্যাক্টলি।’ আমি বললাম, ‘ঠিক ওই সময়টা আমি চা নিয়ে বসি। যখন ষ্টার প্লাসে দ্য অ্যান্ড বোল্ড দি বিউটিফুল হয়। আমি ওটা দেখি।’

আজ ঠিক সাড়ে সাতটায় ফোন করত পিনাকী। যেই সিরিয়াল শেষ।

শেষ মুহূর্তে আজকের সবার ব্যাপারটা অনির্দিষ্টকালের জন্যে আমাকে পিছিয়ে দিতে হল কি না, জেনে নিত। কেননা, কত কিছুই তো হতে পারে। চা আর চুমুকের মধ্যে। সুমন্তদা হাজির হলেন হয়ত। আমার ইনকাম ট্যাক্সের উকিল। বা, রামপুরিয়া। আমার বর্ধমান রোডের জমিতে যে মাল্টি স্টোরিড তুলছে। তখন তো আর ওকে নিয়ে বসার প্রশ্ন ওঠে না। ওদের তদ্বির সবার আগে। বাস ছেলেমেয়ের কে বেরিয়ে গেল সিয়েলোটা নিয়ে। হাতে রইল পেন্সিল। মানে, ওই মারুতি জিপসিটা। কিন্তু, সন্ধ্যার পর ওটা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আমি যেতে চাইলেও ড্রাইবার সিধু একদম মুখের ওপর ‘না’ করে দেবে, ‘মায়জিকো বসনৎ রায়মে যানা হ্যায়।’ চোদ্দর-বি বসন্ত রায় রোডে ফি রবিবার ভজন হয়। সাঁইবাবা। গলায় ছোট আর বড় দুটো সোনার হার পরে সুদেষ্ণা সেখানে যায় ।

বাস! তা হলেই আমার টেংরি খোলা। আমার তো আর পিনাকীর মতো, দেদার ট্রাম-বাস নেই। সবেধন, ওই দুটি নীলমণি। ট্যাক্সি? আরে বাবা, টেরাসে গাড়িই যদি পার্ক করতে না পারলাম, তা হলে আর লেক, স্যাটারডে, ক্যালকাটা ক্লাবের মেম্বার হওয়া কেন। ক্যালকাটা ক্লাবের কথাই ধরা যাক। ক্লাব গেটে আমার গাড়ি উঁকি দিলেই রামাশিস এগিয়ে আসবে, নীল উর্দি, কাঁধে স্ট্রাইপ, বুকে তকমা, ‘আপনি নেমে আসুন সার, আমি পার্ক করে রাখছি’, তবে না! বেরিয়ে আসার সময় একবার শুধু ল্যান্ডিং-এ দেখা দেওয়া। গাড়ি এসে দাঁড়াবে বারান্দার নিচে। গেট খুলে দাঁড়াবে রামাশিস। দশ টাকা দামি সেলাম ঠুকে, পাবে পাঁচ। আসলে, ওয়ান্স ইন এ ব্লু মুন, আমি ওকে দশও দিই। কিন্তু সেটা যে ঠিক কবে, ও তো জানে না। তাই এ অনুপপত্তি। আর, আমি মরি হেসে। এ আমারই বুদ্ধি। যাই হোক, পিনাকী জানে সবই। ফোন করে, তবে ও ক্লাবে আসত। দাঁড়িয়ে থাকত গেটে।

ক্রেডেল রিসিভার নামিয়ে রাখতে রাখতে আমি জেনে গেলাম, আমার বেঁচে থাকা থেকে পিনাকীকেও আমি একইভাবে নামিয়ে রাখছি। এখন থেকে আমার জীবন হবে পিনাকী-বর্জিত। আমার দেশের বাড়ি মুড়াগাছায়। নদীয়ায়, একদম জলঙ্গি নদীর ওপর। গেটের দু-পাশে ঠাকুর্দার আমলের দুটো মস্ত পাম গাছ। আমার প্রথম জন্মদিনে চারাদুটি বসানো হয়। চুয়াল্লিশ বছর ধরে পাশাপাশি বড় হবার নির্মন প্রতিযােগিতা। সেবার কালবোশেখি। একটার মাথায় বাজ এসে পড়ল। যাকে বলে দু-ফাঁক হয়ে গেল ব্রহ্মতালু। তারপর শুকোতে লাগল। শেষ পর্যন্ত কেটে ফেলা হল। কী হল তাতে? অন্যটির কী তাতে কিছু এল-গেল। পাম-বংশ কি নির্বংশ হয়ে গেল? দিব্যি বেঁচে আছে। এবং, একা-একাই।

পিনাকীর ছেলে কাটু বলল, আজ দুপুর দুটো কুড়িতে মারা গেছে পিনাকী।

‘দুটোয়? আর তুমি পাঁচটায় খবর দিচ্ছ!’

‘দেখুন কাকু। আপনি তখন ঘুমোচ্ছিলেন।’

এই মুহূর্তে আমার পায়ে অ্যাডিডাস, পরনে সাদা গ্যাবার্ডিন শটস। বাঁ-দিকে টার্কোয়েজ ব্লু স্ট্রাইপ। ড্রাইবার সিধু এখন আমাকে ভিক্টোরিয়ায় ছেড়ে দিয়ে আসবে। ক্লোরেসস্টরেল, সুগার, প্রেসার এগুলোকে ভ্রণে-হত্যা করার জন্য আমি এখন ঝাড়া পঞ্চান্ন মিনিট ভিক্টোরিয়ায় হাঁটব। আড়াই পাক।

একটু চুপ করে থেকে আমি বললাম, ‘কিন্তু, আমি তো এখুনি হাঁটতে বেরিয়ে যেতাম।’

‘আমি জানি কাকু। আর সেই জন্যেই তো এখনই ফোন করলাম।’

আর ক-মিনিট পরে ফোনটা এলে আমার জীবন থেকে অন্তত আজকের হাঁটাটা বাদ যেত না। আমি জানি, এটা আমার পক্ষে কত জরুরি। আমার বাবা, ঠাকুর্দা, ছোট কাকা, তিনজনেই মারা গেছেন হার্ট অ্যাটাকে। মাদ্রাজের অ্যাপেলো থেকে ডাঃ রঘুবীর এসে ওপেন-হার্ট করলেন বাবার। বরদান করে গেলেন। আরও বারাে বছর। বছর ঘুরল কি? আসলে, ওইসব ট্রেড-মিল, আলট্রা সোনোগ্রাফ, সব বাজে। সার্জনগুলো প্লাম্বারের অধম। অবশ্য, স্ট্যান্ডবাই হিসাবে ওরাও আছে। আমার। কিন্তু, আসল ব্যাপার হল এই হাঁটাটা। হেঁটে গলদঘর্ম হওয়াটা। এটাই প্রকৃত দেহরক্ষী। যার উপর আমি আস্থা রাখি। এবং রেখে ভুল করি না। পঁয়তাল্লিশ পার হচ্ছি, একটা অম্বলেরও ব্যাথা হয়নি কোনো দিন বুকে। নাগাড়ে ঝড়বৃষ্টি হলে আলাদা, নইলে এই ভিক্টোরিয়ায় হাঁটাটা আমার ধর্ম।

ফোন রেখে দেবার পর আমার কাছে তাই সমস্যা হয়ে দাঁড়াল আজকের হাঁটাটা। আমি কী আজকে হাঁটতে যাব। না, যাব না?

বছর খানেক আগে একদিন সন্ধেবেলা খুব অবাক করে দিয়েছিল। সবে একপাক দিয়েছি। দেখি, আমার হাঁটার রাস্তায় একটা বেঞ্চিতে পিনাকী। উঠে দাঁড়াল, তাই দেখতে পেলাম।

জানুয়ারির সন্ধে। সাড়ে পাঁচটাতেই অন্ধকার। আমাকে হাঁটতে হয় খুব দ্রুত, বিশেষত শীতে। কারণ, শীত যতই পড়ুক, ঘাম আমাকে ছোটাতেই হবে। আর ওই আড়াই পাকের মধ্যে । আমি তাই, ওকে দেখেছি বলে, হাঁটা থামাতে পারি না। পিনাকীও হাঁটা শুরু করল। বেচারা পিনাকী! সেদিন মায়াই হয়েছিল। কারণ, ওর ঠ্যাংদুটো তো আমার মতন লম্বা-লম্বা নয়। আর হন্টন-শিল্পে অভিজ্ঞতা বলতেও ওর নেই কিছু। আমার পিছু-পিছু সেদিন প্রায় দৌড়তেই হয়েছিল ওকে।

কেন এসেছিল, বলেনি। আর কখনও আসেনি ওভাবে। তাই এটা একটা রহস্যই থেকে গেছে। শুধু বলেছিল, ‘এমনি।’ আমি ওকে মাঝে মাঝে ডাকি আমার ক্লাবগুলোয়। আড্ডা দিই। মদ-টদ খাওয়াই। ড্রাইভার পাঠিয়েও ডাকিয়ে এনেছি। ডাকলেই আসবে আমার নিঃসঙ্গতা ঘােচাতে, চেনাজানার মধ্যে এমন লোক আর কোথায়। তা ছাড়া ডাকতেও হয় না। নিজেই যত্র-তত্র থেকে ফোন করে খোঁজ নেয়। যে, আজ আমার দরকার হবে কি না। ওকে। সুদেষ্ণা এটা বোঝে। এবং, এ পর্যন্ত তার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু, তার ভয় অন্যত্র। একদিন, সে অসুখ-বিসুখ হোক, মেয়ের বিয়ের সময় হোক কিংবা, একটা ছোট-খাট ফ্ল্যাটই কিনতে গেল হয়ত — বেশ মোটা একটা টাকা আমার কাছে চেয়ে বসবে সে। আর, আমার পক্ষে তখন ‘না’ বলা সম্ভব হবে না। এই তার ভয়। আমি তাকে বলি, ‘খেপেছ তুমি! পিনু কিনবে ফ্ল্যাট? ওর ধারনা কি জান? ওর ধারণা, বাঁচার জন্যে যত তোড়জোড় নিরাপত্তা, বিষয় সম্পত্তি, টাকাকড়ি — এসব যদি শুন্যে রাখা যায়—তবে সেটাই স্বর্গীয়। এ দিক থেকে যে যতটা কমে আছে, সে তত কাছাকাছি — স্বর্গের।’ ঠোঁট উল্টে সুদেষ্ণা বলেছিল, ‘বুনো রামনাথ?’ তার ভয় যায়নি।

বুনো রামনাথ কিনা জানি না। তবে, একদিন ডায়োজেনিসকে নিয়ে আমাদের বেশ কিছু কথাবর্তা হয়। ডায়োজেনিসের বাড়ি বলতে ছিল একটা বাথটব। বিশ্বজিৎ আলেকজান্দার ওখানেই এসে দাঁড়ায়। রােদটা দাও গায়ে লাগাতে।’ এ সব আমারও জানা। এবং ঘটনাটা এই ছোটবেলাতেই একটুও ইম্প্রেসিভ মনে হয়নি আমার। আমার বরং ভালো লাগে ক্যানিয়ুটের গল্পটা। দাস ফার। অ্যান্ড নো ফার্দার।।

কীভাবে মারা গেল, সংক্ষেপে বলল কাটু। রবিবার, খেয়ে উঠতে আড়াইটে হয়েছিল, একবার বাথরুমে গিয়েছিল। এসে সিগারেট ধরিয়ে ইজিচেয়ারে বসে। পাশের ঘরে মা আর বোন শ্ৰীতপা। কাটু পান কিনতে বেরিয়েছিল। হঠাৎ, পোড়া-পোড়া গন্ধ। মা গিয়ে দেখে, জ্বলন্ত সিগারেট পড়ে আছে কোলে। গায়ে ছিল তুষের চাদর। পুড়ে যাচ্ছে চচ্চড় করে। মাথা আর একটা হাত লটকে আছে চেয়ারের বাইরে। ডাক্তার সার্টিফিকেটে লিখেছেন, মাসিভ সেরিব্রাল অ্যাটাক। তিন থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে মারা গেছে পিনাকী। একটুও কষ্ট পায়নি। জানতেই পারেনি। ডাক্তারবাবু সে-রকমই বলেছেন।

শুনতে শুনতে, স্মরণকালের মধ্যে এই প্রথম আমার বুকে একটা যন্ত্রণা হল। এবং বাঁদিকে। ঘামও দেখা দিল। একদম ক্লাসিক্যাল সিম্পটম। বাকি শুধু দম আটকে বমি আর পায়খানা পাওয়া। খুব ভয় পেয়ে গেলাম আমি, আমার হাত থরথর করে কাঁপতে লাগল।

‘কিন্তু, তুমি তো জানো কাটু’, আমি খুব অসহায়ভাবে বলতে লাগলাম, ‘শুনে আমার হাপ-পা কাঁপছে। এখন যদি যাই, ওকে দেখলে আমার হার্ট তো মোটেই ভালো নয় —

‘না-না, কাকু।’ কাটু ওপাশ থেকে আমার কথা ভেবে উদ্বেগ জানায়, ‘আপনার আসার একদম দরকার নেই। আত্মীয়স্বজন সবাই এসে গেছেন। শুধু হলদিয়ার পিসিমা বাকি। চোখে দেখলে হয়ত স্ট্যান্ড করতে পারবেন না আপনি। হয়ত আপনার কিছু হয়ে যাবে।’

“খুব কান্নাকাটি হচ্ছে?’

‘তা একটু —’

‘বাবার চাকরিটা পাবে তো তুমি?’

‘তা পাব কাকু।’ বাবার কথা ভেবে গলা বুজে এল তার, ছোট্ট ফোঁপানির শব্দও শুনতে পেলাম, ‘তবে গ্র্যাজুয়েশনের পরে হলে ইনস্পেক্টর পোস্টে নিত।’

‘না-না। যা পাচ্ছ, নিয়ে নেবে।’

‘হ্যাঁ। তাই করব কাকু। ছোটমামাও তাই বলছেন। আঃ —’ এইখানে কাকে যেন তাড়া দিয়ে আর বেশ ক্রুদ্ধকণ্ঠে সে ধমক দিল, ‘একটু অপেক্ষা করুন। কটা ডেড নিউজ দিচ্ছি আমি।’

‘তুমি কোথা থেকে করছ?’

‘বুথ থেকে কাকু।’

‘ঠিক আছে। ওঃ হো, আজ আসবে বলেছিল।’

‘হ্যাঁ।’

‘তুমি কী করে জানলে?’

‘মাকে বলছিলেন বাবা, সকালে।’

‘কী বলছিলেন?’

‘সকালেই বোধহয় ইন্ডিকেশন পেয়েছিলেন কিছু। বাজারে। বলছিলেন, হঠাৎ মনে হল পায়ের তলায় মাটি নেই। তলিয়ে যাচ্ছি তো যাচ্ছিই। সব অন্ধকার। তারপর ঠিক হয়ে গেল। আজ বোধহয় ভােম্বলের কাছে যাওয়া হবে না।’

‘পিনাকী আমার বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলের বন্ধু। ডাকনামে ডাকে।

‘আপনি নিউজ দিচ্ছেন, না, নিউজ স্টোরি?’ এই সময় তীক্ষ এক তরুণী-কণ্ঠ শুনতে পেলাম আমি।

‘আমি ছেড়ে দিচ্ছি কাকু’, কাটু বলল, ‘কাল সকালে আপনি আসছেন তো?’

আজ আমার সন্ধ্যার সঙ্গী বলতে কেউ নেই। আজ কোনো অ্যাপো নেই কারও সঙ্গে। বহুদিনের মধ্যে এই প্রথম আমি হাঁটতে গেলাম না। বাড়িতে ছেলেমেয়ে কেউ নেই। সুমন্তদার স্ত্রী এসে সুদেষ্ণাকে নিয়ে গেছেন বর্ধন মার্কেটে। চাট-ফাট খেয়ে কখন ফিরবে ঠিক নেই। আমি বাড়িতেই বসে গেলাম একটা জিন আর লাইম নিয়ে। সাতটা নাগাদ। আমার পক্ষে একটু তাড়াতাড়ি। দ্য বোল্ড অ্যান্ড দি বিউটিফুলের কথা মনে এলেও রিমোটে হাত দিলাম না। কী রকম যেন একটা অনুপস্থিত উপস্থিতি বোধ করতে লাগলাম পিনাকীর। আহা, এখনও হয়ত শ্মশানে যায়নি। বোন পারুল এসে পৌঁছায়নি। মনে হল, সত্যি চিরটাকাল আমি দাবিয়েই রেখেছি ওকে। আমার ইচ্ছা, আমার ধ্যানধারণা মেনে নিতে বাধ্য করেছি। আর, মুখ বুজে সে তা মেনেও গেছে দিনে দিনে, এটা একটা পাশবিক অত্যাচারের পর্যায়ে চলে যায়নি কি? পিনাকীর জন্যে একা বসে জিন খেতে খেতে, এই প্রথম, ঠিক অনুশোচনা নয়, নাম দিতে গেলে কষ্টই বলতে হয় তাকে—কষ্ট হতে লাগল আমার। মনে হল, যাইনি, ভালোই করেছি। বুকের ওপর দু-হাত, নাকে তুলো, চোখে ফাটা ফ্রেমের চমশা— ওকে দেখে হয়ত আজ কেঁদেই ফেলতাম আমি।

আমার মারুতির কথা মনে পড়ল। আজ সুদেষ্ণা গাড়ি নেয়নি।

আটটার সময় গেটে পিনাকীর থাকার কথা নয়। তবু আমি গেটের দিকে তাকাই। গেট ছেড়ে, গাড়ির রাস্তা ছেড়ে, বেশ কিছুটা দূরে, ওই ঝাউগাছটার নিচে দাঁড়াত পিনাকী। আজ এলে।

আজ লোকজন কমই। লেক ক্লাবের প্রশস্ত, ঘাসজমির লনকে গোলাকারে ঘিরে ছোট ছোট আলোকস্তম্ভ। হলুদ ফুটবলের মতো। হিম তো পড়ছেই। তা ছাড়া কুয়াশা। অন্ধকার থেকে সুমন্তদা ডাকলেন। আমি কাছে গেলামও।

‘নমিতা তো তোমাদের বাড়ি গেল।’

‘হ্যাঁ। ওরা বেরিয়েছে।’

‘বোসো?’

‘না সুমন্তদা।’ জলের ধারে একটা টেবিল দেখিয়ে বললাম, ‘আমি ওদিকটা বসছি।’

‘তোমার বন্ধু আসবে?’

বেশ কয়েকবারই আমি আলাপ করিয়ে দিয়েছি পিনাকীর সঙ্গে। কিন্তু, উনি কখনও রেফার করার সময় ওর নাম করেন না। পিনাকীকে জাতে তোলার জন্য ওর ইউ-ডি ক্লার্কের সামান্য চাকরির কথা চেপে গিয়ে আমি জোর দিয়ে বলে দেখেছি, ‘আমার বন্ধু। এ ভেরি ওল্ড ফ্রেন্ড অফ মাইন।’ বসেছিও আমরা একসঙ্গে। দেখেছি, সুমন্তদা কেন, কেউ কনভিন্সড হয় না। কেউ হয়ত জানতে চাইল, থাকেন কোথায়? পিনাকী বলল, ‘বাঁশদ্রোনি।’

‘বাঁশদ্ৰোনির কোথায়?’

পিনাকী সংকোচে বলল, ‘গাছতলা স্টপ জানেন কি?’

বাস হয়ে গেল। কেউ আর জানতে চায় না, সেটা কোথায়। কোথায় থাকেন? না, গাছতলায়। সত্যি, এর পর আর জানার কী থাকতে পারে। পিনাকী যেদিন আসে, আমি তাই ইদানীং আলাদা বসছিলাম ওকে নিয়ে। এটা ওরা জানে। ওই, জলের ধারের টেবিলটায়। আজ সেখানে একা বসতে বসতে আমি ঠিক করলাম, ওই লেক ক্লাবটা আপস্টার্ট লোকজনে ভরে গেছে। আমি এখানে আর আসব না। আমি ক্যালকাটা ক্ল্যাবে যাব।


আরো পড়ুন: তিস্তা টাইগার । শক্তি চট্টোপাধ্যায়


জিন-লাইমই চালিয়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। আমি তাই বললাম। আজ পনের বছর ধরে দু-জনে হুইস্কি ছাড়া কিছু খাইনি বলতে গেলে। জিন তো নয়ই। তবে হুইস্কি হলে আমাকে রয়াল চ্যালেঞ্জ আর পিনাকীকে ডি এস পি দেয়। বেয়ারা বদ্রিনাথকে বলতে হয় না। সে এটা জানে। রয়ালেরও দাম প্রায় দ্বিগুণ। এই ব্যবস্থাটা আমারও খারাপ লাগছিল শেষের দিকে। আজ থেকেই, আমি ঠিক করেছিলাম, জিন বলব। ম্যানসন হাউস ছাড়া এখানে কোনো জিন পাওয়া যায় না।

ভীষণ, ভীষণ ভুল করল বদ্রি। ওর থালায় দুটো গ্লাস, দুটো স্ন্যাক্স। দুটো সোডা।

সেদিকে তাকিয়ে আমি বললাম, ‘কী ব্যাপার। দুটো কেন?’

বদ্রি বলল, ‘বাবু আসবেন তো?’

আমি ‘না’ বলতে যাচ্ছিলাম। ঠিক এই সময় দেখলাম, পিনাকী হেঁটে আসছে।

মানুষ সারাজীবন ধরে যে সব ভয় পায়, ভয়ে মরে থাকে, তার একটাও ভয় নয়। জীবন জুড়ে ভয় পেতে পেতে শেষে। ভয় আসে সেটাই ভয়। কিন্তু, তখন আর ভয় পাবার ক্ষমতাটাই থাকে না। আসলে যতক্ষণ সাহস, ভয় তো ততক্ষণই। সাহস মরে গেলে আর ভয় কীসের। যেমন, মৃত্যুর ঠিক আগের মিনিটগুলো, মুহূর্তগুলো। যখন সবকটি ফ্লুইস গেট খুলে গেছে এবং তোড় জলে ভেসে যাচ্ছে সব কিছু। এ প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তখন আর লড়াই কী। তখন সাহস কী। অব্যর্থভাবে অনুমান করা যেতে পারে যে, তখন আর ভয় নেই। পিনাকীকে দেখে আমার একটুও ভয় করল না। এমন মানুষ থাকতে পারে যারা, এমন অবস্থায়, হাউমাউ করে ওঠে। আমি দেখলাম, আমি তাদের একজন নই। আমি তো ভূতে বিশ্বাস করতে পারি না। নিশ্চয়ই কোথাও কিছু ভুল হয়েছে। বেঁচে আছে পিনাকী। আর যদি মরেই গিয়ে থাকে। পিনাকী তো। পিনাকীই এসেছে।

‘কীরে, কী বাপার?’

‘কী ব্যাপার মানে? আসার কথা ছিল না?’

‘তা ছিল। কিন্তু গেটে তো ছিলি না?’

‘একদিন একটু দেরি হতে পারে না?’

আমি দেখলাম, এই প্রথম আমি অত্যন্ত সশ্রদ্ধভাবে কথা বলছি পিনাকীর সঙ্গে। যেন, সে আমাদের সকলের চেয়ে অনেক, অনেক বেশি সফল মানুষ। সম্রান্ত মানুষ। তবে এও ঠিক যে, আজ ওর আটকে পড়ার কারণটা কী, আমি তা সবিস্তারে জানতে চাই না। বলতেও দেব না ওকে, কোনো মতে।

আমি খুব সহজভাবে বললাম, ‘নে, শুরু কর।’

ওর জন্যে একটা গ্লাস আগে থেকে আনানো হয়েছে দেখে খুবই সন্তুষ্ট হল পিনাকী। গ্লাস তুলে বলল, ‘চিয়ার্স।’ বলেই বরাবরের মতো একটা ছোট চুমুক দেয় গ্লাসে।

‘থুঃ-থুঃ। এ কী!’ দেখলাম বাঁ হাতের উলটো পিঠ দিয়ে গ্লাস সরিয়ে দিচ্ছে সে।

কেন রে, কী হয়েছে?’

‘এ তো হুইস্কি নয়!’

‘না, জিন। খা না। ম্যানসন হাউস।’ জিভে একটা টাক-শব্দ তুলে আমি বলি, ‘ব্রিলিয়ান্ট করেছে।’

‘কিন্তু আমি তো হুইস্কি খাই।’

এই প্রথম পিনাকী আমাকে জানাল, সে যা চায়। পর্দা নিচের দিকে হলেও তার এমন তীক্ষ্ণ গলা আমি আগে কখনও শুনিনি।

‘হুইস্কি বল।’

অতি কঠিন, ত্রুর গলায় সে আদেশ করল আমাকে। তবে খুব চাপা স্বরে। যেন কেউ শুনতে না। পায়। কিন্তু, চিকার হয়ে তাই ছড়িয়ে পড়ল আমার শিরায় শিরায়। স্নায়ু থেকে স্নায়ুতে। ‘হুইস্কি বল’, ‘হুইস্কি বল’ ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতে হতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল আমার অস্তিত্ব জুড়ে।।

বরং আমিই চিৎকার করে উঠলাম, এবং, সবাই তা শুনতে পেল।

‘বদ্রি!’

দূর কাউন্টার থেকে মাঠের ওপর দিয়ে বদ্রি দৌড়ে আসে।

‘ক্যা হুয়া সাব?’

‘দো রয়াল চ্যালেঞ্জ লে আও৷’

আলোর আভাস পেয়ে এখন বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে পিনাকী। কে বলল, পিনাকী নয়? আমার মনে হল, এতদিন যে এসেছে, সেই বরং পিনাকীরই ভূত।

আজ অবশেষে, পিনাকী এসেছে আমার কাছে। পিনাকীই এসেছে।

 

১৯৯৬

   

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>