| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: জলষষ্ঠী | মৃত্তিকা মাইতি

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট

পূর্ণর যমজ মেয়ের আজ একুশিয়া। মানাবুড়ি এক মেয়েকে কোলে নিয়ে কোমর জলে থুবড়ে বসে আছে আর পূর্ণর বউ প্রতিমাকে বলে বলে দিচ্ছে। প্রতিমাও ঘাটের ঝামাপাথরে কোমর ভেজা জলে। তার কোলেও বাচ্চা। তাকে সামলে নাপিতবুড়ির কথামতো জলষষ্ঠীর পুজো করছে।

নিয়মকানুন সবই প্রায় জানা প্রতিমার। আগে আরও তিন-তিনটে মেয়ের জন্ম দিয়েছে সে। একুশ দিনের দিন ছুতুক কাটানোর জন্য মানাবুড়ি আসে। পুকুরে ঘাটপুজো হয় জলষষ্ঠীর। তারপর থেকে বাচ্চার জলের, আগুনের ফাঁড়া কেটে যায় বলে মান্য করে গ্রামের মানুষ। মানাবুড়ি এসে নখ কাটলে জ্ঞাতিদেরও ছুতুক মুক্ত হয়। তারপরে তারা সন্ধ্যা-ছড়া দিতে পারে।

ঘাটের পাশে জল থেকে চার আঙুল মতো ওপরে কিছুটা জায়গা নরম মাটি দিয়ে লেপে পরিষ্কার করেছে প্রতিমা। পুকুর থেকে এঁটেল মাটি তুলে সেই কাঁচা মাটি দিয়ে মুঠো মাপের ছোটো ছোটো দুটো ঠাকুর বানিয়ে সেই জায়গাটায় পাশাপাশি বসিয়েছে। এই ঠাকুরের হাত-পা, কান কিছুই থাকে না। বেঁটে ল্যাংচার মতো দেখতে মাটির তালে দুটো চোখ আর নাক করে দেওয়া হয়। এখন সে সেই জলষষ্ঠীর গায়ে ছোটো ছোটো মুছিগামছা জড়িয়ে দিল। ঠাকুরের কপালে সিঁদুর লাগিয়ে ধূপ জ্বালল। এবার একটা পানের ওপর গোটা সুপুরি নিয়ে তাতে সিঁদুর লাগিয়ে দুই ঠাকুরের মাঝে রাখবে। সঙ্গে কিছু পয়সাও। তারপর ঠাকুরকে ফুল দিয়ে সাজাতে হয়। আগেই কলাপাতায় বাতাসা, সন্দেশ রাখা হয়েছে প্রসাদের জন্য। এবার প্রদীপ জ্বালিয়ে কয়েকটা দুব্বো আর তুলসীপাতা ঠাকুরের মাথায় ঘুরিয়ে এনে গড় করে প্রতিমা। পাড়ে দাঁড়ানো পূর্ণর মেয়েরা মাঝে মাঝে শাঁখ আর ঝাঁই বাজিয়ে দিচ্ছে।

মহিলাদের আচারবিচার, পাড়ার কয়েকজন বউকে ডেকেছে পূর্ণ। হাসি, মশকরা হবেই। বউরা একে অপরের গায়ে ঢলে পড়ছে। কেউ আবার নিজের একুশিয়ায় কোন নিয়মটা আগে কোন নিয়মটা পরে করে ফেলেছিল আর তাই নিয়ে শাউড়ির কাছে কথা শুনেছিল, সেই গল্পও করছে।

সকলের থেকে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে বাইনি। সেও বাকিদের মতো প্রতিমার পাড়াতো এক জা। এই শুভকাজে বাইনির থাকা বারণ। ছোঁয়াছানি যাতে না হয়ে যায় তাই সে দূর থেকে দেখছে সব।

বাচ্চার মা এবার আর একটা পানপাতায় গোটা সুপুরি নিয়ে জলষষ্ঠীকে বলল, “আমার বাচ্চা আগুনে পড়লে তাকে রক্ষা করব মাগো, জলে পড়লে তুমি বাঁচাইব মা।” বলেই তিনবার সামনের দিকে জল এগিয়ে দিল প্রতিমা। শেষবারে পানপাতাটাও ভাসিয়ে দিল। সুপুরিটা রাখল দুই ঠাকুরের মাঝে। সব ছাপিয়ে মাঝে মাঝে শাঁখ, কাঁসর বেজে উঠছে।

পুজো হয়ে গেলে মানাবুড়ি বাচ্চার গায়ে, মাথায় জল দিয়ে ভালো করে রগড়ে রগড়ে গা ধুইয়ে দেয়। আগেই নখ কেটে, তেল, হলুদ মাখিয়ে দিয়ে নেমেছিল পুকুরে। 

“বাচ্চা কে লিবে গো মা-মনে… তাড়াতাড়ি করো। আমার এবার শীত শীত করছে।”

“কী কও গো বুড়িমা! কাত্তিক মাসের গরমে লোকে গা ধুয়ার জল পায়নি আর তুমার শীত লাগছে!” পাড়ে থাকা এক বউ কথাটা বলেই খিলখিল করে হেসে ওঠে।

“তুমাদের বরদের আমল থেকে এ কাজ করে আসছি বো… আমার কি আর বয়সের হিসাব আছ্যা? রক্তেও আর সে তেজ নেই মা-মনে।” মানাবুড়ি সত্যিই জলে ঠকঠক করে কাঁপছিল। 

বউদের মধ্যে তখন ঠেলাঠেলি শুরু হল। মানাবুড়িকে টাকা দিয়ে বাচ্চা আঁচলে নিয়ে দোলাবে কে? এ-ওর মুখ চাওয়াচায়ি করে।

যাদের সবে সবে বিয়ে হয়েছে, বেশিরভাগ সময় তাদেরই আঁচল পাততে দেওয়া হয়। পরের বছর যাতে ষষ্ঠীবুড়ির কৃপায় কোল ভরে যায়। কিন্তু এ যে মেয়ে সন্তান। সকলের ঘরেই একটা-দুটো করে আছে। আবার মেয়ে! কেউ আর সাহস করে এগোয় না। ওদিকে বাচ্চা আজ প্রথম পুকুরের জলে গা ধুয়েছে। এ ক’দিন কল থেকে খাবার জল এনে চান করানো হত। আজ ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। মানাবুড়ি ব্যস্ত হয়। “কাই গো বউমনে… টকা লুবো য্যা।”

এবার বাইনি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল। পূর্ণর সঙ্গে তার কথা হয়েই আছে। নিজের আঁচল পেতে দিল বাইনি।

দুই.

বিয়ের বছর না ঘুরতেই পেটে বাচ্চা এসে গিয়েছিল বাইনির। বংশের বড়োবউ সে। খবরটা জানার পর সকলের কী আনন্দ। বাইনিও বুঝতে পেরেছিল মেয়ে হিসেবে এই প্রথম তার কত গুরুত্ব। শ্বশুরবাড়ির বংশরক্ষা করবে যে, বাইনির শরীরের ভেতরে সে বেড়ে উঠছে বলে বাইনির আদরযত্ন বেড়ে গিয়েছে।

পাঁচ মাসে শিবের থানে সুস্থান করাতে নিয়ে গেল শাশুড়ি। সেই মাসে সাধও দিল। তিন ননদ, দুই পিসিশাউড়ি, মাসিশাউড়ি, কুটুমে ঘর ভরে গিয়েছিল। জ্ঞাতির কয়েক ঘরকেও দুপুরে খাওয়ার নেমন্তন্ন করেছিল শ্বশুরবাড়ির লোক।

সকালে লুচি, তরকারি। দুপুরে পাঁচ রকমের ভাজা, ডাল, চচ্চড়ি, শোলমাছের কালিয়া, মাছের ডিমের টক, চাটনি, মিষ্টি। যারাই খেয়েছে প্রশংসা না করে পারেনি।

দিনগুলো নতুন নতুন নিয়মকানুন, আচার-অনুষ্ঠান করে আনন্দে কেটে যাচ্ছিল। বাইনি কোন শাকপাতাটা খেতে ভালোবাসে তাই এনে, রেঁধে, খাইয়ে সাধ পূরণ করা হচ্ছিল। তা না হলে নাকি পেটের বাচ্চার সাধ রয়ে যায়। জন্মাবার পরে তখন মুখ দিয়ে লালা ঝরে তার।

শ্বশুরবাড়ি সাধ দিলে তবেই পোয়াতি অন্য কোথাও সাধ খেতে যেতে পারে। বাকি ক’টা মাস কুটুমবাড়ি সাধ খেয়ে আর ঘুরে ঘুরেই কেটে গিয়েছিল বাইনির। একটা মেয়ের জীবনে প্রথম মা হওয়ার খবর বোধহয় পরিবারের সকলকেই নতুন করে তোলে।

যাকে ঘিরে এত হইহই, আয়োজন, একদিন সে এল বাইনির কোল জুড়ে। প্রথম সন্তানই মেয়ে! কালো হয়ে গেল বাড়ির লোকের মুখ। এত খাওয়ানো-দাওয়ানো, পোয়াতিকে তোলা তোলা করে রাখা— সবই যেন জলে গেল ভাব।

একুশ দিন ধরে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত, এক গেলাস জল আর মশলা ছাড়া বাটিভর্তি নরম কাঁঠালিকলা ভাজা খাইয়ে নাড়ির রস শুকনো করা হল বাইনির। গ্রামে সকল পোয়াতির এইভাবেই রস শুকোনো হয়। তারপরে একুশিয়ার দিন ছোটোখাটো আয়োজন। জলষষ্ঠীর পুজো করে জ্ঞাতির ছুতুক কাটানো হল। কাটল না শুধু বাইনির ছুতুক।

বাচ্চার ছাতিতে কফ বসে বসে শ্বাস নিতে পারছিল না সে। শেষ অবধি ডাক্তারের ওষুধও আর কিছু করতে পারল না। তিন মাসের বাচ্চা বাইনির কোল ছেড়ে মাটির নীচে জায়গা নিল।

তিন.

বাইনির বাচ্চা হয়, বছর ঘোরে না, কোনও না কোনও অসুখে ভুগে মরে যায়। পরপর কয়েকবার এরকম হতে থাকলে শাশুড়ির চোখে বিষ হয়ে উঠল বাইনি। উঠতে, বসতে কথা শোনাতে লাগল, “মাগির কপালে সন্তান ফল নেই। নিশ্চয়ই কোনও পাপ করেছে। নয়তো বারবার একই অলুক্ষণে ঘটনা ঘটবে কেনি? ওর জন্য আমার বাছাটা বাচ্চার সুখ পাবেনি কুনুদিন। বাছানির দুঃখে আমার বুক টাটায়।” এরকম আরও কত নতুন নতুন অপবাদ রোজ খুঁজেপেতে আনে শাশুড়ি।

বাইনির বরের অবশ্য ততটা অসুবিধে হয় না। কারণ জন্ম থেকেই সে কানে খাটো। তাই সকলে তাকে কালা বলে ডাকে। কবে যেন ওটাই তার নাম হয়ে গেছে।

বাইনিকে দেওয়া গালাগাল কালার কান অবধি পৌঁছোয় না বটে কিন্তু বউয়ের চোখের জল তার চোখ এড়ায় না। সে ঠিক করে বাইনিকে নিয়ে আলাদা থাকবে।

তখনও একচোট ঝড় ওঠে শাশুড়ির মুখে। “এ কোন ঘর খাউকির ঝি এনে ভিটায় তুলেছি গো ঠাকুর… ছেলেটার মাথা একেবারে চিবিয়ে খেয়েছে! সংসার ভেঙে শুধু বর নিয়ে সুখে রইতে চায়। এইজন্যই কী কষ্ট করে পো বিইয়ে ছিলাম আমি। শেষ বয়সে পো-বউয়ের সেবা পাব না বলে…” 

কালা কিছু শোনে না। গ্রামেরই পিছন দিকে বাপের যে জমি আছে সেখানে পুকুর খুঁড়ে, বাড়ি বানিয়ে বাইনিকে নিয়ে বেরিয়ে যায় সে। তবে নিজের পরিবার থেকে আগলে রাখলেও সমাজের লোকের থেকে বাঁচাবে কে বাইনিকে?

ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষও জানতে পেরে গেল বাইনির আর বাচ্চা হবে না। তখন তাদের মধ্যেও কানাঘুষো শুরু হল। “সাইত্রিশ-আটত্রিশের পাকা শরীর। ওকে চর্বি ধরেছে। ও মেছেলে তাহালে কাঁচা কুমড়ার বাঁজা বিচা হয়ে গেছে। বাচ্চা দুধ টানে না বলে, শরীরটাও তো এখনও টসটসে, ডাঁটো। কালার কপালে দুঃখ আছে।”

কেউ কেউ আবার গান বানিয়ে ফেলেছে। কালাকে দেখতে পেলে শোনায়। “কালা তুই মালা বাজা রে… কাঠের ঠাকুর এনে দেব বউকে লাচা রে…”

বাইনির নামে দিন দিন অপবাদ রটতেই লাগল। কোনও ভালো কাজে তাকে আর ডাকা হয় না। কেউ হয়তো কোথাও যাচ্ছে, তাকে সামনে দেখতে পেলে তার ভুরু কুঁচকে যায়। “এই রে, বাঁজা ম্যায়ামানুষটা সামনে পড়ল, আইজ আর কাজ হচেনি।”

কালা বাড়ি থেকে বেরোয় কম। লোকের সঙ্গে কথা কমিয়ে দিয়েছে। নিজের বিঘা দেড়েক জমি ভাগে পেয়েছে। চাষবাস, বাগানের খন্দ নিয়ে থাকে। কিন্তু বাইনির মায়ের মন। কোনও বাচ্চা দেখতে পেলে কাছে ডাকে। লজেন্সটা, বিস্কুটটা কিনে দেয়। কখনও গাছের ফলপাকুড় খেতে দেয় আর তাদের বাপ-মায়েদের থেকে গালিগালাজ শোনে।

চার.

জ্ঞাতিঘরে কেউ পোয়াতি হলে বাকিরা ঠিক খবর পেয়ে যায়। বাইনিও শুনেছিল পূর্ণর বউ পোয়াতি। একটু অবাকই হয়েছিল সে। পূর্ণর সংসারের অবস্থা ভালো নয়। বাপের দশ কাঠা জমি ছিল। দুই ভাই ভাগে পাঁচ কাঠা করে পেয়েছে। তার মধ্যেই আলাদা আলাদা বাড়ি, পুকুর। পূর্ণ আবার কোঠায় মাটি ফেলেছে কম। বেশি বর্ষা হলে জল ঢুকে যাবে ঘরে। ঘর তোলার পর কাঠা দেড়েক জমি বেঁচেছে। তাতেই বছরে দুটো চাষ। ছোটোভাই মুম্বাই থাকে। গয়নায় পাথর বসানোর কাজ করে। বউ, বাচ্চা গ্রামে। পূর্ণ ধারধোর করে একটা ভ্যানরিকশা কিনেছিল। বাড়ির কাছে ইটভাটায় ইট বয়। 

তিনবারের বার প্রতিমার যখন মেয়েই হল তখন তার দায়িত্ব নিতে পারবে না বলে এক দূরসম্পর্কের কুটুমকে দিয়ে দিয়েছিল পূর্ণ। সেই পরিবারও বাইনির মতোই নিঃসন্তান। মেয়েটা এখন তাদের কাছেই মানুষ হচ্ছে। তাই বাইনি যখন কানাঘুষোয় জানল পূর্ণর বউ আবার পোয়াতি তখন সে অবাক না হয়ে পারেনি। সঙ্গে উড়োকথাও কানে আসছিল। ছেলে না হলে পূর্ণর নাকি বংশরক্ষা হবে না। তাই প্রতিমার হাজারও কান্নাকাটি সত্ত্বেও পূর্ণ তার বারণ শোনেনি। তৃতীয় মেয়েটাকে অন্যদের হাতে দিয়ে দিয়েছে। উড়ে উড়ে এ কথাও এসেছিল, খালি হাতে মেয়ে দেয়নি পূর্ণ। টাকাপয়সার লেনাদেনাও নাকি হয়েছে।

এবারে পূর্ণর সঙ্গে পাড়া গোটাও অপেক্ষায় ছিল, কী বাচ্চা হয়। বাইনি যখন শুনল প্রতিমার আবারও যমজ মেয়ে হয়েছে, সে আর থাকতে পারেনি। ছুটে গিয়েছিল আঁতুড়ঘরে।

পূর্ণ তখন ঘর-বাইর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। “ও শালির আর আমার ভিটায় ঠাঁই নেই। পেটের ভিতরে শুধু মাইঝি ঝালা গছিয়ে রেখেছে। আমি আবার ব্যায়া হব। দেখি কেমন ব্যাটা না হয়।”

প্রতিমার কান্না আর থামে না। একে দু-দুটো বাচ্চার বিয়োন ব্যথা তার ওপর আবার থেকে থেকে পূর্ণর দ্বিতীয় বিয়ের হুমকি। বিছানার সঙ্গে মিশে গেছে মেয়েটা।

“আমি কী করবা কও ত দিদি? যেখানে যত ঠাকুর আছে, মনে মনে তাদের নাম করে কত ডাকছি, কাঁদছি। তারা যদি আমার দুঃখ না শোনে, কী করবা?”

দুরুদুরু বুকে কথাটা বাইনি বলেই ফেলেছিল। “অভয় দউ তো একটা কথা কই। তোর ঘরে তো মা ষষ্ঠীর কিপায় অভাব নেই। আমাকে একটা দিবি?” 

ব্যথায়, কান্নায় কঁকিয়ে ওঠে প্রতিমা। আস্তে আস্তে উঠে বসার চেষ্টা করে। “আমরা ম্যায়ামানুষ, তারপরে রোজগার করি না। মদ্দগুলো ভাবে আমরা তাদের গোলাম। তাই তারা ইচ্ছেমতো মর্জি চালায়। খাটা খাওয়ার ঘর। মানুষ করার মুরোদ নেই, শখ আছে ষোলোআনা। ওদের তো দশ মাস পেটে রাখতে হয় না, কষ্ট বুঝবে কী? পিথিবীতে যখন এনেছে, দায়িত্ব ওকেই নিতে হবে। বুকে পাথর চাপা দিয়ে একটা মেয়েকে দিয়ে দিয়েছি। আর সে কাজ করতে পারব না।” কথাগুলো বলে আবারও বিছানা নেয় প্রতিমা।

এসব কথা উঠোনে পূর্ণর কানেও যাচ্ছিল। সে দুপদাপ পা ফেলে ঘরে ঢুকে আসে। “দিবি না তো কী ঘরে সাউতাইবি? অতগুলো পেটঝালা খাওয়াইবে কে? আমি যখন পিথিবীতে এনেছি, আমিই তার ব্যবস্থা করবা।” পূর্ণ বেরিয়ে যায়। 

বাইনি বলে, “ব্যাটা ব্যাটা করে যা তাণ্ডব চলছে তোর ঘরে। একটার দায়িত্ব যদি আমি নিই, তোর চোখের সামনে থাকবে। ভেবে দেখবি। বাচ্চা এখন যেমন তোর বুকের দুধ খাচ্ছে, খাউ। একুশিয়া হয়ে গেলে তখন যা হয় করা যাবে।”

প্রতিমা উলটো পাশে ফিরে থাকে। চোখের জল বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে। বরকে তো সে চেনে। এই সুযোগ সে ছাড়বে না।

পাঁচ.

বহুদিন পরে কালা আর বাইনির বাড়িতে পূর্ণ হাজির। প্রতিমার মাঝেমধ্যে যাতায়াত আছে কিন্তু পূর্ণ সচরাচর এদিক মাড়ায় না। হঠাৎ তাকে দেখে কেন যেন বুকটা ধড়াস করে ওঠে বাইনির। পূর্ণকে তা বুঝতে দেয় না। উলটে তাকে বসতে চাটা পেতে দেয়।

“না গো বউদি, বুসবানি। কয়েকটা কথা কইতে আমার আসা।”

অজানা ভয়ে বাইনির শরীর যেন অসাড় হতে শুরু করেছে। সেই সময়ে পিউ কোথা থেকে ছুটে এসে বাইনির কোলে লাফিয়ে পড়ে। সে সব শক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরে তাকে।

“আমার মাইঝিকে তার নিজের ঘরে লিয়া যাবা বউদি। তুমাদের সঙ্গে যা কথা হয়েছিল, তুমরা ত তা রাখছ না। আমার কথা বুঝতে পারছ ত?”

বাইনি যেন কিছুই শুনতে পায়নি। তার কানে যেন তালা পড়ে গেছে, এইভাবে ভ্যাল ভ্যাল করে চেয়ে থাকে পূর্ণর দিকে।

“তুমি কালাদার সাথে কথাটা আলোচনা করে রাখব। আমি আবার আসবা, পিউকে লিয়া যাবা।”

সেই একুশিয়ার দিন দশেক পরে মেয়েকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছিল বাইনি। জোড়া মেয়ে হয়েছে বলে পোয়াতির দিকে একেবারে নজর দিচ্ছিল না পূর্ণ। বাচ্চা হওয়ার পর থেকে প্রতিমাকে তাই দুধ-উঠনা করে দিয়েছিল বাইনিই। 

গ্রামেই একজন দুধ বেচে। তাকে বলেছিল। সে পূর্ণর বাড়ি দুধ পৌঁছে দিত। হিসেবনিকেশ করে টাকা মেটাত বাইনি। কখনও পুকুরের মাছটা কী বাগানের সবজিটা বরের হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিত। একটু ভালো করে না খেলে গায়ে জোর পাবে না মেয়েটা। প্রতিমার জন্য আলাদা একটা ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল বাইনির মনে। ওর জন্যই তো বাইনি মা ডাক শুনতে পেরেছে।

বাইনি মেয়ের নাম রেখেছে পিউ। সে এখন একটা-দুটো করে কথা বলে। তার পায়ে ছোটো ছোটো নূপুর গড়িয়ে দিয়েছে বাইনি। হাতে রুপোর চুড়ি, কানে ছোট্ট রিং। পাড়ায় কোনও বাচ্চার যা নেই, পিউয়ের তা আছে।

যমজ বাচ্চার এক মেয়েকে রেখে অন্য মেয়েকে প্রতিমার কাছে থেকে নিয়ে নিয়েছিল পূর্ণ। তুলে দিয়েছিল কালা আর বাইনির হাতে। বাইনি তো সেই থেকে পিউকে নিজের মেয়ে বলেই ভেবে নিয়েছে চিরকালের জন্য। সেই জলষষ্ঠীর সময়ে যে আঁচল সে পেতেছিল সেই আঁচল তো ভরে গিয়েছে এই মেয়েকে পেয়ে। এখন পূর্ণ এসে এসব কী বলে গেল!

ছয়.

কালা মাঠ থেকে ফিরলে বাইনি কান্নায় ভেঙে পড়ে। সব শুনে কালাও রাগ সামলাতে পারে না। “শালা, এখন মেয়ের প্রতি দরদ দেখাচ্ছে? এতই যদি বাচ্চা পালার চিন্তা তাহালে একটাকে দিয়ে দিয়েছিল কেন? নিশ্চয়ই শালার কোনও বদ মতলব আছে। ওই জন্যই মেয়ে দেওয়ার সময় লিখিতপড়িত করে দেয়নি। আমাদের আর কী করার আছে। তার বাচ্চা সে যদি লিতে চায়, আমরা বাধ্য।”

বলতে বলতে কালা ক্লান্ত হয়ে যায়। মেয়েটার প্রতি তারও তো মায়া কম নয়। “ওই জন্যই তখন তুমাকে পইপই করে বলেছিলাম, যা করবে তা লেখাজোখা থাক। তুমি তখন পূর্ণর কথার জালে জড়িয়ে পড়লে। ওর মনে তখন সৎ ইচ্ছা থাকলে আজ এত দিন পরে এই কথা বলে!”

“তুমি এভাবে কেন বলছ গো? পিউ কি আমাদের মেয়ে নয়? আমাদের যাটুকু আছে সে তো ওই পাবে। এখন দাও আর তখন। পূর্ণকে চাষের জন্য জমিনটা ছেড়ে দিলে মেয়েটাকে আমাদের থেকে নিয়ে যেতে পারবে না।”

“তুমি ভুল ভাবোটো বাইনি। ও ব্যাটার মাথায় বদ বুদ্ধি ঘুরছে। আমি একজনের কাছে খবর পাইছি, শালা ভ্যানরিকশাটাকে বিকি দিয়া সেই টাকায় কোথায় জুয়া খেলেছে আর মদ খেয়ে কাটিয়েছে। এখন মেয়েটাকে সামনে রাখিয়া কোন ফন্দি আঁটছে কে জানে। তুমি ঠিক কইছ, আমাদের যা রইবে তা তো সব পিউই পাবে। তাহালে আমার চাষের জমিন ও ব্যাটাকে দিতে যাবা কেনি?”

বাইনি চুপ করে যায়। সে চাইছিল কালা জমিন ছেড়ে দিক মেয়ের জন্য। কিন্তু হয়ে গেল উলটো। তখনকার মতো কথাটা থেমে গেলেও বাইনির মনে পিউকে হারানোর ভয় ঘর করে নেয়।

সাত.

কয়েক দিন পরে পূর্ণ আবার হাজির। বাইনি তাকে বোঝানোর চেষ্টায় বলল, “দ্যাখো ঠাকুরপো, মেয়েটা তুমার কাছে গেলে ভালো খেতে-পরতে পাবেনি, পড়াইতে পারবনি। বাপ হয়ে কেনি মেয়েটার জীবন খারাপ করছ? দুশোটা টাকা লিয়া যাও। ঘরের জন্য বাজারহাট করব।”

বাইনি তার লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের হাজার টাকা থেকে মাঝে মাঝেই পূর্ণর মেয়েদের জন্য এটা-সেটা কিনে পাঠায়। কখনও পূর্ণর বউয়ের জন্য ঘরে পরা ছাপা শাড়ি কিনে দিয়ে আসে। কালা এসবের কিছু জানতেও পারে না। প্রতিমা বাইনিকে মেয়ে দিতে চায়নি। দিয়েছিল পূর্ণ। কিন্তু সে তো দিয়েছিল লোভে। মেয়ে তো প্রতিমারই। তার কথা ভোলে কী করে বাইনি। 

পূর্ণ টাকাটা ট্যাঁকে গুঁজতে গুঁজতে বলে, “এ টাকা লিয়া আমার কী হবে বউদি? ও আমি তুমার ঝি-র জন্য গুছিয়া রাখবা। কিন্তু যাই বলো, মেয়ে আমি লিয়া যাবা।”

আর কোনও উপায়ান্ত নেই দেখে নিজের ভেতরে কান্না লুকিয়ে বাইনি বলে, “আচ্ছা ধরো, তুমার কথা মতো আমাদের যাটুকু জমিজমা আছে তা যদি তুমাকে চাষের জন্য দিই, তাহালে কি মাইঝিকে আমাদের কাছে রইতে দিব ঠাকুরপো?”

“তাহালে আমার আর কী আপত্তি রইবে? আমি চাই মাইঝিটা তুমাদের কাছেই থাকুক।”

আট.

নিজের ভাইদের সঙ্গে অশান্তি বেঁধে যায় কালার। তারা ঘর বয়ে এসে ঝামেলা পাকায়। “আমরা রইতে রইতে পরকে চাষের জন্য জমিন দিবি? আমরাও দেখব অথব্ব হলে কে তোদের আপন হয়। তখন ডাকলেও সীমাধারেও আসবানি আর।”

কালার ভাইরা সত্যি সত্যিই কোনওরকম সম্পর্ক রাখে না কালার সঙ্গে। উলটে পূর্ণর যাতায়াত বেড়ে গেছে। সে এখন আর কারও অনুমতির ধার ধারে না। যখন খুশি বাগানে ঢুকে কপিটা, মুলোটা তুলে নিয়ে চলে যায়। একদিন তো নারকেল গাছ থেকে কতগুলো নারকেল পেড়ে নিয়ে গেল। সেদিন আবার পুকুরে জাল দিয়ে মাছ ধরে নিয়ে গিয়েছে।

বাইনির সঙ্গে এখন মাঝে মাঝেই কথা কাটাকাটি হয়ে যায় কালার। সে রাগারাগি করে এসে বাইনিকে বলে, “তুমার মুখ চেয়ে আমি চুপ করে আছি। আমি বেঁচে থাকতে ওর আশা কোনওদিন মিটবে না। ভালো করে বুঝিয়ে দিব তাকে— সে যেন যখন-তখন এঠি নেই আইসে।”

পূর্ণকে বারণ করলেও সে মানতে চায় না। সেই নিয়ে বেশ কয়েকবার বাইনির সঙ্গেও লেগে গিয়েছে তার। পূর্ণ যেন ঠিকই করে নিয়েছে, সে কারও কথা মানবে না।

পূর্ণকে বাধা দেবে বলার পরেও কিছুই করে না কালা। এমনিতে শান্তিপ্রিয় মানুষ। সাতে-পাঁচে থাকে না। ইদানীং যেন আরই শান্ত হয়ে গেছে। সবসময় কী যেন ভাবে। বাইনির সঙ্গে বহুদিন মন খুলে কথা বলে না। কয়েক দিন ধরে রাতে রাতে জ্বর আসছে, সে কথাও তাকে জানায়নি কালা।

বাইনি মেয়েকে নিয়ে আলাদা বিছানায় শোয়। সে কিছু টের পায়নি। পাঁচ দিনের জ্বরে ভুগে কালা সংসার ছাড়ে।

নয়.

কালা মারা যাওয়ার পর একরকম কেটে যাচ্ছিল মা-মেয়ের। একাদশী, পূর্ণিমায় পুজো-আচ্চা নিয়ে ডুবে থাকে বাইনি। মাসের মধ্যে তিনভাগ দিন তার উপোস করেই কেটে যায়। শরীর ভেঙে গিয়েছে। পুজো শেষে সাজানো প্রতিমার গা থেকে গয়নাগাঁটি খুলে নিলে যেমন লাগবে, বাইনিকেও ঠিক তেমনি দেখতে হয়েছে।

সেদিন রোজের মতো রাঁধাবাড়া সেরে নিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এসে কাপড় পালটে খাটে বসল বাইনি। অনেকক্ষণ মনে মনে ঠাকুরের নাম করার চেষ্টা করল। এর-তার বাড়ি গিয়ে হাজারো উপদেশ শোনার থেকে এই নতুন অভ্যেসে মনকে কিছুটা মানিয়ে নিয়েছে সে। কিন্তু আজ তার মন বসছে না। পূর্ণ এবারে নাছোড়। হয় জমি দাও নয় তো মেয়েকে ফেরত নেব।

বর্ষাকাল। চাষিদের মাঠে নামার সময়। পথঘাট ভেজা ভেজা। মাঠ থেকে, ঘাস জঙ্গল থেকে অনবরত ব্যাঙের টকর টকর ডাক ভেসে আসছে। বাইনি ঘুমিয়ে থাকা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে থাকে। পূর্ণকে কী করে সামলাবে তা ভেবে পায় না। 

দশ.

এক মাসের বাচ্চাকে এনেছিল বাইনি। ক’মাস আগে দু’বছর পুরো হয়েছে পিউয়ের। তাকে ছেড়ে থাকার কথা মনেও আনতে পারে না বাইনি। আরও চোখে চোখে রাখে। জলষষ্ঠী তো জল আর আগুনের ফাঁড়া থেকে বাঁচাতে পারে। কিন্ত আরও কত যে ফাঁড়া রয়েছে জীবনে। 

বর্ষাকালে ঝোপ-জঙ্গল থেকে জোঁক বেরোয়। পিউকে উঠোনে দাঁড় করিয়ে সবজি তুলতে বাগানে ঢুকেছিল বাইনি। উঠোনের পরেই পুকুর। পুকুরের উলটোদিকে বাগান। কচু তুলতে তুলতে বাইনি মাঝে মাঝে পিউয়ের সঙ্গে কথা বলে যেতে থাকে। কিন্তু ওদিক থেকে তার অনেকক্ষণ কোনও সাড়াশব্দ নেই। বাইনি দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করে। মেয়ে তো উঠোনে নেই! পড়ি কী মরি করে বাগান থেকে বেরিয়ে আসে বাইনি। মেয়েকে চেঁচিয়ে ডাকে। কোনও সাড়া আসে না। সে ছুটে বেরিয়ে আসে বাড়ির বাইরে।

কতগুলো বাচ্চা রাস্তায় খেলা করছিল। তাদের মধ্যে একজন বলল, “তুমি পিউকে খুঁজছ জেঠি? তাকে তো পূর্ণকাকা নিয়ে গেল।”

পূর্ণ এসেছিল! আনাজপাতি সব উঠোনে ফেলে পূর্ণর বাড়ির দিকে দৌড় লাগায় বাইনি। মেয়েটাকে নিয়ে চলে গেল পূর্ণ!

হাঁপাতে হাঁপাতে পূর্ণর বাড়ি পৌঁছোয় বাইনি। প্রতিমা আনাজ কুটছে দাওয়ায় বসে। পিউ হাত-পা ছুড়ে কাঁদছে, “ঘরকে যাবা… মার কাছে দিয়ে এসো আমাকে…”

পূর্ণ তাকে ধমকাচ্ছে, “তোর মা ওই তো তোর কাছে। আবার ঘরকে যাবি কী? এটাই তো তোর ঘর। বেশি ঘ্যান ঘ্যান করি না।”

“মা…! ওই তো আমার মা এসে গেছে।’ বাইনিকে দেখে আনন্দে লাফিয়ে ওঠে পিউ।

ছামুদুয়ারেই দাঁড়িয়ে থাকে বাইনি। ভেতরে যেতে বলে না কেউ। কাদা পা। বাইনিরও ভেতরে যাওয়ার ইচ্ছে হয় না। সে বলে, “মাইঝিটাকে তুমি লিয়ে এসেছ, একবার কয়ে আসবে তো ঠাকুরপো। শুধু শুধু আমি চিন্তায় ছুটছি।” তারপরে পিউকে বলে, “আয় সোনা মা, ঘরকে যাই।”

এবার পূর্ণ গলা খাঁকারি দিয়ে ওঠে, “শোনো একটা কথা। পিউ আর তুমার কাছে যাবেনি বউদি। মাইঝি এখন থেকে আমাদের কাছে রইবে। তুমি মাঝুসাজু এসে দেখা করে যেয়ো, আমাদের কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু পিউকে আর তুমার কাছে রাখবা নি। আমার সাফ কথা জানিয়ে দিলাম।”

এগার.

সেদিন বাইনির কোনও কথাই কানে তোলেনি পূর্ণ। মেয়েকে সে ছাড়েনি বাইনির সঙ্গে। একাই ঘরে ফিরতে হয়েছিল তাকে। দু’চারটে লোক ডেকে নিয়ে যে বসবে, তারও উপায় নেই। পিউকে নেওয়ার সময় কাগজেকলমে কিছু হয়নি। গ্রামের পঞ্চায়েতের এক মেম্বারের কাছে গিয়েছিল বাইনি। সে বলল, “কাগজপত্তর রইলেও তার কোনও দাম নেই। মেয়ে এখনও তাদেরই আছে।” শুনে চলে এসেছিল বাইনি। পূর্ণর হাতেই সব। রাত হলে মদের ঠেকের কত আত্মীয় আছে তার। তাছাড়া বাইনির কথা শুধু শুধু শুনবে কেন সে। মেয়েটার এদিকে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। সবসময় নজরে নজরে রাখে।

মাঝে মাঝে আশেপাশের শরিকি জায়েরা এসে সান্ত্বনা দিয়ে যায় বাইনিকে। “কী আর করবে, পরের বাচ্চা… ভগবান আছে। সে ঠিক বিচার করবে।”

যে মীমাংসা বাইনির হাতে নেই তা নিয়ে কিছুদিন শোকে, দুঃখে কাটাল সে। কিন্তু সংসারের কিছু কাজ থাকে যা সময়ে না করলে খেয়েপরে বেঁচে থাকায় আঁচ পড়ে। সেসব না করলেও নয়।

বর্ষার ধানচাষ এসে গিয়েছিল। চাষিরা নিজের নিজের জমিন ব্যানচারা রুয়ে ঢেকে ফেলছিল। আগে এসব কালা দেখত। সে যাওয়ার পর বাইনিকে মজুর লাগাতে হয়। তাদেরও তো জমি রয়েছে। লোকে আগে নিজের জমিন রোয়। তাই সকলের চাষ শেষে বাইনির জমিতে রোয়া শুরু হয়। 

মাঠ দেখতে বেরিয়েছিল বাইনি। ট্র্যাক্টর জমি লাঙল করেছে কিনা দেখা দরকার। পূর্ণর বাড়ি পেরিয়ে মাঠে যেতে হয়। বাড়ির বাইরে প্রতিমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। সে কি কোনো কাজে বাইরে এসেছিল? না কি বাইনিকে দেখেই বেরিয়েছে? বাইনির চোখ পিউকে কোথাও খুঁজে পেল না। তবে সে বুঝতে পারছিল, প্রতিমা তার দিকে কেমন করে তাকিয়ে রয়েছে। বলল, “কোথায় যাচ্ছ দিদি?”

“জমিন ধারে। দেখি গিয়ে নাঙল করল কিনা।”

বাঁধ ঘুরে মাঠে গিয়ে তো বাইনি থ। তার জমিনে পূর্ণ ব্যানচারা পুঁতছে! কথাই হারিয়ে ফেলেছিল বাইনি। তারপর সামলে নিয়ে বলল, “এটা তুমি কী করটঅ ঠাকুরপো?”

“কেনি? দেখতে পাওটনি? আমি রুইছি।”

“আমার জমিনে তুমি রুইছ কেনি?”

পূর্ণ ঝুঁকেই আছে। তখনও সে জলকাদায় ব্যানগোছ পুঁতেই চলেছে। কোনও উত্তর দিচ্ছে না।

কী করবে বুঝতে না পেরে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিল বাইনি। এই সময় সে দেখতে পেল কাদা রাস্তায় প্রতিমা আসছে। কাঁখে পিউ। এসে বাইনির কাছটায় থামে সে।

“তুমি আবার ওকে নিয়ে মাঠে এলে কেন?” প্রতিমা আর মেয়েকে দেখে পূর্ণ সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিমা বলে, “তুমি এক্ষুনি জমিন থেকে উঠিয়া আইস।”

“কেনি?” 

“তুমি জানো না কেনি? পরের জমি দখল নিতে চাও? লজ্জা নেই তোমার?”

পূর্ণ তেড়েফুঁড়ে উঠেতে চায়। “ম্যায়ালোক ম্যায়ালোকের মতো থাকবি। যা বাড়ি যা। বেশি কথা কইস না।”

পালটা চেঁচিয়ে ওঠে প্রতিমা। “কে আমার মদ্দলোক এল রে! উঠিয়া আইস তুমি দিদির জমিন থেকে।”

প্রতিমার দিকে আবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বাইনি। চোখের পাতা পড়ে না। তবে মনে ভয় ভয় করছে তার। 

পূর্ণ বলে, “ওরা বলেছিল জমিন দিবে। দেয়নি। মেয়েকে লিয়া আসছিলাম তাই। এ জমিন যদি পরের হয় তাহালে ওই মেয়ে কি ওর নিজের?”

রুখে ওঠে প্রতিমা। “জমিন এখন দিদির। ওরই থাকবে। আর মেয়ে কার তা তুমি দেখতে পাবে। আগে জমি ছাড়ো।”

পূর্ণ যেন নিভে যায়। হাতের ব্যানচারা খসে পড়ে যায় মাঠে। বাঁধে উঠে আসে সে।

প্রতিমা পিউকে বাইনির কোলে দিয়ে দেয়। “ও তোমারই মেয়ে দিদি। তুমিই ওর মা। ও তোমার কাছেই থাকবে।” বলেই ঘুরে গিয়ে হনহন করে হাঁটতে থাকে সে। কোনও কথা না বলে হাতে-পায়ে কাদামাটি মাখা পূর্ণ তার পিছন পিছন হেঁটে যায়। পিউ বাইনির গলা জড়িয়ে ধরে বলে, “মা…।”

বাইনির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে নামে। পূর্ণ আর প্রতিমা আবছা হয়ে আসে। বাইনি কোল থেকে মেয়েকে নামিয়ে তার হাত ধরে জমিতে গিয়ে দাঁড়ায়। বলে, “আয়, তোকে ব্যানচারা রুয়া শেখাই।” 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত