| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
আন্তর্জাতিক ফিচার্ড পোস্ট রাজনীতি

প্যালেস্টাইন-ইসরাইল ও ভারত উপমহাদেশ নিয়ে বৃটিশের ’পার্টিশন’ খেলা

আনুমানিক পঠনকাল: 10 মিনিট

 

একদম চোখের সামনে ঘটতে থাকা হালের ইসরাইল-প্যালেস্টাইন সঙ্কট যা মাঝে মাঝেই নিভিয়ে ফেলা আগুনের মত কিছুদিন ছাইচাপা থাকে এবং তারপর আবার কোন না কোন উত্তেজনায় হাউয়ের হল্কা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে বিপুল দাবানল ঘটায়, তার শুরু কিন্ত হয়েছিল সেই ১৯৪৭-৪৮ সাল নাগাদ বৃটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির ’পার্টিশন’ নামক খেলা থেকে। পাঠক, চমকে উঠলেন? উপমহাদেশের মানুষ মাত্রই ’পার্টিশন’ শুনলে খানিকটা হলেও চমকে যায়। আজ ৭৬ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও। অদ্ভুত বিষয় হলো ভারত উপমহাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় একই রকম সময়ে বৃটিশ কেন আরব-ইহুদি ও হিন্দু-মুসলিম প্রশ্নে ’পার্টিশন’ নামক তুরুপের তাসটি খেললো যা দৃশ্যত: আজো এই দুই ভূ-খন্ডে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি, নারী ধর্ষণ, দেশত্যাগ ও উদ্বাস্তু সমস্যা ঘটিয়ে চলেছে? হ্যাঁ, ১৯৪৭ সালে ’ভারত’ ও ’পাকিস্থান’ আলাদা হবার পরেই ১৯৪৮ সাল নাগাদ আরব ভূ-খন্ডে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও লাখ লাখ মানুষের গণ অভিবাসনের ভেতর দিয়েই জন্ম নেয় ’ইসরাইল’ নামে আর একটি রাষ্ট্র। যেন বা বৃটেন বুঝিয়ে দিতে চাইছিল যে ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম, নৃ-তাত্ত্বিক বা সাংস্কৃতিক জন-গোষ্ঠির পক্ষে সহাবস্থান সম্ভব নয়। ইতিহাসের এই দুই মর্মান্তিক ঘটনাতেই ঔপনিবেশিক বৃটেন একইসাথে ’সমস্যা সৃষ্টিকারী’ এবং ’মধ্যস্থতাকারী’র ভূমিকা নিয়েছে। এছাড়াও আয়ারল্যান্ডেও ’ক্যাথলিক’ ও ’প্রটেস্ট্যান্ট’ আইরিশদের ভেতর বিভাজন সৃষ্টি করে বৃটেন সেই ভূ-খন্ডকেও টুকরো করেছে। আজকের সীমিত পরিসরে আয়ারল্যান্ডের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে না পারলেও প্রথমে ’প্যালেস্টাইন-ইসরাইল’ ও পরে ভারত উপমহাদেশে বৃটেনের এই খেলা নিয়ে আসুন একটু আলোচনা করি।

ফিলিস্তিনের গল্প

জায়নবাদী মতবাদ একটি প্রাচীন ভাবনা বা তত্ত্ব যা প্যালেস্টাইন বা ফিলিস্তিনে ইহুদি জন-গোষ্ঠির জন্য তাদের পূর্বপুরুষের ভূ-খন্ড বা ’প্রতিশ্রুত’ ভূমিতে একটি বাড়ি গড়ার স্বপক্ষে সৃষ্ট হয়েছিল। উনিশ শতকের শেষভাগে ইউরোপে ইহুদিদের ভেতর এটি একটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হিসেবে জনপ্রিয়তা পেতে থাকে এবং ইউরোপে যেহেতু তখনো ’এন্টি-সেমিটিক’ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ইহুদিদের টানা নিগ্রহ চলছিলো, কাজেই জায়নবাদী মতবাদ ইহুদি সমস্যার প্রশ্নে একটি সমাধান হিসেবে দেখা হতে থাকে। তবে সব ইহুদিই জায়নবাদী ছিলেন এটা বলা ঠিক হবে না। কিছু ইহুদি এর সক্রিয় বিরোধিতাও করেছিলেন। তবে ১৮৮০ সাল থেকে জারের রাশিয়ায় যখন একাধিক ইহুদি-বিরোধী গণহত্যা ও লুণ্ঠন শুরু হয়, তখন ইহুদি উদ্বাস্তুদের ঢেউ প্যালেস্টাইনে আছড়ে পড়তে থাকে। কিন্তু, সমস্যা হলো ১৭১৫-১৯১৫ নাগাদ অটোমান তুর্কী শাসনের কারণে ততদিনে প্যালেস্টাইনে আরব মুসলিমদের ঘন বসতি গড়ে উঠেছিল এবং এটি কারো হাতে দখল হবার জন্য শূণ্য, বিরাণ কোন ভূমি আর ছিল না। অটোমান তুর্কি শাসনে আরব মুসলিম ছাড়াও কিছু খ্রিষ্টান এবং সহস্রাব্দের মার সয়েও কিছু ইহুদি যারা রয়ে গেছিলেন, তারা ফিলিস্তিনে ছিলেন।

কিন্তু প্যালেস্টাইনের ইতিহাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ একটি বিপুল বদলকারী ঘটনা। যুদ্ধে জেতার নেশায় মরীয়া বৃটেন তখন যুদ্ধে জড়িত সব দেশ বা ভূ-খন্ডের নানা গোষ্ঠিকে খুশি করে যুদ্ধে সেসব গোষ্ঠির সমর্থন পাবার আশায় তাদের সাথে বিভিন্ন রকম চুক্তি সম্পাদন করছে। এমন একটি প্রতিশ্রুতি ছিল লন্ডনে জায়নবাদী নেতাদের প্রদত্ত বৃটিশ প্রতিশ্রুতি- ইতিহাসে যা ’বেলফোর ঘোষণা ১৯১৭’ নামে পরিচিত। এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল ’প্যালেস্টাইনে ইহুদি জন-গোষ্ঠির জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি গঠন করা’র কাজে সহায়তা করা। বৃটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি লর্ড রথসচাইল্ডের কাছে একটি চিঠিতে তদানীন্তন বৃটিশ পররাষ্ট্র সচিব আর্থার বেলফোর এই ঘোষণা প্রকাশ্যে জানান। দ্রুতই বৃটিশ সেনাবাহিনী অটোমান শাসকদের হাত থেকে জেরুজালেমকে বিচ্ছিন্ন করতে সমর্থ হয়। স্বভাবত:ই আরবরা এই ঘটনাগুলো সন্দেহের সাথে লক্ষ্য করতে থাকে এবং বুঝতে পারে যে জায়নাবদী মতাদর্শ দ্রুতই তাদের জন্য একটি বড় সমস্যা নিয়ে আসছে। যুদ্ধের পর পরাজিত জার্মান ও তুর্কিদের অধীনস্থ উপনিবেশগুলোর ভাগ্যে কি ঘটবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার প্রশ্ন সামনে চলে আসে। এক কথাতেই যুদ্ধে জয়ী মিত্র শক্তির পক্ষে এই কাজ করা সম্ভব হয়নি যেহেতু বিজয়ী শক্তি কর্তৃক বিজিত শক্তির ভূ-খন্ড নিজ সীমানায় সংযুক্ত করা যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্যের বিরোধী ছিল। এই সমস্যার মোকাবেলায় ’আদেশপত্র’-এর আঙ্গিকে এক ধরণের সমঝোতা উদ্ভাবিত হলো। এই ব্যবস্থার আওতায়, যুদ্ধে বিজিত এই ভূ-খন্ডগুলো শাসনের দায়িত্ব যতদিন পর্যন্ত তারা স্ব-শাসনের উপযোগী না হয়, ততদিন মিত্র শক্তির হাতে হস্তান্তরিত করা হলো। বিশ্বযুদ্ধের পর ভার্সেই চুক্তি ঘোষণা করলো যে এই অঞ্চলগুলো ’এমন সব জন-গোষ্ঠির আবাসভূমি যারা এখনো আধুনিক পৃথিবীর কঠোর ও শ্রমসাধ্য পরিবেশে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করেনি’ এবং ’এমন সব জন-গোষ্ঠির তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পৃথিবীর অগ্রসর জাতিগলোর কাঁধে ন্যস্ত করা উচিত যারা তাদের সম্পদ, অভিজ্ঞতা অথবা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবে।’ আলোকিত দিক নির্দেশনার ছদ্মবেশে এভাবেই বৃটেন ও ফ্রান্স তাদের সাবেকি ঔপনিবেশিক শাসন চালিয়ে যায়। যাহোক, ১৯২২ সাল নাগাদ পূর্বতন অটোমান সাম্রাজ্যের অধিকারভুক্ত প্যালেস্টাইনের শাসন ক্ষমতা বৃটেনের হাতে দেওয়া হয় এবং ’লীগ অফ নেশনস’ ১৯২২ সালে এর পক্ষে অনুমোদন দেয়। বৃটেন এখন ইহুদি জাতির স্বদেশভূমি গড়া, স্ব-শাসনকারী নানা প্রতিষ্ঠানের বিকাশ এবং ধর্ম-জাতি নির্বিশেষে প্যালেস্টাইনের সব অধিবাসীর বেসামরিক ও ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় দায়বদ্ধ। কাজটি বৃটেনের জন্য বেশ সমস্যাজনকই হয়ে দাঁড়ালো যেহেতু এর ফলে তাকে একই সাথে ইহুদি ও আরবদের জাতীয় দাবি-দাওয়া পূরণ করতে হবে যারা পারষ্পরিক ভাবে সাঙ্ঘর্ষিক।

১৯২০ সালেও ৭০০,০০০ ফিলিস্তিনী অধিবাসীর ভেতর মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ ছিলেন ইহুদি এবং পরবর্তী ৪০ বছরে বাকি ইহুদিদের অধিকাংশ প্রবেশ করেন। যেহেতু ইউরোপে বিশেষত: জার্মানী ও পোল্যান্ডে ইহুদি-বিদ্বেষী মানসিকতা বেড়েই চলছিল আর জায়নবাদীরা বৃটিশের বেলফোর ঘোষণার আওতায় সমর্থন পাচ্ছিলো, ১৯৩৬ সাল নাগাদ ইহুদি অভিবাসীর ঢল প্যালেস্টাইনে এসে তাদের জনসংখ্যা বেড়ে মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ হয়ে দাঁড়ালো। প্যালেস্টাইনে ক্রম-বর্দ্ধমান ইহুদি সম্প্রদায় নিজেদের ভেতর সুসংগঠিত ছিল। ’ইহুদি জাতীয় তহবিল’ নামক জমি ক্রয় এজেন্সি ইহুদিদের জন্য উর্বর জমি ক্রয়ের কাজটি করে জমিগুলো শুধুই ইহুদিদের ভেতর ইজারা দিত। ইহুদি নানা প্রতিষ্ঠানে নিজ সম্প্রদায়ের সবার চাকরি নিশ্চিত করতে ’ফেডারেশন অফ জিউয়িশ লেবার’ বা ’ইহুদি শ্রম সঙ্ঘ’ প্রতিষ্ঠা করা হলো এবং দ্রুতই ইহুদিরা নিজস্ব সামরিক বাহিনীও প্রতিরক্ষাগত কারণে গড়ে তুললো। এই যাবতীয় কাজেই তাঁরা বৃটিশ সমর্থন পেয়েছে। এই যাবতীয় ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আরব জাতীয়তাবাদও পোক্ত হতে শুরু করে এবং জায়নবাদী অভিবাসন ও জমি ক্রয়ের বিষয়টি আরব নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি জানায়। বৃটেনকেও তখন থেকেই আরবরা শত্রু মনে করতে শুরু করে; ফিলিস্তিনী ভূমি বৃটিশদের কাছে কোন প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয় ছিল না। কার্যত: স্থানীয় আরবরা স্ব-ভূমে প্রবল ভাবে আশঙ্কিত বোধ করা শুরু করে এবং এই বিক্ষুব্ধতা ১৯২৯ সালের ’ওয়েস্টার্ন ওয়্যাল রায়টস’ বা ’পশ্চিমা দেয়াল দাঙ্গা’-কে উস্কে দেয়। ’পশ্চিমের দেয়াল’ নামে এই স্থাপণাটি জেরুজালেম শহরের পুরাতণ এলাকায় স্থাপিত ছিল এবং ইহুদি-মুসলিম বা উভয় সম্প্রদায়ের চোখেই এর ছিল এক পবিত্র ভাবমূর্তি। এই দেয়ালটি কাদের মালিকানায় যাবে এ নিয়ে সাম্প্রদায়িক শত্রুতা বাড়তে থাকে এবং প্যালেস্টাইনে আরব-ইহুদি শান্তির কোন সত্যিকারের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে।

১৯৩০ সাল নাগাদ বৃটিশের এই ম্যান্ডেটের আওতাধীন অন্য দেশগুলো- যেমন, ইরাক, মিশর বা সিরিয়া নিজেদের স্ব-শাসনের নানা আঙ্গিক গড়ে তুলেছে এবং আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতাও অর্জন করেছে যখন কিনা প্যালেস্টাইন এমনকি স্ব-শাসনের আশপাশেও ছিল না। ফিলিস্তিনীদের এমনকি একটি প্রতিনিধিত্বমূলক আইন পরিষদও ছিল না। এমতাবস্থায়, আরব জাতীয়তাবাদী অনুভূতি আরো মৌলবাদী এবং ধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে উঠতে থাকে এবং ১৯৩৬ সাল নাগাদ বড় বড় গণবিক্ষোভ দেখা দেয়। বৃটিশ সরকার ’গাজর ও লাঠি’ নীতি অনুসরণ করে এবং সেনাবাহিনীকে আরব বিদ্রোহ দমনে ডাকার পর প্রাক্তন সেক্রেটারি অফ স্টেট ফর ইন্ডিয়া লর্ড পীলের নেতৃত্বে এক দাপ্তরিক কমিশন গঠন করে। এই কমিশনের কাজ ছিল একটি নির্দিষ্ট ভূ-খন্ডে দু’টো জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে একত্রিত করা।

এই কমিশন সুপারিশ দেয় যে প্যালেস্টাইনকে একটি আরব রাষ্ট্র এবং ইহুদি রাষ্ট্রের ভেতর ’পার্টিশন’ বা ভাগ করা হবে। প্রস্তাবিত ইহুদি রাষ্ট্রে অবশ্য তারপরও এক বিপুল সংখ্যক আরব সংখ্যালঘু জন-গোষ্ঠি থেকে যাবে এবং এই ’পার্টিশন’ বা দেশভাগকে ’পরিষ্কার এবং শেষ’ করতে পীল তাই এক জন বিনিময়ের আহ্বান জানালেন। এর অর্থ হলো একটি ইহুদি রাষ্ট্র গড়তে ২০,০০০ আরবকে স্ব-ভূমি ছেড়ে যেতে হবে। পূর্ব পুরুষের ভূমি ছেড়ে যেতে হবে বুঝে আরবরা বিক্ষুব্ধ হয় এবং যার ফলে ১৯৩৯ সালের ’উপনিবেশ-বিরোধী দাঙ্গা’ ছড়িয়ে পড়ে। এই সময় থেকেই মূলত: আরব চাষীদের ঐতিহ্যবাহী মস্তকাবরণী ’কেফফিয়েহ’ ফিলিস্তিনী প্রতিরোধের এক প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ এই বিদ্রোহ আবার নিষ্ঠুরভাবে দমন করে।

কূটনৈতিক পর্যায়ে, এই বিদ্রোহের তীব্রতা এবং বিদ্রোহ দমনের চড়া মূল্য প্যালেস্টাইন নিয়ে বৃটিশ পরিকল্পনায়ও একটি পরিবর্তন আনে। এছাড়া ইউরোপের মাথার উপরে তখন আবার যুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে আসছে এবং একটি সম্ভাব্য যুদ্ধের মুখে বৃটেনের দরকার ছিল যোগাযোগ ও সরবরাহের সব সংযোগ নিশ্চিত রাখা। ফলাফলস্বরূপ, ১৯৩৯ সালে একটি শ্বেতপত্র প্রণীত হয় যা ’পার্টিশন’ বা দেশভাগের ধারণাকে নাকচ করে জায়নবাদী কর্তৃপক্ষ কতৃর্ক ধারাবাহিক জমি ক্রয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এবং ইহুদি অভিবাসনের সীমারেখা টেনে দেয়- বলা হয় যে পাঁচ বছরে ৭৫০০০-এর বেশি ইহুদি প্যালেস্টাইনে প্রবেশ করতে পারবে না এবং তারপর গোটা ইহুদি অভিবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়া হবে। এই শ্বেতপত্র অনুযায়ী একটি অখন্ড ফিলিস্তিনী রাষ্ট্র গড়ার কথাও বলা হয় যেখানে আরব ও ইহুদিরা পারষ্পরিক ভাবে শাসন কর্তৃত্ব বজায় রাখবে। এই শ্বেতপত্র ’বেলফোর’ ঘোষণাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং প্যালেস্টাইনে গৃহীত বিগত বিশ বছরের বৃটিশ নীতি পুরো উল্টে দেয়। কিন্তু এই নীতির ক্ষেত্রে একটি বড় রদবদল ছিল সময়ের ব্যপার মাত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বৃটেন এত ক্লান্ত হয়ে পড়ে যে প্যালেস্টাইনের আগামী দিন কেমন হবে সেটা নির্দ্ধারণে যথেষ্ট পরিমাণ সঙ্কল্প বা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা তার আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। এছাড়াও নাজি জার্মানীর হাতে ৬০ লাখ ইহুদির হত্যার পর বহু পশ্চিমা রাষ্ট্র এবং বিশেষত: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্রের পক্ষে পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করে যে রাষ্ট্র এই নাজি গণহত্যার হাত এড়িয়ে বেঁচে যাওয়া ইহুদিদের আশ্রয় দেবে। ইহুদি জনগণের পক্ষে অভূতপূর্ব জনসমর্থনের বন্যায় ইহুদি অভিবাসন বিষয়ক বৃটিশ নীতিকে তিক্ত সমালোচনা করা হয়। এই পরিস্থিতিতে, বৃটেন জাতিসঙ্ঘের মুখাপেক্ষী হয় এবং প্যালেস্টাইনের সমস্যাটি জাতিসঙ্ঘকে দিয়ে এক অসম্ভব এলোমেলো পরিস্থিতি থেকে নিজের হাত ধুয়ে ফ্যালে যে পরিস্থিতি সে নিজেই সৃষ্টি করেছিল।

জাতিসংঘ এসময় প্যালেস্টাইন বিষয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে এবং প্যালেস্টাইনকে ভাগ করার ধারণাটির পুনরুজ্জীবন ঘটায়, যা দশ বছর আগে ’পীল কমিশন’ প্রথম দাবি করেছিল। প্রস্তাবিত ইহুদি রাষ্ট্র প্যালেস্টাইনের ৫৫ শতাংশ ভূ-খন্ডের মালিকানা পাবে যদিও এই ভূ-খন্ডে ইহুদি বসতি এবং আরব গ্রামগুলো অঙ্গাঙ্গী ভাবে সংশ্লিষ্ট থাকবে। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ক্রুদ্ধ আরব জনতা এই ব্যবস্থাপত্র প্রত্যাখ্যান করে এবং সদ্য গঠিত রাষ্ট্র ইসরাইল ও তার আরব প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ভেতর একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রেক্ষিতে ফিলিস্তিনে একটি গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

এই লড়াইয়ের সময় ইসরাইল প্যালেস্টাইনের ৭৮ শতাংশ ভূমির দখল নিয়ে নেয় এবং লাখ লাখ ফিলিস্তিনীকে স্ব-ভূমি থেকে পালাতে বা নির্বাসিত হতে হয়। ইতোমধ্যে, বৃটিশ চিরতরে এই অভাগা ভূ-খন্ড থেকে বিদায় নিয়েছে কিন্তু বাকি যা ঘটেছে সেটাই হলো ইতিহাস। গত কয়েক দশকে বেশ কয়েক বার আরব-ইসরাইল যুদ্ধ ঘটেছে এবং আশপাশে আমাদের দৃশ্যগ্রাহ্যতার ভেতরে কোন সমাধান নেই।

এভাবেই মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-খন্ডে কয়েক শতাব্দীরও বেশি সময় ইউরোপে বাস করে ইউরোপীয় হয়ে যাওয়া যে ইহুদি জন-গোষ্ঠিকে পুনর্বাসন করা হলো, সেটা একটি সমস্যা-সঙ্কুল বিষয় হয়েই রইলো। একে তো ভূ-খন্ডে ইতোমধ্যে গত দু’শো বছরে আরবরা বসতি গেঁড়েছে, তাতে ইউরোপ থেকে আসা এই জন-গোষ্ঠি পোশাক-চেহারা-ভাষায় সেই দু’হাজার বছর আগে জন্মভূমি ছেড়ে যাওয়া ইহুদিদের মত হুবহু একই তো আর ছিল না। সেই সাথে কোন স্থায়ী, বিচক্ষণ নীতির অভাবে গোটা এলাকার সমস্যা আরো জটিল হয়ে ওঠে। বৃটিশ ভূ-রাজনৈতিক নানা প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করেই প্যালেস্টাইন প্রসঙ্গে বৃটিশ নীতির বারবার বদল হয়েছে।

ভারত উপমহাদেশের গল্প

দেশভাগের ৭৬ বছর পর যখন পরবর্তী প্রজন্মরা সেই তামস সময়ের আতঙ্ক আর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ভীতি বোধ অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে, তখনো একটি অনুক্ত প্রশ্ন থেকেই যায়: কেন এই ভাগ হলো? কেন উপমহাদেশ টুকরো টুকরো হলো? রামচন্দ্র গুহ তাঁর বিখ্যাত কাজ ’গান্ধি পরবর্তী ভারত (ইন্ডিয়া আফটার গান্ধি)’-তে লিখেছেন, ’ এ বিষয়ে তিনটি পৃথক পৃথক উত্তর প্রচলিত। প্রথম উত্তর অনুযায়ী সব দোষ চাপে কংগ্রেস নেতৃত্বের ঘাড়ে যারা জিন্নাহ্ এবং মুসলিমদের যথাযথ গুরুত্ব দেননি। দ্বিতীয় উত্তর দোষ দেয় জিন্নাহকে যিনি মানবীয় প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনা না করেই একটি ভিন্ন দেশের লক্ষ্যকে তাড়া করে ফিরেছেন। তৃতীয় উত্তর অনুযায়ী বৃটিশই সব কিছুর জন্য দায়ি যারা হিন্দু ও মুসলিমদের ভেতর বিভাজন সৃষ্টি করে নিজেদের শাসন ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে চেয়েছে।’ সত্যি উত্তরটি হবে এই তিন উত্তরের এক জটিল জোড়া-তালি।

দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের একটি নিজস্ব জাতি গঠন প্রয়োজন এমন ভাবনা কিন্তু বহু দিনের। বিশ শতকের শুরুতেই এই ভাবনাটি রূপ লাভ করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার সময় নাগাদ এটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে বৃটিশ শাসকেরা দ্রুতই ভারতীয়দের হাতে তাদের স্ব-শাসন ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবেন, পাকিস্থানের ধারণাটিও একটি জরুরি প্রয়োজন হিসেবেই দেখা দেয়।

১৯৪৬-এ সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি কেন্দ্রীয় সংস্থা তৈরির জন্য ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে প্রাদেশিক সরকার গঠনের নির্বাচন হয় এবং সেই নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলই ধর্মের রাজনীতিকরণ করে। মুসলিম লীগ তার সমর্থকদের সমাবেশে পাকিস্থানের ধারণাকে কৌশলগত ভাবে ব্যবহার করে। লীগের প্রচারণার মূল মন্ত্রই ছিল যে লীগের পক্ষে প্রতিটি ভোটই পাকিস্থানের পক্ষে যাবে। ’পাকিস্থান’ বলতে কি বোঝানো হচ্ছে তা’ কিন্তু স্পষ্ট করে বলা হয়নি।

আজ যেমন পাকিস্থান, ভারত বা পরবর্তীতে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশেরও নির্দিষ্ট নানা সীমানারেখা আছে, সেটা দেশভাগের আগে এত সুস্পষ্ট ভাবে ছিল না। অনেকে তখন এমনকি পাকিস্থানের কথা কোন নির্দিষ্ট ভূ-খন্ডের সীমারেখার ভেতর ভাবেওনি। জনমনে ছিল বিবিধ প্রশ্ন। ’হিন্দু’ এবং ’মুসলিম’ জন-গোষ্ঠি অধ্যূষিত এলাকাগুলোকে নিয়ে একটি ফেডারেশন গঠিত হবে কি? নাকি সারা ভারত জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোয় থাকবে ’ছোট ছোট পাকিস্থান?’ অথবা ভূ-খন্ডগত ভাবে পৃথক জাতি-রাষ্ট্র হবে? দিল্লি, আলীগড় বা হায়েদ্রাবাদের মত শহরগুলোরই বা কি হবে? এ বিষয়ে কারোর কাছেই কোন নির্দিষ্ট উত্তর ছিল না এবং একটি বিষয় খুবই পরিষ্কার ছিল- সাধারণ মানুষ তখনো ভাবেইনি যে এমন গণ হারে অভিবাসন হবে।

প্রাদেশিক সরকারগুলো গঠন হবার পর হিন্দু ও মুসলিম- উভয় সম্প্রদায়ের ভেতর একটি বোঝা-পড়ায় আসার চেষ্টা করা হয় এবং অবিভক্ত ভারতের জন্য একটি মাত্র সাংবিধানিক পরিকল্পনা সৃষ্টি করা হয়। এই উদ্দেশ্যে কেবিনেট মিশনও প্রেরিত হয় যা তিন স্তরে একটি ফেডারেশন বা যুক্তরাজ্য গঠনের পরামর্শ দেয় যেখানে কেন্দ্রীয় সরকার শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকবে এবং সায়ত্ত্বশাসিত প্রদেশগুলো তিনটি ভাগে ভাগ হবে। কিন্তু এক শক্ত-পোক্ত, কেন্দ্রায়িত ভারত চাওয়া পক্ষ এবং দেশভাগ চাওয়া পক্ষ- উভয় পক্ষই এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে। এদিকে মুসলিম লীগের আহ্বানে কলকাতায় ১৯৪৬ সালের আগস্টে ’ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে’ আহ্বান করা হয় এবং দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে বিহার, উত্তর প্রদেশ এবং পাঞ্জাবেও যেখানে ১৯৪৭-এর মার্চ নাগাদ অভূতপূর্ব মাত্রায় হত্যা, দাঙ্গা ও অরাজকতা শুরু হয়। উল্লেখ্য, ১৯৪৬ সালে তদানীন্তন পূর্ব বাংলার নোয়াখালিতেও ভয়াবহ এক দাঙ্গা সঙ্ঘটিত হয়।

এমনই এক ভীতি ও উদ্বেগের সময়, পাঞ্জাব ও বাংলার বিভাজন যেন এক সমাধান হিসেবেই দেখা দেয়। সবারই মনে হলো যে ভারতে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার পেতে হলে দেশ ভাগ হতে হবে। এভাবেই পাকিস্থান রাষ্ট্রের ধারণাটি পাকিস্থান রাষ্ট্রের ধারণার সাথে মিলে গেল। এদিকে লন্ডন চাইছিল যত দ্রুত সম্ভব, এক-কেন্দ্রিক বা বিভাজিত ভারত ত্যাগ করতে। ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী এ্যাটলি ঘোষণা করেন যে বৃটেন ১৯৪৮ সালের জুনের ভেতরই উপমহাদেশ থেকে চলে যেতে চায়। লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে এই ক্ষমতা হস্তান্তরের কাজ সম্পূর্ণ করতে নতুন ভাইসরয় হিসেবে পাঠানো হলো। পাঞ্জাব ও বাংলার স্থানিক ও পরিসংখ্যানগত মানচিত্রের উপর ভিত্তি করে পার্টিশন বা দেশভাগের পরিকল্পনা করা হলো অথচ মানবিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়ে পুরো নৈর্ব্যক্তিক থাকা হলো। ’মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা’ নামে পরিচিত এই পরিকল্পনা জুনের ৩ তারিখ উপমহাদেশের উদ্বিগ্ন জনগণের সামনে প্রকাশ করা হলো। এটা পরিষ্কার হলো যে দেশ ভাগ হতে যাচ্ছে, কিন্তু মানুষজনকেও কি সরতে হবে? সীমারেখা কোথায় বসবে? এই কঠিন প্রশ্নগুলোর কোন উত্তর দেয়া হলো না। জনমানসের গভীর হাহাকার ও সংশয়ের ভেতরেই ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতার তারিখ ঘোষিত হলো। সবচেয়ে বেশি বিস্ময় ও ভয়ের আর্তনাদ এলো পাঞ্জাব ও বাংলা থেকে। লাহোর, মূলতান এবং রাওয়ালপিন্ডিতে সংখ্যায় মুসলিমরা বেশি হলেও এখানে পঞ্চাশ হাজারের বেশি শিখও ছিল এবং তাদের পবিত্রতম অনেক তীর্থস্থানও এই এলাকাগুলোতেই অবস্থিত ছিল।

৩০শে জুন, ১৯৪৭ তারিখে সিরিল র‌্যাডক্লিফের নেতৃত্বে পাঞ্জাব এবং বেঙ্গল বাউন্ডারি কমিশন গঠিত হয়। রুদ্ধদ্বারের ভেতর কমিশন কাজ করে এবং কমিশনের কাঁধে চাপে মেয়াদোত্তীর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে ভূমি, সম্পদ ও সেনাবাহিনী ভাগ-বন্টনের দায়িত্ব। বাংলা ও পাঞ্জাবের অসংখ্য দল থেকে কমিশনের কাছে আবেদনের পর আবেদন আসতে থাকে। র‌্যাডক্লিফের কাজটি ছিল ধন্যবাদহীন একটি কাজ। ইতোমধ্যে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস শুরু হয়ে যায় এবং বিশেষত: বাংলা ও পাঞ্জাবের পথে উদ্বাস্তুর ঢল নামে। ১২ই আগস্ট নাগাদই দেশভাগের পরিকল্পনা প্রস্তুত হলেও পাঁচ দিন ইচ্ছা করেই দেরি করা হয়।

অবশেষে ১৭ই আগস্ট প্রথম জনতার কাছে ’র‌্যাডক্লিফ লাইন’ প্রকাশ করা হয় এবং ঐদিনই প্রথম বৃটিশ সেনাবাহিনীর প্রথম রেজিমেন্ট মুম্বাই ছেড়ে দেয়। বৃটিশ-নির্দেশিত ’ভারতীয় সীমান্ত বাহিনী (ইন্ডিয়ান বাউন্ডারি ফোর্স)’ যাদের পাঞ্জাবে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের কথা ছিল, সেই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল ৫০,০০০ এবং এই ৫০,০০০ সৈন্যও যে পাশবিক উন্মত্ততা শুরু হতে যাচ্ছিল তাকে দমনের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত ও পর্যাপ্ত সংখ্যক ছিল না।

দেশভাগের আগে সহিংসতা তো হয়েছেই, কিন্তু ১৯৪৭-এর ১৫ই আগস্টেও পর সহিংসতা এক নতুন নিষ্ঠুরতা ও হিংস্রতায় মেতে ওঠে। জাতিগত নির্মূল অভিযানের পাশাপাশি চলতে থাকে বিপুল হারে জন বিনিময়। তন্দ্রাচ্ছন্ন প্রাদেশিক সরকারগুলোর না ছিল যথেষ্ট অর্থবল বা জনবল- তারা কোনভাবেই নতুন এতটা দায়িত্বের জন্য প্রস্তুত ছিল না। ফলে হাজার হাজার প্রাণ নষ্ট হয়।

দেশভাগ কিভাবে করা হবে সেটা নিয়ে বৃটিশ প্রভুদের মনে কোন সুষ্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। ভারত ও পাকিস্থানের উভয়াংশেই সংখ্যালঘু জন-গোষ্ঠিগুলোকে নাগরিকত্ব, সম্পত্তি ও নিরাপত্তার বিষয়ে পুন: পুন: আশ্বাস ও নিরাপত্তা দেয়া উচিত ছিল, সে তারা যে ধর্মেরই হোন না কেন বা যেখানেই বাস করুন না কেন। ঔপনিবেশিক প্রভুরা প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী ও আমলাদের কয়েক মাস আগে থেকেই প্রস্তুত করে রাখলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা ও জনতার শান্তিপূর্ণ স্থানান্তর সম্ভব হতো। দু:খজনকভাবে সেটা করা হয়নি। ভারত ত্যাগের তাড়া-হুড়োয় ঔপনিবেশিক প্রভুদের মনে দক্ষিণ এশীয়দের জীবনের সুরক্ষা নিয়ে কোন ভাবনাই ছিল না। বৃটিশ মুকুটের রত্ন ভারত ততদিনে একটি বড় বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং ফলে এই রত্নটি বৃটিশ কোনমতে ছুঁড়ে ফেলে পালায়।

যুদ্ধে যুদ্ধে বিপর্যস্ত বৃটিশ ১৯৪৭ সালে চিরদিনের মত ভারত ত্যাগ করে এবং একই বছরে প্যালেস্টাইন বা ফিলিস্তিন ভূ-খন্ডেও একই ’পার্টিশন’ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই উভয় দেশেই যে ক্ষমার অযোগ্য অদক্ষতা বৃটিশ প্রদর্শন করে তা’ ’সাদা মানুষের সভ্যতার আলো ছড়ানোর দায়’ কথাটি থেকে বহু দূরবর্তী এক কান্না। বি-উপনিবেশীকরণ প্রক্রিয়ার সাথে সাথে যে কোন সন্ত্রাস বা সহিংসতার সন্ত্রাসের যে কোন ঘটনায় বহু স্তর থাকে যার কারণে নির্দিষ্ট ভাবে বিশেষ কোন একটি পক্ষকে দায়ি করা চলে না। তবে, একথা পরিষ্কার যে উপমহাদেশ ত্যাগ করা ঔপনিবেশিক প্রভুরা জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারেই ধ্বংস ও সমস্যার যে পথরেখা রেখে গেছিলেন তা’ আজো আমাদের ক্ষতিগ্রস্থ করছে- উপমহাদেশের তিনটি দেশের ভেতর সীমানা নিয়ে সমস্যা এবং বিক্ষুব্ধ সব জন-গোষ্ঠি। পৃথিবীর প্রতিটি বি-উপনিবেশীকৃত অঞ্চলেই (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা বা আফ্রিকা যাই হোক না কেন) একই গল্প। সীমানারেখা পুনরায় অঙ্কণ এবং গণ অভিবাসনের গল্পটা মোটামুটি একইরকম হলেও অঞ্চলভেদে ধর্ষণ, খুন ও লুন্ঠনের কাহিনীগুলো ভিন্ন। এর দায় ঔপনিবেশিক সাদা প্রভুদের নিতে হবে।

উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে পশ্চিমা ও ভারতীয় ইতিহাসবিদেরা কেউ কেউ এ বিষয়ে বই লিখেছেন। সেই তিনটি বিখ্যাত বইয়ের ছবি এখানে সাথে সংযুক্ত করে দেওয়া হলো।



এই লেখাটি বৃটেন কর্তৃক প্যালেস্টাইন ও ভারতের পার্টিশনের তাত্ত্বিক ইতিহাসই শুধু তুলে ধরেছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কত আরব এবং কম সংখ্যায় হলেও ইহুদি নাগরিক হতাহত হয়েছেন, কত হিন্দু-মুসলিম-শিখ নর-নারী হত্যা-ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, কত লাখ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়েছেন সেটা লিখতে গেলে এই লেখাটির পরবর্তী একটি সংখ্যা প্রয়োজন যদিও নিশ্চিত নই যে তেমন সুযোগ পত্রিকা কর্তৃপক্ষ আর দেবেন কিনা।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা: ’ড্রয়িং প্যারালেলস: বৃটিশ পার্টিশন প্ল্যানস ফর ইন্ডিয়া এ্যান্ড প্যালেস্টাইন’- কমল দেওল , মেইনস্ট্রিম উইকলি, আগস্ট ২৮, ২০২১।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত