| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গদ্য: নিস্তব্ধ আত্মার ছায়া । মণিকা চক্রবর্তী 

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

১.

বাগানে ফুলের বীজ লাগাতে গিয়ে নিজেকে নতুনভাবে জানবার সুযোগ করে দেয় বিকেলের নরম আলো। থরে থরে সাজানো তার রং ,রূপ ও গন্ধের শোভা আমাকে দিয়ে তাদের ইচ্ছেমতো কাজ করিয়ে নেয়। এতদিন মনে হয়েছিল তারা আমার ইচ্ছের ফসল কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয় বাগান তার অপরূপ শোভা নিয়ে আমারই উপর ক্রিয়াশীল। লিখতে গিয়ে কবি অরুণ মিত্রের ‘বৃক্ষমূলে’ কবিতাটিকে মনে পড়ছে। কবিতাটি যেন প্রসঙ্গটিকে অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির যৌথ পটচিত্রে গদ্যের টানটান ঋজুতায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। কবিতাটির মর্ম আন্দোলিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে মনের উপর অনায়াসে।

‘বৃক্ষমূলে আমার ঘনিষ্ঠতম কথা রেখে দিয়েছি

আমার সমস্ত আত্মীয়তা তার মধ্যে

কেননা আকুল জল এখানেই ঢালা হয়েছিল

এবং শীত গ্রীষ্মেও মার পড়েছিল বুকে পিঠে।

ফুল ফলের সাজ আলোছায়ার ঝিলমিল বলে

কী সুখ কী সুখ

যে চুরমার পাঁজরে দুঃখ জমে থাকে

তাকে তো আমি দেখেছি

সেই উৎস থেকে শোভা ওঠে

তাই আমার প্রেম আমি পেতে দিয়েছি মাটিতে ধুলোয়।’

প্রেম বা নরনারী সম্পর্ক অথবা তামসিক প্রেমের মধ্যে দিয়ে যে আবেগ সর্বস্ব কবিতা আমরা সচরাচর দেখি, এই কবিতাটি তেমন নয়। প্রেমের অন্তরস্থিত যন্ত্রণার কান্নাটুকু যেন তাৎপর্য পেতে যাচ্ছে এক সমগ্রতার বোধের দিকে। জীবন এক একটি পর্বের শেষে এসে থমকে দাঁড়ায়, যেন ফুরিয়ে যেতে চায়। তখন তাকে আবার নতুন করে জন্ম দিতে হয়। শরীর দুর্বল কিন্তু মন তখন ক্রমশ নির্ভার, বহুদূর প্রসারিত। জীবনই জীবনের আশ্রয়। ছোট জীবনের আশ্রয় বড় জীবনে, প্রকৃতিতে। সেখানে তার মুক্তিও।

২.

ভীষণভাবে বদলে যাওয়া বিশ্বে, নিষ্পেষিত পৃথিবীর চুরমার পাঁজরের দুঃখগাঁথা জমে থাকে প্রকৃতির আর্তনাদে। সমুদ্রতল উঠে এসে প্রতিনিয়তই গ্রাস করছে বন—বনানী, বড় বড় শহরগুলো অবলীলায় পরিণত হচ্ছে কার্বন ডাই অক্সাইডের শহরে। লেখক অমিতাভ ঘোষ তাঁর দ্যা গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট বইতে প্রাকৃতিক জীবনের এই মহা অবিন্যাসকে তুলে ধরেছেন। অনাগত ভবিষ্যতের পাঠক নিশ্চয় ব্যাকুলভাবে খুঁজবে কোনো ইশারা! শিল্প সাহিত্যর নিশ্চয়ই দায়িত্ব রয়েছে এই ঘনায়মান বিপর্যয়কে দ্রুত চিনিয়ে দেবার। তবে শিল্পসাহিত্যে এই সম্পর্কিত চর্চা এত কম কেন! তা কি এতটাই বন্য যে তাকে প্রচলিত সাহিত্যিক রচনায় বিবৃত করা যাচ্ছে না! অথবা আমরা জেনেশুনেই সেইরকম সাংস্কৃতিক আকাক্সক্ষার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি যেখানে কার্বন অর্থনীতিই প্রধান চালিকাশক্তি! অতি বীভৎসভাবে দাবানলে পুড়ে যাচ্ছে অরণ্য—বৃক্ষ, বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী আর পাখিকুল। হারিয়ে যাওয়া ডোডো পাখির কথাও আমরা ভুলে গেছি। নিয়মিত ঘটছে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ, অপ্রত্যাশিত ঝড় ,সাইক্লোন, বন্যা। এই অসম্ভব অপ্রত্যাশিত ঘটনাকে কিভাবে সাহিত্যে রূপ দেয়া যায়! এসব সত্যি যখন রীতিমতো ভয়ঙ্কর! ‘গল্পই লোকের বিশ্বাস কাড়িবার জন্য সাবধান হইয়া চলে। সত্যের সে দায় নাই বলিয়া সত্য অদ্ভুত হইতে ভয় করে না।’ আমাদের সত্যিগুলো কতই না ভয়ঙ্কর!

আধুনিক সভ্যতা বন্যতাকে কিভাবে ধ্বংস করছে তার অকাট্য উচ্চারণ রয়েছে বিভূতিভূষণের আরণ্যক উপন্যাসে। সত্যচরণ জঙ্গলমহলে গিয়েছিল প্রজাবিলি করতে , কুমারী বনাঞ্চলের বুকে বসতি বানাতে। লবটুলিয়া—ফুলকিয়া—বইহারের অপরূপ প্রকৃতি যে অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে সেটা সে জানত। এজন্য তার তীব্র অপরাধবোধ ছিল। ‘হে অরণ্যানীর আদিম দেবতারা ,ক্ষমা করিও আমায়’। মাটির নীচে আকরিকের সন্ধান পাবার পর কী ঘটতে পারে তারও সুস্পষ্ট ধারণা ছিল। উত্তর বিহারের বিশাল অরণ্যে প্রজা বসানোর কাজ করতে গিয়ে প্রথমদিকে কলকাতা শহরের জন্য তাঁর মন কাঁদত। কিন্তু একটা সময় পর তিনি এই অরণ্যভূমিতে বসবাসরত কিছু মানুষের জীবনকে গভীরভাবে ভালবেসে ফেলেন। সাত—আট বছর শেষে প্রজাবসানোর কাজ শেষ হলে পরে এই বনভূমিকে রক্ষা না করতে পারার বেদনা তাঁকে প্রবলভাবে আক্রান্ত করে।

জঙ্গলের জীবনের একটা কঠিন শৌর্যপূর্ণ গতিশীল ব্রাত্যজীবনের ছবি এঁকেছেন বিভূতিভূষণ আরণ্যক উপন্যাসে। বনভূমি, নির্জনতা, ঘোড়ায় চড়া, পথ হারানো অন্ধকার, নির্জন জঙ্গলে খুপড়ি বেঁধে থাকা সেখানকার স্থানীয় লোকদের দারিদ্র্য, সরলতা সকলকিছুই বিবৃত হয়েছে ‘আরণ্যকে’।

ভ্যান গখ্ তাঁর ভাই থিওকে চিঠিতে লিখেছিলেন; ‘যদি তুমি জাপানি শিল্পকলা লক্ষ করো, তুমি খুঁজে পাবে এমন একজন মানুষকে যে নিঃসন্দেহে জ্ঞানী,দার্শনিক এবং বুদ্ধিমান- সে কি চাঁদ ও পৃথিবীর দূরত্ব বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করে? না। সে লক্ষ করে একটি ঘাসের পাতা। কিন্তু এই ঘাসের পাতাই তার ভাবনাকে চালিত করে উদ্ভিদের দিকে, সেখান থেকে বিভিন্ন ঋতুর দিকে, সেখান থেকে প্রকৃতির বিবিধ বৈশিষ্ট্যের দিকে, সেখান থেকে বিভিন্ন প্রাণীর দিকে, সেখান থেকে মানুষের দিকে।’ অর্থাৎ অংশ থেকে সমগ্রের দিকে আর সমগ্রতার বোধ নিয়ে অংশের দিকে তাকানো। কোনো খণ্ডিত বোধ নিয়ে নয়।

এই সমগ্রতার বোধ ছাড়া শান্তির সঙ্গে কি এই পৃথিবীতে বসবাস করা সম্ভব! কোনো রকমে টিকে থাকা এই জীবন নিয়ে ট্রেসি চ্যাপম্যানের একটি গান আছে। ‘আমি জেগে উঠে জানতে চাই কোথায় চলেছি।’ বেঁচে থাকার মানে খুঁজতে যেয়ে শিকড়হীন মানুষেরা নিজের কাছেই নিজে অচেনা। এক সঙ্কটের বোধ নিয়ে অস্থির মানুষেরা বড় বেশি অদ্ভুত চাওয়ায় দিশাহারা,অনেক অপচয় নিয়ে বিপর্যস্ত।

৩.

মানুষ এক অদ্ভুত প্রাণী। এবং জীব হিসাবে সর্বতোভাবে এক জাতি। যেহেতু বারো মাসই তাদের প্রজনন ঋতু, তাই খাদ্যের সংকট না থাকলে তার দ্রুত বংশবৃদ্ধি অতি স্বাভাবিক। ধর্মের সৃষ্টিতত্ত্বে মানুষকে সর্বজীবের উপর প্রভুত্ব সৃষ্টির আশীর্বাদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই আশীর্বাদ আরণ্যক যুগের মানুষ ও প্রকৃতির মর্মকে আঘাত করে নির্মমভাবে। খাদ্যের জন্য মানুষ তখন পশু শিকার করেছে ঠিকই, কিন্তু গাছপালা, পশু ও প্রকৃতিকে স্নেহের বন্ধনে বেঁধে রেখে। তখন গাছের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিল বিশ্বাসের। তারা জানত গাছ অনেক কিছুই পারে। খাদ্য, আশ্রয়,সুস্থতা সবকিছুরই জোগান দিতে পারে গাছ। তাই তাঁকে সম্মান করে বলা হতো কল্পতরু।

একসময় ভারবাহী পশু হিসাবে যেসব পশুরা ছিল,তাদের সঙ্গেও মানুষের ছিল নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক। আজ তারা ক্রমেই নিশ্চিহ্ন হচ্ছে। আমাজান জঙ্গলের সমূহ ক্ষতি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আস্তে আস্তে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে হাতি,বাঘ,গন্ডার,হরিণ,বাইসন আর তিমিমাছ। মানুষের লোভের হাত থেকে নিস্তার নেই ব্যাঙ,বাদুড়,টিকটিকি,প্রজাপতির। স্তূপীকৃত মুরগি প্রজাতিরা নিঃশব্দে পড়ে থাকে, তাদের হাত পা বাঁধা, মাথাগুলো ঝুলতে থাকে।

মাত্র আটহাজার বছর আগেও মানুষের এত সংখ্যাধিক্য ছিল না। ঈশ্বরের আশীর্বাদে সমস্ত প্রাণীকে বিলুপ্ত করে মানুষ কী শুধু একাই বেঁচে থাকবে। মাছির মতো থিকথিকে, কোনো গন্তব্য নেই কিন্তু গতিপথ আছে।

৪.

দু বছর আগে কোভিড ১৯ এর প্রকোপের শুরুর দিকে কয়েক মাস পৃথিবী ছিল লকডাউনে। আমরা তখন দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম,বড় বড় শহরের রাস্তায় কি নিশ্চিন্তে হেঁটে বেড়াচ্ছে প্রাণীকুল। শহরের দাপটে এতদিন গৌণ হয়েছিল যে প্রাণী জীবন,শহরের আলো ছিল যাদের কাছে অন্ধত্ব, হঠাৎ করে তারা পথ খুঁজে পেল।

ভাবা যাক ,খুব ব্যস্ত শহরগুলো যদি কোনো কারণে পরিত্যক্ত হয়, তবে কী কী ঘটতে পারে! জলের পাম্পগুলো সচল থাকবে না। জল জমে খুব দ্রুতই মাটিগুলোকে ধুয়ে নেবে। রাস্তাগুলো বসে যেতে থাকবে। সুড়ঙ্গপথ আর সাবওয়ের ছাদগুলো ধসে পড়তে থাকবে তখন। ফুটপাথ, মেট্রো রেল, আর রাস্তাগুলো হয়ে উঠবে নদী। অচল হয়ে পড়বে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। সব বরফ গলতে শুরু করবে আর পৃথিবীর জলেরা ঢুকে পড়বে ফাটলের ভিতর দিয়ে। জলকে ভূপৃষ্ঠের নীচে নির্বাসন দেয়ার প্রতিশোধ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে জলেরা।

প্রকৃতি কি তার প্রাণের ভিতর এই দাবি অনুভব করছে না! আমরা কি শুনতে পাচ্ছি না তার চিৎকার! অথবা শুনতে পেয়েও তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখছি!

মানবসভ্যতার ভেতরে ও বাইরে এক অদম্য বন্যতা ঘিরে আছে সমস্ত সৃষ্টিকে। বন্দি করলে সে মারা যাবে। এখানেই রয়েছে বিশুদ্ধ স্বাধীনতা, বিশুদ্ধ আবেগ, বিশুদ্ধ খিদে। খনি কোম্পানি, কাঠ ব্যবসায়ী, মিশনারী, পুঁজিবাদ সকলে মিলে প্রকৃতিকে যেভাবে শোষন করছে, অচিরেই প্রকৃতির প্রতিশোধ নেমে আসবে পৃথিবী নামক গ্রহটির উপর। সভ্যতার গুণগান বা সভ্যতার বিরুদ্ধাচারণের কথা না ভেবে এখনই ভাবতে হবে প্রকৃতিকে মানুষের অস্তিত্বের উৎস হিসাবে কিভাবে সঙ্গে রাখা যায়।

৫.

আধুনিক শহরের মতো বিশাল আর শক্তপোক্ত একটা কাঠামোকে যে প্রকৃতি কোনে একদিন গ্রাস করে ফেলতে পারে, এটা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। কারণ প্রকৃতির আগ্রাসী ভুমিকাটি আমরা এখনও চিন্তার গভীরে স্থান দিচ্ছি না। সন্ত্রাসী হামলায় চোখের পলকে নিউইয়র্ক শহরের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার যেভাবে ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে, তাতে এইসব ইমারতের পরিকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে সন্দেহ জাগে। নগরায়ন যা কিছু সৃষ্টি করছে সেই সবকিছুকে নস্যাৎ করতে পৃথিবীর যতটা সময় লাগবে বলে আমরা ভাবি, আসলে তা ঘটে যাবে আতঙ্কজনক দ্রুততায়।

একটি মহানগর কিভাবে ধাপে ধাপে অরণ্যের গ্রাসে হারিয়ে যেতে পারে, কল্পনার এই উপাদান নিয়ে কানাডার দুই যুবক তৈরি করেছেন এক শিশুতোষ বই। জন এরিক লাপানো ও কেলেন হাতানাকা, একজন লেখক আরেকজন চিত্রশিল্পী। অপূর্ব কল্পনার মিশেলে এই বইটির নাম টোকিও ডিগস আ গার্ডেন।

গল্পের নায়ক শিশুটির নাম টোকিও। পরিবারের লোকজন ও কেভিন নামের এক বেড়ালের সঙ্গে সে তাদের ছোট্ট বাড়িতে থাকে। এককালে তাদের এই ছিমছাম বাড়িটার চারপাশে ছিল গাছপালা ,আর দূরে একসার নীচু টিলা। ক্রমশ বড়ো বড়ো হাইওয়ে আর আকাশ ছোঁয়া ইমারতের নীচে সেসব হারিয়ে গিয়েছে, ঢেকে গিয়েছে। যেদিকে চোখ যায় শুধুই নির্মম কংক্রিট,আকাশও দেখা যায় না ভাল করে।

একদিন এক রহস্যময় বুড়ির সঙ্গে দেখা হয়ে যায় টোকিওর। টোকিওর হাতে তিনটি বীজ দেয় বুড়ি,বলে, যেখানেই তুমি চাইবে, সেখানেই এই বীজের থেকে গাছ জন্মাবে। টোকিও এবং তার দাদু ওদের বাড়ির সামনে ফুটপাথের ইট তুলে তার নীচে পুঁতে দেয় বীজগুলো। আর কী আশ্চর্য, রাতারাতি গোটা শহর জুড়ে গজিয়ে ওঠে ঘন জঙ্গল। সারি সারি আকাশ ছোঁয়া উঁচু দালানের মাথায় ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে যায় ঝাঁকড়া সব বনষ্পতি। ফিরে আসে পশুপাখিরা। বাঁদরের দল গাছ থেকে গাছে লাফাতে থাকে, ঝুলতে থাকে আনন্দে। গাড়ি চলার রাস্তায় আনন্দ ভ্রমণে নামে সকল জীবজন্তু। জলের তোড়ে ভেসে যাওয়া রাস্তাগুলিতে মাছেরা সাঁতার দিতে থাকে।

দাদু খুব দুশ্চিন্তা নিয়ে নাতিকে জিজ্ঞেস করে, এখন আমরা কী করব টোকিও!

বড়দের মতো ভাব নিয়ে টোকিও বলে, মানিয়ে নেয়া ছাড়া আমাদের আর কী করার আছে!

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত