| 5 মার্চ 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অসমিয়া অনুবাদ উপন্যাস: অর্থ (পর্ব-১১) । ধ্রুবজ্যোতি বরা

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট

ডক্টর ধ্রুবজ্যোতি বরা পেশায়  চিকিৎসক,অসমিয়া সাহিত্যের একজন স্বনামধন্য লেখক ২৭ নভেম্বর ১৯৫৫ সনে শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন ।শ্রীবরা ছাত্র জীবনে অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিলেন ।’কালান্তরর গদ্য’ ,’তেজর এন্ধার‘আরু’অর্থ’এই ত্রয়ী উপন্যাসের লেখক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। ২০০৯ সনে ‘ কথা রত্নাকর’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বাকি উপন্যাসগুলি ‘ভোক’,’লোহা’,’যাত্রিক আরু অন্যান্য’ ইত্যাদি।ইতিহাস বিষয়ক মূল‍্যবান বই ‘রুশমহাবিপ্লব’দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’,’ফরাসি বিপ্লব’,’মোয়ামরীয়া বিদ্রোহ’।শ্রীবরার গল্প উপন্যাস হিন্দি, ইংরেজি, বাংলা, মালয়ালাম এবং বড়ো ভাষায় অনূদিত হয়েছে।আকাডেমিক রিসার্চ জার্নাল’যাত্রা’র সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ।’ কালান্তরর গদ্য’ উপন্যাসের জন্য ২০০১ সনে অসম সাহিত্য সভার ‘ আম্বিকাগিরি রায়চৌধুরি’ পুরস্কার লাভ করেন।শ্রীবরা অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি।


অনুবাদকের কথা

কালান্তর ট্রিলজির তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হল’অর্থ’। সশস্ত্র হিংসার পটভূমি এবং ফলশ্রুতিতে সমাজ জীবনের দ্রুত অবক্ষয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার তাড়না এবং বেঁচে থাকার পথ অন্বেষণেই আলোচ্য উপন্যাসের কাহিনী ভাগ গড়ে তুলেছে। সম্পূর্ণ পৃথক একটি দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে অসমের মানুষ কাটিয়ে আসা এক অস্থির সময়ের ছবি আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষের অন্বেষণ চিরন্তন এবং সেই জন্যই লেখক মানুষ– কেবল মানুষের উপর আস্থা স্থাপন করতে পারে।

এবার উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ নিয়ে এলাম।আশা করি ইরাবতীর পাঠকেরা এই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত অসাধারণ উপন্যাসটিকে সাদরে বরণ করে নেবে ।নমস্কার।

বাসুদেব দাস,কলকাতা।


 

একগুচ্ছ যেন পাতলা কুয়াশাঠেলে সে অফিসটার ভেতরে প্রবেশ করল এমনটাই মনে হল তার ।

তার সহকর্মী প্রিয়ম্বদা মুখ ফুলিয়ে নিজের ডেক্সে বসে আছে। 

তার পাশে বসা কৌশিককে সে অফিসে ঢোকার সময়তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যেতে দেখেছে । কৌশিক তার সঙ্গে কথাই বলল না । ব্যাপারটাতে সে একটু অবাক হয়েছিল।কৌশিকের আজ কী হয়েছে? এক মুহূর্তের জন্য সে কথাটা ভেবেছিল।

তারপরে মাথার মধ্যে ঢুকে কুণ্ডলী পাকাতে থাকা সবুজ ধোঁয়াগুলি তাকে কথাটা ভুলিয়েদিয়েছিল। ডেক্সে বসার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হচ্ছিল যে সবুজ কুয়াশা গুলি ধোঁয়ারমতো ঘরের ভেতরে উড়ছে।

সেই কুয়াশার মধ্যে সেই প্রিয়ম্বদার ফোলা মুখটা  এবং জ্বল জ্বলে চোখ দুটো দেখতে পেল। নিজের ডেস্কের  ওপরে ব্যাগটা রেখে শ্রীমান তার দিকে তাকাল।

প্রিয়ম্বদা এক ধরনের শূন্য দৃষ্টিতে ঘরটারমেঝের দিকে তাকিয়ে আছে ।

‘কৌশিক কোথায় গিয়েছে?সেজিজ্ঞেস করল।

প্রিয়ম্বদা এরকম একটা মুখভঙ্গি করল যে সে কোথায় গিয়েছে সেই বিষয়ে তার সামান‍্যকৌতূহলও নেই।

শ্রীমান কিছুটা অবাক হল। সে হাত দিয়ে মুখের সামনে দুবার হাওয়া করল, সিগারেটের ধোঁয়া দূর করার জন্য মানুষ যেভাবে করে সেভাবে।

সে টেবিলে বসে অনুবাদের কাজটা বের করে নিল।

দিদি কাগজ বের করার পরিকল্পনাটা একটু পিছিয়েদিয়েছেন। কারণটা বলেননি। প্রেসের মেশিন আসেনি সে কথাটা প্রত্যেকেই জানে। কিন্তু মেশিন না এলেও অন্য জায়গায়ছাপিয়ে কাগজ বের করার কথা ভাবা হয়েছিল– সেটাও প্রত‍্যেকেই জানে। এখন এডিটর ওদেরপ্রত্যেককে নানা রকম কাজ দিয়েছে। তাকে দিয়েছে অনুবাদের কাজ। কিছু জিনিস অনুবাদ করে রেডি করে রাখলে কাগজ বের করার সময় কাজে আসবে।

সে তার ভাগের অনুবাদের কাজটা বের করে নিয়ে বসল।

কিছুক্ষণ পরে সে চোখ তুলে প্রিয়ম্বদার দিকে তাকাল।

সবুজ কুয়াশা গুলি তখন শুধু তার চারপাশে ধীরে ধীরে পাক খাচ্ছে।

সে একইভাবে ঘরের মেঝের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মাঝেমধ্যে নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরছে।

কী হল আজ মেয়েটির? সে একবার ভাবল তারপরে সে তার নিজের কাজে মন দিল। কিন্তু কাজ করার মধ্যে সে মাঝে মধ্যে নিজের অজান্তে প্রিয়ম্বদার দিকে তাকাল। মেয়েটি এখনও ঘরের মেঝের নির্দিষ্ট বিন্দু একটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আগের মতোই। মাঝেমধ্যে একবার মেয়েটি ঠোঁটটা কামড়ে ধরছে। ঠোঁটটা সাদা হয়ে গেছে।

সে তাকানো অবস্থাতেই হঠাৎ প্রিয়ম্বদানড়াচড়া করে বসল।

মেয়েটি এরকম একটি ভঙ্গি করল যেন সে শরীর থেকে কিছু একটা ঝাঁকিয়ে ফেলে দিচ্ছে। এই বিছা ধরণের কোনো কিছু একটা। তার চোখ এবার শ্রীমানেরওপরে পড়ল। শ্রীমান খুব লজ্জা পেল– কাজ ছেড়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকারজন্য। সে এখন মাথা নিচু করতে পারছে না, হাসতেও পারছে না।

প্রিয়ম্বদা এবার তার দিকে তাকিয়ে সুন্দর করে হাসল ।

‘ চলএক কাপ কফি খেতে যাই’, প্রিয়ম্বদা বলল।

‘কফি ‘শ্রীমান  একটু অবাক হল।’ কফি তো বানিয়ে দেবে।’

‘ ইয়ার,অফিসের কফি  খেতে খেতে বমি বমি লাগছে ।চল বাইরের কোথাও থেকে খেয়ে আসি। চল, আমি খাওয়াব। ‘

প্রিয়ম্বদা ব্যাগটা নিয়ে টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল।

এতদিন এভাবে সে আর কৌশিক মাঝেমধ্যে অফিস থেকে বেরিয়েগিয়েছিল । আজ তার সঙ্গ ধরেছে ।

কী করবে বুঝতে না পেরে শ্রীমানও উঠে দাঁড়াল। সে এবার টেবিলে থাকা তার অনুবাদের কাজটুকুর দিকে তাকাল। তারপরে সেই জিনিসগুলি সামলে রেখে বের হল।

তার খুব একটা যেতে ইচ্ছা করছিল না। প্রিয়ম্বদা যদিও তার সহকর্মী অফিসে একসঙ্গে বসে হাসি-স্ফুর্তি করে থাকে, তথাপি সে সবসময় তার কাছে সংকোচ অনুভব করে ,সহজ হতে পারেনা ।যেন কিছুটা দূরে দূরে থাকলেই  সে ভালো থাকবে এরকম একটা ভাব তার মনে সব সময় কাজ করে। আজ প্রিয়ম্বদাহঠাৎ কফি খাওয়ানোর জন্য তার সঙ্গী হয়েছে। সে খুব একটা অবাক হয়নি, কিন্তু কিছুটা অসুবিধায়পড়েছে। প্ৰিয়ম্বদা অফিসে তার সঙ্গে সহজভাবে কথা বলে, একসঙ্গে কফি খায়, হাসি ঠাট্টা করে,দু একদিন পরে বয়সের হিসেব করে তাকে আপনির পরিবর্তে তুমি বলে ডাকতে হবে বলে ঘোষণা করেছিল। সেও খুব একটা অখুশি হয়নি। ইংরেজির সঙ্গে মিশ্রিত করে অসমিয়া বলে যদিও তার কণ্ঠস্বরবড়ো মিষ্টি। তার কথা শুনতে শ্ৰীমানভালোবাসে।


আরো পড়ুন: অর্থ (পর্ব-১০) । ধ্রুবজ্যোতি বরা


অনুবাদ গুছিয়ে রেখে তার সঙ্গে যাবার জন্য প্রস্তুত হল সে।

‘ ব্যাগটা নিয়ে নাও’, সে শ্রীমানকে বলল। তারপরে ফিসফিস করে বলার মতো বলল,’ অফিসে পুনরায় ফিরে আসবে নাকি?কী করতে আসবে। এডিটর দেওয়া অনুবাদ করার জন্য? বাদ দাও, চল।’

ব্যাগটা নিয়েবেরিয়ে এল যদিও শ্রীমানের কিছুটা সংকোচ হল।’ স্যার যদি খোঁজ করেন? না পেলে খারাপ পাবেন’, সে বলল।

‘ খুঁজবে না খুঁজবে না, এসো। কাগজ প্রকাশ করার আজ কী একটা মিটিং আছে। দিদি আসেনি। আজ আমাদের কেউ খোঁজ করবে না।’

উপায়ন্তর না পেয়ে সে প্রিয়ম্বদার সঙ্গে বেরিয়ে গেল।

অফিসের এক পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা পুরোনোমডেলের মারুতি  গাড়িটায়শ্ৰীমানকে পাশে বসিয়েনিয়েপ্রিয়ম্বদাবেরিয়ে এল।

‘ তুমি গাড়ি চালাও কি?’হঠাৎ প্রিয়ম্বদাজিজ্ঞেস করল। 

‘ চালাই’ শ্রীমান বলল। গাড়ি চালাতে পারে বলতে পেরে তার মনটা ভালো লাগল। বাবা প্রাইভেট ট্যাক্সি হিসেবে চালাতে দেওয়া বাড়ির পুরোনোঅ্যাম্বাসেডেরটা চালিয়ে তার হাতপাকা।’ কিন্তু ,পুরোনোমডেলের মারুতি আমি চালাইনি ।’

‘ এটা আমার বড়োপ্রিয়গাড়ি। মায়ের ছিল। প্রথম বের হওয়ারসময় কিনেছিল। এখন আমি চালাই। আজ তুমি চালিয়ে দেখ তো।’

প্রিয়ম্বদারকথায় সে অত্যন্ত পুলকিত অনুভব করল। সে তাকে গাড়ি চালাতে বলেছে? তার মনটা খুব ভালো লাগল।

প্রায় সারাটা দিনই প্রিয়ম্বদা তাকে এদিক থেকে ওদিকে নিয়ে ঘুরে বেড়াল। কফি খাওয়ার পরে গাড়ি তার হাতে ছেড়ে দিল সে। দুরুদুরু বক্ষে গাড়ি চালাতে শুরু করে শ্রীমান দেখল যে পুরোনো মারুতিটা অতি সহজে তার বশ মেনে নিয়েছে। চালাতে তার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হল না।

‘ তুমি খুব ভালো চালাও’ সে বলল।’ কৌশিককে আমার গাড়ি দিতে ইচ্ছা করে না। ব্রেক মেরে মেরেগাড়ি চালিয়ে গাড়ির বারোটা বাজিয়ে দেয়।’

‘আজ কৌশিকের কী হয়েছে?’ সুবিধাটা  পেয়ে সে জিজ্ঞেস করল।’ সকালবেলা তাকে অফিস থেকে রাগ করে ব্যস্ততার সঙ্গে বেরিয়ে যেতে দেখলাম।’

‘ খুব গালি দিয়েছি’, প্রিয়ম্বদা বলল।’ সে একটা স্কাউন্ড্রেল । তাকে আমি দেখিয়ে দেব।’

শ্রীমান চুপ করে রইল। সে এই বিষয়ে আর কথা বাড়াল না। সারাটা দিন এদিকে ওদিকে ঘুরে ফিরে, দুপুর বেলা রেস্তোরায় চা খেয়ে বিকেলে সে গাড়ির সঙ্গে তাকে বাড়িতে রেখে এল। সারাদিন প্রিয়ম্বদা তার সঙ্গে অনর্গল কথা বলে গেল। তার খুব ভালো লাগল। নিজের পরিবারের বাইরে অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে এত নিবিড় ভাবে সে কোনোদিন কথা বলেনি। সেই এক দিনেই প্রিয়ম্বদা তাকে তার বান্ধবীর ঘর , রেস্তোরাঁ, কাপড়ের দোকান,ভাগ্নেরবার্থডের জন্য খেলনা কিনতে  যাওয়া খেলনার দোকান এই সমস্ত কিছু ঘুরিয়ে দেখাল। সব জায়গাতেই তার প্রচুর পরিচিত। সবখানেই ভালো বন্ধু বলে পরিচয় করিয়ে দিল। ভাগ্য ভালো সেদিন সে নতুন করে কেনা জিনটা, ভাইয়েরপুরোনো একটা ক্যানভাসের শার্ট এবং বেশ পরিষ্কার হয়ে থাকা ভাইয়েরঅ্যাকশন জুতো পরে নিয়েছিল। কাপড়ের জন্য তাকে লজ্জা পেতে হল না। তার চেহারাটা যে মোটামুটি চলে যাওয়ার ধরনের সে কথা সে জানে।

প্রিয়ম্বদারবাড়িতেগাড়িটানিয়ে রাখার সঙ্গে সঙ্গে সে গিয়ারের ওপরে থাকা তার হাতটার ওপরে নিজের হাতটা রেখে তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিল। তার সমস্ত শরীর শিহরিত, রোমাঞ্চিত হয়ে পড়েছিল। এক অবিমিশ্ৰসুখানুভূতিতে তার দেহ‐ মন ভরে পড়েছিল।  ‘ড্রাইভারটা নাই দেখছি। মা আসেনি। তোমাকে সে বাড়িতেড্রপ করে রেখে আসতে পারত।’  

‘ লাগবেনা’ সে বলেছিল।’ এখান থেকে একেবারে ডাইরেক্ট বাস।’

‘ আগামীকাল প্রথমে এখানে আসবে। একসঙ্গে অফিস যাব ।’

একটু নার্ভাস হয়ে সে উত্তর দিয়েছিল,’ ঠিক আছে।’

একটা রোমাঞ্চিত মনে প্রিয়ম্বদাদের বাড়ির গেট বন্ধ করে সে রাস্তায়বেরিয়ে এসেছিল। তার শরীর মন সমস্ত কিছুই যেন অদ্ভুত ধরনের হালকা হালকা বলে মনে হচ্ছিল। সে যেন ঠিক মাটি থেকে দুই মিলিমিটার উপরে ভেসে আছে সেরকম মনে হচ্ছিল তার।

সে বাড়ি ফিরে গেল। কিন্তু বাড়িতে কেউ ছিল না। মা বাবা প্রত্যেকেই আবার মেসোর দাদার বাড়িতে গেল কিনা ঠিক নেই। সে তার হাতে থাকা চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। ঘরের ভেতরে ঢুকে এক রুম থেকে অন্য রুমে এসে কিছুক্ষণ উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াল। তারপরে নিজের ঘরে প্রবেশ করে সে জুতো মোজা আর জামা কাপড় খুলতে শুরু করল। কিছুক্ষণ সে কিছু একটা ভেবে রমেনদিয়ে যাওয়া  বইটা বের করে আনল। সারাদিনের সঞ্চিত পুলকে সে নতুন করে বইয়ের রঙ্গিন মৈথুনের ছবিগুলি দেখতে লাগল। তার পুনরায় নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসতে লাগল। উরুর মাঝখানে শুরু হল ক্রমে অসহ্য সুখকরটনটনানি।প্ৰিয়ম্বদার কথা ভেবে রঙ্গিন ছবি দেখতে দেখতে সে স্নায়বিক উত্তেজনার বন্যায় ক্রমে ভেসে যেতে আরম্ভ করল…   ….

স্নান করে এক কাপ চা বানিয়েখেয়ে সে সামনের বারান্দায় এসে বসল। তার বাড়ি থেকে আবার কোথাও বেরিয়ে যেতে ইচ্ছা করল। সে যেন আর বাড়ির ভেতরে  থাকতে পারছে না। কোথাও বেরিয়ে যেতে পারলে যেন তার ভালো লাগবে। কিন্তু কোথায় যাবে সে?

উঠে গিয়ে সামনের দোকান থেকে  সিগারেট একটা এনে জ্বালিয়ে নিল। সামনের বারান্দায় বসে সে ধীরে ধীরে সিগারেট টানতে লাগল। ভালো লাগছে, তার সিগারেটটা টানতে খুব ভালো লাগছে। সে কিন্তু একই সময়ে রাস্তার ওপরে চোখ রাখল-মা বাবা ফিরে আসে নাকি,সেই চিন্তায়।

হঠাৎ শব্দ করে গেটের সামনে একটা মারুতি ভ্যান এসে দাঁড়াল। গাড়িটার শব্দ তার তন্ময়তাভেঙ্গে দিল। চমকে উঠারমতো সে গেটের দিকে তাকাল। ঘটাং করে গাড়ির দরজা বন্ধ করে রমেন নেমে এল।

‘ আবে ঐ, কী করছিস? গেটের মুখ থেকেই সে চিৎকার করে উঠল।’ এদিকে এসেছিলাম। ভাবলাম তুই কি করছিস দেখে যাই।’রমেনকে দেখে তার খুব ভালো লাগল। খালি বাড়িটাতে তার অশান্তি লাগছিল।

‘ তুই কবে এলি?’

‘দুদিনহয়েছে।’

রমেন তার সঙ্গে বসে গল্প করতে শুরু করে দিল।

‘ পিতাশ্রীমাতাশ্রী?’ রমেন জিজ্ঞেস করল।

‘না। কোথাও মানুষ মরার খবর করার জন্য বেরিয়ে গেল।’

‘ চল, একা একা ভূতের মতো কী বসে আছিস‐- চল বেরিয়ে যাই, একটা পার্টি আছে।’

শ্ৰীমান তখনই রাজি হল। কাপড়চোপড়পড়ে তালা মেরে সে রমেনেরগাড়িতে এসে বসল।

‘ কোথায় যাবি?

‘ কোথায় যাবি? রমেনেরগাড়িরড্যাশবোর্ডে থাকা প্যাকেট থেকে সিগারেট একটা বের করে জ্বালিয়ে সে জিজ্ঞেস করল।

চল, হোটেলে পার্টি হবে। আড্ডাও বসবে।

দুজনে গুয়াহাটির ব্যস্ত রাজপথে ঢুকে পড়ল। পথে ঘাটে  রমেনের কাজই শেষ হয় না । গাড়িদাঁড়করিয়ে এখানে ঢুকছে, ওখানে ঢুকছে। উপহার কিনছে। বার্থডে কার্ড কিনছে। পানবাজারদিয়ে আসার সময় শ্রীমান রমেনকে কথাটা জিজ্ঞেস করল। রমেন নিজের দিক থেকে কোন প্রসঙ্গ উত্থাপন না করার জন্য সে কিছুটা অশান্তি ভোগ করছিল।

‘ তোদের প্রজেক্টের কী হল?’

‘ কীসেরপ্রজেক্ট ?’

আমাদের পানবাজারের মাটিতে মার্কেট বানানোর।’

‘ তুই বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিস? পিতাশ্রী রাজি হয়েছে?’

‘ তুই কথা বলার জন্য আসার কথা ছিল, এলি না কেন? বাবাকে রাজি করিয়েছি। কীভাবে কী হবে কথা বলে নিবি।’

‘ এক্সিলেন্ট। আমি আগামী সপ্তাহে যাব। এই সপ্তাহে সময় পাব না। সবকিছু বলে নেব। তুইও সঙ্গে থাকবি। তারপরে একদিন ব‍্যস, ভাড়াটিয়াউঠিয়ে দেব। কোনো অসুবিধা হবে না।’

‘ বাঃ এত সহজ’, হঠাৎ শ্রীমানের মুখ থেকে বেরিয়ে গেল।

রমেন হাঃ হাঃ করে হাসল।

‘ দেখতে থাকবি, তুই নিজেই দেখতে থাকবি কত সহজ। আমরা যখন গিয়ে হাজির হব প্রত্যেকেইভয়ে কাঁপতে শুরু করবে। দেখতে থাকবি।’

‘ বাবা ব্যাপারটাতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তিনি দ্রুত কাজটা আরম্ভ করতে চান।’

‘ খুব ভালো কথা। তাড়াতাড়ি আরম্ভ করাই ভালো। আমাদের আর্কিটেক্ট আছে, ইঞ্জিনিয়ার আছে। উকিল আছে সব আছে। কাগজপত্র রেডি করতে মাত্র একদিন লাগবে। বাবার সঙ্গে কথাটা পাকা হলেই সেই অনুসারে কাগজপত্র রেডি করে সই হয়ে যাবে এবং তারপরেআর্কিটেক্ট ডিজাইন করে ফেলবে। এই ডিজাইন করা পারমিশননেওয়া এই কাজটুকুতেই যা সময় লাগবে। তারপরেকনস্ট্রাকশন ।তাতে আর খুব একটা দেরি হবে না। মার্কেটে দোকানগুলি অফিসগুলি বুক হয়ে থাকবে। কাস্টমারেরা টাকা দিতে থাকবে আর আমরা বানিয়ে যেতে থাকব।কোনো চিন্তা নেই।’

‘ তোর কথা শুনলে বিল্ডিংটা হয়ে গেল বলেই মনে হয়।’

রমেন আবার প্রাণ খুলে হাসল।

‘ তুই দেখতে থাক। চোখের সামনে হুড়মুড় করে কাজগুলি হতে থাকবে।’

ওরা দুজন এসে একটা হোটেলের সামনে দাঁড়াল। রমেনতাড়াহুড়ো করে গাড়ি থেকে নেমে এল।

‘ আছে, সব কিছুই এখানে আছে। আজ জমবে চল, রমেন বলল। ওরা হোটেলে ঢুকতে যেতেই ভেতর থেকে অবিনাশ বেরিয়ে এল।

‘ আরে শ্রীমান’, তাকে দেখে অবিনাশ বলল । ‘তোকে দেখছি দেখাই যাচ্ছে না ।’

আছি ভাই । তোকে দেখতেই পাচ্ছি না ।।’

‘  আমি মাঝখানে ছিলাম না , দিল্লিগিয়েছিলাম। এই দুদিন আগে ফিরে এসেছি। তোদের অফিসে যাব । কাগজ কবে বের হবে ?’

‘আর এক মাসের মধ্যে বেরিয়ে যাবে ।’ কথাটা বলতে শ্রীমানের একটু লজ্জা বোধ হল।

রমেনকাউন্টারের কাছ থেকে ডাক দিল’ শ্রীমান আয়।’

‘ তুই রমেনের সঙ্গে এসেছিস?’ অবিনাশ  জিজ্ঞেস করল।

‘হ‍্যাঁ’, শ্রীমান উত্তর দিল।

‘ আচ্ছা’, অবিনাশ যাবার জন্য প্রস্তুত হল। হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ার মতো সে শ্রীমানকেজিজ্ঞেস করল,’ সকালবেলাতোকে একটি মেয়ের সঙ্গে দেখলাম, খুব হাসতে হাসতেগাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিস।কে?’

‘ আমাদের সঙ্গে কাজ করে– প্রিয়ম্বদা।’

‘ ও আচ্ছা’ অবিনাশ একটা বাঁকা হাসি হেসে  চলে গেল।

শ্রীমান কিছুক্ষণ বোকার মতো সেখানেই দাঁড়িয়েরইল‌।

রমেন তাকে সেদিন এক নতুন জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল।

একদল যুবক ছেলে। দেখলেই বুঝতে পারা যায়প্রত্যেকেই বেশ অর্থবান। কেউ ঠিকাদার করছে। কেউ কয়লার ব্যবসা। কারও আছে নামে বেনামে দুই তিনটি মদের মহল এবং ওয়াইনশপ। হোটেলের বড়োসড়োপার্কিংস্পেসে নতুন নতুন মারুতি, জেন ,সুমো এবং দুই একটি এস্টিমো পার্ক করে রাখা আছে। ভেতরে দামিমদের ফোয়ারা বইছে।

রমেন তাকে একজন মানুষের কাছে নিয়ে গেল।

আসলে একজন যুবক ছেলে। এই কিছুদিন হয় যে শক্ত সমর্থ হয়ে উঠেছে, বোঝা যায়। প্রায় অর্ধস্ফুট এক ধরনের চোখ একজোড়াশ্রীমানকে বিশেষ আগ্রহ না নিয়ে দেখল। রমেন তাকে উপহারের পুটুলিটা আর কার্ডটা দিল।

‘ অঞ্জুদা’ রমেনশ্রীমানকেদেখিয়ে বলল।’ এই যে আমাদের ফ্রেন্ড শ্রীমান। একেবারে স্কুল জীবন থেকে একসঙ্গে পড়াশোনা। পানবাজারের প্রজেক্ট এর কথাটা যে বলেছিলাম, মাটিটা ওদের। পিতা সম্মতি দিয়েছে।’

আধখোলা চোখ জোড়ায় সামান্য ঔৎসুক্য দেখা গেল। একটি ঢিলা হেণ্ডসেকে সে শ্রীমান জানানো জন্মদিনের শুভেচ্ছা গ্রহণ করল।

‘ভালো কথা’ শব্দ দুটি বলে সে মাথাটা  সামান্য ঝাঁকাল।

 শ্ৰীমান কী বলবে কিছুই বুঝতে পারল না।

‘ ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে কথা হয়েছে নাকি?’ সে শ্রীমানকেজিজ্ঞেস করল।

‘হয় নি।’

‘ ভালোই হয়েছে। আজকে আমরা যাব’, সে বলল। তারপর রমেনের দিকে তাকিয়ে বলল। আজ প্রথম ট্রিটমেন্টটাদিয়ে আসে যাক।’

রমেনউৎসাহিত হয়ে উঠল।’ ভালো হবে’ সে বলে উঠল।

‘ অতিথিকে ভালোভাবেখাইয়েছেন তো।’ রমেনকেজিজ্ঞেস করল।

‘ খাওয়াব,খাওয়াব।’

‘ ভালো খাওয়া দাওয়া করে নিন আজকেই যাব দেখতে ।আজ জন্মদিনে কাজটা আরম্ভ করি রমেন।’

‘ খুব ভালো হবে দাদা। ভালো হবে।’ 

পুরো ব্যাপারটা কেমন যেন অবাস্তব বলে মনে হল শ্রীমানের।

রমেন তাকে একপাশে ডেকে নিয়েগিয়ে বলল,’ তুই লাকি। অঞ্জুদাকেদিয়ে কাজটা আরম্ভ করাই কঠিন। একবার আরম্ভ হয়ে গেলে আর চিন্তা থাকেনা। শেষ করেই ছাড়বে। আজ দাদার জন্মদিনে কাজটা আরম্ভ করতে চাইছে যখন আর চিন্তা নাই। নে, নে ,হুইস্কি নে।’

রমেনহুইস্কি সোডার একটা গ্লাস শ্ৰীমানের হাতে তুলে দিল।

‘ অঞ্জুদা আগে আন্ডারগ্রাউন্ডলিডার ছিল’, রমেন ফিসফিস করে শ্রীমানকে বলল।

শ্রীমানেরভয় হল, যেভাবে কথাগুলি এগিয়ে চলেছে তাতে তার ভয় হল। এসব কথা জানলে বাবা কি করবে? তখন ও তিনি এগোবেন কি? তবে এভাবে না করলেও হয়তো অন্য রাস্তা নেই। ভাড়াটিয়াগুলি তো এমনিতেই উঠে না ।আজ কত বছর পরিবার পরিজন নিয়েওরা সেখানে আছে। কোথায় ঘর খালি করবে ?সম্পত্তিটা হাত থেকে যাওয়ার মতোই। এখন উদ্ধার হবে। ওরাও ভালো জায়গা পাবে। কেন, সে তো নিজেই এটা বড় দোকান খুলতে পারবে। কথাটা ভেবে তার মনটা ভালো হয়ে গেল। সে হুইস্কির গ্লাসে একটা লম্বা চুমুক দিল। প্লেটে বের করে রাখা একমুঠো  কাজু হাতে নিয়ে সে একটা একটা করে মুখে ছুড়েদিয়ে খেতে শুরু করল।

বিভিন্ন ধরনের মানুষ পার্টিটাতে আসতে থাকল।

পুলিশ অফিসার, রাজনৈতিক নেতা, বড়োবড়ো ব্যবসায়ী একজন দুজন করে আসতে  থাকল আর যেতে থাকল।

রমেন লোকগুলির সঙ্গে ঘুরে ঘুরে খুব কথা বলছে।

অঞ্জুদা গম্ভীর ভাবে এক জায়গায় বসে আছে। লোকগুলি গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করছে, হ্যান্ডসেক করছে। কেউ কিছু একটা উপহার দিচ্ছে।

দেরি হয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেশ্রীমানের চিন্তা হল।

এই পার্টি কতক্ষণ চলবে কি ঠিক। সে এবার রমেনকে কাছে পেয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করল।’ নটারসময় শেষ হয়ে যাবে। তারপরেঅঞ্জুদার পার্টি চলে না ।আমরা তখনই বেরিয়ে যাব। চিন্তা করিস না। আমি তোকে বাড়িতে রেখে আসব।’

‘ চিন্তা করছি না’, শ্রীমান দুর্বলভাবে বলল। আসলে দেরি হওয়ার জন্য সে চিন্তা করছিল না। চিন্তা করছিল গোটা ব্যাপারটাকেনিয়ে। এই ধরনের মানুষ ওদের প্রাপ্য জায়গাটা ঠিকমতো নতুন বিল্ডিংটাতে দেবে তো! কথাটা রমেনক জিজ্ঞাসা করতে হবে। গোটা ব্যাপারটাতে সে খুব একটা ভরসা পাচ্ছে না। বুকের মধ্যে একটা অজানা আশঙ্কা যেন ক্রমশ জমাট বেঁধে উঠছে।’ এরা মানুষকে মেরে অতি সহজে লাশ গুম করে দিতে পারে।’

‘ স্যার, আপনিও এসেছেন?’

‘ খুব ভালো হয়েছে, স্যার। আপনাকে দেখে খুব খুশি হলাম। অনেক আগেই এসেছেন নাকি? আমি মাঝখানে বেরিয়েগিয়েছিলাম। আপনি এসেছেন বলে তাই জানতে পারি নি।’

হাতে হুইস্কির গ্লাসের একটা ট্রে নিয়েনরেন হাসিমুখে তারদিকেতাকিয়ে রয়েছে।

শ্রীমান চমকে উঠলো মুখে নেওয়াহুইস্কিটা তার গলায় আটকে যাওয়ার মতো মনে হল। কোনোমতেসামলে  নিয়ে সে দুর্বলভাবে বলল,’ভালো তো?’

‘ দেখতেই পাচ্ছেন স্যার ,আজ সারাদিন খুব ব্যস্ত’, নরেন খুব গর্বের সঙ্গে বলল। ‘অঞ্জুদারবার্থডে দুপুর থেকেই চলছে। আমাকেই সব জোগাড় করতে হচ্ছে।’

শ্রীমান কোনো মতে মাথা নাড়ল।

নরেন তার হাত থেকে প্রায় শেষ হওয়াহুইস্কিরগ্লাসটা জোর করে টেনে নিয়ে একটা ভর্তি গ্লাস তার হাতে তুলে দিল। শ্রীমান অসহায় ভাবে গ্লাসটা নিল।

তার একটা চেয়ারের দরকার ছিল। তার বসতে ইচ্ছা করছে। তার পা দুটো হঠাৎ খুব দুর্বল বলে মনে হল। এদিক ওদিকে তাকিয়ে সে এক কোণের একটা সোফায় বসে পড়ল। তার মাথাটা একটু একটু ঘোরাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। বুকটাও ধড়ফড় করছে। চোখ দুটি বন্ধ করে চেয়ারে গা ছেড়েদিয়ে সে হেলান দিল। হুইস্কির নেশা ও তার একটু হয়েছে বলে মনে হল।

‘স‍্যার, নরেনেরকণ্ঠস্বরে সে চোখ মেলে তাকাল।

‘ কাবাব নিন স‍্যার, গরম গরম’, কাবাবের ট্রে টা তার দিকে এগিয়ে দিল নরেন। খুব একটা ইচ্ছা না থাকলেও কাঠিটা ধরে এক টুকরা কাবাব তুলে নিল সে।

‘ তুই এখানে বসে আছিস, রমেন এসে উপস্থিত হল। আমি তোকে ওদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছি।’

‘ এখানে বসেছি’, শ্রীমান দুর্বলভাবে বলল।

‘ কাবাব নিন স্যার’, নরেনরমেনের দিকে প্লেটটা এগিয়ে দিল।

‘ও ,তুমি আছ’, রমেন বলল। কারবার কেমন চলছে?’

‘ না স‍্যার, সিজন চলে যাচ্ছে। বৃষ্টি পড়ছে।’

‘ তুমি এই স্যারকে ভালোভাবেখাইয়েছ তো’, শ্রীমানকেদেখিয়েহঠাৎ রমেন বলে উঠল। স্যার পান বাজারে একটা বড় মার্কেট কমপ্লেক্স বানাতে চলেছেন।’

নরেন চোখ জোড়াবড়োবড়োকরে  শ্রীমানের দিকে তাকাল। শ্রীমানের মনে হল যেন তার চোখে একধরনের সম্মানের ছায়া নেমে এসেছে।

‘ স্যার’, বিগলিতভাবেনরেন বলল’ আপনি চিন্তাই করবেন না স্যার। সমস্ত ম্যাটারিয়াল, লেবার আমি দেব স্যার। অঞ্জুদাদের বাকি বিল্ডিং গুলিতে তো আমিই মাল সাপ্লাইদিয়েছি। রমেন দা জানে। আরও একটা হুইস্কি  দেব নাকি’ স্যার।’

শ্রীমানের কোনো বাধাই সে মানল না। আধা খাওয়া গ্লাসটা পুনরায় সরিয়েনিয়ে নতুন একটা গ্লাস এনে দিল। রমেনকেও একটি দিল। দৌড়েগিয়ে কাজু আর কাবাব এনে দিল। তাড়াহুড়ো করে এবার সে অন্য অতিথিদের দেখাশোনা করার জন্য চলে গেল।

‘ বড়ো কাজের মানুষ’, রমেনমন্তব্য করল।

শ্রীমান ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

হ্যাঁ ,কাজের মানুষ। সত্যিই কাজের মানুষ।শ্রীমানহঠাৎ ভাবল। এই ধরনের মানুষ বালির খাদানে মৃত মানুষের লাশ পুঁতে রেখে গুম করে দিতে পারে। কথাটা ভেবে হঠাৎ শ্রীমান কেঁপে উঠল। সে কেন এরকম ভাবল? কেন এরকম ভাবল সে? এরকম ভাবার তো কোনো কারণ ছিল না। শ্রীমানের বুকটা দ্রুত ধড়ফড় করে উঠল।

তার শরীরটা দুর্বল বলে মনে হতে লাগল। চোখ দুটো কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করে সে হুইস্কির গ্লাসে ধীরে ধীরে শেষ চুমুক দিল।

রমেনহঠাৎ অশান্ত হয়ে উঠল। হাতের গ্লাস রেখে সে উঠে দাঁড়াল। শ্রীমানের দিকে তাকিয়ে বলল,’ পার্টি শেষ। অঞ্জুদা উঠে দাঁড়াল। চল যাবার জন্য রেডি হ। প্রজেক্টটা আজকেই আরম্ভ করা যাক।’

কীভাবে কী করা হবে শ্রীমান কিছুই বুঝতে পারল না।

কী করবে বলে ভাবছে ওরা? আজ গিয়ে কী করবে? ভাড়াটিয়াদেরমারপিট করবে নাকি? নাকি কেবল জায়গাটা দেখে আসবে? মা-বাবা শুনলে কী বলবে?

বেশ হুল্লোড়ের  মধ্যে পার্টি শেষ হল। তখন প্রায় দশটা বাজে।

অঞ্জুদারসুমো,দুটো মারুতি ভ্যান আর রমেনেরগাড়িনিয়ে একটা ছোটোখাটো শোভাযাত্রা গড়ে উঠল।

মোবাইল ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলে অঞ্জুদাগাড়িতে উঠল। শ্রীমানকে তিনি এগিয়ে যাবার জন্য ইশারা করলেন।

রমেনেরগাড়িতে বসে শ্রীমান ধড়ফড় বুকে প্রসেশনটার আগে আগে গাইডের মতো যাত্রা আরম্ভ করল।

পানবাজারের দোকান দুটির সামনে গাড়ি গুলি দাঁড়িয়েপড়ল।

শ্রীমানেরহঠাৎ ভয় করতে শুরু করল।

‘ এই দুটি দোকান নয় কি?’ রমেনজিজ্ঞেস করল। ‘হ্যাঁ’ শ্রীমান ঢোক গিলে উত্তর দিল।

‘মানুষ দুই ঘর পেছনেই থাকে তাইতো। মাঝের করিডরটাদিয়ে দুই ঘরে যায়?’

‘ওঁ।’

‘ তুই গাড়িতেই থাক। নামতে হবে না, বুঝেছিস। আমরা যাব।’

শ্রীমানকেগাড়িতে রেখে দলটা নেমে গেল। অঞ্জুদাএগিয়ে যাচ্ছে, পাশে রমেন, আশেপাশে আরও কয়েকটি ছেলে। তখন দোকান বন্ধ ।রাত অনেক হয়েছে। পানবাজারেররাস্তায় এখন ও খোলা দোকান, একজন ও পথচারী কোথাও দেখা যাচ্ছে না। রাস্তার দুপাশে দেখে শ্রীমান পুনরায় দোকানগুলির দিকে এগিয়ে যাওয়া রমেনদের  দিকে তাকাল। আরে অঞ্জুদাকেঘিরে  যাওয়া ছেলেগুলির হাতে হাতে দেখছি বন্দুক!

দোকান দুটির মাঝখানের করিডরটার  বন্ধ দরজায়দড়াম করে লাথি বসিয়ে দিল। দরজাটা দুপাশে খুলে গেল। সবগুলি ছেলে এবার ভেতরে ঢুকে পড়ল। ভেতরে কিছু শব্দ হচ্ছে, শব্দটা শ্রীমান বাইরে থেকে শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু ঠিক কিসের শব্দ বুঝতে পারছে না। ভেতরে ঢুকে যাওয়ার পরে করিডরের  দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছে।

কতক্ষণ পার হয়ে গেল শ্রীমান বলতে পারেনা।

সে ঘড়ি দেখতেও ভুলে গিয়েছিল।

কিছুক্ষণ পরে পুরো দলটা বাইরে বেরিয়ে এল। কী শান্ত নিরুদ্বেগ ওদের পদক্ষেপ! যেন নিজের বন্ধুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছে। ফুটপাতে দাঁড়িয়েঅঞ্জুদারমেনকে কী সব বলতে দেখল শ্রীমান। তারপরে টাটা সুমো এবং মারুতি ভ্যানে উঠে পুরো দলটা তীব্র বেগে পার হয়ে গেল।

রমেনধীরেধীরে এসে গাড়িতে উঠল।

শ্রীমানের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। ঢোক গেলারমতো তার মুখে থুতু ছিল না। সে যেন নিঃশ্বাস নিতে পারছে না এরকম মনে হয়েছিল তার। উৎকণ্ঠিত হয়ে সে রমেন কী বলে শোনার জন্য অপেক্ষা করছিল।

রমেনগাড়িতে উঠে প্যাকেট থেকে সিগারেট একটা জ্বালালো। গাড়িস্টার্টদিয়ে নাকে মুখে ধোঁয়াছেড়ে সে বলল,’ বাবার সঙ্গে আমি কাল সকালে কথা বলব।’

‘কী হল,কী করলি তোরা?’

‘ বাড়ি খালি করার জন্য এক সপ্তাহের নোটিশদিয়ে এলাম। নোটিশ মানে কি আর, বলে দিয়েছি মুখে।’

‘ তোরা কী বলে নোটিশ দিলি? আমাদের হে নোটিশদেওয়ার কথা ।’

‘ বাড়ি ঘর আমরা কিনে নিয়েছি বললাম। তোরা আমাদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিস বলেছি।’

‘ ওরা কিছু বলেনি?’

‘ দলিল দেখতে চেয়েছে।’

‘ তখন?’

‘ দলিল দেখার জন্য অঞ্জুদারবাড়িতে ডেকে পাঠিয়েছি,আর…

‘আর?’

আমাদের অবিশ্বাস করার জন্য বন্দুকের খুন্দা  দিয়ে একটা দাঁত ভেঙ্গেদিয়েছি।।’

শ্রীমান কেঁপে উঠল। গাড়িরসিটটাকেদুহাতে জোরে  খামচে  ধরল। মুখ দিয়ে তার কোনো আওয়াজবেরোল না। তার এরকম মনে হতে লাগল যেন মুখ খুললেই মুখ দিয়ে এখন গোঁ গোঁ শব্দ বের হবে। এরকম কিছু একটা ঘটতে পারে বলে সে মনে মনে আশঙ্কা করেছিল, কিন্তু ঘটনাটা ঘটে যাওয়াটা সে মেনে নিতে পারছে না।

‘ ভালোই হয়েছে’ ,রমেন বলল। তোরা বা বাবা এখন পিকচারে আসবি না। যা করার আমরাই করব। আমরাই প্রথম সারিতে থাকব। তখন ওরাবেশি কিছু করতে সাহস করবে না।’

গাড়িটা এসে শ্রীমানদের বাড়ির সামনে দাঁড়াল।

‘ কাল সকালে আমি আসব’, রমেন বলল। বাবার সঙ্গে দেখা করেই আমি উকিলের কাছে যাব। আমাদের উকিল একদম রেডি থাকে। বিকেলের দিকে বাবা এবং তোকে উকিলের কাছে নিয়ে যাব। সবকিছু খোলাখুলি ভাবে আলোচনা করে নিতে পারবি। বাকি কাজটা আমাদের।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত