| 27 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
ধারাবাহিক

ইরাবতী ধারাবাহিক: কদমতলি (পর্ব-১০) । শ্যামলী আচার্য

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

       উঠোনে বঁড়শি দিয়েই মাছ ধরা যায় দিব্যি। অনুর প্রিয় খেলা। জ্যাঠতুতো দাদারা বসে মাছ ধরে সারা দুপুর। পশুপতি ছোট। সে’ও বসে বসে দেখে। হাততালি দেয়। বর্ষায় থই থই জল চারদিকে। উঠোনেই কিলবিল করে সব মাছ। ল্যাটা বেলে শিঙি মাগুর। জ্যাঠাইমা শিলে মুড়ি গুঁড়ো করে দেন। সেই গুঁড়ো অল্প জল দিয়ে মেখে ছোট ছোট গুল্লি পাকানো কাজ অনুর। সে হাত মুঠি করে কুটি কুটি গোল্লা বানায়। মাছের চার। ওই খাবার বানানোর দায়িত্ব নিয়েছে অনু সেধে সেধে। না হলে দাদারা সঙ্গে নেবে না যে। অনুর ভাই পশুপতি চেহারাতেই বেশ বড়সড়। ছ’বছর পেরোল। কিন্তু এখনও কেমন ছোট। হাবা হয়ে বসে থাকে। ও বসে বসে হাততালি দেয়। খলখল করে হাসে। দাদারা একটু একটু দলা পাকানো মুড়ির গুঁড়ো বঁড়শি-র মুখে গেঁথে জলে ফেলে দেয়।      

       বঁড়শি-তে বাঁধা থাকে একটুকরো পাটশলমি। বেশি জলে বঁড়শি ডুবে গেলে ওই পাটশলমির টুকরো নড়ে ওঠে, আর দেখলেই বোঝা যায় বঁড়শির খাবার মাছে এসে ঠুকরে খাচ্ছে। যেই টুপ করে জলে ডুবে যায় পাটশলমির টুকরোটি, অমনি বোঝা যায় মাছ পালাতে চায় বঁড়শি গিলে। আর দেরি নয়। তক্ষুনি এক হ্যাঁচকা টান। মাছটা খলবল করতে করতে উঠে আসে ডাঙায়।  

       পুকুরঘাটে যাওয়া বারণ। বর্ষার দিনে তো একেবারেই মানা। একটুতেই ঘাট উপচে পড়ে। জল একটু নামলে দেখা যায় জলের তলা পর্যন্ত। ঝকঝকে স্বচ্ছ জল। দুপুরে খাওয়ার শেষে মানদা ঝি বাসনের পাঁজা নিয়ে পুকুরঘাটের দিকে যায়। অনু ওই ফাঁকে তার পিছু পিছু চলে আসে। এঁটো বাসন ধোওয়া জল পড়ে। উচ্ছিষ্ট সবটা কুড়িয়েকাছিয়ে আদাড়ে ফেলে এলেও ভাতের দানা, ছিবড়ে ডাঁটা, শাকের টুকরো, আনাজের অবশিষ্ট কিছু লেগে থাকে বাসনের গায়ে। সেসব খেতে ছুটে আসে মাছের দল। অনু হাঁ করে চেয়ে চেয়ে দেখে।

       বেলে মাছগুলো কেমন আলসে। ওরা জলের তলার মাটি ছুঁয়ে চুপ করে থাকে। নড়েচড়ে না বেশি। বড়সড় মাছগুলো হাবলা। ভাইয়ের মতো। দেখে দেখে ঠিক ওদের মুখের কাছে বঁড়শি-তে চার গেঁথে নামিয়ে দিতে হয়। টপ করে ওরা ডেলাটা গিলে নেয়। বোকা তো। বোঝে না লোভে পাপ। বঁড়শি-তে আটকা পড়ে জল ছাড়তে হয়। জীবনটাকেও।

       বঁড়শি দিয়ে মাছ ধরা একটা নেশার মতো। বর্ষার দুপুরে উঠোনে বসে বসে জল নড়ছে দেখা যায়। রান্নাঘরের পিছনে হাঁটুজলে নড়ে বেড়ায় মাছের ঝাঁক। বড়দা আর মেজদা মিলে গামছা নিয়ে তৈরি হয়। গামছাটাকে দুদিকে ধরে দুজন। পা টিপে টিপে জলে নামতে হয়। নইলে টের পেয়ে যাবে যে! গামছাটানা দিয়ে একবারে ছেঁকে তুলতে হয় জল থেকে। কিলবিল করে শোলের চারা। বড় কই হেঁটে বেড়ায় উঠোনে। ঘাটের দিকে গিয়ে পুঁটি চেলা ধরে নিয়ে আসে দাদারা।   


আরো পড়ুন: কদমতলি (পর্ব-৯) । শ্যামলী আচার্য


       ঘাসপাতার কাছে যে জল, সেই জলে হাতেপায়ে চুলকুনি হয়। বর্ষার কাঁচা জলে হুটোপাটি করে স্নান, হাতপায়ের আঙুল সাদা হয়ে সিঁটে যায়। কুঁচকে থাকে। চোখ লালা টকটকে জবাফুল। তবু জলে নেমে ঘন্টার পর ঘন্টা। এই করে জ্বরজ্বালা ছোটদের। বড়দের বকুনি। অনুর ঠাণ্ডা লাগার ধাত নেই। জল ওকে টানে।     

       বঁড়শি দিয়ে মাছ ধরতে গেলে মা বকেন। মা’কে লুকিয়ে যাওয়া। মা যখন ভরদুপুরে কাশীরাম দাসের মহাভারতখানা আঁকড়ে ধরেন, সেই ফাঁকে। যেদিন সেলাইফোঁড়াই নিয়ে বসেন, সেদিন অনুর কপাল মন্দ। মা বসে বসে ওয়াড়ে কিংবা কাঁথায় ফোঁড় তুলবেন আর অনুকে জোরে জোরে পড়ে শোনাতে হবে রামায়ণ কিংবা মহাভারত। বেশ কয়েকটি পুঁথি রয়েছে মায়ের। একটি ভাগবত। সংস্কৃতে লেখা সেটি। রামায়ণ আর মহাভারত। আরও রয়েছে দু’তিনটি। প্রাচীন কিন্তু জীর্ণ নয়। দাদামশায়ের নিজের পুঁথি। তাঁর সংগ্রহের কিছুটা তিনি দিয়ে গেছেন নগেন্দ্রবালাকে। মানুষ সম্পত্তির উত্তরাধিকারীকে দিয়ে যায় বাড়িঘর টাকাপয়সা গয়নাগাঁটি। রেবতীভূষণ পার্থিব সম্পদের ঊর্ধে। তিনি আত্মজাকে দিয়ে গেলেন তাঁর প্রিয় কয়েকটি বই। জানতেন, কন্যারত্নটি এই সম্পদের যথার্থ সম্মান করবে।   

       ওই বইক’টি নগেন্দ্রবালার আশ্রয়। তার ওপরে হাত বুলিয়ে তিনি বাপের স্পর্শ পান। রেবতীভূষণের মায়া, স্বপ্ন, বাস্তববোধ আর বস্তুরহিত উন্মাদনা সব জড়িয়ে আছে বইগুলির পাতায়। জীবনের দুয়ারপ্রান্তে অপেক্ষা করে থাকে যে অনন্ত কালপ্রবাহ, সেই প্রবাহে বৃষ্টিবিন্দুর মতো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে থাকে আলো। রেবতী ওই উদাস আলোর পথটি চিনিয়ে দিয়েছেন তাঁর প্রিয়জনকে। নগেন্দ্রবালাকে। সেই পথেই তার মোক্ষ। তার মুক্তি।    

       একটানা বৃষ্টির দুপুরে ঝিম ধরা শব্দ। ব্যাঙের ডাক ছিঁড়ে দেয় নিস্তব্ধতা। কাকগুলো ঝুপ্পুস হয়ে বসে থাকে রান্নাঘরের চালে। চড়ুইগুলোর ছটফটানি বন্ধ। জলঢোঁড়া সাপ কিলবিল করে যেতে যেতে থমকে তাকায় একবার। ও কী দেখতে পায়? চারপাশে থম মেরে যাওয়া মানুষজনকে? হিমঠাণ্ডা গায়ে শ্যাওলা মেখে নিস্পৃহ হয়ে চলে যায় গভীর থেকে আরও গভীর জলে। জলকলমীর বন থেকে লাফিয়ে ওঠে ফড়িং। ভেসে থাকা কাঠকুটো যা পায়, তাতেই বসে থাকা চুপচাপ। যেভাবে বেঁচে থাকা যায়। পালঙ্কেও সোঁদা গন্ধ। স্যাঁতসেতে চারদিক। গরমের দুপুরে শীতলপাটি আর তালপাতার ভেজা হাতপাখায় যে স্নিগ্ধ ভাব থাকে বর্ষার দুপুরে ভিজে কাপড়চোপড়ে তার লেশমাত্র নেই। মন ভার হয়। নগেন্দ্রবালা ঝুপ করে শুয়ে পড়েন হাএর কাজ সব সরিয়ে রেখে। চোখ লেগে আসে। বাদুলে হাওয়ায় নেশা ধরে। রাতে চালেডালে ফুটিয়ে নেওয়ার কথা। ও বেলাতেই রান্নাঘরের দাওয়ায় জল উঠেছে।   

       দুপুরবেলা একা ঘাটে যাওয়া বারণ অনুর। ঠাকুমা বকেন। দিনে দুপুরে যখন তখন মেয়েমানুষ মাছ ঘাঁটাঘাঁটি করবে কেন? পেত্নীতে ধরবে যে! ধরুক গে। বয়ে গেছে। ভূত-পেত্নীতে তার ভয়ডর নেই। মা বলেছেন, ভূত মানে অতীত। যা ঘটে গেছে। তাহলে আর কী! যা কিছু ঘটে গেছে, তাকে নিয়ে আর ভয় কীসের? বরং বর্তমানটুকুই আসল। বৃষ্টি মানেই কুচো মাছ। মাছ ছাড়া একবেলা চলে না অনুর। মুখ হাঁড়ি হয়। ঠাকুমা কথা শোনায়।

       “কোন ঘরে গিয়া পড়বি, মাইয়ামাইনসের অত নোলা ভালো নয়।” অনু শুনে গোঁজ হয়ে থাকে। ইস! মাছ জুটবে না এমন বাড়িতে সে যাবে কেন?

       ঠাকুমা খাবার সময় না থাকলে মা বেশি করে মাছ দেয় অনুর থালায়। কাঁটাচচ্চড়ি, তেলের বড়া, চুনো মাছ দিয়ে ঝুরঝুরে একথালা ভাত খেয়ে নিতে পারে অনু। সে আড়চোখে চেয়ে দেখে মা নিজের ভাগের মাছটুকুও কঁসি থেকে ঢেলে দিল তার পাতে। দাদাদেরও দেয়নি অত। অনু জানে, জ্যাঠাইমার সঙ্গে খেতে বসলে দুই জায়ে আবার বাটিচচ্চড়ি নিয়ে খানিক ভাগাভাগি হবে। উনুনের নিভু আঁচে তেল নুন হলুদ আর কাঁচালংকা দিয়ে মৌরলা বসানো আছে। বেলার দিকে ঝুড়িতে ঘষে ঘষে ধুচ্ছিল জ্যাঠাইমা। সবাই খেয়েধুয়ে উঠে গেলে ওটি তাদের সব ফুরিয়ে যাওয়া হেঁসেলে ভাগাভাগি হয়। ওখানে আর কেউ কম বেশি নয়। সব সমান।  

ঠাকুমার নিরিমিষ হেঁসেলে বর্ষার দিনে আয়োজন কম। একাদশী থাকলে আরও নির্ঝঞ্ঝাট। এখনও শক্তসমর্থ মানুষটি কাউকে ঘেঁষতে দেন না নিজের রান্নার জায়গাটিতে। নিজেই নিকিয়ে তকতকে করেন মাটির মেঝে। বর্ষায় কাদা কাদা সবদিক। ঘরে বসে একবেলা চিঁড়ে, একবেলা দুধ খই। কলা নারকেল গুড়ের অভাব নেই। টান পড়ে না আম-কাঁঠালের। আমের বিচি, কাঁঠালের ভূতির স্তূপ আদাড়ে। সকালের ফ্যানাভাতে কাঁঠালবিচি সেদ্ধ দিলে সে গন্ধে আনচান করে ওঠে অনু। ওই গন্ধটাতেই অর্ধেক পেট ভরে যায়।     

এখন কেরোসিন তেলের গন্ধ অনঙ্গবালার নাকে লাগে। ওই গন্ধে রাঁধা ভাত বিস্বাদ। দেশ ছেড়ে আসা ইস্তক হাতে কোটা চিঁড়ের স্বাদ ভুলেছেন। হলদে সরপড়া ঘন দুধ জামবাটি ভর্তি থাকত ঠাকুমার জন্য। শিবপদ-বিশাখার এই সংসারে দুধে জল মেশানো। কলায় তেতো ভাব। আম খেলে পানসে লাগে। শিবু সংসারের অভাব বাঁচিয়ে মায়ের জন্য নিয়ে আসে টুলটাক। অনঙ্গবালা মিষ্টুকে ডেকে খাওয়ান। উত্তমের জন্য রাখেন। বিশাখার পাতে তুলে দেন। ওরা খাক। ওদের সামনে অনেক বড় জীবন। ছেলেটা ভুগছে। অনঙ্গবালা স্পষ্ট বোঝেন দিনের পর দিন অনাহার আর অনিয়ম শিবুর শরীরে এবার থাবা বসাচ্ছে। দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই তার। কিছু করার নেই। শুধু স্মৃতি আঁকড়ে বসে থাকা ছাড়া।

ঝিমঝিমে দুপুরে পাশের কলপাড় থেকে ভেসে আসে হাঁকডাক। কলোনীর মধ্যে সদা ব্যস্ততা। কোনও সময়ে চুপ নেই নেউ। কলকল করে চলেছে। একে শহর বলে। একে দেশ বলে না। দেশ হল নরমসরম। বুনো স্বাদ, সোঁদা গন্ধ, উষ্ণ আঁচ, ভেজা বাস সেখানে। এখানে সব কড়া। কঠিন। বড় তীক্ষ্ণ, তীব্র। চাওয়া-পাওয়া অভাব-অনটন বড় বুকে বাজে। রাখঢাক নেই তার।   

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত