| 30 মে 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

গল্প: ওমর খলিফার বাঁশি । স্বপন বিশ্বাস

আনুমানিক পঠনকাল: 11 মিনিট

 

 

সেদিন ভোরের আলোয় তখনও ছোপ ছোপ অন্ধকার লেগে ছিল। গ্রামের মসজিদ থেকে খেরু মুয়াজ্জিনের আজান ভেসে এলো। রেনু বোস্টমী প্রভাতি গাইতে আসবে আরও কিছুটা আলো ফুটলে। ঘরের ছোটখোপ থেকে তখন গান ভেসে আসে। বড়মা’র খনখনে ভাঙা গলা। থেমে থেমে কখনো সুর চড়া হয়, আবার হারিয়ে যায়। অনিক তখন অনেক ছোট। গানের ভাব-রস বোঝে না। শুধু কান পেতে রয়। রাতের অন্ধকারে থেমে থেমে একটা বাঁশি বেজে চলে। বড়মা চড়া সুরে গেয়ে ওঠেন-

 

হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল

পার কর আমারে !

 

তখন অনিকের বাবার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি বিরক্ত হয়ে ধমক দেন- “ও দিদিমা! তোমার কাঙাল হরির কেত্তন থামাও। একটু ঘুমোতে দেও।” গান থেমে যায়। অনিক ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকে। জানে, আবার শুরু হবে-

আমি আগে এসে

ঘাটে রইলাম বসে –

ওহে – আমায় কি পার করবেনা হে ?

আমি অধম বলে –

যারা পাছে এল আগে গেল

আমি রইলাম পড়ে !

হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল

পার কর আমারে !

 

অনিক মনে মনে ভাবে, ঘরে শুয়ে শুয়ে এতো আক্ষেপ করার কী আছে। এইটুকু তো পথ। হাঁটতে হাঁটতে ঘাটে গেলেই তো হরি পার করে দেয়। হরি ছিল ওদের ঘাটের পাটনী। গায়ের রঙ শ্যামলা। দেহের তুলনায় হাত দুটো বেশ মোটাসোটা। যখন লগি ঠেলতো তখন পিঠের পেশিগুলো আলাদা করে দেখা যেতো। একদিন খেয়া পারের সময় বাবার কানের কাছে মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ও কি কাঙাল? তখন সে কাঙাল কথার মানেটা জানতো। বাবা বললেন, ও কাঙাল হতে যাবে কেন? ও তো বতরের সময় সবার বাড়ী থেকে ধান পায়। তাই দিয়েই ওর সংসার চলে যায়।

 

তবে যে আপনি বলেন কাঙাল হরির কেত্তন!

 

বাবা হেসে বলেছিলেন, সে তো কাঙাল হরিনাথ। যিনি ওই গানটা বেঁধেছেন। তার বাড়ী কুমারখালী।

 

অনিকদের গ্রাম চুনিয়া। পাশের গড়াই নদী পার হলে ওপারে গৌড়দহ। পশ্চিমে শিমুলিয়া। একদিন বাবার হাত ধরে শিমুলিয়ার রাস্তায় হাঁটছিল। রাস্তা মানে ধুলো ওড়া মাটির ডহর। তার দুধারে সবুজ গাছপালা। ঝোপ-ঝাড়। ঝোপের ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট বাড়ী। আর কিছু ভাঙাচোরা ভুতুড়ে দালান। সেসব দালানের মালিকরা কেউ নেই। তারা দেশ ছেড়েছে দেশ ভাগের সময়। সেগুলো পেরিয়ে গেলেই মাঠ। বাবা রাস্তা থেকে দুটো জমি পেরিয়ে একটা ঝোঁপের সামনে এসে দাঁড়ায়। তখন কয়েকজন বুনো-সর্দার ঝোপের ভেতরে ছাপছুতরের কাজ করছিল। ওইদিন রাতে ওখানে ওদের কালি পুজা। কোন এক সময় ডাকাতরা নাকি এই কালি মন্দিরে পূজা দিয়ে ডাকাতি করতে যেত। কাপালিক সন্যাসীরা নরবলি দিত। বাবা বললেন, আগে এই শিমুলিয়ায় কত বড় বড় লোকের বাস ছিল। দেশভাগ হয়ে সবাই চলে গেল। এখন তো পুজো করার একটা মানুষও এগাঁয়ে নেই। তোমরা এতো দূর থেকে এসে বছরে একবার পুজোটা করো তাই আসনটা টিকে আছে। দেখ কতদিন ধরে রাখতে পারো।

 

বাবা, বড় বড় লোক মানে কী? ধনী লোক নাকি বিখ্যাত লোক?

 

হ্যাঁ, অনেক ধনী লোক যেমন ছিল। আবার বিখ্যাত লোকও ছিল। একজন খুব বড় লেখক জন্মেছিলেন এই গ্রামে। নাম অক্ষয় কুমার মৈত্র । তাঁর মামাদের বাড়ী ছিল এখানে। তিনি সিরাজদৌলার ইতিহাস লিখেছিলেন। সেই ছোটবেলাতেই বাবার মুখে গল্প শুনে শুনে অনিক জেনেছিল ব্রিটিশ শাসন, স্বদেশী আন্দোলন আর মুক্তিযুদ্ধের কথা। জেনেছিল বাবার ছোটবেলার কথা। তাই সেদিন জিজ্ঞেস করেছিল, আপনার ছোটবেলায় নাকি এই এলাকায় কোন স্কুলই ছিলনা। তাহলে সেই অক্ষয় কুমার পড়লেন কোথায়?

 

তিনি লেখাপড়া শুরু করেছিলেন কুমারখালী। কাঙাল হরিনাথের পাঠশালায়। কাঙাল তো খুব গুনী মানুষ ছিলেন। ওনার গানের দল ছিল, স্কুল চালাতেন আবার কুমারখালী থেকে সেই সময় ছাপা পত্রিকা বের করতেন। সেই পত্রিকায় তিনি গ্রামের মানুষদের কথা লিখতেন। নীলকর সাহেবদের বিরুদ্ধে লিখতেন। জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লিখতেন।

 

আমেরিকার বোয়িং কোম্পানির হেড অফিসে বসে নিউইয়র্ক টাইমসের পাতা উল্টাতে উল্টাতে এখনও মাঝে মধ্যে অনিকের কানে বাজে বাবার সেইসব কথা। আর অবাক হয়ে ভাবে কোন এক কালে অজপাড়া গাঁয়ে বসে একজন কাঙাল ছাপা পত্রিকা বের করত। কী উদ্যোগী আর উদ্যমী মানুষ ছিল তারা। এবার অনেকদিন পরে দেশে ফিরে অনিকের চোখে সবকিছুই কেমন নতুন মনে হয়। দেশ পাল্টে গেছে। গ্রাম আর গ্রামের মতো নেই। বাড়ী আছে, সেখানে বাবা-মা নেই। আত্মীয় অনাত্মীয় সদস্যে ভরা বাড়ী নেই। তখন বাড়ীতে ঘরের সংখ্যা ছিল কম। মানুষ ছিল বেশী। এখন বড় বাড়ীর ফাঁকা ঘরে শুয়ে অনিকের চোখে ঘুম আসে না। ছোটবেলার টুকরো টুকরো স্মৃতি ঘুরপাক খায় মাথার ভেতরে। কতকাল আগের সেসব কথা।

 

মনে পড়ে সেদিন শিমুলিয়ার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বাবা থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। ডান পাশের ঝোপ থেকে একটা শেয়াল বেরিয়ে তাদের সামনে দিয়ে বাম দিকের ঝোপে ঢুকে গেল। অনিক শক্ত করে বাবার হাত চেপে ধরেছিল। বাবা সাহস দিয়ে বলেছিলেন, শেয়াল দেখে ভয়ের কী আছে? শেয়াল আমাদের দেখে ভয় পেয়ে পালাচ্ছে। এক সময় এখানে বনে বাঘ থাকতো। বুনো শুয়োর থাকতো। এখন সে সব বনও নেই, জীব জন্তুও নেই।

 

মানুষ সে সব জন্তু দেখে ভয় পেতো না?

 

ভয় পেতো। আবার অনেক সাহসী মানুষও ছিলেন। তারা এসব জীব জন্তু শিকারও করতেন। যতীন নাম একজন ছিলেন। তিনি একবার ছোট একটা ছুরি নিয়ে বাঘের সাথে মারামারি করে বাঘটাকেই মেরে ফেলেছিলেন। সেই থেকে তাঁর নামই হয়ে গেল বাঘা যতীন। স্বদেশী আন্দোলনের নেতা ছিলেন তিনি।

 

সেদিন খেয়া ঘাটে ফিরে দেখা গেল হরিকাকা নেই। নৌকা নিয়ে বসে আছে জীবন। হরিকাকার ছেলে। বাবা নৌকায় উঠে বললেন, নদীতে এতো স্রোত। তোর ডর করে না!


আরো পড়ুন: নৌকা বিলাস । স্বপন বিশ্বাস


নাহ! বাবা বলেচে সাহস করে হাল ধরলিই নদী পার। আমার তো অনেক সাহস। আমার কোন ডর করে না। নৌক ডুবে গেলে সাঁতরে উপরে উঠে পড়বো।

 

অনিক বলেছিল, তুই তো বাঘা যতীন । তোর অনেক সাহস।

 

আমি যতীন হতি যাব ক্যা। যতীন তো আমার ছোট ভাই। ওর এতো সাহস নেই। সেকথা মনে হলে অনিকের এখনও হাসি পায়।

 

সেদিন বড়মা এপারে ঘাটে বসে ছিল। সে যাবে সর্দারদের কালী পূজা দেখতে। সাথে হরিকাকা।

বড়মা বলল, হরি তুই হাল ধর। বয়স হয়েচে। জীবনের নৌকায় উঠতে আমার খুব ভয় করে। কখন ডুবায়ে দেবে তার কি কোন ঠিক আছে।

 

ভয় নেই দিদিমা। আমি তো সাথেই আছি। হরিকাকা হাত ধরে বড়মাকে নৌকায় তুলে নিলো।

আমরা এপারে কূলে দাঁড়িয়ে দেখলাম, বড়মা ভয়ে হরিকাকার হাত ধরে বসে আছে। স্রোতের টানে জীবনের নৌকা তরতর করে এগিয়ে চলেছে ওপারে।

 

ঠিক সেই সময় বাঁশির একটা সুর  ভেসে এলো। অনিক রাতের বেলায় এই বাঁশি অনেক শুনেছে। সে জানত না কে বাজায়, কোথায় বাজায়। বাবা বলেছিল ওই যে ওপারে উঁচু টিলার ওপর ঘন বন। ওখানে ওমর খলিফার আস্তানা। আগে দর্জির কাজ করত। যুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার ছিল। এখন রাজনীতি করে। দেশটাকে ভালোবাসে। তবে স্ররকারের মতের সাথে ওদের মত মেলে না। তাই বনে জঙ্গলে থাকে আর সময়-অসময়ে বাঁশি বাজায়।

 

অনিক বাবাকে অনুরোধ করেছিল একদিন ওমর খলিফার আস্তানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাবা বলেছিলেন, ওখানে সব খারাপ লোকজনের আনাগোনা। কোন ভালো মানুষ ওদিকে যায় না। অনিকের খুব মন খারাপ হয়েছিল। যেমন একদিন মন খারাপ হয়েছিল বাবা তাকে কুঠিবাড়ীতে নিয়ে যায়নি বলে।

 

অনিক তখন অনেক ছোট। ভাবত রবি ঠাকুরের বাড়ি তাদের পাশের কোন গ্রামে। তার বাড়ির নাম কুঠিবাড়ি। যার চিলেকোঠায় বসে তিনি কবিতা লেখেন। যেখান থেকে পদ্মা নদী দেখা যায়। অনিকের বাবা তার ছাত্রদের নিয়ে সাইকেল চালিয়ে রবি ঠাকুরের বাড়ী যেতেন। ফিরে এসে এমন ভাবে গল্প করতেন যেন এই মাত্র তিনি রবি ঠাকুরের সাথে কথা বলে এলেন। রবি ঠাকুরের বাড়িতে একটা শান বাঁধানো পুকুরঘাট আছে। যার পাশেই আছে বকুল ফুলের গাছ। সেই বকুল গাছের তাজা ফুল দিয়ে বানানো সুগন্ধি মালা নিয়ে আসতেন। সেই ফুলগুলোর মত বাবার গল্পগুলো এমন তাজা ছিল যে অনিক রীতিমত দেখতে পেতো পদ্মা নদীটা রবি ঠাকুরের বাড়ি থেকে দুরে চলে যাচ্ছে। উপেনের জমিটা শেষ পর্যন্ত রবি ঠাকুর নিয়েই নিলেন। আর বলতেন তাল গাছের কথা। যে তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অনিক বাড়ির পেছনে তাল গাছের নিচে গিয়ে তার পা খুঁজে দেখার চেষ্টা করত। কখনও নিজেই এক পায়ে দাঁড়িয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করত তাল গাছ কিভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। বাবা বলত সাইকেল চালানো শিখলেই নিয়ে যাবে। সাইকেল চালানো শেখার পর সে অনেকবার গিয়েছে কুঠিবাড়ী। তবে ওমর খলিফাকে দেখেছে জীবনে একবারই। খালেক খুন হওয়ার পর যেদিন পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। সেদিনের কথাও অনিকের বেশ স্পষ্ট মনে পড়ে।

 

একটা অদ্ভুত শব্দ শুনে মাঝারাতে ঘুম ভেঙে যায় অনিকের বাবা অন্নদা বাবুর। সাঁঝের বেলা বৃষ্টি হয়েছে। বাতাসে মাটির সোঁদা গন্ধ ভেসে আসছে। বাইরে ছোপ ছোপ অন্ধকার। তার ভেতরে গোলাঘরের পাশ থেকে একটা ছায়া সরে যায়। ভুলু কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে ডেকে ওঠে। আলো জ্বালতেই দেখে গোলা ঘরের পাশে একটা বস্তা পড়ে আছে। চোর গোলাঘর ছিদ্র করে ধান বের করছিল। বাবা বাড়ীর সবাইকে ডেকে তুলল। বাড়ীতে চোর ঢুকেছে। অনিকের মা বাইরে বেরিয়ে বলল, চোরটা কানা নাকি! বারান্দায় চিড়ার ধান ভেজানো আছে। তা না নিয়ে গোলা ঘর ছিদ্র করতে গেছে। অন্নদা বাবু বলল, এ তোমার ওই শ্যামাপদর কাজ। ওই গাধাটা ছাড়া একাজ আর কে করবে? তোমরা সবাই মিলে প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে চোরটাকে মাথায় তুলেছ। কাল ওটাকে ধরে এনে দড়ি দিয়ে বেঁধে পিটাব।

 

চোরে কিছু চুরি তো আর করেনি। অযথা মাথা গরম করছ কেন? এখন হইচই না করে ঘুমোও।

 

ঘুম আজ আর হবে না। শব্দ শুনেই বুঝেছি আজ আবার একজন গেল। ওরা এভাবেই একজন একজন করে শেষ হয়ে যাবে।

 

ঠিক সেই সময় বাঁশিটা বেজে উঠল। অনিকের মা বলল, খলিফা তাহলে এখনও বেঁচে আছে। গেলে অন্য কেউ গেছে।সকাল হলেই জানা যাবে।

 

শ্যামাপদ ঘরের পেছনে কচুক্ষেতে বসে সবার কথা শুনছিল। চুরি করা তার নেশা। চুরি না করলে রাতে ঘুম আসে না। বেশ কয়েকবার জেল খেটেছে। মানুষের হাতে হর-হামেশা মার খায়। গ্রামের যে কারো যে কোন কিছু হারালেই শ্যামাপদ চোর। চুরির জিনিস হজম করার মত বুদ্ধিও তার নেই। মিথ্যা কথা বেশি সময় টিকিয়ে রাখতে পারে না। কয়েকটা প্রশ্ন করলেই সত্য কথাটা বেরিয়ে আসে। কখনও কখনও নিজের থেকেই স্বীকার করে ফেলে চুরির কথা। অপবাদ সইতে না পেরে বউটা ভেগেছে। তারপর গ্রামের সবাই মিলে রেণু বোষ্টমীর সাথে বিয়ে দিয়েছে। শ্যামাপদ বোষ্টমীকে বেশ সমীহ করে চলতো। চুরি করলেও তাকে লুকিয়ে করার চেষ্টা করতো। বোষ্টমীও শ্যামাপদকে বেশ কেষ্ট জ্ঞানে ভক্তি করতো। চুরি করার বদ-অভ্যাস সত্বেও সহজ সরল মানুষটাকে সে ভালোই বাসত। সেদিন ভোরে রেণু বোষ্টমীর প্রভাতফেরীর সুরে সবার ঘুম ভাঙে।

 

অনিকের মা সেই গানের সাথে গলা মেলাতে মেলাতে বাইরে বেরিয়ে দেখে চিড়ার জন্য ভেজানো ধান চুরি হয়ে গেছে। কাজের মেয়ে খেন্তিকে দিয়ে ডেকে পাঠায় শ্যামাপদকে।

 

শ্যামাপদ এসে বলে, ভেজাধান কে চুরি করবে? ভেজাধান কি বিক্রি করা যায়?

 

বিক্রি যখন করা যায় না তখন মেশিনে নিয়ে গিয়ে চিড়ে কুটে নিয়ে আয়।

 

ধান তো আমি নেইনি বৌদি। আমাকে দুষছেন কেন?

 

তা হলে রেণুকে জিজ্ঞাসা করি, চিড়ার ধান কোথায় গেল?

 

এমন সময় রেণু এসে দাঁড়ায় উঠনে। প্রভাতফেরী শেষে চাল-ডাল নিতে এসেছে। রেণু বোষ্টমীকে দেখে শ্যামাপদ বলল, আমি তবে আসি বৌদি। মেশিন থেকে চিড়াগুলো কুটে নিয়ে আসি। অনিকের মা মুখে আঁচল দিয়ে হাসি চাপা দেয়।

 

রেণু চাল-ডাল নিয়ে শ্যামাপদর পেছনে বাড়ীর পথে পা বাড়ায়। অনিক তখন মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। গাছে গাছে কদমের ফুল ফুটেছে। শ্যামাপদ কয়েক থোকা ফুল পেড়ে বোষ্টমীর হাতে দেয়। বাতাসে ভেসে আসে গানের সুর।

 

মাখন চুরি ছেলে বেলা

হৃদয় চুরি বড় বেলা

হয়না তবু তোমার বদনাম

তোমার কি লীলা

ঘনশ্যাম।

 

ঠিক সেই সময় খেন্তি খবর নিয়ে আসে খালেক খুন হয়েছে। নদীর ধারে খালেকের লাশ পড়ে আছে। তারপর চারিদিকে কেমন একটা আতঙ্ক আর কানাঘুষা চলল। পরদিন ভোররাতে পুলিশ ওমর খলিফাকে ধরে নদী পার করে নিয়ে এলো। গ্রামের লোক সবাই খলিফাকে দেখতে ভিড় জমাল নদীর ঘাটে। অনিকও গিয়েছিল তাকে দেখতে। হাত দুটো পেছন দিকে হাতকড়া দিয়ে আঁটকানো। মাজায় মোটা রশি বাঁধা। সেই রশির ভেতর দিয়ে মাজায় একটা বাঁশি উঁকি দিচ্ছিল। অনিক কীভাবে যেন ভিড় ঠেলে খলিফার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।

 

তোমার হাততো বাঁধা। তুমি এখন বাঁশি বাজাবে কীভাবে? কথাগুলো বলতে বলতে অনিক ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল। ওমর খলিফা অনিকের কান্না দেখে জিজ্ঞেস করেছিল, এই ছেলেটা কে গো? কয়েকজন একসাথে উত্তর দিয়েছিল, মাস্টারের ছেলে। আমাদের অন্নদা মাস্টারের ছেলে, অনিক।

 

ওমর খলিফা তার মাজার রশি ধরে রাখা একজন পুলিশকে বলেছিল বাঁশিটা অনিককে দিতে। অনিক তখনও কেঁদে চলেছে। ওমর খলিফা বলল, আমাকেতো ওরা মেরে ফেলবে। তুমি বাঁশিটা রেখে দাও। তোমার বাবাতো বাঁশির ওস্তাদ। বাঁশি বাজানোটা শিখে নিও। তারপর কোথা থেকে যেন ছুটে এসে অনিকের বাবা তাকে ছোঁ মেরে ভিড় ঠেলে বাইরে নিয়ে এলেন। বাড়ী এসে অনিকের হাত থেকে বাঁশিটা নিয়ে একটা টিনের বাক্সে তালা বন্দি করে রেখে দিলেন। বললেন, জীবনে কোনদিন বাঁশি বাজানো শিখবে না। তোমাকে অনেক বড় হতে হবে। অনেক দূর যেতে হবে। অনিক আজও জানে না বাবা এই কথা কেন বলেছিল। অনেক বড় হওয়ার সাথে বাঁশি বাজানোর দ্বন্দ্বটা ঠিক কোথায়! শুধু জেনেছে বাবা একসময় খুব ভালো বাঁশি বাজাতেন। যুদ্ধের সময় ওমর খলিফা, খালেক আর তার বাবা একই সাথে যুদ্ধ করেছেন। ওমর খলিফার বাঁশি বাজানো শেখা আর রাজনীতির হাতেখড়ি সবকিছুরই গুরু তার বাবা। সে কেন রাজনীতি ছেড়ে দিলো আর তার দেখানো পথে ওমর খলিফারা থেকে গেল সেটাও কোনদিন জানা হয়নি। তবে একসময় এই রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা করে বোঝার চেষ্টা করেছিল। কেন এতো মানুষ এই রাজনীতির জন্য জীবন উৎসর্গ করে। কত ধনীর সন্তান, মেধাবী ছাত্র, তাদের উজ্বল ভবিষ্যত ফেলে রেখে, কত সাজানো সংসারকে তুচ্ছ মনে করে সাধারণ মানুষের জন্য রাজনীতি করে। অথচ যাদের জন্য তারা এই কাজটি করে তারা জানতেই পারেনা এরা কাদের জন্য কী করছে। নেতারা যাদেরকে দিয়ে এই কাজটা করাতে চায় তারা হাতে অস্ত্র পাওয়ার পর মন্ত্রের ধারক না হয়ে অস্ত্রের বাহক হয়ে ওঠে। ফলে কিছু নিরপরাধ মানুষকে শত্রু বানিয়ে তাদের সর্বনাশ করা হয়। যার ফলাফল হিসাবে কেউ লাভবান হয় না। আর নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বে নিজেরা শেষ হয়ে যায়। হয়তো পথের ভ্রান্তি সমাজে নৈরাজ্য আর হতাশা ছাড়া কিছুই দিতে পারেনি । এইসর কথা ভাবতে ভাবতে কখন যেন সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভেঙে দেখে বেশ বেলা হয়ে গেছে। সেই টিনের বাক্সটা খুলে আজ বাঁশিটা বের করে। তারপর সেটাকে একটা ব্যাগে পুরে বেরিয়ে পডে গ্রামের পথে। একেকদিন একেক দিকে হাঁটে। সবার সাথে কথা বলে। ভালো মন্দ খোঁজ খবর নেয়। তরুন যুবকদের সে না চিনলেও তারা সবাই তার সম্পর্কে জানে। তাদের অনেক প্রশ্ন আর অনেক আগ্রহ তার সম্পর্কে। বাড়ীর পূর্বদিকে রাস্তায় একটু এগোতেই একটা কাঁঠাল গাছে ঘুঘু বাসা বেঁধেছে। বহুদিন পরে ঘুঘুর ডাক শুনে অনিক অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। তখন গাছের আড়াল থেকে ধলু চাচা বেরিয়ে এলো।

 

এটা শ্যামাপদর ভিটা না?

 

‘হ্যাঁ, কেন চিনতে পারছ না?’ তারপর ধলু চাচা নিজের থেকেই বলল, এখন গ্রামের কতকিছুই পাল্টে গেছে। চিনবাইবা কী করে।

 

গ্রামে একজন চোর ছিল সেও নেই!

 

অনিকের কথা শুনে ধলুচাচা এক গাল হেসে বলল, কী কও বাবা। শ্যামাপদতো ছিল একজন বোকা চোর। এখন চালাক চোরে দেশ-গ্রাম সব ভর্তি। সব হাইব্রীড চোর। ব্যাংকের থেকি টাকা-পয়সা চুরি করে নিয়ে নাকি সব বিদেশে চলে যাচ্ছে। আমরা বাপু গরীব মানুষ ব্যাংকে টাকাও রাখিনে। চুরিরও ভয় নেই।

 

অনিক দেখল হাইব্রীড কথাটা এখন দেশে বেশ চালু হয়েছে। আগে ভালো কিছু, বড় কিছু দেখলেই যেমন বলত বিলাতি অথবা বোম্বাই। এখন সব খারাপের নাম হাইব্রীড। নেতা হাইব্রীড, চোর হাইব্রীড। কবি সাহিত্যিকেরাও নাকি এখন হাইব্রীড। অনিক বলল, ‘চাচা, দেশের টাকা চুরি হয়ে গেলে সবারই ক্ষতি হয়। সরকারের হাতে টাকা না থাকলে দেশের উন্নতি হবে কীভাবে?’ তখন ঘুঘু দুটো ডেকে ওঠে, ঘু- ঘু-।

 

মন্ডলদের বাড়ী ছাড়িয়ে রমিজদের বাড়ী। সে অনিকের সমবয়সী। একসাথে প্রাইমারী স্কুলে পড়ত। সে ঘরের পেছনের জমি থেকে আদা তুলছিল। অনিককে দেখে কাজ ফেলে ছুটে এলো।

 

শুনলাম তুই নাকি আমেরিকা্য় উড়োজাহাজ বানাস? কীভাবে বানাস। কঠিন কাম না? ওই যে যুদ্ধুর সময় বোমা ফেলে সেই বিমান বানাতি পারিস?

 

অনিক রমিজের কথা শুনে হাসে। বলে, শিখে নিলে কোন কাজই কঠিন না। না শিখলে তোর ওই আদার আবাদ করাও অনেক কঠিন কাম।

 

আদার আবাদ আবার একটা কঠিন কাম হল নাকি! উর আবার শিখার কি আছে?

 

সব কাজই শেখা লাগে। কোন কাজ মানুষ তার বাপ-দাদার কাছ থেকে দেখে শেখে। কোন কাজ শিখতে স্কুল-কলেজে পড়তে হয়। বিদেশে যেতে হয়। তবে কোন কাজই ছোট না। সব কাজেরই দরকার আছে।

 

তবে তুই যাই বলিস, এই যে বোমা বানানো, অস্ত্র বানানো, এগুলার কোন দরকার নেই। তোর আমেরিকা তো খালি অস্ত্র বানায়। আর দেশে দেশে যুদ্ধু লাগায়ে দিয়ে অস্ত্র বিক্রি করে। এইজন্য আমেরিকা দেশটা আমার খুব অপছন্দ।

 

আমারও অপছন্দ। আমেরিকা তো আর আমার নিজের দেশ না। কাজের জন্য থাকি। আর আমেরিকার ক্ষমতা আছে তাই ওসব করে। ধর, একসময় চৌধুরী চাচা গ্রামের সব চেয়ে প্রভাবশালী মানুষ ছিলেন। হয়তো সবাই তাকে পছন্দ করত না কিন্তু মান্য করে চলত। কারণ তার ক্ষমতা ছিল। তিনিও গ্রামের ভেতরে অনেক দ্বন্দ্ব তৈরী করতেন। আবার অনেকে তার ভয়ে অনেক খারাপ কাজ করতে সাহস পেতো না।

 

এখন চৌধুরীদের আর সেই দাপট নেই। এখন গ্রামে কেউ কাউকে মানে না। গ্রামে এখন শহরের পলিটিক্স ঢুকে গেছে।

 

কারও দাপটই চিরস্থায়ী না। একসময় বৃটিশদের দাপট ছিল এখন আমেরিকার দাপট। ভবিষ্যতে হয়তো অন্যদেশ আসবে।

 

ভেবেছিলাম আমার ছেলেটা লেখাপড়া শিখলে আমরিকায় তোর কাছে পাঠায়ে দেবো। তো ছেলে ওই লেখাপড়া বাদ দিয়ে রাজনীতির ভিতরে মাথা দিয়ে দিল।

 

যার যেটা ভালো লাগে তার সেটা করতে দেয়া উচিত। হয়তো সে রাজনীতিতেই ভালো করবে। এই যে কুলসুমের ছেলাটা বাঁশি বাজায়। তাই নিয়ে গ্রামে অশান্তি। চেয়ারমেন চাচা কুলসুমদের একঘরে করেছে। কারা নাকি মেরে ফেলারও হুমকি দিয়েছে। দেখি এখন ছেলেটার সাথে একবার কথা বলব।

 

কুলসুমের ছেলে, কামাল? তাকে কি তুই খুঁজে পাবি? কোন বনে জঙ্গলে বাঁশি বাজিয়ে বেড়াচ্ছে। ওই নদীর চরে নাকি ঘর বেঁধেছে।

 

ক্লাবের ছেলেদের কাল দায়িত্ব দিয়েছি, ওক ডেকে আনার। দেখি পাওয়া যায় কিনা।

 

ক্লাবের নাম এখন পার্টি অফিস। এক ক্লাব ভেঙে এখন চারটা পার্টি অফিস হয়েছে। অনিক পৌঁছানোর আগেই কামালকে ক্লাবে হাজির করা হয়েছে। ক্লাবের একজন নেতা গোছের ছেলে বলল, আঙ্কেল, আপনি চেয়ারমেন চাচা আর কুলসুম খালার দ্ব্ন্দ্বটা মিটিয়ে দিয়ে যান। আপনার কথা সবাই শুনবে।

 

অনিক বলল, আমি তো কোন দ্বন্দ্ব মিটাতে আসিনি। ওটা তোমাদের কাজ। একসময় এই গ্রামে লাঠি খেলার দল ছিল। গানের দল ছিল। আমরা ক্লাব থেকে যাত্রাপালা করতাম। নাটক করতাম। কুলসুম সেখানে অভিনয় করত। কোন সমস্যা ছিল না। আজ কুলসুমের ছেলেটা বাঁশি বাজায় বলে তাকে তোমরা গ্রামছাড়া করেছো। তোমরা যদি এসবের সমাধান করতে না পার তবে আমি সমাধান করে দিয়ে গেলে তা টিকবে না। আগামীকাল আমি চলে গেলে সবাই আমার কথা ভুলে যাবে। আজ আমি এসেছি কামালকে একটা জিনিস দিতে। তোমরা নিশ্চয় ওমর খলিফার নাম শুনেছ।  সে এই দেশের জন্য যুদ্ধ করেছিল। দেশের মানুষকে ভালোবেসে সংসার ছেড়েছিল। রাতেরবেলা তার সকল ভালোবাসা উজাড় করে দিয়ে বাঁশি বাজাতো। শেষবার যেদিন পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে যায় সেদিন তার বাঁশিটা আমাকে দিয়ে গিয়েছিল। আজ সেই বাঁশিটা আমি কামালের হাতে তুলে দিচ্ছি। এই বাঁশির সাথে ওমর খলিফার ভালোবাসা লেগে আছে। সেই ভালোবাসা ছিল দেশের জন্য, মানুষের জন্য। সেটা  রক্ষা করার দায়িত্বও তোমাদের।

 

রাতে বাঁশিতে সুর উঠল। অনিক শুনেই বুঝতে পারল এই বাঁশি ছোটবেলায় শোনা সেই ওমর খলিফার বাঁশি। মানিকের ভালবাসায় তাতে নতুন সুর উঠেছে। অনিক নিজে বাঁশি বাজাতে জানে না। তবু ভাবতে থাকে অন্তরের কতটা ভালবাসা ঢেলে দিলে এক টুকরো ফুটো বাঁশ থেকে এমন সুর ছড়য়ে পড়ে।

 

দুদিন পর  অনিক তার আরলিংটনের বাসায় বসে টেলিভিশনে একটা বাংলা চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখছিল।  স্ক্রলে সংবাদ দেখাচ্ছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদ, জাতীয় সংবাদ, মফস্বলের সংবাদ। সেইসব সংবাদ দেখতে দেখতে অনিকের মাথায় এক ভিন্ন চিন্তার উদয় হল। সংবাদ মাধ্যম এখন এতোটাই উন্নত হয়েছে যে, মফস্বলের একটি সংবাদও মুহূর্তে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কাঙাল হরিনাথ সংবাদ  মাধ্যমের এই উন্নতির কথা হয়তো কোনদিন কল্পনাও করতে পারেনি। হঠাৎ তার নজর আঁটকে গেল একটা সংবাদে,  ……নদীর চর থেকে পুলিশ কামাল নামে এক তরুণের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করেছে। অন্যমনস্ক থাকার কারণে কোথায় কোন নদীর চর সেটা তার নজর এড়িয়ে গেছে। ততক্ষণে খেলার সংবাদ  দেখানো শুরু হয়েছে।  অনিক অপেক্ষা করতে থাকে সেই সংবাদটা আবার দেখার জন্য।  টেলিভিশনের পর্দাটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসে।  সংবাদটা আর ফিরে আসে না। হয়তো অনেকবার দেখানো হয়েছ। এখন আর দেখাবে না। অনিক টেলিভিশন বন্ধ করে দেয়।  ভাবে, কোন নদীর চর আর কোন কামাল তা নির্দিষ্ট ভাবে জেনেই বা লাভ কী?  যে কোন কামাল হারিয়ে যাওয়া মানেইতো আকাশ-বাতাস থেকে একটা বাঁশির সুর থেমে যাওয়া।

 

 

 

 

 

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত