| 15 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

ইরাবতী গল্প: বাঁশের শব্দ । পার্থ ঘোষ

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

 

বাঁশের ওপর বাঁশ পড়ার একটা অন্যরকম শব্দ আছে। শব্দটা আনন্দদায়ক। তবে রঞ্জনবাবুর কাছে ব্যাপারটা অন্যরকম। তাঁর কাছে শব্দটার বিশেষত্ব এখানেই, শব্দটা তাঁর বুকের ভেতরে আঘাত করে। রঞ্জনবাবুর কানে শব্দটা “ব্যাং! ব্যাং!” শব্দে বাজে। শব্দটা যতবার হয়, ততবার ওনার চোখের সামনে দিয়ে সাদাকালো দৃশ্যগুলো আষাঢ়ের আকাশের বিদ্যুৎ চমকের মত জ্বলে উঠেই নিভে যায়। দৃশ্যগুলো পুরাতন, কিন্তু বেশ ঝাঁ চকচকে। দৃশ্যগুলো তখনকার, যখন রঞ্জনবাবুর নামের পরে বাবু শব্দের উপস্থিতি ছিল না, ছিল শুধুই রঞ্জন বা রঞ্জু।

হাঁটুটা বেশ ভোগাচ্ছে। ডাক্তার বলেছেন অস্টিও অর্থারাইটিস। হাঁটুর ভেতরের জেলি শুকিয়েছে – রঞ্জনবাবু আপনি বুড়ো হচ্ছেন। জেলি ছাড়া পাউরুটি তৃপ্তি দেয় না আহারে। মোবিল ছাড়া সাইকেলটাও বড় আর্তনাদ করে ক্যাচ্‌ কোঁচ্‌ করে। তেল না থাকলে, বা তেল না দিলে জীবনেও বড় অসুবিধার সম্মুখিন হতে হয় কারণে অকারণে।

সদ্য পঞ্চাশ পেরনো জীবনে এখন পুরনো কথা বেশি মনে পড়ে। হাঁটুটা যেন বিদ্রোহ ঘোষণা করছে মাঝে মাঝেই। ছুটির দিন ঘুমটা সকালে একটু দেরিতেই ভাঙ্গে। আজও তেমনই ভেঙেছে। ঘুম ভাঙার পর আলিস্যি কাটাতে একটু শুয়ে ছিলেন মাথার ওপর ঘুরন্ত পাখার দিকে চেয়ে। হঠাৎই বাঁশ পড়ার সেই পরিচিত শব্দ ওনাকে একটু চাঙ্গা করে দিল।

পুজোর আর দিন পনেরো বাকি। মহালয়া সামনের সপ্তাহে। এবারের মহালয়া শুক্রবার,তাই তিনদিনের একটা লম্বা ছুটি উপরি পাওনা হবে। গাড়ি করে বাঁশ এনে পুজো মণ্ডপ প্রাঙ্গণে একের পরে এক ফেলা হচ্ছে।  তাতেই আওয়াজ উঠছে। বাঁশের ওপর বাঁশ পড়ার পরিচিত আওয়াজ মনে করিয়ে দেয় এবার পাড়ার পুজোর শতবর্ষ। তাই পনেরদিন আগেই প্যাণ্ডেলের বাঁশ পড়া শুরু হয়ে গেল। আর বাঁশ এসে গেল মানেই পুজোর আমেজও শুরু হয়ে গেল। হঠাৎই হাসি পেল রঞ্জনবাবুর একটা কথা ভেবে – যাক্ কোন না কোন সময় বাঁশও তবে আনন্দের বার্তা বহন করতে সক্ষম!

বিছানা ছেড়ে ওঠেন রঞ্জনবাবু। হাঁটুটা বেশ বেদনাদায়ক হয় সময় বিশেষে। গুটি গুটি পায়ে উত্তরের জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ান। এদিকেই পাড়ার পুজো মণ্ডপ। গতবছরই অস্থায়ী থেকে স্থায়ী হয়েছে। উঁচু বেদির সামনে লোহার গ্রীল বসেছে, মাথা ছেয়েছে কংক্রীটের ছাদে। সারা বছর পাড়ার সাংস্কৃতিক মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই পুজোমণ্ডপ। পাড়ার মানুষের অনেকদিনের চাহিদা পূরণ হয়েছে।

এবার শতবর্ষ। তাই মণ্ডপের দৈর্ঘ্য বাড়বে। কংক্রীটের মণ্ডপের সামনের খোলা মাঠে প্যাণ্ডেল হবে। পুজোর ক’দিন যাতে এখানে বসেই পাড়ার সবাই সময় কাটাতে পারেন, পুজো দেখতে পারেন, সেই কারণে। তাছাড়া এবার পুজোর পাঁচদিন পাড়ার সব ঘরে  অরন্ধন কর্মসূচী। দু’বেলার খাওয়াদাওয়া মণ্ডপেই। সন্ধ্যায় প্রতিদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তার জন্য পশ্চিম ধারে একটা মঞ্চও হবে। এসব একের পর এক মিটিংয়ের মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত হয়েছে সারা বছর ধরে। রঞ্জনবাবু শতবর্ষ পুজো কমিটির হিসাবরক্ষক পদে আসীন। জানালা পথে তিনি দৃষ্টি প্রসারিত করলেন পুজোমণ্ডপের দিকে।

একদিকে বাঁশ নামান হচ্ছেগাড়ী থেকে, অপর দিকে চলছে বাঁশ বাঁধার কাজ।  বর্তমান যেন হুস্‌ করে বাম থেকে ডানে আর ডান থেকে বামে চলে গেল অকস্মাৎ। রঞ্জনবাবু দেখলেন তিনি হাফ প্যাণ্ট পড়ে প্যাণ্ডেলের বাঁশে ঝুলছেন। তাঁর বয়স কমে গেছে অনেকটাই। শুধু তিনি নন, আরো অনেকেই ঝুলছে বাঁশ থেকে, কিন্তু তাদের মুখগুলো অস্পষ্ট লাগছে। এক বাঁশ থেকে অন্য বাঁশে, কখনো দু’হাতে ঝুলে, আবার কখনো বাঁশের ওপর দিয়ে ব্যালান্স করে নীচের বাঁশ থেকে ওপরে, আবার ওপরের বাঁশ থেকে নীচে। দূরাগত হৈ হট্টোগোল ভেসে আসছে কানে। কিন্তু সবাই কি বলছে স্পষ্ট হচ্ছে না।

হঠাৎই ওই ওপরের বাঁশে ঝুলন্ত ছেলেটার মুখটা যেন একটু স্পষ্ট হয়ে আবার ঝাপসা হয়ে গেল, কাকে দেখলেন উনি? বাদলকে? বাদল মানে পাড়ার সেই ডানপিঠে ছেলেটা? যার সঙ্গে রঞ্জনের খুবভাব। যে ছেলেটার সারা অঙ্গে কাটা দাগ। কখনো পাঁচিল থেকে পড়ে যাওয়ার, কখনো ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে কেটে যাওয়ার বা নার্স দিদির করা সেলাইয়ের দাগ। যার সঙ্গে যেমন ঝগড়া, মারপিট, তেমনই ভাব ভালোবাসা রঞ্জনের। যার সঙ্গে পুজোর ক’দিন কেটে যায় চোর পুলিশ খেলতে খেলতে, বারংবার সামনা সামনি হলেই প্যাট্‌ প্যাট করে ফেটে ওঠে হাতের ক্যাপ বন্দুকগুলো। মৃদু আগুন ছেটায় বন্দুক থেকে, গন্ধ বেরোয় বারুদের, বন্দুকের হ্যামারের ঘায়ে ফেটে যায় লায়ন  ব্র্যাণ্ডের রোল ক্যাপ, একনাগাড়ে একঘেয়ে শব্দ তুলে।

বাদলের সঙ্গে মারপিঠ লাগে কখনো কখনো। তুমুল মারপিঠ। গলা টিপে ধরে, বা হাত মুচড়ে ধরে, কিংবা পায়ে পা জড়িয়ে, কে কাকে মাটিতে ফেলতে পারে? রঞ্জন পারে না বাদলের সঙ্গে। বাদল যে ডানপিঠে ছেলে। ওর গায়ের জোরের থেকে মনের জোর অনেক বেশি। তাছাড়া মারপিটের একটা কায়দা আছে, সেটা বেশ ভালোই রপ্ত করা আছে বাদলের। তাই জিৎ হয় বাদলেরই প্রতিবার। তবু রঞ্জন লড়ে যায়, এটাই ওদেরখেলা, এটাই ছেলেবেলা।

আবার বাঁশ পড়ার শব্দে বর্তমানে ফেরেন রঞ্জনবাবু। বাদলের সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়াতেও খুঁজে পাননি বাদলকে। বাদল যেন কোথায় হারিয়ে গেল হঠাৎই। শেষ যেবার দেখা হয়েছিল সেবার পুজোয় খুব বৃষ্টি হয়েছিল। পুজোটা সেবার ভালো কাটেনি দুজনের। বৃষ্টির জন্য বাড়ি থেকে বেরতে দেননি অভিভাবকরা। পুজোর পরেই ফাইনাল পরীক্ষা হত তখন। বৃষ্টি ভিজে জ্বর হলে পরীক্ষা দেওয়া হবে না, তাই সেবার বৃষ্টি ভেজা পুজোটা দুজনের প্রায় গৃহবন্দী হয়েই কেটেছিল।  দশমীর দিন বৃষ্টি কমেছিল। ভাসানের সময় দেখা হয়েছিল দুজনের । মনটা খারাপ ছিল দুজনেরই। বারবার ওদের আলোচনায় মিশে যাচ্ছিল পুজোয় আনন্দ করতে না পারার বেদনা।

নদীর ধারে দাঁড়িয়ে মনটা আরো খারাপ হয়ে গিয়েছিল। মা জলে পড়ে গেলেন ছেলে মেয়ে সমেত। আধো আলো ছায়াতে মায়ের শরীরটা ডুবে গেল জলের মধ্যে। শুধু প্রতিমার মুখটাজলের ওপর ভেসে থাকল। মশালের আলোয় সেই মুখের দিকে তাকাতে মনে হল, মা কাঁদছেন চলে যাবার দুঃখে। সেই করুণ দৃশ্য ওদের দুজনের চোখই ভিজিয়ে দিয়েছিল। ওরা করজোড়ে প্রণাম করে মনে মনে বলেছিল – আবার এসো মা আসছে বছর। দেখ পরেরবার যেন বৃষ্টি না হয় তোমার পুজোয়।

দশমীর পরদিন রঞ্জন মামারবাড়ি চলে গিয়েছিল, দশমী করতে। মামার বাড়ি যাওয়ার আনন্দই আলাদা।  এক সপ্তাহ পর ফিরে এসে শুনেছিল বাদলরা ওদের ভাড়া বাড়ী ছেড়ে চলে গেছে। বাদলের বাবা পুলিশে চাকরী করতেন। হঠাৎই বদলীর খবর আসাতে তড়িঘড়ি ওরা চলে গিয়েছিল নতুন ঠিকানায়।

ঠিকানা বদল হয়েছিল বাদলের । তবে কোথায়? সে খবর আর জানতে পারেননি রঞ্জনবাবু। বাদলের সঙ্গে আর দেখাও হয়নি তারপর। সেই থেকে বাদল রঞ্জনবাবুর মনে বর্ষণ হয়ে ঝরে পড়ে আজও প্রতিবার পুজোর সময়ে। অপেক্ষায় থাকেন, যদি কোনদিন কোথাও দেখা হয় ছোটবেলার সেই বন্ধুর সঙ্গে, বর্তমানে সেও তো রঞ্জনবাবুর মতই বাদলবাবু, অবশ্যই এখন আর তাকে ডানপিঠে বাদল বলা যাবে না কোনমতেই।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত