Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,বাংলার বাউল সাধনা ও বাউল গান

বাংলার বাউল সাধনা ও বাউল গান । লিপিকা ঘোষ

Reading Time: 16 minutes

 
ইংরেজ আমলের অবিভক্ত নদীয়া জেলাকে পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হলে কৃষ্ণনগরের রাজা ও স্থানীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের তৎপরতায় মাউন্টব্যাটেন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হলেন। রাতারাতি রেডক্লিফ লাইন পরিবর্তন করে নদীয়ার কৃষ্ণনগর ও রানাঘাট মহকুমাকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হল। আর মেহেরপুর, কুষ্ঠিয়া, চুয়াডাঙ্গাকে পূর্ব পাকিস্তানের (অধুনা বাংলাদেশের) অন্তর্ভুক্ত করা হল। নদীয়া জেলার মাটির মতো সংস্কৃতিও দুই ভাগ হয়ে দুই বাংলাতে রয়ে গেল। রেডক্লিফ লাইন-এর উপরেই অনেকের বসতবাড়ি পড়েছিল। তার মধ্যে একটি আমার পৈতৃক বসতবাড়ি। পরে কৃষ্ণনগর মহকুমায় চলে আসায় ভারত সরকার টাকার বিনিময়ে ওই জায়গা অধিগ্রহণ করে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ বর্ডার তৈরি করেছিল। ছোটবেলা থেকেই বাউলদের দেখে এবং বাউল গান শুনে আমার বড় হওয়া। তখন জানতাম না যে বাউল নিয়ে বিশ্বজুড়ে এত উন্মাদনা! আমাদের গ্রামে বাউলের আখড়া ছিল। বাউল সাধকের নাম ছিল নীলমণি দাস। বকুল গাছের তলায় মাটির ঘরে বসে তারা সকাল সন্ধ্যা গান করত আর কল্কে করে গাঁজা টানত। আখড়াটি পরে উঠে গেলেও পাড়াটির নাম হয়ে গেল আখড়াপাড়া। পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তে এসে দেখলাম বইয়ের পাতায় বাউলের নাম। আর জানলাম, বাউল বাংলার এক বিশেষ সাধক সম্প্রদায়ের নাম। এদের সাধন সংগীতের নাম বাউল সংগীত বা বাউল গান। বাউল বাংলার সর্বত্র ছড়িয়ে থাকলেও মূলত পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বাঁকুড়া, ২৪ পরগনা এবং পূর্ব বাংলার কুষ্ঠিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, পাবনা, ফরিদপুর, যশোর জেলায় বেশি জনপ্রিয়। অবিভক্ত নদীয়ার কুষ্টিয়া মহকুমা ছিল বাউল সম্প্রদায়ের পীঠস্থান। নদীয়ার নবদ্বীপের ‘বৈষ্ণব’ আর কুষ্টিয়ার ‘বাউল’ স্বতন্ত্র সাধন প্রক্রিয়া হলেও এদের মধ্যে সম্পর্ক বেশ গভীর। ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্য চরিতামৃততে প্রথম “বাউল” শব্দটি পাওয়া যায়। জানা যায় শান্তিপুরের নরোত্তম দাস প্রথম চৈতন্যদেবকে বাউল বলে আখ্যা দেন। গ্রন্থের “আদিলীলা” অনুযায়ী শ্রীচৈতন্যদেব নিজেও নিজেকে বাউল বলেছেন। চৈতন্যদেবের জীবনী গ্রন্থকার কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্য চরিতামৃততে শব্দটি যেভাবে রয়েছে তা হলো,- “বাউলকে কহিও লোকে হইল আউল।”- অর্থাৎ বাউল এর কাছে বা চৈতন্যদেবের কাছে মানুষের ব্যাকুলতার খবর পৌঁছে দিতে বলা হয়েছে। আজ থেকে প্রায় ৪৫০ বছর আগে বাংলা সাহিত্যে বাউল শব্দটি এইভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীতে বৈষ্ণব সহজিয়া তত্ত্বের দ্বারা বাউল গান পরিপুষ্টতা লাভ করেছিল। এই বাউল শব্দটি সংস্কৃত “ব্যাকুল” বা “বাতুল” শব্দ থেকেই আসুক আর আরবি “আউল” বা হিন্দি  “বাউল” শব্দ থেকে আসুক এর অর্থ দাঁড়ায় হয় “ঈশ্বর প্রেমে পাগল” না হয় “ঈশ্বরের একান্ত সেবক”। আর বাউল সাধকদের জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে তারা বলে – বা তে “বায়ু গ্রস্ত” উ তে “যথা তথা” আর ল তে “লয়”। যারা বায়ু যোগে সাধনা করে যত্রতত্র যাতায়াত করে আর লয় পেয়ে যায় সবার মনে তারাই বাউল। সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীতে জাতি সম্প্রদায়ের চিহ্নহীন ঈশ্বর প্রেমে বিশ্বাসী একদল ভক্ত বাংলায় বাউল নামে পরিচিত ছিল। হিন্দু মুসলমান সব ধর্মের মানুষের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল বাউল সম্প্রদায়। বাউলরা পূজা-অর্চনা সম্পর্কে উদাসীন ছিল। হিন্দু মুসলমানের ভেদাভেদ ও তারা মানত না। বাউলের ধর্ম ও জীবনাচরণে কোনো জাতিভেদ ছিল না। তারা কোরান-পুরাণ দুই শাস্ত্রে জ্ঞান অর্জন করত। বেশিরভাগ বাউলের জীবিকা ছিল ভিক্ষা। ভিক্ষা না পেলে অভুক্ত বা অর্ধভুক্ত হয়েও দিন কাটাত। গাঁজা পাতা খেয়ে নেশায় ভুলে থাকত খিদের জ্বালা। এরা পারত জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে ভালবাসতে ঈশ্বরের প্রতি আত্মনিবেদন করতে। নিজেদের মধ্যে কোনো বিভেদ না থাকলেও এরা দুটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল- এক) হিন্দু সহজিয়া বাউল। দুই) সুফি মুসলমান ফকির বাউল বা আউলিয়া। হিন্দু বাউলরা  স্বচ্ছন্দে সুফি সাধনার পরিভাষা ব্যবহার করত আবার সুফি বাউলরা নির্দ্বিধায় যোগতন্ত্রের অনুশীলন করত। শ্রেণীবিভাগ থাকলেও বাউল সাধনায় উভয়ই একত্রিত হয়েছে কিন্তু কেউ কাউকে আঘাত করেনি। কোরানে পুরাণে ঝগড়া বাধেনি। তারা এক আসনে বসেছে। বাউল সাধনার মূল মন্ত্র জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের প্রতি মানুষের প্রেম। এই প্রেমের সুরে গলা মিলিয়েছে হিন্দু-মুসলমান সকলেই। হিন্দু বাউলরা প্রকৃত মানুষের উপর রাধাকৃষ্ণ-তত্ত্ব আরোপ করে অদ্বৈতানুভূতির সন্ধান করেছে। এরা চৈতন্যদেবের প্রতি অত্যন্ত ভক্তি প্রদর্শন করেছে। মূলত সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই বৈষ্ণব সহজিয়ারা হিন্দু সমাজে প্রাধান্য লাভ করেছিল। এই সময় বাউল সম্প্রদায় বৈষ্ণব তত্ত্ব দ্বারা পরিপুষ্ট হয়ে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। সুফি মুসলমান ফকির বাউলরা নিজেদের আল্লার সমীপস্থ বা “আউলিয়া” বলে পরিচয় দিত। এদের সাধনার মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে ভালোবাসা এবং ব্যক্তিসত্তা বিলোপ করে অপরের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করা। তারা মনে করত ব্যক্তিসত্তাকে বা পার্থিব সত্তাকে বিসর্জন দিলে (ফানা) ঈশ্বর সাযুজ্য (বাকা) লাভ করা যায় – “আপনার আপনি ফানা হলে সকলই যাবে জানা——-।” আউলিয়াদের পাঁচটা উপ-সম্প্রদায় ছিল- সাঁই, দরবেশী, কর্তাভজা, সাহেবধনী, বলহাড়ি। সাধন-রীতি অনুযায়ী বাউলের দুটি পর্যায়ে ছিল- ১) পূথ্যা ও ২) তথ্যা। পূথ্যা পর্যায়ে সাধন ক্রিয়ার অঙ্গ হিসেবে নানা জটিল তান্ত্রিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে সাধনসঙ্গিনী রাখা হত। এদের বস্তুবাদী বাউল বলা হত। যারা তথ্যা পন্থী তারা আচার সংস্কারহীন ভাববাদের সাধক। তারা সাধনসঙ্গিনী পথ এড়িয়ে চলত। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে এই রহস্যবাদী সাধক-সম্প্রদায় বাংলায় বিশেষ ভাবে প্রসার লাভ করেছিল। এদের কাছে গুরু, মৈথুন, আত্মতত্ত্ব সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাউল সাধনায় গুরু হলো সর্বশ্রেষ্ঠ। গুরু-শিষ্য পরম্পরা বজায় রাখা এই তত্ত্বের মূল উদ্দেশ্য। তারা বিশ্বাস করত গুরুর কাছে শিক্ষা না নিলে সিদ্ধি লাভ করা যায় না। মৈথুন তত্ত্বে, ধারণা ঊর্ধ্বে সঞ্চালনের সময় গঙ্গা (ইড়া) ও যমুনা (পিঙ্গলা) বেয়ে সরস্বতীতে ত্রিবেণী সঙ্গম ঘটাতে হয়। তারপর সেখান থেকে সহস্রদল পদ্মে (মস্তকে অবস্থিত) যখন বিন্দু গিয়ে পড়ে তখনই সৃষ্টি হয়  মহাভাব বা সহজ অবস্থা। বাউলরা মূলত এই সহজভাবের অর্জন করে। এই তত্ত্বের একটি উল্লেখযোগ্য গানের অংশ হলো – “ত্রিবেণীর তীর ধারে, সুধারে জোয়ার আসে/ সুধা সাগরে মানুষ খেলে বেহাল বেশে।“ আত্মতত্ত্ব হল সাকার দেহে নিরাকার আনন্দস্বরূপ আত্মাকে উপলব্ধি করার চেষ্টা। অরূপের কামনায় রূপসাগরে ডুব দেওয়া, এই স্বভাব থেকে ভাবে উত্তরণই হল আত্মতত্ত্ব। বাউল সাধকদের সাধন সংগীত বাউল গানের বাদ্যযন্ত্র হল একতারা। তবে পরবর্তীতে ডুগডুগি, খমক, ঢোলক, দোতারা, ইত্যাদিও ব্যবহার করা হয়। এই গানে সাধারণত দাদরা, কাহারবা, ঝুমুর তাল, ঝাঁপতাল ব্যবহার করা হয়। উদাত্ত কণ্ঠে গাওয়া মন মাতানো সেই গান নদীয়ার বাতাসে কান পাতলে শোনা যায়। কানের ভিতর দিয়ে মরমে পৌঁছে যায় সে গান। এর সহজ সরল উপস্থাপনা লোকসঙ্গীতের সার্থক নিদর্শন।

অষ্টাদশ শতাব্দীর একজন বাউল সাধক ও দার্শনিক ছিলেন সিরাজ সাঁই (১৭১৮-১৭৯৮)।  তিনি অনেকগুলো বাউল গান রচনা করেন। সৈয়দ জাহিদ হাসান তাঁর “লালন গুরু সিরাজ সাঁইয়ের গান” গ্রন্থে সিরাজ সাঁইয়ের শতাধিক গান সংগ্রহ করে লিপিবদ্ধ করেন। তিনি লালন ফকিরের দীক্ষাগুরু ছিলেন। তাঁর একটি গান এখানে  দেওয়া হল-

“আপনার আপনি ফানা হলে সে ভেদ জানা যাবে।/ কোন নামে ডাকিলে তারে হৃদাকাশে উদয় হবে।।/ আরবিতে বলে আল্লাহ, ফরাসিতে কয় খোদাতালা।/ গড বলেছেন যিশুরচেলা ভিন্নদেশে ভিন্নভাবে।।/ মনের ভাব প্রকাশিতে ভাষার উদয় এ জগতে।/ মনাতীত অধর চিনতে ভাষাবাক্য নাহি পাবে।।/ আল্লা হরি ভজন পূজন এ সকল মানুষের সৃজন।/ অনামক চেনায় বচন বাগেন্দ্রীয় না সম্ভবে।।/ আপনাতে আপনি ফানা হলে তারে যাবে জানা।/ সিরাজ সাঁই কয় লালন কানা স্বরূপের রূপ দেখ সংক্ষেপে।”—————–

সিরাজ সাঁইয়ের এই গানে লালনের প্রসঙ্গ এসেছে। অনেকে গানটিকে লালনের গান বলে মনে করেন কিন্তু জাহিদ হাসান এটিকে সিরাজ সাঁইয়ের গান বলেই দেখিয়েছেন।

বাউলের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সাধক ও গীতিকার হলেন লালন ফকির। তিনি ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে মতান্তরে ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে কুষ্ঠিয়ার ভাঁড়রা গ্রামে এক হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে কথিত আছে। ছোটবেলায় দেশ ভ্রমণকালে গুটি বসন্ত হলে পথের মধ্যে তার সহযাত্রীরা তাকে ত্যাগ করে। এক মুসলমান পরিবার তাঁকে উদ্ধার করে নবজন্ম দেয়। এই কারণেই হিন্দু সমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে মুসলমান সমাজে ফিরে আসেন। জীবনের এমন চরম অভিজ্ঞতা হওয়ায় ধর্মের গোঁড়ামিকে তিনি ঘৃণা করতেন। যদিও ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে লালন ফকির নিজে কিছুই বলতেন না। তিনি একাধারে বাউল সাধক, দার্শনিক, গীতিকার, সুরকার ও গায়ক ছিলেন। লালন ফকিরের গানে  দুটি ভাবের পরিচয় পাওয়া যায় – “জেন্তে মরা” আর  দিওয়ানা- “একান্তে যে অনুরাগী জেন্ত মরা হয় ত্যাগী।” তাঁর গানে যে তত্ত্ব গুলি পরিলক্ষিত হয় সেগুলি হল- গুরুতত্ত্ব, নবীতত্ত্ব, আত্মতত্ত্ব, কৃষ্ণতত্ত্ব, ভক্তিতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, পরম তত্ত্ব, ও সাধনতত্ত্ব। লালন ফকিরের গানের বৈশিষ্ট্য হলো- ১) দেহতত্ত্ব ও মানবতাবাদ ২) ধর্মের উদারতা ৩) প্রেম সাধনা বা অনুরাগ ৪) সহজ-সরল প্রকাশ রীতি।

লালন ছিলেন একজন মানবতাবাদী বাউল সাধক। তিনি ধর্ম-বর্ণ-গোত্র সহ সকল প্রকার জাতিভেদ থেকে সরে এসে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। তাঁর গানে তা প্রকাশ করেছেন- “সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।/ লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে।।/ কেউ মালা কেউ তসবি গলায়, তাইতে যে জাত ভিন্ন বলায়।।/ যাওয়া কিংবা আসার বেলায়, জাতের চিহ্ন রয় কার রে।।/ যদি সুন্নত দিলে হয় মুসলমান, নারীর তবে কি হয় বিধান।।/ বামন চিনি পৈতা প্রমাণ, বামনী চিনি কেমনে রে।।/ জগৎ বেড়ে জেতের কথা  লোকে গৌরব করে যথা তথা।।/ লালন সে কয় জেতের ফাতা ঘুচিয়াছে সাধবাজারে।।/”

লালন ফকির একদিকে যেমন শান্ত স্বভাবের ছিলেন তেমনি অন্যদিকে খুব সাহসী স্বভাবেরও ছিলেন। ইংরেজ শাসক ও জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কলম ধরার হরিনাথ মজুমদারকে আক্রমণ করলে জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনীকে বাউল বাহিনী নিয়ে লালন ফকির মেরে তাড়িয়েছিলেন। তিনি ছোটবেলা থেকে ঘোড়ায় চড়তে পছন্দ করতেন। শেষ বয়সেও ঘোড়ায় চড়ে গ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়াতেন। লালন ফকির বাস করতেন ঠাকুর পরিবারের জমিদারি বিরহামপুর পরগনায়। কুষ্ঠিয়ার কুমারখালী গ্রামের সেঁউড়িয়া বা ছেঁউড়িয়াতে তার আখড়া ছিল। প্রথমদিকে কম হলেও পরের দিকে তার প্রায় দশ হাজার শিষ্য ছিল বলে জানা যায়। তারা তাঁকে “সাঁই”  বলে সম্বোধন করত। তিনি শিষ্যদের নীতি ও আধ্যাত্মিকতা শেখাতেন। তাঁর মতে,- “যা আছে ভাণ্ডে, তাই আছে ব্রহ্মাণ্ডে”। বৈষ্ণব সহজিয়া,বৌদ্ধ সহজিয়া ও সুফিবাদের সংমিশ্রণে মানব-দেহ-কেন্দ্রিক সাধনা লালনের বাউল সাধনার মূল মন্ত্র। লালন ফকির বিশ্বাস করতেন সব মানুষের মধ্যে আছে “মনের মানুষ” বা ঈশ্বর। আর সেই “মনের মানুষের” সন্ধান পাওয়া যায় আত্ম-সাধনার মধ্য দিয়ে। দেহের ভিতর “মনের মানুষ” বা “অচিন পাখির” বাস। এ নিয়ে তাঁর বিখ্যাত গান- “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।/ তারে ধরতে পারলে মন বেড়ি দিতাম পাখির পায়।।/ আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা মধ্যে মধ্যে ঝলকানি কাঁটা । তার উপরে সদর কোঠা আয়না মহল তায়।।/ কপালের ফের নইলে কি আর/ পাখিটির এমন ব্যবহার।/ খাঁচা ভেঙে পাখি আমার কোনখানে পালায়।।/ মন তুই রইলি খাঁচার আশে/ খাঁচা যে তোর কাঁচা বাঁশের/ কোন দিন খাঁচা পড়বে খসে ফকির লালন কেঁদে কয়।।/”

বাউল মতে দেহ একটি মন্দির আর সেখানে পরমেশ্বর আত্মারূপে বাস করেন। শুধু মিলনের অপেক্ষায় রয়েছেন লালন ফকির। তিনি আরও লিখেছেন- “মিলন হবে কত দিনে আমার মনের মানুষেরই সনে।/ চাতক প্রায় অহর্নিশি চেয়ে আছে কালো শশী/ হব বলে চরণদাসী ও তা হয়না কপাল গুনে”/ -এখানে মনের মানুষ অর্থাৎ পরমেশ্বর এর সঙ্গে মিলনের জন্য অপেক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। লালনের নামে আরেকটি গান ও প্রচলিত আছে- এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে।/ যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে।/ শোনায়ে লোভের বুলি, নেবে না কেউ কাঁধের ঝুলি, ইতর আতরাফ বলি দূরে ঠেলে নাহি দেবে।।/ আমির ফকির হয়ে একঠাঁই।/ সবার পাওনা পাবে সবাই/ আশরাফ বলিয়া রেহাই ভবে কেহ নাহি পাবে।/ ধর্ম কূল গোত্র জাতির/ তুলবে না গো কেহ জিগির।/ কেঁদে বলে লালন ফকির কে বা দেখায় দেবে।।/”- তবে এই গানটি লালন ফকিরের নিজের রচনা নয় বলে অনেকে দাবি করেছেন। ভাষা ও ভাবে আধুনিকতার ছোঁয়া আছে। তবুও এটা বলা যায় অন্য কোনো ব্যক্তি গানটি রচনা করলেও তার ব্যক্তিগত চাহিদা বা দলগত চাহিদা এখানে প্রকাশ পেয়েছে।

মানবতাবাদ, ধর্মীয় উদারতা, প্রেম সাধনা, শুদ্ধ অনুরাগের পরম সাধক লালন ফকির ১১৬ বছর বয়সে ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর “হিতকরি” পত্রিকা তাকে”মহাত্মা” আখ্যা দেয়। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে দদ্দু শাহ, পঞ্চ শাহ, গগন হরকরা, হাসান রাজা, গোপাল গোঁসাই, মদন বাউল, গোপাল, হাওড়ে গোঁসাই বিখ্যাত সাধক ছিলেন।

লালনের আখড়া সেঁউড়িয়াতে এখনও প্রতি বছর তাঁর মৃত্যুর দিন এবং দোল পূর্ণিমার দিন বাউলের মহাসম্মেলন হয়। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে লালনের আখড়ায় সাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে শিল্পকলা একাডেমির অধীনে লালন একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয় ।

তাঁর গানে প্রভাবিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কুড়িটি গান নিয়ে “হারামণি” নামে একটি সংকলন গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এটি “প্রবাসী” পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৩২২ বঙ্গাব্দে। পরে মোহাম্মদ মনসুর উদ্দিন একাই ৩০০ টি গান সংগ্রহ করেন ও “হারামণি” নামে ১৩টি খণ্ডে আরেকটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। এছাড়া মোহাম্মদ মনসুর উদ্দিনের বাউল নিয়ে অন্য দুটি গীতি সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়-“লালন ফকিরের গান” ও “লালন গীতি”। ১৩০৫ বঙ্গাব্দে যতীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় “বীণা ও বাদিনী” পত্রিকার সপ্তম  সংখ্যায় দ্বিতীয় ভাগে (মাঘ) “পারমার্থিক গান” শিরোনামে “ক্ষম অপরাধ ও দীননাথ” গানটি স্বরলিপি সহ প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকার অষ্টম সংখ্যায় আর একটি লালন গীতি প্রকাশিত হয়- “কথা কয় কাছে দেখা যায় না।” এলেন গিন্সবার্গ নামে একজন আমেরিকান কবি লালনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং তাঁর রচনাশৈলীতে লালনের প্রভাব পরিলক্ষিত  হয়। তিনি “আফটার লালন” নামে একটি কবিতাও লেখেন।

তবে শিক্ষিত সমাজের পক্ষ থেকে প্রথম বাউলের প্রতি আকৃষ্ট হন হরিনাথ মজুমদার (২২ জুলাই ১৯৩৩- ১৬ এপ্রিল ১৮৯৬)। কুষ্ঠিয়া জেলার কুমার খালি গ্রামের হরচন্দ্র মজুমদারের পুত্র “কাঙাল হরিনাথ” বা “ফিকির চাঁদ বাউল” নামে পরিচিত ছিলেন। নিজে কতগুলি উত্কৃষ্ট মানের বাউল গান রচনা করেন। অল্প বয়সে পিতা-মাতা মারা যাবার কারণে প্রথাগত শিক্ষা বেশি দূর না হলেও তিনি ইংরেজি স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। পরবর্তীতে শিক্ষার প্রসারের কাজে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। ১৮৫৫ খ্রি: একটি ভার্নাকুলার বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে সেখানে বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষা দান করতেন। এর পাশাপাশি সাংবাদিকতাও করেছেন। “গ্রামবার্তা প্রকাশিকা” নামে একটি সংবাদ পত্র প্রকাশ করেছিলেন। দীর্ঘ আঠার বছর ধরে রাজশাহীর রানি স্বর্ণকুমারী দেবীর অর্থানুকূল্যে সংবাদ পত্রটি প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি নীলকর সাহেব ও দেশীয় জমিদারের অত্যাচার এর বিরুদ্ধে কলম ধরেন। পরে সংবাদপত্র বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন এবং বাউলের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁর সমাজ সংস্কার ও শিক্ষা মূলক কাজে আকৃষ্ট হয়ে বহু যুবক বাউল গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। হরিনাথ মজুমদারের একটি জনপ্রিয় গান হল- “হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল পার করো আমারে।/তুমি পারের কর্তা জেনে বার্তা তাই ডাকি তোমারে।/আমি আগে এসে রইলাম বসে,যারা পরে এলো আগে গেল, আমি রইলাম পড়ে।/” তিনি বাউল গান ছাড়াও গদ্য, পদ্য সহ মোট আঠারোটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।তার মধ্যে বিজয়া, দক্ষযজ্ঞ, কাঙাল ফিকির চাঁদ ফকিরের গীতাবলী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

লালন পরবর্তী বাউল সাধকদের মধ্যে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছিল পঞ্চশাহ বা পঞ্জ শাহ (১৮৫১-১৯১৪)। যশোর জেলার শৈলকূপা গ্রামের প্রসিদ্ধ মুসলমান পরিবারে পঞ্চশাহ  জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা খাদেম আলি খোন্দকার অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ, বৈষয়িক ব্যাপারে উদাসীন হওয়ার কারণে শৈলকূপার জমিদারি হারিয়েছিলেন। পঞ্চশাহ লালন ফকিরের ভাবশিষ্য ছিলেন। তাঁর প্রকৃত দীক্ষাগুরু ছিলেন হরিশপুর নিবাসী হেরাজতুল্লা খোন্দকার। এ প্রসঙ্গে তাঁর গান এর প্রমাণ দেয়-“গুরুজীর নাম লিখি করি ছালাম।/হয়ে আছি হীন পঞ্জু তাহার গোলাম।/জানাবে যে খোন্দকার হেরাজতুল্লায়।——”

তিনি আরবি, ফারসি ও বাংলা ভাষায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। পঞ্চশাহ বা পঞ্জ শাহ ব্যক্তিগত জীবনে কোনো ধর্মরীতি মেনে চলতেন না। শুদ্ধাচার মেনে চলতেন। ইসলামী শাস্ত্রে বা সুফি সাধন তন্ত্রে তাঁর বিশেষ পাণ্ডিত্য ছিল। আবার হিন্দু যোগতন্ত্রাদিও তাঁর অজানা ছিল না। গোঁড়া মুসলমানরা তাঁকে অপছন্দ করতেন। কয়েকশো উৎকৃষ্ট মানের গানের রচয়িতা পঞ্চশাহ বাউল সাহিত্যের ইতিহাসে এক স্মরণীয় নাম।  লালনের শিষ্যদের মধ্যে তিনি বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেন৷  পঞ্চশাহের গান ভক্তিরসে ভরপুর, অতি উত্কৃষ্ট মানের বাউল গান। উৎকর্ষতার বিচারে লালনের গানের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় সে সব গান। তাঁর একটি গান খুব জনপ্রিয় হয়েছিল,সেটি হল-“শুধু কি আল্লা বলে ডাকলে তারে পাবি ওরে মন পাগেলা।/যে ভাবে আল্লা তালা বিষম লীলা ত্রিজগতে করছে খেলা।/ কতজনে জনের মালা তুলসীতলা।/হাতে ঝোলে জপের ঝোলা।/আর কতজন হরি বলে মারে তালি নেচে গেয়ে হয় মাতেলা।/ কত জন হয় উদাসী তীর্থবাসী মক্কাতে দিয়েছে মেলা।/কেউ বা মসজিদে বসে তার উদ্দেশ্যে সদাশয় করে আল্লা আল্লা।/”-

এছাড়া তাঁর একটি জনপ্রিয় গান হল-“স্বরূপে মানুষ মিশে,স্বরূপ দেশে বোবায় কালায় নিত্য লীলা।/ স্বরূপের ভাবনা জেনে চামর কিনে হচ্ছে কত গাজীর চেলা।।/”-

এই গানটিতে বাউল সাধনার মূলতত্ত্ব অতি চমত্কার ফুটে উঠেছে। শাস্ত্র-পুরাণ, কোরান-হাদিস মিলিয়ে কত নিয়ম মেনে গোঁড়া হিন্দু মুসলমান ঈশ্বরের আরাধনা করে। পাঁজি পুঁথি মেনে চলে কিন্তু “মনের মানুষ” বা “স্বরূপ মানুষ” বা ঈশ্বর কে পেতে গেলে মানুষ কে ভালোবাসতে হয়। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে যারা বিখ্যাত হয়েছিল তারা হল আনার শাহ, রহিম শাহ, আরমান শাহ প্রভৃতি।

বাউলের জগতে আর একটি উল্লেখযোগ্য নাম দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরী (২১ ডিসেম্বর ১৮৫৪ – ৬ ডিসেম্বর ১৯২২)। তিনি হাসন রাজা নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি বেশ কিছু অতি উৎকৃষ্ট মানের বাউল গান রচনা করেছিলেন। তিনি শ্রীহট্টের অধিবাসী ছিলেন।১৯০৭খ্রি: “হাছন উদাস” নামে তাঁর ২০৬ টি বাউল গান নিয়ে একটি সংগীত বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এছাড়া “শৌখিন বাহার” নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। হাসন রাজার একটি বিখ্যাত গান হল- “সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ান বানাইল।/ সোনা বন্ধে আমারে পাগল করিল।/ আরে না জানি কি মন্ত্র করি যাদু করিল।।/ রূপের ঝলক দেখিয়া তার আমি হইলাম কানা। সেই অবধি লাগল আমার শ্যাম পিরিতির টানা।/ হাসন রাজা হইল পাগল লোকের হইল জানা।/ নাচে নাচে পালায় পালায় আর গাঁয়ে জানা।/ মুখ চাহিয়া হাসে আমার যত আদি পরী।/ দেখিয়াছি বন্ধের দুঃখ ভুলিতে না পারি।”

লালন ফকিরের আর একজন শিষ্য পরম্পরা হল গগন হরকরা (১৮৪৫-১৯১০)। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল গগন চন্দ্র দাম। তিনি শিলাইদহের ডাকঘরের পিওন ছিলেন। তাই লোকে তাঁকে হরকরা বলত। ১৮৯০ খ্রিঃ এর শেষের দিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহ যান। তিনি জমিদারির কাজ দেখাশোনার জন্য সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, নওদা প্রভৃতি অঞ্চলে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। এর আগে রবীন্দ্রনাথের দাদা জ্যোতিরীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন ফকিরের সংস্পর্শে আসেন এবং লালনের গানে আকৃষ্ট হন। এবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গগন হরকরার গান শুনে মুগ্ধ হলেন। গগন হরকরাকে শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে ডেকে এনে গান শুনতেন এবং বাউল নিয়ে আলোচনা করতেন। গগন হরকরার সেই চির বিস্ময়কর গান রবীন্দ্রনাথের মন কেড়েছিল। -“আমি কোথায় পাবো তারে,আমার মনের মানুষ যে রে।/হারায়ে সেই মানুষে, তার উদ্দেশ্যে দেশ বিদেশে আমি দেশ বিদেশে বেড়ায় ঘুরে।/কোথায় পাবো তারে—-/লাগি সেই হৃদয় শশী,সদা প্রাণ হয় উদাসী।/পেলে মন হত খুশি দিবা-দিশা দেখিতাম নয়ন ভরে।/আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে নিভাই কেমন করে।/মরি হায় হায় রে———-ও তার বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করে।/ওরে দেখ না তোর হৃদয় চিরে।/কোথায় পাবো তারে,আমার মনের মানুষ যে রে।“

ব্রাহ্ম কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাউলের গানে উপনিষদের সুর ও তত্ত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন।অন্তর দিয়ে ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা আর মানুষের মধ্যে ঈশ্বরকে খোঁজার কথা এ গানে বলা আছে। ১৯০৫ খ্রিঃএ বঙ্গ-ভঙ্গের আদেশ জারি হলে সারা বাংলা জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও প্রতিবাদে সামিল হন। তিনি গান লেখেন-

“আমার সোনার বাংলা, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।/চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।/ওমা ফাগুনে তোর আমের বনে, ঘ্রাণে পাগল করে,মরি হায় হায় রে ।/ওমা অঘ্রানে তোর ভরা খেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি।/কী শোভা কী ছায়া গো,কী স্নেহ কী মায়া গো/,কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে,নদীর কূলে কূলে।/মা তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মত।/মরি হায় হায় রে।/মা তোর বদন খানি মলিন হলে ওমা আমি নয়ন জলে ভাসি।/তোমার এই খেলাঘরে শিশুকাল কাটিলরে/তোমারই ধূলা মাটি অঙ্গে মাখি ধন্য জীবন মানি।/তুই দিন ফুরালো সন্ধ্যা কালে কী দীপ জ্বালিস ঘরে।/মরি হায় হায় রে।/মা তোর বদন খানি মলিন হলে ওমা আমি নয়ন জলে ভাসি।”

সেই সময় এই গানটি খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। এ গান সবার মুখে মুখে ঘুরত। এ গানের সঙ্গে সঙ্গে বাউলের সুর জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। কারণ এগানের সুরে ছিল বাউলের সুর। কবির মন্ত্র শিষ্য শান্তিদেব ঘোষ লিখেছেন-“এ গানের সুর দিলেন গগন হরকরার ‘ আমি কোথায় পাবো তারে’ গানের আদলে”। ১৯৭১ খ্রিঃ এ ১৩ই মার্চ গানটি বাংলা দেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়। এছাড়া গগন হরকরার আর একটি প্রিয় গানের সুরের আদলে একটি গান রচনা করেন – “অমন অসাড় মায়ায় ভুলে রবে”-এই গানের সুরে লিখলেন-“যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক”।

ছোটবেলা থেকে বাউল গানের প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। শিলাইদহে গিয়ে বাউল গান ও বাউল সম্প্রদায়ের সংস্পর্শে এসে বাউল গান সংগ্রহ করার জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৯২৫ খ্রিঃ-এ বিখ্যাত ফকির হিরু শাহের সঙ্গে  লালনের সিঁউড়িয়ার আখড়ায় যান। সেদিন ছিল আখড়ায় বাত্সরিক উত্সবের দিন। সেদিন বাউলদের মুখে শুনে শুনে কয়েকটি গান লিখে নেন । সেটা ছিল তাঁর প্রথম বাউল গান সংগ্রহ। রবীন্দ্রনাথ বাউল নিয়ে মোট তিনটি গ্রন্থ লেখেন- ১) হারামনি ২) মানুষের ধর্ম ৩)বাউলের গান। প্রবাসী পত্রিকায় ১৩২২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হারামনি সংকলনে লালনের কুড়িটি গান স্থান পেয়েছে। পত্রিকায় ১৩২২ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত “হারামনি” সংকলনে গ্রন্থটির সূত্রে শিক্ষিত সমাজে বাউল গান যেমন মর্যাদা পেল, তেমনি লালন ফকিরের পরিচিতি ঘটেছিল শিক্ষিত সমাজে। এর আগে বাউল গান ও সাধনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম মূল্যায়ন করেন “বাউলের গান” গ্রন্থে। এটি ১২৯০ বঙ্গাব্দে “ভারতী”পত্রিকায় বৈশাখ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাউল গান সম্বন্ধে লিখেছেন- “প্রেমের মহিমা এমন করিয়া আর কে গাহিয়াছে।”

তাঁর পরের প্রবন্ধটি হল –“মানুষের ধর্ম”। এটি “রিলিজিয়ন অফ ম্যান” নামে ইংরেজিতে লেখা হয়েছিল। ১৯৩০খ্রিঃ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে হিবার্টের সভায় এই প্রবন্ধটি পাঠ করেন। এই গ্রন্থে বাউল গান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লালন ফকির, গগন হরকরা, হাসন রাজা ও উত্তরবঙ্গের বাউলের কথা উল্লেখ করেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রিয় দুটি গানের বাংলা অনুবাদ করে বিশ্লেষণ করেন। গগন হরকরার- “আমি কোথায় পাবো তারে” এবং হাসন রাজার- “মম আঁখি হইতে পয়দা হইল আসমান জমিন”। গান দুটি ক্ষিতি মোহন সেনের সহযোগিতায় ইংরেজি অনুবাদ করেন। তিনি নিজে বাউল সাধনা ও গানে অনুপ্রাণিত হয়ে বাউলের সুর ও আঙ্গিকে প্রায় দেড়শোর কাছাকাছি গান রচনা করেন। বাউল গানের “লিরিক্যাল বিউটি অফ টিউনস্”-এ গভীর ভাবে প্রভাবিত হন। বাউলের সংস্পর্শে এসে তাঁর চিন্তাধারার পরিবর্তন ঘটে। তিনি রোমান্টিক থেকে মিস্টিক কবি হয়ে ওঠেন। তাঁর জীবন ও সাহিত্যে আমূল পরিবর্তন এনেছিল বাউলের সংস্পর্শ। অন্য বাউল-সংগ্রাহকদের সঙ্গে তাঁর এখানে পার্থক্য । তিনি “ফাল্গুনী” নাটকে অন্ধ বাউল সেজে অভিনয়ও করেন। শান্তিনিকেতনের সঙ্গে বাউলের সম্পর্ক রবীন্দ্রনাথের সময় থেকেই গভীর। বোলপুরের বাউল-পাড়া থেকে বাউলরা এসে রবীন্দ্রনাথকে গান শুনিয়ে যেত। নবনী দাস বাউল রবীন্দ্রনাথের খুব প্রিয় বাউল গায়ক ছিলেন। বীরভূমের সনাতন দাসও একজন বিখ্যাত বাউল গায়ক ছিলেন। তবে বিংশ শতাব্দীর বাউলচর্চায় নবীন দাসের নাম সবার আগে আসে। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। গাইতে গাইতে মাঝে মাঝে সংজ্ঞা হারাতেন, জ্ঞান ফিরে পেয়ে আবার গাইতেন। রবীন্দ্রনাথ, ক্ষিতিমোহন সেন, অলেন গিন্সবার্গ, দেবেন ভট্টাচার্য, আর্নল্ড বাকে — সবাই তাঁর গানের ভক্ত ছিলেন। শেষ বয়সে থ্রম্বসিস রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন,তখন গাঁজা ছাড়া কিছুই নাকি খেতেন না। সিউড়িতে ছোট ছেলে লক্ষ্মণচন্দ্র দাসের কাছে শেষ জীবন কাটিয়ে ১৯৬৪ খ্রিঃএ মারা যান।

রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও বিহারীলাল চক্রবর্তী ১৯৪০ খ্রিঃ “বাউল বিংশতি” নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। তাতে কুড়িটি বাউল গানের উল্লেখ আছে। “বাংলার বাউল ও বাংলার গান”- গ্রন্থে লালন ফকিরের কয়েকশো গান সংগৃহীত হয়েছে। সংগ্রাহকের কাজ করেছেন ডঃ উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। বাংলা সাহিত্যে বাউল নিয়ে দুটি উপন্যাসও লেখা হয়েছে ১) কালকূটের “কোথায় পাবো তারে” ২) সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “মনের মানুষ”।

রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী যুগে যিনি বাউল গানের জনপ্রিয়তায় পূর্ণতা এনে দিয়েছেন তিনি হলেন পূর্ণদাস বাউল। একতারার সুরে সারা বিশ্বকে মোহিত করেছেন। তিনিই প্রথম বাউল যিনি বিশ্বের মঞ্চে বাউল গানকে পরিবেশন করেন। পূর্ণদাস বাউল ১৯৩৩ খ্রিঃ-এ ১৮ মার্চ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত রামপুরহাটের কাছে “একচক্কা” গ্রামে দোল পূর্ণিমার দিন জন্ম গ্রহণ করেন। তাই তাঁর নাম রাখা হয় পূর্ণচন্দ্র। ছোটবেলা থেকেই পিতা নবনী দাসের সঙ্গে বাংলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। বাংলার মন্বন্তরের সময় দারিদ্র্য -পীড়িত হয়ে বেল স্টেশনে গান গেয়ে রোজগার করতেন। এই সময় সীতারাম ওঙ্কারনাথ নামে এক সাধকের সহযোগিতায় পূর্ণদাস বাংলার বাইরে বাউল গান গাইতে যান। তিনি মাত্র নয় বছর বয়সে বাউল গান গেয়ে জয়পুরে এক প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক লাভ করেন। ছোটবেলায় কলকাতা শহরে রংমহল থিয়েটারে এবং বঙ্গসংস্কৃতি মেলায় বাউল গান গেয়েছিলেন। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে প্রথম বাউল পরিবেশন করেন। তাঁর পিতা নবনী দাস বাউলের সিউড়িতে নিজের আশ্রম ছিল। পিতার কাছে প্রথম বাউল তত্ত্ব সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছিলেন। বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনে (১৯৪৫) দেবেন ভট্টাচার্য নবনী দাস, পূর্ণদাস ও লক্ষ্মণদাসের গান রেকর্ড করেন। নবীন দাসের  গান- “কত দোষী হই গে প্রভু তোমার আজ রাঙা পায়ে”- আলাদা করে প্রকাশিত হয়। দেবেন ভট্টাচার্যের রেকর্ড করা সেই গান প্রকাশের ফলে বাউল গান ও পূর্ণচন্দ্রের জন্য বিশ্বের দরজা খুলে যায়। পিতার সঙ্গে যুগ্মভাবে রেকর্ডিং করা গানও সেই সময় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। ১৯৫৬ খ্রিঃ-এ আর্নল্ড বাকে নবনী দাস ও পূর্ণচন্দ্র দাসের গান রেকর্ড করেন। নবনী দাসের  – “দেখ দেখ মন থেকো সচেতন। জীবন হে নূতন নেয় না যেন চোরে।” এবং “একটা সোনার মানুষ এসেছে গো দেখবি যদি আয়।”

আর পূর্ণচন্দ্র বাউলের- “ওরে আমার অবোধ মন/সর্বদায় চেতনে থাকে রে মন।” -এই গানগুলি রেকর্ড করা হয়। এই গানগুলি লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সাউন্ড এন্ড অডিও ভিসুয়াল আর্কাইভ-এ রাখা ছিল সযত্নে। সম্প্রতি উদ্ধার করা হয়। পূর্ণদাস বাউলের সবচেয়ে জনপ্রিয় গান হল- “গোলমালে গোলেমালে পিরিত কইর না।/পিরিতি কাঁঠালের আঠা লাগলে পরে ছাড়বে না।”

১৯৬০ খ্রিঃ আমেরিকার সানফ্রান্সিসকোতে এক গানের অনুষ্ঠানে যোগ দেবার জন্য বব ডিলানের ম্যানেজার আলবার্ট গ্র্যাসমান পূর্ণদাস বাউল কে আমন্ত্রণ জানান। আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় পরিভ্রমণ করে তিনি  সঙ্গীত পরিবেশন করেন। বব ডিলানের বাসস্থান বিয়ার্স ভিলায় অনুষ্ঠান করেন এবং বেশ কিছু গান রেকর্ড করেন। ফ্রান্সের নাইটস শহরে মাইক জ্যাগররের প্রাক্তন ম্যানেজার পূর্ণদাস বাউলকে রোলিং স্টোন স্টুডিওতে গান রেকর্ডিং এর আমন্ত্রণ জানান। সান দিয়াগো শহরে তিনি বাউল গানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করেন। এই বাউল গান তাঁকে বিদেশের “লক্ষ্মী” আর দেশের “পদ্মশ্রী” এনে দিয়েছে। তিনি “বাউল সম্রাট”বলে আখ্যায়িত হয়েছেন।

গত শতাব্দীর মাঝামাঝি বাউল সাধকরা অন্যান্য তত্ত্বের তুলনায় মৈথুনতত্ত্বকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় এবং অতিরিক্ত গাঁজা আসক্ত হয়ে পড়ায় ভদ্র ও সুশীল সমাজে জনপ্রিয়তা হারিয়েছিল। “বাউল খেদাও” বলে আন্দোলনও হয় বেশ কয়েকবার। বাংলাদেশের কুষ্ঠিয়া পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে বাউল ও ফকিরদের ওপর আক্রমণ করা হয়। এরপর আখড়া বা  আশ্রমাশ্রিত বাউল ও ফকিরের সদস্য-সংখ্যা কমতে শুরু করে কিন্তু বাউল গানের জনপ্রিয়তা কমে না। পূর্ণদাস বাউলের বিশ্ব জোড়া খ্যাতি বাউল সম্প্রদায়কে অনেকটা স্বস্তি এনে দিয়েছিল। পূর্ণদাস বাউলের খ্যাতির পর বাউল গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গ্রামের অন্য পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বাউল গান গাইতে শুরু করে। অনেকে শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের জন্য কিংবা খ্যাতি অর্জনের লক্ষ্যে বাউল গান গাইতে আসে। কেউ কেউ সফলও হয়। সংসার ধর্মে থাকা বাউল সাধকরা বাউল গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকে। কৃষিকাজ, ছোট ব্যবসা, কুটির শিল্প ও অন্যান্য জীবিকার সঙ্গে যুক্ত নিম্নবিত্তের সংসারী ব্যক্তিরা বাউল গানের চর্চা  করলে সমাজে আবার বাউল গানের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। এর ফলে বাউল সাধক সম্প্রদায় ও বাউল গায়ক সম্প্রদায় আলাদা হয়ে যায়। আগে শুধু মাত্র সাধক সম্প্রদায় বাউল গান করত কিন্তু পরে আলাদা করে বাউল গায়ক সম্প্রদায় তৈরি হল, এরা ব্যক্তিগত জীবনে বাউল সাধনা করত না শুধু বাউল সেজে মঞ্চে উঠে গান করত।

বর্তমানে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সর্বত্রই বাউলদের আখড়া দেখা যায় । কুষ্ঠিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, মাগুরা, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবেড়িয়া -সব জায়গায় বাউলের দেখা মেলে। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া, বীরভূম, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা সহ অন্যান্য জেলাতেও বাউল সম্প্রদায় রয়েছে। চট্টগ্রাম ও সিলেটের বাউলের বৈশিষ্ট্য হল এরা বেশিরভাগ সুফি মতবাদের বাউল ফকির। এরা সাদা পিরান ও সাদা তহবন্দ পরে। গানের শেষে “আল্লাহ”,”জয়গুরু”,”সাঁই নিবন্ধন” বলে। বাংলাদেশের বাকি অংশে বৈষ্ণব প্রভাব যুক্ত সাধক বা বাউলের সঙ্গে সঙ্গে সুফি প্রভাব যুক্ত সাধক বা ফকির বাউলদের লক্ষ্য করা যায় ।

পশ্চিমবঙ্গের বৈষ্ণব প্রভাব যুক্ত সাধক সংখ্যা বেশি। এরা গেরুয়া পোশাক পরে। গানের শেষে এরা “হরি হরি” বলে। তবে পশ্চিমবঙ্গের ফকিরদের সংখ্যাও কিছু কম নয়। জেলা ভেদে এদের জীবন যাপনে পার্থক্য রয়েছে। উত্তর বঙ্গের ফকির ও বাউলরা সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মুর্শিদাবাদের বাউলরা অত্যাচারিত ও অবহেলিত। নদীয়া জেলার বাউলরা বেশি সমাদৃত। আবার ফকিরদের তুলনায় বাউলরা দেশ বিদেশে গান গাইতে যাবার কারণে আর্থিক ভাবে কিছুটা হলেও সচ্ছল। কিন্তু সেই তুলনায় ফকিররা সুযোগের অভাবে অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। তারা প্রতিনিয়ত দারিদ্র্যতার সঙ্গে লড়াই করে দুঃখ কষ্ট উপেক্ষা করে সাধন সঙ্গীতকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বাংলার এই লোকসঙ্গীত তাদের মুখে মুখে বেঁচে আছে। অতি উত্কৃষ্ট মানের একটি ফকিরি গান নীচে দেওয়া হল–

“ফিরবি কবে রে মন মরি এ রণ।/ঘর বড় ঘড়িতে ভাই দেখলাম ঘোর দরশন।/সেই জানাতে বিরাজ করে সাঁই নিরঞ্জন ।/ছাঁচ চালের পানি রে ভাই ঘরের মড়কচাতে মরে।/ভেবে দেখ ও পাগল মন আপন আপন ধড়ে/ফিরবি কবে রে মন।/হাল জোয়াল মাঠে গেলে বলদ রইল গাভীর পেটে।/কিরষেণের ও খোঁজ খোঁজ লাইলি গেল মাঠে।/ফিরবি কবে রে মন ।/ধায়েম শাহ ফকির বলে আমার লেগে গেল ধাঁধা।/করকটাতে শিকার করে বাজ রইল বাধা।/ফিরবি কবে রে মন।/”

আর একটি ফকিরি গান হল-

“শুনুন বাবু চার ফকিরের ফকিরি গান গাই।/ আমরা ফকির বটে মোদের ফিকির জানা নাই।/ হিন্দু মুসলমানের এ দেশ সকলে ভাই ভাই।/ শুনুন বাবু চার ফকিরে ফকিরি গান গাই ।/ হিন্দু যদি মাটি হয়ত মুসলমান হয় তার জল।/ মাটিতে জল পড়লে তখন হয় জানি ফসল।/ হিন্দু যদি ফল হয় তো মুসলমান হয় ফুল।/ হিন্দু যদি নদী হয় তো মুসলমান হয় তার কূল।/ ভেবে দেখুন দুয়ের মাঝে কোনো তফাত নাই।/শুনুন বাবু চার ফকিরের ফকিরি গান গাই ।”

পূর্ববঙ্গের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় সারা বছর ধরে বাউলের সমাবেশ ও গানের আসর বসে। লালনের আখড়া সেঁউরিয়া ,পঞ্চশাহের হরিশপুরের মাজারে প্রতি বছর বাউল গানের উৎসব হয়। পদকর্তা জয়দেবের জন্মস্থান বীরভূমের কেঁদুলি গ্রামে প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তিতে এবং শান্তি নিকেতনের পৌষমেলায় বাউলের মহাসম্মেলন হয়। এখানে দেশ বিদেশের বাউল সাধকরা যোগদান করে। তবে এখানে বাংলাদেশের বাউল ফকিরদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বাউল পরিবেশিত হয়- ঘোষ পাড়া, অগ্রদ্বীপ, শেওড়াতলা,পাথরচাপুড়ি,সিঁউড়িয়া প্রভৃতি অঞ্চলে নিয়মিত বাউলের মেলা হয়৷ আধুনিক বাউলরা আইন, আদালত, রেলগাড়ি, ব্যাঙ্কের লেনদেন, ইলেকট্রনিক আলো ইত্যাদি বিষয়কে নিগূঢ় তত্ত্বকথার মোড়কে সুন্দর উপমা ও রূপকে সাজিয়ে পরিবেশন করে থাকে। দূরদর্শন ও বেতারের মাধ্যমে এর জনপ্রিয়তা আরো বেড়েছে। নাটক ও চলচ্চিত্রে বাউল গানের ব্যবহার বেড়েছে। তবে কখনও কখনও গ্রাম বাংলার অনুষ্ঠানে অযোগ্য গায়কের কণ্ঠে অতিরিক্ত বাদ্যযন্ত্র সহযোগে এই বাউল গান শব্দদূষণে পরিণত হয়। কেউ কেউ হাতে একতারা বাজিয়ে বাউল গেয়ে লোক জড়ো করে বাড়িতে তৈরি দাঁতের মাজন বিক্রি করে। এরই মধ্যে বাউল গানকে আকর্ষণীয় করেছে এমন যোগ্য ব্যক্তিরও অভাব নেই। কয়েক জনের নাম দেওয়া হল- গোলাম শাহ, পবন দাস শাহ, গোষ্ঠ গোপাল, পার্বতী বাউল, অচিন্ত্য দাসী, বাসুদেব বাউল, সুফিয়া বিবি, সুমিত্রা দাসী, হরিপদ গোঁসাই, কালাচাঁদ দরবেশ, সুফিয়া বিবি, অজয় রায়, গণেশ টুডু, কার্তিক দাস বাউল, প্রফুল্ল হালদার, বেহেতর শাহ, মুক্তার শাহ, লক্ষ্মণচন্দ্র দাস প্রমুখ।

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলা হয়ে উঠেছে  বাউল সাধকদের গানের প্রধান  চর্চাকেন্দ্র। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলা বাউল গানকে তাদের জেলার নিজস্ব সংস্কৃতি বলে ঘোষণা করেছে। ইউনেস্কো ২০০৫ খ্রিঃ বাউল গানকে মানবতার ধারক হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। সারা বিশ্বের ৪৩টি বাক ও বিমূর্ত ঐতিহ্য চিহ্নিত করতে গিয়ে বাংলা দেশের বাউল গান কে অসাধারণ সৃষ্টি বলে আখ্যা দেয়। বিশ্বের মৌখিক ও দৃশ্যমান ঐতিহ্য সমূহের মধ্যে বাউল গান কে অন্যতম সেরা সম্পদের একটি বলে ঘোষণা করে। দুই বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় অবস্থা এবং বাউল সাধনার ইতিহাসের ধারক ও বাহক হল এই বাউল গান। বাংলার নিজস্ব সম্পদ, বাংলার লোকসঙ্গীত, সেদিনের কুষ্ঠিয়ার সেই বাউল গান আজ উচ্ছল, প্রবহমান ধারায় পরিণত হয়েছে। আর রেডক্লিফ লাইন? ঠিক আগের মতোই মাঝখানে বসে আছে। তার দু-পাশ দিয়ে সগর্বে বয়ে চলেছে এই ধারা ।

 

তথ্যসূত্রঃ-

 ১) “বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত”- ডাঃ অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

২) “লালন সমগ্র” আবুল আহসান চৌধুরী।

 ৩) মোহাম্মদ মনসুর উদ্দিনের “হারামণি”

 ৪) বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান- সেলিনা হোসেন নুরুল ইসলাম (দ্বিতীয় সংস্করণ)

৫) “বাউল ফকির কথা” সুধীর চক্রবর্তী

 ৬) “বাংলার বাউল ও বাংলার গান” উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য

৭) “লালন গুরু সিরাজ সাঁইয়ের গান” সৈয়দ জাহিদ হাসান

৮) বাউল গান ও ইউনেস্কোর স্বীকৃতি প্রথম আলো- ঢাকা। প্রকাশকাল ৩১ শে আগস্ট ২০১৩

৯) “অজ্ঞাত নবনী”- মৌসুমী ভৌমিক রবিবাসরীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা।২৩ শে আগস্ট ২০২০।

     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>