Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,বাংলা

আ গ্রামার অব বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ । ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড

Reading Time: 14 minutes

এ অল্প কয়েক বছরেই ব্রিটিশ সংসদের বিচক্ষণতা, প্রতিশ্রুতি মোতাবেক এর এশীয় অঞ্চল, বিশেষ করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে অঙ্গীভূত বাংলা রাজ্যে একটি সুপ্রিম কোর্ট অব জাস্টিস প্রতিষ্ঠার কর্তৃত্বের পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিক তত্পরতায় অভ্যন্তরীণ নীতি ও বেসামরিক প্রশাসনের ক্ষেত্রে সুস্পষ্টভাবে অংশগ্রহণ করেছে। এ শুভকাজের আরো অনেক কিছুই এখনো বাকি রয়ে গেছে। এবং যুক্তিসঙ্গতভাবেই আমরা ধরে নিতে পারি যে সরকার, যারা শাসন করবে সেই ইউরোপীয় অধিবাসী এবং এর প্রজা, যারা আনুগত্য করতে যাচ্ছে, সেই ভারতের অধিবাসীদের ভেতর সঠিক বোঝাপড়া ও যোগাযোগের একটা সাধারণ মাধ্যম গড়ে তোলা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা। অল্প শিক্ষিত ও সুরুচি বর্জিত রোমান জাতি গ্রিস অধিকার করার পর পরই গ্রিক ভাষা নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিল। এমনকি পড়তে পারার আগেই তারা এখানকার আইন গ্রহণ করেছে এবং শত্রুকে বশে আনতে নিজেদের সভ্য করে তুলেছে। সৌজন্যের ক্ষেত্রে বিকাশকে মূলধনে পরিণতকারী এবং বাংলার প্রভু ইংরেজরা তাদের জারি করা আইন-কানুনের উদার নীতিমালা ব্যাখ্যা করতে, শাসন করার সময় আস্থা তৈরি করতে; এবং পাশাপাশি বাইরের একটি জাতির কাছে আইন ও বিজ্ঞানের জোগানদার হতে আরো অনায়াসে এবং বেশি কর্তৃত্ব নিয়েই এখানকার ভাষাকে বিজয়ের অধীনে নিয়ে যেতে পারে। এই প্রজারা এত দিন ধরে ইউরোপে দারুণ উপেক্ষিত ছিল; এবং জোরালোভাবে বিশ্বাস করা হতো যে, বেঙ্গল সবসময়ই মুর নামে পরিচিত, এবং গোটা ভারতে চালু ভাষা-ধরন থেকে ভিন্ন নিজস্ব এবং অদ্ভুত ভাষার অধিকারী। এই ভুল বিশ্বাস দূর করতে এবং সাধারণের সেবায় আমার সামান্য বিদ্যা নিয়োজিত করতে আমি বেঙ্গলের স্থানীয় ভাষার এ ব্যাকরণগত ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়াস পেয়েছি: এখানে নিজেকে উপরিগত বা খণ্ডিত দৃষ্টিকোণে সন্তুষ্ট না রেখে কিংবা আমার পর্যবেক্ষণকে সুস্পষ্ট পুঙ্খানুপুঙ্খতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না করতে প্রয়োজনীয় সবকিছু উপলব্ধি করাই আমার মূল নীতি ছিল। একই বিষয়ে আরো বৃহত্ ও বিস্তারিত সংকলনের পূর্বসূরি একটি সংক্ষিপ্ত নিবন্ধ হয়তো সুবিবেচিত সারসংক্ষেপ বা একটি জাঁকাল সারাংশ হিসেবে উতরে যেতে পারে; কিন্তু নতুন একটি বিষয় নির্বাচনকারী কোনো লেখকের প্রতিটি ভ্রান্তিকে আরো পূর্ণাঙ্গ তথ্য জোগানো পরবর্তী আবিষ্কারকদের দিক থেকে অজ্ঞতা কিংবা অবহেলা হিসেবে দোষারোপ করা হবে।

ভারতীয় সাহিত্যের বিশাল উৎস, পারস্য উপসাগর থেকে চীন সাগর পর্যন্ত অঞ্চলের প্রায় সব ভাষার অভিভাবক হলো সংস্কৃত: খুবই সমীহযোগ্য ও অচিন্তনীয় প্রাচীন একটি ভাষা; এখন ব্রাহ্মণদের গ্রন্থাগারে বন্দি এবং কেবল তাদের ধর্মের নথিপত্র পুরোপুরি দখল করে থাকলেও এই ভাষা গোটা প্রাচ্য বিশ্বে চালু ছিল বলেই মনে হয় এবং এর আদি ব্যাপ্তির পরিচয় এশিয়ার প্রায় সব অঞ্চলেই এখনো হয়তো মিলবে। ফার্সি ও আরবি এবং এমনকি লাতিন ও গ্রিক শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত শব্দের মিল আবিষ্কার করে আমি বিস্মিত হয়েছি; সেটা পরিশীলিত শিল্পকর্ম ও উন্নত আচরণের পরিবর্তনের কারণে কখনো কখনো সংযুক্ত হওয়ার মতো কারিগরি কিংবা উপমার দিক থেকে নয়; বরং ভাষার মৌলিক ক্ষেত্রে, শব্দাংশে, সংখ্যার নামে এবং সভ্যতার একেবারে ঊষালগ্নে প্রথম আরোপিত বিভিন্ন জিনিসের নামে। এশিয়ার বিভিন্ন এলাকার পদক এবং প্রতীকের ওপর খোদাই করা ছবির মিল, সেগুলোর পারস্পরিক আলোকপাত এবং একই আদি-উেসর সঙ্গে সেগুলোর সাধারণ সাদৃশ্য কৌতূহলের আরেকটি প্রশস্ত জায়গা জোগায়। আসাম, নেপাল, কাশ্মীর এবং অন্য আরো রাজ্যের মুদ্রা সংস্কৃত ভাষায় খোদাই করা এবং বেশির ভাগই প্রাচীন সংস্কৃত পুরাণের ইঙ্গিত বহন করে: ভুটান ও তিব্বতেও বিভিন্ন সিলমোহরের ছাপে একই সমরূপতা লক্ষ করেছি। বিশ্বের অন্য যেকোনো জায়গা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃত বর্ণমালার অদ্ভুত বিন্যাস থেকে একইভাবে একটা বাড়তি ধারণায় পৌঁছানো যেতে পারে। বিন্যাসের এ অসাধারণ ধরন আজো সিন্ধু থেকে পেগু পর্যন্ত পুবের বেশির ভাগ অংশে বর্তমানে আপাত সম্পর্কহীন এবং সম্পর্ণ ভিন্ন ভাষায় অস্তিত্ববান রয়েছে, তবে সেগুলো একই উত্স থেকে উদ্ভুত হওয়ার পক্ষে একটা জোরালো যুক্তি। ব্যক্তি ও জায়গার নাম, পদবি ও উপাধিতেও সাদা চোখেই ধরা পড়া আঁচ-অনুমানের আরেকটি দিক নিজেকে তুলে ধরে যাতে এবং এশিয়ার শেষসীমা পর্যন্ত সংস্কৃতের স্পষ্ট চিহ্ন মিলতে পারে। কপ্টিক প্রাচীনতার সামান্য অবশেষের কারণে ওই ভাষার সঙ্গে এই আদিম ভাষার কোনো ধরনের তুলনার সুযোগ মিলছে না; তবে ভাষা, আইন-কানুন ও ধর্মের বেলায় মৌলিকতার দিক থেকে মিসরের দাবি তর্কসাপেক্ষ মনে করার যথেষ্ট কারণ এখনো আছে। এ মতের সমর্থনে মাত্র একটি পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করব। বেশির ভাগের কাছে এ শতকে বেঙ্গলের জন্ম দেয়া সবচেয়ে প্রাজ্ঞ এবং সুদক্ষ প্রাচীন বস্তুর সংগ্রাহক কিশেনগরের রাজা অতিসম্প্রতি তার নিজের সংস্কৃত বইপত্র রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন, যেখানে ভারত ও মিসরের ভেতর অতীতে চলমান যোগাযোগের বর্ণনা রয়েছে। একই সময়ে এ সম্পর্ক থেকে ব্রাক্ষণদের সমীহ দেখানো প্রাচীন গ্রিক লেখকদের টিকে থাকা কিছু অনুচ্ছেদ খুবই জোরালোভাবে এর সত্যতাকে সমর্থন করে।

কিন্তু সংস্কৃত ভাষার অতীত ব্যাপ্তির বেশ কিছু প্রমাণ সত্ত্বেও এখন তা একটা বিশাল মহাদেশে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে গেছে, এবং এর পরিচর্যা বা ধ্বংসকারী বিভিন্ন জাতির আচার-আচরণ ও আইন-কানুনের সম্ভাব্য সব ধরনের পরিবর্তনের কারণে নানা ধরনের অন্তহীন বাহ্যিক বিষয়ে আকীর্ণ হলেও সিন্ধু ও গঙ্গার মধ্যবর্তী এশিয়ার ওই অংশ এখনো খাঁটি ও অবিকৃতরূপে গোটা ভাষাটিকে সংরক্ষণ করেছে; কৌতূহলী পাঠকের জন্য এখনো হাজার হাজার বই ধারণ করছে, যার অনেকই মানব অস্তিত্বের অতীতকাল থেকে ধর্মীয়ভাবে হস্তান্তর হয়েছে।

জেস্যুইট দুপোঁ এ ভাষাটির অনন্য কাঠামোর অবিশ্বাস্য বর্ণনা দিয়ে পরবর্তী কালের অনেক লেখককেই বিভ্রান্ত করেছেন। তার মতে, এ ভাষাটি শব্দের বিপুল ও প্রচুর ভাণ্ডারের জন্য খুবই অপর্যাপ্ত সংখ্যক আদিম মূলের কাছে ঋণী, এবং একে ভাষার কাপুত মরতুয়াম বলতে চেয়েছেন: পূর্ণাঙ্গ শব্দ নয়, বরং নির্দিষ্ট কয়েকটার কিছু বিশেষ ধারণার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তিনি যেসব উপাদানের দিকে ইঙ্গিত করেছেন এবং উদাহরণ হিসেবে ভুল উদ্ধৃতি দিয়েছেন, সবগুলোই তার আরোপ করা সামগ্রিক গুণ থেকে দুরস্ত। এগুলো স্রেফ ক্রিয়া মূল, এবং এমনকি তিনি যে বই থেকে এই ভুল উদাহরণ জোগাড় করেছেন সেখানেও এ নামই দেয়া হয়েছে। সেগুলোর পরিমাণ প্রায় সাতশর মতো হবে; এবং অন্য বেশির ভাগ ভাষার ক্রিয়া পদের মতো ক্রিয়ারূপ বিশেষ্যের খুবই বড় একটা অংশ এগুলোর কাছে ঋণী হওয়ার কথাটা মানতেই হবে; কিন্তু সেগুলো সংখ্যা বা বৈচিত্র্যের দিক থেকে গ্রিককে ছাড়িয়ে গেছে বলে মোটেই বিশ্বাস করি না আমি।

সংস্কৃত ভাষার মৌলিক অংশ তিন ভাগে বিভক্ত: ধাতু বা ক্রিয়াপদের মূল (দুপোঁর আদিম উপাদান), শব্দ বা মূল বিশেষ্য এবং অব্যয় বা অপ্রধান পদ। অন্যান্য ভাষায় শেষেরটি আরো বেশি অপরিবর্তনীয়; কিন্তু প্রথম দুটি শ্রেণীতে যেসব শব্দ বোঝায়, সেগুলোকে কোনো রচনায় জুত্সই অবস্থান দিতে সংযোজন-বিয়োজন করে তৈরি করা জরুরি। এবং এখানেই ব্যাকরণবিদ একে বিস্তারিত করার এবং পরিমার্জিত করে তুলতে সব রকম শক্তি প্রয়োগের অবকাশ পান। নিয়ম না মেনে একটি হরফ বা শব্দাংশও যোগ বা বদলানো যাবে না; একাধিক বিধির প্রয়োগ ছাড়া কোনো পরিবর্তন বা সংযোজনের ক্ষুদ্রতম অর্থের ক্ষেত্রেও কোনো অদল-বদল ঘটানো চলবে না; এবং লিঙ্গ, বচন, কারক, পুরুষ, কাল, ধরন কিংবা মাত্রার প্রতিটি পরিবর্তনের সব ভিন্ন ভিন্ন ধরন পদ্ধতিগতভাবে প্রোপ্রিয়া কুয়ে মারিবাস এবং অ্যাজ ইন প্রেপেন্তির মতো স্মৃতিকে সহায়তার লক্ষ্যে বিন্যাস (যদিও অসীমভাবে বিস্তৃত এক মাত্রায়) করা হয়েছে।

দুপোঁ তার কাপুত মরতুয়ামের পদ্ধতির ক্ষেত্রে কম একগুঁয়ে হলে নিশ্চয়ই বাক্যের গঠন এবং বক্তব্যের বোধগম্যতায় ক্রিয়া ও বিশেষ্য পদের সমান প্রয়োজনীয়তার কথা ভাবলে এবং সংস্কৃতের সঠিক ধারণা পেলে এর মৌলিক অংশগুলো এ দুই ধরনের সঙ্গে অব্যয়ের সংযোজনের মাধ্যমে তৈরি হওয়ার ব্যাপারটা পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন।

আমি মনে করি, কষ্টসাপেক্ষ ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে এ ত্রয়ী শক্তি গোটা হিন্দুস্তানের প্রাদেশিক ও উপভাষায় সত্যিকারের ভারতীয় প্রতিটি আদি শব্দে এখনো খুঁজে পাওয়া যাবে; এবং এ ধরনের যেসব শব্দের সংস্কৃত কোনো শিকড় নেই বলে পুরোপুরি প্রমাণ হয়েছে, সেগুলোকে পরবর্তীকালে মূল ভাষায় রোপণ করা কোনো প্রত্যন্ত এবং বিদেশী ভাষার সৃষ্টি ধরে নেব। এ নিয়মের একটি বিচক্ষণ অনুসন্ধান হয়তো বহু শিল্পকর্ম ও বিজ্ঞানের প্রথম উদ্ভাবনের ওপর নতুন আলো ফেলবে এবং দার্শনিক আবিষ্কারের একটা টাটকা উত্স উন্মুক্ত করবে।

সংস্কৃত ছাড়া বেঙ্গল রাজ্যে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষা (যদিও সমান মাত্রায় নয়) চালু আছে, যেমন ফার্সি, হিন্দুস্তানি এবং খাঁটি বাংলা; দেশের সুবিধার ক্ষেত্রে প্রতিটিরই নিজস্ব ভিন্ন অবস্থান রয়েছে এবং সেকারণে একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে সর্বজনীনভাবে গ্রহণ করা যাবে না।

মোগল বিজয়ের হাত ধরে ফার্সি বেঙ্গলে প্রবেশ করেছে এবং দরবারের ভাষা হওয়ায় স্বভাবতই আইন-কানুন ও খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে ভিত্তি লাভ করে; কয়েক শতকের জন্য হিন্দুস্তানের বেশ কয়েকটি রাজ্যের দরকষাকষির ভাষাও ছিল এটা এবং সে কারণেই যারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিষয়-আশয়ের দেখাশোনা করতে যাচ্ছিল, তাদের পক্ষে প্রায় অনিবার্য যোগ্যতায় পরিণত হয়; ফলে মিস্টার জোন্স রচিত নির্ভুল ও অসাধারণ ব্যাকরণ এশিয়ায় তার স্বদেশীদের শিক্ষা ও সেবার ক্ষেত্রে মানানসই অবদান রেখেছে। সরকারের মোগল কর্মকর্তারা তাদের বেশকিছু হিসাব ও যোগাযোগ বিভাগে সাবেক শাসকগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে এখনো এ ভাষা ব্যবহার করেন, ইংরেজি কিছু পরিমাণ যার জায়গা অধিকার করে নিয়েছে; কিন্তু গোটা ব্যবস্থাকে এখনো বাতিল করে দেয়নি। পরিণামে বেঙ্গলের রাজনৈতিক বিন্যাসের সমরূপতার একটি প্রধান বাধা দেখা দিচ্ছে; কেননা জনগণের সব সুবিধার সারাংশ যেখানে এক ভাষায় সংরক্ষিত, সেখানে যেমনটা আমি এখন তুলে ধরব বিস্তারিত অনিবার্যভাবেই ভিন্ন একটিতে বন্দি।

সব সত্যিকার হিন্দুস্তানি এলাকায় বহু যুগ ধরে সাধারণভাবে হিন্দুস্তানি বা ভারতীয় ভাষায় কথা বলে আসা হচ্ছে বলে মনে হয়। সন্দেহাতীতভাবে সংস্কৃত থেকেই এর উদ্ভব ঘটেছে, সংস্কৃতের সঙ্গে খাঁটি লাতিন এবং ফ্রান্স ও ইতালির আধুনিক ভাষার মধ্যকার মিলের মতো একই ধরনের মিল রয়েছে। একই ধারণা প্রকাশের জন্য দুটো ভাষাতেই যেখানে প্রায় একই শব্দ প্রয়োগ করা হয়ে থাকে, সেখানে এসব শব্দের সংযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহূত বিভক্তি ও প্রত্যয় এবং ব্যাকরণগত নিয়মের ধারা ব্যাপকভাবে ভিন্ন। ক্রিয়া ও বিশেষ্যের ক্ষেত্রে সংস্কৃতের দ্বৈত সংখ্যা আছে, হিন্দুস্তানির কোনোটার বেলায়ই তা নেই। সংস্কৃতে ক্রিয়া পদের পুরুষ ও স্ত্রী, দুটিই লিঙ্গের ক্ষেত্রে একই রূপ, হিন্দুস্তানি ক্রিয়া পদগুলো আরবির মতো ভিন্ন ভিন্ন লিঙ্গের বেলায় আলাদা শব্দে শনাক্তযোগ্য। অমিলের ক্ষেত্রে এগুলোই তাদের প্রধান রূপরেখা, কিন্তু নির্দিষ্ট শব্দের নির্দিষ্ট অর্থের ক্ষেত্রে মূল উপলব্ধি, কথার প্রকাশ ও মেজাজের বাগধারাগত বাঁকে জোরালো পারিবারিক সাদৃশ্য লক্ষ করতে পারি আমরা।

হিন্দুস্তানি ভাষার বর্ণগুলোও হুবহু সংস্কৃত হরফের মতো, তবে কিছুটা রুক্ষ চেহারার; তবু বিভিন্ন যুগের খোদাই কর্মে মেলা গ্রিক হরফের সাদৃশ্যের চেয়ে বেশি নির্ভুল মিল তুলে ধরে।

বর্তমানকালে এ আদিম হিন্দুস্তানি ভাষা মোটেই এর খাঁটিত্ব বা সর্বজনীনতা বজায় রাখেনি, কেননা ধর্মের মতো আধুনিক ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভাষার ক্ষেত্রেও বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। এটা সুবিদিত জেন্তুরা যে একগুঁয়ে এবং অলঙ্ঘনীয় দুর্বোধ্যতায় তাদের বই, তাদের ধর্ম ধারণ করে, সেগুলোর মতোই সব রহস্য গোপন রেখেছে এবং তাদের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য আইনজ্ঞরা কেমন কঠোর নিষেধাজ্ঞায় সংস্কৃতের পাঠ কেবল তাদের নিজস্ব প্রধান গোত্রের ভেতরই সীমিত রেখেছে! জাতের কারণে এ বিদ্যার যোগ্য নয়, এমন কারো কাছে এর ব্যাখ্যা গুরু ও শিষ্য দুজনকেই ভয়ঙ্কর শাস্তির মুখোমুখি করতে পারে, কিন্তু আগন্তুকদের এর সামান্যতম বিদ্যা জানিয়ে কলুষিত করাটা সবচেয়ে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে চিরকাল এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আমাকে ভাষার সামান্য অংশ তালিম দেয়া পণ্ডিতও স্বজাতির গালমন্দ থেকে রেহাই পাননি; এবং স্বেচ্ছায় তার ব্যাকরণের নিয়ম-কানুন তুলে ধরলেও ব্যতিক্রমহীনভাবে তার ধর্মের একটি বিধানও খোলাসা করতে অস্বীকার করেছেন। এভাবে আমরা ধরে নিতে পারি যে, মোহামেডান হানাদাররা প্রথম ভারতে বসতি করার পর তাদের নতুন প্রজাদের সঙ্গে যোগাযোগের এক ধরনের মাধ্যমের প্রয়োজনে হিন্দুস্তানি ভাষা শিক্ষায় মনোযোগী হয়েছিল, জেন্তুদের দুর্ভেদ্য রক্ষণশীলতা দ্রুততার সঙ্গে এর অপেক্ষাকৃত দুর্বোধ্য সংস্কৃত পরিভাষা বোধের অতীত করে তুলেছিল। এই ভাষায় আনাড়ি বিদেশীরা বেশি করে তাদের নিজস্ব প্রকাশভঙ্গির আশ্রয় নিয়েছে। অবিরাম হাজির হতে থাকা নতুন নতুন অভিযাত্রীরা ভিনদেশী শব্দের অবিরাম ধারা বজায় রেখেছিল এবং বিজয় বা নীতিসীমানা বাড়িয়ে তোলায় বৈচিত্র্যময় বিষয়বস্তুর পরিমাণ ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছে। কিন্তু এসব পরিবর্তন কেবল শব্দকেই প্রভাবিত করেছে। আদি হিন্দুস্তানি ভাষার ব্যাকরণগত নিয়ম-কানুন এবং প্রত্যয় ও বিভক্তির প্রাচীন ধরন একই রয়ে গেছে। এবং আদিম বিশেষ্যগুলোর বর্জন বা বিনিময় ঘটলেও ক্রিয়া পদগুলো তাদের প্রত্যয় ও বিভক্তি এবং নিয়ম বজায় রেখেছে। এখনো আদিম রূপেই বজায় আছে সেগুলো; এবং এখন এ জটিল ভাষায় যারা সাবলীলভাবে কথা বলেন বলে মনে করেন, তারা খাঁটি ভারতীয় ক্রিয়া পদকে বেশি সংখ্যক ফার্সি ও আরবি বিশেষ্যের সঙ্গে মেশান। মুসলমান দরবারের সঙ্গে সম্পর্কিত কিংবা ওই সরকারের কোনো দপ্তরে নিয়োজিত এ ধরনের হিন্দুরা সাধারণত এসব সাহিত্যিক উদ্ভাবনের সাহায্যে তাদের মনিবদের সম্বোধন করত। কিন্তু ব্রাহ্মণ এবং যাদের অভিলাষ নীতিকে গ্রাস করেনি, এমনি অন্য সুশিক্ষিত জেন্তুরা এখনো তাদের আদিম ভাষাকে কিছুটা সচেতন গোঁয়ারতুমির সঙ্গে মানে এবং খাঁটি রূপে লেখা এই ভাষার বহু বই তাদের আছে, সম্ভবত পিলপের কাহিনী (এখন দুষ্প্রাপ্য) এগুলোর ভেতর সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল। সুরাত, গুজরাট এবং পশ্চিম উপকূলের অন্যান্য জায়গায় ব্যবসার কাজে এর প্রয়োগ চালু রেখেছে তারা; এবং বেঙ্গলের একেবারে প্রত্যন্ত এলাকা অবধি গোটা হিন্দুস্তানে তাদের যোগাযোগ চালু রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন সময়ে উচ্চভূমি থেকে পাড়ি জমানো এ ধর্মের বেশকিছু হেফাজতকারীর প্রচুর আনাগোনা। যে হরফে এটা লেখা হয়েছে, সব সংস্কৃত থেকে নেয়া হলেও আমাদের চালু হরফ আর ইতালিয়ান খোলা হাতের লেখার মতো মূল আদর্শ থেকে অনেকটাই সরে গেছে। বলা হয়ে থাকে, সাধারণ পরিভাষা নাগরীর অধীনে সাতটি ভিন্ন ভিন্ন ভারতীয় হাতের লেখার ভাণ্ডার রয়েছে, যাকে লেখা হিসেবে তর্জমা করা যেতে পারে; এবং অভিজাত সংস্কৃতকে দায়েব নাগরী বা অমরদের লেখনী বলা হয়, যা হয়তোবা অতীত কালের আরো সরল ও অমার্জিত নাগরীর পরিমার্জিত রূপ হয়ে থাকবে। তাগরী শব্দটি অনেক সময় নাগরীর শিথিল বা ভুল হরফ বোঝাতে ব্যবহার হয়, তবে আমি এ থেকে কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা খুঁজে পাইনি। পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোয় তুলে ধরা বেঙ্গল হরফগুলো একই জাতের আরেকটি শাখা, পরিমার্জিত সংস্কৃতের চেয়ে কম সুন্দর, তবে নাগরীর চেয়ে কম সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। বেঙ্গলের মতো আসামেও এগুলো ব্যবহার হয়, এবং সম্ভবত বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন লিখনরীতি হয়ে থাকবে। বাঙালি ব্রাহ্মণরা জাতীয় এ হরফে তাদের সব সংস্কৃৃত বইয়ের অনুলিপি তৈরি করেছে এবং নিজেদের পাঠের খাতিরে সব দায়েব নাগরী পাণ্ডুলিপি রূপান্তর করেছে।

আমাদের উল্লেখিত ভাষা মুরস উপরে বর্ণনা করা হিন্দুস্তানি ভাষার মিশেল জাত মুসলিম বিজয়ের কাছে ঋণী বলেছি। শিক্ষিত ফার্সি ও মোগল লেখকরা এ ভাষায় বেশকিছু কবিতা ও গদ্য রচনা করেছেন; প্রত্নসামগ্রী সংগ্রাহকদের লাইব্রেরিতে এখনো তা পাওয়া যায়। এগুলো সবসময়ই ফার্সি হরফে লেখা, যা কোনোভাবেই হিন্দুস্তানি স্বরবর্ণ বা নাসিকা ধ্বনির ব্যঞ্জন বর্ণ প্রকাশের লক্ষ্যে তৈরি করা হয়নি। নিম্ন শ্রেণীর মোহামেডানদের এ ভাষায় এবং নাগরী লিপিতে ধর্মীয় বিষয়ের ওপর কিছু বই আছে; খুচরো হিসাবের জন্য তাদের অনেকেই এটা ব্যবহার করে। ভারতে আসার পর মোহামেডান ভৃত্য কিংবা সিপাইদের সঙ্গে অতি প্রয়োজনীয় যোগাযোগে বাধ্য হওয়া ইউরোপীয়রা অভ্যাসবশত ওই ত্রুটিপূর্ণ ও সীমিত রূপেই ভাষাটি শেখে, যা তাদের গুরুদের অদক্ষ অবস্থারই পরিণাম; তবে শিক্ষার এ বিচিত্র পদ্ধতি ব্যাকরণ ও শব্দভাণ্ডার সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একাধিক প্রয়াসের সৃষ্টি করেছে। কিন্তু হিন্দুস্তান ও বেঙ্গলের গ্রামবাসী এবং কৃষকদের কাছে ভাষাটি দুর্বোধ্য প্রমাণিত হয় এবং বড় বড় মোহামেডান ও বহিরাগতদের আনাগোনা বিশিষ্ট শহর বাদে আর কোথাও চলেনি। একজন মেধাবী মিশনারি দীর্ঘদিন আগে লাতিনে এ ভাষা নিয়ে একটি পরিশ্রমসাপেক্ষ নিবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে তিনিই প্রথম এবং সম্ভবত একমাত্র লেখক হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন, কেননা পরবর্তীকালের রচনা উল্লেখের যোগ্যতা রাখে না।

উচ্চ ভারতের পক্ষে খাঁটি হিন্দুস্তানি যেমন, আমি এখানে যে ভাষার কথা ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছি, বেঙ্গলের কাছে সেটা তাই, প্রকাশ, নির্মাণ এবং চরিত্রগত দিক থেকে ঘনিষ্ঠভাবে সংস্কৃতের সঙ্গে সম্পর্কিত। সব পেশা ও গোত্রের হিন্দুদের ভেতর ব্যক্তিগত ও লিখিত যোগাযোগের একমাত্র উপায়। তাদের সব লাভ ও লেনদেন এ ভাষায় রাখা হয়; এবং সাধারণভাবে তাদের শিক্ষা পদ্ধতি অত্যন্ত সীমিত বলে অল্প কিছু ভিন্ন কোনো ভাষা লিখতে ও পড়তে পারে: অশিক্ষিতরা, গোটা জাতির প্রতি দশজনের ভেতর আটজন, মাতৃভাষার ব্যবহারেই সীমিত।

বিনিয়োগের গোটা ব্যবস্থাই প্রস্তুতি ও আইন-কানুনের প্রতিটি স্তরে দেশের ভাষায় পরিচালিত হওয়ায় বেঙ্গল দোভাষীদের জরুরি মাধ্যম ছাড়া ক্যালকাটার বোর্ড অব কমার্স এবং অধীন কয়েকটি কারখানার প্রধানরা ভারতে বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও দরকষাকষি করতে পারছেন না: যে ভাষায় আড়ংয়ের (বা প্রস্তুতকারী শহর), কোম্পানি রফতানি পণ্যের গুদাম, সব প্রস্তাব এবং এজেন্ট, বণিক, কন্ট্রাক্টর, তাঁতি, উইন্ডার, ব্লিচারদের সব হিসাব রাখা হয় এবং অবিরাম দাখিল করা হয়; আর যে ভাষায় গোমস্তা, আমীন এবং অন্য কর্মকর্তাদের কাছে পণ্য কেনা ও সংগ্রহের নির্দেশ তর্জমা করতেই হয়।

বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে এ ভাষার যতটা গুরুত্ব প্রতীয়মান হতে বাধ্য, তেমনি রাজস্ব বিভাগের ক্ষেত্রেও একে গ্রহণ করা কম লাভজনক হবে না। সরকার এবং নিকট নির্ভশীল এবং বর্গাদারদের ভেতর সব চুক্তি, ইজারা ও অন্যান্য দায়দেনা ফার্সি ভাষায় লেখা অব্যাহত থাকলেও জমির কৃষক ও আবাদিদের এবং পোত্তাহ নামে পরিচিতদের পরবর্তীতে অনুমোদন দেয়া ইজারা ও চুক্তিগুলো অবিরাম বাংলায় লেখা হচ্ছে। এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি জেন্তু জমিদার, কৃষক এবং অন্য ইজারাদাররা তাদের মুন্সীদের ফার্সি ভাষায় সরবরাহ করা নিজস্ব হিসাব ও আবেদনের একটি শব্দও পড়তে পারেন কিনা, তাতে সন্দেহ করার যথেষ্ট অবকাশ আছে।

রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নীতি মনোযোগের সমান অংশ দাবি করে; সাবেক স্বৈরাচারী আধিপত্যের অবশেষ এবং বর্তমান বিধিবিধানের উদার চেতনার ভেতর এখনো দোদুল্যমান একটি দেশে অসংখ্য বিধিনিষেধের নিগঢ়ে বন্দি দরিদ্র শ্রেণী প্রতিকারের জন্য দীর্ঘদিন ধরে আকুতি জানাচ্ছে। বেঙ্গলের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলার স্থানীয় আচরণ এবং রীতিনীতিতে অভিজ্ঞ ভদ্রলোকদের প্রধান কৃষক ও তার বর্গচাষীদের ভেতর সালিশি কাজের জন্য নিয়োগদানে সম্প্রতি এর প্রস্তাব করা হয়েছে; যাদের কাছে স্থানীয় গ্রামবাসী স্বেচ্ছাচারী ভূস্বামী বা কঠোর খাজনা আদায়কারীর অত্যাচারের ক্ষেত্রে সাধারণ আদালতের প্রচলিত বিলম্ব এবং নিয়মিত মামলা-মোকদ্দমার খরচ ও ঝামেলা থেকে মুক্ত থেকে অবিলম্বে কার্যকর প্রতিকার লাভ করবে। এ ধরনের ব্যবস্থা, আমাদের বিজয়ে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে, প্রশাসনের জনপ্রিয়তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি পরিশ্রমী ব্যক্তিকে তার আয়ের ক্ষেত্রে প্রায় মালিকানার সম্ভাবনা এবং তার পেশায় নিরাপত্তা, এবং সবচেয়ে কার্যকর প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে সম্ভবত ব্রিটিশ অঞ্চলকে হিন্দুস্তানের প্রতিটি অংশের নিরুত্সাহিত কৃষক, অবহেলিত কারিগর, এবং নির্যাতিত শ্রমিকদের পক্ষে আশ্রয়ে পরিণত করবে। কিন্তু এ গুরুত্বপূর্ণ কাজটি কেবল এর আগে বাংলার যথাযথ বিদ্যা শিক্ষা তাদের প্রতিটি জটিল হিসাবের পরীক্ষা এবং জবরদস্তি আদায় তদন্তের জন্য ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের যোগ্যতা আরোপের অনুপাতেই আরো দ্রুত ও ব্যাপকভাবে মঙ্গলকর হবে।

এর সঙ্গে যোগ করুন, নাজিম বা মোগল প্রশাসনের অধীনে এমন একটা দপ্তর বা রাজ্যে এমন কোনো বিচারের প্রাদেশিক অধীন আদালত নেই, যেখানে এ ভাষার দোভাষীকে অতি প্রয়োজনীয় মনে করে ফার্সি ভাষার মতোই অবিরাম নিয়োগ দেয়া হচ্ছে: গোটা দেশে কোনো সরকারি হুকুম জারি করতে হলে বা বড় বড় শহরে সেটা সাঁটানোর ক্ষেত্রে সবসময়ই বাংলা তরজমাসহই করতে হয়। সংক্ষেপে, সরকারের কাজে, রাজস্ব আদায়ে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে শক্তি, নিরপেক্ষতা ও গতির প্রয়োজন থাকলে, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত বিষয়-আশয়ের জন্য ফার্সির আলঙ্কারিক বাক্য ও নিয়ন্ত্রিতকাল থেকে এর সহজ-সরল, স্পষ্টতা ও নির্মাণের নিয়মের ক্ষেত্রে শ্রেয়তর নকশা করায় কেবল সাধারণ মানুষের ব্যবহূত এ ভাষার প্রতি সঠিক মনোযোগ দিয়েই নিশ্চিত করা সম্ভব।

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার ক্ষেত্রে ঝোঁক এর আরেকটি একক সুবিধা। সংখ্যা ও সেগুলোর ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলা পদ্ধতি ইউরোপে গৃহীত পদ্ধতির কাছাকাছি, বিন্যাস ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ফার্সি প্রতীকায়ন কৌশল এর চেয়ে বেশি আবশ্যিকভাবে দূরবর্তী হতে পারে না; ফলে যারা শেষেরটির সঙ্গে পরিচিত হবেন, তাদের একাধারে একটি নতুন গণিত ও ভাষা আয়ত্ত করতে হবে; এবং এ মাধ্যমে কোনো লেনদেন করতে হলে অবশ্যই ফার্সি হিসাবকে ইউরোপীয় রূপে রূপান্তর করার পরবর্তী ঝামেলা পোহাতে হবে; অথচ বেঙ্গলের সঙ্গে পরিচিতদের নির্ভুল একজন নকলকারী ছাড়া আর কিছুই লাগবে না।

বাংলা বর্ণমালার বিপুল সংখ্যা এবং সেগুলোর বিন্যাসের জটিল বৈচিত্র্য প্রথম দেখায় শিক্ষার্থীর চোখে হয়তো প্রায় অলঙ্ঘনীয় সমস্যা মনে হতে পারে। কিন্তু এটাই তার একমাত্র সমস্যা; কারণ ব্যাকরণ অংশ সহজ, যদিও বিক্ষিপ্ত এবং কোনো জটিলতা ছাড়াই পূর্ণাঙ্গ। এর নিয়মগুলো সাধারণ এবং সামঞ্জস্যহীনতা অল্প। সুতরাং অগ্রসর হওয়ার সময় আগাম পাঠের পেছনে সময় নষ্ট না করে এবং অযথা আরো অগ্রসর অধ্যায়ের দিকে নজর না দিয়ে প্রতিটি পদের বিস্তারিত জ্ঞান আয়ত্ত করতে চাইলে অচিরেই বাধা পেরুনোর দ্রুততায় বিস্ময় মানার কারণ তৈরি হবে।

এখানে পড়াশোনার বিশেষ কোনো পদ্ধতি সম্পর্কে মন্তব্য করা নিষ্প্রয়োজন, আরো যোগ্য হাতে সেটা সম্পন্ন হয়েছে। এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে যে, এ ব্যাকরণের জন্য আমি একটি সুস্পষ্ট নিয়মমালা বেছে নিয়েছি এবং আমার পক্ষে যত দূর সম্ভব সামগ্রিক বিন্যাস দিয়েছি। আমার সংগৃহীত পর্যবেক্ষণের বিপুল পরিমাণ এবং সংস্কৃতের অব্যাহত প্রয়োগের ফলে ক্রমাগত আবির্ভূত নতুন নতুন বিষয়বস্তুর কারণে অত্যন্ত পরিশ্রমসাপেক্ষ ছিল কাজটা, যে ভাষাটিকে আমি আমার ব্যাকরণ-সংক্রান্ত নীতিমালার পদ্ধতিতে সংযুক্ত করার প্রয়োজন মনে করেছি, যা হয়তো বাংলার ওপর প্রত্যক্ষ বা এমনকি সমান্তরাল আলোকপাত করতে পারে। আগ্রহী ও মেধাবীদের কাছে এটা সম্ভবত এ কাজের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীক অংশ; এবং তালিম দেবে বা বিশ্বাস জন্মাবে, এমন কিছুই বাদ দিতে চাইনি আমি। এ কারণে প্রতিটি নিয়মের ক্ষেত্রে উদাহরণ তুলে ধরার এবং সাধারণ ব্যাকরণের ক্ষেত্রে আমার পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনায় ভীষণ সতর্ক ছিলাম। আমি যে পথটুকু স্পষ্ট করতে চেয়েছি, সে পথে এর আগে কেউ চলেনি। এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে আমার নিজেরই পথ বের করে নেয়া এবং ভবিষ্যতের পর্যটকদের জন্য পথনির্দেশ স্থাপনও দরকার ছিল। এর আগে বাংলা নিয়ে গবেষণা করেছেন, এমন কয়েকজন ইউরোপীয়র ভ্রান্ত মতামত বাদ দেয়ার চেষ্টা করেছি; তাদের কেউই সংস্কৃতের সঙ্গে এ ভাষার সম্পর্ক খুঁজে পাননি; সুতরাং তাদের পদ্ধতিকে আমি ভুল বলে স্থির করেছি। কারণ আরবি ভাষা (মিস্টার জোন্স যেমন চমত্কার পর্যবেক্ষণ করেছেন) যদি ফার্সি ভাষার সঙ্গে এমন ওতপ্রোতভাবে মিশে গিয়ে থাকে যে, অন্য ভাষার মোটামুটি জ্ঞান ছাড়া ঠিকভাবে আলাদা করাই কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে এ দুটো ভাষার সম্মিলন আরো ঘনিষ্ঠ এবং আরো সাধারণ; এবং পরস্পরের সঙ্গে আদিম ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে আমরা আরো যথার্থভাবেই সংস্কৃতের একটা সাধারণ ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা ছাড়া বাংলা শেখার অসম্ভাব্যতার ওপর জোর দিতে পারি; আরবি বা ফার্সির সঙ্গে যাকে মেলানো যাবে না।

শিক্ষার্থী প্রথম নিয়ম সম্পর্কে কিছুটা নৈপুণ্য আয়ত্ত করার পর মিস্টার জোন্সের মতো এমন সঠিক ও বিস্তারিত নির্দেশনার চেয়ে অনুসরণ করার আর কিছু থাকে না। তিনি তার পার্সিয়ান গ্রামারের ভূমিকায় পড়াশোনার একটি সমীহযোগ্য পদ্ধতির অবতারণা করেছেন, তার নিজের সাফল্যের নজিরের ভেতর দিয়েই যার উপযুক্ততা যথার্থভাবে প্রমাণ হয়েছে। তাঁর পরিকল্পনা অনুসরণ করে স্থানীয়দের সঙ্গে কথোপকথন ও সংক্ষিপ্ত চিঠি বিনিময়ের পথ খুলে দেয়ার মতো ভাষাটি অচিরেই আয়ত্ত করা যাবে। এর পর জ্ঞানের পরিধির বৃদ্ধিটুকু পরিশ্রমের সমানুপাতিক হয়ে দাঁড়াবে।

এখানে এটা বলা বাহুল্য হবে না যে, খাঁটি বাংলার ব্যাকরণ রাজ্যের আধুনিক বুলি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা দিতে পারবে বলে আশা করা যাবে না। এর মোকাবেলা করা বহু রাজনৈতিক বিপ্লব এর ভাষার সরলতাকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে; এবং ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম, দেশ এবং আচরণের মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ যোগাযোগ বাঙালি কানে পরিচিত কিছু বিদেশী শব্দ যুক্ত করেছে। মোহামেডানরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব ধর্মের আচার বা নিজস্ব আইন এবং সরকারের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিভাষাই যোগ করেছে; পর্তুগিজরা ইউরোপীয় শিল্পকর্ম ও উদ্ভাবনের নাম জুগিয়েছে; আর প্রতিটি বিদেশী উপনিবেশের পরিবেশে স্থানীয় বাঙালির ভাষা তাদের সঙ্গে বসতি করা আগন্তুকদের বুলির সঙ্গে মিশে গেছে।

একই নিয়মের ভিত্তিতে ব্রিটিশ জাতির প্রভাব সাবেক বিজয়ীদের প্রভাব ছাপিয়ে যাওয়ায় ব্রিটিশ উেসর অনেক কিছুই বাংলা বুলিতে আত্মস্থ হয়ে গেছে। আইন-কানুন, রাজস্ব এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ধীরে ধীরে নতুনদের হাতে চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে, পুরনোকে বাতিল করে নতুন সম্প্রদায় অবশ্যই আবির্ভূত হবে। এ পর্যবেক্ষণের শক্তি যেসব জায়গায় ইন্ডিয়া কোম্পানির বৃহত্তর বিনিয়োগ জোগানো হয়েছে, যেখানে বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বিপুল সংখ্যক পরিভাষা সরাসরি ইংরেজি থেকে নেয়া হয়েছে, সেখানে বিশেষভাবে প্রমাণ হতে পারে। তো সব বিচারিক আদালতে ডিক্রি, আপিল, ওয়ারেন্ট, সমন এবং আরো অনেক শব্দ সংশ্লিষ্ট সমগ্র জনতা প্রয়োগ করছে ও বুঝতে পারছে।

পরবর্তী রচনা বাংলা ভাষাকে স্রেফ এর অভিভাবক সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত ভাষা হিসেবে তুলে ধরেছে। আমার পদ্ধতির ক্ষেত্রে আমি কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে দেশের স্থানীয় নয়, এমন শব্দগুলো এড়িয়ে গেছি; এবং সে কারণে আমার সব উদাহরণই সবচেয়ে খাঁটি এবং প্রাচীন রচনা থেকে সংগ্রহ করেছি। কিন্তু নিজেকে একজন নির্ভুল অনুবাদক হিসেবে আলাদা করতে চান, এমন সবাইকে আমি ফার্সি ও হিন্দুস্তানি ভাষার প্রতি কিছু পরিমাণ নজর দেয়ার পরামর্শ দেব, কেননা বর্তমান অশিক্ষিত প্রজন্মের হাতে পরিচালিত আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সব চিঠিপত্র, আবেদনপত্র এবং হিসাবে ধার করা বাগধারা বা চোরাই অভিব্যক্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখবেন তিনি। এখানে তার কোনো সুযোগ নেই বলে আমি আশা করি; এবং যারা ভারতের যেকোনো ভাষার মাধ্যমে উদাহরণ দিয়েছেন, তাদের কাজে বাদ সেধেছি বলে আমাকে অভিযুক্ত করা যাবে না, তো আমি আস্থার সঙ্গে নিশ্চিত করতে পারি যে, আমার গবেষণায় অতীতের কোনো লেখকে প্রভাবিত বা সহায়তা গ্রহণ করিনি। এ সংকলনের ভুল ও ত্রুটি সম্পূর্ণ আমার; তার পরিমাণ যত বেশিই হোক না কেন, আমি সেগুলোকে শোধরানো ও বর্জন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরলস প্রয়াস পেয়েছি; এবং যদি কৌতূহলী কারো সামান্যতম আগ্রহ তৈরি কিংবা উত্সাহী রুচি সন্তুষ্ট করার কারণ হতে পারি; আমি আশা করি, বিপরীত হারে আমাকেও তার সুযোগ দেয়া হবে।

পরবর্তী রচনায় তুলে ধরা অসাধারণ হরফগুলো বিপুলভাবে সাধারণের কৌতূহল উস্কে দেবে; এবং আমার প্রয়াস দৃষ্টি কাড়ার পক্ষে অনুপযুক্ত মনে হতে পারে হয়তো, কিন্তু খোদ এ বইটির সবসময়ই সম্ভবত এ পর্যন্ত দেখা যাওয়া শৈল্পিক ক্ষমতার একটি নজির ধারণের কারণে স্বকীয় একটা মূল্য থেকে যাবে। বাংলা হরফ অনুকরণ করা খুবই কঠিন, তবু যারা এগুলোর টানের জটিলতা, এবং বর্ণের অসম দৈর্ঘ্য ও আকার এবং সেগুলোর অবস্থান ও সমন্বয়ের বৈচিত্র্য যাচাই করবেন, তাদের কাছে অনায়াসে ধরা দেবে। পরিচিত এবং আগাগোড়া সমানুপাতিক আকারের এবং হরফের শুদ্ধতা ও পরিচ্ছন্নতার পক্ষে প্রয়োজনীয় সমরূপ নির্ভুলতার সঙ্গে একটি বর্ণমালা তৈরির লক্ষ্যে একজন লেখক সংগ্রহ করা সহজ ছিল না। মিস্টার জোন্স (এ ভাষায় ওয়াকিবহাল বলেই মনে করা হয় তাকে) লন্ডনের হরফ শিল্পীর সহায়তায় এর জন্য একসেট হরফ তৈরির প্রয়াস পেয়েছেন। কিন্তু তিনি এমনকি সহজতর অংশ বা প্রাথমিক বর্ণমালা তৈরিতেও ব্যর্থ হওয়ায়, যার নমুনা প্রকাশ করেছেন তিনি, এটা  ভাববার কোনো কারণ নেই যে, তার প্রকল্প শেষ হলে ভুলের স্বাভাবিক অবস্থার কোনো ধরনের উন্নতি হবে, যার নতুন নতুন উদ্ভাবন ক্রমাগত প্রকাশ হচ্ছে।

বাংলা হরফের একটা সেট গ্রহণের জন্য কয়েক বছর ধরে ইন্ডিয়া কোম্পানির সিভিল সার্ভিসে কর্মরত মিস্টার উইলকিন্সের প্রতি গভর্নর জেনারেলের পরামর্শ, এমনকি অনুরোধ এখনো বহাল আছে। তিনি সেটা করেছেন এবং তার সাফল্য প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেছে। ইউরোপীয় শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে বহু দূরের একটি দেশে মেটালারজিস্ট, খোদাই শিল্পী, ফাউন্ডার ও আঁকিয়েদের বিভিন্ন পেশাদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। উদ্ভাবনের বুদ্ধির পাশাপাশি ব্যক্তিগত শ্রম যোগ করতেও বাধ্য হয়েছেন। ইউরোপীয়দের কাছে অচেনা দ্রুততায় একটি কঠিন শিল্পকর্মের প্রাথমিক নিয়মের ক্ষেত্রে সব বাধা এবং সেসঙ্গে নিঃসঙ্গ গবেষণার সমস্যাগুলোও অতিক্রম করেছেন; এবং এভাবে একক হাতে প্রথম প্রয়াসেই নিজের প্রয়াস নির্ভুল চেহারায় তুলে ধরেছেন, দুনিয়ার সব জায়গায়ই যার জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রকল্পধারীর সম্মিলিত উন্নয়ন ও পরবর্তী যুগের ক্রমপরিমার্জনা দরকার হয়।

এ মুহূর্তে বেঙ্গলের বিভিন্ন পাট্টায় (বা পাতা), বন্ড এবং অন্যান্য লিখিত সম্পত্তির নিরাপত্তা; রওয়ানা ও দস্তকে, দেশীয় ভাষায় জারি করা বিভিন্ন ফরমান ও নোটিস, সেসঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন ও সুপ্রিম ও অন্যান্য নিম্ন আদালতের জারি করা বিভিন্ন প্রক্রিয়া, সমন এবং ডিক্রিতে নানা প্রতারণা ও জালিয়াতির ছড়াছড়ি সম্পর্কে ভারতীয় বিষয়-আশয়ের কর্তাব্যক্তিরা তাদের জানানো হোক চান না, যার সবই মিস্টার উইলকিন্সের মেধা প্রয়োগের প্রচুর সুযোগ জোগাবে।

এ শাখায় তার সাফল্য গ্রেট ব্রিটেনকে এরই মধ্যে এশীয় দাসত্ব থেকে রক্ষা করা একটি জাতির সামনে ইউরোপীয় সাহিত্যকে পরিচিত করিয়ে দেয়ার, ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি ও প্রাবল্য জুগিয়ে সম্পদের চলিষ্ণুতা বাড়ানোর এবং সুবিধা বণ্টন ও মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে সহযোগিতা করে সুশীল সমাজের অগ্রগতি বাড়ানোর ঢের বেশি জোরালো সুযোগ করে দিয়েছে।

রক্তের উচ্ছ্বাসের বদলে শিল্পকর্ম ও বিজ্ঞানের উদার যোগাযোগের ভেতর দিয়ে বিজয়ের অগ্রগতি চিহ্নিত করতে জাতির সাফল্য চিহ্নিত করতেই জাতির সুনাম আগ্রহী: নতুন প্রজারা যেন আনুগত্যের প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি সুবিধারও বোধ লাভ করতে পারে, নীতিমালা তা-ই চায়।

এই নিবন্ধটি আ গ্রামার অব বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ গ্রন্থে

হ্যালহেড ভূমিকা হিসেবে লিখেছিলেন

রূপান্তর: শওকত হোসেন

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>