| 20 এপ্রিল 2024
Categories
গীতরঙ্গ

বাউল গানের কাব্যসৌন্দর্য

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

বাউল গান বাঙালির প্রাণের গান। গানগুলো অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মানুষের রচনা। এসব সরল, বিশ্বাসপ্রবণ, ধর্মপথযাত্রী মানুষের রচনায় ভাবের পদবিন্যাস, ভাষার মার্জনা বা সচেতন অলঙ্করণের চেষ্টা নেই। তাদের ভাবানুভূতি নিরলঙ্কারণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে বউল গানের সৌন্দর্য। বাউল গানের মূল  বিষয়বস্তু একটি ধর্ম সাধনার ক্রিয়াকলাপ। বহুদিন ধরে এ বাউল গান ছিল অবহেলিত। রবীন্দ্রনাতসহ তার পরবর্তী কিছু গবেষক বিশেষ প্রযত্নে বাউল গান বাঙালির প্রাণের সাহিত্যের মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু বাউল গানের মূল বিষয়বস্তু একটি ধর্মতত্ত্ব, সেই ধর্মের সাধনভজন ও ক্রিয়াকলাপ, ফলে এর পরিধি সংকীর্ণ, সীমিত ও বৈচিত্র্যহীন। তবুও ধর্মতত্ত্বকে বুঝাতে বাউলরা যেটুকু ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছে সেটুকুই এর সাহিত্যমূল্য।

এটা সহজাত কবিত্বের অনুপ্রেরণায় ভাব যেভাবে ছন্দোবদ্ধ হয়েছে তাতে কৃত্রিমতার চিহ্ন নেই, এই অকৃত্রিমতাই বাউল গানের শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার।

বাঙালি সমাজের একটি ধর্ম সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাস, অধ্যাত্ম চিন্তা, জগৎ ও জীবন সম্বন্ধীয় মনোভাব নিতান্ত তাদের দৈনন্দিন জীবনাচরণের উপাদান, উপকরণ, উপমা, ভাষা, ছন্দ, রূপে বিনম্র সৌন্দর্যে ফুটে তার স্নিগ্ধ সৌরভ বিলাচ্ছে। এখানেই বাউল গানের শিল্পগুণ অনন্য মাত্রা পেয়েছে।

মনের মানুষকে চিনতে পারার হতাশা, গুরুর নিকট আত্মসম্মান, ভগবানের নিকট নিজের দৈন্য, সাধনভজনের অক্ষমতার জন্য নৈরাশ্য এ গানগুলোর উপজীব্য এবং এই ভাবানুভূতির মধ্যে যে কারুণ্য, যে মাধুর্য, প্রকাশভঙ্গির যে অকপট সারল্য, তাই বাউল গানের শিল্পমূল্য।

গুরু প্রসঙ্গে গানগুলোতে চিত্তের কাতরতার সহজ ও অকপট প্রকাশে একটি করুণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়-

(ক) পরম গুরু প্রেম-পিরীতি,

কাম-গুরু হয় নিজ পতি,

কাম ছাড়া প্রেম পাই কি গতি,

তাই ভাবে লালন।।

(খ) আমার দেহ জমি আবাদ হইল না

গুরুর বীজ বুনতে পারলাম না।

পরমাত্মার খোঁজে বাউলদের নিরন্তর যে ভাবনা তাঁর শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে-

(ক) আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।

আমার বাড়ীর কাছে আরশী নগর,

সেথায় এক পড়শী বসত করে।

(খ) দেহের মাঝে আছে যে সোনার মানুষ

ডাকলে কথা কয়।

আত্মজ্ঞান না থাকায় বাউলদের যে খেদোক্তি তা সরলভাবে প্রকাশ পেয়েছে-

(ক) আপনার আপনি যদি চেনা যায়

তবে তারে চিনতে পারি সেই পরিচিত।

(খ) লালন মরল জল পিপাসায়

থাকত নদী মেঘনা।

বাউলদের অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির বর্ণনার বিরল দৃষ্টান্ত-

(ক) রাম কি রহিম সে কোন জন,

মাটি কি পবন জল কি হুতাশন,

শুধাইলে তার অন্বেষণ

মূর্খ দেখে কেউ বলে না।।

(খ) কেউ মালা, কেউ তসবি গলায়,

তাইতে কি জাত ভিন্ন বলায়,

যাওয়া কিংবা আসার বেলায়

জাতের চিহ্ন বয় কার রে।।

বাউলেরা গ্রাম্য জীবনের দৈনন্দিন বিষয়গুলোর মাধ্যমে তাদের তত্ত্বকথা ব্যক্ত করেছেন যা শিল্পোত্তীর্ণ-

(ক) ধর্ম-মাছ ধরব বলে নামলাম জলে।

ভক্তি-জাল ছিঁড়ে গেল।

(খ) এমন চাষা বুদ্দি নাশা তুই

কেন দেখিল না আপনার ভুঁই।

উপমাঃ বাউলরা উপমা ব্যবহারে ঐতিহ্য গ্রাম্য অভিজ্ঞতা কাজে লাগালেও তাদের উপমা আধুনিকতায় ঋদ্ধ।

(ক) জলে যেমন চাঁদ দেখা যায়

ধরতে গেলে হাতে কে পায়,

(খ) সাঁই নিকট থেকে দূরে দেখায়,

যেমন কেশের আড়ে পাহাড় লুকায়

দেখ না।

দেহতত্ত্বে জটিলতা বাউলরা নানা উপমায় তুলে ধরেছেন-

(ক) অনুরাগের আড়া কর

আল্লার নামে খুঁটি গাড়

(খ) ছয় রিপুরে বশ করিয়ে

আল্লার নামের পেরাক দেও আঁটিয়ে।

ভজনসাধনের পদগুলোতে বাউলরা আত্মনিবেদিত। আত্মনিবেদনের ভাষা কোমল ও বেদনার্ত-

(ক) বিনা মাঙ্গায় কত ধন দিয়েছিলে মোরে।

এখন আর কোন ধন চাই না গুরু

চরণ দাও আমারে।

বাউলদের সাধনা কাম-কামনাবর্জিত নয, কামের কথা প্রকাশে তাদের বিষয়ানুগ-

(ক) বলব কি সে প্রেমের কথা

কাম হইল প্রেমের লতা

কাম ছাড়া প্রেম যথা তথা

নাইরে আগমন।

শব্দঃ বাউলরা তাদের তত্ত্বকথা বুঝাতে গ্রামীণ দৈনন্দিন জীবনের উপমা উপকরণ ব্যবহারে যেমন সহজ-সরল শব্দ ব্যবহার করেছে, তেমনি তত্ত্বকথা বুঝাতে কিছু প্রতীকধর্মী শব্দ ব্যবহার করেছে। তাছাড়া হিন্দু-মুসলিম ঐতিহ্য থেকে ব্যবহৃত হয়েছে শব্দ।

মুসলিম ঐতিহ্যঃ নিরঞ্জন, সাঁই, আসমান, ব্যঞ্জনা, সুন্নত, তসবি, মোকাম, নাসুত, লাহুত, মালকুত, বেদাতি।

হিন্দু ঐতিহ্যঃ রাম, হনুমান, গঙ্গা, হরি, বেদ, বেদান্ত, শ্মশান, তীর্য, বামন, পৈতা।

প্রতীকঃ পড়শী (পরমাত্মা), চাবি (গুরু), মোগ (ধর্মজ্ঞান), অচেনা (পরমাত্মা), অচিন পাখি (আত্মা), পাঁচ ভূত (বাহু)।

তৎসমঃ হস্ত, পদ, স্কন্ধ, নীর।

দেহ তাত্ত্বিকঃ দ্বিদল, পদন, ত্রিবেণী।

লোকজঃ গাজি, জেলে, দড়া, মিছরি, গুগলি, ঘোঙা।

রসঃ বাউলরা তাদের গানের মধ্য দিয় সাধনভজন করে মনের মানুষ তথা পরমাত্মাকে পেতে চায়। কিন্তু তাদের সাধনভজন যথার্থ হচ্ছে না এবং মানুষকে স্পর্শ করতে না পারায় তাদের সংগীতে বেদনার সুর উচ্চারিত, ফলে বাউল সংগীতে প্রধান রস করুণ রস।

ছন্দঃ বাউল সংগীত গ্রাম্য গায়কদের ভজন সংগীত হিসেবে এর ছন্দ সহজ-সরল এবং অন্তঃমিল প্রধান মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত।

বাউল সংগীতের শিল্পমূল্যের চেয়ে এর গুরুত্ব সাধারণ মানুষের গ্রহণযোগ্যতায়। তার ওপর যদি শিল্পমূল্য নির্ভর করে।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত