| 17 এপ্রিল 2024
Categories
গীতরঙ্গ

বাঙালী সংস্কৃতি এবং তার ঐতিহাসিক পর্যালোচনা

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

।। হাসনাইন ইমতিয়াজ সাকিব ।।

সাংস্কৃতিক অঞ্চল হিসেবে দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতিতে “বাঙালী সংস্কৃতি” এর প্রভাব অনবদ্য এবং খুবই শক্তিশালী। বাঙালী সংস্কৃতি শুধু মাত্র ইংরেজ শাসনামল কিংবা মুঘলকে ঘিরেই এক জায়গায় আবদ্ধ নয় কারণ সংস্কৃতির ধারণায় মিথস্ক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এবং সেই সাথে ঐতিহাসিক পর্যালোচনা সাপেক্ষে সেই বাঙালী সংস্কৃতির মানেই হলো যখন থেকেই বাঙালী জাতির জন্ম ঠিক সেই সময় থেকে তার জীবন নির্ধারণের জন্য এবং সার্বিক প্রয়োজনের সাপেক্ষে সে জাতি যা যা সৃষ্টি করে গিয়েছে নিজের জাতির জন্য, তাই হলো সম্পূর্ণ্রূপেই বাঙালী সংস্কৃতি। বর্তমান যুগে এই বাঙালী সংস্কৃতি কেউ কেউ বৈজ্ঞানিক নৃতত্ত্ব,কেউ জাতি তত্ত্ব,অধ্যাত্ন সম্পদের উপর নির্ভর করে নানান রকম তত্ত্বের সৃষ্টি করেন। পুরো ভারতজুড়ে বাঙালী শ্রেফ একটি আলাদা সত্ত্বার অধিকারী জাতি। সুতরাং সমগ্র ভারতীয় মহাসংস্কৃতি থেকে একটি অংশ বাঙালী সংস্কৃতি। পুরো ভারতের অংশকে তাই বয়কট করা সম্ভব নয় কারণ বাঙালী সংস্কৃতির ধারাকে বুঝতে হলে পুরো ভারতের সংস্কৃতিকেও বুঝাটা গুরুত্বপূর্ণ।  ভারতীয় সংস্কৃতির জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করলে বাঙালী সংস্কৃতিকে বুঝা সম্ভবপর হবে না।

সংস্কৃতি হলো সেই ধারণা যা নিজের ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে না, অতীতকে সে বর্তমানের মধ্যে বাঁচিয়ে রেখে এগিয়ে চলছে ।বাঙালী এই ধারাতে তার নিজস্বতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে তার নিজের ভাষার উৎপত্তির দরুণ ঠিক যেভাবে হিন্দি,মারাঠি,গুজরাটিরাও জাতি হিসেবে শক্তিশালী হয়েছিল তাদের স্ব স্ব ভাষার প্রভাবে। ভাষা হলো জাতীয়তাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যার ফলেই ভারতীয় সমগ্র সংস্কৃতি থেকে বাঙালী নিজেকে স্বতন্ত্রের জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছে।  এখানে মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোরও প্রভাব রয়েছে। কোনো জাতির সংস্কৃতি তার বিশিষ্ট মানসিক ভঙ্গিমার যেমন পরিচায়ক হয়ে উঠে ঠিক তেমনিভাবে বিশিষ্ট মানসিক ভঙ্গিমাও গড়ে ওঠে আবার সেই সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে। আবার এই মানসিক-ভঙ্গিমা ও সংস্কৃতিও (হতে পারে বস্তুগত এবং অবস্তুগত) আবার তাদের বিকাশের জন্য নির্ভর করে  সেই জনসমাজের আবাস ভূমি, তাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস,আর্থ সামাজিক পেক্ষাপট,জীবন পদ্ধতি। এই রূপগুলোর দরুণ “বাঙালী” হিসেবে সে নিজেকে অন্যের থেকে পৃথক করে নেয় এবং তা নিজস্বতার বলয়ে আবদ্ধ হয়ে একটি কমন চিন্তাধারাকে একবদ্ধ করে একটি “বাঙালী সংস্কৃতি” ভিত্তিক সমাজকে গড়ে তুলে। ঠিক এই ভাষাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি করে নিজস্ব সংস্কৃতি গুলোকে যা নিজস্ব পরিচয়ে বহনে সক্ষম করে তুলে। জাতি গঠনের বেলায় বাঙালী অন্যান্য ভারতীয় হিন্দি, মারাঠি বা গুজরাটি ভাষাভিত্তিক জাতিদের চেয়ে আলাদা, স্বতন্ত্র মতবাদ ভিত্তিক জাতিতে রূপান্তর হয়।

এক্ষেত্রে আমরা যদি লক্ষ্য করে থাকি তবে বিভিন্ন সূত্র হতে প্রাপ্ত ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে – বাঙালী সংস্কৃতির জন্ম এমন একটি সময়ে অবস্থিত যখন গুপ্তযুগ শেষ হয়েছে, পালযুগ চলছে ,সেনযুগ সামনে আসছে। এই সময়কালটি ধরতে গেলে  ৮০০ খ্রি.। এই যুগ শেষ হলে মধ্যযুগের সূত্রপাত বখতিয়ার খিলজির বাংলায় আক্রমণের সময়কালটাই ,তুর্ক বিজয়কাল অর্থাৎ ১২০৩ খ্রি.। এর পর থেকে শুরু মধ্য যুগ। মধ্য যুগ শেষে ১৮০০ থেকে ১৯৪০ এর সময়কালটি যা ইংরেজ শাসনামলের কাল। নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো সময়কালকে ঘিরেঃ

প্রাথমিক যুগ  (৮০০-১২০০ খ্রিঃ)

এ সময়কালটি বাঙালী সংস্কৃতির পূর্বকাল নামে পরিচিত এবং এই সময়কালের বৈশিষ্ঠ্য বিভিন্ন পন্ডিতদের সেই সময়কালের অনুশাসন থেকে পাওয়া যেত। সেই অনুশাসন প্রকৃত অর্থে রাজা অভিজাতদের,সাধারণ লোকদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত করতেন। আবার অনেক সংস্কৃত গ্রন্থে উচ্চবর্গের মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা, কল্পনা -ভাবনা, বিলাসিতা ও জীবনের আভাস ইত্যাদি তুলে ধরা হতো। আর নিম্নস্তরের কিংবা সাধারণ মানুষের ভাষা ও ভাবনাকে তুলে ধরেছে “চর্যাপদ” ও “দোহাকোষ” এর মতো গ্রন্থাবলী। আর এই পূর্ব ইতিহাসে বাঙালীর জীবনযাত্রা ছিল পুরোপুরি পল্লীভিত্তিক, কৃষিভিত্তিক। সেখানে জীবিকা সংগ্রহ করতো ডোম,জেলে, বাগদী,মাঝি ইত্যাদি। রাষ্ট্রে নতুন করে সৃষ্টি হয় এক সামন্তের অবস্থান। সামন্ত অর্থাৎ যেখানে জমির উপর কর্তৃত্ব আরোপ করে রাজাদের শাসন প্রভাব বিস্তৃত করার প্রক্রিয়া। আর সেই সময় এই প্রক্রিয়া সাধন হয় ব্রাক্ষণদের জমি দানের মাধ্যমে। সেই সময়কালেই আবার বণিকশ্রেণীর জন্ম হওয়া শুরু করে ফলে তার একটি সংঘর্ষের সৃষ্টি করে রাজা-ব্রাক্ষণ বনাম বণিক শ্রেণী। সেন রাজার আমলে থাকাকালীন কৌলিন্য প্রথা চাপিয়ে দেবার মাধ্যমে অত্যাচার পাকাপোক্ত করেছে বণিকদের উপর, সেন রাজার বিরোধী জাতিদের রাখলেন দমিয়ে এবং চাপের মুখে। এ সময়কালের শেষের দিকে হরেক রকমের উচ্ছৃঙ্খলতা ও অকর্মণ্যতার কাহিনি সৃষ্টি হওয়া শুরু করে। সামন্ত প্রভু বনাম বণিক শ্রেণীর এই সম্পর্ক গড়ন  ও ভঙ্গন ইত্যাদির ক্রমাগত ধারা বইতেই থাকে। মার্ক্সীর ধারণায় আমরা দেখতে পাই এই সম্পর্ক নির্ভর করে উৎপাদন সম্পর্কের উপরে। ঠিক এই উৎপাদন সম্পর্কের বিশাল সংঘর্ষ সেই সময় রাজাকে ভাবতে বাধ্য করিয়েছে তার ক্ষমতায়নের বিষয়টিকে, বণিক শ্রেণীর জন্ম হলে অত্যাধিক তা রাজার ক্ষমতার সময়কালকে আরো নিম্নবেগে গতিশীল করে দিবে। এই মর্মে তাদের মধ্যে একটি দা কুমড়ার সম্পর্ক তৎকালীন সময়ে স্থাপিত হওয়া শুরু করে।

লোকাচারের দ্বারা সেই সময়ে একটি সংস্কৃতি গত ধারণা পাওয়া যায় যেমন – ব্রত,পার্বণ ,নাশ ইত্যাদি। সমাজের ভিতরে আজও এসবের প্রচলন আছে তবুও তা সংখ্যায় প্রচুর কম।

মধ্যযুগ

প্রথম পর্ব – ১২০০ থেকে ১৪০০ খ্রিঃ

এই যুগের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক বাস্তবতা যে সকল গ্রন্থ তুলে ধরেছে তা হলো সংস্কৃত শাস্ত্র,কুলজী গ্রন্থ,জয়দেবের কবিতা সহ অন্যান্য কবিতাগুলোতেও। এই যুগে রাষ্ট্রীয় চিত্র তুলে ধরতে সহায়তা করে “সেখ শুভোদিয়ার” ও “শূণ্যপুরাণ” এর মতো বইগুলো। এই যুগের অন্যতম নিদর্শন “শ্রীকৃষ্ণকীর্তন”। তুর্কি বিপ্লবের পরবর্তীতে সামাজিক বিপর্যয় ঘটলেও বনিয়াদ শ্রেণী তখনও অটল ছিল।

দ্বিতীয় পর্ব – ১৪০০ থেকে ১৬০০ খ্রিঃ

এই সময়কালে সামন্ত বাংলার একটি চিত্র ফুটে উঠে জোরদার ভাবে। তাও আমরা পাঠান রাজত্ব ও বারো ভুইয়ার কালে দেখতে পাই। এই যুগে বাংলা সাহিত্যের ধারকার সূত্রপাত ঘটতে থাকে আস্তে আস্তে এবং মোটামুটি অনেক রাজসভায় সাহিত্য নির্ভর সংস্কৃতির জাগরণের সৃষ্টি হয়। হুসেন শাহের দরবারে, পরাগল খাঁ ,রোসাঙ্গের রাজসভায়। মুসলিম ও হিন্দু সমভাবেই বাঙলা কাব্যরসে তখন আনন্দিত। অপরপক্ষে নবদ্বীপে প্রতিষ্ঠা হয় নৈয়াকিকদের। বৈষ্ণবযুগের প্রসার চলতে থাকে এই সময়কালে। বিষ্ণুপুরের রাজসভা হয়ে উঠে বৈষ্ণব ধর্মের প্রধান কেন্দ্র। এই যুগে সাহিত্য,শিল্পকলা, সংস্কৃতির প্রবাহ ইত্যাদি জোরদার চলতে থাকে।

তৃতীয় পর্ব – ১৬৫০ থেকে ১৮০০ খ্রিঃ

মোঘলের বিজয়ের দ্বারা এই সময়কালের সূত্রপাত ঘটে। ভারতের সর্বঅঙ্গের সাথে বাংলার যোগাযোগ আরো বৃদ্ধি পায়। টোডরমলের জমানা ধরে নতুন করে সামন্ত সৃষ্টি হলো। কেননা ঠিক এই সময়কালে আস্তে আস্তে বিদেশী বণিক শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটা শুরু করে।  অর্থাৎ কলোনিয়াল কালচার এর সাথে নিজস্ব কালচারের একটি মিশ্রণের ধারার সূত্রপাত ঘটা শুরু করে।  এই দেশ বিদেশ বাণিজ্য প্রসারের ফলে সওদাগর শ্রেণির প্রভাব বাড়তে শুরু করে,পুরোনো গন্ডি ভাঙতে থাকে। দরবারি সভ্যতার বিকাশ দেখা যায় মুর্শিদাবাদ ভিত্তিক এবং বর্গীদের হাঙ্গামার দরুণ সামন্তের মাঝে একটি ফাটলের সৃষ্টি হওয়া শুরু করে। বিষ্ণুপুর হারিয়ে যেতে শুরু করে কিন্তু নাটোরের বর্ধমান জেগে রয়।  ঠিক এই যুগেই রামায়ণ,মহাভারত প্রভৃতি পৌরাণিক কাব্য,মঙ্গলকাব্য,বৈষ্ণব সাহিত্য -পদাবলী,জীবনী কাব্য,রসশাস্ত্র,কীর্তন ও সংগীতকলার যথেষ্ট অনুশীলন চলে। উচ্চশ্রেণির মানুষদের মধ্যে সেই সময় অধিকাংশই ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের, কিছু সংখ্যক মুসলমান ছিলেন যেমন আলাওল,দৌলত কাজী প্রভৃতি। এই সময় উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের প্রকোপ বাড়ার সাথে সাথে শহরের চাহিদার সৃষ্টি হয়। শহরের সৃষ্টি যতো দ্রুত হয় ততোই কারুশিল্পের প্রচলন ঘটতে থাকে এবং সেই হিসেবে টোডরমলের নতুন জায়গাদারী ও ভূমি ব্যবস্থার নীতি প্রবর্তিত হয়। এই ধারায় নতুন নতুন সংস্কৃতির সৃষ্টি হয় যা এখনও অক্ষুণ্ণ অবস্থায় রয়েছে যেমন পূজা পার্বণ, মেলা,বাইচ,দৌড় ব্রত। উচ্চকোটির সৃষ্টির প্রভাব এসে ঠেকে মূল ধারার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি গুলোর উপর  যা হারিয়ে যাবার উপক্রম ছিল প্রায়ই। এই সংস্কৃতিহুলো লোকসংস্কৃতি নামে পরিচিত।। উচ্চকোটির এই ইংরেজ মিথস্ক্রিয়ার ফলে তাদের মধ্যে কলোনিয়াল কালচারের একটি প্রভাব ঢুকে পড়ে এবং শহরায়নের দরুণ উৎপাদন সম্পর্কও ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে থাকে। তবুও এই যুগে এই লোকসংস্কৃতি গুলো টিকে ছিল শুধু মাত্র গ্রামীণ বা সাধারণ জনগণের মধ্যখানে। যেমন অপুর্ব “ময়মনসিংহ গীতিকা”। এই সময়ে নতুন করে সৃষ্টি হয় পারস্য ভিত্তিক সাহিত্য, জিন হুর পরি ভিত্তিক উপন্যাস। বৈষ্ণব কীর্তন ছাড়াও আউল বাউল সহজিয়া প্রভৃতি ধারার গান, দেহতত্ত্বের গান, সূফীদের প্রাণাবেগ ও সাধনায় প্রদীপ্ত মর্সিয়া ও মারফতি গান।  সাধারণ মানুষের মুখে ফুটে উঠতো জারি ,সারি,ভাটিয়ালী,বেদে গান,আগমনী,নবমী,বিয়ের গান।

আধুনিক যুগের এই সময়তেও এই লোকসংস্কৃতির ধারাগুলো অক্ষত রয়েছে। ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে বিদেশী ভাবের পরেও পোড়ামাটির পুতুল,পাথরের মূর্তি,হাতির দাতের কাজ,শাখার কাজ,কোলার কাজ,কাথের পুতুল,মাটির পুতুলের প্রচলন আছে। সোনা রূপার নানা কাজ,নকশী তোলা,মীনার কাজও রয়েছে। কাসা পিতলের বাসন কোসন টিকে আছে এলুমিনিয়ামের যুগেও। শাক,শুকান্তি,ছানার মিষ্টান্ন টিকে আছে,রসগোল্লা ও সন্দেশ প্রভৃতি বানগালী কালচারের বাহন হিসেবেই খ্যাত। রেশমের কাজ হারিয়ে গেলেও ঢাকা,টাঙ্গাইল, ফরাস ডাঙ্গা প্রভৃতিতে বস্ত্রশিল্পের আদি ধারণা গুলোও এখনও প্রচলিত। আচার অনুষ্ঠানে বিবাহ শ্রাদ্ধ, ভাইফোটা,জামাই ষষ্ঠী,নবান্ন, নতুন হাল খাতা, কিংবা মহররম,ইদ,শাহ মাদারের উৎসব অক্ষত। আলপনা কাথা সেলাই বেঁচে আছে এখনও। লাঠি খেলা,কালিকাছের নাচ, রাইবেশের নাচও অচল হয়নি।

এই হারিয়ে যাবার পেছনে নতুন এক বাঙালী সংস্কৃতি দায়ী যাদের উদ্ভব ইংরেজ আমলে অর্থাৎ কলোনিয়াল কন্সেপেটের মিথস্ক্রিয়ার আদলে গঠিত নব্য বাঙালী সংস্কৃতির ধারণা। এই ধারণায় উচ্চকোটির শ্রেণীর লোকজনের সাহিত্য ও সংস্কৃতি থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয় নিম্নকোটির থেকে কারণ তখন শিক্ষা,অর্থ গত ধারণায় এই উচ্চকোটির লিপ্ত ছিল যা ইংরেজদের সফলতার মূল চাবিকাঠি। এই সময়ে অনেক মধ্যবিত্তের সৃষ্টি হয়, সৃষ্টি হয় বাবু চাকরের কালচার। মধ্যস্বত্বভোগীরা ইংরেজ অর্থনীতির ছায়াতলে বসবাস শুরু করে যার ফলে তাদের সংস্কৃতিতে একটি বিশাল ইংরেজ ছাপ পড়তে থাকে। এই ছাপ পড়বার দরুণ সাধারণ “লোকসংস্কৃতি” হতে উচ্চকোটি বা মধ্যবিত্ত্ নিজেদের গুটিয়ে ফেলে। অর্থাৎ আজও পর্যন্ত যদি এই লোকসংস্কৃতি টিকে থাকে তবে তার পুরো কৃতিত্ব হলো সাধারণ মানুষ, পল্লীসমাজ ভিত্তিক, কৃষিভিত্তিক সমাজের লোকেদের কারণে। শহরায়ণ যা ইংরেজ দের উন্নয়নের ধারণার মূল পরিকল্পনা এবং সেই সাথে ইংরেজ দর্শন সৃষ্টি করার একটা সহজতর পন্থা সুতরাং শহরায়ণের ফলে মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে ও ইংরেজ ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি এই শ্রেণি ঝুকতে শুরু করে। 

  

আধুনিক যুগ- ১৮০০ থেকে ১৯৪০ খ্রিঃ

এই যুগটাতে প্রবেশ করবার সাথে সাথেই রেনেসাঁ এর একটি প্রভাব সংস্কৃতিতে বিরাজমান হয়। রেনেসাঁ এর অর্থ যদি জাগরণ হয় তবে বাঙালী সংস্কৃতিতে রেনেসাঁ আসলো নতুন করে ভাবনা চিন্তা ও পরিবর্তনের জাগরণের আভাস নিয়ে। এর মাধ্যমে ভারতে খুজে পাবার এবং অতীতকে আবিষ্কার করার একতা চাবিকাঠির সৃষ্টি হয়েছে। এই বাঙালীর জাগরণের আসল প্রেরণা এসেছে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির কারণে। ১৮০০ থেকে ১৮৪০ সালের দিকে এই জাগরণের একটি নব উদয় হয়, রাজা রামমোহন রায়। ধর্ম সংস্কার,রাজনৈতিক সংস্কার,সমাজসংস্কারের একটি ইঙ্গিত বয়ে আনেন। ডেভিড হেয়ারের শিক্ষা দান নীতি,ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠা এবং সেই সাথে বাংলা সাহিত্যে নতুন গদ্যের বিকাশ যেন মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ওয়েলেসলি-ডালহৌসির আমলে সামন্ত ব্যব্বস্থা ভাঙ্গে আর রেল,টেলিগ্রাফ প্রভৃতির সৃষ্টিতে বাস্তব ভিত্তির রচনা হয়। এই সময়তেই ঘটে যায় সংস্কারের জন্য সিপাহী বিদ্রোহ ও সামন্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টির সাথে সাথে জ্ঞান চর্চার একটি মাধ্যমের সৃষ্টি হয় যা জনগণকে নতুন আলোর পথ বাতলে দিতে সহায়তা করে। এই রেনেসাঁর মধ্যে প্রবেশ করে মাইকেল মধুসূদন ও দীনবন্ধু মিত্রের কাব্য প্রতিমা। রাজনৈতিক চেতনার আদলে গঠিত হওয়া শুরু করলো জাতীয়তাবাদের ধারণা এবং পাশ্চাত্য সংস্কারী মনোভাব যেন সমাজ,রাজনীতি,অর্থনীতিতে প্রখরভাবে ছড়িয়ে পড়লো। নতুন ধরনের সংগীত কলার আবিষ্কার ঘটে রবীন্দ্রনাথ এবং কাজী নজরুলের হাত ধরে। নতুন ভারতীয় চিত্রকলার জন্ম এবং বাঙালী রেনেসাঁয় আর্ট কালচারের নির্ধারক গোষ্ঠীর জন্ম যেমন যামিনী রায়, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।বিজ্ঞানী হিসেবে জগদীশ চন্দ্র বসু, চিকিৎসা শাস্ত্রে ডা ব্রম্মচারী, অর্থনীতিতে রমেশ চন্দ্র, ইতিহাসে রাজেন্দ্রলাল মিত্র, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী । এই সময়েই উদারনৈতিক সংস্কারবাদী যাদের মধ্যে প্রধানত যুক্তিবাদ,দর্শন, সাহিত্যের জ্ঞান প্রবেশ করে তাদের দ্বারা একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে জাতীয়বাদ রক্ষার স্বার্থে।  “জাতীয় গৌরব” নামক কন্সেপ্টের জন্য দেবেন্দ্রনাথ,অরবিন্দ,স্বামী বিবেকানন্দ প্রভৃতি মানুষজনদের অবদান ছিল অসামান্য।  এই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন মনস্তাত্ত্বিক ভাবে আমাদের বয়ে নিয়ে চলে আধুনিকতার এক চূড়ান্ত ধারায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত