| 5 মার্চ 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অসমিয়া অনুবাদ উপন্যাস: অর্থ (পর্ব-১০) । ধ্রুবজ্যোতি বরা

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

ডক্টর ধ্রুবজ্যোতি বরা পেশায়  চিকিৎসক,অসমিয়া সাহিত্যের একজন স্বনামধন্য লেখক ২৭ নভেম্বর ১৯৫৫ সনে শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন ।শ্রীবরা ছাত্র জীবনে অসম্ভব মেধাবী ছাত্র ছিলেন ।’কালান্তরর গদ্য’ ,’তেজর এন্ধার‘আরু’অর্থ’এই ত্রয়ী উপন্যাসের লেখক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। ২০০৯ সনে ‘ কথা রত্নাকর’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্য আকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বাকি উপন্যাসগুলি ‘ভোক’,’লোহা’,’যাত্রিক আরু অন্যান্য’ ইত্যাদি।ইতিহাস বিষয়ক মূল‍্যবান বই ‘রুশমহাবিপ্লব’দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ’,’ফরাসি বিপ্লব’,’মোয়ামরীয়া বিদ্রোহ’।শ্রীবরার গল্প উপন্যাস হিন্দি, ইংরেজি, বাংলা, মালয়ালাম এবং বড়ো ভাষায় অনূদিত হয়েছে।আকাডেমিক রিসার্চ জার্নাল’যাত্রা’র সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন ।’ কালান্তরর গদ্য’ উপন্যাসের জন্য ২০০১ সনে অসম সাহিত্য সভার ‘ আম্বিকাগিরি রায়চৌধুরি’ পুরস্কার লাভ করেন।শ্রীবরা অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি।


অনুবাদকের কথা

কালান্তর ট্রিলজির তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস হল’অর্থ’। সশস্ত্র হিংসার পটভূমি এবং ফলশ্রুতিতে সমাজ জীবনের দ্রুত অবক্ষয়ের মধ্যে বেঁচে থাকার তাড়না এবং বেঁচে থাকার পথ অন্বেষণেই আলোচ্য উপন্যাসের কাহিনী ভাগ গড়ে তুলেছে। সম্পূর্ণ পৃথক একটি দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে অসমের মানুষ কাটিয়ে আসা এক অস্থির সময়ের ছবি আঁকার চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষের অন্বেষণ চিরন্তন এবং সেই জন্যই লেখক মানুষ– কেবল মানুষের উপর আস্থা স্থাপন করতে পারে।

এবার উপন্যাসটির বাংলা অনুবাদ নিয়ে এলাম।আশা করি ইরাবতীর পাঠকেরা এই ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত অসাধারণ উপন্যাসটিকে সাদরে বরণ করে নেবে ।নমস্কার।

বাসুদেব দাস,কলকাতা।


সে বিরাট অবাক হল মা-বাবার ,বিশেষ করে বাবার প্রতিক্রিয়ায়।

মেসোর দাদার মত্যুর খবর করে এসে মা-বাবা সন্ধ্যেবেলা বাড়িতে প্রবেশ করার পরে মা চা বানিয়েছিল।

‘এতক্ষণ পর্যন্ত এক কাপ চা খাবার সুযোগ পাই নি,মানুষের মৃত্যু হওয়া বাড়িতে আর চা কোথায় পাবি?অণ্ঠ –কণ্ঠশুকিয়ে গেছে।’

মা রাস্তায় মারোয়ারি মিষ্টির দোকান থেকে গরম গরম কচুরি কিনে এনেছিল।সে কচুরি খেতে খুব ভালোবাসে।বিশেষ করে সেই দোকানের কচুরি।

হিঙের চাটনি দেওয়া।রসগোল্লার রস আর তেঁতুল জলে বানানো চাটনি দিয়ে গরম কচুরি আর চা খাওয়ার সময় শ্রীমান রমেন আসার কথাটা উত্থাপন করল।

‘তোর সেই বিজনেস করা লাফাঙ্গাবন্ধুটা?’

বাবা এক কামড় বসানো কচুরিটার পেটে চামচ দিয়ে এক চামচ চাটনি ঢোকাতে ঢোকাতে বলল ‘সে নিশ্চয় স্মাগলিং করে।শিলিগুড়ির দিকে কোথায় যেন যায় সে?’

বাবার কথাগুলি ভালোই মনে আছে!শ্রীমান অবাক হল।

‘সেইসব ছেলেদের কাছ থেকে সাবধানে থাকবি’,মা তার দিকে আরও একটি কচুরি এগিয়ে দিয়ে বলল।

‘সঙ্গ দোষ মহা দোষ’,চাটনি ভরতি কচুরিটাতে এক কামড় বসিয়ে বাবা একটা মন্তব্য করল।তারপরে বেশি করে চিনি দেওয়া মিষ্টি চায়ে শব্দ করে তিনি একটা চুমুক দিলেন।

‘রমেন একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছে’,শ্রীমান বলল।

‘হেঃহেঃহেঃ,একসঙ্গে স্মাগলিং করার নাকি?বাবা মজা করল।

‘না ,পানবাজারের মাটির টুকরাটার।’

‘কি?পানবাজারের কিসের?’বাবা কচুরিতে কামড় দেবার উদ্যোগ নিতে গিয়ে থেমে গেল।

‘মাটির টুকরাটার’,শ্রীমান বলল।সে এবার রমেনের সম্পূর্ণ প্রস্তাবটা মা-বাবাকে খুলে বলল।

বাবা কচুরির টুকরো প্লেটে রেখে দিয়ে সোজা হয়ে বসল।কচুরির পেট থেকে চাটনিটা বেরিয়ে প্লেটে বয়ে গেল।

‘ও কী বলেছে ভালো করে বলতো’,বাবা বলল।‘কোনো কিছুই বাদ দিবি না।প্রতিটিডিটেইল,প্রতিটিডিটেইলই বর ইম্পপর্টেন্ট।’

‘কথা আমি যতটুকু বলেছি।অন্য কিছু নেই।পুরোটাই বলেছি।’

‘আবার বলতো।কিছু ভুলে যেতে পারিস।তুই কথায় মন দিস না।’

উপায় না পেয়ে শ্রীমান পুরো কথাগুলি আবার বলল।মা-বাবা একেবারে নীরব হয়ে মনোযোগের সঙ্গে শুনল।শোনার শেষে বাবা প্রশ্ন করল।

‘কিন্তু ভাড়াটিয়া কীভাবে উঠাবে বলেছে?

‘ভয় দেখিয়ে।সঙ্গের ছেলে এনে বন্দুক-টন্দুক দেখিয়ে ভয় খাওয়াবে।আর সঙ্গে মার্কেটের দুটো রুমওদেরকে ন্যায্য দামে কিনে নেওয়ার অফার দেবে…’

‘এক্সেলেন্ট’,বাবা হঠাৎ খাবার টেবিলে সজোরে চাপড় মেরে বসল।টেবিলের কাপ-প্লেটগুলি ঝনঝন করে উঠল।তাঁর সামনে থাকা প্লেটটা থেকে আধা খাওয়া কচুরির টুকরো চাপড়ের চোটে লাফ মেরে প্লেট থেকে টেবিলে এসে পড়ল।তার মাঝখান থেকে জলীয়চাটনিটা টেবিলের ওপর দিয়ে বয়ে গেল।

‘এক্সেলেন্ট’,বাবা পুনরায় সজোরে বলে উঠল।শ্রীমান চমকে উঠল।

‘কাপ-প্লেট ভাঙবেনা’,বাবা পুনরায় টেবিলে চাপরমারবে বলে মা হাত তুলে বলে উঠল।

‘এক্সেলেন্ট।এতদিন ধরে আমি এরকমই কিছু একটা চাইছিলাম।’বাবা বলে উঠল।‘এবার আমি ভাড়াটিয়া বেটাদের দেখাব-আমি ওদের বাবার বিয়ে দেখিয়ে দেব।কবেআসবে।তোর বন্ধু রমেনকখন আসবে?’

‘ঠিক।এতদিন কোর্টে কেস দিয়ে দিয়েওরা আমাদের ঠগিয়েএসেছে।এবারওদের একটা ভালো শিক্ষা দেওয়া যাবে।আর সেখানে একটা মার্কেট হলেও ভালো চলবে।’মাবলল।‘কবে আসবে বলেছে রমেন?’

‘সে শিলিগুড়ি গিয়েছে।দুই-একদিন ঘুরে আসার কথা।’

‘দলিল-পত্র সব ঠিক আছে।ক্লিয়ারটাইটেল।কোনো অসুবিধা নেই।ভাড়াটিয়া বেটাদের সঙ্গে একটা ফয়সালা হয়ে গেলেই আরম্ভ করে দিতে পারা যাবে।আমি সব দলিলের কপি করে রাখব।আরতুই,তুই খোঁজ খবর নে তো-এই রমেন আর কী কী কার কার এই ধরনের কাজ করেছে,কতটাসাকসেসফুলহয়েছে,তার নাম কী ধরনের আর মালিক মেক্সিমাম কত এলাকা পায়।আমিও খবর নেব।তুই ও খবর করবি।’


আরো পড়ুন: অর্থ (পর্ব-৯) । ধ্রুবজ্যোতি বরা


‘সব কথা জেনে নেওয়া ভালো’,মা বলল।

‘যদি ভাড়াটিয়ারা বেশি অসুবিধা করে,তাহলেরমেনের সঙ্গের ছেলেগুলির মাধ্যমে ওদের একদিন উঠিয়ে নিয়ে ভালোভাবে দুয়েক ঘা দিলেই কাজ হয়ে যাবে’,বাবা বলল।

শ্রীমান চায়ের কাপে চুমুক মারার জন্য গিয়ে চমকে উঠল।

কাকে উঠানোর কথা বলছে বাবা!ভাড়াটিয়াগুলিকে?গুণ্ডালাগিয়েউঠিয়ে নিয়ে মারপিট করে ভয় দেখানোর কথা হয়েছে।এভাবেউঠিয়ে নিয়ে… তার হঠাৎবালিরখাদানের গর্তে থাকা মানুষটার কথা মনে পড়ে গেল।সে যেন এবার ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠল।সে খাবার টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল।

‘দাঁড়া,কোথায় যাস’,বাবা ডাকল।‘রমেন কখন আসবে?তুই কাল সকালবেলা একবার ওদের বাড়িতে যা তো।কে জানে হয়তো সে এসেছেই।তাকে পেলে সোজা আমার কাছে নিয়ে আসবি।এবার খেলা জমবে।’

শ্রীমান দরজার কাছে দাঁড়াল।

সে ফিরে মা-বাবার দিকে তাকাল।

মায়ের চোখে এক অজানা উৎফুল্লতার ভাব এবং বাবা-বাবার মুখটা এত উজ্জ্বল হয়ে পড়েছে,এত জ্বলজ্বল করছে যে তার অশালীন অশালীন বলে মনে হতে লাগল।

‘পান বাজারের মাটিটুকু সম্পর্কে রমেন যদি সত্যিই সিরিয়াস,তাহলে সে নিজেই আবার আসবে’,শ্রীমান গভীরভাবে বলল।‘আমরা তার খবর না করাই ভালো।সে বিজনেস করে।তার খোঁজ খবর করলে আমাদের কাছ থেকে বেশি সুযোগ সুবিধা চাইতে পারে।সে এলেও বরং প্রথমেই আমাদের খুব একটা উৎসাহ দেখানো ঠিক হবে না।তার মুখ থেকে কথাগুলি কেবল শুনে নিতে হবে।’

কথাটা বলে শ্রীমান কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। বাবার মুখটা যেন অধোবদন হয়ে গেল।একটা ছোটো বাচ্চাকে লজেন্স দেখিয়ে না দিলে মুখের যে অবস্থা হয় বাবার মুখটাও সেরকম হয়েছে।

শ্রীমানের কথার যুক্তিটাও তিনি অস্বীকার করতে পারছেন না।

‘বাবাই ঠিকই বলেছে।আমরা প্রথমেই বেশি আগ্রহ দেখানোটা ঠিক হবে না।’মা তাকে সমর্থন করে বলল।

বাবাও মাথা নাড়তে বাধ্য হল।‘আচ্ছা,তুই খোঁজ খবর নে।’তিনিদুর্বলভাবেশ্রীমানকে বললেন।

সন্ধে নেমে এসেছিল।

চারপাশে বিদ্যুতের বাতিগুলি জ্বলে উঠেছে।

শ্রীমান ধীরে ধীরে ঘরের বারান্দা থেকে নিচে নেমে এল।বাড়ির সামনের ছোটো বাগানটাতে সাদা সুগন্ধি ফুল ফুটেছে।বাতাসে মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে।সে আকাশের দিকে তাকাল।আকাশে মেঘ নেই।মুক্তআকাশ।কিন্তু একটা তারাও কোথাও দেখা যাচ্ছে না।সে তারায় ভরা আকাশ কোথায় দেখেছিল।যেখানে তারাগুলি এক একটি রসে ভরা সুমিষ্ট ফলের মতো আকাশের গায়ে ঝুলছিল।এই যেন রসের ভারে বোঁটা খসেপড়বে।কোথায় দেখেছিল সেই আকাশ!নিশ্চয় ব্রহ্মপুত্রের পারে।

হ্যাঁ,ব্রহ্মপুত্রেরপারে।নদীর তীরের বালুচরের ওপরের উন্মুক্ত আকাশে তারাগুলি পাকা কলার মতো ঝুলছিল।

তার শরীরটা একবার অজান্তেই শিরশির করে উঠল।

তার হঠাৎ নদীর তীরে,বালিরখাদানে,খাদানের সেই গর্তগুলির কাছে  যেতে ইচ্ছা করল।কী এক দুর্বার আকর্ষণ যেন তাকে সেই নদীর তীরে টনাছে।তাকে যেতেই হবে।যেতেইহবে,না গিয়ে সে থাকতে পারবে না।সেই গর্তগুলি তাকে এক চুম্বকের মতো আকর্ষণ করেছে-আয় আয়!

নিজের অজান্তেই সে দ্রুত গেটের দিকে দুই পা এগিয়ে গেল।গেটটা খোলার জন্য হাতটা এগিয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে –লোহা্র শীতল গেটটায় হাতটা লেগে তার যেন সম্বিৎ ফিরে এল।

সে কী করতে চাইছে?কী করতে চলেছে?

সে নিজের শরীরটা এবং মাথাটা একবার জোরে ঝাঁকিয়েনিল।গেটটাতে হাত দিয়ে সে যেন প্রকৃ্তিস্থ হওয়ার চেষ্টা করল।

সে লম্বালম্বা শ্বাস নিল।একবার সজোরে চোখটা বন্ধ করে নিল,পুনরায় খুলল।

অঃ কী হচ্ছে তার?

ঐ পানদোকানের সামনে দাঁড়ানো মানুষগুলি তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে দেখছি! কেন,কেন তাকিয়ে আছে ওরা?কীমতলবওদের? কী মতলব?  

সে গেটটা খুলে এবার বাইরে বের হল।এক পা দু পা করে সে পান দোকানের দিকে এগিয়ে গেল।ওদের বাড়ি থেকে একটু এগিয়ে গেলেই পান দোকান।পান দোকানে কেন সে এল সেকথাস্রীমান নিজেও বুঝতে পারল না।দোকানে পৌছে সে দেখল যে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলি নেই।ক্ষন তারা চলে গেছে ,সে বুঝতেই পারে নি।

লোকগুলি কোথায় গেল?হঠাৎ কর্পূরেরমতো নাই হয়ে গেল।সন্দেহজনক।

সে কী খুব বেশি চিন্তা করছে?এমনিতেই ভাবছে নাকি কথাগুলি?

না,ঠিকই ভাবছে সে।নাহলেএতক্ষণ ধরে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ওদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকার অর্থ কি?সে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে কেন মানুষগুলি নাই হয়ে গেল?কোথায় গেল।

‘এখানে যে কিছুক্ষণ আগে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়েছিল তারা কোথায় গেল?’শ্রীমান দোকানি ছেলেটিকে জিজ্ঞস করল।

দোকানি অবাক হওয়ার মতো তার দিকে তাকাল।

সাধারণত দোকানটিতে ছেলেটির পিতা বসে।বিকেলের সময় ছেলেটিবসে।শ্রীমানদের সমবয়সী হবে।এক্টু হয়তো ছোটো হবে। হ্যাঁ ছেলেটি দুই বছরের ছোটো হবে।

‘কোন মানুষের কথা বলছেন দাদা?’

‘কেন? এই যে তোমার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেক সময় কথা বলছিল। লোকগুলি কে?’

ছেলেটি মনে করার চেষ্টা করল।

‘কিছুক্ষণ আগে তিনজন মানুষ পান-সুপুরি খেতে খেতে কথা বলছিল।কারা বলতে পারব না।পরিচিতনয়।আমাদের লোকজন নয়। কেন দাদা? আপনার পরিচিত নাকি?’

শ্রীমান কিছুটা অসুবিধায় পড়ল।সেদুর্বলভাবে বলল। ‘দূর থেকে পরিচিত বলে মনে হচ্ছিল।’

‘দেখুন তো দাদা’ছেলেটি হঠাৎ সজোরে বলে উঠল।‘ওহো পয়সা রেখে চলে গেছে।‘লজেন্সেরবৈয়ামের ওপরে রাখা এক টাকার একটা মোহর দেখাল ছেলেটি।‘তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে টাকাটাও রেখে গেল।’দোকানি এবার টাকাটা উঠিয়েনির্বিকারভাবে তার পয়সা রাখা বাক্সটাতে রেখে দিল।

টাকা রেখে গেছে?তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে টাকা রেখে গেছে?কীসের তাড়াহুড়ো?সে বেরিয়ে আসায় ওদের তাড়াহুড়ো লাগল।হ্যাঁ,আমি বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেওদের তাড়াহুড়ো লাগল।ঠিক,আমি ঠিকই ভেবেছিলাম।ওরা আমার ওপরেই নজর রাখছিল।হয়তো,আমাদের বাড়ির ওপরে নজর রাখার জন্য এই দোকানের চেয়ে সুবিধাজনক জায়গা আর কি হতে পারে?

‘দাদা,কিছু দেব?’দোকানিছেলেটিজিজ্ঞেস করল।

‘অ্যাঁ?হ্যাঁদাও,পান-না একটা সিগারেট দাও।’

‘সিগারেট,দাদা? ছেলেটি জিজ্ঞেস করল।সে শ্রীমানকে কখনও সিগারেট খেতে দেখে নি।একটামিষ্টি পান ছাড়া কখনও কিছু কিনতে দেখে নি।‘আপনি আজকাল সিগারেট খান নাকি?’কী দেব?’

‘খাব বলে ভাবছি।অনেক আগে তো খেতামই।দাও,দামিটাই দাও,ইন্ডিয়া কিং খুচরো বিক্রি কর কি?’

‘করি দাদা,নিন’,ছেলেটি আলগোছে প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে তার দিকে এগিয়ে দিল।

সিগারেটটা হাত পেতে নেবার সময় শ্রীমানের মনে হল যে মাথার ওপর দিয়ে দোকানিছেলেটি তার পেছন দিকে –ওদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে রয়েছে।হ্যাঁ,ছেলেটিওদের বাড়ির দিকে তাকাচ্ছে।সে তখনই মাথা ঘুরিয়েছেলেটির দৃষ্টি অনুসরণ করল।ওদের বাড়ির বাইরে সেদিকে দেখার মতো তো কিছুই নেই!

ছেলেটি এবার শ্রীমানকেবলল,’আপনাদের বাড়িটা পুরো দেখা যায়।’

শ্রীমান সিগারেটটা জ্বালাল।নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের করে দিয়ে সে দোকানিছেলেটির চোখে চোখ রেখে ধীরভাবে বলল,’হ্যাঁ,এখান থেকে আমাদের বাড়ির ওপরে লক্ষ্য রাখা খুব সহজ।’

কথাগুলি বলেই তার চিন্তা হল।কেন সে এভাবে বলল।সে এভাবে বলা মানেই ওরা এখন জানতে পারবে যে সে ও কথাটা লক্ষ্য করেছে।ইস আমাকে কীসে পেল যে এভাবে বললাম!

সিগারেটটাতে আরও একটি টান মেরে শ্রীমান দোকানিছেলেটার দিকে তাকাল।ছেলেটিও তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।ছেলেটি এবার হাসল।

কেন হাসল সে?

আমার কথাটা তার মানে সে বুঝতে পেরেছে।শ্রীমান ভাবল।

‘ভাগ্য ভালো আমাদের বাড়িতে মেয়ে নেই।’পরিস্থিতিটা লঘু করার জন্য শ্রীমান বলল।‘কয়েকজন সুন্দরী মেয়ে থাকলে তোমার দোকানে ভিড় লেগে যেত।অবশ্য তোমার বিক্রিও বেড়ে যেত।’        

দোকানি সশব্দে হেসে উঠল।

দোকানের সামনে একটা স্কুটার এসে দাঁড়াল।

‘ স্যার, আপনি এখানে?’ স্কুটারেরআরোহীটি নেমে এসে শ্রীমানকে দেখে জিজ্ঞেস করল।

‘অ্যঁ,ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েস্কুটারেরআরোহীর দিকে তাকাল।

মাথার হেলমেটটা খুলে হাতে নিয়েআরোহীটি  বলল,’ আমি সেদিনই আপনি রিপোর্টার বলে জানতে পারলাম। স্যার আপনাদের অফিস তৈরির সময়প্রয়োজনীয় মাটি, বালি,শিল সব কিছুই আমি জোগাড় করে দিয়েছিলাম। আপনাদের ম্যাডাম খুব ভালো মানুষ। কিছু একটা দরকার হলেই আমার খোঁজ করেন। নরেন অমুক জিনিসটা প্রয়োজন– তমুকটা প্রয়োজন। দিদির প্রয়োজনীয় জিনিসগুলি আমি জোগান দিই,হেঃহেঃ…’

নরেন, তার মানে বালির খাদানেরমানুষটার নামটাও নরেন। তার একটা নামও আছে তাহলে। সে এখানে কী করছে?

‘ আপনার বাড়ি আশেপাশেই নাকি, স্যার?’ মানুষটাজিজ্ঞেস করল।

‘হুঁ’ কোনোমতে শ্রীমান উত্তর দিল। নরেন এদিকে ওদিকে তাকিয়েনির্ভুলভাবেশ্রীমানদের বাড়ির দিকে আঙ্গুল দেখিয়েজিজ্ঞেস করল,’ রাস্তার ওপারের ওই ঘরটাই নাকি?’

‘ হুঁ,শ্রীমান উত্তর দিল।

‘ ভালোই হল স্যার, বাড়িটা চিনে রাখলাম। স‍্যার,ঘর বানালে খবর দেবেন। যখন যা লাগে সব কিছু নরেনযোগাড় করে দেবে।হেঃহেঃ…’

মানুষটা দোকানটা থেকে এটা ওটা কিনতে লাগল।

ও এভাবেই আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছে। শ্রীমানের মনে হল। তার মাথাটা কেমন যেন ঘোরাচ্ছে বলে মনে হল।

জিনিসপত্র কিনে নরেন হেলমেট পরে যাবার জন্য প্রস্তুত হল।’ এদিকে আমাদের মামার বাড়ি আমি মাঝে মাঝে এসে থাকি’, সে বলল। তারপর হঠাৎ শ্রীমানের কাছে এসে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,’ আপনি খবরের কাগজের রিপোর্টার বলে জানার পরে আমার কাছে গোটা ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল। না হলে অন্যরা বালির খাদানে মরা মানুষের কথা কেন জিজ্ঞেস করবে? পুলিশ তো জিজ্ঞেস করে না, ওরা জানেই। খুব খারাপ জায়গা স্যার। পেটের দায়ে সেসব জায়গায় কাজ করতে হচ্ছে। সেই সব জায়গা থেকে দূরে থাকবেন,স‍্যার। খুব খারাপ জায়গা। কখনও কখনও মাসে দু তিনটে লাশ পড়েযায়।’

স্কুটার চালিয়ে নরেন চলে গেল।

পায়ের নিচে শিকড় গজা মানুষের মতো শ্রীমান দোকানের সামনে দাঁড়িয়েরইল। তার শরীরটা নেশাগ্রস্থ মানুষের মতো টলমল করতে লাগল। পৃথিবীটা যেন একটু একটু চারপাশে ঘুরতে শুরু করেছে। সে হাত মেলে দোকানটা ধরে রইল।

‘ দাদা কী হল?’ দোকানিছেলেটি উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল। শ্রীমানের যে কিছু একটা হয়েছে সে বুঝতে পারল।

‘না–নেই, কিছু হয়নি’, শ্রীমান বলল।’ হঠাৎ মাথাটা ঘোরালো।

‘ অনেকদিন পরে আপনার সিগারেট খাওয়ার জন্য হল, দাদা। একটা কোকাকোলাখেয়ে নেবেন নাকি? ভালো লাগবে।’

শ্রীমান লাগবেনা বলে মাথা নাড়ল।

‘ আমি বাড়িতে রেখে আসব নাকি?’

‘ লাগবে না, যেতে পারব। ঠিকই বলেছ, সিগারেটের জন্যই হয়েছে। অনেকদিন পরে খেয়েছি তো…’ কথা বলে বলে টলমল করে শ্রীমান রাস্তাটা পার হয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত