| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য নভেলা: ভুজঙ্গ সংহার । তন্ময় দেব

আনুমানিক পঠনকাল: 43 মিনিট

(নরক দহনের আগের কাহিনী)

 

 

প্রথম পর্ব: দম্পতি কথা!

 

তুমি কি কোনো কারণে আমার ওপর রাগ করে আছো কামিনী?

– কই? না তো!

– সত্যি?

– আমি যে কখনও মিথ্যে কথা বলি না সে তুমি ভালো মতোই জানো। সবাইকে অযথা নিজের মতো ভাবো কেন!

– মানে! তুমি আমাকে মিথ্যুক বললে?

– হ্যাঁ! বললাম। বেশ করেছি বলেছি।

– আমায় এত বড় দণ্ডে দণ্ডিত করার কারণ জানতে পারি কি?

– বলবো না।

– আরে, না বললে বুঝবো কি করে? তবে এটুকু নিশ্চিত করে বলতে পারি যে জ্ঞানত কোনোদিন তোমায় কখনো কোনও মিথ্যে কথা বলিনি মিনি।

– আমাকে ঐ নামে ডাকবে না। তোমার আর সেই অধিকার নেই!

– এ তো আচ্ছা মুশকিলে পরা গেল। সত্যি বলছি আমি বুঝতে পারছি না কবে বা কি মিথ্যে বলেছি তোমায়।

দেখো, আমি নিজেও কিন্তু মিথ্যে কথা বলা অপছন্দ করি। তবে মক্কেলের স্বার্থ রক্ষার্থে যে আদালতে মাঝেমধ্যে আমাকে মিথ্যে বলতে হয় সেটা অস্বীকার করছি না। তাই বলে বিয়ের পর থেকে আজ অবধি একদিনও মিথ্যে কথা বলিনি তোমায়। বিশ্বাস করো!

– বিশ্বাস! তাও আবার তোমাকে? এইজন্মে আর সেটা হবার নয়। তাছাড়া তুমি যদি মিথ্যে বলতে এতই অপছন্দ করো তাহলে তোমার যে ওইরকম একটা অতীত রয়েছে, এতদিন বলোনি কেন আমায়?

– অতীত! কোন অতীত? কীসের অতীত? কীসব বলছ!

– বুঝেও না বোঝার ভান কোরো না। তুমি যে গুরুদেব রুদ্রাক্ষের মতো এমন একজন মহান মানুষের শিষ্য, একথা আমাকে এতদিন বলোনি কেন? তোমার স্ত্রী হিসেবে কি আমার তা জানার অধিকার ছিল না?

– ওহ! এই ব্যাপার। আমি ভাবলাম কি না কি!

– কেন? তোমার জীবনের আরও কোনো গুপ্ত রহস্য লুকিয়ে রেখেছ নাকি আমার থেকে?

– আরে না না! পাগল নাকি! কোনো গুপ্ত রহস্য-টহস্য নেই আমার জীবনে। আর এবার বুঝলাম, গত পরশু গুরুদেব চলে যাওয়ার পর থেকে মেয়ের এত কেন গোসা হয়েছে আমার ওপর! সরাসরি বললেই তো পারতে। অযথা রাগ করে নিজের মাথা গরম করলে!

– সবসময় আমিই কেন যেচে গিয়ে বলব তোমায়? নিজেও তো একটু বুঝে নিতে পারো। কিন্তু তোমার সেই সময় কোথায়! দিনভর শুধু কোর্ট-কাছারি।

আমি তো জানতামই না যে তুমি অ্যাডভেঞ্চার, পাহাড় চড়া, অলৌকিক শক্তির মুখোমুখি হওয়া… এসবেও পারদর্শী!

– হেহেহে! ওই আরকি একটু-আধটু! মহাদেবের কৃপায় দু’একবার অজান্তেই জড়িয়ে পড়েছিলাম এসবে।

– আমার এসব জিনিস খুব প্রিয় জানো তো। চাঁদের পাহাড়, তারানাথ তান্ত্রিক ইত্যাদি বই পড়ে আমিও ভাবতাম শঙ্কর কিংবা তারানাথের মতো হবো – দূর দেশে ঘুরে বেড়াবো, ভূত-প্রেতদের শায়েস্তা করব।

মায়ের মুখে তো শুনেইছো, ছোটবেলা থেকেই ডানপিটে বলে আমার বদনাম রয়েছে। তাই যখন দেখলাম তুমি এসবে জড়িত থেকেও আমাকে জানানোর ন্যূনতম প্রয়োজনটুকু বোধ করলে না, সত্যিই খুব কষ্ট হয়েছিল আমার। কেন বলোনি গুরুদেবের কথা আমায়?

– আরে… গুরুদেবের কথা তোমায় বলিনি কারণ আমি ওনার শিষ্য নই। উনি এসব শিষ্য-গুরু পরম্পরায় বিশ্বাস করেন না।

– তাহলে গুরুদেব সম্বোধনে ডাকো কেন?

– প্রথম সাক্ষাতের দিন নন্দদা গুরুদেব সম্বোধনেই আমাদের সঙ্গে ওনার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। আমরাও তাই নন্দদাকে অনুসরণ করে গুরুদেব সম্বোধনেই ওনাকে ডাকতে শুরু করি। ওনার ব্যক্তিত্বটাই এমন যে প্রথম দেখাতেই আমাদের কাছে ঐ নামে ডাকাটাই স্বাভাবিক মনে হয়েছিল! তোমরাও তো সবাই মিলে ওনাকে নির্দ্বিধায় ‘গুরুদেব’ সম্বোধনে ডেকে গেলে এই কয়েকটা দিন! বুঝেছ এবার ব্যাপারটা!

– তাহলে কি নন্দকিশোরবাবুই ওনার একমাত্র শিষ্য?

– নন্দদা গুরুদেবের শিষ্য নয়। উনি নিজে মুখেই আমাদের সেটা বলেছেন, নন্দদার সামনেই। তবে শুধু এটুকু জানি যে নন্দদা প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে গুরুদেবের সঙ্গে রয়েছেন।

– পঞ্চাশ বছর! কিন্তু নন্দকিশোরবাবুকে দেখলে তো তা মনে হয় না। আমি তো ভেবেছি উনি তোমার বয়সী বা তোমার চেয়ে বয়সে ছোট!

– সেটা তো আমার কাছেও এক বিরাট রহস্যের বিষয় মিনি। পাঁচ বছর আগে নন্দদাকে ঠিক যেমনটা দেখেছিলাম, এখনও তিনি ঠিক তেমনটাই রয়েছেন। চেহারায় বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি!

– বলো কি?

– তাহলে আর বলছি কি!

– আচ্ছা, গুরুদেব তোমায় অতগুলো বছর আগে ত্রিমুখী রুদ্রাক্ষটা দিতে গেলেন কেন?

– অতগুলো নয়, পাঁচ বছর আগে ওনার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল আমার। আর তোমার বলা ঐ প্রশ্নটা আমার মনেও বেশ কয়েকদিন ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে! একটা সম্ভাব্য উত্তরও খুঁজে পেয়েছি আমি, সঠিক কিনা জানিনা। জানা সম্ভবও নয়।

      – পাঁচ নাকি পাঁচশ, আমাকে না বললে আমি জানব কি করে?

– এই রে! রাগ কোরো না লক্ষ্মীটি।

– হু! আমার বয়েই গেছে তোমার ওপর রাগ করতে! তুমি কোন সম্ভাব্য উত্তরের কথা বলছ সেটা বলো।

– আমার মনে হয় গুরুদেব ধীরে ধীরে ত্রিকালজ্ঞ হয়ে উঠছেন!

– মানে?

– ত্রিকালজ্ঞ কথার অর্থ হল যাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তিনটি কালের ওপরেই দখল থাকে। আমার মনে হয় গুরুদেব নিজের অবচেতনে ঐ তিনকালকে আবছা আবছা দেখতে পান বা আগামীতে কিছু বড় ধরণের বিপদ ঘটবে সেটা আঁচ করতে পারেন। নাহলে আমাকে হঠাৎ করে নিজের গলার মালা থেকে একটা রুদ্রাক্ষ খুলে দিতে গেলেন কেন? এর আগেও উনি একজনকে এভাবেই একটি রুদ্রাক্ষ দিয়েছিলেন, যে কারণে সে যাত্রায় আমরা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলাম!

– তুমি যে কি বলছ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। এভাবে অর্ধেক ও খাপছাড়া কথা শোনার চেয়ে ঘুমনো ভালো। অনেক রাত হয়েছে। আমি শুয়ে পড়ছি।

– আচ্ছা! আচ্ছা! আমায় কি করতে হবে বলো যাতে তোমার সমস্ত রাগ এক নিমেষে চলে যায়?

– গল্প বলতে হবে!

– গল্প! কীসের গল্প? আমি আইনের বই পড়া মানুষ। অপরাধীদের নিয়ে আমার কাজ-কারবার। গল্প, রূপকথার ধারেকাছেও আমার কোনো যাতায়াত নেই!

– আমি কিন্তু মোটেও বইয়ের গল্প শুনতে চাইনি। অবসর সময়ে ওসব আমি নিজেই পড়ে নিই।

আমি তোমার বাস্তব জীবনের গল্প শুনতে চেয়েছি। গুরুদেবের সঙ্গে কিভাবে তোমার পরিচয় হল সেই গল্প!

– কামিনীর কথা শুনে বন্ধন চেয়ার ছেড়ে উঠে এলো। তারপর ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল –

“ঠিক আছে। তোমার যখন এতই ইচ্ছে, আজ তবে আমার জীবনে ঘটে যাওয়া এক অলৌকিক কাহিনী শোনাবো তোমায়। এই ঘটনা আমার বন্ধুরা, যারা নিজেরাও অকুস্থলে উপস্থিত ছিল, তারা বাদে আর কেউ জানে না, এমনকি আমার মা-বাবাও না।

আমার মুখ থেকে এরপর যা যা শুনবে তার সবটাই সত্যি। প্রত্যেকটি ঘটনা আমার সজ্ঞানে ও চোখের সামনে ঘটেছে কিন্তু সেগুলো এতটাই আশ্চর্যজনক যে গল্প শোনা শেষ হলে তুমি বিশ্বাস করবে নাকি অবিশ্বাস, সেই দায়িত্ব একান্তই তোমার!”

বন্ধনের বুকে আলতো করে মাথা রেখে কামিনী বলল –

“ওটা আমি কথার কথা বলেছি গো। তোমাকে আমি নিজের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করি। তুমি মন খুলে বলো…”

কামিনীর কথায় আশ্বস্ত হয়ে বন্ধন বলতে শুরু করল ওর জীবনে ঘটে যাওয়া এক অলীক অথচ চরম পর্যায়ের বাস্তব-গাথা –

 

 

দ্বিতীয় পর্ব: প্রস্তাব!

“তোমাকে খানিকক্ষণ আগেই বলেছি, এই কাহিনীর শুরু আজ থেকে পাঁচ বছর আগে, ১৯৮৫ সালে। আমি তখন জলপাইগুড়ি ল-কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্র। কলেজ হস্টেলেই থাকি। সেখানেই আমার ওদের সঙ্গে আলাপ – বিজয় বাগচী, মানস মাইতি, শুভম সাহা এবং প্রতিম দে। প্রতিমের সঙ্গে তোমার পরিচয়ও হয়েছে ইতিমধ্যেই।

      বিজয় ও প্রতিম দুজনেই আলিপুরদুয়ারের ছেলে। মানসের বাড়ি হুগলীতে। শুভমের কোচবিহার।

      তো জুন মাস পড়তেই কলেজ কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করলেন আমাদের পনেরো দিনের জন্য গরমের ছুটি দেওয়া হবে। হস্টেলও বন্ধ থাকবে ঐ কয়েকটা দিন। অতএব, প্রত্যেকেরই তাদের নিজ নিজ বাড়ি যাওয়া ছাড়া হাতে আর কোনো দ্বিতীয় রাস্তা রইল না।

তখন বয়স কম, তারওপর সেই প্রথম বাড়ি থেকে দূরে একা একা থাকতে শুরু করেছি, নিজের বিষয়ে সমস্ত সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হচ্ছে, এমন অবস্থায় যা হয় আর কি! পাঁচ বন্ধু মিলে ঠিক করলাম কেউই ছুটিতে বাড়িতে যাব না। এই কয়েক মাসে হাত খরচের টাকা বাঁচিয়ে যা জমেছে সেটা দিয়ে কাছেপিঠে কোথাও গিয়ে কয়েকদিন ঘুরে আসব। আমাদের সিনিয়রদের দেখেছি জানুয়ারি মাসে শীতের ছুটিতে মিরিক ঘুরতে যেতে, তখন থেকেই পরিকল্পনাটা ছকে রেখেছিলাম পাঁচজনে।

মুশকিল হল ঘুরতে যাবার জায়গা খুঁজতে গিয়ে। কেউ বলল পাহাড়, কেউ বলল জঙ্গল, কেউ আবার ঝোঁকের বশে সমুদ্রও বলে ফেলল! টাকার হিসেব করে দেখলাম সঙ্গে যা আছে তাতে দার্জিলিং যেতে গেলেই হিমশিম অবস্থা, দিঘা তো পরের কথা!

সবাই ভাবছি কি করা যায়, এমন সময় প্রতিমই রাখল প্রস্তাবটা – ‘বক্সা-জয়ন্তী গেলে কেমন হয়? ভিন্নমত থাকলেও পাহাড়ে যাওয়া নিয়ে সকলেই রাজি, পাশাপাশি ওখানে জঙ্গল আর নদীরও দেখা মিলবে, এককথায় সবার ইচ্ছেই পূরণ হবে। এই ফাঁকে মানসেরও উত্তরবঙ্গের আসল সৌন্দর্য চাক্ষুষ করার সুযোগ মিলবে। কি মানস, রাজি তো?’

মানস দক্ষিনবঙ্গের ছেলে। এসময় ওদিকে যা গরম, তাতে মানস নিজেও দিঘা যেতে চাইছিল না। প্রতিমের প্রস্তাব শুনে তাই ও এক কথায় রাজি হয়ে গেল। বাকি চারজনেরও অবশ্য এতে গররাজি হবার কোনো কারণ ছিল না। উত্তরবঙ্গের ছেলে হয়েও আমাদের মধ্যে কেউই তখনও অবধি বক্সা কিংবা জয়ন্তী যায়নি!

      বিজয় বলল – ‘বক্সা গেলে তো আমাদের প্রথমে আলিপুরদুয়ারে নামতে হবে। আমি চাই অযথা হোটেল ভাড়া না করে সবাই মিলে আমার বাড়িতেই উঠবি। এমনকি প্রতিম তুইও!

বাবা দু’দিন আগে চিঠিতে জানিয়েছেন তিনি ব্যবসার কাজে আসাম যাচ্ছেন। অতএব বাড়ি পুরো ফাঁকা। শুধু আমাদের কাজের লোক মতিদা থাকবে’

বিজয়ের মা নেই। ওর যখন পাঁচ বছর বয়স, তখন ওর মা টাইফয়েড জ্বরে মারা যান। বিজয় মতিদার কাছেই মানুষ। প্রচুর শুনেছি ওর মুখে মতিদার কথা। তাই বিজয়ের এই প্রস্তাব শুনে সকলে একপ্রকার লাফিয়ে উঠলাম। সেইমত গোছগাছও সারা হল। কোন দিক দিয়ে, কোন পথ ধরে যাবো তার দায়িত্ব বিজয়ই নিলো। এসবে বিষয়ে ওর কর্মদক্ষতা অতুলনীয়। মাত্র ছ’মাস আগে কলেজে এসে তিন-তিনটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করে ফেলেছিল বিজয়। প্রিন্সিপাল স্যার এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে নবাগত হওয়া সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক কমিটির সহ-সভাপতি বানিয়ে দিয়েছিলেন বিজয়কে।

যাই হোক, সেইদিন থেকে আমরা বহুকষ্টে নিজেদের আনন্দ ও উদ্দীপনাকে নিয়ন্ত্রণ করে বন্ধুদের সাথে জীবনে প্রথম কোথাও দলবেঁধে ঘুরতে যাবার দিন গুনতে শুরু করেছিলাম!”

 

 

তৃতীয় পর্ব: বাগচী ভিলায়

“বিজয়রা যে বড়লোক তা সকলেই জানতাম কিন্তু এতটাও যে বড়লোক সেটা ভাবতে পারিনি। কেন একথা বললাম, শুনলেই বুঝতে পারবে!

      যেদিন আমাদের ছুটি দিল, সেইদিনই বিকালবেলায় পাঁচজনে বেরিয়ে পড়েছিলাম হস্টেল থেকে। তারপর ট্রেনে চেপে সোজা নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশন। যখন প্ল্যাটফর্মে পা রাখলাম তখন বেশ ভালোই রাত। স্টেশন থেকে বেরোতেই দেখি চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার।

বিজয় আমাদের দাঁড় করিয়ে রেখে কোথায় যেন একটা গেলো। অজানা অচেনা জায়গায় পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেই মনে হয় যেন এক ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। আমাদেরও ঠিক তেমনই মনে হচ্ছিল। তবে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। দেখলাম, হেডলাইটের তীক্ষ্ণ হলুদ আলোয় স্টেশন চত্বরের অন্ধকারকে চিরে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল আমাদের সামনে আর জানালার কাঁচ নামিয়ে গাড়িটার ভেতর থেকে মুখ বাড়িয়ে বিজয় বলল –

‘উঠে আয় সবাই। এটা আমাদেরই গাড়ি। মতিদা নিজে আসতে পারেনি বলে ড্রাইভারকে পাঠিয়েছে। সে আবার আমাকে চেনে না। তাই ওকে পরিচয় দিয়ে নিজেকে চেনাতে একটু সময় লাগলো। কি হলো? হাঁ করে দেখছিস কি? উঠে পড়!’

      সত্যিই হাঁ করে দেখছিলাম আমরা। একটা টকটকে লাল রঙের মারুতি এইট হান্ড্রেড এবং সেটা যে আমাদেরই নিতে এসেছে কারোরই তা বিশ্বাস হচ্ছিল না।

প্রতিম গাড়িতে ওঠার আগে আমাকে ফিসফিস করে বলেছিল – ‘শালা! ক্ষমতা হলে একদিন এই গাড়িই কিনব!’। কথা রেখেছে ছেলেটা!

      যাই হোক, গাড়ি আমাদের তুলে রওনা দিলো। গদি আঁটা নরম সিট। কোনো ঝাঁকুনি নেই। আরামে চোখে বুজে এসেছিল আমার। হঠাৎ বিজয়ের ডাকে তন্দ্রা কেটে গেল –

‘এই বন্ধন! বন্ধন! ওঠ। চলে এসেছি আমরা’

      জেগে উঠে দেখি একটা দোতালা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে গাড়িটা। ধবধবে সাদা রঙের বাড়িটাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোনো হিন্দি সিনেমার সেট। কতক্ষণ ধরে মোহিত হয়ে তাকিয়ে ছিলাম সেদিকে জানিনা, বিজয় ফের বলে উঠল – ‘ওয়েলকাম টু বাগচী-ভিলা, মাই ফ্রেন্ডস!’

      নামটা শুনে আমার খানিকটা কষ্টই হয়েছিল সেদিন। কোথায় চৌধুরী-বাড়ি আর কোথায় বাগচী-ভিলা! মনে মনে ঠিকই করে নিয়েছিলাম এখন থেকে অন্তত আর আমাদের বাড়ির নাম কারোর কাছে বলবো না। সে যতই গৌরবমণ্ডিত অতীত বা ইতিহাস জড়িয়ে থাকুক না কেন! এই আধুনিক বাগচী ভিলার সামনে সেই ইতিহাস বড্ড ফিকে!

      “আমি জানি তো যে তুমি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগো!” – বন্ধনের কথার পরিপ্রেক্ষিতে ওকে খোঁচা দিলো কামিনী।

      “বাগচী ভিলাকে দেখলে তোমারও একই অবস্থা হত মিনি। আর তখন আমার বয়স কম, অভিজ্ঞতাও কম, এসব ভাবনা আসা স্বাভাবিক। তার মানে এই নয় যে আমি হিংসুটে!” – নিজের পিঠ বাঁচাতে জবাব দিল বন্ধন।

      “এই যুক্তি ধোপে টিকবে না কর্তা মশায়। আর আমি খুব ভালো করেই জানি তোমার এই স্বভাব আছে। বহুবার প্রমাণও পেয়েছি আমি! তবে তুমি হিংসুটে না সেটা সত্যি। তারপর কি হল বলো” – কামিনীর ইশারা বুঝে হেসে ফেলল বন্ধন। বলল –

      “আমাদের আপ্যায়ন করতে মতিদা এগিয়ে এলেন। ওনার বয়স তখন পঞ্চাশের কোঠায়। সদা হাস্যময় মানুষটির ব্যবহার যেমন অমায়িক তেমনি রান্নার হাতও লা-জবাব!

জয়ন্তী যাবার আগে দেড় দিনের মতো ছিলাম বাগচী-ভিলায়। মতিদা একেকটি পদ যা খাইয়েছিলেন, এখনও তার স্বাদ জিভে লেগে আছে! ওনার হাতের দেশি মুরগীর ঝাল এবং ডিমা নদীর মাঝারি সাইজের কাঁকড়ার পাতলা ঝোলের স্বাদ এই জন্মে ভুলব না!

      এদিকে বিজয় একদিনের মধ্যে সব ব্যবস্থা করে ফেলল। আমাদের সকলের বয়স তখন আঠারো পেরনোয় বনদপ্তরের ছাড়পত্র পেতে বিশেষ অসুবিধা হল না কিন্তু তবুও বলা হল যে একজন গার্জিয়ান যদি সঙ্গে যান তো ভালো হয়। আমরা মতি’দাকে রাজি করিয়ে ফেললাম সঙ্গে যাবার জন্য। বিজয়ও ওর বাবার চেনা একজন ফরেস্ট অফিসারকে বলে জয়ন্তীতে বনদপ্তরের গেস্ট হাউসে তিনদিনের মতো থাকবার ব্যবস্থা করে নিলো। এরপর আর আমাদের পায় কে!”

 

 

চতুর্থ পর্ব: প্রকৃতির কোলে

“উত্তরবঙ্গের সৌন্দর্য নিয়ে আর তোমায় নতুন করে কি বলবো মিনি।  তার সৌন্দর্য বর্ণনার ঊর্ধ্বে! তাকে শুধুই দু’চোখ দিয়ে অনুভব করতে হয়। আর কিছুদিন যাক, দুজনে মিলে বক্সা-জয়ন্তী ঘুরে আসব। গুরুদেবের আস্তানাও দেখিয়ে আনবো যদি পাহাড়ে চড়তে পারো” – বন্ধনের কথা শুনে আনন্দে ঝিলিক দিয়ে উঠল কামিনীর মুখ। বলল –

“সত্যিই নিয়ে যাবে? আমার পাহাড়ে ঘুরতে যাবার খুব ইচ্ছে জানো তো। বহুবার বলেছি কিন্তু বাবা কোনোদিন নিয়ে যায়নি। আমার দৌড় ঐ কোচবিহার রাজবাড়ি অবধিই!”

      “তাহলে তো অবশ্যই নিয়ে যেতে হবে তোমায়। মজার বিষয় কি জানো, আমার কিন্তু শুরুর দিকে পাহাড় বিশেষ পছন্দ ছিল না। জঙ্গল ভালো লাগত বেশি কিন্তু সেদিন জয়ন্তীতে পা দিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি পাহাড়দের রূপ দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এখনও চোখ বুজলে ঐ কয়েকটা দিনে কি কি দেখেছিলাম, কি কি ঘটেছিল সবটা মনে করতে পারি।

আমাদের রাজ্যের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় উত্তরবঙ্গে গরমকালের চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে রোদ ও বৃষ্টি বন্ধুর মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

আমরা যেদিন জয়ন্তীতে পৌঁছলাম তার তিনদিন আগে থেকে পাহাড়ে একটানা বৃষ্টি হয়েছে। তবে আমাদের ভাগ্য ভালো ছিল যে বিট অফিসে যাবতীয় সইসাবুদ ও পারমিশনের কাগজপত্র চেক করে যখন বেরিয়ে এলাম তখন আকাশ পরিষ্কার হয়ে রোদ উঠেছে। তবে গরম বিশেষ ছিল না।

গেস্ট হাউসে ব্যাগপত্র রেখে, স্নান সেরে, দুপুরের খাবার খেয়ে বারান্দায় এসে বসলাম। বারান্দা থেকে পাহাড়গুলোকে এতটাই স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল যে আমাদের মনে হচ্ছিল হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারবো ওদের।

এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখে মানস ও শুভম আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠল। শুভমের একটা শাটার ক্যামেরা ছিল। ও একের পর ছবি তুলতে শুরু করল। আমার পুরনো অ্যালবামটা খুঁজলে হয়তো ওর তোলা কিছু ছবি এখনও পাওয়া যাবে।

বেতের চেয়ারে পা ছড়িয়ে বসে আমি, প্রতিম, বিজয় ও মতিদা আগামীকাল কোন পথ ধরে এগোবো আমরা সেই বিষয়ে আলোচনা করতে বসলাম।

প্রতিম বলল – ‘বড় মহাকাল গেলে কেমন হয়?’

শুভম কখন যে আমাদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে জানিনা, বলল – ‘আমরা কি এখানে তীর্থ করতে এসেছি নাকি? ঘুরতে এসেও যদি আমাদের ঠাকুর দেবতার মন্দির দেখতে যেতে হয় তাহলে তো না এলেই হত!’

শুভম তখন একটু বেশ নাস্তিক প্রকৃতিরই ছেলে ছিল। সরস্বতী পূজায় অঞ্জলি দিত না। বিজয়ায় মা দুর্গার পায়ে বই ছোঁয়াত না। বয়সে বড় কাউকে কখনও পা ছুঁয়ে প্রণাম করত না। তাই মহাদেবকে নিয়ে এত বড় কথা বলতেও ওর বাঁধল না।

প্রতিম আবার মহাদেবের বিরাট ভক্ত। শুভমের কথা শুনে ও দারুণ রেগে গেল। মতিদা না থাকলে সেদিন হয়তো হাতাহাতিও হয়ে যেত।

দুই বীরপুঙ্গবকে সামলে উনি বললেন – ‘আমি একটা গুপ্ত রাস্তা জানি যেদিক দিয়ে ভুটান যাওয়া যায়। যাওয়ার পথে বেশ কয়েকটি ঝোরা আর ঝরনারও দেখা মিলবে। রান্নার সরঞ্জাম সঙ্গে নিলে আশা করি তাঁবু খাটিয়ে এক রাত কাটাতে অসুবিধা হবে না’

বিজয় উৎসাহিত হয়ে বলল – ‘এ তো দারুণ কথা। তবে তাই হোক। কাল আমরা সকাল সকাল বেরিয়ে পড়বো।

ও হ্যাঁ, আবহাওয়া মনোরম দেখে গেস্ট হাউসে উপস্থিত সকল অতিথিদের জন্য আজ রাতে ক্যাম্প ফায়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি এক স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায় তাদের লোকনৃত্যও পরিবেশন করবেন। গেস্ট হাউসের ম্যানেজার তাই আমাদের সবাইকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য নিমন্ত্রণ করলেন’

এই কথা শুনে সকলেই উৎসাহ ও উল্লাসে চিৎকার করে উঠলাম!”

 

 

পঞ্চম পর্ব: দুশ্চিন্তার ছাপ!

“বেশ জমে উঠেছিল রাতের আড্ডাটা। আমাদের ছয়জনকে নিয়ে গেস্ট হাউসে অতিথি সংখ্যা পনেরো জনের বেশিই ছিল সেদিন। বড় করে আগুন জ্বালানো হয়েছিল। চারপাশে গোল হয়ে বসেছিলাম সবাই। তিনজন বাবুর্চি মিলে আমাদের ডানদিকে ফাঁকা ঘাস জমিতে গ্যাস-ওভেনে রান্না করছিলেন। খাসির মাংসের দুটো পদ ছিল, আর ছিল নদীর টাটকা বরোলি মাছভাজা। সঙ্গে চিকেন পকোরা ও চা।

খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে শুরু হল নাচের আসর। গভীর রাত অবধি চলেছিল অনুষ্ঠান। আমরা শেষ অবধিই ছিলাম তবে শুভম ও মতিদা খাওয়া-দাওয়া হতেই ঘরে চলে গিয়েছিল। মতিদার বিশেষ রাত জাগার অভ্যাস নেই আর শুভমের নাকি এসব পোষায় না – এই কথা বলে দুজনেই উঠে পড়েছিল।

      জ্বলতে থাকা কাঠের আগুনকে ঘিরে মাদলের তালে তালে নাচগান চলছিল আর আমরা সকলেই সেই ছন্দে মাথা দোলাচ্ছিলাম। হঠাৎ একজন কেয়ারটেকার এসে বিজয়কে ডাক দিয়ে নিয়ে গেল। মিনিট পাঁচেক পর বিজয় যখন আবার এসে আমাদের পাশে বসল ওর মুখে-চোখে তখন চিন্তার ছাপ ফুটে উঠেছে।

আমি, ‘কি হয়েছে?’ জিজ্ঞেস করায় সেভাবে কিছু বলল না ঠিকই, কিন্তু স্পষ্ট বুঝলাম বিজয় হয় কোনও কারণে বিরক্ত নয় ভীত!

      পরদিন ভোর ভোর মতিদার ডাকে আমাদের ঘুম ভেঙে গেল। জানালার পর্দা সরাতেই দেখলাম রাতের অন্ধকার মুছে গিয়ে দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে। কারোরই বিছানা ছেড়ে নামার লক্ষণ নেই দেখে মতিদা ধমক দিয়ে বললেন –

‘তোমরা কি এখানে শুয়ে থাকার জন্য এসেছ নাকি? ওঠো! ওঠো! অনেকটা পথ হেঁটে যেতে হবে আমাদের। একটানা তো চলতে পারবে না, মাঝে মাঝে বিশ্রামও নিতে হবে। তাই আগেভাগে বেরোনোই ভালো। আর গেস্ট হাউস থেকে জলখাবার দিতে এখনও অনেক দেরি, আমি তাই ওদের রান্নাঘরে গিয়ে সবার জন্য ডিম টোস্ট ও চা বানিয়ে নিয়ে এসেছি। মুখ ধুয়ে খেয়ে নিয়ে তৈরি হও সবাই।

বিজু রান্নার সরঞ্জাম সব ঢুকিয়ে নিয়েছিস তো ব্যাগের ভেতরে?’

      ‘হ্যাঁ’ – শুকনো গলায় উত্তর দিল বিজয়। বুঝলাম এখনও ওর ভয় বা বিরক্তি ভাবটা কাটেনি।

শুভম চিরকালের কাটখোট্টা। কারোর মন মেজাজের ধার ধারত না কখনও। বিজয়ের উত্তর দেওয়ার ভঙ্গী শুনে বলল –

‘কি রে তোর আবার কি হল? ইচ্ছাশক্তি মরে গেল নাকি? আগে বললেই পারতি, তোকে আলিপুরদুয়ারেই ছেড়ে আসতাম! নিজের ভিলায় বসে আরাম-আয়েশ করতি এই কয়েকটা দিন! বড়লোকের ছেলেদের এই এক অসুবিধা, হাতের কাছে তৈরি করা জিনিস না পেলেই বেগড়বাই করতে থাকে!’

মানস ওর দিকে কটমট চোখে তাকিয়ে বলল – ‘এই শুভম, তুই থামত! সবসময় তোর মুখে কথার ফুলঝুরি ফুটতে থাকে! কাল সারারাত বাইরে কাটিয়ে এসে এত ভোর ভোর উঠতে গেলে অসুবিধা হবেই। সবারই হয়।

আর তুমি একদম ঠিক বলেছ মতিদা। অনেকটা পথ যেতে হবে আমাদের। এই তোরা বিছানা ছেড়ে নীচে নাম সবাই। তারপর তৈরি হয়ে নিয়ে যে উদ্যম ও আনন্দ নিয়ে এখানে ঘুরতে এসেছিলাম, সেই উদ্যম ও আনন্দ বজায় রেখে পরবর্তী জার্নি শুরু করব’

আমরাও মানসের কথা শুনে আর দেরি করলাম না। আধঘণ্টার মধ্যে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম অজানা অচেনা পথের উদ্দেশ্যে। তবে মনে একটা খটকা থেকেই গেলো। দেখলাম গেস্ট হাউস থেকে বেরনোর মুখে বিজয় ফের সেই কেয়ারটেকারের সঙ্গে কথা বলছে। ছেলেটি ওর হাতে যেন কি একটা গুঁজে দিল। জিনিসটা পকেটে পুরে বিজয় মুখ ঘোরাতেই দেখে আমি তাকিয়ে আছি ওর দিকে। ও তৎক্ষণাৎ মুখে ছদ্ম হাসি ফুটিয়ে বলল –

‘তুই দাঁড়িয়ে আছিস যে এখনও? চল, চল… ওরা এরমধ্যেই হয়তো অনেকখানি পথ এগিয়ে গিয়েছে!’

ষষ্ঠ পর্ব: অশনি সংকেত!

“দেশলাইের বাক্সটা দাও তো মিনি” – চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে সিগারেটের খাপটা বার করে বলল বন্ধন। কামিনী ওর দিকে দেশলাই-বাক্স বাড়িয়ে দিল। বন্ধন একটা সিগারেট জ্বালিয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর লম্বা সুখটান দিয়ে আবার শুরু করল –

      “পাহাড়ি পথে চলাফেরা এমনিতেই অসুবিধাজনক। তারওপর বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই! কিন্তু আকাশ মেঘলা থাকলেও বৃষ্টি না নামায় আমাদের যাত্রা বেশ ভালোভাবেই শুরু হল। মতিদাই নেতৃত্বে ছিলেন। গেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে জয়ন্তী নদীর স্রোতের বিপরীতে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম।

      দিনের আলো বাড়ার সাথে সাথে প্রকৃতি যেন তার মোহময়ী রূপ আরও বেশি করে মেলে ধরতে শুরু করল আমাদের চোখের সামনে। ঐ রূপে আমরা এতখানি মগ্ন ছিলাম যে এবড়োখেবড়ো জঙ্গুলে পথে বারবার হোঁচট খেয়ে, ব্যথা পেয়ে, পায়ের পেশিতে টান ধরার পরেও কারোর বিন্দুমাত্র বিরক্ত লাগছিল না।

      ভেবো না যে নিজের ঢাক নিজেই পেটাচ্ছি – কিন্তু আদালত চত্বরে অনেকেই বলেন যে আমি নাকি আরও কয়েক বছর গেলে দুঁদে উকিল হয়ে উঠবো! কারণ কোনো কিছুই নাকি আমার চোখ এড়ায় না!

কথাটা কতখানি সত্যি তা আমি জানিনা, কিন্তু অসামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু যদি আমার আশেপাশে ঘটে সেটা অনুভব করার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আমার মধ্যে রয়েছে। সেই দিনও তাই হল!

গেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে আমাদের যাত্রা শুরুর পর প্রায় দু’ঘণ্টা কেটে গেছে। সকলেই নিজেদের নানা ধরণের কথাবার্তা বলছে, শুভমের ক্যামেরায় ফটো তুলছে কিন্তু বিজয় একদম চুপ। ওর মুখে টুঁ শব্দটুকু নেই। সবার পিছনে ও যন্ত্রের মতো হেঁটে চলেছে!

সামনে দেখলাম ডলোমাইটের চাঙর জমে জমে সাদা ধবধবে বেশ কয়েকটি টিলা গড়ে উঠেছে। বাকিরা সেদিকে এগিয়ে যেতেই আমি বিজয়কে পাকড়াও করলাম – ‘কিরে তোর কি হয়েছে রে? এমন মনমরা হয়ে আছিস কেন? সব ঠিক আছে তো?’

‘কোথায় কি হয়েছে? কিচ্ছু হয়নি তো! সব ঠিক আছে। আমার শরীরটা ভালো লাগছে না শুধু। কাল রাতে খাওয়া হজম হয়নি মনে হয়’ – নিঃস্পৃহ স্বরে জবাব দেয় বিজয়।

আমি বুঝতে পারি আসল প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে ও মিথ্যে কথা বলছে আমায়। তাই সোজাসুজি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিই ওর দিকে –

‘কাল রাতে কেয়ারটেকার ছেলেটা তোকে ডেকে নিয়ে কি বলেছিল? ওর সাথে কথা বলার পর থেকেই দেখছি তোর মুখখানা এমন বাংলার পাঁচ হয়ে আছে। ব্যাপারটা কি বলবি?’

      বিজয় বুঝতে পারল যে স্বীকার করা ছাড়া ওর হাতে আর দ্বিতীয় কোন পথ খোলা নেই।

‘আমাদের ঘোর বিপদ রে বন্ধন… ঘোর বিপদ! আর আমি এতটাই অসহায় যে সব জেনেও কিছু করতে পারছি না। বহু চেষ্টা করেছি যাতে তোদের এই বিপদের করাল গ্রাস থেকে সরিয়ে আনতে পারি, কিন্তু পারলাম না। এখন শুধু মহাদেবই ভরসা। তার এই পুণ্যভূমিতে যেন কোনো অকল্যাণকর কাজ না হয়। প্রভু তুমি দেখো!’ – আমার দু’হাত জড়িয়ে ধরে বড় বড় চোখ করে ধরা গলায় বলল বিজয়।

      বিজয়ের মুখ থেকে একথা শুনে আমি সত্যিই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম সেদিন। কারণ বড় ধরণের কিছু না ঘটলে বিজয় অত সহজে কাবু হত না। ওকে কেমন যেন অপ্রকৃতিস্থ দেখাচ্ছিল। কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল বারবার। আমাকে কথাগুলো বলতে বলতে ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল ওর সারা শরীর। আমি ওকে জাপটে ধরে সামনের বড় একটা গাছের নীচে নিয়ে গিয়ে বসালাম। তারপর ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করে দিতেই ঢকঢক করে এক বোতল জল শেষ করে ফেলল বিজয়। আকাশে ততক্ষনে ধূসর মেঘের আনাগোনা বাড়তে শুরু করেছে। আমি স্পষ্ট অনুভব করলাম বিজয়ের বলা কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে ফলা মাত্র সময়ের অপেক্ষা। বিপদ কাছে পিঠেই কোথাও আমাদের জন্য ওঁত পেতে রয়েছে”

সপ্তম পর্ব: চোখের নিমেষে!

জয়ন্তী এমনিতে শান্ত নদী। শীতকালে তো শুনেছি স্রোতই থাকে না তেমন, শুকনো নদীখাতে লোকজন পায়ে হেঁটে বেড়ায়। তবে আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন ভুটান পাহাড়ে বৃষ্টি হওয়ার দরুন নদীতে জল এবং স্রোত দুটোই বেশ ভালো রকমই ছিল।

বিজয়কে সামলে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম ওরা কেউ নেই, শুধু ওদের ব্যাগগুলোকে ডলোমাইটের টিলার কাছে রাখা। বুঝলাম যে টিলা পেরিয়ে ওরা নদীর দিকে গিয়েছে।

      বিজয়কে আবারও – ‘কি বিপদের আশঙ্কা করছিস তুই?’ – জিজ্ঞেস করেও কোন সদুত্তর না পেয়ে ঠিক করলাম যে আর অ্যাডভেঞ্চারের দরকার নেই, ঘরের ছেলেদের এবার ঘরে ফিরে যাওয়াই উচিত কাজ হবে। বাকিদেরও সেকথা বলার জন্য টিলার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে শুনলাম নদীর ধার থেকে ওদের গলার স্বর ভেসে আসছে। টিলার মাথায় চড়তেই দেখতে পেলাম ওরা সব জয়ন্তীর ঠাণ্ডা জলে মনের আনন্দে স্নান করছে। আমাকে দেখামাত্রই ওরা নীচে নেমে আসার জন্য ডাকাডাকি শুরু করল কিন্তু বারবার বারণ করছিলাম দেখে প্রতিম জল থেকে উঠে দৌড় লাগাল আমায় টিলার ওপর থেকে টেনে নীচে নামাবে বলে। ঠিক তখনই প্রথম দুর্ঘটনাটা ঘটল!

      হঠাৎ করেই আকাশের সমস্ত ধূসর মেঘ ঘন কালো হয়ে উঠল। কড়কড় শব্দ করে বাজ পড়ল সামনের পাহাড়গুলোর গায়ে আর জয়ন্তীর জল ফুলে-ফেঁপে লম্বা তালগাছের সমান উচ্চতায় উঠে গেল। এই দৃশ্য দেখে সকলেরই আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার জোগাড়!

ওরা তিনজন নদী থেকে কোনওমতে উঠে পড়িমরি করে ছুট দিল টিলার দিকে কিন্তু ততক্ষণে যা বিপদ ঘটার ঘটে গেছে! জয়ন্তীর প্রবল জলস্রোত যেন হিংস্র দানবের মতো বড় ‘হাঁ’ করে এসে গিলে ফেলল মতিদা, মানস ও শুভমকে!

টিলার দিকে খানিকটা এগিয়ে আসার ফলে প্রতিম ঐ উত্তাল স্রোতের থেকে বাঁচল ঠিকই কিন্তু বেশিক্ষণের জন্য নয়। কারণ তীব্র স্রোত তার অভিমুখ বদলে এবার টিলার দিকে ধেয়ে এলো।

জলের তোড় ওকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবার কয়েক সেকেন্ড আগেই প্রতিম প্রাণপণে আমার হাত চেপে ধরল। আমিও শরীরের সমস্ত জোর লাগিয়ে চেষ্টা করতে লাগলাম যাতে স্রোতের কবল থেকে বাঁচিয়ে ওকে টিলার ওপর টেনে আনতে পারি কিন্তু আমার মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে ঐ শক্তিশালী স্রোতের বিরুদ্ধে লড়া সম্ভব হচ্ছিল না। দুজনেরই কব্জির জোর ক্রমশ শিথিল হয়ে আসছিল। চোখের সামনে প্রিয় বন্ধুকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যেতে দেখে যেন আরও দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। সেদিনের ঐ তীব্র যন্ত্রণাময় মুহূর্তের কথা এজন্মে ভুলব না!

ক্রমবর্ধমান জলের স্তর এরপর প্রতিমের শরীরকে ডোবাতে শুরু করল। ঠিক তখনই আরেকটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটল! দেখলাম বিজয় কখন যেন আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ওর সারা শরীর ভেজা আর চোখদুটো থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে রাগ ও ভয় মেশানো এক অদ্ভুত দৃষ্টি!

অপ্রকৃতিস্থের মতো জামা-প্যান্ট হাতড়ে বুক পকেট থেকে গোলাকার কি যেন একটা বার করে হাতের মুঠোয় রেখে বিজয় বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে শুরু করল। তারপর প্রতিম ও আমাকে কিছু বুঝতে না দিয়ে সোজা ঝাঁপ দিলো জয়ন্তীর বুকে!

এই দৃশ্য দেখে আতঙ্কে আমার মুখের ভাষা হারিয়ে গেল। প্রতিমকেও দেখলাম বিজয়ের এই হঠকারিতায় নিজের মৃত্যু-চিন্তা ভুলে অবাক চোখে জলের দিকে তাকিয়ে আছে!

বিজয় ঝাঁপ দেবার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জানি না কেন স্রোতের তেজ ও প্রবাহ কমতে আরম্ভ করল! কিন্তু কপালে দুর্ভোগ থাকলে যা হয়! সেই করাল স্রোত শান্ত হবার আগে তার শেষ ছোবলটা দিয়ে গেল। টিলা থেকে একটু দূরেই মড়মড় শব্দে একটা গাছের ডাল ভেঙে তিরবেগে ছুটে এসে লাগল প্রতিমের মাথায়!

গলা থেকে যন্ত্রণাক্লিষ্ট শব্দ বার করে প্রতিম আমার হাত ছেড়ে দিয়ে টিলা থেকে গড়গড়িয়ে জলে পড়তে লাগল। আমিও টাল সামলাতে না পেরে ঠিক একই ভাবে অনুসরণ করলাম ওকে!”

 

 

অষ্টম পর্ব: মহাপুরুষের সান্নিধ্যে!

“যখন জ্ঞান ফিরল, দেখলাম একটা অন্ধকার ঘরের ভেতরে মাটির মেঝেতে তালপাতার চাটাইয়ের ওপর শুয়ে আছি। অসম্ভব যন্ত্রণায় মাথার সমস্ত শিরা-উপশিরাগুলো যেন ছিঁড়ে পড়ছে। শরীরের পেশিগুলো ব্যথায় জর্জরিত। এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম যে শত চেষ্টাতেও সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াতে পারছিলাম না।

তখনই একটা বেশ গুরুগম্ভীর গলা শুনতে পেলাম – ‘মাঝে মাঝে উঠে দাঁড়ানোর জন্য মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়াও জরুরি। এতে নিজেকে যাচাই করার সময় ও সুযোগ দুটোই মেলে। নিজেকে যদি কেউ চিনতেই না পারে তাহলে তার পক্ষে বেশিদিন দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়!’

আমাদের সবার জীবনেই এমন কিছু কথা থাকে যা চাইলেও ভোলা যায় না। ঐ উক্তিটাও ঠিক তেমনই। যখনই কোনো বিপদে পড়ি বা কোনো কারণে মানসিক চাপ বেড়ে যায়, বুঝতে পারি না যে আমার পরবর্তী পদক্ষেপ কি হওয়া উচিত, তখন এই উক্তিটা আমায় খুব সাহায্য করে চলার পথে এগিয়ে যেতে।

      যাই হোক, অমন ব্যারিটোন ভয়েস শুনে চোখ তুলে তাকাতেই দেখলাম ঘরটার পূর্বদিক থেকে কেউ একজন আমার উদ্দেশ্যে কথাটা বললেন কিন্তু ঘরের ভেতরে চাপা অন্ধকার থাকায় বক্তার মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। তিনিও হয়তো আমার মনের ভাব বুঝতে পেরেছিলেন, বললেন – ‘নন্দকিশোর! প্রদীপটা জ্বালো দেখি’

      প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোকশিখায় ঘর আলোকিত হতেই দেখতে পেলাম মানুষটাকে। সরলতা ও কাঠিন্য মেশানো এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তিনি আমার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। ওনার চোখে চোখ রাখতেই যেন তীব্র এক ঝাঁকুনি অনুভব করলাম সারা শরীর জুড়ে। আমার সমস্ত অতীত ও বর্তমান এক নিমেষে চোখের সামনে ভেসে উঠল।

ঐ তীব্র দৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে চোখ নামিয়ে নিলাম। তবে একটি বিষয়ে নিশ্চিত হলাম যে ইনি কোনও সাধারণ মানুষ নন… হতেই পারেন না!

‘মহাপুরুষ’ শব্দটি ততদিন শুধু বইয়ের পাতাতেই পড়ে এসেছি, কোনোদিন যে ঐ ধরণের মানুষের মুখোমুখি হবো, স্বপ্নেও ভাবিনি কিন্তু সেদিন বুঝেছিলাম মহাপুরুষেরা হয়তো এমনই হন!

      তিনি আবার বললেন – ‘নন্দ ওর শরীর দুর্বল। ওকে ধরে দাঁড় করিয়ে আমার সামনে নিয়ে এসো’

নন্দদার সঙ্গে সেই আমার প্রথম পরিচয়। ছিপছিপে চেহারা, পরনে সাদা ধুতি আর ফতুয়া। নন্দদা এগিয়ে এসে আমাকে চাটাই থেকে পাটকাঠির মতো তুলে সোজা দাঁড় করিয়ে দিলো। তারপর কাঁধে ধরে এগিয়ে নিয়ে গেল পদ্মাসনে বসে থাকা পুরুষটির দিকে। বলল – ‘ইনি গুরুদেব রুদ্রাক্ষ!’

দৃষ্টিভ্রম নাকি সত্যিই দেখেছিলাম কিনা জানিনা, কিন্তু সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছিল প্রদীপের কম্পমান আলোকশিখা ছাপিয়ে যেন এক অদ্ভুত রশ্মি বিকিরিত হচ্ছে ওনার দেহ থেকে! আমি যত ওনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম ততই আমার দেহ হালকা, মন শান্ত হতে শুরু করেছিল। আমি শ্রদ্ধাবনত হয়ে ওনার পা ছুঁয়ে প্রণাম করলাম।

গুরুদেব ততক্ষনে বেদী ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। দেখলাম প্রায় সাড়ে ছ’ফুট লম্বা দীর্ঘদেহী মানুষটির গাত্রবর্ণ ধূসর। হয়তো দীর্ঘদিন ধরে ছাই মাখবার ফল। মাথায় জটা, মুখ-ভর্তি দাড়ি, ললাটে ত্রিপুন্ড্রু। পরনে কৌপীন, ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। গলায় রুদ্রাক্ষ ও আকন্দ ফুলের মালা।

তিনি আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বললেন – ‘জয় শিবশম্ভু! মহাদেব তোমার মঙ্গল করুন’

“গুরুদেব সবসময়ই এই কথা বলেই আশীর্বাদ করেন, তাই না?” – অনেকক্ষণ পর মুখ খুলল কামিনী। ও যে একমনে গল্প শুনে যাচ্ছিল আর মনে মনে রোমাঞ্চ অনুভব করছিল সেটা ওর মুখ-চোখ দেখেই বুঝতে পেরেছিল বন্ধন। বলল –

“হ্যাঁ! গুরুদেব মনে করেন যে এই জগতে যা কিছু ঘটছে সবই মহাদেবের কৃপায়। তিনি মহাদেবের এক সামান্য আজ্ঞাবাহক মাত্র।

আমি ওনাকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়াতেই নজরে পড়ল দৃশ্যটা – ঘরের বাঁ-দিকে আরেকটি তালপাতার চাটাইয়ের ওপর প্রতিমের দেহ মাটিতে শোয়ানো! নিঃশ্বাসের মাত্রা ক্ষীণ! শরীর ফ্যাকাশে ও রক্তশূন্য!

প্রতিমকে ঐ অবস্থায় দেখে আমি আঁতকে উঠলাম।

 

 

নবম পর্ব: অলৌকিক!

“প্রতিম দা’কে যে ওভাবে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলে, তারপর কি হল? কে উদ্ধার করে নিয়ে এলো তোমাদের? গুরুদেব?” – পরপর অনেকগুলো প্রশ্ন করল কামিনী।

      বন্ধন বলল – “না গুরুদেব নন, নন্দদা। আর তারপর একে একে যে সমস্ত ঘটনা ঘটে চলল, সেগুলোর সঠিক কারণ বা ব্যাখ্যা কোনটাই আমার জানা নেই। শুধু এটুকু জানি যে গুরুদেব না থাকলে আমাদের আর সে যাত্রায় বেঁচে ফেরা হত না। বলছি শোনো –

প্রতিমকে ঐ অবস্থায় দেখে আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। নন্দদা এগিয়ে এসে না ধরলে আমি প্রায় মাটিতে পড়েই যাচ্ছিলাম!

গুরুদেব প্রতিমের দিকে নির্দেশ করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন – ‘ও তোমার কে হয়? বন্ধু?’

আতঙ্কে বাকরুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় কথা বলার মতো শক্তি ছিল না আমার। গুরুদেবের প্রশ্নের উত্তরে আমি শুধু ঘাড় নেড়ে সায় দিলাম।

গুরুদেব বললেন – ‘মহাদেবের কৃপায় খুব জোর বেঁচে গিয়েছ তোমরা দুজনে। নন্দকিশোর না থাকলে তোমাদের আজ রক্ষে ছিল না! ও’ই তোমাদের এখানে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে’

একথা শুনে আমি সজল নয়নে একবার প্রতিমের দেহের দিকে দেখলাম, তারপর নন্দদার দিকে ফিরে দু’হাত জড়িয়ে ধরে বললাম – ‘তোমার এই ঋণ আমি এজন্মে শোধ করতে পারবো না দাদা কিন্তু তুমি কি শুধু ওখানে আমাদের দুজনকেই দেখতে পেয়েছিল? আর কাউকে দেখনি?’

আমার একথা শুনে নন্দ’দা ও গুরুদেব একে অপরের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে কথা বলে নিলেন। তারপর গুরুদেব বললেন –

‘সময় হলে সব জানতে পারবে বাবা। তার আগে তোমার বন্ধুকে সুস্থ করে তোলা জরুরি। তুমি এদিকে সরে এসো। আমার কিছু কাজ আছে। তুমি চাইলে বাইরে গিয়েও বসতে পারো। তোমার যা শারীরিক ও মানসিক অবস্থা তাতে এই ঘরে এখন যা ঘটবে তা তোমার কাছে অসহনীয় মনে হতে পারে!’

গুরুদেবের কথা শুনে আমি ওনাকে সরাসরি বললাম যে বাইরে নয়, আমি ঘরেই থাকতে চাই। নিজের প্রিয় বন্ধুর সবচেয়ে বিপদের দিনে তার সঙ্গ ত্যাগ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, সে আমি যতই অসুস্থ হই না কেন।

তাছাড়া নন্দদা বাকিদের হদিশ পায়নি শুনে ততক্ষণে আমার মন কষ্টে-যন্ত্রণায় পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। জয়ন্তীর ধারে আমাদের সঙ্গে ঘটা সেই ঘটনা যে কোনোভাবেই সাধারণ নয়, সেটুকু আমি বুঝে গেছিলাম। তাই তখন মানসিকতা এমন হয়ে গিয়েছিল যে যা খুশি ঘটুক আমি জানি, আমি আর ঘাবড়াবো না।

আমার উত্তরে গুরুদেব হয়তো সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তিনি বললেন – ‘ঠিকই তো! বন্ধুত্বের মতো জোরালো ও শুভ শক্তি এই জগতে কমই আছে। তুমি এখানেই বসো বাবা। শুধু বন্ধুকে দেখে ঘাবড়ে যেও না বা আবেগপ্রবণ হয়ে আমার কাজে বাঁধা দিও না!

নন্দ তুমি দেহটাকে ঘরের ঠিক মাঝে এনে শুইয়ে দাও। আমি পঞ্চপত্রিকার ক্বাথটা নিয়ে আসছি!’

নন্দদা প্রতিমের দেহটাকে পুতুলের মতো এক হাতে তুলে নিয়ে ঘরের মাঝে এনে শুইয়ে দিল। গুরুদেবের হাতে দেখলাম পোড়ামাটির গ্লাস, তাতে সামান্য পরিমাণ গাঢ় সবুজ বর্ণের ক্বাথ, এক ঝলক দেখলে মনে হবে কাঁচা জলপাই বাঁটা।

জড়িবুটি, তুকতাক, জাদুটোনা এসবে আমার কোনোদিনই বিশ্বাস ছিল না। সত্যি বলতে কি এখনও নেই, ভবিষ্যতেও হবে না কিন্তু সেই ক্বাথের যা গুণাগুণ সেদিন দেখেছিলাম তারপর থেকে ঠিক করেছিলাম যে বিশ্বাস করি বা না করি, এইসব বিষয়ে কারোর সাথে অযথা তর্কে জড়াবো না!

গুরুদেব গ্লাসটা হাতে নিয়ে প্রতিমের দেহের পাশে বসে পড়লেন। ওর এই অবস্থা দেখে আমার কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছিল। হাত জোর করে মহাদেবের কাছে প্রার্থনা করছিলাম যেন তিনি ওকে সুস্থ করে দেন। বাকিদের তো ফেরাতে পারবো না আর, অন্তত প্রতিমকে নিয়ে যেন ফিরতে পারি। ছেলেটা প্রথমেই বলেছিল সবাইকে বড় মহাকাল মন্দিরে যেতে। সেই কথা শুনলে আজ হয়তো আর এমন দিন দেখতে হত না।

গুরুদেব পরম মমতায় প্রতিমের মুখ হাঁ করিয়ে গ্লাস থেকে পঞ্চপত্রিকা নামের ক্বাথটা ওর গলায় ঢেলে দিলেন। তারপর বললেন – ‘পিছিয়ে এসো সকলে। নন্দ ফল দুটো রেখে দাও ওর পাশে’

নন্দদাকে দেখলাম তড়িঘড়ি করে দুটো পাকা কলা প্রতিমের পাশে রেখে পিছিয়ে এলো। তার ঠিক কয়েক সেকেন্ড পর থেকেই শুরু হল এক অলৌকিক ঘটনা –

প্রতিমের শরীরটা প্রথমে টানটান হয়ে উঠল। কয়েক সেকেন্ড পর আবার কুঁকড়ে গেল। তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে প্রতিম সোজা হয়ে মাটি থেকে উঠে দাঁড়াল।

প্রতিমের দেহে এই বারংবার পরিবর্তন দেখতে পেয়ে সেদিন যে কি ভয় পেয়েছিলাম কল্পনা করতে পারবে না। একজন মানুষ কি করে এমন করতে পারে আজও আমার তা বোধগম্য নয়।

প্রতিম এরপর দাঁড়ানো অবস্থা থেকে মাটিতে হাত-পা ছড়িয়ে বসে পড়ল। ওর ঘনঘন শ্বাস পড়ছে। মুখ থেকে লালা ঝরছে। তারপর চোখ খুলে ঘোলা দৃষ্টিতে একবার আমাদের দেখে নিয়ে প্রতিম কলা দুটোর ওপর শিকারি জন্তুর মতো হামলে পড়ল।

ভাইকে যখন মহানন্দার ধারে ওভাবে শূন্যে ভেসে থাকতে দেখেছিলাম তবুও কেন ভয় পাইনি জানো? কারণ অতিপ্রাকৃত বা অলৌকিক যাই বলো না কেন, সেই শক্তির সঙ্গে ততদিনে আমার পরিচয় হয়ে গিয়েছিল গুরুদেব রুদ্রাক্ষের ছোট্ট মাটির ঘরে!”

দশম পর্ব: উদ্ধার রহস্য!

“কিছুক্ষণ পরেই সুস্থ হয়ে গিয়েছিল প্রতিম। সুস্থ মানে পুরোপুরি সুস্থ! দেহে কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্নমাত্র নেই। রক্তশূন্য ভাবটাও কেটে গিয়েছে। উদ্ভ্রান্তের ছাপ মুছে গিয়ে চোখে স্বাভাবিক দৃষ্টি। অবাক হয়ে আমি ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।

আমাকে অসহায়ের মতো বসে থাকতে দেখে প্রতিম ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল। বলল – ‘তুই ঠিক আছিস তো? বাকিরা কোথায়?’

      ওর প্রশ্নের কি উত্তর দেবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বুকফাটা কান্না বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে। প্রতিম আমাকে আগলে ধরে বসে রইল। গুরুদেবকে দেখলাম নন্দদার কানে কানে কি যেন বললেন। নন্দদাও তাতে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে আমাদের দিকে ফিরে বলল – ‘তোমরা আমার সঙ্গে এসো’

      নন্দদার কথা মেনে আমরা ওর পিছুপিছু গেলাম। প্রতিমই ধরে ধরে নিয়ে গেল আমাকে। বাইরে তখন রাত। সময়ের হিসেব রাখার ইচ্ছে বা শক্তি, কোনটাই আর অবশিষ্ট ছিল না আমার ভেতরে।

বারান্দায় দুটো চটের আসন পেতে দিয়ে নন্দদা আমাদের বসতে বলে ঘরের ভেতরে গেল। কিছুক্ষণ বাদে দু’হাতে দুটো বাটি নিয়ে বেরিয়ে এল। আমাদের সামনে বাটি দুটো মাটিতে রেখে বলল –

‘সারাদিন কিছু খাওনি তোমরা। ওতে মধু মেশানো দুধ, খই আর ত্রিনয়নী গাছের ছালের নির্যাস আছে। খেয়ে নাও। দেখবে দেহে বল ও মনে জোর, দুটোই ফিরে পাবে। পেশি ও স্নায়ুকে নিমেষের মধ্যে সতেজ করে তুলতে ত্রিনয়নীর ছালের কোনও বিকল্প নেই’

আমাদের তখন অতশত ভাবার সময় ছিল না। খিদের জ্বালায় নিমেষের মধ্যে দুজনে দু’বাটি দুধ-খই শেষ করে দিলাম।

আমাদের খাওয়া শেষ হতেই নন্দদা বলল – ‘ঐ যে মহাদেবের মন্দিরটা দেখতে পাচ্ছ, গুরুদেব তোমাদের সেখানে গিয়ে বসতে বললেন। তিনি খানিকক্ষণ বাদেই স্নান সেরে আসছেন। তোমাদের সঙ্গে কিছু জরুরি কথা রয়েছে ওনার’

প্রতিম বলল – ‘আপনাকে আমরা দাদা ডাকতে পারি তো? আপনাকে তো দেখলে আমাদের বয়সী বা আমাদের চেয়ে সামান্যই বড় মনে হয়’

‘অবশ্যই ডাকতে পারো। আমি তোমাদের দাদার মতোই। আর আপনি নয় তুমি করেই ডেকো’ – নন্দদা হাসিমুখে জবাব দেয়।

প্রতিম সম্মতি পেয়ে বলল – ‘নন্দদা, আমরা ঠিক কোথায় আছি তুমি কি বলতে পারবে একটু?’

‘আমরা এখন বড় মহাকাল মন্দির থেকে আরও কিছুটা উত্তর দিকে রয়েছি’ – নন্দদার কথা শুনে প্রতিম দেখলাম অবাক হয়ে গেল। বলল –

 ‘কিন্তু আমরা তো বড় মহাকালের দিকে আসিইনি। পুরোপুরি উল্টো পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম। আর বন্ধন বলল তুমি নাকি আমাদের উদ্ধার করে নিয়ে এসেছ! এতদূরে আমাদের নিয়ে এলে কিভাবে?’

প্রতিমের প্রশ্নবাণের সামনে নন্দদা দেখলাম কেমন যেন চুপসে গেল! শুধু বলল – ‘তোমাদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর গুরুদেবের কাছে আছে। তিনিই যা বলার বলবেন। আমি আসি। আমার অনেক কাজ পড়ে আছে’

একথা বলে নন্দদা প্রায় ঝড়ের বেগে আমাদের সামনে থেকে উধাও হয়ে গেল। আমি ও প্রতিম শুধু অবাক হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম!”

 

 

একাদশ পর্ব: অশুভের উৎস সন্ধানে!

শিব মন্দিরের সামনে গিয়ে বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই গুরুদেব স্নান সেরে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। দেখলাম, পরিধান বদলে তিনি সাদা ধবধবে ধুতি আর খদ্দরের পাঞ্জাবি পড়েছেন। জটা ও দাড়িটুকু বাদ দিলে, আমাদের দেখা সেই যোগী মানুষটি পুরোপুরি উধাও!

মুখ দেখে মনের কথা পড়ার অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে গুরুদেবের। অনেকবারই তার প্রমাণ পেয়েছি আমি। তবে সেদিনই প্রথম সুযোগ পেয়েছিলাম ওনার সেই ক্ষমতা চাক্ষুষ করবার কারণ গুরুদেব বললেন –

‘তোমরা ভাবছ আমি আদতেই কোন সাধু-টাধু কিনা! নাকি কোনো ভণ্ডের পাল্লায় পড়লে! কি তাইতো?’

      একথা শুনে প্রতিম আর আমি দুজনেই লজ্জায় পড়ে গেলাম। গুরুদেব বললেন –

‘এমন ভাবনা আসা স্বাভাবিক। আমরা সাধু মানেই বুঝি চালচুলোহীন একজন মানুষ যার কোনো বাড়িঘর নেই, ভালো পোশাক-আশাক নেই। সে একদম একা। এই সমগ্র ত্রিভুবনই তার সংসার, তার বাড়িঘর। তার ওপর যে সাধুরা আবার মহাদেবের অনুগামী তাদের তো আরও মুশকিল। ভালো ও মানানসই জামাকাপড় পড়লেই তাদের জাত-কূল, ভক্তি-সাধনা সব শেষ।

তোমাদের মনের ভাব বুঝতে পেরেছি বলে লজ্জা পেও না। তোমাদের লজ্জিত বা অপমানিত করার ইচ্ছে নিয়ে আমি কথাটা বলিনি। তোমাদের কাছে যাতে আমার পরিচয় নিয়ে কোনো ভুল বার্তা না যায় সেটা বলে দেবার জন্যই কথাগুলো বললাম। এর আগেও বহুবার এই ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি তো!

      প্রথমেই বলে রাখি, নন্দ আমাকে গুরুদেব ডাকে বলে ভেবো না আমি কোন সাধু বা যোগী পুরুষ কিংবা ওর গুরুদেব। আমি মহাদেবের আরাধনা করি নিজের মানসিক ও আত্মিক শান্তিলাভের জন্য। আর তার সাধনা করতে গেলে কিছু নিয়ম নীতি রয়েছে, তাই আমাকে সেই ধরনের বস্ত্র পরিধান করতে হয়, আচার নিয়ম মানতে হয়।

মহাদেব আমার জীবনের আধার, সব দুঃখ-কষ্ট, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনার উৎস। এই জগতে যা কিছু কল্যাণকর জিনিস ঘটে চলেছে সবই তার অঙ্গুলিহেলনে। তিনিই আবার সময় এলে অশুভের বিনাশ করে জীবকুলকে রক্ষা করেন। আমি তার এক সেবক মাত্র। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে মানুষের মধ্যে শিব শক্তির সঞ্চার করে বেড়াই। সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশতে হলে, আত্মিক সংযোগ স্থাপন করতে হলে তাদের মতো পোশাক-আশাক পড়া, তাদের আচার-আচরণ শেখা খুবই জরুরি। এতে তারা আমাকে তাদের নিজেদের একজন মনে করেন। তাছাড়া ওরকম যোগীদের মতো বেশ দেখলে লোকজন ভক্তি করে কম, ভয় পায় বেশি। ভাবে ওনাদের কথা না শুনলে তন্ত্র-মন্ত্র করে যদি সাধুরা তাদের ক্ষতি করেন।

এই প্রচলিত ধ্যানধারণা ভাঙবার উদ্দেশ্যে আমার গুরুদেব আদিনাথ শাস্ত্রী আমাকে শৈশবকাল থেকেই আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো গড়ে তুলেছেন কিন্তু তাই বলে যোগ-সাধনার আদি রীতিনীতি থেকেও আমাকে বিচ্যুত হতে দেননি। তিনি বলতেন, ভয় দেখিয়ে বা জোর করে যেমন কারোর অন্তরে শিবশক্তির সঞ্চার করা যায় না তেমনি মহাদেবের আরাধনাও কোন ছেলেখেলার বিষয় নয়’

      ‘শিবলিঙ্গ ও মন্দিরটা কি আপনার নিজে হাতে গড়া গুরুদেব? আচ্ছা, আপনাকে আমরাও গুরুদেব বলে ডাকতে পারি তো?’

– আমার কথা শুনে গুরুদেব রুদ্রাক্ষ হেসে বলেছিলেন –

‘অবশ্যই পারো বাবা! অবশ্যই পারো! আর হ্যাঁ, ঐ শিবলিঙ্গ আর প্রভু নন্দীর মূর্তি আমিই গড়েছি।

গুরুদেবের সঙ্গে পদব্রজে ভ্রমণের সময় নেপালের এক গ্রামে কিছুদিন ছিলাম। সেই গ্রামের মানুষদের প্রধান জীবিকাই ছিল পাহাড় থেকে পাথর সংগ্রহ করে খাবারের থালা-বাটি-গ্লাস, ঘর সাজাবার বিভিন্ন সরঞ্জাম, ঠাকুরের মূর্তি বানানো ও বিক্রি করা। আমিও তাদের সঙ্গে থেকে থেকে শিখে নিয়েছিলাম কিভাবে সঠিক পাথর চিনতে হয়, ছেনি ও বাটালী দিয়ে কাটতে হয়, আকার-আকৃতি দিতে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।

তাই প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর আগে যখন প্রথমবার এখানে আসি, আসার পথে দেখেছিলাম সামনের একটি পাহাড়ের ঢালু অংশের দিকে ঘন কালো রঙের দুটো বড় পাথর পড়ে ছিল। পাথর-দুটো নজরে আসা মাত্রই আমার ইচ্ছে হয় যে একে দিয়ে আমি শিবলিঙ্গ ও প্রভু নন্দীর মূর্তি গড়ব। নন্দ ও আমি খুঁজতে খুঁজতে এইখানে আস্তানা গড়ার স্থান খুঁজে পেলে একদিন গিয়ে দুজনে মিলে ধরাধরি করে পাথর-দুটোকে এখানে নিয়ে আসি। তারপর নন্দ কাঠ ও বাঁশ কেটে মন্দির বানায় আর আমি পাথর কুঁদে মূর্তি দুটো তৈরি করে তিথি মেনে মন্দিরে স্থাপন করি। আর সঙ্গে যে ত্রিশূলটা দেখতে পাচ্ছ, গুরুদেব আমাকে তা আশীর্বাদস্বরূপ দিয়েছিলেন।

আমার কথা অনেক হল। এবার বলো তোমাদের মনে কি কি প্রশ্ন জমে রয়েছে। আমি যথা সামর্থ্য তার উত্তর দেবো’

      গুরুদেব যে ফের আমার মনে কথা পড়ে ফেললেন সেটা বুঝতে পেরে এবার আর আমি অবাক হলাম না। ওনার ক্ষমতা বা উদারতা নিয়ে আমার মনে আর কোনো সংশয় ছিল না!

জিজ্ঞেস করলাম – ‘গুরুদেব আপনি বললেন নন্দদা আমাদের জয়ন্তীর ধার থেকে নিয়ে এসেছে। প্রতিমের মুখে শুনলাম সেই জায়গা নাকি এখান থেকে অনেকটাই দূরে। উনি এই এবড়োখেবড়ো পাহাড়ি রাস্তায় আমাদের এতদূর নিয়ে এলেন কিভাবে? এখানে তো গাড়িঘোড়াও চলা সম্ভব নয়। সকলে শুনেছি পায়ে হেঁটে বড় মহাকাল মন্দিরে পুজো দিতে আসেন’

      ‘কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তর জানতে নেই বাবা। তোমরা শুধু এইটুকু জেনে রাখো যে মহাদেব কৃপা করেছেন বলেই তোমরা আজ রক্ষা পেয়েছে’ – গুরুদেবের মুখে একথা শুনে বুঝলাম তিনি আমার প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেবেন না। আমিও ওনাকে আর এই বিষয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে অসম্মান করলাম না।

প্রতিমও ‘একটু আসছি’ বলে উঠে যেতেই আমি গুরুদেবকে বললাম  – ‘প্রতিমকে আপনি ওটা কি খাইয়েছিলেন গুরুদেব? ওর শরীর এভাবে দুমড়ে-মুচড়ে গেল। তারপর ও হিংস্র পশুর মতো কলাগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কি ছিল ঐ ক্বাথে গুরুদেব?’

গুরুদেব বললেন – ‘তোমার সামনেই তো তখন নামটা বললাম নন্দকে – পঞ্চপত্রিকার ক্বাথ, মানে পাঁচ ধরণের ভেষজ পাতা বেটে তাতে মধু মিশিয়ে ওটা তৈরি করা হয়। গুরুদেব আদিনাথ শাস্ত্রীর কাছ থেকে শিখেছিলাম। দারুণ কাজের জিনিস’

‘এই পঞ্চপত্রিকা বাঁটা যে দারুণ কাজের জিনিস সেই বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহ নেই! আমি তো ভেবেছিলাম প্রতিমকে বাঁচানোই যাবে না। আপনি ও পঞ্চপত্রিকা না থাকলে যে কি হত!

কিন্তু গুরুদেব, প্রতিমের কি মনে নেই যে ওর সঙ্গে কি কি হয়েছিল ক্কাথটা খাবার পর?’

– আমার প্রশ্ন শুনে গুরুদেব বললেন – ‘নাহ! কারণ এই ক্বাথ পেটে যাওয়া মাত্র মানুষ আর তার নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সে আদিম, জান্তব ও উন্মাদ হয়ে ওঠে। সেই কারণেই ক্বাথের প্রভাব কাটাতে ফল খাওয়ানো হয়। যাতে ধীরে ধীরে মানুষটির হিংস্রতা কেটে গিয়ে মানবিক সত্ত্বা ফিরে আসে’

‘গুরুদেব, কোন কোন পাঁচটি পাতা এতে ব্যবহার হয় তা কি বলা যাবে? নাকি সেগুলো কোনো গোপনীয় উপকরণ?’ – আমার কৌতূহলের মাত্রা তখন এতটাই বেশি যে নির্লজ্জের মতো জিজ্ঞেস করে ফেললাম গুরুদেবকে। তিনি কিন্তু কোনো রাগ বা লুকোছাপা করলেন না –

‘অবশ্যই যাবে! আমার কারোর কাছ থেকে কিছু লুকোনোর নেই। কিন্তু যে পাঁচটি পাতা এতে ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে দুটি পাতা সাধারণ মানুষের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। আর যদি অসৎ মনোবৃত্তি নিয়ে কেউ সেগুলো সংগ্রহ করে ক্বাথ বানিয়ে খায়ও তাতেও আদি শক্তির রোষানলে পড়বার আশঙ্কা থাকে। তাৎক্ষনিক মৃত্যু অবধি হতে পারে। গুরুদেবের আদেশ মেনে আমি তাই খুব বিপদে না পড়লে পঞ্চপত্রিকার ক্বাথ ব্যবহার করি না। গুরুদেবও করতেন না।

এই ক্বাথে আছে সর্পগন্ধা গাছের দুটো কচি পাতা, একটি বড় মাপের কালো ধুতরোর পাতা, নব্বইটি মহাবেল গাছের পাতা, কৈলাস পর্বতের পাদদেশ থেকে সংগ্রহ করা নাকপোচেন উদ্ভিদের আটটি পাতা এবং নীলগিরির আদিমূল গাছের সাতটি পাতা – সর্বমোট ১০৮টি পাতা বেটে তাতে মধু মিশিয়ে এটা তৈরি করা হয়’

প্রতিম ততক্ষনে ফিরে এসেছে। পিছুপিছু নন্দদাও। প্রতিম কোন রাখঢাক না রেখে গুরুদেবকে সরাসরি প্রশ্ন করল – ‘বাকিরা কোথায় গুরুদেব? ওরা কি আর বেঁচে নেই? নন্দ’দা তো সঠিক ভাবে কিছুই বলছে না। দয়া করে আপনি সত্যিটা বলুন আমাদের’

বুঝতে পারলাম উত্তর পাবার জন্য প্রতিম ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। নন্দদাকে অবধি ডেকে নিয়ে এসেছে ঘর থেকে। গুরুদেব, প্রতিমের কথা শুনে কি যেন একটা ভাবলেন। তারপর শিবলিঙ্গের সামনে এগিয়ে গিয়ে জ্বলতে থাকা প্রদীপের সলতেটাকে আরেকটু উসকে দিয়ে বলতে শুরু করলেন –

‘জন্ম-মৃত্যু সবই বিধাতার লিখন। তিনি যাকে যতটুকু আয়ু দিয়ে এই জগতে পাঠাবেন তার দৌড় ঠিক ততটুকুই। কিন্তু তখনই গণ্ডগোলের শুরু হয় যখন কেউ জন্ম-মৃত্যুর সদা ঘূর্ণায়মান চক্রকে ভাঙার খেলায় নামে। তোমরা সবাই নিজেদের অজান্তেই সেরকম একটি খেলায় পা দিয়ে ফেলেছ প্রতিম। তোমাদের পাশা খেলার ঘুঁটি বানিয়ে সে আমার উদ্দেশ্যে যুদ্ধের বার্তা পাঠিয়েছে! তবে আশার কথা এই যে তোমাদের বন্ধুরা এখনও হয়তো বেঁচে রয়েছে’

গুরুদেবের মুখে এমন হেঁয়ালিতে ভরা কথা শুনে কি বলবো ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তিনিও আমাদের কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজেই আবার বলতে শুরু করলেন –

‘ভেবেছিলাম তার সাথে লড়াইয়ে জড়াবো না কিন্তু আমার মৌনতাকে দুর্বলতা ভেবে সে এভাবে একের পর এক অন্যায় করে যাবে সেটা তো আর মেনে নেওয়া যায় না। নন্দ তুমি এক্ষুনি যাও। ওদের বন্ধুরা ঠিক কি অবস্থায় আছে সেটা দেখে এসো। সেই মতো পরিকল্পনা সাজাতে হবে। ওর সমস্ত পাপের হিসেব নেবার সময় হয়ে এসেছে!’

আমরা দেখলাম গুরুদেবের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই নন্দদা ঘরে ছেড়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম – ‘কার কথা বলছেন আপনি গুরুদেব?’

গুরুদেব চোয়াল শক্ত করে বললেন –

‘যার কথা বলছি সে একাধারে গুরুদেব আদিনাথ শাস্ত্রীর প্রথম ও শেষতম শিষ্য – ভুজঙ্গ ধর!’

 

দ্বাদশ পর্ব: শিষ্য-গুরু সংবাদ

“অতীত বড়ই জটিল জিনিস, তাই না?” – কামিনীর কথা শুনে জানালা থেকে মুখ ফেরাল বন্ধন। বয়স মাত্র আঠারো হলে কি হবে, তার স্ত্রী যে খুবই বুদ্ধিমতী বন্ধন তা জানে। ও হেসে জবাব দিল –

“একদম ঠিক বলেছ! বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা খারাপ অথবা ভালো যে ধরণের কাজই করি না কেন ভবিষ্যতে গিয়ে সেটা অতীতের রূপ ধারণ করে আমাদের জীবনে বিভিন্ন রকমের প্রভাব ফেলে।

গুরুদেব রুদ্রাক্ষ যার হাত ধরে এই শিব সাধনার পথে এসেছিলেন সেই আদিনাথ শাস্ত্রীর প্রথম শিষ্য ছিলেন ভুজঙ্গ ধর। শেষ শিষ্যও উনি”

“তাহলে গুরুদেব?” – বিস্মিত সুরে বলল কামিনী।

“আমরা যেমন গুরুদেবের শিষ্য নই, গুরুদেবও তেমনি আদিনাথ শাস্ত্রীর শিষ্য নন! কেন নন সেটা পরে জানতে পারবে।

তো সেই ভুজঙ্গ ধর নাকি এতটাই কুটিল ও স্বার্থলোভী ছিল যে আদিনাথ শাস্ত্রীর মতো মানুষের চোখকেও সে ফাঁকি দিতে পেরেছিল।

সেদিন গুরুদেবের মুখে ভুজঙ্গ ধরের কাহিনী এবং পরে স্ব-চক্ষে তার অশুভ কর্মকাণ্ডের সাক্ষী থাকবার পর এখন ভাবতে বসলে মনে হয় এই জগতে সবই সম্ভব!

      গুরুদেব আমাকে ও প্রতিমকে ভুজঙ্গের কাহিনী বলতে লাগলেন –

‘আদিনাথ শাস্ত্রী ছিলেন একজন ত্রিকালজ্ঞ পুরুষ। ত্রিকাল অর্থাৎ ভূত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ওপর ওনার দখল ছিল প্রশ্নাতীত। কিন্তু ত্রিকালজ্ঞ হয়ে ওঠা তো আর এত সহজ কাজ নয়!

তোমরা আধুনিক যুগের ছেলেপুলে। আমার পরবর্তী কথাটা শুনে আমাকে কি ভাববে আমি জানিনা, কিন্তু গুরুদেব আদিনাথ শাস্ত্রী তিনশো বছর বেঁচে ছিলেন!’

‘তিনশো বছর!’ – আমাদের দুজনের মুখ ততক্ষণে হাঁ হয়ে গেছে – ‘এও কি সম্ভব!’

একবার মনে হল আমরা যেন কোনো গুলবাজের আড্ডায় এসে উপস্থিত হয়েছি। আবার মনে হল এতক্ষণ অবধি যে সমস্ত ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি সেগুলো বিচার করলে একজন তিনশ বছর বয়স্ক মানুষের অস্তিত্ব থাকা অসম্ভবের কিছু নয়। জাপানে হামেশাই লোকজন একশো বছর পার করে দেয়। তাছাড়া অনেকের মুখেই শুনেছি যে আমাদের ভারতবর্ষেও আগে এমন অনেক যোগী, ঋষি, মুনি ছিলেন যারা দীর্ঘদিন ধরে বেঁচে থাকতেন এবং নিজের ইচ্ছায় দেহত্যাগ করতেন। আদিনাথ শাস্ত্রীও যদি তেমনই একজন যোগী বা ত্রিকালজ্ঞ হন, তাহলে ওনার কাছে তিনশো বছর বেঁচে থাকা কোনো ব্যাপারই নয়।

আমাদের অবাক করা মুখ দুটো দেখে গুরুদেব বললেন – ‘তোমরা চাইলে এই আলোচনা আমি এখানেই বন্ধ করে দিতে পারি। কোনো চমকপ্রদ কাহিনী শুনিয়ে বা জোর করে তোমাদের অলৌকিকতায় বিশ্বাস করাতে চাই না! নন্দ ফিরে এলে তোমাদের বন্ধুদের উদ্ধার করার কথা ভাবা যাবে নাহয়’

‘না! না! আপনি বলুন। আমরা আপনার কথায় সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেছি। আমাদের মিথ্যে বলে আপনার তো কোনো লাভ নেই গুরুদেব। আমরা নগণ্য দুই মানুষ’ – গুরুদেবের কথা শুনে প্রতিম অনুরোধের সুরে বলে উঠল।

‘ঠিক আছে। শোনো তবে –

গুরুদেব আদিনাথ শাস্ত্রী আজ থেকে প্রায় তিনশো চল্লিশ বছর আগে বর্তমান বেনারস শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বেনারস – ‘মহাদেবের আপন শহর’ – সেখানে গুরুদেব শিবশক্তির আবহে বড় হতে শুরু করেন এবং একদল অঘোরী সাধুর সঙ্গে খুব অল্প বয়সে গৃহত্যাগ করেন।

অঘোরীদের সঙ্গে কয়েক বছর কাটিয়ে তারপর বেরিয়ে পড়েন ভারতবর্ষের বিভিন্ন শিব-ক্ষেত্র দর্শনের উদ্দেশ্যে। ঘুরতে ঘুরতে তিনি কৈলাস মন্দিরে পৌঁছন। সেখানে যোগসাধনা, তন্ত্রমন্ত্র ইত্যাদি নানা বিষয়ে জানবার পর গুরুদেব তাতে মগ্ন হয়ে পড়েন। এভাবেই কিছু বছর চলার পর অমরনাথ ধাম দর্শন করতে গিয়ে ওনার নাকি এক গুপ্ত সমিতির সঙ্গে পরিচয় হয় যারা আদিশক্তি ও রুদ্রদেবের আরাধনা করে।

গুরুদেব তাদের দলে যোগ দিতে চাইলে সমিতির প্রধান জানান যে ওনাকে এভাবে আরও এক শতাব্দী অবধি পরিভ্রমণ করতে হবে এবং একজন যোগ্য শিষ্য জোগাড় করে পুনরায় এই সমিতিতে ফিরে আসতে হবে। তারপর তিনি এখানে যোগদান করার অনুমতি পাবেন। আদিশক্তির পরম্পরা বজায় রাখতে ও সমিতির সদস্য হওয়ার জন্য এই রীতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।

‘একশো বছর’ শুনে গুরুদেবও তোমাদের মতোই অবাক হয়ে গিয়েছিলেন যে ওনার মতো সামান্য মানুষ কিভাবে এতদিন ধরে বেঁচে থাকবেন!

সমিতিই এই অদ্ভুত সমস্যা সমাধানের উপায় বাতলে দেয়। তারা গুরুদেবকে বিভিন্ন কঠিন কঠিন পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে প্রস্তুত করে নেয়। কখনও তীব্র শীতল গুহায় ওনাকে মাসের পর মাস বন্দী করে রাখে, কখনও আবার জল-খাবার ছাড়াই মরুভূমির মাঝে রেখে দিয়ে আসে। এভাবে পঁচিশ বছর কাটে।

গুরুদেব যখন শারীরিক ও মানসিক ভাবে পুরোপুরি পরাস্ত হবার পর দিনরাত শুধুই মৃত্যুকামনা করতেন তখন একদিন ওনার প্রায় ভঙ্গুর দেহটাকে তুলে নিয়ে শ্মশানের চৌকাঠে বসিয়ে দেওয়া হয়। তারপর ওনার চারপাশে চন্দন কাঠ সাজিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়।

গুরুদেবের শরীরে বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট ছিল না যে এসবে তিনি বাঁধা দেবেন। ওনার কাছে তখন মৃত্যুই সবচেয়ে শান্তির। কিন্তু আশ্চর্যের কথা এই যে সেই চন্দনের আগুনে গুরুদেবের দেহ না পুড়ে ক্রমশ সুস্থ হতে শুরু করে। মানব জীবনের সবচেয়ে চরমতম সত্য – ‘মৃত্যু’-কে আলিঙ্গন করে গুরুদেব নতুন জীবন লাভ করেন। তারপর সমিতি থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়েন শিবশক্তির প্রসারে। তখনই গুরুদেবের সঙ্গে ভুজঙ্গ ধর-এর পরিচয় হয়।

গুরুদেব তখন মা কামাখ্যার মন্দির দর্শনে গিয়েছেন। ভুজঙ্গ সেইসময় মায়ের মন্দিরে আসা দর্শনার্থীদের অতি নিম্নমানের তন্ত্র-মন্ত্র আর হাত সাফাইয়ের খেলা দেখিয়ে পয়সা উপার্জন করতো। গুরুদেব তা দেখতে পেয়ে সবার সামনে ভুজঙ্গের কীর্তিকলাপ ফাঁস করে দেন। এতে কিন্তু ভুজঙ্গ রাগ করল না, প্রতিবাদও করল না। সন্ধ্যা হতেই সোজা ধ্যানমগ্ন গুরুদেবের পায়ের কাছে এসে পড়ল। ভোরবেলায় যখন গুরুদেব ধ্যান সেরে চোখ খুললেন, দেখেন ভুজঙ্গ ঠায় ওনার পায়ের সামনেই বসা। গুরুদেব ওকে কিছু না বলে উঠে গেলেন। ভুজঙ্গ কিন্তু হার মানল না! সে প্রতিদিন এসে গুরুদেবের পায়ের কাছে বসে থাকত।

এভাবে এক মাস চলল। ভুজঙ্গের নিষ্ঠা দেখে গুরুদেবের ওর ওপর মায়া হল। তিনি ভুজঙ্গকে জিজ্ঞেস করলেন যে সে কি চায়। ভুজঙ্গ করজোড়ে বলল – ‘শুধুই আপনার চরণ সান্নিধ্য চাই সাধুবাবা!’

এরপর পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে ভুজঙ্গ গুরুদেব আদিনাথ শাস্ত্রীর শিষ্য হিসেবে ওনার সঙ্গে থেকে গেলেন। সমিতিতে পুনরায় যোগ দেবার সময় হলে গুরুদেব ভুজঙ্গকে সঙ্গে নিয়েই সমিতিতে যান। তারপর কি হয়েছিল তা আর আমি জানিনা। গুরুদেবও বলেননি। এইটুকু কাহিনী শুনিয়ে আমাকে শুধু বলেছিলেন – ‘কখনও কাউকে নিজের শিষ্য বানাবে না রুদ্র। তালগাছের মতো মাথা উঁচু করে একলা দাঁড়িয়ে থাকবে আজীবন। মানুষের উপকার করবে কিন্তু বিনিময়ে কিছু চাইবে না। মানুষের প্রতি মায়া বড় অমোঘ বস্তু রুদ্র! সেই মায়াজালে নিজেকে জড়িয়ো না। একটা ভুল সিদ্ধান্ত সারাজীবনের জন্য আফসোসের কারণ হয়ে থেকে যাবে’

‘তাহলে যে উনি আপনাকে নিজের শিষ্য করেছিলেন? – প্রশ্ন করল প্রতিম।

‘শুনেছি আমার জন্মের দশ বছর আগে থেকেই নাকি উনি আমার মুখ বারবার ওনার দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পেতেন। তাই আমাকে নিজের ছায়ায় টেনে এনেছিলেন। কিন্তু কখনও কোনো দীক্ষা বা বীজমন্ত্র দেননি। তাই দেখতে গেলে আমি ওনার শিষ্য নই। বরং উনি আমাকে নিজের ছেলে হিসেবে স্নেহ করতেন। আগলে রাখতেন। আশৈশব শিব, সত্য ও ন্যায়ের শিক্ষা দিয়েছেন’

– গুরুদেবের মুখে একথা শুনে আমাদের চোখ ছলছল করে উঠল। জিজ্ঞেস করলাম – ‘নন্দদা কি তবে আপনার শিষ্য নয়?’

গুরুদেব বললেন – ‘ওর মুখে গুরুদেব ডাক শুনে ভেবেছ আমি ওর গুরুদেব? না! না! আমি নন্দর গুরুদেব নই, নন্দও আমার শিষ্য নয়। নন্দকে বরং তোমরা আমার বন্ধু ভাবতে পারো।

আসলে আমাদের সাক্ষাতের শুরুর দিন থেকেই নন্দ গোঁ ধরে বসে আছে যে আমাকে ও গুরুদেব সম্বোধনেই ডাকবে! বহুবার না করেছি, শোনেই না আমার কথা!’

বুঝলাম গুরুদেবও ওনার গুরুদেব আদিনাথ শাস্ত্রীর পথ অনুসরণ করে নন্দদাকে নিজের ছায়ায় টেনে এনেছেন। ঠিক যেমন প্রতিম ও আমাকে নিয়ে এলেন জয়ন্তীর ধারে ঘটা ঐ বিপদের হাত থেকে।

আমাদের গল্পের ফাঁকে নন্দ’দাও ফিরে এল। তবে একা নয়, সঙ্গে বিজয়! ওর গোটা শরীর ক্ষতবিক্ষত। পরনের জামা-প্যান্ট ছিঁড়ে গেছে। চোখমুখে স্পষ্ট দুর্বলতার ছাপ।

      আমরা ওকে ধরে বারান্দায় বসালাম। নন্দদা বাটিতে দুধ নিয়ে এলো। বিজয় কোনওমতে দুধটা খেয়ে শেষ করে মাটিতে শরীর এলিয়ে দিলো”

 

 

 

ত্রয়োদশ পর্ব: মাৎসর্য ষষ্ঠতম রিপু

“প্রায় তিন ঘণ্টা পর ঘুম ভাঙল বিজয়ের। তখন মধ্যরাত। উঠোনের মাঝে আগুন জ্বেলে সকলেই চিন্তামগ্ন অবস্থা বসে আছি। ঝিঁঝিঁ আর রাতচরা পাখির ডাক ছাড়াও দূরের জঙ্গল থেকে মাঝেমধ্যেই হাতি আর শেয়ালের ডাক ভেসে আসছে।

      ঘুম ভাঙতেই বিজয় হয়তো প্রথমে আমাকেই দেখতে পেয়েছিল। দুর্বল স্বরে ডাক দিল – ‘বন্ধন? এই বন্ধন? আগুনের কাছে কি ওটা তুই বসে আছিস?’

ডাক শুনে আগুনের সামনে থেকে উঠে আমি বিজয়ের কাছে গিয়ে বসলাম। আমাকে দেখে ও ভয়ার্ত গলায় বলল – ‘লোকটা ওদের মেরে ফেলবে বন্ধন। মতিদা! মতিদা…’

কোনোভাবেই বাক্যটা সম্পূর্ণ করতে পারছিল না বিজয়। যেন কোনো এক অদৃশ্য শক্তি ওর কথা বলার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে।

‘বদ্ধভাষিণী তন্ত্র!’ – বলে উঠলেন গুরুদেব। তারপর আমাদের অবাক করে দিয়ে গনগনে আগুনে অবলীলায় হাত ঢুকিয়ে একটা ছোট আকারের গরম কাঠকয়লা বার করে আনলেন। তারপর বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে কাঠকয়লাটাকে সোজা বিজয়ের কণ্ঠনালীতে চেপে ধরলেন!

গুরুদেবের কাণ্ড দেখে প্রতিম ও আমি ভয়ে আঁতকে উঠলাম। আর আমাদের অবাক করে দিয়ে কয়েক সেকেন্ড বাদেই বিজয় ফের স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে শুরু করল! দেখলাম, ওর গলায় কোনো রকমের ছ্যাঁকা বা পোড়ার দাগ নেই!

বিজয় একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল – ‘লোকটা ওদের মেরে ফেলবে বন্ধন! মতিদার মতো ভালো মানুষকে বশ করে ঐ শয়তানটা আমাদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করেছে আর তাতে সফলও হয়েছে।

গতকাল রাতে কেয়ারটেকার ছেলেটা আমায় আলাদা করে ডেকে নিয়ে এইকথাই বলেছিল কিন্তু তখন আমি বিশ্বাস করিনি। মতিদার মতো মানুষ আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে এটা কি বিশ্বাস করা যায় বল?

ছেলেটি আমায় বলেছিল যে, সেই তান্ত্রিক নাকি পরশু দিন ওদের গ্রামে গিয়ে দাবি করে যে তন্ত্রসাধনা ও পূজার জন্য বলি হিসেবে পাঁচজন মানুষকে ওর ডেরায় পাঠাতে হবে। হুমকিও দিয়েছিল যে যদি ওরা বলির জন্য আগামী দু’দিনের মধ্যে পাঁচজনকে না পাঠায় তাহলে নাকি অভিশাপ দিয়ে গোটা গ্রামে মড়ক ডেকে আনবে সেই তান্ত্রিক। প্রমাণ হিসেবে সে নাকি গ্রামের এক বয়স্ক বৃদ্ধকে সবার সামনে বশ করে তেপথির মাঝে দাঁড় করিয়ে কীসব মন্ত্রপূত জল ছেটাতেই বৃদ্ধের সারা শরীর মানুষের চোখের মতো হাজারো হাজারো চোখে ভরে যায় এবং তিনি তৎক্ষণাৎ মারা যান।

এই দৃশ্য দেখে গোটা গ্রাম আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় ভয়ে সিটিয়ে ছিল। তখন সেই কেয়ারটেকার ছেলেটি গ্রামের প্রধানের সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করে যে হোটেল থেকে কাউকে ভুলিয়ে ভালিয়ে ঐ তান্ত্রিকের ডেরায় পাঠাবে।

সেই মতো সে তান্ত্রিকের কাছে গিয়ে বশীকরণের জন্য একটি মন্ত্র-পাথর নিয়ে যখন রিসেপশনে এসে বসে তখনি আমরাও গেস্ট হাউসে এসে পৌঁছই। ছেলেটি সুযোগ বুঝে ঐ মন্ত্র পাথর মতিদার ব্যাগে চালান করে দেয় এবং সেই মন্ত্র পাথর মতিদাকে বশ করে ফেলে।

বিকেলবেলায় যখন আমরা সবাই ঘুমচ্ছিলাম তখন নাকি ছেলেটি মতিদাকে জঙ্গলের দিকে যেতে দেখে। মন্ত্র কাজে দিয়েছে কিনা সেটা যাচাই করতে ছেলেটি মতিদার পিছু নেয় এবং দেখে মতিদা তান্ত্রিকের আস্তানায় গিয়েই উঠেছে।

আমি জানি এসব বড্ড গাঁজাখুরি শোনাচ্ছে কিন্তু বিশ্বাস কর এসব ঘটনা ঘটেছে আর আমরা নিজেদের অজান্তেই সেই চক্রব্যূহে ফেঁসে গেছি। কাল থেকে বহুবার চেষ্টা করেছি তোকে এসব কথা বলার কিন্তু যখনই বলতে যাবো তখনই ভুলে যাচ্ছিলাম যে কি বলতে এসেছিলাম তোকে!’

‘এর নাম বদ্ধভাষিণী তন্ত্র! এই তন্ত্রের সঠিক প্রয়োগে কোন ব্যক্তির স্বাধীন ভাবে কথা বলার শক্তি কেড়ে নেওয়া যায়। ভুজঙ্গ ধর অতি ধুরন্ধর। সে হয়তো বুঝতে পেরেছিল কেয়ারটেকার ছেলেটা শেষ মুহূর্তে বিবেকের দংশনে দংশিত হয়ে তোমাদের সাহায্য করতে পারে। তাই  তোমাদের মতিদাকে দিয়ে তোমাদের সবাইকে ও নিজের বশে নিয়ে এসেছিল যাতে ওর পরিকল্পনা বানচাল না হয়ে যায়!’ – দৃঢ় কণ্ঠে বললেন গুরুদেব।

বিজয়ের এতক্ষণে ওনার ওপর নজর পড়ল। গুরুদেবকে তো তুমি দেখেইছো মিনি। ওনাকে দেখলে মনে এমনিতেই ভক্তিভাব জেগে ওঠে। বিজয়েরও তাই হল। যেন কোনো বাঁচার আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে, এমন মনোভাব নিয়ে ও লুটিয়ে পড়ল গুরুদেবের পায়ের কাছে।

আমি বললাম – ‘ইনি গুরুদেব রুদ্রাক্ষ আর পাশে উনি নন্দকিশোর দা। ওনাদের কৃপাতেই প্রতিম আর আমি রক্ষা পেয়েছিলাম জয়ন্তীর করাল গ্রাস থেকে’

বিজয় নন্দদাকে উদ্দেশ্য করে বলল – ‘আপনিই গুরুদেব রুদ্রাক্ষ? গতকাল থেকে শুধু আপনার নামই শুনে আসছি আমি। আমার প্রণাম গ্রহণ করুন!’

গুরুদেব বিজয়কে আশীর্বাদ করে বললেন – ‘জয় শিবশম্ভু! মহাদেব তোমার মঙ্গল করুন। তা আমার নাম কোথায় শুনলে বাবা?’

‘প্রথম শুনলাম সেই কেয়ারটেকার ছেলেটার মুখে। মতিদাকে  তান্ত্রিকের বশে এনে আমাদের সবাইকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবার ব্যবস্থা করার পর তার নাকি নিজেকে ঘোরতর পাপী মনে হচ্ছিল।

অজানা-অচেনা কিছু নিরপরাধ কমবয়সী ছেলের বলি হবে একথা যতবার তার মনে পড়ছিল ততবার সে নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছিল। অবশেষে আর থাকতে না পেরে আমায় রাতে ডেকে নিয়ে সব খুলে বলে। আমিও শুনে ভয়ে কাঁপতে থাকি। তারপর তাড়াহুড়ো করে বন্ধনকে বলতে এসে ভুলে যাই কি বলতে চেয়েছি। সে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। সারারাত অস্বস্তিতে ঘুম হয়নি আমার।

পরদিন কেয়ারটেকার ছেলেটি যখন দেখে তার বারণ সত্ত্বেও আমরা মতিদার সঙ্গে তান্ত্রিকের ডেরার পথেই যাচ্ছি তখন সে বুঝতে পারে আমাদের আর এই যাত্রায় বেঁচে ফেরা সম্ভব নয়।

তবুও সে আমাদের বাঁচাতে একটা শেষ চেষ্টা করে। আমার হাতে এই রুদ্রাক্ষটা দিয়ে বলে পথে কোনো বিপদ হলে যেন একে হাতের মুঠোয় ধরে তিনবার ‘ওম নমঃ শিবায়’ বলে ডাক দিই। বাকি যা করার রুদ্রাক্ষই করবে।

আমি যখন জিজ্ঞেস করি সে এটা কোথা থেকে পেয়েছে, ছেলেটি বলে গুরুদেব রুদ্রাক্ষ নামের একজন মহান মানুষ নাকি অনেকদিন আগে তাদের গ্রামে গিয়েছিল। তখন সে ছোট। গুরুদেব ওকে আশীর্বাদ স্বরূপ এই রুদ্রাক্ষটি দেন। তারপর থেকে আজ অবধি ছেলেটি কখনোই রুদ্রাক্ষটাকে নিজের কাছ ছাড়া করেনি কিন্তু আমাদের বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে যে পাপ ও করেছে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে ওর সব ভক্তি ও ভরসার আধার এই রুদ্রাক্ষ আমার হাতে তুলে দেয়’

– বিজয়ের কথা বলা শেষ হলে প্রতিম গুরুদেবকে বলল –

‘গুরুদেব আপনি কি আগে থেকে জানতেন যে এমন কিছু ঘটতে পারে? নাহলে কিভাবে…’

প্রতিমকে কথাটা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে গুরুদেব বললেন –

‘না! একদমই না। তবে চলার পথে কখনও কখনও কোন মানুষকে দেখলে কেন জানিনা আমার নিজের ভেতরে এক ধরণের পরিবর্তন চলে আসে। মনে হয় একে আমার দরকার। এর  দ্বারা কোনো শুভ কাজ সাধিত হতে পারে। এই ছেলেটিকে দেখেও হয়তো আমার তেমনই কিছু মনে হয়েছিল, তাই হয়তো আমার মালা থেকে খুলে একটা রুদ্রাক্ষ দিয়েছিলাম ওকে যা এখন তোমাদের উদ্ধারে সাহায্য করল’

গুরুদেবের কথা শেষ হলে বিজয় বলল – ‘আপনার নাম দ্বিতীয়বার শুনলাম আজ, ঐ শয়তান তান্ত্রিকের মুখে। আবহাওয়া আর জয়ন্তীর জল নিয়ন্ত্রণ করে সে যখন আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবার তালে ছিল তখন আপনার আশীর্বাদী রুদ্রাক্ষ আমাকে নিয়ে সোজা নদীতে ঝাঁপ দেয়।

পরে জ্ঞান ফিরতে শুনলাম রুদ্রাক্ষের তেজে নাকি তান্ত্রিকের বুকের অনেকখানি পুড়ে গিয়েছে! এমনিতেই সে আপনার ওপর খাপ্পা ছিল। এবার নাকি আপনাকে পুরোপুরি ধ্বংস করবে – সারাদিন ধরে এই এক কথা বকবক করে গেলো মতিদার সাথে’

 ‘কিন্তু মতিদা আমাদের ওপর বদ্ধভাষিণী তন্ত্র প্রয়োগ করল কখন?’ – জিজ্ঞেস করল প্রতিম।

‘এই তন্ত্রে কণ্ঠপুষ্প ফুলের পরাগ ও মৃত মানুষের কণ্ঠনালীর হাড় মিশিয়ে গুঁড়ো করে খাবার বা পানীয়ের মিশিয়ে দিতে হয়!’ – গুরুদেবের মুখে একথা শুনে আমি বললাম –

‘গতকাল সন্ধ্যাবেলায় কিন্তু মতিদাই চা বানিয়ে নিয়ে এসেছিল আমাদের জন্য। গেস্ট হাউসে অর্ডার করিনি। আবার সকালবেলায়ও বেরনোর আগে মতিদাই ফের চা ও ডিম টোস্ট বানিয়েছিল। তাহলে কি তখনই? কিন্তু দু’বার কেন?”

‘দু’বার কারণ যাতে মন্ত্রের গুনাগুণ নিশ্চিত করা যায়!’ – গুরুদেবের কথা শুনে বিজয় রাগে গজগজ করে উঠল – ‘মতিদার মতো মানুষ যিনি কোনোদিন কারোর গায়ে ফুলের টোকা অবধি দেননি, তাকে দিয়ে ঐ শয়তান নিজের স্বার্থে এতগুলো খারাপ কাজ করাল। ওকে আমি ছাড়ব না।’

তারপর আমার দিকে ফিরে ধরা গলায় বলল – ‘জানিস তো মতিদা না নিজের মধ্যে নেই! তান্ত্রিকের বশে এসে একের পর এক খারাপ কাজ করে চলেছে অথচ মনে কোনো অনুতাপ নেই।

তান্ত্রিকের আদেশ মেনে মাটি খুঁড়ে মানস ও শুভমকে তাতে নামিয়ে গাছের চারার মতো গলা অবধি পুঁতে দিল। তারপর আমার হাত পা বেঁধে গাছের ছাল দিয়ে চাবুক বানিয়ে খুব মারল! একবারও ওর হাত কাঁপল না!’

কাছের মানুষকে এভাবে বদলে যেতে দেখে বিজয় ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছিল। গুরুদেব ওকে আশ্বস্ত করে বললেন – ‘চিন্তা কোরো না বাবা। মহাদেবের কৃপায় সব ঠিক হয়ে যাবে। ঐ ভুজঙ্গ ধর ওর পাপের চরমতম শাস্তি পাবে!’

বিজয় নিজেকে সামলে নিয়ে বলল – ‘আমার প্রথমেই বোঝা উচিত ছিল, যে মানুষটাকে আজন্ম আলিপুরদুয়ারের বাইরে যেতে দেখিনি সে কিভাবে চিনবে কোন গুপ্ত পথ দিয়ে ভুটানে যাওয়া যায়!

বন্ধন, তুই না এত গোয়েন্দা গল্প-উপন্যাস পড়িস! নিজেকে ব্যোমকেশ, ফেলুদা মনে করিস। তাও আন্দাজ করতে পারলি না?’

‘আমি কি করে জানব বল? আমি ভেবেছি ওনার পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর বয়স, তোদের বাড়ি কাজে যোগ দেবার আগে হয়তো এই পথ ধরে কখনও ওদিকে ঘুরতে বা কোন কাজে গিয়ে থাকবেন। তাই চেনেন।

আচ্ছা গুরুদেব, ভুজঙ্গ ধর কি চায় আপনার কাছে? আপনার কথা অনুযায়ী ওনার বয়সও তো প্রায় দুশো বছরের কাছাকাছি! তারওপর সে আদিনাথ শাস্ত্রীর মতো মহান পুরুষের শিষ্য। আপনার কি দেওয়ার থাকতে পারে ওনাকে!’ – আমার কথা শুনে গুরুদেব হাসলেন। তারপর শান্ত স্বরে বললেন – ‘ষষ্ঠতম রিপু কাকে বলে জানো?’

– জানি গুরুদেব, মাৎসর্যকে!

– ভুজঙ্গ তারই শিকার! সে অমর হতে চায়। মৃত্যুকে জয় করার লোভ জেগেছে ওর মনে!

এক সপ্তাহ আগে ভুজঙ্গ আমার কাছে এসেছিল গুরুদেব আদিনাথ শাস্ত্রীর খোঁজ করতে। কারণ খুলে না বললেও আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি  ওর মনে কোনো অসৎ পরিকল্পনা রয়েছে। তাই আমি গুরুদেবের বিষয়ে কোনোরকম খবর দিতে অস্বীকার করায় ভুজঙ্গ রাগে গজগজ করতে করতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

আমিও নন্দকে ওর পিছু নিতে বলি। নন্দ ঘণ্টা তিনেক পর ফিরে এসে আমায় ওর সমস্ত পরিকল্পনা খুলে বলে –

দুশো বছর বেঁচে থাকার পরও নাকি কোনো কারণে ভুজঙ্গ নিজের  মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। তাই দেরীতে হলেও বাকি সমস্ত সাধারণ মানুষের মতো ভুজঙ্গের শরীরেও মৃত্যুচক্র শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ভুজঙ্গ চায় অমর হতে! মৃত্যুকে জয় করতে! এবং সেই কাজে ওকে একজনই সাহায্য করতে পারেন – গুরুদেব আদিনাথ শাস্ত্রী!

তাই ভুজঙ্গের ইচ্ছা গুরুদেবের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে নেমে, ওনাকে হত্যা করে, ওনার জীবনীশক্তি আহরণ করা!

যতদিন না সে এই কাজ সম্পন্ন করতে পারছে ততদিন তার প্রতি কৃষ্ণপক্ষে একজন জ্যান্ত মানুষ দরকার নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য!’

‘এই কারণেই প্রায় তিরিশ জনের মতো মানুষকে মাটিতে গলা অবধি পুঁতে রেখেছে ভুজঙ্গ ধর? ভবিষ্যতের সঞ্চয় হিসেবে!’ – বিজয়ের কথা শুনে শরীর শিরশির করে উঠল।

গুরুদেব নন্দদাকে ডেকে বললেন – ‘ভুজঙ্গের অত্যাচারের সীমা এবার ছাড়িয়েছে নন্দ। মহাদেবের সেবক হয়ে অন্যায়ের পথে যেতে ওর বিবেকে বাঁধল না!

এবার ওকে উচিত শিক্ষা দিতে হবে। তুমি সরঞ্জাম গুছিয়ে তৈরি হয়ে নাও। আমাদের বেরোতে হবে’

গুরুদেব কথাটা বললেন ঠিকই কিন্তু ওনাকে আস্তানা ছেড়ে বেরোনোর কষ্টটুকু করতে হল না, কারণ শত্রু ততক্ষণে নিজেই এসে হাজির হয়েছে!

চতুর্দশ পর্ব: লড়াই

বন্ধনের কথা শুনে কামিনী অবাক হয়ে বলল – “কি বলো! ভুজঙ্গ ধর সোজা গুরুদেবের আস্তানায় এসে হাজির? এত বুকের পাটা!”

বন্ধন বলল – “ভুজঙ্গকে কি তুমি হেলফেলা তান্ত্রিক ভেবেছ নাকি? একে তো নিজে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন তান্ত্রিক তারওপর ঘাড়ের কাছে মৃত্যুভয়! ভুজঙ্গ যে মরিয়া হয়ে ছোবল দেবে তাতে আর আশ্চর্য কি!

গুরুদেবের নির্দেশ মেনে নন্দদা শিব মন্দিরের দিকে এগোতে গিয়ে উঠোনের মাঝে থেমে পড়লেন। কান খাঁড়া করে কি যেন শুনলেন আর সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠলেন –

‘গুরুদেব! সাবধানে। আপনার ঠিক…’ – কথাটা সম্পূর্ণ করতে পারল না নন্দদা, তার আগেই দেখলাম বারান্দার ডান দিক থেকে অন্ধকার ফুঁড়ে একজন মানুষ নিঃশব্দে বেরিয়ে এসে ছোরা হাতে গুরুদেবকে আক্রমণ করল!

গুরুদেবের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যে কতখানি সজাগ সেদিন টের পেয়েছিলাম! আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি এমন ভাবে ছোরার আঘাত এড়ালেন যেন আগে থেকেই জানতেন ওদিক দিয়ে কেউ ওনাকে আক্রমণ করবে। তারপরই শুনলাম কোথা থেকে যেন অজস্র সাপ একসঙ্গে হিসহিস শব্দ করে উঠল। আর নন্দদার হাতে ধরা মশালের আলোয় আমরা আক্রমণকারীর মুখ দেখলাম – শুভম!

শুভম তখন গুরুদেবের দিকে ছোরা হাতে উদ্যত অবস্থায় দাঁড়ানো কিন্তু একচুলও এগোতে বা নড়তে পারছে না! তীব্র রাগে ফুঁসছে। গুরুদেবের হাতে ধরা একটা চাবুক বা দড়ির মতো জিনিস যেটা দিয়ে তিনি শুভমকে পেঁচিয়ে জড়বস্তুর মতো দাঁড় করিয়ে রেখেছেন। অবাক করা বিষয় এই যে সেই দড়ি থেকে ক্রমাগত সাপের আওয়াজ ভেসে আসছে!

সারাদিন ধরে এত কিছু দেখে ফেলেছিলাম যে তখন আর কোনোকিছুতেই আমরা অবাক হচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল এসব অতি সাধারণ ও স্বাভাবিক বিষয়!

গুরুদেব ভুজঙ্গের বশে থাকা শুভমকে শান্ত করতে বললেন –

‘বাবা, ভগবান এবং ভক্তির ওপর তোমার জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্রোধ প্রশমিত করো, নাহলে ভুজঙ্গ তোমার আত্মা ও সত্ত্বার ওপর আরও বেশি করে জাঁকিয়ে বসবে।

এর আগে আমি একজনকে অশুভ শক্তির হাত থেকে বাঁচাতে পারিনি। কিন্তু আর নয়! তোমাকেও আমি শুভ শক্তির পথে নিয়ে আসবই। তুমি আমার কণ্ঠস্বরে নিজের মনকে সন্নিবিষ্ট করো’

“গুরুদেব ঐ কথাটায় কি নরক-পাল কে নির্দেশ করেছিলেন!” – জিজ্ঞেস করল কামিনী।

কামিনী ব্যাপারটা ধরতে পেরেছে বলে বন্ধন খুশি হল। বলল – “হ্যাঁ! কিন্তু তখন তো আর এত কিছু জানতাম না। আমি ভেবেছি হয়তো গুরুদেবের চেনা পরিচিত কারোর কথা বলেছেন উনি।

এদিকে শুভম পাগলা ষাঁড়ের মতো গুরুদেবের দিকে তাকিয়ে ফুঁসছে। গুরুদেব ওকে বললেন – ‘আমার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নাও বাবা, নাহলে তোমার দৃষ্টিক্ষয় হতে পারে। পরিবর্তে যে প্রতিহিংসার আগুনে তোমাকে পুড়িয়ে এখানে পাঠানো হয়েছে সেই আগুনকে নিজের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করো। আত্মশুদ্ধি করো। আমি জানি তুমি পারবে। আমার সাথে মনে মনে বলো –

ॐ নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয় হেতবে ।

নিবেদয়ামি চাত্মানং ত্বং গতিঃ পরমেশ্বরঃ ।।

দেখলাম, শুভমের রাগ কমতে শুরু করেছে। ও ক্রমশ স্বাভাবিক হচ্ছে। তারপর হাত থেকে ছোরাটা ফেলে দিয়ে শুভম ঝড়ে ভেঙে পড়া সুপারি গাছের মতো মাটিতে পড়ে গেল।

নন্দদা ওকে ঘরে নিয়ে যাবার জন্য এগিয়ে এসে গুরুদেবকে বললেন – ‘ভুজঙ্গ টের পেয়ে গেছে গুরুদেব। কাছেপিঠেই কোথাও হয়তো লুকিয়ে ছিল। আপনি ছেলেটাকে ওর বশ থেকে বার করে আনতেই বাকি দলবল নিয়ে আমাদের আস্তানার দিকে আসছে। অনেকগুলো পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।

ছেলেটাকে এই ফাঁকে ঘরে রেখে আসি। ভালোই হয়েছে শত্রু নিজে যেচেই ধরা দিয়েছে। আমাকে অযথা আর খোঁজাখুঁজি করতে হল না!’

‘ভুজঙ্গ যে অতর্কিতে আক্রমণ শাণাবে আমার তা বোঝা উচিত ছিল নন্দ। ওর হিংস্রতা এতটাই চরম সীমায় উত্তীর্ণ হয়েছে যে কাপুরুষের মতো লড়াই ওর পক্ষেই মানায়! একটা বাচ্চা ছেলেকে বশ করে আমায় হত্যা করতে পাঠিয়েছে। এতগুলো নিরীহ মানুষকে তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করে চলেছে। এর একটা বিহিত চাই। নন্দ তুমি তৈরি তো?’

‘হ্যাঁ! গুরুদেব। শুধু আপনার আদেশের অপেক্ষা!’ – মশালের গনগনে আলোকশিখায় দেখলাম নন্দদার মুখটা রাগে ফেটে পড়ছে। ছিপছিপে চেহারার মানুষটার ভেতর যেন এক প্রাচীন যোদ্ধা বেরিয়ে এসেছে যে এক নিমেষে তার শত্রুদের ভূলুণ্ঠিত করে দিতে পারে!

প্রতিম আমার কানে ফিসফিস করে বলল – ‘নন্দদাকে দেখ কেমন উন্মত্ত ষাঁড়ের মতো লাগছে! গুরুদেবের আদেশ মেনে ঘাড়ের কুঁজ ফুলিয়ে যে কোনো মুহূর্তে লড়াইতে নামার জন্য প্রস্তুত!

মেনে নিলাম ভাই, এই নন্দ’দার পক্ষে আমাদের দুজনকে অত দূর থেকে তুলে আনা সত্যিই সম্ভব!’

প্রতিমের কথা শুনে আমি ওর দিকে তাকিয়ে হাসলাম। এমন চরম বিপদের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে হাসি পাওয়াটা পাগলের লক্ষণ জানি, কিন্তু আমার বারবার মনে হচ্ছিল গুরুদেব রুদ্রাক্ষ আর নন্দদা যখন রয়েছেন তখন আমাদের কোনো ক্ষতি হবে না… হতে পারে না।

সারাদিন ধরে যে সমস্ত অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী থেকেছি সেদিন, কি জানি তার প্রভাবে হয়তো সামান্য স্নায়ু বৈকল্য ঘটেছিল আমার!

গুরুদেব নন্দদাকে বললেন – ‘শুরুতেই ঝাঁপিয়ে পড়লে চলবে না নন্দ। ভুজঙ্গ আমাদের শত্রু হতে পারে, ওর বশে থাকা মানুষগুলো নয়। তারা প্রত্যেকেই নিরপরাধ। ওদের কোনোরকম ভাবেই আঘাত করা যাবে না’

কথা বলতে বলতে গুরুদেব মন্ত্রপূত ছাই দিয়ে উঠোনের চারপাশে গণ্ডী কেটে দিলেন। ভুজঙ্গও হয়তো আঁচ করতে পেরেছিল যে গুরুদেব এমন কিছু করতে পারেন, তাই আবারও নিজে না এসে ওর বশে থাকা আরেকজন নিরপরাধ মানুষকে আমাদের আক্রমণ করতে পাঠালেন। লোকটা দিক্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে গুরুদেবের আস্তানার দিকে ছুটে এলো আর সীমানায় পা রাখামাত্রই বিকৃত মুখে যন্ত্রণাময় শব্দ করে কিছুটা দূরে ছিটকে পড়ল।

      ‘লোকটা কি মরে গেল?’ – ঐ দৃশ্য দেখে আমি আঁতকে উঠলাম!

‘না! ও যে অশুভ শক্তির বশে ছিল সেই শক্তি আমার মন্ত্রপূত ছাইয়ের সংস্পর্শে এসে দেহত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। ঘণ্টাখানেক পড়েই ওর জ্ঞান ফিরবে। ভুজঙ্গের বোঝা উচিত বারবার একই ধরণের চাল দিয়ে স্নায়ু হোক বা শারীরিক, কোন যুদ্ধেই বাজিমাত করা যায় না!’ – গুরুদেব বাঁকা সুরে বললেন।

ভুজঙ্গের দিক থেকে কিন্তু এরপর আর কোন আক্রমণ এলো না। দেখলাম সে মিনিট খানেক পর দক্ষিন দিকে নীচে নেমে যাওয়ার যে রাস্তাটা রয়েছে সেখানে সদলবলে এসে দাঁড়িয়েছে। ছাইয়ের সীমানা পেরোনোর দুঃসাহস বা চেষ্টা কোনটাই করল না।

      ভুজঙ্গের হাতে একটা মশাল। ওর পেছনে দাঁড়ানো কিছু কিছু লোকের হাতেও মশাল রয়েছে। আর সেই মশালের আলোতেই ওদের দেখতে পেলাম – মতিদা আর মানস! বিকারগ্রস্ত, ক্লান্ত ও উদ্ভ্রান্ত ভাবে ভুজঙ্গের ডানদিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে দু’জনে।

      আমি নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলাম না। ছুটে গেলাম ওদের দিকে। গুরুদেব পেছন থেকে সাবধান করলেন – ‘ছাইয়ের ওপর পা দিও না বন্ধন। যা জিজ্ঞেস করার ভেতর থেকেই করো’

      আমি বেদনা ভরা গলায় ডাক দিলাম – ‘মানস… মতিদা – শুনতে পাচ্ছ আমার কথা? তোমরা অনুগ্রহ করে ফিরে এসো আমাদের কাছে। আমি জানি আমার গলার স্বর তোমাদের কান অবধি পৌঁছচ্ছে। দয়া করে ফিরে এসো তোমরা … আমরা তোমাদেরই অপেক্ষায় রয়েছি’

      কোনো লাভ হল না মিনি। আমার করুন আর্তি শুনেও ওরা কেউই একবারের জন্য ফিরেও তাকাল না আমার দিকে।

ভুজঙ্গ ধর গুরুদেবের উদ্দেশ্যে ব্যঙ্গোক্তি করে বলল – ‘তোমার শাগরেদ দেখি মেয়েদের মতো নাঁকি কান্না কাঁদছে রুদ্রাক্ষ! সামলাও ওকে!’

গুরুদেব ততক্ষনে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। গলার স্বর কঠিন। বললেন – ‘নারী জাতিকে দুর্বল ভাবা বন্ধ করে কাজের কথায় এসো ভুজঙ্গ। তোমাকে আগেই বলেছি যে আমি জানিনা গুরুদেব কোথায়। ওনার সাথে আমার তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনও যোগাযোগ নেই’

‘মিথ্যুক! তুমি না যোগী পুরুষ, শিব ভক্ত! মিথ্যে কথা বলো কি করে রুদ্রাক্ষ? এমনিতেই তো সাধারণ মানুষের মতো বস্ত্র পরিধান করে তান্ত্রিক কূলের মান ইজ্জত সব ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছ। আদিনাথ শাস্ত্রীর মতো মহান মানুষের শিষ্য হয়ে এসব অনিয়ম করে বেড়াতে লজ্জা করে না?’ – চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলল ভুজঙ্গ ধর।

গুরুদেব দৃপ্ত কণ্ঠে বললেন – ‘বহুবার বলেছি তোমায় ভুজঙ্গ, আমি গুরুদেবের শিষ্য নই। তোমার মতো কুটিল ও স্বার্থলোভী মানুষকে নিজের শিষ্য বানিয়ে যে ভুল তিনি করেছিলেন তারপর থেকে আর সেই পথে কখনও হাঁটেননি তিনি।

আর তুমি ভাবলে কি করে আমি গুরুদেবের খোঁজ দেব তোমায়? তোমার সব বদ মতলব আমার জানা হয়ে গেছে ভুজঙ্গ। গুরুদেবকে হত্যা করার যে পরিকল্পনা তুমি নিয়েছ তা কখনোই সফল হবে না। আমি হতে দেবো না’

‘কিছুদিনের জন্য বন্দী করে রাখা ছাড়া তোমার গুরুদেবই আমার আর কিছু করতে পারলেন না, এখন তোমার মতো ভণ্ড কিনা শেষে রুখবে ভুজঙ্গ তান্ত্রিককে! এই জগতের সবচেয়ে বড় শিব-ভক্তকে!

ঠিক আছে। তুমি যদি আদিনাথ শাস্ত্রীর ঠিকানা আমাকে না দাও, আমি জানি কোন উপায়ে তোমার পেট থেকে কথা বের করে আনতে হয়! তারপর আদিনাথকে হত্যা করে আমার বন্দীদশার সমস্ত হিসেব-নিকেশ সুদে আসলে পুষিয়ে নেবো। অমর হব আমি… অমর!

তোমার জন্য গত দু’দিনে দুজন লোক মারা পড়েছে রুদ্রাক্ষ। ওদের এক বন্ধুকেও আশা করি তুমি মেরে ফেলেছ কিছুক্ষণ আগেই। এই যে বাকিদের দেখতে পাচ্ছ আমার পেছনে, তারাও এবার একে একে তোমারই জন্য মারা পড়বে। এখন বিচার করো তুমি কোন পথ বেছে নেবে – ঐ তিনশ বছরের বৃদ্ধকে রক্ষা করার পথ নাকি এতগুলো মানুষের জীবন বাঁচানোর পথ!’

– ভুজঙ্গের মুখে একথা শুনে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেলো! বারবার মনে হতে লাগল মানস বা মতিদাকে যদি মেরে ফেলে লোকটা।

চরম উৎকণ্ঠায় মুহূর্ত গুনছি, ঠিক তখনই বিজয় এক কাণ্ড করে বসল। কাউকে কিছু না বলে ‘রে! রে!’ করে সোজা ভুজঙ্গের দিকে ছুটে গেল। তারপর যে মর্মান্তিক ঘটনাটা ঘটল সেটা আমাকে আজীবন তাড়িয়ে বেড়াবে!”

– কথাটা শেষ করা মাত্রই কেঁদে ফেলল বন্ধন। স্বামীকে ওভাবে ভেঙে পড়তে দেখে কামিনীও বিহ্বল হয়ে পড়ল। তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নেমে এসে জড়িয়ে ধরল বন্ধনকে।

কামিনী ভেবেছিল বইয়ে পড়া অভিযানধর্মী বা অলৌকিক কাহিনীগুলোর মতো বন্ধনের এই বাস্তব অভিজ্ঞতা শুনেও হয়তো একই রকম রোমাঞ্চ পাওয়া যাবে কিন্তু সেই রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি যে হঠাৎ করেই অন্যদিকে মোড় নেবে কামিনী সেটা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।

কামিনীর ছোঁয়া পেয়ে বন্ধন খানিকটা স্বচ্ছন্দ বোধ করল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল –

‘গুরুদেব ও ভুজঙ্গ যখন নিজেদের মধ্যে তর্কে ব্যস্ত ছিলেন, বিজয় সেই ফাঁকে সকলের চোখ এড়িয়ে মহাদেবের মন্দির থেকে আদিনাথ শাস্ত্রীর দেওয়া ত্রিশূলটা তুলে নিয়েছিল। তারপর কেউ কিছু বুঝে উঠবার আগেই তিরবেগে ছুটে গিয়ে ত্রিশূলের তিনটি ফলাই গেঁথে দিয়েছিল ভুজঙ্গের বুকে!

ভুজঙ্গ এই অতর্কিত আক্রমণের জন্য একদমই তৈরি ছিল না। পাশাপাশি সময়ের অভিশাপে তার শরীরও ভাঙতে শুরু করেছে। ভুজঙ্গ তাই ত্রিশূলের আঘাতটা সহ্য করতে পারল না। যাকে সে হত্যা করার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিল, অদৃষ্টের ফেরে তার ত্রিশূলের আঘাতেই ভুজঙ্গ সংহার সম্পন্ন হল!

ভুজঙ্গ যতই দুর্বল হোক, তার মতো ধূর্ত তান্ত্রিকের আস্তিনে যে নিজেকে রক্ষা করার মতো কোনো মারণাস্ত্র লুকনো থাকবে না তা কি হয়!

সবাই ছুটে গিয়ে দেখলাম ত্রিশূলের আঘাত থেকে নিজেকে শেষবারের মতো বাঁচানোর চেষ্টায় বিজয়ের সমস্ত প্রাণশক্তি নিজের ভেতরে টেনে নিতে চেয়েছিল ভুজঙ্গ। গুরুদেবের টেনে দেওয়া ছাইয়ে বাঁধা পাওয়ায় যে কয়েক সেকেন্ডের জন্য যে গতি কমে গিয়েছিল বিজয়ের সেই ফাঁকেই ঐ কাণ্ড করে ভুজঙ্গ। বিজয়ের জীবনীশক্তি কেড়ে নিয়ে ওর দেহকে প্রায় কঙ্কালে পরিণত করে ফেলেছিল।

কিন্তু বিজয়, আমাদের প্রাণপ্রিয় বন্ধু, তীব্র মৃত্যুযন্ত্রণার মাঝেও মহাদেবের ত্রিশূলকে হাতছাড়া তো করেইনি, বরং ভুজঙ্গের বুকের আরও গভীরে গেঁথে দিয়েছিল যাতে ভুজঙ্গের কলুষিত হৃদয় পুনরায় আর সচল হতে না পারে! যাতে ভুজঙ্গ আর পৃথিবীতে ফিরে আসতে না পারে!”

 

পঞ্চদশ পর্ব: স্মৃতি সততই বেদনার

“নন্দদা গিয়ে আলিপুরদুয়ার থানায় খবর দিয়ে এসেছিল। থানা থেকে বিজয়ের বাবাকেও ফোন করা হয়। পুলিশ আমাদের প্রথমে সন্দেহের চোখে দেখলেও এতগুলো বন্দী মানুষ সাক্ষ্য পেয়ে ও স্ব-চক্ষে ভুজঙ্গের মৃতদেহের ওপর বিজয়ের প্রায় কঙ্কাল শরীরকে ওভাবে ত্রিশূল হাতে শুয়ে থাকতে দেখে আমাদের বিরুদ্ধে কোনো কেস ফাইল করা হল না। অলৌকিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়ার মতো কোন আইন বা ধারা তো আর আমাদের দেশের পেনাল কোডে উল্লেখ করা নেই!

বিজয়ের দেহ আর ময়না-তদন্ত করার মতো পরিস্থিতিতে ছিল না। তাছাড়া বিজয়ের বাবাও আমাদের আইন-আদালতের ঝামেলায় জড়াতে চাননি। খুব ভালো মানুষ ছিলেন উনি। ওনার ইচ্ছাতেই জয়ন্তীর ধারে বিজয়ের শেষকৃত্য করি আমরা। গুরুদেবই সমস্তটা তদারকি করেছিলেন। তারপর চিতা ঠাণ্ডা হলে ছাই হাতড়ে একটি ছোট্ট হাড় তুলে নিয়েছিলেন।

প্রিয় বন্ধুর সৎকার সেরে বুকে একরাশ যন্ত্রণা নিয়ে সবাই উঠোনে বসেছিলাম। হঠাৎ নজরে এলো গুরুদেব ঐ হাড়টাকে ওনার গলায় রুদ্রাক্ষের মালাটায় গেঁথে রেখেছেন। লক্ষ্য করেছ কিনা জানিনা, সেই হাড় এখনও ওনার গলায় রয়েছে”

      “হ্যাঁ হ্যাঁ! করেছি। তখন কি আর ঐ হাড়ের তাৎপর্য জানতাম!” – দুঃখ ভারাক্রান্ত স্বরে বলল কামিনী।

“গুরুদেব আমায় বললেন – ‘যেহেতু বিজয়ের স্মৃতিচিহ্ন আমি নিজের কাছে রেখেছি, বিনিময়ে তোমাকে আমার মালা থেকে একটি ত্রিমুখী রুদ্রাক্ষ দিলাম বন্ধন। যত্ন করে রেখো!

      এই সেই রুদ্রাক্ষ! মহানন্দার তীরে এই রুদ্রাক্ষই আমায় নরক-পালের মায়াজাল থেকে বাঁচিয়েছিল!”

      – গলায় পড়ে থাকা রূপোর মালাটা বার করে কামিনীকে দেখিয়ে বলল বন্ধন।

কামিনী যত শুনছিল ততই দুঃখ-যন্ত্রণা আর রোমাঞ্চ মেশানো এক অদ্ভুত অনুভূতি ঘিরে ধরছিল ওকে। বন্ধন বলে চলল –

      “বিজয়ের এই আকস্মিক মৃত্যুতে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিল মতি’দা। বিজয়ের মা মারা যাবার পর তিনি একা হাতে মানুষ করেছিলেন ওকে।

ভুজঙ্গ সংহারের পর যখন বন্দী মানুষগুলোর ওপর থেকে ভুজঙ্গের করা বশীকরণ শক্তির প্রভাব কেটে যায়, তখন সকলেরই মানবিক জ্ঞান ও সত্ত্বা ফিরে আসে।

আর মতিদা নিজের সত্ত্বা ফিরে পেতেই দেখেন ওনার সামনে বিজয়ের নিথর কঙ্কালপ্রায় দেহ শায়িত। এই দৃশ্য দেখামাত্রই জঙ্গলের নীরবতা ভেঙে মতিদা যেভাবে জোরে চিৎকার করে উঠেছিলেন, সেই চিৎকার এখনও আমার কানে বাজে।

বিজয়ের সৎকারের পর মতিদা গুরুদেবের কাছে এক অদ্ভুত  আবদার করলেন। বললেন – ‘গুরুদেব রুদ্রাক্ষ, বাকিদের মুখে শুনলাম, আপনি মহাদেবের সাধক। বিজয় আর বাকিদের চরম বিপদের মুখ থেকে উদ্ধার করেছেন। আপনার নাকি অলৌকিক ক্ষমতাও আছে। আপনি কি আমার একটা অনুরোধ রাখতে পারবেন?’

‘আপনি নির্দ্বিধায় বলুন। মহাদেবের ইচ্ছা থাকলে আমি নিশ্চয়ই আমার সামর্থ্য মতো সাহায্য করবো আপনাকে’ – মতিদার হাত ধরে বললেন গুরুদেব।

      মতিদা বুকে কষ্ট চেপে রেখে বললেন – “যতই আমি ভুজঙ্গ ধরের বশে থাকি না কেন, ছেলেগুলোকে যে আমিই সেই পাপী আস্তানায় টেনে নিয়ে গিয়েছিলাম তাতে কিন্তু কোনো দ্বিমত নেই গুরুদেব।

অতএব, বিজুর মৃত্যুর জন্য অন্য কেউ নয়, আমিই দায়ী!

আর ভাগ্যের কি পরিহাস দেখুন, আমি এতটাই অভাগা যে ছেলেটার সঙ্গে সারাদিন কাটালাম অথচ ওর শেষ মুহূর্তের কোনও স্মৃতিই আমার স্মরণে নেই। আপনি কি আমাকে সেই স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে দিতে পারবেন’

      – ভাবতে পারবে না মিনি, মতিদার এই কথা শোনার পর আমরা চার বন্ধু বাচ্চা শিশুর মতো কেঁদে উঠেছিলাম। গুরুদেব বলেছিলেন –

‘দেখুন মতিন্দ্রনাথ বাবু, আপনার কথা যদি আমি মেনে নিই তাহলে কিন্তু বিজয় বা বাকি মানুষগুলোর মৃত্যুর জন্য প্রকৃতপক্ষে দায়ী আমিই। তাই না?

আমার গুরুদেব আদিনাথ শাস্ত্রী আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগে ওনার নশ্বর দেহ ত্যাগ করেছেন। তারপরই হয়তো ভুজঙ্গ বন্দিদশা থেকে মুক্তি পায় এবং ওর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার আশায় গুরুদেবকে খুঁজতে শুরু করে।

ভুজঙ্গ আমার হদিশ কিভাবে পেয়েছিল আমি জানিনা কিন্তু আমি গুরুদেবের ব্যাপারে কিছুই জানাইনি। ভেবেছিলাম গুরুদেবের এই জগত থেকে বিদায়ের খবর শুনলে ও আবার হয়তো অমরত্ব লাভের আশায় অন্য কোন অসৎ উপায় অবলম্বন করবে।

জন্ম ও মৃত্যুর সদা ঘূর্ণায়মান চক্রকে নিয়ে কাটাছেঁড়া করলে পৃথিবীর বুকে যে মহাপ্রলয় নেমে আসবে তা আটকানো কারোর সাধ্যি নেই। তাই চেষ্টা করেছিলাম ভুজঙ্গের উদ্দেশ্যটাকে একই দিকে চালনা করার যাতে সহজেই ওকে পরাস্ত করা যায় কিন্তু তার পরিণতি যে এমন হবে কে জানত!

তাই বলছি, যে মুহূর্তগুলো পেছনে ফেলে রেখে এসেছেন সেগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে কি লাভ!’

      ‘আমি একজন অতি সামান্য মানুষ গুরুদেব। জীবনে আজ অবধি কোনোদিন লাভ-ক্ষতির হিসেব করিনি। আজও করছি না। কিন্তু এটুকু জানি বিজুর শেষ মুহূর্তের স্মৃতিগুলি যদি আমার সঙ্গে না থাকে আমি এমনিতেও সারাজীবন নরক যন্ত্রণা ভোগ করবো। এই বয়সে এসে এরচেয়ে বড় প্রলয় আর আমার সাথে ঘটতে পারে না’

– মতিদার মুখে একথা শোনার পর গুরুদেব আর আপত্তি করলেন না। তিনি মহাদেবের আসন থেকে একটা বেলপাতা নিয়ে এসে মতিদার দুই চোখের মাঝে চেপে ধরে খুব নিচু স্বরে মন্ত্র পড়তে শুরু করলেন।

      মতিদার মুখে যন্ত্রণার ছাপ ফুটে উঠল। বুঝতে পারলাম মতিদার সব মনে পড়তে শুরু করেছে। মানুষ যেভাবে স্বপ্নের মাঝে কথা বলে, মতিদা ঠিক সেভাবেই আবছা আবছা ভাবে কথা বলে চলেছেন –

‘আমার ব্যাগ থেকে একটা লাল রঙের পাথর মেঝেতে পড়ল … এটা পাথর নয়, একটা লাল মাকড়সা… নাহ নাহ! আমাকে কামড়ে দিলো মাকড়সাটা… আমার প্রণাম গ্রহণ করুন প্রভু ভুজঙ্গ… বলুন আমাকে কি করতে হবে… যথা আজ্ঞা… ওদের আমি ঐ পথ ধরেই নিয়ে যাবো… গেস্ট হাউস থেকে বলেছে অনুষ্ঠান উপলক্ষে আজ সন্ধ্যায় চা হবে না। আমিই নিজে বানিয়ে নিয়ে এলাম তাই… তোমরা নাচ উপভোগ করো, আমি ঘুমোতে যাচ্ছি… হ্যাঁ প্রভু, ওদের ওপর বদ্ধভাষিণী তন্ত্র প্রয়োগ হয়ে গেছে… এই চলো চলো, নাহলে দেরি হয়ে যাবে… বিজু কি হয়েছে তোর… এমন মনমরা দেখাচ্ছে কেন তোকে? খিদে পেয়েছে? ডিম টোস্ট খাবি?… এই তোমরা নদীতে স্নান করবে? বিজু আর বন্ধন আসুক, চলো আমরা গিয়ে নদীতে নামি… হ্যাঁ প্রভু, দুজন বাদে বাকি সকলেই এসেছে… হ্যাঁ! আপনার ক্ষমতা দেখান প্রভু… ভাসিয়ে নিয়ে যান সবকিছু… প্রভু! প্রভু! আপনি ঠিক আছেন তো? ইস কতখানি বুক পুড়ে গিয়েছে আপনার… কে বিজু? ও করেছে আপনার এই অবস্থা? ঠিক আছে ওকে উচিত শাস্তি দিচ্ছি… বল শয়তান কোথায় পেলি তুই এই রুদ্রাক্ষ… প্রভু বিজু পালিয়েছে… ঠিক আছে। তাই হবে… এই শুভম ছেলেটা বড়ই নাস্তিক… একেই আগে পাঠানো হোক… জয় প্রভু ভুজঙ্গের জয়… চলো সবাই… জোরে পা চালাও!’

      স্মৃতির ভার আর নিতে পারলেন না মতিদা! বিচারকের চূড়ান্ত রায় শোনার পর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামি যেভাবে কান্নায় ভেঙে পড়ে, মতিদাও ঠিক সেভাবে দুহাতে চোখ-মুখ ঢেকে কেঁদে ফেললেন!”

 

 

ষোড়শ পর্ব: শেষাঙ্ক

সেদিন বিকেলেই আমরা আলিপুরদুয়ারে ফিরলাম সবাই। ফেরার আগে প্রতিম নন্দদাকে জিজ্ঞেস করল –

‘দাদা তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি? গুরুদেবকে সরাসরি জিজ্ঞেস করা মানে ওনাকে অসম্মান করা, তাই তোমাকেই বলছি, গুরুদেবের তাও বয়স কত হবে?’

      নন্দদা একটু ভেবে বলল – ‘সঠিক বলতে পারবো না। তবে আমার সঙ্গে ওনার প্রথম দেখা প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে!’

      পঞ্চাশ বছর শুনে প্রতিম আর আমি একে অপরের চোখের দিকে তাকালাম। ও আমার কানে ফিসফিস করে বলল – ‘এনাদের বয়সের কোন গাছপাথর নেই নাকি! চেহারায় তো বার্ধক্যের সামান্যতম লক্ষণও ফুটে ওঠেনি!’

      আমি নন্দদাকে বললাম – ‘গুরুদেবের বয়স নাহয় বাদই দিলাম। তোমাকে দেখলেই তো মনে হয় না যে পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেছে তোমার! আমি ভাবলাম তুমি আমাদেরই বয়সী বা সামান্য বড় হবে! বয়স ধরে রাখার রহস্যটা কি নন্দদা?’

      নন্দদা হেসে জবাব দিয়েছিল – ‘তিনবেলা যোগ ব্যায়াম!’

      নন্দদার থেকে বিদায় নিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলাম গুরুদেব আমাদের জন্য বাইরে অপেক্ষা করছেন। একে একে সবাই ওনাকে প্রণাম করলাম।

মানস বলল – “আপনার গুরুদেবের কথা মেনে কাউকে কোনোদিন আর নিজের শিষ্য বানাবেন না। তাই না গুরুদেব?”

“হ্যাঁ। বিজয়ের মৃত্যুর পর তো আরও নয়। এই শেষ! জগতের কোনও বিষয়েই আর কখনও হস্তক্ষেপ করবো না আমি। ভালো থেকো তোমরা সবাই। জয় শিবশম্ভু! মহাদেব তোমাদের মঙ্গল করুন” – দেখলাম কথা বলতে বলতে গুরুদেবের মুখটা কেমন যেন যন্ত্রণায় ভরে উঠল। বিজয়ের মৃত্যু যে ওনার মতো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষকেও সজোরে ধাক্কা দিয়ে গেছে স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম।

গুরুদেবকে প্রণাম করে সবাই রওনা দিলাম গেস্ট হাউসের দিকে। কেয়ারটেকার ছেলেটি বিজয়ের খবরটা শুনে কেঁদে ফেলল আর বারবার নিজেকে দোষারোপ করতে লাগল।

আমি ওকে শান্ত করার জন্য বললাম – ‘যা হবার হয়ে গেছে। তুমি নিজেকে আর অপরাধী ভেবো না। ভুজঙ্গ ধরের মতো শয়তানের হাত থেকে নিজের গ্রামকে বাঁচানোর জন্য তোমার যা ঠিক মনে হয়েছে করেছ।

তাছাড়া তোমার জন্যই এযাত্রায় আমরা বেঁচে ফিরেছি। এই নাও, গুরুদেবের দেওয়া রুদ্রাক্ষটা রাখো। উনি তোমায় দু’হাত ভরে আশীর্বাদ করেছেন’

এরপর আলিপুরদুয়ারে পৌঁছে আমরা আর দেরি করলাম না। মতিদা ও বিজয়ের বাবা আমাদের রাতটা থেকে যেতে বলেছিলেন কিন্তু বিজয়কে ছাড়া আর বাগচী ভিলাতে এক মুহূর্তও থাকতে মন চাইছিল না। নিজেদের ব্যাগপত্র নিয়ে সন্ধ্যের ট্রেনে যে যার বাড়ি ফিরে এলাম। ছুটি শেষ হতে তখনও আরও হপ্তা দেড়েক বাকি।

হস্টেলে ফিরে সব বন্ধুরা মিলে ঠিক করেছিলাম আমরা ছাড়া এই কাহিনী যেন আর কেউ না জানে, কারণ আমাদের কথা কেউ যেমন বিশ্বাস করবে না তেমনি আমরাও চাইনি আমাদের প্রাণপ্রিয় বন্ধুর মৃত্যু নিয়ে সারাজীবন ধরে কানাঘুষো হোক।

নিজের প্রাণের মায়া না করে বিজয় যেভাবে প্রবল শক্তিধর শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে পরপর দু’বার প্রাণ বাঁচিয়েছিল আমাদের, তারপর ওর আত্মার শান্তির জন্য আমাদের এইটুকু কর্তব্য ছিল।

– এই হচ্ছে গিয়ে গুরুদেব রুদ্রাক্ষের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাতের কাহিনী। তোমার বইতে পড়া রোমাঞ্চকর কাহিনীগুলোর মতো হল না বোধহয়, তাই না? শেষটা কেমন যেন দুঃখে ভরা!”

কামিনী স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল বন্ধনের দিকে। গল্প বলা শেষ হতেই এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল বন্ধনকে। বন্ধনও স্ত্রী’কে পরম স্নেহে বুকে জড়িয়ে ধরে ওর অশ্রুসজল দুই চোখকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করল।

ঘরের খোলা জানালা দিয়ে রাতের আকাশ দেখা যাচ্ছে। অগুনতি নক্ষত্ররাজি হীরের কুচির মতো ঝলমল করছে নিকষ কালো অন্ধকারের বুকে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বলতম নক্ষত্রটা যে বিজয় তা নিয়ে বন্ধনের মনে কোনো সন্দেহ নেই!

প্রিয় বন্ধুকে হারানোর কষ্ট আবারও মাথাচাড়া দিচ্ছে দেখে বন্ধন মনে মনে দেবাদিদেব মহাদেব আর গুরুদেব রুদ্রাক্ষের নাম স্মরণ করল। কামিনী ততক্ষণে বন্ধনের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত