Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,বিলু

পাঠ প্রতিক্রিয়া: জলের উপর পানি । পাপড়ি গঙ্গোপাধ্যায়

Reading Time: 6 minutes

স্বপ্নময় চক্রবর্তী আমার অত্যন্ত প্রিয় সাহিত্যিকদের একজন। তাঁর সব লেখা পড়ে উঠতে পারিনি এখনও। কিন্তু তাঁর নতুন বই বেরোল কি না সেই খোঁজ রাখি। তেমনভাবেই এই বইয়ের খোঁজ পাওয়া।

যখন ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল তখন পড়া হয়নি। ধারাবাহিক ভাবে কোনো লেখা আমি যে পড়ি না, সে আমার নিজস্ব সমস্যা। অভিজ্ঞতায় দেখেছি নানা বাধা পড়ে, যেমন, পরিবারে কোনো বিপদ, নিজের বেড়াতে যাওয়া, নিজের অসুস্থতা,কাজের চাপ ইত্যাদি কারণে  অনেক পর্ব পড়া বাদ থেকে যায়। তখন মনের ভেতরে একটা অস্বস্তি কিলবিল করে। এই জন্য এখন আর ধারাবাহিক ভাবে কিছু পড়ি না। পরে বই হয়ে প্রকাশিত হলে কিনে নিই। এই সমস্যার জন্যই এই লেখকের ” হলদে গোলাপ” আমি ধারাবাহিক হিসেবে বেরনোর সময়ে বিচ্ছিন্ন ভাবে কয়েকটি পর্ব পড়েছিলাম। পরে বই হিসেবে গোটাটা একত্রে পড়ি।

যাইহোক, উপন্যাস-টি ধারাবাহিক হিসাবে পড়া হয়নি বলে কেনার সময়ে আমি জানতাম না যে,  এটি আমার আরেক প্রিয় উপন্যাস ” চতুষ্পাঠী”র পরের পর্ব। ” চতুষ্পাঠী” র পরের পর্ব হলেও যারা “চতুষ্পাঠী ” পড়েননি, তাঁদেরও এই বই পড়ে বুঝতে কোনো সমস্যা হবে না। “চতুষ্পাঠী”র প্রধান চরিত্র অনঙ্গমোহন এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বিপ্লবের দাদু হলেও উপন্যাসের প্রথম অর্ধের অনেকটা জায়গা জুড়ে আছেন। কিন্তু তাঁর এবং তাঁর সংসারের পূর্ব ঘটনা, যেটুকু এই উপন্যাসটি বোঝার জন্য প্রয়োজন সেটুকু লেখক এই উপন্যাসের বিভিন্ন ফাঁকে ফোঁকরেই বলে দিয়েছেন। এ কথা বলার কারণ হল, বহুযুগ আগে পড়া “চতুষ্পাঠী” উপন্যাসটির খুঁটিনাটি আমার কিছুই মনে ছিল না। কিন্তু এই উপন্যাসটি পড়ে বুঝতে কোনো সমস্যা হয়নি। “চতুষ্পাঠী” না পড়েও এই উপন্যাস  বুঝতে কোনো সমস্যা হবে না ঠিকই। কিন্তু মনস্ক ও উৎসাহী পাঠককে আমি বলব সেই উপন্যাসটিও অবশ্যই পড়ে নিতে। কারণ, “চতুষ্পাঠী” বাংলা সাহিত্যের এক অন্যতম উল্লেখযোগ্য উপন্যাস।

ভূমিকা তো হল। এবারে আসি আলোচ্য বইটির কথায়। এই বইটির পাঠ অভিজ্ঞতা লেখার কোনো যোগ্যতা আদৌ আমার আছে কি না সে নিয়েও আমি বেশ দ্বিধায়। তবুও আমার পড়ার অভিজ্ঞতা সাধারণ এক পাঠক হিসেবেই সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম।

এই উপন্যাস নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতা নিয়ে কেন সংশয় তা আগে বলি। এই উপন্যাসে ভারতীয় ভূখণ্ডের এক বিরাট সময়কালের কথা, ভারতীয় ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সময়ের কথা তুলে ধরা হয়েছে।   লক্ষ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যত নির্ধারিত হয়েছে কিছু মানুষের মুখের বচনে,কলমের খোঁচায়, নিজেদের অভিসন্ধিমূলক ভাবনায়।


আরো পড়ুন: পাঠপ্রতিক্রিয়া: গাঁওবুড়ো ও অন্যান্য গল্প । পাপড়ি গঙ্গোপাধ্যায়


কী উঠে আসেনি এই উপন্যাসে? ১৯০৫ বঙ্গভঙ্গের কথা উঠে এসেছে একটি চরিত্র কৈলাশ দেবনাথের বয়ানে। তিনি ছিলেন প্রথমে নেতাজীপন্থী, পরে কম্যুনিস্ট ঘেঁষা কংগ্রেস। তিনি মহাকাব্যের আদলে দেশের ইতিহাস লিখে রাখতে চেষ্টা করেন। তাঁর ভাবনায় এসেছে বঙ্গভঙ্গ আর দেশভাগের অন্য এক ব্যাখ্যা,  অন্যরকম বিশ্লেষণ। এরপর এসেছে দেশভাগ আর দাঙ্গার কথা। ওপার থেকে এপারে আসা ছিন্নমূল মানুষদের বেঁচে থাকার লড়াই। এসেছে বিহার রায়ট,মুক্তিযুদ্ধ,জরুরী অবস্থা,নকশাল আন্দোলন, বামফ্রন্ট সরকার গঠন, মরিচ ঝাঁপি এবং অতি সাম্প্রতিক অতীতের বাবরি মসজিদ ভাঙার কথা। উপন্যাসের মধ্যে বিভিন্ন চরিত্রর মাধ্যমে এগুলি বলা হলেও যা লেখা হয়েছে তা সত্য তথ্য অনুসারী। কোন কোন বই থেকে তথ্য নিয়েছেন লেখক তার উল্লেখ উপন্যাসের ভূমিকাতেই করেছেন।

প্রধান চরিত্র অনঙ্গমোহন চতুষ্পাঠীর আচার্য থেকে কীভাবে হয়ে উঠলেন চায়ের দোকানদার, তাঁর বিধবা পুত্রবধূ মৃত স্বামীর চাকরিস্থলে কত কম্প্রোমাইজ করে বালক পুত্র আর বৃদ্ধ শ্বশুরের ভরণপোষণের চেষ্টা করতেন, কীভাবে অনঙ্গমোহনের নাতি বিপ্লব ওরফে বিলু সব রকম রাজনৈতিক ঘটনা থেকে নিজেকে প্রাণপণ বিচ্ছিন্ন রেখে পরিবারটিকে বাঁচানোর জন্য কঠিন সময়ের মধ্যেও লেখাপড়া করে নানা রকম জীবিকার মধ্যে দিয়ে গিয়ে অবশেষে একটি সরকারি দপ্তরে উচ্চ পদে চাকরি পেল সেই সব গল্প বলার ফাঁকে ফাঁকেই এসেছে নানা ইতিহাস। একটি রাজনৈতিক দল অনঙ্গমোহনকে চা দোকান খোলার জায়গা দেয়। বিনিময়ে তাকে টাকা দিতে হয় না। কিন্তু বিনি পয়সায় চা দিতে হয়। আরেক দল তাঁকে শহীদ বেদীতে মাল্যদান করতে ডাকে। কারণ তাঁর মৃত নাতজামাই পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিল। অনঙ্গমোহন বোঝানোর চেষ্টা করে যে সে তো ওই সময়ে ওই জায়গায় গিয়ে পড়েছিল বলে গুলি খেয়েছে। সে তো শহীদ নয়। কিন্তু সেই দলটি এইসব কথা শুনতে চায় না। এই দলটি আবার দোকান খোলার জায়গা দেওয়া দলের বিপরীত দল। অনঙ্গমোহন ভয় পান যে, শহীদ বেদীতে মাল্যদান করলে দোকান উঠিয়ে দেবে কি না। হরেকৃষ্ণ কোঙারের বক্তৃতা শুনে তাঁর মনে হয় যে, এঁর রিফিউজিদের প্রতি টান আছে। এদিকে কোনো এক রাজনৈতিক লোক কায়ক্লেশে দিন চলা হকারদের থেকেও পাঁচ টাকা করে আদায় করে। অনঙ্গমোহন দিতে না চাইলে দোকান ভেঙে দেয়। কিছু লোক ব্যঙ্গ করে বলে যে, বামুনদের আবার অভাব কিসের? তাদের তো তিন ফুঁয়ে টাকা আসে। শাঁখে ফুঁ, কানে ফুঁ আর উনুনে ফুঁ । মানে তারা পুজো করে, মন্ত্র দিয়ে আর রাঁধুনিগিরি করে টাকা রোজগার করে। এসব অনঙ্গমোহনের পরিবার সহ্য করছিল নিরুপায় বলেই। তবু শেষ পর্যন্ত দোকান এবং উত্তর কলকাতার খুপরি বাসাবাড়িটিও ছাড়তেই হয়। যথাসর্বস্ব দিয়ে দমদমের এক দখলদারী জমিতে গড়ে ওঠা  উদ্বাস্তু কলোনীতে এক টুকরো জমি পায়।

অনঙ্গমোহন সহ উদ্বাস্তু কলোনীর সকলেই নানা দ্বিধায় থাকে কোন দল তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে সেই নিয়ে। কলোনীর মানুষ বিভিন্ন লোক বিভিন্ন দলের দিকে ঝোঁকে। বিভিন্ন ভোটে বিভিন্ন দল মিশ্রিত ভাবে ক্ষমতায় আসতে থাকে।  অবশেষে বামফ্রন্ট একক গরিষ্ঠতায় সরকার গঠন করে। অনঙ্গমোহনের বিধবা পুত্রবধূ আর নাতনিটি  পরিবারের কনিষ্ঠ পুরুষ সদস্য বিপ্লব ওরফে বিলুর প্রতিষ্ঠিত হবার অপেক্ষায় দিন গোনে। তাদের মুখের দিকে তাকিয়েই বিলু সব রকম রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রাখে। সুবিধাবাদী স্বার্থপর অপবাদ মাথায় তুলে নেয়। বিলুর মা অঞ্জলি রান্না করতে করতে মনে মনে মৃত স্বামীকে চিঠি লিখে সংসারের প্রাত্যহিক সুখ  দু:খের কথা জানায়। মনে মনে ভাবে স্বামী যেন কোনো কাজে দূরে কোথাও আছে। এই কল্পনা তাকে বাস্তবতার সঙ্গে লড়বার শক্তি দেয়। অনেক কষ্ট অপমানকে উপেক্ষা করার মনোবল জোগায়। এরই মধ্যে একদিকে বাংলাদেশে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, অন্যদিকে এপারে নকশাল আন্দোলন ও জরুরী অবস্থা। অনেক সমাজ বিরোধী অনেক অপকর্ম করে, যার দোষ এসে পড়ে নকশালদের ওপর। বিলু ভাবে, এদের সমাজ বিরোধী বলা উচিত কি না। কারণ,সমাজের যা অবস্থা তাতে তো তার বিরোধিতাই করা উচিত। তাই সমাজ বিরোধী শব্দটা নেগেটিভ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। বরং অপকর্ম যারা করছে তাদের সমাজের অহিতকারী বা সমাজের অনিষ্টকারী বলা যায়।

এখানে একটি অত্যন্ত ইন্টারেস্টিং তথ্য লেখক দিয়েছেন। ১৯৭২ সালে কবি শঙ্খ ঘোষ  থাকতেন কালাচাঁদ সান্যাল স্ট্রিটে। তাঁর কাছে  পুলিশ জানতে চেয়েছিল ওই পাড়ায় কোন কোন বাড়িতে নকশাল থাকে। স্বাভাবিক ভাবেই উনি বলেছিলেন, এসব জানি না আমি। বিলু কাজের সন্ধানে একটি পাড়ায় গেলে সম্পূর্ণ ভুল ইনফর্মেশন এবং সন্দেহের ভিত্তিতে বিলুকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তার বাড়ি সার্চ করে একটি ডায়েরি পায় পুলিশ।সেই ডায়েরি পড়ে পুলিশ বোঝে বিলু এসব থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করে।কিন্তু বিলুর একটি ভুল সন্দেহ বিলু ডায়েরিতে লিখেছিল। সেটা পড়ে পুলিশ সম্পূর্ণ বিনা প্রমাণে বিনা বিচারে বিলুর বন্ধু বরুণ ওরফে রুনুকে গ্রেপ্তার করে। রুনুকে লুকোতে চেষ্টা করার অপরাধে পুলিশের আঘাতে বৃদ্ধ অনঙ্গমোহনের মৃত্যু হয়। রুনু ছাড়া পায় বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর। তখন এরকম ঘটনা অনেক ঘটেছিল। তারই ছায়া পড়েছে এই উপন্যাসে। যাদের বাড়িতে তরুণ বয়সী পুরুষ ছিল তারা দেশের অন্য জায়গায় কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে তাদের পাঠিয়ে দিত। যাদের সেরকম কোনো আত্মীয় ছিল না তাদের কোনো না কোনো ছুতোয় পুলিশ স্রেফ সন্দেহ বশে গ্রেপ্তার করত। এরপর বিলু আবহাওয়া দপ্তরে চাকরি পায়। সেই সূত্রে লেখক আবহাওয়া সম্পর্কিত কাজকর্ম কীভাবে হয় সেসব তথ্য দিয়েছেন এবং প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করেছেন, যেহেতু আবহাওয়াকে কোনো সীমানায় বদ্ধ করা সম্ভব নয়, প্রকৃতিতে কোনো এক অঞ্চলের ছোট্ট একটা ঘটনার প্রভাব সম্পূর্ণ অন্য প্রান্তে পড়তে পারে। তাই যুদ্ধাবস্থাতেও পারস্পরিক শত্রু দেশগুলিও তথ্য বিনিময় করে। এছাড়া উপায় নেই কোনো। তাই সারা পৃথিবী জুড়ে আবহাওয়া দপ্তরের কর্মচারীরা একে অপরের বন্ধু। এরপর এসেছে মরিচঝাঁপি আর বিহার দাঙ্গার প্রসঙ্গ। দেশভাগের ঘা যে কতদূর ছড়িয়েছিল তা দেখানোর জন্য লেখক যথাসাধ্য চরিত্র তৈরি করেছেন। চাকরি সূত্রেই বিলুর পরিচয় হয় বিহার দাঙ্গার ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানে উদ্বাস্তু হয়ে গেছে এরকম এক অবাঙালী মুসলিম পরিবারের কন্যা উজমার সঙ্গে। দুই দাঙ্গার স্মৃতিতাড়িত অথচ উদার মনের মানুষ মানুষীর পরিচয় হয় ।  বিলুর মা পূর্ববাংলায়  মুসলিমদের অত্যাচারের স্মৃতির জন্য প্রথমে মুসলিম পুত্রবধূকে মেনে নিতে না পারলেও ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেন যে, মানুষ হিসেবে কে কেমন সেটাই বড় কথা। ধর্ম নয়। এরপরে এসেছে ভারতবর্ষে বিজেপির উত্থান প্রসঙ্গ ও বাবরি মসজিদের ইতিহাস আর তার ধ্বংস হবার ঘটনা পরম্পরা।

এই সময়ে উজমা সন্তান সম্ভবা হয় এবং  বাবরি মসজিদ নিয়ে উত্তাল সময়ে দিল্লিতে এক দাঙ্গার মধ্যে পড়ে তার গর্ভের ভ্রূণ নষ্ট হয়। এর প্রভাব দুজনের মনোজগতে এমনভাবে পড়ে যে বাচ্চা হবার সম্ভাবনা চিরতরে নষ্ট হয়ে  যায়। ফলত তারা এক অনাথ শিশুকে দত্তক নেবার সিদ্ধান্ত নেয়। বিলুর মা সেই শিশুর মধ্যেই খুঁজে নিতে চান তাঁর গৃহদেবতা নারায়ণকে। নারায়ণ শিলা ভাসিয়ে দেন গঙ্গায়। এদিকে উন্নয়নের প্লাবনের বলি হতে হয় অনঙ্গমোহন আর কৈলাশ দেবনাথের স্মৃতিস্তম্ভটিকে। উপন্যাসের শেষে মনে হয় যেন, দুই আদর্শবাদী মানুষের আত্মা নিজেদের স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে পড়ার শোকে কাতর নয়, বরং তারা আশাবাদী নবীন প্রজন্মের দিকে তাকিয়ে। অনেক খারাপ ঘটনার মধ্যেও তারা আশার আলো খুঁজে পায় বিলু ব্রাহ্মণ এবং মুসলিমদের দ্বারা অত্যাচারিত পরিবারের সন্তান হয়েও মুসলিম মেয়েকে ঘরণী করাতে এবং জাত গোত্র কূল পরিচয়হীন অনাথ শিশুকে দত্তক নেবার সিদ্ধান্তে। আগামী ভারত এই নবীনদের দিকেই তাকিয়ে আছে এটাই তাঁরা বলাবলি করেন নিজেদের মধ্যে।

যেহেতু ধর্মের কারণেই দেশভাগ হয়েছে তাই বিভিন্ন প্রসঙ্গে পৃথিবীর নানা দেশের ধর্ম ও তার রিচুয়াল নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা আছে বিভিন্ন চরিত্রের মুখে। কীভাবে ধর্মবোধ মানুষের মধ্যে এসেছে। ধর্মগুরুরা মানুষকে শুভ পথে নিয়ে যাবার উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন ধর্মের উদ্ভব করেছেন। কিন্তু পরবর্তী কালে তাদের প্রয়াণের পর সেগুলি হয়ে গেছে আচার সর্বস্ব। মূল উদ্দেশ্য থেকে তা অনেক দূরে সরে গেছে। এগুলো লেখক লিখেছেন তথ্য প্রমাণ সহ। মূল ঘটনা ও ইতিহাস ছাড়াও অনেক ছোটখাট বিষয়ও এসেছে। যেমন, দমদম এয়ারপোর্ট তৈরি হবার পুরো ইতিহাস, অধুনা বিস্মৃত ওপার বাংলার সংস্কৃতি রয়ানি গানের কথা,নেতা ধোপানীর গানের কথা।

গোটা উপন্যাসে অনঙ্গমোহনের মুখে অনেক সংস্কৃত শ্লোক আছে। সুন্দর অর্থ এবং সুললিত। লেখককে এগুলোও যত্ন করে সংগ্রহ করতে হয়েছে। একটি শ্লোক উল্লেখ না করে পারছি না। কেন সব সময়ে তর্কে জড়াতে নেই সেই প্রসঙ্গে এই শ্লোক। ” কৃতং মৌনং কোকিলৈজলদাগমে/  দর্দুরা যত্র বক্তারস্ত্রত মৌনং হি শোভনম” । এর অর্থ হল- বর্ষাকালে কোকিল চুপ করে যায় ।কারণ ভেকগণ যখন চিল্লায় তখন কোকিলের পক্ষে চুপ করে থাকাই শোভন। এই শ্লোকের প্রাসঙ্গিকতা আধুনিক যুগেও মনে হয় একই রয়েছে।

পাঠকের মনোজগত এই লেখক খুব ভালো বোঝেন। টানা ইতিহাস,লড়াই আর যন্ত্রণার কথার ভার পাঠকের মাথা নিতে পারবে না। মনোসংযোগ ব্যাহত হবে। তাছাড়া,বাস্তবেও জীবন কখনও একটানা এক রকম হয় না। মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতাই হল কষ্ট যন্ত্রণা আর লড়াইয়ের মধ্যেও মজা খুঁটে নেওয়া, কতটুকু আনন্দ জীবনের ভাঁড়ারে আছে তার সন্ধান করা। তাই এই লেখকের সিরিয়াস উপন্যাসের মধ্যেও এইসব হাসি মজা গোঁজা থাকে। এই রসবোধ স্বপ্নময়ের সিগনেচার টিউন। গম্ভীর কথার মধ্যেই তিনি অনায়াস দক্ষতায় খুঁজে নেন ও খুঁজে দেন রসের ভাঁড়ার। কারণ, এটাই জীবন। জীবন ঠিক এরকমই। তাই এসেছে কলোনীর ওই ভয়ানক জীবনের মধ্যেও কিশোর কিশোরীদের প্রেমের কথা। তখনকার বাল্যকালের প্রেমপত্রের নমুনা এরকম- তুমি প্রিয় আমি প্রিয়া/  থরথর দুটি হিয়া। প্রেম করাকে বলতো “এল করা”। তবে বিলু ভাই, ” কে প্রথম কাছে এসেছি”-  এই গানটার লিপ কিন্তু সৌমিত্র -মাধবী নয়। উত্তম-মাধবী। শঙ্খবেলা। ভাগ্যিস এটা মনে মনে ভেবেছ। বলে ফেলোনি। বলে ফেললে কেলেঙ্কারী হত।

সব শেষে বলি,  স্বপ্নময় চক্রবর্তী প্রথম কবে পড়া শুরু করেছি অথবা কোন উপন্যাস প্রথম পড়েছি, “সে আমার মনে নাই মনে নাই”, কিন্তু এটুকু মনে আছে, ক্ষণে ক্ষণে আসি তাঁর লেখার দুয়ারে। কিন্তু অকারণে নয়, মনের খোরাক হবার মত যথেষ্ট উপাদান খুঁজে পাই তাঁর লেখায়।

                         

বইয়ের নাম- জলের উপর পানি লেখক- স্বপ্নময় চক্রবর্তী প্রকাশক- দে’জ বিনিময় মূল্য- ৫৫০ টাকা

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>