Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,বি-উপনিবেশন

ধারাবাহিক: উত্তর উপনিবেশবাদ ও অন্যান্য (পর্ব-৪) । ফয়েজ আলম

Reading Time: 4 minutes

পশ্চিমারা শাসন শোষণের স্বার্থে, উপনিবেশ কায়েম রাখার স্বার্থে যেজ্ঞানভাষ্য তৈরি করেছে তাতে উপনিবেশিতদের মানসিকভাবে দাসে পরিণত করেছে। মনোজগতের এই উপনিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই উত্তর উপনিবেশী ভাবচর্চা জরুরি। উপনিবেশ স্বাধীন হওয়ার পর উপনিবেশক সংস্কৃতির প্রভাব বহাল থাকে স্বাধীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে, যাকে বলা হয় উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতি। এই প্রভাব কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটাই হলো বি-উপনিবেশায়ন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার পর এখন আত্ম-উদবোধন ও প্রতিরোধ সংগ্রাম মূলত উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতির বিরুদ্ধে, সাংস্কৃতিক ও ভাবাধিপত্যের নিরবচ্ছিন্ন কিন্তু অসম উপস্থিতি ছুড়ে ফেলার জন্য। এর শুরু সাংস্কৃতিক ক্রিয়াশীলতায়, বোধ ও ভাবের সংগ্রামে। উত্তর উপনিবেশবাদ নিয়ে আরো গভীরভাবে জানতে ইরাবতীর ধারাবাহিক ফয়েজ আলমের উত্তর উপনিবেশবাদ ও অন্যান্য লেখাটির আজ থাকছে পর্ব-৪।


 

বি-উপনিবেশন: জায়গা কায়দা-কানুনের প্রসঙ্গ

 

বি-উপনিবেশন কথাটি দুই ধাপে বিস্তৃত। প্রথমে, বি-উপনিবেশন হলো উপনিবেশের অবসান, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে স্বাধীনতা অর্জন। বি-উপনিবেশনের অতীত ও রাজনৈতিক পর্যায়টি ছিল রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পথে ভূমির পুনরুদ্ধার ও রাজনৈতিক-প্রশাসনিক স্বাধীনতা অর্জন; কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে বলা যায় তার অবসান হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী এক যুগের মধ্যে। উত্তর-উপনিবেশী তত্ত্বে বি-উপনিবেশনের পরবর্তী ধাপের অর্থই প্রাসঙ্গিক। উপনিবেশ স্বাধীন হওয়ার পর উপনিবেশক সংস্কৃতির প্রভাব বহাল থাকে স্বাধীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে, যাকে বলা হয় উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতি। এই প্রভাব কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটাই হলো বি-উপনিবেশন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার পর এখন আত্ম-উদ্বোধন ও প্রতিরোধ সংগ্রাম মূলত উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতির বিরুদ্ধে, সাংস্কৃতিক ও ভাবাধিপত্যের নিরবচ্ছিন্ন কিন্তু অসম উপস্থিতি ছুড়ে ফেলার জন্য। এর শুরু সাংস্কৃতিক ক্রিয়াশীলতায়, বোধ ও ভাবের সংগ্রামে।

উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতিতে জাতির মনস্তত্ত্ব ও চর্চায় জড়িয়ে থাকে উপনিবেশী সংস্কৃতির প্রভাব; আসলে জড়িয়ে নয়, একেবারে মিশ খেয়ে স্থায়ী হয়ে বসে থাকে, উপনিবেশিতের দৈনন্দিন জীবন  থেকে শুরু করে চেতনার গভীর-গোপন গুহায়। দীর্ঘকাল ধরে নিজের ছাপ আঁকতে আঁকতে তা প্রবাহিত হয়েছে। আমার মনে হয়, এটিই উত্তর-উপনিবেশী পরিস্থিতির ভয়াবহ দিক। মেশানোই  হোক, আর সংকর সংস্কৃতিই হোক, যুগ যুগ ধরে তাকে লালনের কারণে এর প্রতি একরকম অবচেতন মমত্ববোধ ও পক্ষপাতিত্ব দেখা দেয়; অভ্যস্ত হয়ে ওঠার ব্যাপার তো আছেই। এই চোরাবালিতে আটকে যেতে পারে সাধারণ মানুষের বড় এক অংশের মনন। প্রয়োজনের সময়ে তারাই হয়তো উপনিবেশ-প্রভাবিত এ সংস্কৃতির পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন।

এ-অবস্থায় বি-উপনিবেশন বলতে কী বুঝব আমরা? কোন কোন জায়গায় বি-উপনিবেশনের চেষ্টা করতে হবে? এবং কী উপায়ে, কোন কায়দা-কানুন মেনে? কোন কৌশলে উপনিবেশ-প্রভাবিত সংস্কৃতির প্রতি মোহ থেকে মুক্তি ঘটানো যাবে?

বি-উপনিবেশন বলতে আমরা বুঝব উপনিবেশের সেইসব প্রভাব নিষ্ক্রিয় করা, যেগুলো আমাদের প্রাক-ঔপনিবেশিক সামাজিক সাংস্কৃতিক উপাদান ও  অভিজ্ঞতাসমূহ বিকৃত করেছে, গোটা জাতির মধ্যে হীনমন্যতার বোধ পুঁতে দিয়েছে। আবার যেসব সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপাদান উপনিবেশ-প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে কিংবা নব্য উপনিবেশের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে, সেগুলোর বিরুদ্ধেও লড়তে হবে।

শুরুটা কোথায় হবে? তাও এক গুরুতর সমস্যা। বি-উপনিবেশনের কিছু কিছু কৌশল স্বাধীনতার আগেই বিকশিত হয়েছে। বস্তুত উপনিবেশ-প্রতিষ্ঠার পরপরই তার সাংস্কৃতিক আধিপত্য ঠেকানোর জন্য প্রতিটি উপনিবেশিত জনগোষ্ঠী নিজেদের মতো করে প্রতিরোধাত্মক কৌশল গ্রহণ করেছে; যদিও সম্পূর্ণ সফল হয়নি তাদের সকল প্রয়াস। বি-উপনিবেশনের প্রক্রিয়ায় সেই  কৌশলগুলোও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

উপনিবেশের সূচনা থেকে অদ্যাবধি বিকাশমান প্রতিরোধাত্মক প্রবণতাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সাঈদ একটা দিকনির্দেশনার মতো বলেছেন যে, সাম্রাজ্যবাদ জাতির অতীতে যা দমন করে এসেছে, চাপা দিয়ে রেখে এসেছে, তা আবিষ্কার ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বি-উপনিবেশনের একটা ভিত তৈরি হতে পারে, যেখানে দাঁড়িয়ে পরের পদক্ষেপগুলো নেওয়া যায় (সাঈদ ১৯৯৪; ২৫৩)। এখানে দেখা যাচ্ছে, প্রথমে জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য-সাহিত্য ইত্যাদি নিয়ে কাজ করতে হবে, সামাজিক আচার-প্রথা-পদ্ধতির কথাও বাদ যায় না।


আরো পড়ুন: উত্তর উপনিবেশবাদ ও অন্যান্য (পর্ব-৩) । ফয়েজ আলম


এই কথার মাঝখানে আরেকবার আমার সীমাবদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দিই। উপনিবেশের প্রভাব পড়েছে সমাজ, সংস্কৃতি ও চিন্তার সকল জায়গায়, প্রায় সকল জায়গাতেই তা স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে চাপা দিয়ে সামনে এগিয়েছে এবং সেইসূত্রে তার স্থানিক প্রকাশ দেখা দিয়েছে একেকজন মানুষের মনে। এটি রীতিমতো ভয়ংকর ও বিশাল এক পরিসর। সবগুলো জায়গায় উপনিবেশের প্রভাব চিহ্নিত করা বহু পন্ডিতের সম্মিলিত সামর্থ্যের কাজ। এ-প্রবন্ধে আমি কেবল জ্ঞানচর্চা বিশেষ করে সাহিত্যের পরিসর নিয়ে দু-চারটি কথা আলোচনা করব।

প্রতিরোধের অতীত-ঐতিহ্য থেকে দৃষ্টান্ত সহকারে বি-উপনিবেশনের দিকনির্দেশনা দিয়ে সাঈদ সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সতর্কও করেন যে, প্রতিরোধের একটা দুঃখজনক দিক হলো, এতে এমন সব অবস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে হয় যেগুলো সাম্রাজ্যবাদ কর্তৃক সরবরাহকৃত কিংবা তার দ্বারা প্রভাবিত অথবা বিকৃত (সাঈদ ১৯৯৪, ২৫৩)।

বি-উপনিবেশনের একটা পথ হলো সংকর বা মিশ্র সংস্কৃতির মধ্যে প্রাক ঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো চিহ্নিত করা, বিকৃত অবস্থা থেকে পুনরুদ্ধার করা, অতঃপর ওগুলোর নিজস্ব পরিসর ও মূল্য প্রদান; উপনিবেশকের সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোর তুলনায় ওগুলোকে বেশি গুরুত্বে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে তা ঘটতে পারে। অর্থাৎ কেবল আলাদা আইডেনটিটি নির্মাণ করলেই চলবে না, বরং হাইব্রিড আইডেনটিটিকে স্বীকার করে নিয়ে সে-পটভূমিতে প্রাক-উপনিবেশী উপাদানগুলোর অধিকতর উজ্জ্বল ও নিয়ামক ভূমিকা পালনের পথ তৈরি করতে হবে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ  লেখক সালমান রুশদি এই পথটিকে কার্যকর ভাবেন। সাঈদ মনে করেন, মিডনাইট চিলড্রেনসে এ-কাজটিই করেছেন রুশদি।

কিন্তু এ-কায়দাটাকে বলা যায় বাস্তবতার নিরিখে আপোসরফা এবং একরকম উচ্চাকাঙ্খার সমন্বিত রূপ। আপোসরফা এ-অর্থে যে, উপনিবেশে নানা টানাপোড়েনে বহুযুগ ধরে গড়ে ওঠা একটা নতুন সংস্কৃতির রক্তে-লোমকূপে মিশে থাকা উপনিবেশক সংস্কৃতির উপাদান খুঁজে বের করে বাতিল করে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। বরং এ-পরিস্থিতি স্বীকার করে নিয়ে প্রাক-ঔপনিবেশিক উপাদানগুলোর প্রাধান্য তৈরি করা অনেক সহজ ও অর্জনযোগ্য লক্ষ্য। আর উচ্চাকাঙ্খী এজন্য যে, এ-প্রস্তাবে নিহিত রয়েছে পশ্চিমের জ্ঞানকান্ডে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে তা বদলে দেয়ার ইচ্ছা। অর্থাৎ পশ্চিম যে-ডিসকোর্স তৈরি করেছে তাকেই পুনর্গঠিত করে পশ্চিমকে বাধ্য করা,  যেন সে পুবের মূল্য স্বীকার কওে নেয়। ‘দি এম্পায়ার রাইটস ব্যাক টু এন্ড ফ্রম দি সেন্টার’ কথাটির মূলে আছে এই মনোভঙ্গি। সাঈদ, রুশদি, হোমি ভাবারা মনে করেন এ-কাজটা সম্ভব এবং বাস্তব বিবেচনাপ্রসূত।

বি-উপনিবেশনের আরেকটা উপায়ের কথা বলেছেন সাঈদ : উপনিবেশকের সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা এবং তার প্রভাবজনিত বিকৃতি ঝেড়ে ফেলে প্রাক উপনিবেশী অভিজ্ঞতা ও সঞ্চয়ের ওপর ভর করে সম্পূর্ণ নতুন যাত্রাপথ তৈরি করে নেওয়া। একে বলা যায় পরম উত্তর-উপনিবেশবাদ। সাঈদ আশঙ্কা করেন, এ ধরনের আকাঙ্খা উসকে দিতে পারে, গোঁড়া ‘স্বদেশবাদী, চরম-জাতীয়তাবাদী মনোভাব যা  থেকে জন্ম নিয়েছে ইসলামি মৌলবাদ, আরববাদ ইত্যাদি মতবাদ ও আন্দোলন’ (সাঈদ ১৯৯৪; ২৫৮)।

সাঈদের মতো, আবদুল আর. জানমোহামেদও উপনিবেশী জ্ঞানভাষ্য পুনর্লিখনের ওপর গুরুত্ব দেন। জানমোহামেদ মনে করেন স্থানীয়দেরকে ‘আন’রূপে দাড় করানোর ও নিয়ন্ত্রণ করার উত্তম জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে সাহিত্য। স্থানীয় সংস্কৃতি মুছে উপনিবেশকের সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য এ-ক্ষেত্রটি খুবই কার্যকর। জানমোহামেদ এইসব সাহিত্যিক রচনা পুনর্লিখনের মধ্য দিয়ে উপনিবেশী জ্ঞানভাষ্যের (ইউরোপীয়/আন, আমরা/ওরা, সভ্য/স্থানীয় ইত্যাদির) দ্বিমেরু বিন্যাসটি উলটে দিতে চান। (জান মোহামেদ ১৯৯৯; ৫৯-৮৭)।

       

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>