Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,  বীরেশ্বর

ইরাবতী ধারাবাহিক: কদমতলি (পর্ব-২৩) । শ্যামলী আচার্য

Reading Time: 5 minutes

    

       কাঠের সিঁদুরকৌটোতেই ছিল নগেন্দ্রবালার সাতনরী হারের লকেটের একটি টুকরো। সোনার একটি ছোট্ট পাতা। অনুর ‘তেঁতুলপাতা’। বেশ মনে পড়ে, বিরাট বড় একটি হার বাবা গড়িয়ে দিয়েছিলেন মা’কে। জ্যাঠতুতো দিদির বিয়েতে। দিদির গয়না গড়াতে দেওয়া হল, আর কী ভেবে বীরেশ্বর স্ত্রী আর কন্যার জন্য স্যাকরাবাড়ি চলে গেল গয়নার অর্ডার দিতে।

       হরি স্যাকরার তখন অনেক বয়স। বীরেশ্বরের বাপ-ঠাকুর্দার আমলের লোক। এখনও চোখের জ্যোতি আর হাতের কাজ নিখুঁত। ছেলেপুলেরা সকলে স্যাকরার কাজ করতে চায় না। একটিমাত্র সন্তান তার ভরসা। সে’ও বাপের মতোই পাকা। শিল্পীর চোখ তার। বাপের একমাত্র ভরসা। হরি স্যাকরা গোল ফ্রেমের চশমার আড়াল থেকে বীরেশ্বরের দিকে একবার চায়।  

       “উমার বিয়ার গয়নার তো ফর্দ পাইসি। তোমার দাদায় দিয়া গ্যাসে। তা এই দুইখান কার?” 

       পারিবারিক প্রাচীন স্যাকরা পরিবারেরই একজন সদস্য। বীরেশ্বরকে তিনি জন্মাতে দেখেছেন। কাজেই এই ধরনের ব্যক্তিগত প্রশ্ন করার পরিপূর্ণ হক আছে তাঁর।     

       বীরেশ্বর অসংকোচে তাকায় হরির দিকে।    

       “এই দুইখান… সীতাহার তোমার বউমা আর নাতনীর কানের রিং। বিদেশ-বিভুঁইয়ে থাকি…” কথাটা অসম্পূর্ণ রাখে বীরেশ্বর। যেন ওই অসমাপ্ত বাক্যটিতেই বোঝানো হয়ে যাচ্ছে তার না-বলা মনোভাব। যেন ওই প্রবাসের বাসিন্দা হলেই দায় থাকে ভাইঝির বিয়ে উপলক্ষে স্ত্রী-কন্যাকেও কিছু উপহার দেবার। হঠাতই মনে হয় তেমন করে তো কখনও কিছু দেওয়া হল না এদের।   

       “হক্কলের সামনেই দিবা তো? না চুপি চুপি? হেইখান জিগাইয়া লই আগে…” হরিখুড়ো চোখের দিকে না তাকিয়েই প্রশ্ন করেন। তার কথায় সম্বিৎ ফেরে বীরেশ্বরের। দীর্ঘ প্রবাসে সংসারে অমনোযোগী মানুষটি বহু রীতিনীতি সামাজিকতা ভুলতে বসেছে। বা হয়তো বিস্মরণ নয়, খানিক গা-আলগা দিয়ে থাকা। বাঁধন আলগা হলে নিয়মের জোড় খুলতে থাকে। বহু সাধারণ লৌকিকতা তখন বড় অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। বীরেশ্বর একবারও তলিয়ে ভাবেনি পারিবারিক স্যাকরার কাছে এই তথ্যটি এত জরুরি হতে পারে। নিজের বউ-মেয়ের জন্য যা কিছু সে আনবে, তা’ যেন থাকে আড়ালে। সকলের অগোচরে। গোপনে দেওয়া। গোপনে রাখা।

       কথাটা মনে পড়েনি বীরেশ্বরের।

       কেন গোপনীয়তা? বীরেশ্বর মাইনে পায়। ইংরেজ সরকারের বেতনভুক কর্মচারী সে। ভারতীয় রেলবিভাগ। প্রতি মুহূর্তে নিজের কর্মদক্ষতা প্রমাণ করেছে, করছে। আরবী ফার্সি এবং ইংরেজি ভাষা শিখেছে নিজের চেষ্টায়। কাজের ভাষা তার আয়ত্তে, কাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতা প্রশ্নাতীত। কাজেই ইংরেজ সরকার প্রসন্ন। এবং সরকারের কৃপায় বেতন এবং তার পদোন্নতি নিয়মিত। ইচ্ছে করলেই স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে সে সুদূর পশ্চিমের কর্মস্থলে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু মায়ের শত অনুরোধেও এই কাজটি সে করেনি।

       প্রবাসে বীরেশ্বর স্বহস্তে রাঁধে, নিভৃতে পড়াশোনা করে আর ছুটিছাটা পেলেই একা দেশভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে। এই একার জীবনে তার চাওয়া-পাওয়া এটুকুই। স্বাধীনতা। নির্ভার দায়হীন যাপন।

       তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হল শুধুমাত্র এই বাউণ্ডুলেপনা কমানোর আশায়। সুন্দরী সুশীলা স্ত্রী যদি তাকে সংসারে বাঁধতে পারে। 

       সংসার বড় কঠিন ঠাঁই। সংসার নিংড়ে নেয়। ফেরত দেয় কী? অন্তত বীরেশ্বর তাঁর জ্ঞান বুদ্ধি অভিজ্ঞতায় সংসারকে অসার জেনেছে চিরকাল। বাঁধাধরা খাওয়া পরা আর বেঁচে থাকার নিশ্চিন্ত নিরাপদ জীবনযাপনে কোনও আকর্ষণ নেই তার। বরাবরই তার অচেনার টান। ঘরের গণ্ডি ছাড়িয়ে সে দূরদূরান্তে মানুষ দেখে বেড়ায়, প্রকৃতির রস উপভোগ করে, বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে স্ত্রী-পুত্র-কন্যার ভরণপোষণের দায় পূরণ করে। সূর্যাস্তের আলো মালভূমির দিকচক্রবালে কেমন রঙ নেয়, সাগরের মোহনায় মিশে যাবার সময় কেমন শব্দে আকুল হয় স্রোতস্বিনী, দুই নদীর গলাগলি মিলনেও ঘোলা আর নীল জল কেমন দিব্যি পাশাপাশি আলাদা রাখে নিজেদের অস্তিত্ব, সূর্যের প্রথম আলো কেমন করে ধুইয়ে দেয় বরফঢাকা পাহাড়চূড়া… বীরেশ্বর আকণ্ঠ পান করে সব সৌন্দর্য। ভুঁইচাঁপা কিংবা বনকলমীর লতার আপাততুচ্ছ চেহারাটিও তার কাছে বড় আদরণীয়। একের পর এক ঋতু আর সেই বদলে যাওয়া দিনে ঠাণ্ডা গরম ভিজে হাওয়ায় মেলে থাকা একটা আলুথালু জীবনে তৃপ্তি খুঁজে পায় বীরেশ্বর। পথেঘাটে ফকির সন্ন্যাসী ভবঘুরে তাকে জীবনের পাঠ দেয়। তাদের চেয়ে বড় শিক্ষক পাঠশালায় আছে নাকি!   


আরো পড়ুন: ইরাবতী ধারাবাহিক: কদমতলি (পর্ব-২২) । শ্যামলী আচার্য


       সেই যে বারাণসীর দশাশ্বমেধ ঘাটে সাদা থান পরা এক বুড়িমা তাকে ডেকে বলল, “অ হীরু, আমারে এক নয়া পয়সা দিবি বাবা? ক’টা বাতাসা মুখে দিই, শুধু শুধু জলে আর পেট ভরে না বাপ আমার…”

       বীরেশ্বর কেঁপে ওঠে। কে হীরু? তার নাম তো হীরু নয়। সে হীরু হয়ে জন্মায়নি। হীরু হতেও চায় না কখনও। হীরু কে তবে? ওই বুড়িমা’র ছেলে? আত্মীয়? প্রিয় পরিজন? তার কাছে ওই বুড়ির চাওয়া শুধু একটী মাত্র পয়সা?    

       জিগ্যেস না করেই পয়সাটি হাতে দেয় বীরেশ্বর। জিগ্যেস করতে ভয় করে। যদি সে হয়ে ওঠে ওই বুড়ির হারিয়ে যাওয়া কোনও প্রিয়জন, যদি তাকে আঁকড়ে ধরে আবার বড় কিছু চেয়ে নেয় সে। পার্থিব বস্তুর চেয়ে বেশি ভয় পায় মায়া। ওই দুটি অক্ষরের মধ্যে সে বাঁধা পড়বে না। কিছুতেই না।      

       কিন্তু নগেন্দ্রবালা বড় চাপা স্বভাবের। বড় বেশি ব্যক্তিত্বময়ী। বাপের ধারা পেয়েছে সে। আজ অবধি কোনওদিন মুখ ফুটে কিছু চায়নি। বুদ্ধিমতী নগেন্দ্রবালা বুঝেছিল, যে একবার আকাশ মাটি জল হাওয়ার স্বাদ পেয়েছে, তাকে ঘরের কোনে বন্দি করে রাখা অর্থহীন।  

এই সংসারে অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করে সে। রান্নাবান্না ঘরকন্না। যাতেই হাত দেয়, সেটি ফুটে ওঠে ফুলের মতো। খাওয়াদাওয়ার পালা মিটলে এক-একদিন বসে হাতের কাজ নিয়ে। সেদিন আর বইয়ের পাতায় মন বসে না। শাড়ি পুরনো হলে ছিঁড়ে গেলেও তার টকটকে রঙিন পাড়টি থেকে সুতো খুলে জড়িয়ে রাখে নগেন্দ্রবালা। পাড় জুড়ে জুড়ে তৈরি হয় ট্রাঙ্কের ঢাকনা, বাক্সের ঢাকনা। পাড় থেকে একটি একটি করে সুতো ছাড়িয়ে নেয় ঠাস ঘন বুনোট থেকে। ততক্ষণ মনে মনে নিজেকেও বিচ্ছিন্ন করে নেয় চারপাশে ঘন হয়ে আসা পিছুটান থেকে। মনের মধ্যে জমে থাকা প্রত্যাশার কালো মেঘ গলে পড়ে ফোঁটায় ফোঁটায়।  গাল বেয়ে নেমে আসা দু’চার ফোঁটা অভিমান সবার অলক্ষ্যে মুছে নিয়ে আবার খুলে ফেলা ওই সুতোর জোড়। সন্তর্পণে খুলে জড়িয়ে রাখা সুতো আবার একদিন ফিরে যায় কাঁথার নকশায়, রঙিন সুতোর শিকায়। ঘরের মধ্যে ঝুলে থাকেীকের পর এক উজ্জ্বল রঙিন শিকা। তার মধ্যে নানা জিনিসপত্রের সম্ভার। আচার বড়ি কাসুন্দি। দস্যিদের উৎপাত, বেড়ালের দৌরাত্ম্য থেকে বাঁচিয়ে রাখা। এধার-সেধারে সাজিয়ে রাখা, হাতের নাগালে গুছিয়ে রাখা। এক-একদিন চওড়া করে কাপড়ের ফালি পাকিয়ে দড়ি হয়। সেই দড়ি জুড়ে জুড়ে নানান রঙের সুতোয় তাকে অন্য চেহারায় সাজানো।

কী ছিল, কীভাবে ছিল আর কোথায় তার পরিণতি।

নগেন্দ্রবালার চাহিদা একটাই। ছেলে-মেয়েদের পাঠশালা ছুটি থাকলে সে চলে যায় তার বাপের ভিটেয়। শ্বশুর-শাশুড়ি কোনওদিন এই নিয়ে কোনও অভিযোগ-অনুযোগ করেননি। তাঁদের সস্নেহ অনুমোদন রয়েছে। যে ছেলে ন’মাসে-ছ’মাসে বাড়ি আসে, তার বউ-ছেলে-মেয়ে যদি মাঝেমধ্যে বাপের ঘরে কাটায়, তাতে ক্ষতি কী?  

নগেন্দ্রবালা বাপের আদরের মেয়ে, ভায়েদের শ্রদ্ধার, স্নেহের দিদি। ভা’জেদের কাছেও তার বড় কদর। বীরেশ্বরের মনে হয় নগেন্দ্রবালাও আসলে পালাতে চায়। সংসার থেকে মুক্তি চায় সে। তার শিশুবেলার পরিবেশে গিয়ে শ্বাস নেয়।  

অনুর স্পষ্ট মনে আছে মা সাতনরী হারটি পরেননি। অপ্রস্তুত হয়েছিলেন। বীরেশ্বরের হাত থেকে হারটি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন খানিকক্ষণ।

“এমন করে দেখার কী আছে? নকশা পছন্দ হয়নি?” বীরেশ্বরের গলায় উষ্মা।

“বড় সুন্দর। এইখান আমার লিগা?”

“তোমার হাতে এনে দিয়েছি যখন, তখন নিশ্চয়ই তোমার। উমার বিয়ার গয়না তো দাদা অর্ডার দিল আমার সামনেই। তখন মনে হইল…” বীরেশ্বর যেন কৈফিয়ত দেন।

“উমার বিয়াতে কিন্তু পরুম না, আগেই কইয়া দিলাম।” নগেন্দ্রবালার মৃদু অথচ দৃঢ় কন্ঠটিতে বীরেশ্বর সামান্য উত্তেজিত হন। কিন্তু উত্তেজনা প্রশমন করে নেন সৌজন্যবশত। উচ্চকণ্ঠ যেন যৌথ পরিবারের আশেপাশের ঘরে পৌঁছে অকারণ কৌতূহল উদ্রেক না করে, তা’ নিয়ে দুজনেই সাবধানী।   

“কেন?”

“লোকে কী কইব? কথা নাই বার্তা নাই একখান ভারী গয়না পরলেই হইল? এইখান আমি বরং অনুর জইন্য রাখি…”

“অনুর জন্য এনেছি একখানা। আর তাছাড়া ওর জন্য গয়না বানানোর ক্ষমতা আমার আছে। এইখান তোমার।” বীরেশ্বরের গলায় জোর ফুটে ওঠে। একে ভালবাসা বলে না। স্নেহ হতে পারে না। দীর্ঘদিনের অদর্শনের পরে যুবতী স্ত্রীর শরীরের প্রতি আকর্ষণজনিত প্রতিক্রিয়ার স্বরও নয়। হয়ত পৌরুষ।      

বিয়ের পাকা কথা হবে। গ্রামের পাঁচজন এসে বসেছেন। বিশিষ্ট মানুষ। পাকা মাথার লোক সব। তাদের সামনে যে কথাবার্তা হবে, তা’ আর ফেলতে পারবে না কেউ। ক্রমে ঠিক হল বিয়ের দিন, ঠিক হল দেনাপাওনার কথা। কন্যাপক্ষ থেকে কত ভরি সোনার গয়না, খাট-পালঙ্ক আসবাব, নমস্কারীর শাড়ি, রূপো তামা কাঁসা পিতলের কত বাসন যাবে তার হিসেবপত্র কিছু এল প্রকাশ্যে। কিছু রইল আড়ালে। পাত্রপক্ষও জানে, দানসামগ্রীতে কিছু হেরফের হতেই পারে। তবে বনেদি পরিবারে হাত পেতে চাওয়ার চেয়ে হাত তুলে ভদ্রতা দেখালে প্রাপ্তির ভাঁড়ার ভরে ওঠে দ্রুত। বরের তরফের লোকেরা জোর খাটালেন না কেউ। খুবই দ্রুত কথা পাকা হল। দু’পক্ষের কাগজে সই করল দু’পক্ষ। রূপোর টাকায় মাখানো হল সিঁদুর আর সেই রাঙা ছাপ পড়ল এবার দু’পক্ষের সইয়ের ওপরে। সিলমোহর। আইন-আদালতের চেয়েও যে চুক্তিপত্রের মূল্য বেশি। এয়োস্ত্রীরা উলু দিলেন সদলবলে। ঘোমটার আড়ালে তাদের চোখেমুখে আহ্লাদ। শাঁখ বেজে ওঠে। শাঁখে উলুতে কখন অজান্তেই সিঁদুররাঙা হয়ে উঠল কনের মুখখানি। পাড়া-প্রতিবেশী জানল, উমার বিয়ের ‘পাটিপত্তর’ মিটল। এবার শুধু দিন গোনার পালা। আর কাজ গোটানোর। মেয়ের বিয়ে বলে কথা। দায় কী কম?      

শেষবেলার এক ফালি রোদ্দুর তুলসীগাছের ওপর এসে লুটিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। অনঙ্গবালা তার দিকে তাকিয়ে বোঝেন আরও একটা দিন ফুরোল। হারখানি টুকরো টুকরো হয়ে মিশে গেছে অভাবে সংসারের ঘরের ফুটো চালে, ফ্যানাভাতের হাঁড়িতে, কয়লার উনুনে। সব যেতে যেতেও সাতনরী হারের লকেটের সেই তেঁতুলপাতাটি শত অভাবেও হাতছাড়া করেননি অনঙ্গবালা। ওটুকু নাতবউয়ের প্রাপ্য। বিশাখাকেও দেননি এখনও। বউয়ের মুখ দেখে তাকে সিঁদুরকৌটোটিও দেননি। দেখিয়ে রেখে বলেছিলেন, “এই একখান মাত্র সধবা চিহ্ন আজও রাখসি যত্ন কইরা। আমার ঘরের লক্ষ্মী তুমি। যেদিন তোমার ঘরে লক্ষ্মী আনবা, সেইদিন তারে দিও এইখান। অদ্দিন   

        

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>