| 15 এপ্রিল 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অনুবাদ উপন্যাস: সুবালা (পর্ব-২) । হোমেন বরগোহাঞি

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

লেখক পরিচিতি-১৯৩২ সনে লখিমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোটো গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক  রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়। সুবালা লেখকের প্রথম উপন্যাস।


(৩)

    খালি পেটে আমরা সেদিন রাতে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ভাইটা শুতে  এল না । কেউ ধরে চোখ কানা করে দেওয়া বন্য পশুর মতো সে অন্ধ হিংস্র আক্রোশে গাঁক গাঁক শব্দ করে ঘরের চারপাশে ঘুরে বেড়াল। সে যেন মানুষ নয় স্বয়ং ক্ষুধার মূর্তিমান রূপ। ক্রোধে পাগল হয়ে সে মাঝেমধ্যে মায়ের পিঠে প্রচন্ড জোরে  লাথি বসিয়ে দেয়, কিন্তু মা বিন্দুমাত্র শব্দ না করে স্থির হয়ে পড়ে থাকে। ক্ষুধার যন্ত্রণায় ধড়ফড় করতে করতে অবশেষে ভাই বোধহয় ক্লান্ত হয়ে আগুনের কাছে খালি মাটিতে শুয়ে পড়ল। আমাদের বিছানা এবং মাটির মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না, কারণ শোবার জন্য কাঠের খাট তো দূরের কথা, একটা বাঁশের চাঙ ও ছিল না। আমাদের ঘরও ছিল মাত্র একটি, তার মধ্যে খাওয়া-দাওয়া, শোয়া সমস্ত কাজ চলত। এক কোণে উনুনে আমরা ভাত রাঁধি, শীতের দিনে সেখানে আগুন পোহাই।রাত হলে তার পাশে দুটি বস্তা এবং একটি পাটি পেতে প্রত্যেকেই শুয়ে থাক। তাই ভাই মাটিতে শুয়ে পড়লেও মা তাকে বিছানায় তুলে আনার জন্য কোনো চেষ্টা করল না। ভাই তার ক্ষুধার জ্বালা লম্ফঝম্প করেই শান্ত করল, তাই সে কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে মগ্ন হয়ে পড়ল। কিন্তু আমরা তিনজনেই নীরবে তিলে তিলে সেই আগুনে দগ্ধ হতে লাগলাম। অনেক রাত পর্যন্ত আমাদের চোখে ঘুম এল না। খালি পেটে অনিদ্রার যন্ত্রণা যে কী ভয়ংকর সে কথা কি কেউ বর্ণনা করতে পারে?অন্যের কথা বলতে পারিনা,এই সময় যে অনুভূতি আমার সমস্ত হৃদয় ছারখার করে ফেলছিল, তা হল একটা প্রচন্ড অবুঝ অভিমান। কার ওপরে অভিমান করছি, কেন অভিমান করছি, কিছুই বলতে পারি না। কেবল একটি ভয়ংকর নিরলম্ব অভিমান  নিরলম্ব অভিমানে আমি ফুলে উঠছিলাম। মা বোধহয় আমার মনের অবস্থাটা কোনো উপায়ে অনুভব করতে পারছিলেন, হঠাৎ তিনি একবার বলে উঠলেন—‘হে ভগবান এদেরকে তাড়াতাড়ি মেরে ফেলার ব্যবস্থা কর!’

    কে বলে যে মানুষের কোনো প্রার্থনাই ঈশ্বরের কাছে পৌঁছায় না । মায়ের প্রার্থনা অন্তত আংশিক ভাবে হলেও ঈশ্বর তখনই মঞ্জুর করলেন।পরের দিন দুপুর বেলা স্কুল থেকে ফিরে এসে কিছুদূর থেকেই আমি দেখতে পেলাম,আমাদের বাড়ি আগুনে পুড়ে যাচ্ছে, একদল মানুষ ঘিরে দাঁড়িয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে। আমি আমার বইগুলি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বাড়ির দিকে দৌড়ে গেলাম। ইতিমধ্যে সবকিছু পুড়ে শেষ হয়ে গেছে । লোকগুলি বোধহয় খুব দেরিতে এসেছে। আমাকে দেখে দু একজন কাছে এসে উশ আশ  শব্দ করে আ সান্তনা জানাতে চেষ্টা করল। আমি ওদের সান্তনায় কান না দিয়ে এক দৃষ্টিতে ঘর পোড়া ছাইয়ের স্তূপটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎ আমি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলাম, ‘বেঙা,বেঙা কোথায় গেল?’ আমার চিৎকারে মানুষগুলি চমকে উঠল। ওরাও কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে কয়েকজন একসঙ্গে প্রশ্ন করতে লাগল,’বেঙা  ঘরের ভেতর ছিল নাকি?’ আমি পাগলের মতো কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করতে লাগলাম — ‘ বেঙা ঘরের ভেতরে ছিল, মা ওরা বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে হাটে গিয়েছে, সে বোধহয় পুড়ে মারা গেছে, বেঙা….ও বেঙা…।’ আমার কথা শুনে লোকগুলি ব্যস্ত হয়ে ছাইয়ের স্তূপটা  ঘাঁটাঘাটি করতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে কয়েকটি মানুষ হায় হায় করে আর্তনাদ করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে একটি মানুষ ছাইয়ের স্তূপ থেকে তুলে নিয়ে এল বেঙার  আধপোড়া, মুখের চিহ্ন না হওয়া, বীভৎস মৃতদেহটা।


আরো পড়ুন: অনুবাদ উপন্যাস: সুবালা (পর্ব-১) । হোমেন বরগোহাঞি


(৪)

    এই ঘটনার পরে প্রায় একমাস ধরে মা আহার নিদ্রা সমস্ত কিছু ত্যাগ করে কেব্ল কাঁদতে লাগল।কী ভয়ঙ্কর সেই কান্না,মনে পড়লে এখনও আমার বুক কেঁপে উঠে।এক মুহূর্তও তিনি স্থির হয়ে বসতে পারেন না,জীবন্ত পুড়ে মরা মানুষের মতো তিনি অহর্নিশি ছটফট করতে থাকেন।আমরা ঠিক বুঝতে পারলাম ,বন্ধ ঘরের ভেতরে চারপাশ থেকে গ্রাস করে আনা অবস্থায় কালা,বোবা ছেলেটি যন্ত্রণার একটা চিৎকার করতে না পেরে মূক পশুর মতো উবুড় হয়ে পড়ে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মরেছিল,জননীর হৃদয় নিয়ে মা এখন সেই সমস্ত দাহ-যন্ত্রণাটুকু তিলে তলে ভোগ করছেন।বিশেষ করে রাতের বেলা তাঁর অবস্থা সাংঘাতিক হয়ে উঠে।বিছানায় এক মুহূর্ত থাকতে পারেন না।তাকে যেন কেউ জীবন্ত চিতায় তুলে দিয়েছে,বিছানায় পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি একটা ভাব দেখিয়ে ধড়ফড় করে লাফিয়ে উঠেন।তারপরে ঘরের চারপাশে ঘুরে ঘুরে আহত বা ভীত বন্য পশুর মতো বীভৎস শব্দ করে তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন।একমাস ধরে এই অবস্থা চলার পরে আমি ভাবতে শুরু করলাম যে আমি নিশ্চয় পাগল হয়ে যাচ্ছি।কিন্তু কী আশ্চর্য ,সেইভাবে ভাবতে আরম্ভ করার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মুখ দেখেই যেন তিনি আমাদের মনের ভাব বুঝতে পারলেন,আর তৎক্ষণাৎ সমস্ত কান্নাকাটি বন্ধ করে স্থির হয়ে পড়ল।

    মা পাগলী হয়ে যান নি,কিন্তু তিনি যে আগের মতো আর স্বাভাবিক নেই,সেকথা দুইদিনের মধ্যে সবাই বুঝতে পারল।তিনি লোকজনের সঙ্গে কথা বলা ছেড়ে দিলেন,এমন কী নিতান্ত দরকার না হলে আমাকেও ডাকছেন না।তাঁর চোখেমুখে একটা কঠিন হিংস্রতা ফুটে উঠল।কান্নাকাটি বন্ধ করেই তিনি একটা জাল বুনতে শুরু করলেন….তারপরে আরও একটি….তারপরে আরও একটি—যেন জীবনের জাল বোনা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।হিংস্র অপলক দৃষ্টিতে কেবল হাতের মাকোটা এবং সুতোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তিনি এমনভাবে জাল বোনায় মগ্ন হয়ে থাকেন যে সেই সময় তার মুখের দিকে তাকাতে যে কোনো মানুষের ভয় হবে,তাকে রূপকথার ডাইনি বুড়ি বলে মনে হবে।কখনও মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভাঙলে আমি দেখি,তিনি তখনও ঘুমোন নি,উনুনের পাশে বসে প্রদীপের মিটমিটে আলোতে তিনি সেই একই হিংস্র দৃষ্টিতে জাল বুনে চলেছেন।তাঁর চোখের দৃষ্টি দেখলে মনে হয়,তিনি যেন একা নন,অপলক দৃষ্টিতে ভীষণ নিষ্ঠুর ক্রোধে তিনি যেন কারও দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছেন,-তখন একটা অশরীরী সত্তার অস্তিত্ব অনুভব করে ভয়ে আমার শরীরটা শিহরিত হয়ে উঠে,মায়ের সামনে থেকে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করে।তাড়াতাড়ি করে মাথার ওপর পর্যন্ত কাপড়টা টেনে নিয়ে দিদির বুকে জড়োসড়ো হয়ে পুনরায় শুয়ে পড়ি।কিন্তু ভয়ে চোখে ঘুম আসে না,নিজের মাকে শ্মশানের পেত্নী বলে মনে হয়।কখনও ভয়ে এভাবে ঘেমে উঠি যে গায়ের জামা পর্যন্ত ভিজে যায়।ভূতের ওপরে দানোর মতো কখনও হঠাৎকানে আসে মা দাঁত কড়মড় করছে;দূপুর রাতের অন্ধকার নিস্তব্ধতায় সেই নির্বাক দাঁত কড়মড়ের শব্দটা শ্মশানে ছোটো বাচ্চার মাথা চিবোনো ডাইনির মুখের শব্দ বলে মনে হয়ে ভয়ে আমার মেরুদণ্ড পর্যন্ত একটা শীতল স্রোত বয়ে যায়।আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়।দ্রুত নিশ্বাস নিয়ে আমি দিদিকে জড়িয়ে ধরি।

     

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত