| 5 মার্চ 2024
Categories
ইতিহাস

ভারতের বিবাহের ইতিহাস (পর্ব -২) । অতুল সুর

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট

প্রাচীন ভারতে বিবাহ

 

হিন্দুরা যদিও দাবী করে যে তাদের মধ্যে প্রচলিত বিবাহের রীতিনীতি বৈদিক যুগ থেকে অনুস্থত হয়ে এসেছে তথাপি কথাটা ঠিক নয়। গোত্র-প্রবর-সপিও বর্জন বিধি, যার উপর বর্তমান হিন্দুদের বিবাহ প্রথা প্রতিষ্ঠিত, তার উল্লেখ বৈদিক যুগের প্রাচীনতম গ্রন্থ ঋগ্বেদে মোটেই নেই। মনে হয়, ঋগ্বেদের যুগে বিবাহ প্রতিষ্ঠিত ছিল গ্রামভিত্তিক বহির্বিবাহের নিয়মের উপর। কেননা, ঋগ্বেদের বিবাহসংক্রান্ত স্তোত্র থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, পাত্রপাত্রী বিভিন্ন গ্রামের সহিত সংশ্লিষ্ট হতে এবং “দিধিষু” নামে এক শ্রেণীর মধ্যগের মাধ্যমে বিবাহের যোগাযোগ সাধিত হতো। নবপরিণীত। যে অন্ত গ্রামের সহিত সংশ্লিষ্ট থাকতো, তা তার বধু আখ্যা থেকেই বোঝা যায়। কেননা, “বধু’ শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে যাকে বহন করে আনা হয়েছে। বৈদিকযুগের বিবাহ সম্বন্ধে আরও লক্ষ্য করবার বিষয় এই যে, নবপরিণীতার বিবাহ কোন বিশেষ ব্যক্তির সঙ্গে হতে না, তার সমস্ত সহোদর ভ্রাতাগণেরই সঙ্গে হতো। অন্ততঃ আপস্তম্ভ ধর্মসূত্রের যুগ পর্যন্ত এই রীতি প্রচলিত ছিল। কেননা, আপস্তম্ভ ধর্মসূত্রে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে কন্যাকে দান করা হয় কোন এক বিশেষ ভ্রাতাকে নয়, বংশের সমস্ত ভ্রাতাকে। এজন্তই পরবর্তীকালে মনু বিধান দিয়েছিলেন যে কলিযুগে কন্যার বিবাহ যেন সমগ্র পরিবারের সঙ্গে যৌথভাবে না দেওয়া হয়। মমুর এই বিধান থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, তথাকথিত কলিপুর্বযুগে কন্যার বিবাহ সমগ্র পরিবারের সহিতই সাধিত হতো। ঋগ্বেদে এবং অথর্ববেদে এমন কয়েকটি স্তোত্র আছে যা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, যদিও বধূকে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাই বিবাহ করতে, তা হলেও তার কনিষ্ঠ সহোদরগণেরও তার উপর যৌনমিলন বা রমনের অধিকার থাকতো। এই দুই গ্রন্থেই স্বামীর কনিষ্ঠভ্রাতাকে “দেবৃ” বা দেবর বলা হয়েছে। এই শব্দদ্বয় থেকেও তা সূচিত হয়। কেননা দেবর মানে দ্বিবর বা দ্বিতীয় বর।

 

 

ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের এক স্তোত্র থেকে বোঝা যায় যে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার মৃত্যুর পর তার বিধবা দেবরের সঙ্গেই স্ত্রীরূপে বাস করতো। সেখানে বিধবাকে বলা হচ্ছে, “তুমি উঠে পর, যে দেবু তোমার হাত ধরছে তুমি তারই স্ত্রী হয়ে তার সঙ্গে বসবাস কর।” অথর্ববেদের এক স্তোত্রেও (১০৩১-২ ) অনুরূপ কথা ধবনিত হয়েছে।

 

 

ভাবীর সঙ্গে দেবরের যে যৌন ঘনিষ্ঠত থাকতো তা ঋগ্বেদের বিবাহ সম্পর্কিত স্তোত্রও ইঙ্গিত করে। উক্ত স্তোত্রে দেবতাগণের নিকট প্রার্থনা করা হচ্ছে যে, তারা যেন নববধূকে দেবুর প্রিয় ও অনুরাগের পাত্রী করে তোলেন। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের অপর এক স্থানেও বর্ণিত রয়েছে যে, বিধবা ভাবী দেবুকে র্তার দাম্পত্য শয্যায় নিয়ে যাচ্ছেন।

 

 

একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারা যাবে যে ঋগ্বেদের যুগে ভাবীর সঙ্গে দেবরের যৌন সম্পর্ক ছিল কেন। আর্যরা যখন এদেশে আসেন তখন র্তারা তাদের সঙ্গে খুব কমসংখ্যক মেয়েছেলে নিয়ে এসেছিলেন । র্তাদের মধ্যে মেয়েছেলের অভাব বিশেষভাবেই ছিল। এদেশে আসবার পর তারা এদেশের অধিবাসীদের খুব ঘৃণার চক্ষে দেখতেন । রক্তের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্ত, গোড়ারদিকে তারা এদেশের অধিবাসীদের সঙ্গে কোনরূপ বিবাহ সম্পর্ক স্থাপন করেন নি। পরবর্তীকালে অবশ্য র্তারা এদেশের মেয়ে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিলেন । কিন্তু অস্তবর্তীকালে তাদের মধ্যে বিবাহযোগ্য মেয়ের অভাবের দরুন মাত্র জ্যেষ্ঠভ্রাতাই বিবাহ করতেন আর অন্য ভ্রাতারা ভাবীর সঙ্গেই যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতেন।

 

 

ভাবীর উপর দেবরের এই যৌন অধিকার যে পরবর্তীকালের নিয়োগপ্রথা থেকে স্বতন্ত্র সে বিষয় কোন সন্দেহ নেই। বৈদিক যুগে দেবরের যে যৌন অধিকার থাকতে তা সাধারণ রমণের অধিকার। আর পরবর্তীকালের নিয়োগপ্রথা ছিল মাত্র সন্তান উৎপাদনের অধিকার। সন্তান উৎপন্ন হবার পর এ অধিকার আর থাকতো না। আরও লক্ষ্য করবার বিষয় হচ্ছে এই যে, বিধবা ভাবীর উপর দেবরের এই যৌন অধিকার জ্যেষ্ঠের মৃত্যুর পরেও অবিকৃত থাকার দরুন ঋগ্বেদে বিধবা বিবাহের কোন উল্লেখ নেই, যা পরবর্তীকালের গ্রন্থসমূহে দেখতে পাওয়া যায়। বেদে ব্যবহৃত ও জ্ঞাতিত্ব বাচক কয়েকটি শব্দ থেকেও আমরা বুঝতে পারি যে স্ত্রীলোকের একাধিক স্বামী থাকতো। ‘পিতা’ ও ‘জনিত পিতা’ এ দুটি শব্দ বেদে স্বতন্ত্র জ্ঞাতিবাচক শব্দ হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। মনে হয়, শেষোক্ত শব্দের অর্থ হচ্ছে, যে পিতা সন্তানের প্রকৃত জন্মদাতা আর প্রথম শব্দের অর্থ হচ্ছে অপর পিতা বা মাতার অন্ত স্বামী। একথা বলাবাহুল্য যে, প্রকৃত পিতা হতে অপর কোন পিতা মাত্র সেই সমাজেই কল্পিত হতে পারে, যে সমাজে স্ত্রীর একাধিক স্বামী থাকতে । বেদে ব্যবহৃত “পিতৃতম” শব্দও অনুরূপ ইঙ্গিত করে। এর অর্থ পিতাদের মধ্যে যে অগ্রণী বা অগ্রগামী ।

 

 

যে যুগের লোক দেবতাগণের বেলায় নিকটতম আত্মীয়ের মধ্যেও যৌনমিলন কল্পনা করতে পারতে সে যুগে যে ভাবীর সঙ্গে দেবরের যৌনসম্পর্ক থাকবে, তা কিছু বিচিত্র ব্যাপার নয়। ঋগ্বেদে যম-যমীর কথোপকথনে দেখা যায় যে, যমের যমজ-ভগ্নী যমী যখন যমের সঙ্গে যৌনমিলন প্রার্থনা করছে, যম তখন বলছে, যেকালে ভাই-বোনে যৌনমিলন ঘটতো সেকাল অনেকদিন অতীত হয়ে গেছে। সেখানে একথাও বলা হয়েছে যে ভবিষ্যতে হয়তো এমন যুগ পুনরায় আসবে যখন ভাই-বোনের মধ্যে এরূপ সংসর্গ আবার বৈধ বলে গণ্য হবে। এ ছাড়া ঋগ্বেদে এরূপ অস্বাভাবিক মিলনের আরও উদাহরণ আছে, যেমন সূর্য ও উষার মিলন, অশ্বিনদ্বয় ও সূর্যার মিলন। আগেই বলা হয়েছে যে ঋগ্বেদে বিধবা বিবাহের উল্লেখ নেই। মনে হয়, অথর্ববেদের যুগে এর প্রবর্তন হয়েছিল । কেননা অর্থববেদের নবম মণ্ডলে বর্ণিত হয়েছে যে জনৈকা বিধবা মৃতস্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে, যাতে দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে স্বর্গে যেতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে এক ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিচ্ছেন।

 

 

পণ্ডিতমহলে স্বীকৃত হয়েছে যে আর্যরা দুই বিভিন্ন স্রোতে ভারতে এসেছিলেন। যারা পঞ্চনদে এসে বসবাস সুরু করে ঋগ্বেদ রচনা করেছিলেন, তারা এসেছিলেন পরে। আর র্যার আগে এসেছিলেন র্তারা বসতি স্থাপন করেছিলেন বাংলাদেশে । ( লেখক প্রণীত “বাঙালীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয়” দেখুন ) মনে হয় পরবর্তীকালে আগত ঋগ্বেদের আর্যদের তুলনায় তারা অনেক উদার মনভাবাপন্ন ছিলেন। সেই কারণে র্তারা এদেশে অনার্যদের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করেছিলেন। তারা বহুক্ষেত্রে যে শুধু অনার্য মেয়েদের বিবাহ করেছিলেন তা নয়, তারা অজ্ঞাতকুলশীল বহু ব্যক্তিকে যেমন সত্যকাম, জবাল, মহীদাস, ঐতরেয় ইত্যাদিকে নিজেদের গোষ্ঠীভুক্ত করে নিয়েছিলেন। মনে হয় অনার্য সমাজে প্রচলিত টটেম-ভিত্তিক বহির্বিবাহ গোষ্ঠী সমূহের অনুকরণে র্তারাই গোত্র প্রবর প্রভৃতি স্থষ্টি করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে ঋগ্বেদীয় আর্যরা যখন পূর্বদিকে অগ্রসর হয়েছিলেন তখন তারা তা গ্রহণ করেছিলেন ।

আর্য ও অনার্যদের মধ্যে যে মেলামেশা ঘটেছিল, তা বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছিল মহাভারতের যুগে। এর ফলে অনার্যসমাজের বিবাহপদ্ধতি সমূহ আৰ্যসমাজেও স্থান পেয়েছিল। ঋগ্বেদের যুগে এক রকমের বিবাহই প্রচলিত ছিল। সে বিবাহ নিম্পন্ন হতো মন্ত্র উচ্চারণ ও যজ্ঞ সম্পাদন দ্বার। কিন্তু মহাভারতীয় যুগের সমাজে এমন সব রকমের বিবাহও স্থান পেয়েছিল, যার জন্ত মন্ত্র উচ্চারণ ব: যজ্ঞ সম্পাদনের প্রয়োজন হতে না ।

 

 

মহাভারতীয় যুগে আমরা চার রকম বিবাহের উল্লেখ পাই। ব্রাহ্ম, গান্ধৰ্ব, আমুর ও রাক্ষস । এর মধ্যে মাত্র ব্রাহ্ম বিবাহেই মন্ত্র উচ্চারণ ও যজ্ঞ সম্পাদনের প্রয়োজন হতো। বাকী তিন রকম বিবাহ-এ সবের কোন বালাই ছিল না। আবার যাজ্ঞবল্ক্য ও মনুস্মৃতিতে আমরা আট রকম বিবাহের উল্লেখ পাই । এই আট রকম বিবাহ যথাক্রমে ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রাজাপত্য, আস্থর, গান্ধৰ্ব, রাক্ষস ও পৈশাচ। ব্রাহ্ম বিবাহ ছিল ব্রাহ্মণ্য আচারসম্পূত বিবাহ। এই বিবাহে মন্ত্র উচ্চারণ ও যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে স্ববস্ত্রা, সালংকর ও সুসজ্জিত কন্যাকে বরের হাতে সম্প্রদান করা হতো। প্রাচীন ঋষিদের মধ্যে যে বিবাহ প্রচলিত ছিল, তার নাম ছিল আর্য বিবাহ । এই বিবাহে যজ্ঞে ব্যবহৃত ঘৃত প্রস্তুতের জন্য মেয়ের বাবাকে, বর এক জোড়া গামিথুন উপহার দিত। যজ্ঞের ঋত্বিককে দক্ষিণ হিসাবে যেখানে কন্যাদান করা হতো, তাকে বলা হতে দৈব বিবাহ। “তোমরা দুজনে যুক্ত হয়ে ধর্মাচরণ কর” এই উপদেশ দিয়ে যেখানে বরের হাতে মেয়েকে দেওয়া হতো, তাকে বলা হতো প্রাজাপত্য বিবাহ। বলা বাহুল্য যে এই চার রকম বিবাহপদ্ধতিরই কৌলীন্য ছিল। বাকীগুলির কোন কৌলীন্য ছিল না, কেননা সেগুলি প্রোগ বৈদিক আদিবাসী সমাজ থেকে নেওয়া হয়েছিল। তার প্রমাণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে সেগুলি আদিবাসী সমাজে এখনও প্রচলিত আছে। আস্থর বিবাহ ছিল পয়সা দিয়ে মেয়ে কেনা। তার মানে যে বিবাহে কন্যাপণ দেওয়া হয়। এরূপ বিবাহে মেয়ের বাবাকে কিংবা তার অভিভাবককে পণ বা মূল্য দিতে হতো। আর মেয়েকে জোর করে কেড়ে নিয়ে বিবাহ করা হতো, তার নাম দিল রাক্ষস বিবাহ। আর যেখানে মেয়েকে অজ্ঞান বা অচৈতন্য অবস্থায় হরণ করে এনে বা প্রবঞ্চনা অথবা ছলনার দ্বারা বিবাহ করা হতো, তাকে বলা হতে পৈশাচ বিবাহ। আর নির্জনে প্রেমালাপ করে যেখানে স্বেচ্ছায় মাল্যদান করা হতো তাকে বলা হতো গান্ধৰ্ব বিবাহ। যদিও যাজ্ঞবল্ক্য ও মনু এই আট রকম বিবাহের কথা উল্লেখ করেছেন, তথাপি মহাভারতীয় যুগে উচ্চবর্ণের মধ্যে মাত্র দু-রকমের বিবাহই সাধারণত অনুষ্ঠিত হতো। তা হচ্ছে ব্রাহ্ম ও গান্ধৰ্ব । ক্ষত্রিয়ের পক্ষে গান্ধৰ্ব বিবাহই ছিল প্রশস্ত। মহাভারতের নায়কদের মধ্যে অনেকেই গান্ধৰ্ব মতে বিবাহ করেছিলেন। যথা ; গঙ্গার সঙ্গে শাস্তমুর বিবাহ এইভাবেই নিম্পন্ন হয়েছিল। এইভাবেই আবার নিম্পন্ন হয়েছিল ভীমের সঙ্গে হিরিস্কার বিবাহ, অজুনের সঙ্গে উলুপী ও চিত্রাঙ্গদার বিবাহ, কুষ্মস্তের সঙ্গে শকুন্তলার বিবাহ ও ইক্ষাকুবংশীয় পরীক্ষিতের সঙ্গে স্থশোভনার বিবাহ। তবে রাজারাজরার ঘরের মেয়েদের পক্ষে স্বয়ম্বর প্রথায় বিবাহ ছিল আদর্শ। স্বয়ম্বর বিবাহ ছিল রাক্ষস বিবাহেরই একটা স্থঠু সংস্করণ মাত্র। রাজারাজরাদের মধ্যে স্বয়ম্বর প্রথায় বিবাহই যে প্রশস্ত ছিল, তা আমরা কাশীরাজার তিন কন্যা অম্বা, অম্বিকা ও অম্বালিকার স্বয়ম্বরসভায় ভীষ্মের উক্তি থেকে পরিষ্কার বুঝতে পারি। ঐ সভায় ভীষ্ম বলেছিলেন, “স্মৃতিকাররা বলেছেন যে স্বয়ম্বর সভায় প্রতিদ্বন্দীদের পরাহত করে কন্যা জয় করাই ক্ষত্রিয়দের পক্ষে শ্রেষ্ঠ বিবাহ।” অনুরূপভাবে পাণ্ডব-ভ্রাতার দ্রুপদ রাজার কন্যা দ্রৌপদীকে স্বয়ম্বর সভায় জয় করেছিলেন। একথা এখানে বলা প্রয়োজন যে স্বয়ম্বর সভায় প্রতিদ্বন্দিতা করবার জন্য যে মাত্র আর্যকুলের রাজারাই যোগ দিতেন, তা নয়। অনার্য রাজারাও যোগ দিতেন। কেননা এরূপ স্বয়ম্বর সভা থেকেই নিষাদ-রাজ নল বিদর্ভরাজার মেয়ে দময়ন্তীকে জয় করেছিলেন। মহাভারতীয় যুগে আর্য ও অনার্যদের মধ্যে যে পরস্পর বিবাহের আদান-প্রদান ঘটতে সে বিষয় কোন সন্দেহ নেই। ব্রাহ্মণ কর্তৃক নিষাদ কন্যাকে বিবাহের

 

 

উল্লেখ মহাভারতের একাধিক জায়গায় আছে। মহাভারতের অপর এক জায়গায় উল্লিখিত হয়েছে যে জনৈক ব্রাহ্মণ “পক্ষী” জাতির এক মেয়েকে বিবাহ করেছিলেন। এখানে ‘পক্ষী’ জাতি বলতে পক্ষী টটেম বিশিষ্ট কোন অনার্যজাতিই বোঝাচ্ছে। মহাভারতীয় যুগে রাজারাজরারাও অনার্য সমাজ থেকে স্ত্রী গ্রহণ করতে সঙ্কুচিত হতেন না। শান্তনু তো অনার্য দাসকন্যা সত্যবতীকে বিবাহ করেছিলেন । রাজা দেবক-ও এক অসবর্ণ শূদ্র কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন।

এরূপ সন্দেহ করবার যথেষ্ট অবকাশ আছে যে মহাভারতীয় যুগের সমাজের প্রথম অবস্থায় বিবাহ সম্পাদন করবার জন্ত যজ্ঞ নিম্পাদন, মন্ত্র উচ্চারণ, সপ্তপদীগমন ইত্যাদি বিধিসম্মত কোন পদ্ধতির প্রয়োজন হতো না। পরবর্তীকালের সমাজেই এগুলি প্রবর্তিত হয়েছিল। দ্রৌপদীর বিবাহ কাহিনী থেকে এটা আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি। পাণ্ডব-ভ্রাতারা দ্রৌপদীকে জয় করে এনে কিছুকাল র্তার সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীরূপে বসবাস করেছিলেন। পরে তারা আবার দ্রুপদ রাজার গৃহে ফিরে গিয়েছিলেন যজ্ঞ সম্পাদন ও আচার অনুষ্ঠান পালনের জন্য। মনে হয়, পরবর্তীকালের রীতিনীতি ও প্রথার সঙ্গে খাপ খাওয়াবার জন্যই মহাভারতের মধ্যে এই অংশটি উত্তরকালে প্রক্ষিপ্ত করা হয়েছিল। ব্রাহ্মণ্য আচারসম্পূত বিবাহই যে কালক্রমে প্রাধান্ত লাভ করেছিল, তা আমরা নারদ-পৰ্বত-শৃঞ্জয় উপাখ্যান, ভৃগু-পুলোমা উপাখ্যান প্রভৃতি থেকেও পরিষ্কার বুঝতে পাবি। মনে হয়, পরবর্তীকালে যখন যজ্ঞ সম্পাদন, মন্ত্র উচ্চারণ ও সপ্তপদীগমন ছাড়া অনুষ্ঠানগত বিবাহ হতে পারতো না, তখনই মহাভারতের মধ্যে এই অংশগুলি প্রবেশ করানো হয়েছিল।

আচার অনুষ্ঠানগত বিবাহ যখন প্রচলিত হলো, তখন এইরকম বিবাহের উপরই জোর দেওয়া হলো। সেজন্য আমরা দেখতে পাই যে ভৃগু যখন পুলোমাকে বিবাহ করলেন, তখন এক রাক্ষস এসে দাবী করে বললে যে, পুলোমাকে সে-ই আগে বিবাহ করেছে। এই বিবাহের মীমাংসার জন্ত অগ্নিকে সাক্ষী মানা হলো। অগ্নি রাক্ষসকে বললেন–রাক্ষস, এ কথা সত্য বটে যে তুমিই পুলোমাকে প্রথম বিবাহ করেছে, কিন্তু যেহেতু তুমি মন্ত্রপাঠদ্বারা তাকে বিবাহ কর নাই, আর ভৃগু তাকে মন্ত্রপাঠ দ্বারা বিবাহ করেছে, সেইহেতু পুলোমা ভৃগুর স্ত্রী। অপর একস্থলে ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বলছেন—একমাত্র যজ্ঞ সম্পাদন, মন্ত্রপাঠ ও সপ্তপদীগমন দ্বারাই বিবাহ নিম্পন্ন হয়।

আগেই বলা হয়েছে যে গান্ধৰ্ব বিবাহে এ সকল আচার অনুষ্ঠানের কোন বালাই ছিল না। সেজন্য মনে হয় যে গান্ধৰ্ব বিবাহ পূর্ববর্তীসমাজের বিবাহ । গান্ধৰ্ব ও রাক্ষস বিবাহ সম্পর্কে রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে যে কথা বলেছিলেন তা থেকেও মনে হয় যে পূর্ববর্তীকালের ক্ষত্রিয় সমাজে অনুষ্ঠানগত বিবাহের প্রাধান্ত ছিল না। রাজা দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে বলছেন—“প্রিয়ে, তুমি আমাকে স্বামীরূপে বরণ কর। তুমি আমাকে গান্ধৰ্ব মতে বিবাহ কর। কেননা, শাস্ত্রকাররা বলেছেন যে, গান্ধৰ্ব বা রাক্ষস মতে বা উভয় মতের সংমিশ্রণে বিবাহই ক্ষত্রিয়ের পক্ষে প্রশস্ত ।”

রাক্ষস বিবাহে কন্যাকে বলপূর্বক কেড়ে এনে বিবাহ করা হতো। এরূপ বিবাহের অনেক উল্লেখ মহাভারতে আছে। যথা—কৃষ্ণ রুক্মিণীকে বলপূর্বক হরণ করে এনে বিবাহ করেছিলেন। দেবকের রাজসভা থেকে দেবকীকে শিনি বলপূর্বক অধিকার করে এনেছিলেন বসুদেবের সঙ্গে বিবাহ দেবার জন্য। অনুরূপভাবে দুর্যোধনের সঙ্গে বিবাহ দেবার জন্ত কলিঙ্গ-রাজার সভা থেকে চিত্রাঙ্গদাকে কৰ্ণ বলপূর্বক লুণ্ঠন করে এনেছিলেন। রৈবতকে থাকাকালীন অজুন যখন কৃষ্ণের ভগিনী সুভদ্রার প্রতি আসক্ত হয়েছিলেন, কৃষ্ণ তখন অজুনকে বলেছিলেন, “ক্ষত্রিয়ের পক্ষে স্বয়ম্বরই প্রশস্ত বিবাহ। কিন্তু যেহেতু সুভদ্রা কা’কে মাল্যদান করবে তা জানা নেই, সেইহেতু আমি তোমাকে পরামর্শ দিচ্ছি, তুমি তাকে বলপূর্বক অধিকার করে নিয়ে যাও। শাস্ত্রকাররা বীরের পক্ষে এরূপ বিবাহ সম্মানজনক বলেছেন।” এই কথা শুনে অজুন সুভদ্রাকে বলপূর্বক হরণ করে এনে বিবাহ করেছিলেন। অজুনের এই আচরণে যাদবরা যখন ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন, কৃষ্ণ তখন তাদের এই বলে সাস্তুনা দিয়েছিলেন, “আমরা যে অর্থের বিনিময়ে কন্যা বিক্রয় করি, অজুনের পক্ষে এরূপ চিন্তা কল্পনার বাইরে, স্বয়ম্বর বিবাহে অজুন সম্মত নয়, সেজন্য অজুন বলপূর্বক সুভদ্রাকে বিবাহ করেছে।” কৃষ্ণের এই উক্তি থেকে আরও প্রকাশ পাচ্ছে যে যাদবসমাজে কন্যাপণ গ্রহণের (আস্থর বিবাহের ) প্রচলন ছিল ।

আস্থর বিবাহের দৃষ্টান্ত আমরা মহাভারতের আরও অনেক জায়গায় পাই। পাণ্ডুর সঙ্গে বিবাহ দেবার জন্য মাদ্রীকে তো মদ্ররাজ শল্যের কাছ থেকে বহু মূল্যবান জিনিসের বিনিময়ে নিয়ে আসা হয়েছিল। ভৃগুমুনির ছেলে রিচিক যখন কান্তকুজরাজ গাধীর পাণিপ্রার্থী হয়েছিলেন, গাধী তখন বলেছিলেন, “আমাদের বংশের রীতি অনুযায়ী কন্যার মূল্য বাবদ তোমাকে এক হাজার তেজস্বী ঘোড়া দিতে হবে।” যযাতির মেয়ে মাধবীকে পাবার জন্যও গালবকে চার সহস্ৰ অশ্বপণ দিতে হয়েছিল। মহাভারতের অন্যত্র উল্লিখিত হয়েছে যে অঙ্গদেশে কন্যাপণ দিয়ে বিয়ে করাই প্রচলিত রীতি ছিল।


আরো পড়ুন: ভারতের বিবাহের ইতিহাস (পর্ব -১) । অতুল সুর


মহাভারতীয় যুগে বিধবা ও সধবা এই উভয় অবস্থাতেই কন্যার দ্বিতীয় বার বিবাহ সম্ভবপর ছিল। এরূপ কন্যাকে পূণভূ বলা হতো। ঐরাবত তুহিতার স্বামী যখন গরুড় কর্তৃক নিহত হন তখন অজুন তাকে বিবাহ করে তার গর্ভে ইরাবন নামে এক সন্তান উৎপাদন করেছিলেন। ব্রাহ্মণের বেশ ধারণ করে গৌতম ঋষি যখন জনৈক নাগরিকের গৃহে ভিক্ষার্থে এসেছিলেন, তখন তাকে ভিক্ষাস্বরূপ এক শূদ্র বিধবাকে দান করা হয়েছিল। গৌতম তাকে বিবাহ করে, তার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করেন। সধবার পক্ষে দ্বিতীয়বার বিবাহ প্রয়াসের দৃষ্টান্ত স্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে যে নলের কোন সংবাদ না পেয়ে দময়ন্তী দ্বিতীয়বার স্বয়ম্বর হবার চেষ্টা করেছিলেন।

মহাভারতীয় যুগে বিবাহ যদিও সবর্ণে হতো, তথাপি অসবর্ণ বিবাহের দৃষ্টান্তও বিরল নয়। ব্রাহ্মণ কর্তৃক শূদ্রকন্যাকে বিবাহ করার দৃষ্টান্ত একটু আগেই দেওয়া হয়েছে। তবে উচ্চবর্ণের কন্যার সঙ্গে নীচবর্ণের পুরুষের বিবাহ বিরূপদ্ধৃষ্টিতে দেখা হতো। এরূপ বিবাহকে প্রতিলোম বিবাহ বলা হতো। এই কারণে ব্রাহ্মণ কন্যার সহিত শূদ্র পুরুষের বিবাহের ফলে যে সন্তান উৎপন্ন হতো তাকে চণ্ডাল বলা হতো এবং তার স্থান ছিল সমাজে সকল জাতির নীচে। একমাত্র অনুলোম বিবাহ, তার মানে উচ্চবর্ণের পুরুষের সঙ্গে নীচ বর্ণের কন্যার বিবাহই বৈধ বলে গণ্য হতো।

বহুপত্নী গ্রহণও মহাভারতীয় যুগে বেশ ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। মহাভারতের অনেক নায়কেরই একাধিক স্ত্রী ছিল। যেমন : যযাতি বিবাহ করেছিলেন শৰ্মিষ্ঠা ও দেবযানীকে, দুষ্মন্ত বিবাহ করেছিলেন শকুন্তলা ও লক্ষ্মণাকে, শান্তনু বিবাহ করেছিলেন সত্যবতী ও গঙ্গাকে, বিচিত্রবীর্য বিবাহ করেছিলেন অম্বিক ও অস্বালিকাকে, ধৃতরাষ্ট্র বিবাহ করেছিলেন গান্ধারী ও বৈষ্ঠাকে, পাণ্ড বিবাহ করেছিলেন কুন্তী ও মাদ্রীকে এবং যুক্ত-স্ত্রী হিসাবে দ্রৌপদী বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ভীম বিবাহ করেছিলেন হিরিস্বাকে এবং অজুন বিবাহ করেছিলেন উলুপী, চিত্রাঙ্গদ ও সুভদ্রাকে । মগধের রাজা বৃহদ্রথও বিবাহ করেছিলেন কাশীরাজার দুই যমজ কন্যাকে । মহাভারতের একস্থলে উল্লিখিত হয়েছে যে কৃষ্ণের ১০১৬ স্ত্রী ছিল আবার অপরস্থলে বলা হয়েছে যে কৃষ্ণের ১৬,০০০ স্ত্রী ছিল। মহাভারতে আরও উল্লিখিত হয়েছে যে রাজা সোমকের একশত স্ত্রী ছিল ।

বহুপতি গ্রহণের দুষ্টান্ত মহাভারতে মাত্র একটিই আছে। পাণ্ডবভ্রাতাদের সঙ্গে দ্রৌপদীর বিবাহই একমাত্র বহুপতি গ্রহণের দুষ্টান্ত নয়। কালান্তরে গৌতম বংশীয় জটিল সাতটি ঋষিকে এক সঙ্গে বিবাহ করেছিলেন। আবার বাক্ষী নামে অপর এক ঋষিকন্যা এক সঙ্গে দশভাইকে বিবাহ করেছিলেন। বৈদিক যুগে আমরা দেখেছি যে, জ্যেষ্ঠভ্রাতা কর্তৃক বিবাহিতা বধুর উপর সকল ভ্রাতার এক সঙ্গেই যৌনাধিকার থাকতো। বহুপতি গ্রহণ যে এক সময় ব্যাপক ছিল তা আমরা ব্যাসের এক উক্তি থেকেও বুঝতে পারি। দ্রৌপদীর বিবাহকালে ব্যাস বলেছিলেন “স্ত্রীলোকের পক্ষে বহুপতি গ্রহণই সনাতন ধর্ম।” ধর্মসূত্র সমূহেও এর উল্লেখ আছে। আপস্তম্ভ ধর্মসূত্রে বলা হয়েছে যে “কন্যাকে কোন বিশেষ ভ্রাতার হাতে দেওয়া হয় না, ভ্রাতৃবর্গের হাতে দেওয়া হয়।” বৃহস্পতি এর প্রতিধ্বনি করেছেন, তবে তার সময়ে এরূপ বিবাহ বিরূপদূষ্টিতে দেখা হতো। পরবর্তীকালের স্মৃতিকাররা অবশ্য পরিষ্কারভাবেই বলেছেন, “এক স্ত্রীর বহু স্বামী থাকতে পারে না।”

প্রাচীনকালে যৌনবাসন চরিতার্থ করা ছাড়া, বিবাহের পরম উদ্যে ছিল বংশরক্ষার জন্য সন্তান উৎপাদন করা। হিন্দু শাস্ত্রে বলা হয়েছে, “পুত্রার্থে ক্রীয়তে ভাৰ্যা” অর্থাৎ পুত্র উৎপাদনের জন্যই ভাৰ্যাগ্রহণ করা হয়। সেজন্য স্ত্রী-পুরুষ উভয়েরই চরম আকাজক্ষ থাকতো সম্মান লাভ করা। জরৎকারুমুনি যখন বহু বৎসর তপস্যায় নিযুক্ত থেকে ব্রহ্মচর্য পালন করছিলেন, তখন তার সামনে র্তার পূর্বপুরুষরা আবিভূত হয়ে তাকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, “বৎস, ব্রহ্মচর্য পরিহার কর । বিবাহ করে সন্তান উৎপাদন কর। তাতে আমাদের অশেষ মঙ্গল হবে।” এই কারণে বহুপুত্র লাভই সকলের চরম আকাজক্ষা হতো। অগস্ত্য যখন বিদর্ভ রাজকন্যা লোপামুদ্রাকে বিবাহ করেছিলেন, তখন তিনি তাকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, “প্রিয়ে, তোমার অভিলাষ বল, তুমি আমা-দ্বারা কতগুলি সন্তানের জননী হতে চাও, একটি, না একশত, না এক সহস্ৰ ।” এ সম্পর্কে মহাভারতে বর্ণিত মহাতপামুনির কন্যা শুভ্রার কাহিনীও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বহুবর্ষ তপস্যার পর শুভ্র যখন স্বর্গে যেতে চাইলেন, নারদ তখন তার সামনে এসে তাকে বললেন যে, “অনুঢ়া কন্যা কখনও স্বর্গে যেতে পারে না।” তাই শুনে শুভ্রা গালবমুনির পুত্র প্রাকশৃঙ্গকে বিবাহ করেন। মোট কথা, মহাভারতীয় যুগে বিবাহ ছিল বাধ্যতামূলক। যথাসময়ে পুত্র-কন্যার বিবাহ দেওয়ার উপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হতো। আমরা দেখতে পাই যে ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে উপদেশ দিচ্ছেন, “পুত্র বিবাহের বয়স প্রাপ্ত হলেই, পিতার কর্তব্য তার বিবাহ দেওয়া ।” অপর এক স্থানে ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বলছেন, যে ব্যক্তি উপযুক্ত পাত্রের সঙ্গে যথাসময় কন্যার বিবাহ দেয় না, সে ব্যক্তি ব্রাহ্মণ হত্যার পাপে লিপ্ত হয়।

বিবাহের পূর্বে মেয়েদের যৌনসংসর্গ মহাভারতীয় যুগে অমুমোদিত হতো। বোধ হয় আগেকার যুগেও হতো। কেন-না ছান্দোগ্য উপনিষদে আমরা দেখতে পাই যে মহর্ষি সত্যকামের মাতা জবালা যৌবনে বহুচারিণী ছিলেন। মহাভারতে এরূপ সংসর্গের দৃষ্টান্ত স্বরূপ সত্যবতী পরাশরের কাহিনী বিবৃত করা যেতে পারে। উপরিচর বস্তুব কুমারী কন্যা সত্যবতী যৌবনে যমুনায় খেয়া পারাপারের কাজ করতেন। একদিন পরাশরমুনি তার নৌকায় উঠে তার অপরূপ সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে তার সঙ্গে যৌনমিলন প্রার্থনা করলেন । সত্যবতী তখন পরাশরকে বললেন, “নৌকার মধ্যে আমি কি ভাবে যৌনকর্মে রত হবে, কেন-না তীর হতে লোকেরা আমাদের দেখতে পাবে।” পরাশর তখন কুঙ্কটিকার সৃষ্টি করেন ও তারই অন্তরালে তার সঙ্গে যৌনমিলনে রত হন। এর ফলে কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ ব্যাসের জন্ম হয়েছিল। পরাশর সত্যবতীকে বর দেন যে এই সংসর্গ সত্ত্বেও সে কুমারী থাকবে। কুন্তী-ও কুমারী অবস্থায় সূর্যের সঙ্গে মিলনের ফলে পুত্র কর্ণকে প্রসব করেছিলেন। এক্ষেত্রেও দুর্বাশামুনির বরে কুন্তী র্তার কুমারীত্ব হারান নি। মাধবী-গালব উপাখ্যানেও আমরা দেখতে পাই যে, প্রতি সন্তান প্রসবের পর মাধবীর কুমারীত্ব অটুট ছিল। বিবাহের পূর্বে মেয়েদের যৌনসংসর্গ যে সমাজে বরদাস্ত হতো, তা বিবাহের পূর্বে প্রসূত সন্তানের “আখ্যা” থেকেই বুঝতে পারা যায়। কৃষ্ণ কর্ণকে বলছেন, ‘কুমারী মেয়ের ভূ-রকম সন্তান হতে পারে।’ (১) কানীন ও (২) সহোঢ়। যে সন্তানকে কুমারী বিবাহের পূর্বেই প্রসব করে তাকে বলা হয় কানীন। আর যে সস্তানকে কুমারী বিবাহের পূর্বে গর্ভে ধারণ করে বিবাহের পরে প্রসব করে তাকে বলা হয় সহোঢ়। মহাভারতের অপর এক জায়গায় ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বলছেন, কুমারী যে সন্তানকে বিবাহের পূর্বে প্রসব করে তাকে বলা হয় কানীন আর যে সন্তানকে বিবাহের পরে প্রসব করে তাকে বলা হয় অরোঢ়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে মহাভারতীয় যুগে কুমারী কন্যার পক্ষে গর্ভধারণ করা বিশেষ নিন্দনীয় ব্যাপার ছিল না।

মহাভারতীয় যুগে বিবাহিত নারীর পক্ষে স্বামী ভিন্ন অপর পুরুষের সঙ্গে যৌনসংসর্গও নিন্দিত ছিল না। সুদর্শন উপাখ্যানে দেখতে পাওয়া যায় যে, অতিথির সন্তোষ বিনোদনের জন্য গৃহের গৃহিণীর পক্ষে অতিথির নিকট আত্মদেহ নিবেদন করা প্রচলিত রীতি ছিল। সন্তান উৎপাদনের জন্যও স্বামী ব্যতীত অপর পুরুষের সহিত যৌনমিলনের রীতিও ছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর এই ধরনের যৌন মিলনতে ঘটতোই, স্বামী জীবিত থাকাকালীনও যে এরূপ মিলন ঘটতো তারও দৃষ্টান্ত আছে। স্বামীর মৃত্যুর পর পুত্র উৎপাদনের জন্য অপরের সহিত যৌন মিলনের দৃষ্টান্ত স্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পাবে যে বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পর মাতা সত্যবতী ভীষ্মকে ভ্রাতৃজায়াদ্বয় অম্বিকা ও অস্বালিকার গর্ভে সন্তান উৎপাদন করতে আদেশ দিয়েছিলেন। ভীষ্ম যখন এর অনুমোদন করলেন না, তখন তাদের গর্ভে সন্তান উৎপাদনের জন্য ব্যাসকে আহবান করা হয়। ব্যাস অম্বিকা ও অম্বালিকার গর্ভে দুটি সন্তান ও তাদের দাসীর গর্ভে আর একটি সন্তান উৎপাদন করেন। শতশৃঙ্গ পর্বতের নির্জনে পাণ্ডু কুন্তীকে আদেশ করেছিলেন, “তুমি, অপরের সহিত সঙ্গম করে সন্তান উৎপাদনের চেষ্টা কর, কেন-না শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে প্রয়োজন হলে নারী তার দেবরের সহিত মিলিত হয়ে সস্তান উৎপাদন করতে পারে।” কুন্তীর গর্ভে সন্তান উৎপাদনের জন্য ধর্মকে আহবান করা হয়েছিল। ধর্মের সহিত কুন্তীর সঙ্গমের ফলে যুধিষ্ঠিরের জন্ম হয়েছিল। পরে পাণ্ডুর ইচ্ছানুক্রমে কুন্তী বায়ু ও ইন্দ্রকে আহবান করে ভীম ও অজুনকে উৎপাদন করান। পাণ্ডুর অপর স্ত্রী মাদ্রীও অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের সহিত মিলিত হয়ে দুটি সন্তান নকুল ও সহদেবকে উৎপাদন করিয়েছিলেন। ইম্ফাকুবংশীয় রাজা কলমাশপাদের স্ত্রীর গর্ভে বশিষ্ঠ একটি সন্তান উৎপাদন করেছিলেন। নমস্ত ঋষিপত্নীরাও এরূপ যৌন সংসর্গ বা যৌন আকাজক্ষা থেকে মুক্ত ছিলেন না। কথিত আছে যে মাতিকাবত দেশের রাজা চিত্ররথকে নিজ স্ত্রীগণের সহিত নদীতে যৌনকেলি করতে দেখে জামদগ্ন ঋষির স্ত্রী রেণুকা রাজার প্রতি অত্যন্ত কামাতুর হয়ে উঠেছিলেন।

রামায়ণ ও বৌদ্ধজাতক গ্রন্থে বিবাহের যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে সে সম্বন্ধে এখানে কিছু বলা যেতে পারে। রামায়ণী যুগে রাজারাজদের মধ্যে স্বয়ম্বর প্রথায় বিবাহ করাই প্রচলিত রীতি ছিল। তবে বলপূর্বক হরণ করে এনেও যে বিবাহ করা হতো তা রাবণ সীতার উপাখ্যান থেকে বুঝতে পারা যায়। ভ্রাতৃজায়াকে বিবাহ করার রীতিও যে ছিল, তা সুগ্ৰীব কর্তৃক মৃত জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বালীর স্ত্রী তারার বিবাহ থেকে বোঝা যায়। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাবণের স্ত্রী মন্দোদরীর সহিত বিভীষণের বিবাহও এ সম্পর্কে উল্লেখ করা যেতে পারে। এ যুগে সহোদরা ব্যতীত অন্য ভগিনীকে বিবাহ করার রীতিও প্রচলিত ছিল। . এ সম্পর্কে রামায়ণে অন্তত একটি দৃষ্টান্ত আছে । রাজা দশরথের সহিত কৌশল্যার বিবাহ। দশরথ কোশল রাজবংশের নৃপতি ছিলেন। কৌশল্যাও যে সেই বংশেরই কন্য ছিলেন, তা তার নাম থেকেই প্রকাশ পাচ্ছে। সুতরাং নিজবংশেই যে রাজা দশরথ বিবাহ করেছিলেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই । দশরথের বিবাহ যে ভগিনীর সহিত হয়েছিল, তা দশরথ-জাতকেও উল্লিখিত হয়েছে। বস্তুত বৌদ্ধ পালিগ্রন্থ সমূহে উত্তর ভারতের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে এরূপ ভ্রাতা-ভগিনীর মধ্যে বিবাহের বহু কাহিনী নিবদ্ধ আছে। যেমন : নন্দিতা বিবাহ করেছিল তার মাতুল কন্যা রেবতীকে। অৰ্দ্ধমাগধী ভাষায় রচিত জৈন সাহিত্যেও এরূপ বিবাহের উল্লেখ আছে। শালিবরণ বা শু্যালিকাকে বিবাহ করার রীতিও যে ছিল, তা নাভী কর্তৃক দুই যমজ ভগিনীর বিবাহ থেকে বুঝতে পাবা যায়। প্রসঙ্গক্রমে বলা যেতে পারে যে এই দুই যমজ ভগিনীর অন্ততরা মরুদেবী জৈন তীৰ্থংকর ঋষভের মাতা ছিলেন। বসুদেব কর্তৃক দেবক রাজার সাত কন্যাকেবিবাহ ও কংশ কর্তৃক জরাসন্ধের দুই কন্যাকে বিবাহ ও শালিবরণের দৃষ্টান্ত স্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে। আমরা আগেই দেখেছি যে বৈদিক যুগে ভাবীর উপর দেবরের যৌন সংসর্গের অধিকার ছিল। এই কারণে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে “দত্তক” গ্রহণের প্রশ্ন বৈদিক যুগে উঠতে না। কিন্তু পরবর্তীকালে কনিষ্ঠ ভ্রাতা, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃজায়ার সহিত অবাধ মিলনের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন এবং মাত্র “নিয়োগ” প্রথার ভেতর দিয়ে তাকে এরূপ সংসর্গের সীমিত অধিকার দেওয়া হয়েছিল ।

স্বামী ব্যতীত অপর পুরুষের সহিত যৌনমিলনের যে দুষ্টান্ত ইতিপূর্বে মহাভারত থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে তা থেকে পরিষ্কার বুঝতে পারা যায় যে, ঐ যুগে স্ত্রীলোকের সতীত্বের অন্য তাৎপর্য ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে, বিশেষ করে রামায়ণী যুগের সমাজে সতীত্বের অন্তরূপ মূল্যায়ন করা হয়েছিল। পতিব্ৰতা স্ত্রীলোককেই সতী বলা হতো। উত্তরকালের হিন্দুসমাজ সতীত্বের এই মূল্যায়নই গ্রহণ করেছিল এবং একমাত্র পতিব্ৰতা স্ত্রীলোককেই সতী বলে গণ্য করা হতো। কোন স্ত্রীলোকের সতীত্ব সম্পর্কে সংশয় হলে তাকে অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হতে হতো। সীতাকে এইরূপ অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছিল। তবে সীতার অগ্নিপরীক্ষার যে প্রণালী রামায়ণে বিবৃত হয়েছে, তা ছাড়াও আর এক রকমের অগ্নিপরীক্ষা প্রাচীনকালে প্রচলিত ছিল । কোন নারীর সতীত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ হলে, তাকে লাঙ্গলের অগ্নিতপ্ত লৌহশলা লেহন করে নিজের পবিত্রতা প্রমাণ করতে হতো। জিহবা দগ্ধ না হলে, সে নারী যে যথার্থই সতী তা প্রমাণ হয়ে যেতো।

 

 

 

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত