| 21 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
ধারাবাহিক

ইরাবতী ধারাবাহিক: কদমতলি (পর্ব-১৩) । শ্যামলী আচার্য

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

            একের পর এক প্রতীক চিহ্ন। চিহ্ন নয় চিত্র। এই চিত্র আঁকলে নিজেদের কামনা আর প্রত্যাশা পূর্ণ হবে। তাই বোধহয় এত কল্পনার নকশা সারা বাড়ি জুড়ে। ধানের ছড়া আঁকলে গোলা ভরা ধান হবে, মাছ ভর্তি পুকুর আঁকলে ভরে উঠবে সত্যিকারের পুকুর। ঢেউ তোলা নদী, ফলে অবনত গাছ, উড়ে যাওয়া পাখি–  একের পর এক প্রতীক চিত্র। সবই সেই সম্পদের আশায়।  

            বিশাখার অনেক প্রশ্ন ছিল ছেলেবেলায়। কৌতূহল। কেন এতরকম আলিম্পনের নকশা। কেন এসব থাকবে চারদিকে ছড়ানো? যদি ধনসম্পত্তির জন্যই হবে, তাহলে এমন দেখানেপনা কেন? অমন করে চাই চাই দাও দাও না বললেই নয়?

            বাবা হাসতেন। মা চুপ করে থাকতেন।

যীশুর কাছে কি আমরা অমন করে সব চাই মা? অমন হ্যাংলার মতো?

            মা মাঝে মাঝে বাইবেল পড়ে শোনাত। মা বাইবেলের বাংলা করে দিত ভারি চমৎকার। মা বলত, ঈশ্বর ভক্তদের বলেন, তোমরা যখন আমার কাছে প্রার্থনা করতে আসো, তখন তোমরা আমার উপাসনার জায়গাটিকে অমন অশুচি করো কেন? আমার কাছে তোমাদের সব নৈবেদ্য অসার। ওই ধূপধুনোর প্রজ্জ্বলনে প্রয়োজন নেই আমার। যে হাতে রক্ত লেগে আছে, যে হাতে পাপ লেগে আছে, সেই হাত তুলে প্রার্থনা জানালে আমি চোখ ফিরিয়ে নেব তোমাদের দিক থেকে। তোমরা প্রার্থনা করবে বারে বারে, কিন্তু আমি তা শুনব না। আগে তোমরা পরিচ্ছন্ন করো নিজেদের, পরিষ্কার করো, শুদ্ধ করো, মন্দ কাজ করা বন্ধ করো তোমরা।

            মায়ের গলার স্বর অন্যরকম হয়ে যেত।

সারা জীবন দিয়ে একটা সার সত্য বুঝেছি, ভালো কাজ করাটাই আসল। ভালো কাজ, ভালো ব্যবহার, ন্যায়বিচারের অনুশীলন, অনাথের পাশে দাঁড়ানো, অসহায় বিধবাদের সাহায্য করা। বাইবেলে এভাবেই পড়েছি আমরা। অত্যাচারী অনিষ্টকারী মানুষকে প্রভু কখনও পছন্দ করেননি। ক্ষমা করেছেন হয়ত, কিন্তু মনে রেখো বিশি, ক্ষমা আর সমর্থন কিন্তু এক নয়। অন্যায়কে কখনও সমর্থন করা যায় না, করা যাবে না। কিন্তু অন্যায়কারীকে তার দোষ বুঝিয়ে দাও। তাকে বোঝাতে চেষ্টা করো। তার কাজের প্রতিবাদ করো। তার কাছ থেকে দূরে সরে যাও। কিন্তু তার ক্ষতি কোরো না। দাঁতের বদলে দাঁত, নখের বদলা আঁচড় কামড়, রক্ত পড়লে পালটা রক্তক্ষরণ কোনও ধর্মই সমর্থন করে না।     

আমরাও তো কত পাপ করি মা। কত অন্যায় করি। বিশাখা বলতে গিয়েও বলতে পারল না, অনিতার পেনটা দিয়ে লিখতে লিখতে খুব লোভ হয়েছিল ওর। কী ভালো পেনটা। ফাউন্টেন পেন। গায়ের রঙ কালো। নিবটা উজ্জ্বল সোনালি। সূর্যের আলোর মতো ঝলক। অতক্ষণ ধরে লিখল বিশাখা, কিন্তু আঙুলে একটুও কালি লাগল না। কী ভালো। আর লিখে কী আরাম। এক মুহূর্তের জন্য বিশাখার মনে হল, এই কলমটা আমার হতে পারত না? আমার নেই কেন অমন? আচ্ছা যদি এটা আমি ফিরিয়ে না দিই, তাহলে? এটা অনিতার প্রিয় পেন। অনিতা ঠিক ফেরত চাইবে। অনিতা প্রিয় বন্ধু, ফেরত না দিলে রাগ করবে না হয়ত। কিন্তু দুঃখ পাবে। ঝগড়া করবে না, অনুযোগ করবে। অনিতা খুব শান্ত। বিশাখারই মতো। ঝগড়া ওর আসে না। অভিমান করবে। কিন্তু এমনও তো হতে পারে, পেনটা অনিতার রইল, কিন্তু আবার রইল না। পেনটা অকেজো হয়ে রইল। একটা স্মৃতির মতো। কুটকুট করে একটা পোকা কামড়ে দিল বিশাখাকে। পেনটা যদি হঠাৎ এখন হাত থেকে পড়ে যায়? পড়ে যেতেই পারে। কত পেনই তো পড়ে যায়। মাটিতে পড়ে গিয়ে নিব ভেঙে যায়, দুমড়ে যায়। তাকে আর সারানো যায় না। আর ঠিক হয় না সে। এমন তো কতই ঘটে। ক্লাসে প্রায় রোজই ঘটে।    

আচ্ছা পেনটা ভেঙে গেলে অনিতার কি খুব মন খারাপ হবে? ওর জ্যাঠামশাই উপহার দিয়েছেন ওকে। অঙ্কে একশোয় একশো পেয়েছিল। তার জন্য পুরস্কার। পুরনো পেনটা দিয়ে ও বেশি লেখে। নতুনটা তোলা তোলা করে রাখে। একটা ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো মুড়িয়ে রাখে। ভীষণ যত্ন। ইস্কুলে না আনলেও পারত। কিন্তু নিয়ে আসে। এবং লেখে না। বিশাখা ওর কাছে চেয়েছিল। একটু দিবি রে? লিখব। আরও কেউ কেউ চেয়েছিল। ক্লাসের মেয়েরা। লোভী চোখে দেখেছিল। কাউকে দেয়নি অনিতা। শুধু তাকেই। প্রিয় বন্ধু তো, তাই। বিশাখা দু’একবার বলার পরে দিয়ে দিল। বলল, এই ক্লাসটায় লিখে ফেরত দিয়ে দিস কেমন?

বিশাখা মন দিয়ে লিখছে। ইতিহাস ক্লাস। রোজ যা লেখে, তার চেয়েও বেশি। বেশ বুঝতে পারছে, অনিতা মাঝে মাঝে আড়চোখে চাইছে পেনটার দিকে। ওই কলমের মধ্যে ওর প্রাণভোমরা। খাতার পাতায় জোরে আঁচড় দিলে, আনমনে দু’চারটে আঁকিবুঁকি কাটলে অনিতার মুখটা কেমন অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। বিশাখা বুঝতে পারে, ও মন দিচ্ছে না ক্লাসে। পড়া শুনছে না কিচ্ছু। লিখছে না নিজের খাতায় মন দিয়ে। ওরা দু’জনেই দু’জনের অজান্তে মনোযোগী হয়ে পড়ছে পেনের দিকে। বড় বেশি সতর্ক।      

মা রোজ মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রভু বলেন, আমাদের পাপগুলো উজ্জ্বল লাল কাপড়ের মতো। ওগুলো ধুয়ে ফেলা যায় সহজেই। একটু চেষ্টা করলেই সব ধুয়ে পশমের মতো, তুষারের মতো শুভ্র আর পবিত্র হয়ে ওঠা সম্ভব।  


আরো পড়ুন: কদমতলি (পর্ব-১২) । শ্যামলী আচার্য


            কলমটা ইচ্ছে করে ফেলেনি বিশাখা। হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল। যেমন পড়ে যায় প্রায়ই। পড়ে গিয়ে ভেঙে যায়। ভোঁতা হয়ে যায় সরু নিব। আর ভালো করে লেখা পড়ে না। সেভাবেই পড়ে গেল। পেছনের বেঞ্চিতে ধাক্কা না ডানদিকের কনুইতে পাশে বসা আরতির গায়ে ঠোকা লেগে… কিন্তু বিশাখা ইচ্ছে করে ফেলেনি।

বিশাখা নিজের মনের কাছে বার বার প্রশ্ন করেছে, ওর ভেতরে উথলে ওঠা পাপবোধ কি ওকে দিয়ে অপরাধ করিয়ে নিল? কিন্তু ও কেবল একবার মাত্র চেয়েছিল, ওই পেনটা ওর হোক। ওই পেনটা ওর যেমন নয়, তেমন অনিতারও থাকবে না। পেনটা থাকবে। বিশাখা যদি লিখতে না পারে, তাহলে অনিতা লিখবে কেন? ও একা কেন ভোগ করবে একটা অত চমৎকার দামী পেন?  

অনিতা খুব কেঁদেছিল। ওর সঙ্গে বিশাখাও। ও যেহেতু ইচ্ছে করে ফেলে দেয়নি। তাই কেঁদেছিল। ইচ্ছে করে ফেলে দিলে হয়ত অত কাঁদত না। কান্নার ভান করত। মনে মনে খুশি হত। আর ওই খুশিটাই অন্যায়। অপরাধ। পাপ।  

মা’কে বলতে গিয়েও বলা হয়নি। বাড়ি ফিরে যীশুকে বলেছিল। মা যখন কলতলায় বাসন ধুচ্ছে, বিড়বিড় করে বলেছিল বিশাখা। আর বলতে বলতে আরও কান্না পাচ্ছিল। যে অন্যায় ও করেনি, অথচ করবে ভেবেছিল, সেই অপরাধের শাস্তি খুঁজছিল প্রাণপণ।  

            সোমাদের বাড়িতে অনেক নিয়মকানুন ছিল। অনেক রীতি। অনেক আচার। প্রতি বৃহষ্পতিবার ঘট বসত। লক্ষ্মীর ঘট। আর ওর মা বসে বসে আলপনা দিতেন। চালের গুঁড়িতে জল মিশিয়ে যে ধবধবে পবিত্র রঙ ফুটে ওঠে, সেই রঙে। একটা ছেঁড়া ন্যাকড়া আর চাঁপাকলির মতো আঙুল কাকিমার। সিমেন্টের এবড়োখেবড়ো মেঝেতেও ফুটে উঠত নরম ছবি। বিশাখা বসে বসে দেখত। দেখে দেখে শিখে ফেলেছিল অনেক ছাঁদ। পরে অনঙ্গবালাকে চমকে দিয়ে এঁকে দিয়েছিল লক্ষ্মীপুজোর আলপনা।  

            সোমাদের বাড়ি ছিল বাঙাল। ওরা বলত, আমরা কাঠবাঙাল। ওর মা প্রতিদিন খুব মনখারাপ করতেন। পূববাংলায় সব ফেলে এসেছেন তাঁরা। কিছু আর কোথাও অবশিষ্ট নেই নিশ্চয়ই। রোজ রাত থাকতে উঠে পূবদিকে সুয্যিটাকে একখানা পেন্নাম ঠুকে তার দিন শুরু হত। উঠোন ঝাঁট দেওয়ার ঝাঁটা থাকত ছেঁচার কোলে। উঠোনে উড়ে আসা শুকনো পাতা কাঠিকুটি ঝেঁটিয়ে বিদেয় করতেন সক্কাল সক্কাল। শহরে গোবর দিয়ে উঠোন নিকোনোর উপায় নেই বলে গুনগুন করতেন আপনমনে। যেন কী ফেলে এসেছেন কোথায়… তুলসীতলা, বকুলগাছ, পুকুরপাড়, সজনেফুল… বকবক করে যেতেন একা একা। বিভিন্ন জীবিত-মৃত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে করে চোখ মুছতেন। আবার চোখ মুছে নিয়েই চট করে ঝাঁটা ফেলে দিয়ে জোড় হাত ঠেকাতেন মাথায়।  সকলকে ভালো রেখো ঠাকুর। সকলকে সুখে শান্তিতে রেখো। সকলে যেন ঘরে থাকে, সকলে যেন নিজের ঠাঁই পায়। আমার মতো বেঘর যেন না হতে হয় কাউকে।  

            অঘ্রাণের ভোর। হিমালয়ের কোল থেকেই সিধে যেন নেমে এসেছে ঠাণ্ডা কুয়াশা। চারদিক ঝাপসা। তার মধ্যেও আবছা হয়ে লেগে থাকত কাকিমার মুখখানা। প্রখর জৈষ্ঠ্যের সকালে টাইপ ইস্কুলে যাবার সময় বিশাখা তাকিয়ে দেখত কাকিমা উনুনে আঁচ দিয়েছেন। তোলা উনুনের নরম সাদা ধোঁয়া মোটা অজগরের মতো পাকিয়ে উঠছে উনুনের মুখ থেকে। কাকিমার ফর্সা মুখে ঘামতেল। চিবুকের ডৌলের খাঁজে একটা ছোট্ট তিল। কপালের মধ্যিখানটিতে গুঁড়ো সিঁদুরের টিপ যেন স্পষ্ট একটি চোখ। তৃতীয় নয়ন।

            “কোথায় চললি?” রোজকার মতোই প্রশ্ন করেন কাকিমা।

            “এই তো টাইপ ইস্কুল যাচ্ছি কাকিমা। সোমা কোথায়?”

            “সোমা তো এই উঠল। কলঘরে ঢুকেছে। সাবধানে যাস মা।”  

            “আচ্ছা কাকিমা।”

            বিশাখা পা চালায়। আজকাল সকালে একাই যায় সে।  বাবাকে ব্যস্ত হতে বারণ করে।

গতকাল ক্লাসের শেষে সেই ছেলেটা এসে সামনে দাঁড়িয়েছিল। লম্বা দোহারা গড়ন। জোড়া ভুরু। চোখ দুটো ভাসা ভাসা।

            বিশাখার প্র্যাকটিস শেষ হয়নি তখনও। বাঁ হাতের কড়ে আঙুল থেকে অনামিকা মধ্যমা তর্জনীতে পর পর এ, এস, ডি, এফ টাইপ করতে পারছে না সে। ডান হাতের চারটে আঙুল দিব্যি চলছে। স্পিড তুলতে হবে, স্পিড। ফাস্ট ফাস্ট ফাস্ট। ঘাড় গুঁজে মন দিয়ে আঙুল বসাচ্ছিল বিশাখা। খট খট করে শব্দ হচ্ছিল শুধু।

            “আপনার সময় শেষ হয়ে গেছে। এবার মেশিন ছাড়লে ভালো হয়।”

            বিশাখা তাকিয়ে দেখে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটির চেক শার্টের পকেটে কালির ছোপ। ফাউন্টেন পেন থেকে কালি পড়েছে জামায়। টাইপ মেশিন থেকে চোখ তুললে ওটুকু আগে চোখে পড়ে।    

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত