| 5 মার্চ 2024
Categories
ধারাবাহিক

ধারাবাহিক: একাকিনী শেষের কথা (পর্ব-১০) । রোহিণী ধর্মপাল

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট
দ্বিতীয় দিনে বিয়ের সময় ভীমের সঙ্গে শুভদৃষ্টির অনুষ্ঠানে খানিক আনমনা হয়ে ছিলেন দ্রৌপদী। আগের রাতে ঘুম হয় নি। মনটাও বড় বিচলিত ছিল। ভীমের হাতে হাতটি রাখার সময় শুধু একটু সচকিত হয়ে উঠেছিলেন। কারণ বিপুল বলশালী হওয়া সত্ত্বেও ভীম তাঁর হাতটি ধরেছিলেন পালকের মতো আলতো করে। গদাচালনায় দক্ষ ভীমের নিজের হাতটি ছিল বড়ই কর্কশ। খরখরে। তবু যথাসম্ভব আলতো করে ধরেছিলেন তিনি কৃষ্ণার হাতটি। যেন কৃষ্ণার না লাগে। একে একে বিয়ের সমস্ত আচার পালনের পর পুষ্প বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে কৃষ্ণা সখীদের সঙ্গে গেলেন সেদিনের জন্য নির্দিষ্ট একটি ঘরে। যেখানে ভীমের সঙ্গে তাঁর প্রথম রাতটি কাটবে। তিনি আগেই বলে রেখেছিলেন ঘরটিতে যেন ফুলের বাহুল্য না থাকে। অতিরিক্ত ফুলের গন্ধের কথা ভাবলেই তাঁর যেন বিবমিষা জাগছিল। গত রাতের অভিজ্ঞতায় এতটাই তিক্ত হয়ে ছিল তাঁর মন, আর তিনি ধরেই নিয়েছিলেন যে ভীম যুধিষ্ঠিরের মতোই আচরণ করবেন। বা হয়ত তাঁর থেকেও বেশি। সখীরা তাঁকে পালঙ্কে উঠিয়ে দিতে চাইলেও তিনি দাঁড়িয়েই রইলেন। সখীরা কৃষ্ণার মনোভাব বুঝে সেইভাবেই তাঁকে রেখে বেরিয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর ঘরের দরজাটি আবার খুলে গেল। দ্রৌপদী অনুভব করলেন ভীমের আসার শব্দ। তাঁর সমস্ত শরীর শক্ত হয়ে গেল। ভীম তাঁর সামনে এসে আস্তে করে তাঁর হাতটি ধরে বললেন, “দাঁড়িয়ে কেন দ্রৌপদী! এসো। খাটে বসি!” দ্রৌপদী প্রায় ধাক্কা দিয়ে হাতটা সরিয়ে বললেন,” না, আমি এখানেই থাকব। আপনি বরং পালঙ্কে উঠে শুয়ে পড়ুন। সারাদিন পরিশ্রম গেছে। ঘুমিয়ে পড়ুন।”
” ঠিক বলেছ পাঞ্চালী। একেবারে ঠিক ধরেছ। কী ধকল যে গেল সারাদিন! জানো, এই সব বিয়েটিয়ে নিয়ে সারাদিন ধরে যা চলছে, কয়েকদিন ধরে আমার ঠিকমতো ব্যায়াম পর্যন্ত করা হয় নি! শরীর ঢিসঢিস করছে। আজ তো সারাদিন ঠিক করে খাওয়া পর্যন্ত হয় নি! কৃষ্ণা, এখন যদি বলি, আমার খুব খিদে পেয়েছে, একটু খাবার ব্যবস্থা করবে, তাহলে কি তুমি খুবই রাগ করবে?” ভীমের এত সহজ কথা শুনে দ্রৌপদী হেসে ফেললেন। বললেন, “না না, সেকী। রাগ করব কেন! আপনাকে আসন পেতে দিচ্ছি। বসুন। আমি এক্ষুণি খাওয়ার ব্যবস্থা করছি। “
পালঙ্কের পাশে ছোট একটা কাঠের আসনে একটি পেতলের ঘন্টা রাখা ছিল। পাঞ্চালী সেটি বাজালেন। তৎক্ষণাৎ ঘরের বাইরে দ্বাররক্ষিণী ঘরে ঢুকে মাথা ঝুঁকিয়ে বললে, “আদেশ করুন দেবী।” পাঞ্চালী বললেন, “সূপকারকে জানাও মধ্যম পাণ্ডব ক্ষুধার্ত। এখনই, এই ঘরেই, এই সময়ের উপযুক্ত খাদ্যপানীয় যেন নিয়ে আসা হয়। আর আমার জন্যেও যেন কদম্বরী তৈরি করা হয়।” দ্বাররক্ষিণী একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে “এক্ষুণি খবর পাঠাচ্ছি দেবী”, বলে বাইরে চলে গেল। ভীম একগাল হেসে পাঞ্চালীকে বললেন, “তুমি তো মায়ের চেয়েও ভালো। এই সময় খিদের কথা বললে মা নিশ্চয়ই বকুনি দিতেন। আর এই কদম্বরীটি কী? আমি তো খাই নি কখনও!”
 “তা কেন আর্যপুত্র! মা বকতেন না। খিদে পেয়েছে, সেটা সহজভাবে বলতে পারাটাই তো প্রয়োজন। আপনি একটু অপেক্ষা করুন। অথবা চলুন, এই ঘরের পেছন দিকের দরজাটি খুললেই একটি দীঘি আছে। সেখানে গিয়ে দুজন বসি। খাবার এলেই সখীরা জানাবে। ওখানে বসে কদম্বরীর কথা বলছি আপনাকে।”

আরো পড়ুন: একাকিনী শেষের কথা (পর্ব-৯) । রোহিণী ধর্মপাল


অত্যন্ত সহজভাবে কৃষ্ণা ভীমের হাতটি ধরে তাঁকে নিয়ে গেলেন দীঘির ধারে। মৃদুমন্দ শীতল হাওয়া বইছে। আকাশের চাঁদটি দীঘির জলে ছলছল করে যেন নৃত্য করছে। কোথা থেকে উড়ে আসছে ফুলের সুবাস। কৃষ্ণার যেন মনে হল তিনি হঠাৎই বনে ফিরে গেছেন। এমনকী, এই ক’দিন তিনি মনে মনে সর্বদা অর্জুনের কথা ভেবে গেছেন, মুহূর্তের জন্য যেন তাও ভুলে গেলেন। তাঁর মনে অদ্ভুত আনন্দ জাগল। তিনি ভীমের পাশে বসে তাঁর মাথাটি হেলিয়ে দিলেন। বুঝলেন ভীমের সমস্ত দেহ রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল তাঁর ছোঁয়ায়। তবু ভীম এতটুকু নড়লেন না। বরং এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন দ্রৌপদীর কাঁধ। দ্রৌপদী কদম্বরীর কথা বলতে ভুলেই গেলেন। ভীমেরও আর জিজ্ঞেস করার কথা মনেই রইল না। কতক্ষণ দুজনে এইভাবে বসে থাকার পর একটা ক্ষীণ আওয়াজ পেয়ে দ্রৌপদী পেছন ফিরে দেখলেন দরজার কাছে সখীরা দাঁড়িয়ে। অর্থাৎ খাবার এসে গেছে।
ঘরে ঢুকে কৃষ্ণা দেখলেন সখীরা থরে থরে খাবার নিয়ে এসেছেন। আর একেবারে কৃষ্ণার পছন্দের পাত্রে। মাটির পাত্রে আনা হয়েছে 
পাকা কদম থেকে বানানো কদম্বরি এবং মহুয়া ফুলের পাপড়ি দিয়ে তৈরি মাধবিকা। এছাড়াও ছিল গোটা ভেড়ার মাংসের পুরভরা রান্নাটি সাজানো ছিল বিরাট একটি মাটির থালায়। শালপাতার ডোঙায় ছিল সরেল, আম ও আচার দিয়ে সেদ্ধ হরিণের মাংস। শিকে গাঁথা ঘি মাখান মহিষের মাংস রাখা ছিল জ্বলন্ত কাঠকয়লা দিয়ে ভরা পিতলের একটি থালায়। দুটি নরম রেশমের আসন পাতা হয়েছিল। ভীম চারিদিকে তাকিয়ে একটি হর্ষধ্বনি করে দু হাত ঘষে নিজে একটি আসনে বসে দ্রৌপদীকে পাশে বসতে ইঙ্গিত করলেন। তারপর বললেন “আগে আমাকে কৃষ্ণার পছন্দের কদম্বরী দাও দেখি।”
এই ভাবে মাঝরাত পর্যন্ত কৃষ্ণা, ভীম আর সখীরা মিলে খাওয়া দাওয়া আর হাসি গল্পে কেটে গেল। ভীম যে এমন হাসাতে পারেন, তাঁকে দেখে তো বোঝা যায় না! কৃষ্ণা যেন প্রাণ খুলে বহুদিন পর এত হাসলেন। সেই যে প্রকৃতির জঙ্গলের জীবন ছেড়ে রাজনীতির জঙ্গলে পা দিয়েছেন, তবে থেকে এই সহজ হাসি যেন চলে গেছিল। ভীম তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন ঝর্ণার জলের মতো দ্রৌপদীর হাসির ধারাটি। সখীরাও এতদিন কৃষ্ণাকে স্মিত হাসতেই দেখেছে। তারাও খুশি হচ্ছিল তাদের এমন আশ্চর্য আগুন থেকে উঠে আসা রাজকন্যেকে এমন হাসতে দেখে।
 চাঁদ যখন মাঝ আকাশে, সখী মদনিকার ইশারায় বাকিরা আস্তে আস্তে সব কিছু সরিয়ে পরিষ্কার করে চন্দন আর ধুনো মিশিয়ে মুছে দিল মেঝেটা। কেয়া ফুলের সুগন্ধী মেশানো জল রেখে দিল ঘরের কোণে। পিদ্দিমের আলোটি কমিয়ে দরজা ভেজিয়ে দিল। দ্রৌপদী ভীমের বুকে এলিয়ে পড়লেন। ভীম আর নিজেকে সংযত করে রাখতে পারলেন না। ভীমের আগ্রাসী চুম্বনে দ্রৌপদীও সাড়া দিলেন সমান ভাবে। তিনি নিজেও তো বুনো মেয়েই আসলে। বরং নাগরিক জটিলতা, অযথা সুভদ্র হওয়ার চেষ্টা, বাইরে আর ভেতরে আলাদা সত্ত্বাই তাঁকে পীড়িত করে। ভীমের মধ্যে তিনি সেই আদিম বুনো ভাবটি পেলেন। জঙ্গলের সারল্য পেলেন। একগুঁয়ে ভালোবাসা পেলেন।
ভীমের সঙ্গে বিয়ের রাতটি, প্রথম মিলনের তীব্র আদরগুলি ভাবতে ভাবতেই তাঁর মনে পড়ে গেল বিরাট নগরীর সেই বিভীষিকাময় রাতগুলো। বারো বছরের বনবাস পর্ব শেষে সবথেকে শক্ত এক বছরের অজ্ঞাত বাস পর্বটি। পাঁচ ভাই আর দ্রৌপদীকে এক নগরে, যথাসম্ভব এক জায়গায় থাকতে হবে। আর যুধিষ্ঠিরের সবথেকে বেশি চিন্তা দ্রৌপদীকে নিয়ে। এই ধকধকে জ্বলন্ত রূপ কী ভাবে চাপা সম্ভব! কে আশ্রয় দেবে এমন অলৌকিক রূপসীকে? আর কী কাজই বা দ্রৌপদী বেছে নেবেন? এমন কী কাজ আছে, যা তাঁর রূপ আর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে একটুও মানানসই হবে? 
তখন দ্রৌপদীই সমাধান বলে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন তিনি সৈরিন্ধ্রীর কাজ করবেন। নিজেকে স্বাধীন রাখাও যাবে আর প্রসাধন থেকে শিল্পকাজের সঙ্গেও জড়িত থাকা যাবে। এবং তাঁকে দেখে আর তাঁর কাজের পরখ করে ডেকে নিয়েছিলেন বিরাট রাজার রাণী সুদেষ্ণা স্বয়ং। বড় আদরে আর সম্মানে। দ্রৌপদী নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন। নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন পাণ্ডবরাও। তখনও কী তিনি জানতেন, কুরু রাজসভার মতোই ভয়ানক কুৎসিত অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে তাঁকে আবার যেতে হবে! 
‘হা ঈশ্বর! এত নির্যাতনেও তোমার মনে হয়নি যে আমাকে শাস্তি দেওয়া তোমার সম্পূর্ণ হয়েছে! নাকি তুমিও আসলে যুধিষ্ঠির বা অর্জুনের মতোই ঈর্ষাকাতর এক পুরুষমাত্র!’
আবছা হয়ে যাচ্ছে দৃষ্টি। অতি কষ্টে বরফের পাথর থেকে একটু নড়লেন দ্রৌপদী। ভীম! ভীমের প্রতি তিনি খানিক অন্যায়ই করেছিলেন। যদি সেই কথা ভীমের কাছে বলতে পারতেন! হায় ভীম! তুমিই আমাকে ভালো বেসেছিলে। তুমিই। শুধু তুমিই।
error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত