| 21 মে 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: সরীসৃপ । পার্থ ঘোষ

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

পিচ্ছিল শরীরটা পিছলে পিছলে যাচ্ছে লাঠির ডগা থেকে। পড়ে যাচ্ছে বারংবার। মাটিতে পড়েই স্বমহিমায় দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বুকে ভর করে। জাতিতে যে সরীসৃপ। 

মন ভোলান রূপে আটকে যায় চোখ। কি অপূর্ব। তবে একেই কি বলে ভয়ঙ্কর সুন্দর! 

ভুজঙ্গের জানা নেই। রূপ সেই মেয়েটারও এমনই ছিল। রূপে মজেছিল ভুজঙ্গ একবার দেখেই। 

ভুজঙ্গর পোষা কুকুরটা বাগানের কোণ থেকে উদ্ধার করেছে ওকে। চড়-চাপড়ও কষিয়েছে বেশ কয়েকটা। প্রাণ বাঁচাতে মৃতবৎ চুপচাপ পড়ে আছে সরীসৃপটা। অনেকটা ধরা পড়া পকেটমারের মত। প্রহারে ক্ষত বিক্ষত হয়েও যেভাবে পড়ে থাকে করুণা আদায়ের জন্য, নিজেকে বাঁচানোর জন্য। 

রকি মনে হয় সরীসৃপের এই চালাকির সঙ্গে পরিচিত কিংবা পশু সুলভ অনুভূতিতে অভ্যস্ত। তাই সেও ছাড়ার পাত্র নয়। যখনই হলুদ কালো রঙে সজ্জিত পিচ্ছিল শরীরের সরীসৃপটা শত্রু পাশে নেই মনে করে সামান্য আন্দোলিত করছে শরীর, তখনই রকি তার থাবা দিয়ে আঘাত করছে ওকে। পুনরায় নিশ্চুপ হয়ে যাচ্ছে সরীসৃপ। 

ভুজঙ্গর চোখ পড়েছে হঠাৎই। ও দৌড়ে গেছে লাঠি হাতে। সরীসৃপটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎই ক্ষণিকের দেখা সেই মেয়েটার কথাই মনে পড়লো সর্বপ্রথমে। 

মেয়েটার সঙ্গে কোন সম্পর্ক গড়ে ওঠার আগেই ভেঙে গিয়েছিলো। তবু ভুজঙ্গর মনে মেয়েটার সাক্ষাৎ সৃষ্টি করে গেছে এক বিজাতীয় অনুভূতির। 

জীবন পথে এগিয়ে যেতে যেতে দেখা হয়েছিল সেই নাম না জানা নারীর সাথে কোন এক পড়ন্ত বিকেলে জংশন স্টেশনের চার নম্বর প্লাটফর্ম শেষের ঢালু অংশে এক বিপদজনক পরিস্থিতিতে। 

ভুজঙ্গ যখন ট্রেন ধরবে বলে একের পর এক ট্রেন লাইন টপকে সময় বাঁচিয়ে চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের গড়ানো অংশে এসে সবে মাত্র পা দিয়েছিল, ডাউনের গাড়িটা তখন গতি সংকোচন করতে করতে স্টেশনে ঢোকার জন্য জোরে জোরে হর্ন দিচ্ছিল। 

শরতের আকাশ থেকে কিছুক্ষণ আগেই এক পশলা বৃষ্টি ঝরে পড়েছে সাধারণ ভাবেই। ওই সময়ে যেমন হয় আর কী – কখনো মেঘ কখনো রোদ্দুর। বৃষ্টি নামিয়ে দিয়ে মেঘটা তখন ভেসে গেছে বেশ কিছুটা দূরে। 

ভুজঙ্গ নিজের মনে দ্রুত পদক্ষেপে প্লাটফর্মের গড়ান বেয়ে উঠে আসছিল।  একই সময়ে তাড়াহুড়ো করে নেমে আসছিল এক উর্দ্ধ কুড়ির যুবতী। অধিক ব্যস্ততার সাথে বৃষ্টি ভেজা গড়ান পথে নামতে গিয়ে অতর্কিতে পা পিছলে গেলে যেভাবে দুর্ঘটনার সূত্রপাত হয়ে যায়,প্রায় ভুজঙ্গের গা ঘেঁষেনামার সময় অনেকটা সেভাবেই ঘটে গিয়েছিলো দুর্ঘটনা। 

মেয়েটা পিছলে গিয়ে এসে পড়েছিল ভুজঙ্গের শরীরের ওপর। যা ঘটার ঘটে গিয়েছিলসেকেন্ডের বিভাজনে। ভুজঙ্গ পড়ে গিয়েছিল। মেয়েটা পড়েছিল ভুজঙ্গের ওপর। ওভাবেই ওরা দুজনে গড়িয়ে গিয়েছিল প্রায় রেল লাইনের পাশ বরাবর। চার নম্বর লাইনে তখন ডাউনের ট্রেনটা প্রচন্ড যান্ত্রিক শব্দ তুলে ঢুকছে স্টেশনে। 

একটা সমবেত কোলাহল দর্শণার্থীদের, গেল গেল রব। হঠাৎই সম্বিৎ ফিরে আসা ভুজঙ্গ ডান হাত ফেলে দিয়ে আটকে দিয়েছিল সাক্ষাৎ মৃত্যুকে একে অপরকে জড়িয়ে থাকা অবস্থায়। মৃত্যুদূত ট্রেনটা তখন অকুস্থল পেরিয়ে ঢুকে গেছে স্টেশনে। দৌড়ে এসেছে যাত্রীদের একাংশ। ওরা দুজনে তখন ব্যস্ত নিজেদের সামলাতে। 


আরো পড়ুন: শারদ সংখ্যা গল্প: শিউলির ঘ্রাণ  । তসলিমা নাসরিন


মুখোমুখি দুজনে। নত মাথায় মেয়েটার কাঁপা গলার স্বীকারোক্তি –“সরি! হঠাৎই পা-টা পিছলে গিয়েছিল।”

ওর দিকে তাকিয়ে কেমন মায়া হয়েছিল ভুজঙ্গর। সত্যি তো দোষ দেওয়া যায়না মেয়েটাকে। দুর্ঘটনা বলে আসে না।  পা পিছলে গেলে কী আর করবে মেয়েটা। তবে মৃত্যু হতেই পারতো যখন তখন।  অবশ্য রাখে হরি মারে কে?

ভুজঙ্গ বলেছিল–“ভুলে যান। বেঁচে তো আছি দুজনেই। তবে, ভবিষ্যতে একটু সাবধান হবেন। এতো অন্যমনস্ক হলে কিন্তু বিপদ পদে পদে।” 

– “আসলে এভাবে পিছলে যাবো…..”

– “ছাড়ুন, এখন তো উঠে দাঁড়িয়েছেন।”

– “সে তো আপনার জন্যই, না হলে….”

– “যা হয়নি তা নিয়ে চিন্তা করে আবার বিপদ ডেকে না আনাই ভালো।”

হাঁটু জ্বালা করছিল ভুজঙ্গর। প্যান্টটা ছিঁড়েছিল সামান্য। কনুইতে ব্যাথা লাগছিল, সঙ্গে জ্বালাও। ভুজঙ্গ আন্দাজ করেছিল লেগেছে মেয়েটারও। হয়ত এমন স্থানে লেগেছে একজন মহিলার পক্ষে সেই স্থান সর্বসমক্ষে প্রকাশ করা বেশ কঠিন। 

ভুজঙ্গ জিজ্ঞেস করেছিল, “লেগেছে নিশ্চয়ই?” 

মেয়েটা দাঁতে দাঁত চেপে ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলেছিল, – “না না তেমন লাগেনি, আসলে আমি তো আপনার ঘাড়েই পড়লাম। খুব বড় ফাঁড়া গেল।”

ভুজঙ্গ বলেছিল,“চা খাবেন? গরম চা? নার্ভাসনেস ব্যাপারটা কেটে যেতে পারে।”

মেয়েটা তাড়াতাড়ি বলে উঠেছিল, “না না ব্যস্ত হবেন না, চা খাবো না। ও ঠিক হয়ে যাবে।” 

ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ভুজঙ্গর মনে হয়েছিল সে কিছু লুকাচ্ছে। ভুজঙ্গরমনে হয়েছিল ওর শরীরে আঘাত লেগেছে, আর তা এমন জায়গায় যে বলতে লজ্জা পাচ্ছে। সুন্দরী মেয়েদের ব্যাপারে পুরুষরা এইটুকু যত্নবান হয়েই থাকে। ভুজঙ্গরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। 

ভুজঙ্গ ওর ব্যথিত মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “যদি কিছু মনে না করেন তবে স্টেশনের কাছেই আমার বাড়ি;মা আছেন, বোন আছে আপনার অসুবিধা হবে না। আপনি ফ্রেশ হয়ে নিতে পারেন। আমার মনে হচ্ছে আপনি আপনার ব্যাথা আড়াল করছেন। হয়ত আমাকে জানাতে অসুবিধা হচ্ছে।” 

– “না না সেরকম কোন ব্যাপার নয়। আমি ঠিক আছি। আমার তাড়াও আছে একটু। আমি এখন আসি।”  

ততক্ষণে ট্রেন ধরতে যাওয়া যাত্রীদের একটা ভিড় ঘিরে ধরেছিল ওদের। সবাই উৎকণ্ঠা প্রকাশ করছিলেন। কথায় কথায় বাড়ছিল কথা। 

মেয়েটা এবার যেন একটু অস্থির হয়ে উঠেছিল। সে ভিড় কাটিয়ে এগিয়ে গেছিল দ্রুতপায়ে রেল লাইনের দিকে। একটু অবাক হলেও তখন অত চিন্তার সময় ছিল না ভুজঙ্গের কাছে। এমনিই অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। ট্রেনটাও ধরতে পারেনি । পরের ট্রেনটা আর মিস করা যাবে না। সেও দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেছিল সামনে। এগিয়ে যেতে যেতে শুনেছিল পরের ডাউন ট্রেন আসার বার্তা ঘোষিত হচ্ছে স্টেশনের বৈদ্যুতিক শব্দ-যন্ত্রগুলোয়। অনুভব করেছিল পেছনের জমাট ভিড়টা পাতলা হয়েযাচ্ছিল। 

স্টেশনের মাঝবরাবর আসতেই ডাউনের ট্রেন ঝম্‌ঝম্‌ শব্দে স্টেশনে ঢুকেছিল। ভুজঙ্গ উঠে পড়েছিল ট্রেনে । এই লাইনে ভিড়ের শেষ নেই। সারাদিন কত মানুষ যে যাতায়াত করেন তার হিসেব রাখা খুব কঠিন। তবে সেই ট্রেনটা বেশ ফাঁকা ছিল । গুটি কয়েক যাত্রী দাঁড়িয়ে বা বসেছিল ভেতরে । দরজার কাছেও সে ভাবে কেউ দাঁড়িয়ে ছিলনা । অন্য সময় দরজা ব্লক করে অনেকে দাঁড়িয়ে থাকেন। স্বাভাবিক ভাবেই তাতে ট্রেনে উঠতে খুব অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। সেরকম কোন বাধাপ্রাপ্ত হতে হয়নি সেদিন। 

ভুজঙ্গ ফাঁকা জায়গা দেখে ভালো করে দাঁড়িয়েছিল ।  মেয়েটাকে বেশ ভালোই লেগেছিল ওর এক ঝলক দেখে। বেতস শরীর বিনা প্রসাধনেও কী সুন্দর উজ্জ্বল। একটা ঘরোয়া নারীত্ব। চোখ নাক ঠোঁট যেন তুলিতে আঁকা, প্রকট, লাবণ্যময়ী। কিন্তু সব কিছুই আধিক্যহীন, নয়নমনোহর । এককথায় এই মেয়েকে পছন্দ হয়েই যায়, বন্ধু হিসেবে। অকৃতদার ভুজঙ্গ নিজের ভালোলাগার অনুভূতিতে মেয়েটার একটা নামও ঠিক করে ফেলেছিল ক্ষণিকের অবসরে– শর্মী। ওর মনে হয়েছিল এমন নামই মানায় ওই বেতস শরীরের যুবতীর। ভাবুক মনে চিন্তাও করেছিল – শর্মী যদি বন্ধু হও, তবে হাত বাড়াও। 

ট্রেন দৌড় শুরু করেছিল আপন গতিতে। ভুজঙ্গ ট্রেন সফরের একাকিত্ব কাটানোর জন্য মোবাইলে চোখ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে পকেটে হাত ঢোকাতেই চমকে উঠেছিল। পকেট ফাঁকা । মোবাইলের কোন অস্তিত্বই নেই।

মনটা হঠাৎই বিষন্ন হয়ে গেছিল তখন । সে প্যান্টের ব্যাকপকেট স্পর্শ করেছিল মানিব্যাগের অস্তিত্বের খোঁজে। হতাশা আবারও গ্রাস করেছিল ভুজঙ্গর মন। অনুভব করেছিল সে কপর্দক শূন্য, নিঃস্ব। 

ভুজঙ্গর ভগ্ন হৃদয় আবিষ্কার করেছিল মেয়েটা মানবী নয় কালনাগিনী। 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত