| 1 মার্চ 2024
Categories
ধারাবাহিক

ধারাবাহিক: অমৃতস্য পুত্রা (পর্ব-২) । অনিন্দিতা মণ্ডল

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

আমাদের সাবেক বাড়ি ছেড়ে আমার পিতা ভাড়াটে হয়েছেন! তাঁর চোখের পাতাগুলো বড় বড়। সুদর্শন তরুণের ঘন আঁখিপল্লবের ছায়ায় যেন কষ্ট তার আঁচল বিছিয়ে রেখেছে। তাঁর সাবেক বাড়ির কথায় বুকে বেহাগের সুর বাজে। সে বাড়ির সুরে ভরা বৈঠকখানা, ঠাকুরদালানের সামনের উঠোনে হাঁড়িকাঠ, সদরের ঠিক পাশেই ঠাকুরদার লম্বাটে চেম্বার। চারিদিকের আলমারি বইয়ে ঠাসা। ব্যারিস্টারের যেমন হয়। যদিও ব্যারিস্টার সাহেব পাততাড়ি গুটিয়েছেন। পড়ে রয়েছে তাঁর গদি আঁটা উঁচু চেয়ার। বিশাল মেহগনি কাঠের লম্বা টেবিল। আর একখানা সুতোয় ফোঁড় তুলে নিখুঁত আঁকা ছবির মতো কালীর পট। এক সিনেমাহলের মালিকের বিধবা বউয়ের উপহার। নিঃসন্তান বিধবাকে কপর্দক শূন্য করে ছেড়েছিল আত্মীয় কুটুম্বের দল। ঠাকুরদা তাঁকে তাঁর প্রাপ্য পাইয়ে দিয়েছিলেন। ব্যারিস্টার সাহেবের স্ত্রী বিধবা হলে অবশ্য আর একজন ব্যারিস্টার পাওয়া যায়নি। নিঃস্ব নিঃসহায় ঠাকুমা সমানে ভাগ্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। আর কালীর পটটি বুকে করে নিজের কাছে এনেছেন। হয়ত ওই পট তাঁকে স্বামীর কথা মনে করাতো। তিনি কোনও পুজো আচ্চা করতেন না। ব্রাহ্মণের ঘরের বিধবা যে কৃচ্ছসাধন করে থাকে, শুধু তাইতে কোনও ঘাটতি ছিল না। মাত্র সাতাশেই শুরু হয় শ্বেতাম্বরী সন্ন্যাসিনী জীবন।

       আমাদের বাসাবাড়ির বসার ঘরে ডিমের মতো অবতল কাঁচে ঢাকা ঠাকুরদার একটা ছবি আছে। বিলেতে থাকাকালে আঁকানো। সোনার ফ্রেমের চশমা আর সোনার পকেট ঘড়িতে সাহেবের মতো একজন। গায়ের রং যদিও কেষ্ট ঠাকুরের মতো।

       ও বাড়ি থেকে আসার সময় বাবা দুটো ছবি আর কালীর পটটা এনেছিলেন। আর কিছু নয়। বাবা বলত, আমার আর কী চাই? আর একটা ছবি এক মধ্যবয়স্ক, মাঝে সিঁথি করা, ভারী মুখের এক পুরুষের। বাবা বলতে শিখিয়েছিলেন—‘বাবু’। বাবার ঠাকুরদা। বাবা নিজেও তাঁকে মনে করতে পারতেন না। কিন্তু এই ছবি যেন তাঁর পূর্ণ ব্যক্তিত্ব নিয়ে বাবার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠত। ‘বাবু মন্মথ নাথ গাঙ্গুলি’। বাঙালির অন্দরে তবলাকে সম্মানের সঙ্গে পরিচয় করান। এর আগে তবলাবাদকের সম্মান ছিল না। আর জি কর হাসপাতালের পাশে খালধারের পথটুকু এখনও ওই নাম বহন করছে। কিন্তু কতদিন আরও তা বহাল থাকবে কেউ জানেনা। জানা সম্ভব নয়। কালের গতিতে সে পথ হারিয়ে যেতে পারে কিংবা আর কারো নামে চিহ্নিত হতে পারে। ব্রিটিশ সরকারের দেওয়ানের কাজ করতেন। তাই প্রতাপ ছিল যথেষ্ট। আর ছিল কলকাতা শহরের আদি বাসিন্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠার উজ্জ্বলতা। আমরা শিশু বয়সে ও ছবির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম। বাবার মুখের সঙ্গে কী অদ্ভুত মিল! বাবার ঠাকুরদা কাশীতে তবলা শিখতে গিয়ে গুরুর বাড়ির কাছে বাড়ি করেছিলেন। সে বাড়ি শেষ পর্যন্ত পরিবারের গুরুজনেদের তীর্থের আশ্রয় হয়ে উঠেছিল।

       আর একটা ছবিও এনেছিল বাবা। আর্টিস্ট দিয়ে টাচ করানো ছবি। পেছনে সমুদ্র। তীরে দুটো পাথর। একটা কালো আর একটা সাদা। ঠাকুরদা বসে আছেন কোল পেড়ে। ঠাকুমা কাত হয়ে কোলের কাছটিতে ডান হাতে মাথা রেখে শুয়ে। এমন ছবি কি বৈঠকখানায় সাজিয়ে রাখা যায়? অথচ ছবির পরিকল্পনা ঠাকুরদার। ঠাকুরদা কালো ছিলেন। ঠাকুমা ফর্সা। তাই দুটো পাথর রাখা। অগত্যা সে ছবিকেও শোবার ঘরে লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল। অন্তত বাবার ঠাকুমা যে ছেলের এই আদিখ্যেতা মানতে পারেননি সে সকলেই জেনেছিল।

       আমাদের ভাড়াটে বাড়ির দেওয়াল আলো করে এক প্রেমিক দম্পতি ভালোবাসা ছড়িয়ে গেছেন, এ আমি জ্ঞান হওয়া ইস্তক দেখেছি।    

শহরের কথা আমার মনে পড়েনা। তিন বছরে শহর ছেড়েছি। এখন এই আধাশহরই আমাদের বাড়িঘর। বুড়ো রিক্সাওলা রোজ সকালে ডাকে, খুকি দেরি হয়ে যাবে। এক্ষুনি এসো। টিনের সুটকেস ধাক্কা খেতো রেলিঙে। তবু দেরি হতো। আমার জন্য নয়। রিক্সায় ছ জনের মধ্যে সুতপাদিও ছিল। আমরা ক্লাস ওয়ান। সুতপাদি ক্লাস সিক্স। আমাদের ফ্ল্যাট বাড়ির বাইরে কোনাচে রাস্তার উল্টোদিকে লাল রঙের গোল বারান্দাওলা বাড়ি ওদের। সামনে একটুকরো উঠোন বাগান আর কী আশ্চর্য একটা ছোট্ট পদ্মফোটা পুকুরের মতো চৌবাচ্চা যেন। আমার কেবল সেই নাম ভুলে যাওয়া ইংরেজি সিনেমাটা মনে পড়ত, যেখানে সাদা রিবন বেঁধে সোনালি চুলের একটা আমাদের বয়সী মেয়ে সাদা লেসের ঝালর দেওয়া ফ্রক পরে ওরকম একটা পদ্মফোটা পুকুরের পাশে গিয়ে বসত। আমার খুব ইচ্ছে করত ওরকম জামা পরতে।

সুতপাদি আবার ওদের ভাড়াটে ছেলেটিকে গুড বাই না করে উঠত না রিক্সায়। নেট ফল, স্কুলের সামনের মাঠে একঘন্টা শাস্তি। আমাদের ইংরিজি পড়াতেন মিস রোজ। ভারি কড়া ধাতের। তখনও এলটন জন তাঁর বিখ্যাত গান “গুড বাই মিস রোজ” গাননি। তাই মিস রোজের সঙ্গে করুণা নামক অনুভূতিটিকে মেলাতে পারতাম না। কিছুতেই সময়ের বেনিয়ম বরদাস্ত করতেন না তিনি। হাতে থাকত লিকলিকে বেত। কিন্তু আমরা কখনও তার ব্যবহার দেখিনি। হাতে থাকাটাই যথেষ্ট ছিল। মিস রোজ এই দেরিতে আসার শাস্তি দিয়ে থাকতেন। ক্লাসরুম ছেড়ে বেড়িয়ে যেতে হবে। মুক্তির আনন্দ যে কী মিস রোজ মনে হয় তা জানতেন না। তাঁর আইডেন্টিটি নিয়েই কি এমন একটি সংশয় ছিল? জানি না। তবে বুঝি, নিরাপত্তার কারণে ঘরবন্দী থাকার মধ্যেই তাঁর শান্তি ছিল। আমাদের মুক্ত করে খোলা মাঠে ছেড়ে দিয়ে তিনি মনে করতেন বেশ ভালো শাস্তি দেওয়া হল। আমরা ভয় পাবো, মাথার ওপরে ছাদ নেই। চারপাশে নিরাপদ দেওয়াল নেই। কিন্তু এখন আমাদের সামনে অত বড় মাঠ। আমরা শাস্তি পেলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়াতাম। নিজেদের মধ্যে অনেকটা ফাঁকা জায়গা থাকত। বুড়ো রিক্সাওলা তখন আমাদের গল্প শোনাতো। সে গল্প ক্রমশ হয়ে চলতো। শেষ হত না। সেদিনের মতো থামত অবশ্য, যতক্ষণ না আমরা ক্লাসে ঢুকছি।

সুতপাদি-র ওপরে একটুও রাগ হতো না আমাদের। কেন হবে? ওর জন্যই ত আমাদের গল্প শোনা হল। পড়াশুনা করতে হল না। সেই বুড়ো রিক্সাওয়ালার নাম ছিল ভুলো। আমরা ডাকতাম ভুলোকাকা বলে। কী যে ও ভুলে যেত কে জানে? আমাদেরকে তো অনর্গল বলে যেত নিজের কথা। কখনও শুনে মনে হয়নি যে ও বানিয়ে বলছে। গল্প যে সবসময় মিথ্যেই হবে তাই বা কে বলেছে?  কিন্তু ওর নাম ভুলো শুনে মনে করবেন না যে ভুলো আবার কারো নাম হয়? হয়। আবার যখন শহরে ফিরে আসার অনেক পরে, আশির দশক, কলেজে পড়ি তখন, আমাদের বাড়ির সামনে থাকত ভুলো। সারাদিন কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকতো। মুখে বেশি চিৎকার-চেঁচামেচি পছন্দ করতো না। কিন্তু শুয়ে থাকতে থাকতে বাইরের কোন লোক কাছাকাছি এলে মুখ তুলে দেখতো। সকলেই ওকে সমীহ করত। ওর মধ্যে ছিল একটা গাম্ভীর্য। এভাবে ঢুকে আসাটা ঠিক পছন্দ করত না। আগন্তুক বুঝতে পারত। আমাকে প্রতিদিন টিউশান ফেরত বাড়ি আসার সময় গার্ড দিয়ে আনত ভুলো। আমি দেখতাম আমার পেছন পেছন অন্ধকার গলির হলুদ আলোয় হেঁটে আসছে ও। মজা করতাম, কী কাকা? গার্ড দিচ্ছ? হলদে আলোয় প্রেম করলে আটকাবে নাকি? ভুলো লেজ অল্প নেড়ে পেছনে পেছনে চলত। ভুলোকে ‘কাকা’ বলে ডাকার মধ্যে আমার যে সেই বাল্যস্মৃতি অবচেতনে কাজ করত না তা নয়। এরকম আপনজন পাওয়া ভাগ্যের কথা। আর ভুলো কুকুর হলেও সাধু ছিল। কারণ কুকুর সাধুই হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। মানুষই ভণ্ড। নিজেকে লুকোতে জানে।


আরো পড়ুন: অমৃতস্য পুত্রা (পর্ব-১) । অনিন্দিতা মণ্ডল


ওই হলুদ আলোর গলিতে ছিল সুদর্শনদাদের ছোট লাল একতলা। তার ডানদিকে অধ্যাপক সেনগুপ্তর ছাইরঙা একতলা, যার সামনের ঘরখানা গোল, জানলাগুলো রুজু রুজু খোলা, আর দেখতে পাওয়া যায় অধ্যাপকের সাদা চুলে ভরা মাথা ঝুঁকে পড়ে আছে সামনের টেবিলে। টেবিল দেখা যায়না। দেখা যায় রাশিকৃত বই। বেরঙ বই। বহু ব্যবহারে জীর্ণ। বাঁ দিকে সুশীলজ্যাঠাদের দোতলা বাগান ঘেরা বাড়ি। টাকমাথা সুশীলজ্যাঠা ব্রিজ খেলতে আসত আমাদের বাড়ির বসবার ঘরে। কিন্তু খেলা হত টোয়েণ্টি নাইন। জ্যাঠা মাথা নেড়ে বলত, কেউ ব্রিজ খেলতে জানে না। ব্রিজ খেলতে জানলে মাথার ডালডা ঝরে যায়। রাস্তা দিয়ে অফিস শেষে ফিরতে ফিরতে সেকথা শুনতে পেয়ে হাসত কল্যাণকাকু। ব্রিজ খেলতে দিল্লি আগ্রা যেত কল্যাণকাকু। আসলে জ্যাঠা টোয়েণ্টি নাইনই খেলতে জানত। ব্রিজের কথাটা ফাঁকা দেমাক।    

ফিরে যাই ভুলোকাকার কথায়। কাকা আমাদের নিয়ে যাওয়াআসা করত স্কুলে। আর মাঝের সময়টা মাঠে শুয়ে নিজের গামছাটা পেতে ঘুমিয়ে পড়তো। ও ভুলো কুকুরটার কথা জানত না। জানার কথা নয়, কারণ ভুলো ছিল আমাদের কলেজ বেলার সঙ্গী। ক্লাস ওয়ান বা টুয়ে কোথায় ছিল ও? না, ওই সময় কেউ ছিলনা। আর ওই জায়গাতেও ও ছিল না। কিংবা হয়ত ছিল, আমার কাছে তা ধরা দেয়নি। আর ভুলোকাকা? ও জানলেও বলবে না। গল্প যদি শোনো তো শোনো। অন্য কথায় ওর কি কাজ?  

যাই হোক, ভুলোকাকা যে কিনা আমাদের বাহক ছিল চালক ছিল, সে রোজ আমরা যখন শাস্তি পেতাম সেই সময়টাকে খুব উপভোগ করত। কারণ ওর গল্প শোনার লোক ছিল না। আমরা ওই কটা বাচ্চা ছিলাম শুধু। অথচ গল্পগুলো না বললে ও হারিয়ে যেত। ওর কথা কেউ শুনতে পেত না। আর কেউ না শুনলে ওসব গল্প থাকত কোথায়?

আমাদের ও যা বলেছিল সব গল্প আমার মনে নাই পড়তে পারে। মাঝে মাঝে অন্য গল্প ঢুকে যেতে পারে। আসলে মানুষ নিজেকে আর কত আড়াল করতে পারে! আর, ভুলোকাকার মতই, নিজেদের গল্পগুলো না বললে ওগুলো হারিয়ে যাবে যে! সে যত সাধারণ গল্পই হোক।

স্বাভাবিকভাবেই সুতোর খেই ধরে অন্য গল্পে ঢুকে যেতে হয়। কিন্তু কিছু কিছু গল্প কাকা যে বলেছিল সেগুলো মনে রাখার চেষ্টা না করেও মনে পড়ে।

ভুলোকাকা গামছা পেতে যখন ঘুমতো, আমার মনে হয় তখনই মনে মনে গল্প তৈরি করে নিতো।

আর যেদিন আমাদের শাস্তি হত না, বাড়ি ফেরার সময় বলতো—যেতি আজ শাস্তি পেতে তবে বলতম সে এক ভীষণ কথা।

এই সব সময় সুতপাদি-র মুখটা দেখার মতো হতো। ও বলতো, কি করব বলো কাকা? আজ অঙ্কুর আমাকে টাটা করেনি। আমার মনটা বড় খারাপ। ভুলোকাকা রিক্সা চালাতে চালাতে বলতো–আশনাই? ভালো। করো আশনাই। আমার তখন আশনাই কথাটার মানে জানার কথা নয়। জিজ্ঞেস করতাম—আশনাই কি ভুলোকাকা? ভুলোকাকা মুচকি হেসে আকাশে আঙুল দেখাত—আসমান থেকে যখন জিনপরীরা নেমে আসে তখন আমাদের মনে কিরকম হয় বলো দেখি? আমি আকাশ পাতাল ভাবতাম। আকাশ থেকে পরী নামলে কেমন লাগবে? ওঃ! সে তো  একটা দারুন ব্যাপার! ভুলোকাকা হেসে বলত—পারলে না তো? ওই যেমন লাগে, তাকেই বলে আশনাই। আমি তখনও কোনো আসমানপরী দেখিনি। শুধু কল্পনায় যা ধরতে চেষ্টা করতাম। শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়ে ভাবতাম, আগে তো পরী দেখি, তারপর না হয় আশনাই হবে আমারও।  

আমার বন্ধু ছিল শম্পা। সুতপাদি-র ছোট বোন। রোজ রিক্সাতে সামনের সিটের মধ্যিখানে বসার জন্য ও সবার আগে আসত। আমরা এসে দেখতাম রোজ রোজ শম্পা ভালো জায়গা দখল করেছে। বড্ড রাগ হতো সবার। ভুলোকাকা অবশ্য সান্ত্বনা দিতো। ও কিনা বাবুদের বাড়ির মেয়ে, পুকুরে পদ্মফোটা বাড়ির মেয়ে, তাই ভালো সিটে ওর হক আছে বসার। তার ওপরে ওরা এই মফস্বলেই সাত পুরুষ ধরে জন্মাচ্ছে আর মরছে। জন্মাচ্ছে আর মরছে। তাই রিক্সাটার ওপরে পর্যন্ত হক জন্মেছে ওদের। একদিন বললাম—ভুলোকাকা, আমরা যেদিন বাড়ি বদলাবো সেদিন তুমি আমাকে ওই সিটে বসিয়ে নিয়ে যাবে, হ্যাঁ? ভুলোকাকা এক পায়ে রাজি। সে আর বলতে? তোমাকে নতুন বাসায় নে যাবো তো। আর তো কেউ নতুন বাসায় যাবে নে। তুমি একেবারে রাজার মতো বসি থাকবে। আমি হুম হুম করে রিক্সা ছোটাবো। শম্পা ওর ফর্সা মুখটা কালো করে বলে উঠত—উঃ! আমরা কি স্কুল কামাই করব নাকি সেদিন? তুই অন্য রিক্সায় নতুন বাড়িতে যাবি।

আমি অবশ্য বলার কথা তাই বলেছি। এটাই তো মাত্র কয়েক মাস হল আমাদের বাড়ি হয়েছে। এখুনি কোথায় যাবো?

       সেই মফস্বলের নাম ধরা যাক দক্ষিণপাড়া। সেখানে আমাদের প্রথম বাড়িটা ছিল রাজেন্দ্র এভিনিউ সেকেন্ড লেনে। শান্ত গলির শেষে অচিনকাকু, মাধাইকাকু, রুনুকাকুদের বাড়ি ফেলে এগিয়ে যেতে হবে। প্রায় শেষে দু একটা বাড়ি বাদ রেখে দোতলা বাড়ির ওপরতলাটা আমাদের ঠিকানা। বাড়ির পেছনে বাগান ঘেরা নিরালা একতলা। খুকুমণিদিদের বাড়ি। খুকুমণিদি বেণী দুলিয়ে স্কুলে পড়তে যায়। একেবারে শেষ ক্লাস। এরপর কলেজ। খুকুমণিদির দাদা চাকরি করে। লেখাপড়ায় ভালো সে। খুকুমণিদির বাবা লম্বা রোগা ফর্সা। এত লম্বা যে সামনে ঝুঁকে চলেন। সাদা পাঞ্জাবি আর ধুতি পরেন। অমরেন্দ্র বিদ্যাপীঠের মাস্টার মশাই। ভীষণ রাগী। গম্ভীর। আমাদের একতলায় মিতাকাকিমা আর উত্তমকাকু। ওদের একটা ছোট্ট মেয়ে আছে। হামা টানে। মা তাকে কোলে করে ওপরে আনে। রান্নাঘরে আলু পটল দিয়ে বসিয়ে রাখে। সে খেলা করে। আমাদের মা ভাত মেখে এক থালা থেকে খাইয়ে দেয়। সেই ছোট্ট খুকিও একটু একটু ভাত খায়। মিতাকাকিমা সবসময় শুয়ে থাকে। শরীর খারাপ। উত্তমকাকু উনুন ধরিয়ে রান্না করে খেয়ে অফিস যায়। কখনও কখনও আমি আর দিদি মিতাকাকিমার কাছে যাই। মা বারণ করা সত্ত্বেও জিজ্ঞেস করি—তোমার কি হয়েছে গো? মানবকাকু তোমাকে সারিয়ে দিতে পারে তো! এই দ্যাখো, আমাদের সারিয়ে দিয়েছে। মিতাকাকিমা ঘোলা ঘোলা চোখে তাকায়। কখনও এক চিলতে হাসি হাসে। কখনও ঘাড় কাত করে মাথাটা ঝাঁকাতে থাকে। হাত পা থরথর করে কাঁপে। আমরা ভয় পেয়ে মাকে ডাকি—মা মা! শিগগির এসো, কাকিমা আবার ওরকম করছে। মা এসে আমাদের সরিয়ে দেয়। দিদি খুকিকে কোলে করে ওপরে উঠে যায়। আমিও ওর পেছন পেছন উঠি।   

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত