Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,ভুলোমনা

শারদ সংখ্যা উপন্যাস: মনে রবে কিনা রবে । মোনালিসা ঘোষ

Reading Time: 117 minutes

এক

এ জন্মে পাপ নেই আমার, বলল ও। পূর্বজন্মের পাপের খেসারত দিতেই এই জন্ম। এমনি একটা অনুভুতি ওর মনে মনে ঘুলঘুলিয়ে ওঠার জন্য; সত্যিই এই জন্মে পাপ আছে কি নেই, তার একটা হিসেবনিকেশ করার বাসনা হল তার। কিন্ত মাথার মধ্যে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের যে শব্দটা একটানা ওঁ ওঁ করে সেটাকে অনুসরণ করে সে একটা গোলকধাঁধার মত রাস্তায় ঢুকে পড়ল । রাস্তাটায় পাক খেতে খেতে তার চোখের সামনে ফুটে উঠল কত কিছু । যা যা দেখার সব কিছু দেখে ফেলার পর নিজের যদিও তার আচ্ছন্ন ও বিবশ মনে হবে, কিন্ত এই  মুহূর্তে সে দেখছিল  নানারকমের ঠাকুরের ছবি গাদাগাদি করে রাখা শোবার ঘরের কোণের একটা জায়গায়। আর সে সম্পর্কে মুগ্ধ হয়ে নানারকম বকবক করে যাচ্ছিল লিপির মৃত স্বামীর মা অর্থাৎ লিপির শাশুড়ি –মা । শাশুড়ি – মা- র মুখ থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসা কথাগুলোর মধ্যে সে শুনতে পাচ্ছিল লিপির  এই পুজা- পুজোআচ্ছার বহর যে দিন দিন বেড়ে উঠেছে মহা সমারোহে এবং তাতে তিনি উচ্ছ্বসিত। লিপির জীবনযাত্রা সম্পর্কে সে যা জানত তার সঙ্গে এটা মিলছিল না। অতএব মনের মধ্যে কথাগুলোর নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে সে ভাবল, তাই নাকি?  তবে কি লিপির ভেতরে গজিয়ে উঠেছে নানাবিধ ইনসিকিওরিটি? হবে  হয়ত বা। শাশুড়ি- মা অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন, যদিও লিপির ব্যাপারেই। লিপি তাড়াহুড়ো করে তৈরি হছিল । গোলাপী রঙের সিল্কর মটকা পরে এবং তারপর সে এসে বলল, তোমরা তাহলে কথাবার্তা বল, আমি অফিস ঘুরে তোমাদের নিয়ে ইন্দ্রনাথের কাছে যাব। অবিশ্বাস্য ছিল কথাগুলো। 

        সে যদিও জানত লিপি তাকে জাত- শত্রু মনে করে। তবে তার হাতে নিজের শাশুড়ি –মাকে রেখে যাবার কারণ কি? এটাও তো হতে পারে, যে সে খানিক ভালমন্দ কথা লিপির ব্যাপারে তার শাশুড়িমাকে বলে ফেলতে পারে। ফলে, তার ধারনা হল লিপি হয়ত তার চেনাশুনা বিভিন্ন ধরণের মানুষদের সঙ্গে শাশুড়ি মায়ের আলাপ করানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। এর কিছুক্ষণ পর তারা ইন্দ্রনাথের অফিসের মধ্যে একটা ছোট বসার ঘরে হাজির হল। তখন লিপির অফিসের দু একটা যা কাজ ছিল তা হয়ে গেছিল।অফিসে ইন্দ্রনাথও ছিল।কিছুক্ষণ কিসব যেন কথা হল। শাশুড়ি মায়ের কোন হেলদোল ছিল না, তার মৃত ছেলের জায়গা ইন্দ্রনাথ নিয়েছে বলে, সে দেখল। বরং উনি একটু আড়ষ্ট এবং লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে ইন্দ্রনাথ টুকটাক নিরীক্ষণ করছিলেন। কথাবার্তাগুলো তেমন জরুরী ছিল না। এমনিই কথা চালিয়ে যাবার জন্য বলা হছিল। বরং ইন্দ্রনাথ বেশী কথা বলছিল তার সঙ্গেই। কথা বলতে বলতে লিপি গিয়ে ইন্দ্রনাথের গা ঘেঁষে সোফাটায় বসে পড়ল। ইন্দ্রনাথ লিপিকে বলল, গা হাত পা ব্যথা করছে, হাতটা টেপো তো । লিপি ইন্দ্রনাথের হাত টিপতে শুরু করল। টিপতে টিপতে ইন্দ্রনাথ পুরো হাতটাই তুলে দিল লিপির কাঁধের ওপর। হাতটা শক্ত করে রাখার জন্য লিপির কাঁধটা খামচে ধরল ইন্দ্রনাথ। এবং কিছুক্ষণ মধেই কাঁধ থেকে লিপির ব্লাউজ নামিয়ে সেখানটায় ধরে রইল ইন্দ্রনাথ।লিপির শাড়ি এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল ম্যাসেজ করার জন্য এবং লিপি হাত ছেড়ে ইন্দ্রনাথের বডি ম্যাসাজ করতে আরম্ভ করেছিল।লিপি বলল, দাঁড়াও  হচ্ছে না, তোমাকে পা দিয়ে মাড়িয়ে দিই।প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সোফার হাতলে ঠেসান দিয়ে বডি ম্যাসাজ করতে লাগল লিপি। ইন্দ্রনাথ শাড়ির তলা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে থাইটা ধরে সাপোর্ট দিল। সাপোর্ট দিতে দিতে ইন্দ্রনাথ লিপিকে দেবযানীর সঙ্গে কারুর শারীরিক সম্পর্কের বর্ণনা দিতে লাগল মৃদু গলায়।  

সে তটস্থ হয়ে উঠেছিল এবং ভাবছিল শাশুড়ি- মা কি ভাবছেন, এসব কি হচ্ছে ?কিন্ত শাশুড়ি- মা একদম নির্বিকার ছিলেন! ইন্দ্রনাথ তার অবস্থা বুঝে লিপিকে ছেড়ে দিয়ে জামা-কাপড় টেনেটুনে তাকে বলল ,এস, তোমাকে সুড়সুড়ি দিয়ে দিই। বলতেই সে দেখল, পাশের ডিভানটার ওপরে সে ইন্দ্রনাথের শরীরের ওপরে সমান্তরালভাবে ভাসছে। এটা আচমকা কিকরে ঘটল, ভেবেই পেল না সে । ইন্দ্রনাথের দুটো- পা- এর ওপর সার্কাসের খেলার মত ঘটছে ঘটনাটা .হঠাৎ ক্রোধে  তার নিজেকে উন্মাদ মনে হল।উন্মত্তের মত তার ইচ্ছে করল, এই অবস্থায় সে ইন্দ্রনাথের শরীর নখ দিয়ে ফালা ফালা করে । অস্থির অস্থির করেছিল তার শরীর মন, মাথা। ঠিক কিভাবে সঠিক পদ্ধতিতে  ঘায়েল করা যায় ইন্দ্রনাথকে সে ভেবে পাচ্ছিল না। লিপি পেছন ফিরে  নির্বিকার বসে   আছে। ডিভানটার ওপরেই। সে যদি ক্রোধে পাগল হয়ে যায়, তাহলে তার মনে হল লিপি হাসবে। লিপির কাছে সে হেরে যাবে। এমন কি করলে তার হারা হবে না, অথচ এটা বোঝানো যাবে যে, তার যথেষ্ট রাগ ধরছে। তার সঙ্গে রয়েছে তীব্র বিরক্ত। ইন্দ্রনাথ অপমানিত হোক আর তার সঙ্গে লজ্জিতও। এমনটাই চাইছিল সে। অথচ ইন্দ্রনাথ এমন এক ধাতুতে গড়া ছিল, সম্ভবতঃ তাকে লজ্জা দিতে পারে, এমন মানুষ তখনও পর্যন্ত জন্মায়ইনি পৃথিবীতে। 

এইরকম একটা উৎকট স্বপ্ন যখন ভাঙল, তখন মুক্তি পাবারই কথা।ওহ্ , তারমানে আগাগোড়াটাই স্বপ্ন ছিল একটা ।চিটেগুড়ে পড়লে পিঁপড়ে , আর নড়তে চড়তে পারবে না টাইপের স্বপ্ন । কিন্তু মুক্তি পাবার বদলে সে লক্ষ্য করল, তার শরীর জুড়ে ছড়িয়ে আছে অস্বস্তিকার ঘিনঘিনে একটা কামবোধ। সেই কামবোধ এমন যে তাকে না গিলতে পারা যাচ্ছে না যাচ্ছে ফেলতে। 

বোঝাই যাচ্ছে, ইন্দ্রনাথ তাকে ছাড়বে না। স্বপ্নটাই তার প্রমাণ। ইন্দ্রনাথ সম্পর্কটাকে নারকোলের দড়ির আগায় জ্বলতে থাকা, একটুখানি আগুনের মত ধিকিধিকি জ্বালিয়ে রাখবে আর অনেকবারই নিবু নিবু হবে তা। আর তার বারবারই মনে হবে, এরচেয়ে দাউদাউ করে জ্বলে উঠে একেবারে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার হয়ে গেলে বাঁচা যায়। কিন্ত ইন্দ্রনাথের দৌলতে তা তো হবার নয়। ইন্দ্রনাথ ভালবাসবে, তবে শুধু নিজের সুবিধে মত ভালবাসবে।ব্যাপারটা একতরফা। 

           কে জানে, লিপির সঙ্গেও ইন্দ্রনাথ এরকম কিনা। এক সঙ্গে দুজনকে ভালবাসার হ্যাপা আছে। আগেকার দিনের রাজা-রাজড়ার মেজাজের মতন। একাধিকজনকে ভালবাসলে যে গোটা বৃন্দাবনের গোপীকূলকে নিয়ে রাসলীলায় মও হবে, মধ্যে রাধা! এসব সামলাতে ইন্দ্রনাথের মত ধুরন্ধরেরও  নাকের জলে চোখের জলের অবস্থা হয়।তবে কিনা, ইন্দ্রনাথ তো ইন্দ্রনাথই। স্বয়ং শিবের বাবারও অসাধ্যি ইন্দ্রনাথকে জন্মের মত হাবুডুবু খাওয়ায়।

   এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে আবার কখন ঘুম এসে গেছিল কে জানে?এই জায়গাটায় রাতে মনের সুখে ঘুমোবার জো নেই। এক ইঁদুরের উপদ্রবে সারারাত জ্বালাতন পোড়াতন হতে হয়। আলো নিভে গেলেই সে তার কাজকম্ম শুরু করে। বাড়িটার কাঠের মেঝের তলায় ফাঁকা জায়গাগুলোর মধ্যে ঢুকে কাঠ কাটতে থাকে। ফলে খুড়ুর খুড়ুর করে আওয়াজ হয় রাতভোর। যেন রদ্যা চালাচ্ছে। ভারী বিচ্ছিরি ব্যাপার।

ইঁদুরটার কথা ভাবলে ওর গা চিড়বিড়ই করে। প্রথমতঃ মনে হয়, ইঁদুরটার গায়ে নিশ্চয় ভীষণ গন্ধ, তারপর ইঁদুরটার ওমনিধারা স্বভাব আর তার ওপর ওর এই ইঁদুর সুলভ চেহারাখানা । ব্যাপারটা ওর খুব অপছন্দের।গা ঘিনঘিনের। 

রাতটা কেটে যাবার পর এই জায়গাটায় সুন্দর ভোর হয়। পাহাড়ের খাঁজ থেকে জঙ্গলের মাথা ছাড়িয়ে ডিম ফুটে বেরোনোর মত সূর্যটাউঠে পড়ে।তখন সূর্যটাকে গপ করে খেতে ইচ্ছে করে।

কখনও কখনও ও সারাদিন এদিন পানে ওদিক পানে ঘুরে বেড়ায়। পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে রান্নাঘরে উঁকি দেয়। এই পাহাড়ের দেশে রান্নাঘরটাকে দেখলেও পাহাড়ী-পাহাড়ী মনে হয়। মেটে রঙের দেওয়াল। তাকগুলো সব মোটা খোবড়ালো কাঠের। শক্ত গুঁড়ির গাছের কাঠ ছিল সেগুলো এককালে। তাই এখনও ওমন শক্তপোক্ত । তাকগুলোকে দেখলে ওর মনে হয় খুব পুরুষালি অথচ মানবিক ?? দুটো কি বিপরীত ধর্মীগুণ যে একটা থাকলে আর একটা থাকবে না ? পুরুষরা কি কম মানবিক ? না, তা কেন হবে? তবে এই ইন্দ্রনাথকে দেখে দেখে পুরুষ বিষয়ক বোধবুদ্ধিগুলো ওর কেমন যেন ঘুলিয়ে গেছে। এই জায়গাটার কি যেন নাম।মাঝেমাঝেই দেবেন্দ্র এসে ওকে মনে করিয়ে দেয় বটে, তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই ও আবার তা ভুলে যায় । কি যেন এক মহা বিস্মৃতির  গুহার মধ্যে ঢুকে গেছে ও।এখানকার প্রকৃতির মতই অনেকটা। প্রকৃতি কি বিস্মৃত হয়? এই পাহাড়, জঙ্গল,চড়াই-উৎরাই ভরা রাস্তা, লম্বা লম্বা মহাসমারোহে অটল ব্যক্তিত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো , আকাশে মেঘের রং বদল , এরা কি স্মৃতিহীন ? কিন্ত গাছের গায়ে হাত রাখলে  গাছ ওকে চিনতে পারে যে ! যে রাস্তা মাড়িয়ে ও চলে যায়, রাস্তারা ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতায় । আবার ফিরে এলে চেনা দেয়। এরা নির্বাক ভঙ্গিতে মানুষের থেকেও বেশী কাছাকাছি থাকে। মানুষের থেকে ওর বেশী কাছাকাছি পশু- পাখিরাও থাকে। অবশ্যই সংবেদনশীলতা প্রকৃতি, পশুপাখি এবং বস্তুখন্ডদের মত নির্বাক প্রানী ও অপ্রাণীদের বেশি  মানুষদের থেকে, একথাটায় নিজের মনেই বারবার সায় দিল ও । এই যে কাঠের রেলিংটার ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে ও, রেলিংটাকে ও চেনে, রেলিংটাও ওকে চেনে। বেশ টের পাওয়া যায় সেটা। এই টের পাওয়া পাওয়ি নিয়েই আজকাল ওর দিনগুলো কাটে । 

             যাইহোক ঘোরানো যে কাঠের সিঁড়িটা বেয়ে ও নীচের বাগানটার নেমে দাঁড়ায়, সেই কাঠের সিঁড়িটার ওপর ও মাঝে মাঝে বসে থাকে। কাঠের সিঁড়িটা তখন ওর সঙ্গে কথা বলে। নেহাত খুব পোকামাকড়ের উপদ্রব না থাকলে সিঁড়িটার ওপর ও বিরক্ত হয় না কখনও। এটা অবশ্য একটা ব্যাপার যে, এই পৃথিবীর যাবতীয় পোকামাকড়, কাদা এবং গোবর, রক্ত এবং পুঁজ, শ্লেষ্মা এসব কিছুই ওর ভয়ঙ্কর রকমের অপছন্দের এমনকি শুকনো ধুলো এবং কিচকিচে বালির ব্যাপারেও আপত্তি আছে। এই পৃথিবীটা ছবির মত সুন্দর ও পরিষ্কার আবর্জনাহীন হলে ওর পক্ষে ভীষণ সুবিধেজনক হত। কিন্ত পৃথিবী ভর্তি করে এইসব বিরক্তিকর জিনিস বহাল তবিয়তে থাকলেও পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগস্থাপন করতে ওর তেমন কোন আসুবিধে হয় না। বরং মহাপ্রকৃতিতে ভাল আর মন্দের সহাবস্থান সে উপভোগই করে। কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন নোংরা- পাংরাগুলো সরাসরি গায়ে এসে পড়ে। নোংরা, ময়লা, ধুলো, কাদা এদেরও নিশ্চয় একধরণের ভাষা আছে, কিন্ত এদের সঙ্গে বৈরীতার দরুণ তাদের ভাষাটা ও রপ্ত করে উঠতে পারেনি। আজকাল তাই কিছুটা সময় যায় নোংরা তাড়াতে। আর বেশীরভাগ সময়ই কাটে প্রকৃতির সঙ্গে কথপোকথনে।

প্রকৃতিও সম্ভবতঃ ওর মতো স্মৃতিহীনতায় ভোগে। আবার ভোগেও না।সম্ভবত প্রকৃতি ওরই মতো তাৎক্ষণিক স্মৃতির অধিকারী। অপ্রয়োজনীয় স্মৃতি প্রকৃতি মুছে ফেলে। যখন ও এবং প্রকৃতি দুজনে দুজনের মুখামুখি দাঁড়ায়। তখন টের পায় ওদের মধ্যে ভালবাসা আছে। তবে কিনা, সেই ভালবাসাটা শুধু সেই মুহূর্তের। ভালবাসাটার মধ্যে আর যাই থাক, পিছুটান নেই কোনো। যেকোনো মুহূর্তে প্রকৃতি ওর দিক থেকে চরম নিস্পৃহ হয়ে যেতে পারে,নিস্পৃহ হয়ে যেতে পারে ও-ও। এইরকম চরম উদাসীনতা ও নিস্পৃহতা আবার একই সঙ্গে গভীর সংবেদনশীলতা নিয়ে ওদের মধ্যের যে ভালবাসা তা ওকে সুখ দেয় খুব, কিন্তু শান্তি দিতে পারেনি এখনও।

             স্বস্তি দিতে পারেনি ইন্দ্রনাথও। ইন্দ্রনাথ অর্থাৎ যে লোকটি প্রায়ই ওর স্বপ্নে আসে। হয়তবা বাস্তবেও ।  তবে সে সব ঠিক মতন মনে পড়ে না। বরং মনে করতে গিয়ে সব কিছুই অলীক বিভ্রম বলে মনে হয় ওর। ওর তাৎক্ষণিক স্মৃতিই  বোধহয় এর জন্য দায়ী। তবে অপ্রয়োজনীয় স্মৃতি কিনা জানা নেই। আর ইন্দ্রনাথের সঙ্গে ওর এত রকমই ঘটনা ঘটে এবং ঘটেছে তাই নিয়ে ভেবে ভেবে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া যায়। ঘটনাগুলো  বিস্মৃতির অতল থেকে ভেসে মনের মধ্যে জেগে ওঠে। অবশ্য যদি  ইন্দ্রনাথের বিষয়ও ওকে নিস্পৃহতা গ্রাস করে তাহলে আলাদা কথা। কখনও কখনও ইন্দ্রনাথের সঙ্গে ওর সমস্ত হিসাবনিকেশ পাল্টে গিয়ে সম্পর্কটা চরম সুখের হয়ে ওঠে। তখন ওর অথবা ইন্দ্রনাথের কারুরই কোন অতীত থাকে না, ভবিষ্যতও তেমনি থাকে , তা মনে হয় না। এই ভাবে মহাসুখে সারাক্ষণ বর্তমানে বিরাজ করা ওর অথবা ইন্দ্রনাথের কারুর পক্ষেই সম্ভব হয়নি। ইন্দ্রনাথের অতীত এবং লিপি ও হিঁচড়ে টেনে বার করেছে। আর ওর নিজের মনের ভেতর গুমড়ে থাকা চাহিদাগুলোও ওর নিজের চোখের সামনে আছড়ে এসে পড়েছে। দোষটা ওরই, অন্তত এমনটাই মনে হয় ওর। ইন্দ্রনাথ যতই পাঁচমিশালী মানুষ হোক, তার সমস্যাটা তারই। ইন্দ্রনাথের সমস্যা নিয়ে ও ব্যতিব্যস্ত হলে সমস্যাটা আর ইন্দ্রনাথের থাকে না, ওর হয়ে যায়। নিজের সমস্যা নিয়ে ও বরাবরই নির্মম। ক্ষমা নেই সেখানে। 

যেমন একদিন রাত বারোটার সময় ইন্দ্রনাথের ফোন এল। সে সময়টাতে শব্দগুলো  সব কমে এসে থম ধরেছিল অন্ধকারে। নিঝুম হয়ে গেছিল জানলা-দরজা, দোকান-পাট, শহর। ঘরের মধ্যে কুপকুপে অন্ধকারে বসেছিল ও আর অন্ধকার কাটিয়ে পরিত্রাহী চিৎকার করছিল ইন্দ্রনাথ। আওয়াজ করে নয়, হৃদয় ফুঁড়ে। 

তিরিশ সেকেন্ড, মাত্র তিরিশ সেকেন্ড থাকতাম তোমার সামনে। একবার দেখতাম তোমায়।

কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিল ও। অবিশ্বাস!! ভারী পর্দাটানা ঘরের ভেতরকার ঘোর অন্ধকার ঘিরে রেখেছিল ওকে, যার মধ্যে মিশেছিল জমাট বাঁধা অবিশ্বাসের টুকরো। এইরকম গাঢ় অবিশ্বাসের রঙ সাপের বিষের মত হয়। আর তার মধ্যে মিশে থাকে ভয় আর নিরাপত্তাহীণতা । ইন্দ্রনাথ ফিরে গেছিল। অতএব। ফিরে যেতে  যেতে বলে গেছিল, আজ এইদিনে আমার বাবার অস্থি আমি ভাসিয়ে দিয়েছিলাম জলে। কেন আসতে দিলে না? কি করতাম তোমার? তখন ওর মনে হয়েছিল, আসতে দিলেই তো হত ! সত্যি কি আর করত সে !

এইরকম বিবিধ দোলাচলে ভোঁ ভোঁ করে ওর দিনগুলো। একরকমভাবে কেটে যায়। এসব সময় ওর আর ইন্দ্রনাথের মধ্যের সম্পর্কের হিসেব-নিকেশগুলো বদলে ফেলে ও নিজেই কখনও কখনও। তখন আদান ও প্রদান দুটো ব্যাপারকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। অন্তত এমনটাই ধারণা হয় ওর। তত্ত্বগতভাবে এইরকম একটা সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টায় ও ব্যস্ত হয়ে পড়ে ।যদিও এইধরণের সম্পর্কে ও এখনও ততটা অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি বললেই চলে। তবে একদিন অভ্যস্ত হয়ে উঠবে, এইরকমই ওর বিশ্বাস। সেই দিন ও মহাপ্রকৃতি হয়ে যাবে।

                  মহাপ্রকৃতির কথায় ওর শ্বাস ঘন হয়ে আসে। রক্তর মধ্যে তৈরি হয় ছন্দ। সেই তালে শরীর বাঁধা হয়ে গেলে তা তানপুরার মত কেবলই বাজতে থাকে। যেন কোন অতল ফুঁড়ে উঠে আসা একটা ধুন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে ওকে! প্লাবনের মত উপচে উঠে টইটম্বুর হয়ে যাবে একসময়। হাবুডুবু খেতে যে এত আনন্দ জানা ছিল না ওর আগে।

ঘোরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কাঠের মেঝের ওপর ক্রমাগত একটা আওয়াজ ওর দিকে এগিয়ে আসছিল। ফটাস ফটাস চটির আওয়াজ। ঘোর ঘোর চোখে তাকিয়ে দেখতে পেল দেবেন্দ্রকে। মজায় থাকে ছেলেতা।ম্যাথস্‌ নিয়ে সমস্যা আছে বলছিল। কখন যে পড়ে আর কখন যে করে কি জানে! সারাদিনই ওকে দেখা যায় টো-টো কোম্পানী করতে।

দেবেন্দ্র ওকে বলল, কি দিদি, কি করছ?

ও উওর দিল না।

দেবেন্দ্র এক ঝুড়ি বীনস্‌ নিয়ে যাচ্ছিল। ও জিজ্ঞস করল, কি করবে?……

-চাচী বলেছে, ভাজি বানাবে। বাগান থেকে তুলে নিয়ে যাচ্ছি।

যেতে যেতে দেবেন্দ্র ঘাড় ঘুরিয়ে ওকে বলল ,আও।

ও যেতে থাকল দেবেন্দ্রের পেছন। দেবেন্দ্রের পায়ে সাদা অজন্তা হাওয়াই। সাদা চটিতে নীল স্ট্র্যাপ্‌। এই চটি দেবেন্দ্রের সর্বক্ষণের সঙ্গী। ধুলোমাখা পা আর অজন্তা হাওয়াই নিয়ে দেবেন্দ্র সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়। পাহাড়ে, বনে- বাদাড়ে। কাঁটা ঝোপে ভর্তি পাহাড়ের গড়ানে গা বেয়ে তরতরিয়ে নামে,ওঠে।উঠতে উঠতে শেষ পাথুরে পাহাড়ের টং-এ চরে বসে থাকে। তারপর সেখান থেকে হাওয়াই চটি ফটফটিয়েই কেমন করে যেন হড়কে হড়কে নেমে আসে।ভয় লাগে তখন। আর প্রত্যেক মুহূর্তে মনে হয়, অবধারিত পতন হবে। পাহাড়ের তলায়, কোথায় কোন গভীর গর্তে সগর্ব উচ্চতা থেকে মাধ্যাকর্ষণের টানে ছিটকে পড়া ধ্বসের মতন ধসে পড়বে ছেলেটা। কিন্ত ও দেখেছে, মানে ও নির্ঘাৎভাবে এই ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী থেকেছে যে, দেবেন্দ্র অজন্তা হওয়াই দু- আগুলে টিপে নিশ্চিন্তে নেমে এসেছে ওই আঘাটা থেকে।

হনুমানের জাতভাই তুমি। দেবেন্দ্রকে বলেছে ও।

আজ্ঞে, তুমিও।তফাৎটা শুধু এই যে এইসব কর্তব তুমি ইদানিং ভুলে গেছ।

হেসেছে ও।

এখন দেবেন্দ্র আর তার অজন্তা হাওয়াই-এর পেছন পেছন যেতে যেতে ও দেখল পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে দেবেন্দ্র রান্নাঘরে যাচ্ছে । রান্নাঘরের বাইরে কাঠের বেঞ্চিতে বসল, ওরা দুজন। দেবেন্দ্র গুছিয়ে জোগাড় করে নিয়ে এল,দুটো ছুরি আর চপার বোর্ড । নিপুণ হাতে কচুকাটা করছিল ওরা বীনগুলোকে। চাচী রান্না করবে। দেবেন্দ্র বকবক করছিল কত কথা। কথাগুলো এমনই যা বললেও হয় না বললেও হয়। ফুটবল ম্যাচে কাত করে দিয়েছে দেবেন্দ্র কাদের যেন। বোধহয় সেইসব ছেলেগুলোকে, সেদিন যখন দেবেন্দ্রর সঙ্গে ও হাঁটছিল, রাস্তা দিয়ে একটা মাঠের কাছে কিছু ছেলে খুব করে দেবেন্দ্রকে কিছু বলেছিল। ঠিকমত শোনেনি ও । টিটকিরিই হবে বোধহয়। টিটকিরিকে দেবেন্দ্র হজম করেছিল তখন । কিসের টিটকিরিকে কে জানে ? দেবেন্দ্রকে পেয়ে বসেছিল ফুটবল ম্যাচ ।

ওকে পেয়ে বসে ছিল প্রকৃতি ।এখনও তার ঘোর ওকে ছাড়েনি।

এই ঘোর নিয়ে সব কাজ করে ফেলা যায়, কিন্তু ঘোর ছেড়ে যায় না । এই যে দেবেন্দ্রর এতশত বকবকানি, ও কিন্ত দিব্যি আছে ,আধা শুনে আধা না শুনে । এত শব্দ করে বলা কথা , ওসবের কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে? ভাবছিল ও । প্রকৃতি তো কথা বলে না ! প্রকৃতি তো কিছুই না বলে কতো কিছু বলে দেয়।বলে যায় । নাক, মুখ চোখ দিয়ে প্রকৃতি আস্তে আস্তে ওর মধ্যে সেঁধিয়ে যাচ্ছিল । 

ও অনবরত কথা বলছিল প্রকৃতির সঙ্গে নিঃশ্বাসের মারফৎ।

একনাগাড়ে বীনস্‌ কাটছিল ও। আর বীনস কাটকে কাটতে 

একনাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছিল দেবেন্দ্রও । একনাগাড়ে ঘটে যাচ্ছিল অনেক ঘটনা।

দুই

       চিকুটা একটা জানোয়ার। চিকু মহা ধুরন্ধর এবং বদমাশ হলেও চিকুর সঙ্গে ওর একটা বোঝাপড়া আছে।কিন্ত এদিক-ওদিক চোখ বুলিয়েও চিকুকে ধারেকাছে কোথাও দেখা গেল না।ঘাপটি মেরে আছে কোথাও। একটা গভীর রাত ঝুলে আছে পাহাড়ের আনাচে- কানাচে। পাথুরে ফাঁকফোকরগুলো তাই তেমন আর ঠাহর করা যাচ্ছে না। পাহাড়ের গা বেয়ে পিচের রাস্তা ধরে ও এগিয়ে যাচ্ছিল, ক্রমশঃ। রাত গভীর হলে শীতও চেপে ধরে পাহাড়ে। ইয়াক লোমের শালটা গায়ে চাপিয়ে বেরিয়ে এসেছে ভুলোমনা । রাতের খাবারের পর। রাতের খাবারে আজ রুটি, অড়রডাল, আর দুরকম সবজির সঙ্গে স্যালাডও ছিল। রুটিতে নিজের হাতে বানানো ঘি লাগিয়ে দিচ্ছিল গুরুং। এদের গরুগুলো এদের বাড়ীতে না থেকে পাহাড়ের কোলে অন্য একটা জায়গায় থাকে।

দিনেরবেলা সব পশু-পাখীদের মতোই সেগুলো খায়-দায় আর জাবর কাটে। সন্ধেবেলাটা ব্যাজার মুখে বসে থাকে খামারের মধ্যে। ল্যাজ দিয়ে মশা তাড়ায়। গরুগুলোর দুধ বড় একটা গামলায় জ্বাল দেবার পর মোটা সর জমিয়ে রাখে চাচী। তাই দিয়ে ঘি

 বানায় গুরুং।বড় সরেস সেই ঘি । ভুলোমনা মানে ও। সব ভুলে গেছে বলে গুরুং ওকে ভুলোমনা বলে ডাকে। সদ্য আসার পর গুরুং জিজ্ঞেস করেছিল- নাম বল ?

-ওই তো লেখা আছে রেজিস্টারে। দেখে নিও।

-রেজিস্টার তো আমার হাতের কাছে নেই এখন। সে ছিল যখন তোমাকে এখানে রেখে যাওয়া হল। এখন নামটা তো বল।

-তখন দেখে নাওনি কেন? আমি বলতে পারব না।

-আমি তো ছিলাম না রিসেপশনে! নাম বলতে পারবে না কেন?

-জানলে তো বলব।

-যারপরনাই আশ্চর্য হয়েছিল গুরুং।

-নাম জানো না ?

– মনে নেই।

-নামও মনে নেই ? তাহলে আমার সঙ্গে এসো। রেজিস্টার দেখে নিই দুজনেই।

-না মহাশয় । দেখতে চাইলে তুমি যাও একা। ওখানে যে নামটা লেখা আছে, লোকে বলে ওটা আমার নাম। নামটা আমার এত অচেনা , নাম দেখে কি করব ? তার থেকে আপনা- আপনি যখন মনে পড়বে….. তখনই না হয়…

রেজিস্টারে পরে দেখেছিল কিনা জানেন না ভুলোমনা ।শুধু গুরুং বলেছিল, আপনা- আপনিই মনে পড়ুক তবে।এখন তোমাকে কি বলে ডাকি তাহলে ?

-তোমার যা খুশী।

-তুমি তো ভুলো মনা। ভুলো মনা। ভুলোমনা । ও গোলাপী ভুলোমনা আমরা একটু একটু করে তোমাকে সব মনে পড়িয়ে দেব।

ভুলোমনা থেকে যায় ওখানে। মানে, গুরুং ফ্যামিলিতে।গুরুংদের বিশাল পাহাড়ি বাড়ি। তাতে যে কোন পাহাড়ী বাড়ির মতোনই গুচ্ছের জানলা। আর তেল রং দিয়ে হলুদ সবুজ, মেরুন রং-করা। বাড়িটার দেওয়াল সাদা রঙ্গের।তাতে ওরা প্রায় চল্লিশজন থাকে।

চিকুকে খুঁজে পেল না ভুলোমনা। বারদুয়েক শিস দিল। শিস শুনলে চিকুটা আন্দাজ করে নেবে ভুলোমনা, কোথায় আছে। অন্ধকার হাতড়েও বের করে ফেলবে ভুলোমনাকে। অবশ্য অন্ধকার এখন তেমন ঘুটঘুটে নয়।মাঠটাতে তো বাণ ডেকেছে জ্যোৎস্না। সেই জ্যোৎস্নায় নিজের ছায়া দেখল কিছুক্ষণ ভুলোমনা। এপাশ- ওপাশ থেকে নানাভাবে দেখলে ছায়াটা ক্রমাগত বেঁটে হচ্ছে, লম্বা হচ্ছে। কোনো ছায়াটাই  প্রকৃত ভুলোমনার হচ্ছে না! হাতের পাতা ফেলে দেখল। আঙুলগুলো প্রয়োজনের থেকে বেশি লম্বা এল। ভুলোমনার স্মৃতিটাও কি এই ছায়ার মত? ইচ্ছেমত লম্বা অথবা বেঁটে হয়ে গেছে? যেগুলো ঘটে গেছে তার বেশ কিছু বেঁটে হতে হতে এত বেঁটে হয়ে গেছে যে, ছোট্ট এইটুকু হয়ে গেছে মাথায় মধ্যে।আবার খামচে খামচে কিছু মনেও পরে ভুলোমনার। আবার এখনকার দিনগুলো নতুন করে ঝকমক করে মনের মধ্যে। 

কি করে ভুলে গেল, আর কি কি ভুলে গেছে, এই প্রশ্ন ভুলোমনা নিজেকে প্রায়ই করে। চেনাশোনা পুরনো লোকেদের কাছ থেকে মনে করে নিলেই হয়।কিন্ত সেই পুরনো মানুষগুলোকে বেজায় অচেনা লাগে ভুলোমনার। তারা সারি সারি অনেকগুলো মুখ ছাড়া আর কিছুই না, যারা ভুলোমনার দিকে তাকিয়ে আছে। এখানে সামন্ত ওকে রেখে যাবার পর, ওর ডঃ অমিতাভ ব্যানার্জী বলেছিলেন, যাবতীয় এক্সটারনাল স্টিমুলাস যা থেকে ইরিটেটিভ সিগন্যাল পাচ্ছে, তা থেকে দূরে সরিয়ে ফেলতে হবে। একেবার চোখের আড়ালে।আর ইরিটেটিভ স্টিমুলাস তো সবকিছুই, মানে ভুলোমনার পুরনো জগতে যা ছিল তা সবই। অতএব…

গুরং- এর সাহায্য ছাড়া নাকি সম্ভব নয় ভুলোমনাকে ফিরিয়ে আনা ; অন্ততঃ এমনটাই লিখেছিল সামন্ত ই-মেলে গুরুংকে। গুরুং একজন অত্যন্ত বুদ্ধিমান, উচ্চ- শিক্ষিত, সৎ মানুষ, যা বোঝার চটপট বুঝে নিয়েছে। 

    ভুলোমনা শুনেছে, সামন্ত খুবই ভালো মানুষ, প্র্যাকটিক্যাল বুদ্ধিসম্পন্ন এবং সে নাকি ভুলোমনার শুভাকাঙ্ক্ষী। শুভাকাঙ্ক্ষীই হবে । সামন্তকে দেখলে বা সামন্তর কথা ভাবলে সেরকমই মনে হয়। বিশেষ করে সামন্ত যখন তিন/চার দিন বাদে বাদে একবার ভুলোমনার মোবাইলে ফোন করে।টাকা পয়সার খবর নেয় আর ভুলোমনার কিছু দরকার কিনা খোঁজখবর করে। অর্থাৎ সামন্তের কিছু একটা দায় আছে ভুলোমনার প্রতি।একটা দায়িত্ববোধ। কিসের দায় আর কিসের দায়িত্ববোধ তা নিয়ে ভুলোমনা মাথা ঘামায় না।ধু…উ…র।সে বেশ আছে। ফোন করে ইন্দ্রনাথও। ইন্দ্রনাথ চরিত্রটি গোলমেলে। কেন যেন ভুলোমনার মনে হয় সে তেমন ভালো নয়। ভগবানই জানে! ভালো আর মন্দের ধারণাটাও ভুলোমনার মগজ থেকে মুছে সাফ হয়ে যাওয়ার কথা। কি ভালো আর কি মন্দ! কিন্তু ভুলোমনা ভালোমন্দের টের পায়। গন্ধ শুঁকে। গন্ধ শুঁকে টের পায় অনেককিছু। কোনখানে বিপদ আছে, ভুলোমনা অনুভব করে নিতে পারে। এটা বোধহয় প্রাকৃতিক ব্যাপার। এবং ভুলোমনার পুরানো জীবন অন্তত এখানে থাবা বসাতে পারেনি বরং গুরুংদের সঙ্গে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকতে এসে প্রকৃতি রোজই একটু একটু করে ভুলোমনার নাক, কান, মুখ, চোখ ত্বক সবকিছুর মধ্য দিয়ে ঢুকে পড়েছে। 

   এই ব্যাপারে ওকে অনেক সাহায্য করে চিকুও। ধুরন্ধর বদমাশ বলে নাম আছে চিকুর এ তল্লাটে। বাঁচার তাগিদে চিকুকে অনেককিছু করতে হয়। চুরি-চামারি এইসব।তবে সেসব ক্ষ্যামাঘেন্না করে নেওয়া যায়। চরম নিঃশব্দে হাঁটা-চলা করে চিকু, গন্ধ শুঁকে শুঁকে এগিয়ে যেতে পারে। বিপদ বুঝলে হিংস্র হায়না হয়ে উঠতে এক মুহূর্তও সময় নেয় না। তাই ভুলোমনা নিশ্চিন্তে থাকে, চিকুর সঙ্গে। একদিন আদাড়-পাদাড় পেরিয়ে যেতে যেতে, অনেক দূর চলে গেছিল ভুলোমনা। সেদিন দেবেন্দ্র সঙ্গে ছিল না। ফিরতে সন্ধে নেমেছিল। আর ঘন সন্ধ্যের চোরকাঁটা আর জোঁকের কবল থেকে মুক্তি পেতে প্রাণপাত করতে হচ্ছিল ভূলোমনাকে। ঘোর অন্ধকারে একটা লোক সরসরিয়ে নেমে আসছিল পাহাড়ের গা বেয়ে। ভাল কি মন্দ জানা নেই। কারণ তার মুখ দেখার উপায় ছিল না। ভুলোমনা প্রথমে সন্ত্রস্ত হল। কে রে বাবা? তারপর সে আর ভুলোমনা হাঁটতে শুরু করেছিল। ভুলোমনা চোরকাঁটা মাড়িয়ে দুদ্দাড় করে এগোতে চাইছিল, কারণ তার পিঠ বলছিল এইদিকে বিপদ আছে। ভুলোমনার কানদুটো যেন খাড়া হয়ে পেছন পানে উঁচিয়ে ছিল। আর ঘাড়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়বে পড়বে করছিল লোকটা। সেই সময় রাস্তার নুড়িপাথরগুলো পায়ের কাছে সড়সড় করছিল। একইসঙ্গে তারা জানান দিচ্ছিল, তারা বিপদে কাজে লাগলেও লাগতে পারে, যদি কাজে লাগাও। আবার বিপদ বাড়াতেও পারে, চলার পথের অসুবিধার কারণ হয়ে। ভুলোমনা পাথর কুড়োতে চাইল! কিন্তু ভয় হল নীচু হয়ে বসলে লোকটা মওকা পেয়ে যাবে। ভুলোমনা প্রাণপাত চলছিল; চলছিল না ছুটছিল। সেই সময় নিঃশব্দে অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে চিকু। মূর্তিমান যমের মত রুখে দাঁড়ায় লোকটার সামনে। লোকটা হঠাৎ অন্ধকারে সরতে থাকে। কিন্তু চিকু ছিল অন্ধকারের পোকা। অন্ধকারে চিকু ভূতেদেরও খুঁজে বার করতে পারে। লোকটার পেছু ধাওয়া করে চিকু। লোকটাকে গালাগাল দিতে শোনে ভুলোমনা। তারপরে সব চুপচাপ। চিকু চলে আসে ভুলোমনার পাশে। ভুলোমনার বুকের ধড়ফড় কাটেনি তখনও। গলা শুকিয়ে কাঠ/সে চিকুকে বলে, জল খাব চিকু। চিকু হাঁটতে থাকে। পাশে ভুলোমনাও! ছোট্ট একটা গ্রামের বাড়ির উঠোন থেকে জল খায় ওরা। এরপর ফিরে আসে!। 

  ভুলোমনা সেদিন চিকুকে বলেছিল, ভিখিরির মত চেয়ো না লোকের কাছে। আর জবরদস্তি ডাকাতিও কোরো না। যারা দেবে, তাদের দেওয়া খাবার খেও। আমিও দেব যতদিন আছি। তবে জানো তো, আমার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। যেদিন আমার সবকিছু মনে পড়ে যাবে। আমাকে চলে যেতে হবে এখান থেকে। তখন তুমি কি করবে বলে দিচ্ছি, আমি! পাহাড়াদারি করে রোজগার করবে। 

    ভুলোমনার চলে যাবার কথায় হেলদোল দেখা যায়নি চিকুর ।

    এখন জ্যোৎস্নারাতে ভুলোমনা চিকুকে পেল না। কিন্তু কেমন একটা বিশ্বাস হল ওর , যে এখুনি যদি কোনো বিপদ আসে তাহলে চিকু ঠিকই টের পাবে। এমন একটা গাঢ় বিশ্বাস কেমন ভেজা ভেজা ঘামের মতন দুধরঙা নির্যাস হয়ে ভুলোমনার গা থেকে বেরিয়ে এসে মিশে গেল জ্যোৎস্নার মধ্যে। একটা বুনো গন্ধ বেরোচ্ছিল তা থেকে। বিশ্বাসের গন্ধ তবে বুনো? এই বিশ্বাসটাই করে উঠতে পারেনি ভুলোমনা ইন্দ্রনাথকে।

  সবকিছু দিতে রাজি ছিল ভুলোমনা। বিশ্বাসটা নয়। বিশ্বাসটা দিতে পারল না বলে সবকিছু দেওয়াটাও আর হল না। আসলে, এখানেই ভীষণ মতবিরোধ ছিল। ভুলোমনা কিভাবে কিভাবে যেন বড় হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে  শিখেছিল, দেখেশুনে পা ফেলো। থিঙ্ক বিফোর ইউ লিপ। এই সবকিছু নিক্তির ওজনে মেপেজুপে এগোতে চাইছিল সে। এদিকে ইন্দ্রনাথটাতো হাড় ধান্দাবাজ। সে বারবার বলেছিল, বিলিভিং ইস সিয়িং। যা বিশ্বাস করবে, তাই দেখবে। যদি বিশ্বাস করো যে, আমি বিশ্বাসযোগ্য তাহলে তাই দেখতে পাবে। আজ ভুলোমনার মনে হল, এত বিশ্বাসের জোর কি ছিল ? ছিল না বলেই বোধহয়, তার পদ্ধতি ছিল সিয়িং ইস বিলিভিং। যা দেখব, দেখে বুঝব , তাই বিশ্বাস করব। এই বিলিভিং ইস সিয়িং না সিয়িং ইস বিলিভিং –এর জটিল ঝকমারিতে ভুলোমনা আর ইন্দ্রনাথ-এর এর মধ্যে বোঝাপড়াটা আড় হয়ে রইল।

  ইন্দ্রনাথ ছিল গোড়ায় গোড়ায় ঘোর রহস্যজনক। এইরকম রহস্যজনক, মানুষজন যারা সবকথাই বলে আধাখ্যাঁচড়া ভাষায় , তাদের বিশ্বাস করা দূরূহ তো বটেই। আর বিশ্বাস করলে ঠকতে হয়। ভুলোমনা হাজারবার ঠকেছিল। ইন্দ্রনাথ বলত, কাউকে বিশ্বাস করে ঠকাও ভাল। ভুলোমনার ঠকতে ছিল ভীষণ ভয়। ফলে একদিন চ্যাঁচামেচি করে, ভুলোমনা ইন্দ্রনাথকে জানিয়ে দিল যে, আপনি যা যা বলেন, সব আপনার নিজের সুবিধের জন্য। আপনার মত ফিশি লোককে কোন কারণে বিশ্বাস করব বলতে পারেন? ইন্দ্রনাথ বলল, ফিশি তা ভাল। ফিশ ভাল লাগে না তোমার? ভুলোমনা বলল, দূর হোন। 

দূর হওয়া কি চাট্টিখানি কথা! ইন্দ্রনাথ তো আজও দূর হয়নি।ভুলোমনা স্মৃতিভ্রংশের পরেও স্বপ্নের সুতো ধরে ধরে আবার গুটি গুটি এগিয়ে আসছে ইন্দ্রনাথ। ভুলোমনা কোনোদিনও ইন্দ্রনাথকে বিশ্বাস করবে না।

বিশ্বাস ভঙ্গ হতে পারে জেনেই রয়ে যাবে কাছে।

হাঁটতে হাঁটতে ভুলোমনা গেস্টহাউসে এসে পড়েছিল। ধারেকাছে কাউকে দেখা যাচ্ছিল না।

না দেবেন্দ্র না গুরুং, না অন্য কেউ। রাত এখন প্রায় সাড়ে এগারোটা । পাহাড়ে অনেক রাত ! গেস্ট হাউসের কাছটা সরগরম হয়ে আছে। ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর করে একঘেয়ে একটা ব্যাঙের মত কিছু বেজে চলেছে, আর তার সঙ্গে ঢোল। একটা শামিয়ানা খাটানো আছে। সেখানে অষ্টপ্রহর কীর্তন চলছে। খুব বাঁচা গেছে, এই বিতিকিচ্ছিরি সংকীর্তনের আওয়াজ ভুলোমনার ঘর অবধি পৌঁছোয় না।একগাদা মানুষ সেখানে বসে ভয়ঙ্কর রকমের একটা গান গাইছে। সেটা তিব্বতী ভাষায় মন্ত্র পড়ার মত হলেও আদৌ শ্রুতিমধুর নয়। জায়গাটায় এসে পড়ার পর অসম্ভব বিরক্তিকর লাগছিল ভুলোমনার।সে শুনেছে রিমপোচে এসেছেন। ইনি এদেরই ফ্যামিলির কেউ। এরা এঁকে ডাকে ঠাকুরজী বলে। শুনতে লাগে ঠাকুরঝির মত। গুরুং-এর বড়দিদি এক দশাসই আকৃতির প্রখর বুদ্ধিসস্পন্ন দাপুটে গোছের ভদ্রমহিলা, অতিথিদের খাওয়া-দাওয়ার সময় ভীষণ খাতিরদারি করেন। তিনি দুদিন আগে বলেছিলেন ভুলোমনাকে ঠাকুরজী এসে আছেন। যাবে দেখতে ? ভুলোমনা শুনেছিল ঠাকুরঝি। ভুলোমনা ভাবল ঠাকুরঝি তো ননদকে বলে। সেটা আবার এত ঘটা করে জানাচ্ছে কেন? তার ওপর এই ভদ্রমহিলা যাকে সবাই ‘দিদি’ ডাকে সে বিয়ে থা’র পরে বাপের বাড়িতে কেন থাকেন ? তাহলে উনিই তো এই বাড়ির বউদের ঠাকুরঝি । গোলমাল পাকিয়ে যাচ্ছিল ভুলোমনার।ঠাকুরজী  সম্পর্কে আগ্রহ জাগেনি তার।

এখন শামিয়ানার কাছে উঁকি মেরে ভুলোমনা ভাবল, কি কাণ্ডখানা হচ্ছে দেখা যাক একবার। উঁকি মেরে দেখল, অনেকে বসে আছে, ঢিলেঢালা ভাব।অস্টপ্রহর সংকীর্তন তো ছাড়া যাবে না মোটেই। তাই কিছু লোক চুইংগাম চিবোনোর মত ঘ্যানঘ্যান করে গেয়েই চলেছে। ঠাকুরজী নেই সেখানে।

তিন

       গুরুং ফ্যামিলির গেস্ট হাউসে প্রথম থেকেই গোটা জায়গাটার মদ্যিখানে দাঁড়িয়ে থাকা হেক্সাগন শেপের ঘরখানার দিকে চোখ পড়েছিল ভুলোমনার। মনে হয়েছিল, ওই ঘরটায় থাকতে পারলে বেশ হত। কিন্তু কেন যে গুরুং ভুলোমনার জন্য অন্য ঘর বেছে রেখেছিল কে জানে। ঘরটার তিনটে হেক্সাগনের হাতে তিনখানা কাঁচের জানলা। ঘরের মধ্যে আকাশের চাঁদও ঢুকে পরে বসে থাকে মাঝেমধ্যে। গোটা আকাশটা তখন ঘরের সিলিং হয়ে যায়।

অনেকদিন শুধু-মুদু ঘরটা নিয়ে ভেবে ভেবে ভুলোমনা একদিন দেবেন্দ্রকে জিজ্ঞেস করেই ফেলল। ওই ঘরটা কি বলত? কেউ থাকে না দেখি।        –ও তো হনিমুন স্যুইট। যারা হনিমুন করতে আসে তারা থাকে।

   –ও ।

মুহুর্তেই ঘরটার সম্পর্কে সব উৎসাহ হারিয়ে ফেলল ভুলোমনা।কেন যেন একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। তার অ-ঘরে থাকা হবে না, তার জন্য নয় ওই ঘর। ঘরটা যেন বিশেষভাবে ইন্দ্রনাথ আর লিপির জন্য রাখা আছে। ওরা সেখানে বসে হয়ত, জীবন কাটানোর উপায় স্বরূপ নানাবিধ কথা বলবে, হুইস্কি খেতে খেতে। এমনিভাবে ওরা প্রয়োজন আর প্রয়োজন মেটানোর দায় হিসাবে একটা বহুশ্রুত বহুচর্চিত প্রেমকে জন্ম দেবে, যে প্রেম সম্পর্কে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে ভুলোমনা। এমন কি সেদিন ঘটেছিল যে ভুলোমনা চিরকালের মত সেসবকে ভুলে যেতে চেয়ে নিজেকেই নির্বাসনে পাঠিয়ে দিল সেটা খুব ভাল মনে নেই ভুলোমনার। ব্যাপারটা ভাবতে চেষ্টা করলেই ক্যাও ম্যাও ক্যাও ম্যাও এরকম একটা জবরজং জগঝম্পের শব্দ পায় সে। কিছুই ঠিকঠিক মনে পড়ে না, শুধু অনেক অনেক আওয়াজ ছাড়া। কিন্তু বিষয়টা আজকাল ইন্টারেস্টিং লাগে ভুলোমনার। জানলে যেন বেশ হত। বেশ দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দর্শকের মতো নির্মোহ হয়ে দেখেশুনে নিতে পারত ও। যদিও যে বা যারা ভুলোমনাকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে তারা ঠিক নির্মোহ হবার জন্য নয়, প্রথমে সবকিছু থেকে দূরে নিরবচ্ছিন্ন বিশ্রামের মাধ্যমে তারা তাকে আবার আশা, নিরাশা, হতাশা, পাওয়ার জন্য সংগ্রাম এবং না পাওয়াকে নির্বিবাদে হজম করা এইসব বাগাড়া বাগাড়া যাতে ভুলোমনা রপ্ত করে আবার জীবনের মূলস্রোতে ফিরতে পারে তার কথাই ভেবেছে বোধহয়। 

বিশেষ করে ওই সামন্ত নামধারী লোকটা , যাকে সকলে ভাবে ভুলোমনার শুভাকাঙ্ক্ষী আর অ্যালবামে যার ছবি দেখা মাত্রই ভুলোমনা চোখ বুজিয়ে ফেলে এই ভয়ে যে বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকলে ভুলোমনা যেন লোকটার শরীরের হাড় , মাস, মজ্জা পর্যন্ত দেখে ফেলতে পারে।

     দেবেন্দ্রকে বলল ভুলোমনা, আজ বিকেলে কোথায় নিয়ে যাবে? দেবেন্দ্র মহা উৎসাহে বলল, সানসেট পয়েন্টে । 

     এই এক ছাতার মাথা সানসেট পয়েন্ট হয়েছে দেবেন্দ্রর। পাহাড়ি জায়গা হলেই বোধহয় সেখানে একটা সানসেট পয়েন্ট থাকতে হবে। আর এই মহা উৎসাহিত দেবেন্দ্রের সানসেট পয়েন্টটাতে গুষ্টির পিন্ডি কিচ্ছু নেই। সেখানে গিয়ে শুধু-মুদু দেবেন্দ্র পাহাড়ে পাহাড়ে একগাদা লাফালাফি করবে। 

   দেবেন্দ্র যথারীতি অজন্তা হাওয়াই ফটাস ফটাস করে গেছিল সানসেট পয়েন্ট-এ। সেই বিকেলেই পথঘাট মোটামুটি শুনসান। মাঝে মধ্যে গাড়ি যাচ্ছে একটা দুটো, আর কিছু কিছু বাইক। কাছাকাছির মধ্যে যে মণিহারি দোকানটা পরে, সেখানে বসে বাড়ির লোকজন গল্পগুজব করছে তাদের চুলবাধাঁ পরিপাটি করে। জামাকাপড় ফিটফাট। যেন তাদের সারাদিনের কাজকম্ম শেষ।  সন্ধ্যে বেলার কাজগুলো মুলতুবি আছে সন্ধ্যেবেলার জন্যই। সন্ধ্যে হলে আবার সকলে মিলে সেঁদিয়ে যাবে, ঘরের মধ্যে। যে দোকানে বসার, সে দোকানে বসে বসে উল বুনবে। বাকীরা ফটাফট লেগে যাবে কাজে। টি.ভি চলবে অনর্গল। ওদের হাতও চলবে অনর্গল। তারপর ঝুপ করে শীত নেমে আসবে। আর ওরাও সেঁধিয়ে যাবে, লেপ-কম্বলের মধ্যে। পাশাপাশি। ঘেঁষাঘেঁষি। পরদিন সকাল থেকে আবার একই কাজে জুটে যাবে সবাই। দিনের পর দিন নিজেদের মধ্যে জড়িয়ে-মড়িয়ে থাকাটা থেকে এরা সবচেয়ে বেশী জীবনীশক্তির রসদ পায়।

     দেবেন্দ্র এরকম নয়। ভুলোমনা দেখেছে দেবেন্দ্র সর্বঘটে কাঁঠালি কলার মত, সব জায়গায় দরকার মত কাজ করে যেতে পারে। কাজটা দেবেন্দ্র করে অকাতরেই। কাজটা ওর কাছে কাজ নাকি মজাদার কোন খেলা, এটা তেমন বোঝা যায় না। যেমন, সকাল হলে দেবেন্দ্র, চটি ফটফটিয়ে, বোর্ডারদের ঘরে ঘরে ফ্লাস্কে করে চা আর চায়ের কাপ দিয়ে আসে। এই যাওয়া-আসার পথে ভুলোমনার ঘরে সে একবার না একবার নক করবেই।        –উঠে পড়েছ দি?

   –উঁহু এখনো না।

   –উঠে পড়ো, এখন কিন্তু উঠে পড়ার সময় ।

   –টিং টিং ।

   –পাশের ঘরে বেল বাজিয়ে দেবে দেবেন্দ্র। ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবে, মিনারেল ওয়াটারের বোতল।

এইরকম একটা হিসেবি ছেলে যে কি করে অঙ্কে কাঁচা হয়! চলতে চলতে ভুলোমনা বলল, 

– আচ্ছা, বল দেখি, তোমরা তিন বন্ধু হোটেলে গেছ খেতে।

সঙ্গে সঙ্গে দেবেন্দ্র বলল, হোটেলের রান্না খেতে আমার ভাল লাগে না, হ্যাক থুঃ। 

প্রায় হুমড়ি খেয়ে দেবেন্দ্র রাস্তায় পড়ে পড়ে। 

ভুলোমনা বলল, আচ্ছা, ধরই না। সত্যিসত্যি তো যাওনি। ধর গেছ।        –আচ্ছা, গেছি।

   –আড়াইশো টাকার খাবার অর্ডার করেছ।

   –আড়াইশো টাকার খাবার অর্ডার করেছি ? কিন্তু চাচী আমাকে আড়াইশো টাকা দেবে না। সুরেন্দ্রর ভাইয়ার কাছ থেকে চাইতে হবে।

   –চাইতে হবে না। শোনোই না।

   –আচ্ছা, বল। চাইব না তো খাব কি করে?

   –দূর বাবা। সত্যি সত্যি তো যাওনি। মিছিমিছি গেছ। মিছিমিছি খেয়েছ।

   –আচ্ছা, মিছিমিছি।

   –হ্যাঁ । এবার হয়েছে কি তোমাদের তিনজনের কোনো একজনের কাছে একসঙ্গে আড়াইশো টাকা নেই। 

   –এ বাবা , টাকা নেই ! তাহলে আমি যাব না । 

   –আঃ যাবে, যাবে। দাঁড়াও না, শোনো না বাপু।

অজন্তা হাওয়াই ভর করে এক পাক মারতে মারতে দেবেন্দ্র বলল, আচ্ছা, বল।         –তোমরা তিনজনে তিনটে একশো টাকার নোট বার করে ওয়েটারকে দিলে। একশো, একশো, একশো, তিনশো।

   –আচ্ছা, বেশ দিলাম।

   –খাবারের দাম দেবার পর ওয়েটারকে তোমরা দিলে কুড়ি টাকা।

   –ও.কে ।

   –তোমাদের কাছে পড়ে রইল তিরিশ টাকা।

   –ও. কে।

   –সেই টাকাটা তোমরা দশ-দশ করে তিনজন মিলে নিলে।

   –বেশ।

   –তাহলে তোমাদের পার হেড খরচ হয়েছে নব্বুই টাকা।

   –হ্যাঁ।

   –নব্বুই গুন তিন হল গিয়ে দু’শ সত্তর টাকা।

   –হ্যাঁ।

   –ওয়েটারকে দিয়েছো কুড়ি টাকা মানে দু’শ নব্বুই।

   –হ্যাঁ।

   –তাহলে দশ টাকাটা কোথায় গেল?

   –তাইতো, দশ টাকাটা কোথায় গেল?

   –তুমি বল।

   –না, তুমি বল।

দেবেন্দ্র খানিকক্ষণ মাথা চুলকোলো । খানিক বিড়বিড় করল।        –দশ টাকা গেল কোথায়?

   –আচ্ছা, একদিন সময় দিলাম তোমায়। ভাবো তারপর জানাও।

   –দেবেন্দ্র একটা জ্যান্ত কালবোশ মাছের মত জালের মধ্যে খলবল করতে লাগল। বোঝাই যাচ্ছে কাল অবধি ওর পক্ষে অপেক্ষা করাটা ভারী আছে। ফিরেই ও সুরেন্দ্র ভাইয়াকে পাকড়ে জিজ্ঞেস করে ফেলবে। কিন্তু সুরেন্দ্র ভাইয়া মাথায় গাঁট্টা না মেরে তো সলভ্ করে দেবে বলে মনে হয় না। একটা পাহাড়ের ওপর তরতরিয়ে উঠে গেল দেবেন্দ্র। 

   –দশ টাকাটা কোথায় গেল?

পাহাড়ে পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনি হল , গেল গেল- গেল-গেল।

ভুলোমনা চেঁচিয়ে বলল,        –ভাবো।

   –ভাবো-ভাবো-ভাবো-ভাবো

   –ভেবে ভেবেও পাচ্ছি না।

   –পারবে। ভাবো।

   –আমার মাথায় অঙ্ক ঢোকে না।

   –হিসেব তো ঢোকে। কত কাপ চা, এক বোতল বিসলেরি কি করে হিসেব মেলাও?

প্রতিধ্বনি হল মেলাও মেলাও মেলাও মেলাও। দুনিয়ার হিসেব সবসময় মিলে যায়। পাহাড়ে পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে প্রকৃতি জানিয়ে দিল সেকথা।         –ওঃ, আমার হয়ে তুমি ভেবে দাও না ভুলোমনা। “ভুলোমনা” শব্দটা আছড়ে আছড়ে পড়তে লাগল শুধু ‘না’ হয়ে। না-না-না-না। 

   –কেন না?

   –আমিও ভাবতে পারি না তোমার মতন।ভাবতে না পেরে পেরে আমি ভুলে গেছি সব। ‘ব’ শব্দটা ফিরে এল ওদের কাছে। 

   –কেন, ভুলে গেছ , কেন ভাবতে পারো না তুমি? ‘মি’ ফিরে ফিরে এল ।

দু-হাত চোঙের মত করে ভুলোমনা ছুঁড়ে দিল উত্তরটা।

-ডিসোসিয়েটিভ অ্যামনেশিয়া । 

‘ য়া’ শব্দটা পাহাড়ে পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে আর্তনাদের মত শোনালো।

-ডিসোসিয়েটিভ অ্যামনেশিয়া।

দুটো হাত দু-পাশে ছড়িয়ে দিয়ে উর্ধমুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভুলোমনা চিৎকার করল,

-ডিসোসিয়েটিভ অ্যামনেশিয়া _হা__হা -হা ।

বুড়ো আঙুলে অজস্তা হাওয়াই টিপে ধরে দেবেন্দ্র তরতরিয়ে নামছিল, পাহাড়ের মাথা থেকে।

-চলো, আমরা বাড়ি যাব। চলো।

-চলো। কিন্তু রিডল্‌-এর উত্তর আমার চাই।

-তাই হবে। এখন চলো।

তড়িঘড়ি বলল দেবেন্দ্র!

দাবীটা করেই ভুলোমনা অনুভব করল, তার আসলে কিছু চাই না। না রিডল্‌-এর মানে না অন্য কিছু। তার

কিছু চাইবার নেই। এই খাওয়া-দাওয়া, ঘুমানোর জন্য একটা নিরাপদ জায়গা ছাড়া। এই যে আমার চাই-ই-এই

বোধটাকে ভয় পেতে শুরু করেছে ভুলোমনা। পরক্ষণেই মনে হল, না ঠিক ভয় নয় বোধহয়। এই দাবী-দাওয়াগুলোর অসারতা বুঝতে পেরে গেছে ও।

ফিরে আসতে আসতে ওরা দেখতে পেল, গতকাল থেকে যে নতুন একদল বোর্ডার এসেছে, তারা একটা ঢাউস গাড়ি করে হৈ-চৈ করতে করতে ফিরল কোথা থেকে যেন। ওরা আজ সকালবেলা ডাইনিং হলে

ব্রেকফাস্ট টেবিলে এসেছিল, ভীষণ নাক সিঁটকোত্ সিঁটকোতে । ওদের টেবিলে, কাঁসার বাটিতে বাটিতে কে

যেন ডাল রেখে গেছিল। একজন ঢুকে প্রথমেই বলল, ডাল খাব ? অর্থৎ এই সকাল সকাল ডাল খেতে যাব

কেন ? গুরুং প্রথমে ওদের কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করল। ভুলোমনা একমনে পুরি ভাজি খাচ্ছিল। আড়চোখে লক্ষ্য করল ওদের। ওদের মুখে একটা ক্ষ্যামাঘেন্নার ভাব গুরুংদের প্রতি। নাক-উঁচু গোছের মানুষ এরা। গুরুংদের যে পরিমাণ জমি-জমা, ক্ষেত, পশুখামার ইত্যাদি তাতে গুরুংরা এদের কয়েক গুষ্টিকে পুষতে পারে, সেটা সম্ভবত এরা জানে না। গুরুং খুব চটপট ওদের মর্জি বুঝে খাবার সার্ভ করে দিল। অথচ একবারও বলল না, যে ডালের কথাটা ওরাই বলেছিল।

গুরুংদের ডাইনিং হলটা একটা মজাদার জায়গা। খেতে বসার সঙ্গে সঙ্গে গোটা কয়েক ছেলে সুরেন্দ্র বা অন্য কেউ এসে আ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। গুরুং এবং তারা চটপট খাবার সার্ভ করে ফেলে। খেতে শুরু করলে গুরুং তাদের তদারকি করে, আর কিছু চাই কিনা ইত্যাদি। এ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ছেলেগুলো চটপট হুকুম তামিল করে। বস্তুতঃ বাসনমাজা, ঘর মোছার মত কাজ ছাড়া বাকী সব কাজই ওরা নিজেরাই বাড়ির সকলে মিলে করে।একটা পুরোনো আমলের বিশাল জয়েন্ট ফ্যামিলির ধরণে চলে গুরুংদের সবকিছু। আসলেই ওরা জয়েন্ট ফ্যামিলিই বটে, যার কিছু নিয়মকানুন আছে, যা সব সদস্যদের মেনে চলতে হয়। আর পরিবারের মাথা হচ্ছে পিসি। সে যেমন দাপুটে তেমনি ডাকসাইটে। আর পিসীও অতিথিদের যত্ন-আত্তি করেন একজন যথার্থ গৃহকর্তীর মতই। বয়ামে ভরা সব নানাধরণের আচার পিসি তৎবির করে জিজ্ঞেস করেন, এই আচারটা পরোটার সঙ্গে লাগত ভাল, অমুক আচার দিয়ে ডাল খেলে, খাওয়াটাটুকু হত ঠিক খাওয়ার মত খাওয়া । গুরুং তখন খুব গর্বের সঙ্গে জানায় যে আচারের মালমশলাগুলো ওদের ফার্মের আর আচারটা বানানোও হয়েছে বাড়িতে, ঘরোয়া পদ্ধতিতে । ঘি-টা যেমন গরুগুলোর দুধের ওপর পড়া মোটা সর জমিয়ে জমিয়ে বানানো হয়েছে ঘরেই। সব হোমমেড। গুরুং স্বয়ং দিল্লি থেকে এম.বি.এ করার পর এই ক্ষেতখামার সমেত গোটা বিজনেসটার তদারক করে। রিসর্টটার পাশেই গুরুংদের নিজস্ব পাহাড়ি বাড়ি। অতএব কাঠের তৈরি। সারা বাড়িভর্তি ছোট ছোট জানলা । আর তাতে রং-বেরং-এর রঙ করা। বোর্ডাররা যখন ডাইনিং হলে হাজির হয়, কি করে কে জানে, বাড়ি থেকে পিসি নিমেষে চলে আসে , তদারকি করতে। একাধারে উনি অতিথিদের মধুর স্বরে কথা বলেন। আর অন্যধারে এ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলোকে বকাবকি করেন। গজগজ করতে থাকেন ওদের নির্বুদ্ধিতার কথা ভেবে। অথচ সুরেন্দ্রই হোক আর দেবেন্দ্রই হোক কি অন্য কেউ, পিসির গজগজানিতে তাদের মধ্যে কোন বিশেষ হেলদোল দেখা যায় না। তারা হুকুম পালন করে মাত্র। পিসির

গজগজানির ব্যাপারটা ভাত, ডাল, ভাজির মতই এত স্বাভাবিক তাই নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না । রান্নাঘরেও চাচি মাঝেমধ্যেই চ্যাঁচামেচি করে, দেবেন্দ্র বা রাজ বা হীর-এর ওপর। কাউকে বকা হলে অন্য কেউ মাথা ঘামায় না, তারা তাদের

মত থাকে। অতএব, ভুলোমনা অনেক লক্ষ্য করে ভেবে দেখেছে, এদের বাড়িতে কে যে কার ছেলে, আর কে যে কার বাবা অথবা মা কিছুতেই বোঝবার জো নেই! যেকোন একজন বড়-র কাছে যে কোন একজন ছোট বকুনি খেয়ে যেতে পারে। এই বকুনি খাওয়া আর যারা বকুনি খাচ্ছে তাদের নিরুত্তাপ ভঙ্গি দেখে দেখে দেখে ভুলোমনার জব্বর লাগে। আগাগোড়া ব্যাপারটাই ভীষণ কনফিউজিং।

এরকম একটা মান্ধাতার আমলের একান্নবর্তী পরিবার আবার কি করে জগতে ফিরে আসতে পারে , নতুন মোড়কে, কিন্তু পুরনো মৃল্যবোধে, আগাগোড়া ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছিল ভুলোমনা। এদের দেখে আর দেখতে দেখতে এরকম কথাটা ভুলোমনা প্রায়ই ভাবে। এমনি একান্নবর্তী পরিবার ভুলোমনা কোথায় যেন দেখেছে।

ছবির মত ছায়া ছায়া। কিছুতেই তা মনে পড়ে না। কিন্ত দেখেছে, এটা নিশ্চয় মনে হয়। মেয়েরা সবাই অহোরাত্র ব্যস্ত। প্রত্যেকটা দিন যেন যজ্ঞি বাড়ি। এই মুটে মাথায় ঝুড়ি ভর্তি করে কাঁচাবাজার আনল। ডাঁই হয়ে থাকা কাঁচাবাজার তরকারি অনুযায়ী হিসেবনিকেশ করে করে কাটতে বসে গেল কয়েকজন। তিন-চার খানা বঁটিতে কচকচ করে কাটা হয়ে যাচ্ছে কাঁচাবাজার । এটা চচ্চড়ির, এটা ডালনার, এইটা দিয়ে ছেঁচকি মত হবে। ডালে পড়বে নারকোল কোরা। মাছের ঝোলের জন্য কাটা হচ্ছে ডুমো ডুমো করে আলু আর পটল। হাতবদল হয়ে কাটা সবজি চলে যাচ্ছে, যে রাঁধবে তার হাতে। বাকী সবজি গুছিয়ে তুলে রাখছে কেউ। জলখাবারের লুচি আর আলু ছেঁচকি বানানো রয়েছে। জলখাবারের পর্ব চুকলে রান্না শুরু হবে। দুপুর থেকে শুরু হয় আচার, পাঁপড় বানানোর ধুমধাড়াক্কা। ছাদে কাগজ পেতে পেতে শুঁকোতে দেওয়া হয়েছে পাঁপড়। আচার শুকোচ্ছে গামলায়।শিশি ভর্তি করে ভাঁড়ারে রাখা আছে নিমকি , নাড়ু চিঁড়েভাজা। ছেলেরা সব বিকেলের দিকে সাবড়ে দেবে সেসব। বিরামহীন এক সংসার যজ্ঞের চাকা যেন অবিরত ঘুরে চলেছে ঘড় ঘড় ঘড় ঘড়। ক্রমশঃ সেই ঘড়ঘড়ানির শব্দ ছাপিয়ে আওয়াজ উঠতে থাকে একটা বিদ্রোহ, বিদ্রোহের শব্দ যেন বা! বিদ্রোহেরও কি কোন শব্দ হয়? আসলে বিদ্রোহটা যে দানা বাঁধছে তার শোরগোল কানে আসে।

মুহূর্তে ভুলোমনার চোখের সামনে ব্যক্তিস্বাধীনতা, যৌধস্বার্থ, কালেকটিভ প্রপার্টি এইসব যত কঠিন কঠিন, কঠিন শব্দরা , বর্ম পরা অবস্থায় হাতে  বর্শা নিয়ে এসে দাঁড়ালো। 

এদের মধ্যে ঠোকাঠুকি লাগা  অবশ্যম্ভাবী বুঝতে পেরে ভীষণ ভয় পেয়ে গেল ভুলোমনা। আর তখনই বাগানের গেটের কাছ থেকে কে যেন চিল-চিৎকার করে কাকে ডাকতে থাকে মিঠুয়া-মিঠুয়া-আ-আ বলে। মুহূর্তে ঘুরে তাকাল ভুলোমনা। তার নাম ধরে তাকে কে ডাকছে? ও তো মোহিনী। তার নাম, তার নামই তো মিঠুয়া। একেকজন একেকরকম ভাবে ডাকত। কেউ বলত মিঠু, কেউ বলত মিঠি। সামন্ত বলত ,কে জানে সামন্ত কি বলত? তার জীবনের প্রধান শুভাকাঙ্ক্ষী  লোকটা সে কি বলত, আদৌ কিছু বলত কিনা, মনে পড়ছে না ভুলোমনার। অথচ ইন্দ্রনাথ ডাকত মিঠ্‌ঠুমিয়া বলে। আদরের ডাক।

এই ডাকটা  আদরের নাকি আদরের নামে ধান্দাবাজির তাই নিয়ে ঘোর  সন্দেহ আছে ভুলোমনার। বরাবরই সে ইন্দ্রনাথকে নিয়ে এই ধরণের একটা সন্দেহের মহা টানাপোড়েনে পড়ে। এখন নিজের নামটা ফিরে পাবার পরও ইন্দ্রনাথের সম্পর্কে সন্দেহের ধোয়াটা পাকিয়ে পাকিয়ে উঠল। 

মোহিনী মিলিয়ে যাবার পর সেই বিরাট উঠোনওয়ালা বাড়িটারও লোকজন কোথায় যেন চলে গেল। বাড়িটাতে তখন টিমটিম করে আলো জ্বলত সন্ধ্যাবেলা বাড়ীটীর মধ্যে থেকে ভেসে আসত শাঁখের আওয়াজ। গোঙনির  মত শুনতে লাগত সেটা। লোকবল হারিয়ে বাড়িটা এমন নিঝ্‌ঝুম আর অথর্বের মত হয়ে গেল মনে  হল একদিন বাড়িটা ঝুরঝুর করে বালির মত ঝরে পড়বে । বাড়িটার লোকজন সময় হওয়া মাত্রই যে যার মত জীবন খুঁজতে বেরিয়ে গেছিল। বাড়িটাও যদি ওমনি যেতে পারত, বেঁচে যেত বুড়ো হয়ে  যাওয়ার হাত থেকে। কালের হাতের ছোবল খাওয়ার হাত থেকে। গুরুংদেরও কি এইরকম হবে? হঠাৎ একদিন কে বা কারা একযোগে  একসঙ্গে রুখে দাঁড়াবে পিসির বিরুদ্ধে? খুব খারাপ হবে কি তাহলে? নাকি ভালই হবে একরকম । হয়ত এরা জানে মহাকাল কখন কালসাপ হয়ে উঠে ছোবল বসায়। তার হাত থেকে বাঁচার  ফিকিরও বের করে ফেলেছে সবাই। ভাল  আর খারাপের এই ঝুটঝামেলার মধ্যে গোল গোল পাক খেতে লাগল ভুলোমনা। সবকিছু গুলিয়ে গেল তার। একবার তার মনে হল, গুরুংদের এরকম কিছু হবে না। শীতের জায়গায় মানুষরা একা একা থাকতে পারে না। আর তারা মার-মুখো কম হয়। তারা ঘেঁষাঘেঁষি করে বাঁচতে ভালোবাসে ।

ভুলোমনা ভাবছিল, তার জন্য কোন বাঁচাটা ঠিক হবে। একা একা জীবনের সঙ্গে কানামাছি খেলতে খেলতে বাঁচা নাকি যৌথভাবে অনেকের সঙ্গে হড়বকত নানান পাঁচমেশালি বাঁচার মধ্যে ভুলে থেকে বাঁচা।

ভুলোমনার মনে হল, ইতিমধ্যে এই দু ধরণের বাঁচাই  সে যেন বেঁচে ফেলেছে। মানে মিঠুয়া নামের যে ভুলোমনা সে যেন বেঁচে ফেলেছে। সে আর ভুলোমনা একই মানুষ এটুকু ভুলোমনা এখন বুঝতে পারছে। এই দুইরকম বাঁচাই  ভুলোমনার মনে দুধরনের মোহজাল বিস্তার করছিল। সেই মোহজালের মধ্যে

ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে পড়ল ভুলোমনা। কাঠের বারান্দা বেঞ্চিটার ওপর ঘুমোচ্ছিল সে। কম্বলটা আস্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছিল তাকে। ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে ভুলোমনা ভাবল মানুষগুলো কেন যে, কম্বলের মত হয় না! কম্বলের মধ্যে একবার ঢুকলে আর বেরোতেই ইচ্ছে করে না। সত্যি সত্যি কোন মানুষ যদি এইরকম কম্বলের মত ভালবাসত ভুলোমনাকে, তাহলে হয়ত ও মিঠুয়াই থেকে যেতে পারত। 

অথচ মানুষের ভালবাসার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত আবেগের পর কেমন যেন একধরণের একঘেয়েমি, একটা বিচ্ছিন্নতার ভাব গ্রাস করে মনকে। মানুষের ভালবাসা বিরতি চায়, বিরতি দিতে হয় ভালবাসাকে। নয়তো সারাক্ষণ  একটা ভ্যাদভ্যাদে ভালবাসা ভীষণ চটচটে করে তোলে গা হাত পা মন ও মগজকে।

ইন্দ্রনাথের সঙ্গে এরকম একটা চটচটে ব্যাপারের মধ্যে যেতে পারেনি বলেই কোথাও একটা ক্ষীণ সুতো লেগে আছে। ইন্দ্রনাথের ওপর অনেক রাগ, অনেক অভিমান-অভিযোগ সত্ত্বেও  সবটা ছিঁড়ে যায়নি এখনও।এক, ভয়ানক রাত এসেছিল একদিন। সারা বাড়ির লোক ঘুমিয়ে গেলে ইন্দ্রনাথের কাছে চুপিচুপি চলে গেছিল ভুলোমনা। রাতবিরেতে।ইন্দ্রনাথ সেদিন রাতে ওদের বাড়িতে  থাকতে এসেছিল। সে ছিল মহা ঘোর দুর্যোগের রাত। ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হচ্ছিল সবকিছু। গাছ শেকড়শুদ্ধ উপড়ে পড়েছিল সর্বত্র। ইন্দ্রনাথের গাড়ি খারাপ হয়ে গেছিল। কারণ যেকোন মুহুর্তে গাছ উল্টে তাতে  চাপা পড়তে পারত মানুষ এবং বাড়ি ফেরা ছিল বিপজ্জনক।

ঘরে-বাইরে সর্বদাই বিপদ যেন ওত পেতেছিল। সময়টা ইন্দ্রনাথের জন্য ভাল যাচ্ছিল না। সেদিন আকাশ বাতাস আচ্ছন্ন করে সমুদ্রের ঢেউ-এর মত আছাড় খেয়ে পড়ছিল ঝড়। বাইরের সেই ঝড়  ইন্দ্রনাথের জীবনেও ভাঙচুর শুরু করে দিয়েছিল। ওমনি একটা ঝড়ে রাস্তাঘাট যখন ওলটপালট জীবনযাত্রা অচল প্রায়, ইন্দ্রনাথ জানাল সে ভুলোমনার বাড়িতে থাকতে চায়। কারণ বাড়ি ফেরা দায়। বেশ কতগুলো আবেগ পরপর খেলা করে গেছিল ভুলোমনার ভেতরে। প্রথমে দোনামনা, তারপর গররাজি ভাব, তারপর, ভয়ে অথবা কি বিপদে পড়া গেল এরকম ধরণের কেমন একটা মিশ্রিত উত্তেজনা, তারপর খানিকটা পরোপকার করার আবেগ এবং সর্বোপরি বিপদগ্রস্ত ইন্দ্রনাথ যে আর কোথাও না গিয়ে তার কাছেই সাহায্য চেয়েছে তার জন্য ইন্দ্রনাথের কাছে নিজেকে কি নাকি ভাবা। অথচ সবকিছু মিলিয়ে দেখে ভুলোমনা আবিষ্কার করেছিল, সে ইন্দ্রনাথকে ভালবাসে,জান-প্রাণ দিয়েই ভালবাসে।

সেই সন্ধে এবং রাতটা শেষমেশ হল বিড়ম্বনাময়। ইন্দ্রনাথের সঙ্গে মোলাকাতগুলো কেন যেন সবসময়ই

বিড়ম্বনাময় হত! দুজনেরই একসঙ্গে সময় কাটানোর আন্তরিক ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও  কেন যে একটা কালো রঙের ছায়া ইন্দ্রনাথের মধ্যে থেকে বেরিয়ে ভুলোমনাকে ঘিরে ফেলত কে জানে। অন্ততঃ এরকমই বারবার করে ঘটত বলেই ওর মনে হত।

আসলে সেই রাতে ভুলোমনার ধারণা হয়েছিল যে, সে একটা মহান কর্ম করছে এবং করছে অনেক অসুবিধে অগ্রাহ্য করে উপরোধে ঢেঁকি গিলে। খাওয়া-দাওয়ার পর ইন্দ্রনাথ গেস্টরুমে ঢুকে পড়ল। বলাই বাহুল্য এই সময়টা ছিল গল্পগুজব করার সময়। ইন্দ্রনাথ ভুলোমনাকে বলেছিল শরবত বানিয়ে আনতে। পুরোদস্তর খাওয়া-দাওয়ার পর আবার শরবত খাবার কি দরকার থাকতে পারে, এমনটাই মনে হচ্ছিল ভুলোমনার। আর ভুলোমনা আশ্চর্য হয়ে গেল দেখে যে, আসলে শরবতটার দরকার ছিল না, দরকার ছিল লিপির সঙ্গে কথা বলার। দরকার ছিল এটা জানানোর যে, গাড়িটা রাখার একটা সুবন্দোবস্ত করা গেছে। আর কিসব জরুরি,দরকারি, কেজো, সাংসারিক কথার মত কথা ছিল যেগুলো বলে নিতে পারলে দু-পক্ষই আশ্বস্ত হত। সেগুলো বলে নেওয়া গেল। সবটাই পাশের ঘর থেকে ভুলোমনা শুনে ফেলেছিল, যদিও না শোনাটাই বাঞ্ছনীয় ছিল। 

ভুলোমনার মনের মধ্যে কালোকালির পোঁচ  পড়ছিল। আর যেহেতু মনটাও ছিল একটা  পুরোদস্তুর মানুষ আর মোটা ব্রাশে  মারা কালিটাও তাই, ফলে দুজনের মধ্যে কি যেন সব ছাতার মাথা আদানপ্রদান চলছিল। তা সত্ত্বেও মিঠুয়া শরবত আনল এবং ইন্দ্রনাথ নির্ঘাত একদিন তাকে বুঝবে এই অক্ষম বিশ্বাসে ভর করে ইন্দ্রনাথকে অপার ক্ষমায় ভরিয়ে দিতে চাইল।

 মিঠুয়া যেটা বোঝেনি সেটা হল, আসলে ইন্দ্রনাথ কোনদিনই মিঠুয়া যেভাবে চায়, সেভাবে তাকে চাইবে না। ইন্দ্রনাথ তাকে চাইবে, তবে সেটা তার মত করে। তাতে মিঠুয়ার পোষালে পোষাবে, না পোষালে না পোষাবে । সেটা একান্তভাবেই মিঠুয়ার সমস্যা ।

সেইরাত ক্রমে গভীর হয়ে এলো। ইন্দ্রনাথ অপেক্ষায় ছিল ভুলোমনার আর ভুলোমনা ইন্দ্রনাথের। 

অল্পবয়সী সদ্য ফুটে ওঠা তারুণ্যের বশবর্তী ছিল তাদের মন। আর শরীর ছিল বয়স্ক লোকেদের মতন। তাই অধীর অপেক্ষা আর মানসিক দুর্যোগের টানাপোড়েনে ইন্দ্রনাথ ঘুমিয়ে পড়ল। ভুলোমনা ইন্দ্রনাথের কাছে এল, গুটিগুটি। আর ইন্দ্রনাথ নিমেষে ঘুমের ঘোর কাটিয়ে টেনে নিল ভুলোমনাকে। মিঠ্ঠুমিয়া । 

খুব সহজেই ঘুমিয়ে পড়তে পারত ইন্দ্রনাথ। বাস্তব থেকে পালাতে। কারণ, বাস্তবিক জীবনে ইন্দ্রনাথ চাইত ক্ষমতা, আধিপত্য। এসব চাওয়ার জন্য লিপিকে ওর ভীষণ দরকার ছিল। কারণ, লিপির মধ্যেই ও খুঁজে পেয়েছিল বাস্তবিকভাবে  সেই নারীকে, একজন পুরুষের সফলতার জন্য যে শক্তপোক্ত কাঠামো হয়ে দাঁড়িয়ে যেতে পারবে। আর বিনিময়ে লিপি একটা উড়ন্ত প্রজাপতি হয়ে ইন্দ্রনাথের চারধারে নেচে নেচে ইন্দ্রনাথের সফলতা উপভোগ করবে। ওরা খুব সুন্দরভাবে দুজন দুজনের ঢাক পেটাতে পারত। একজন যদি ডাড্ডা নাকুর, ডাড্ডা নাকুর বলত তো অপরজন কাঁই নানা, কাঁইনানা শব্দে অন্য মানুষদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলত। এমন রাজযোটক যোগ খুব কমই হয়।

কিন্তু ভুলোমনাটা ছিল কোন আহাম্মকদের দলের সদস্য যে, যার ইন্দ্রনাথের মধ্যে এক জীবনের চাহিদা মেটানোর জন্য হাঁচোড়-পাঁচোড় করা মানুষটাকে দেখে অসহায় মনে হত। মনে হত, নিজেরই তৈরি করা জালের জট খুলতে খুলতে সে ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, আর জটগুলো এমন ছ্যাঁচড়া প্রকৃতির যে একটা জায়গায় খুলতে গেলে আরেকটা জায়গায় জট পড়ে যায়। আর ইন্দ্রনাথের পোড়া কপাল যে,  ইন্দ্রনাথ কেবলই ঘোর ঘোর লাল লাল চোখে অবিরত জট ছাড়াতে বাধ্য হত।  

ভুলোমনার মনটা একটা অলীক মায়ায় ভরে উঠত। মায়ার মধ্যে ভরা ছিল করুণা। করুণার বশবর্তী হয়ে কাউকে ভালবাসা যায় না। সে ভালবাসায় অনেক ভুল থাকে। এসব ভুলোমনা কোথা থেকে যেন শিখেছিল । আপনি আপনিই । ওই যে জীবন কাটাতে গেলে অনেকগুলো ঘটনাবহুল দিন কাটাতে হয় , সেই রকম সব দিন কাটাতে কাটাতে ভুলোমনা ভালোবাসা বা না-বাসার বা সঠিক কিম্বা বেঠিকভাবে ভালোবাসার একখানা জবরদস্ত তত্ত্ব খাড়া করেছিল , এতশত হয়ত না করলেও চলত । 

অতএব এইসব মর্হাঘ্য ধারণাগুলো বগলদাবা করে নিয়ে ভুলোমনা ভালোবাসতে বসল । তখন হয়তোবা আড়াল থেকে কেউ বলেছিল ট্রেসপাসার্স উইল বি প্রসিকিউটেড । আর ভুলোমনার কান অবধি পৌঁছোয়নি সেকথা । কিন্তু কানে পৌঁছোবেনা তা কি হতে পারে ? কথাগুলো কানের পর্দায় ধাক্কা খেয়েছিল । সেই স্টিমুলাস নিশ্চয় আলোড়ন তুলে স্নায়ুগুলোর মধ্যে দিয়ে পৌঁছেছিল ব্রেনে । কিন্তু ভুলোমনার মন ব্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ইন্দ্রনাথেতে আচ্ছন্ন্ ছিল । তার মন তখন যিশাস ক্রাইস্ট হবার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল , যে কিনা ইন্দ্রনাথকে মুক্তি দেবে । অতএব কথাগুলো মর্মে পৌঁছোয়নি তার । 

চার

   ক্রমশঃ দম আটকে আসছিল। বাথরুমটা সত্যিই এত নোংরা ও দুর্গন্ধময়। অথচ দুর্গন্ধটা নাকে আসছিল না। এটা সেই পরিচিত বাড়িটার দোতলার বাথরুম, যেটা ছিল ভুলোমনার স্বপ্নের বাথরুম।এই বাথরুমের শুকনো মেঝেতে কতবার চিৎপাত হয়ে শুয়ে শুয়ে আকাশকুসুম ভেবেছে সে ।সেই বাথরুমটাকে প্রাণপণে পরিষ্কার করবার চেষ্টা করেছিল সে। ভারতীয় পদ্ধতির প্যান ছিল সেটা। ছ্যাতলা পড়ে পড়ে লালচে হয়ে গেছিল। গু জমে ছিল।

    গর্তের মধ্যে পড়ে গেছিল চিরুনী। ভুলোমনার রোখ চেপে গেল। সে মারাত্মকভাবে ঘষাঘষি করে আজ গু-এর বংশকে নির্বংশ করবেই। এমনি পণ করে বসল। ফলে ব্লিচিং-এ, অ্যাসিড-এ তার হাত খসখসে হয়ে যাচ্ছিল। প্রাণপণে বাথরুম পরিষ্কার করে যাচ্ছিল ভুলোমনা। বাথরুমটার এমন একটা জায়গাও ছিল না যেটা একটু পরিষ্কার।সাধের বাথরুমের এ অবস্থা কেন সম্ভবত এই প্রশ্নটাই ভুলোমনাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে কুরে কুরে খাচ্ছিল। চিরুনীটা বার করা গেল অবশেষে। জমা জলের একটা হিল্লে হল। একটা মরণ-বাঁচন লড়াই-এর শেষে হাঁফ ছেড়ে নিঃশ্বাস ফেলার কথা। কিন্তু কাহিল হওয়া হালাত নিয়ে ভুলোমনা দেখল নাক বন্ধ, হাত পা ভেজা খসখসে, বুকে চাপ, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।

      ঘুম ভেঙে দেখল শ্বাসকষ্ট সত্যিই হচ্ছিল ভুলোমনার।ফলে,কম্বলটা সরিয়ে নিঃশ্বাস নেবার জন্য গুরুংদের দেওয়া ঘরটাতে শুয়ে শুয়ে হাওয়া হাতরালো সে। গভীর অন্ধকার ছিল তখন। রাতের অন্ধকারের পরতে পরতে পাহাড়ি অন্ধকার ঢুকে ঘাপটি মেরে বসেছিল। এইরকম অন্ধকারের রাজ্যে সব ভুলে যাওয়া ভুলোমনা নিজেকে খুঁজে পায়।তাই সে অন্ধকার পছন্দ করে। কিন্তু এখন তার দরকার ছিল হাওয়া। ওগো, হাওয়া কি নেই ভরা পৃথিবীতে? হাওয়া দাও, হাওয়া। আর্তনাদ করছি।এ কেমন স্বপ্ন? নোংরার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে গিয়ে আরও নোংরায় নিমজ্জিত হওয়া। এর থেকে পালাতে পালাতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে ভুলোমনার।আর তখনই বেবাক ভুলে যেতে হবে ক্রমশঃ একটু একটু করে নোংরায় ডুবে যাবার কথা। মন আর নিতে পারবে না। সে ঘুমিয়ে পড়বে একটা বিশাল সময়ের জন্য।

 আপাতত ভুলোমনা চাইছিল হাঁপরের মত শ্বাস টেনে নিতে ।সে কিছুক্ষণ খাটের ওপর বসে রইল। দরজা খুলে প্রকৃতির শরণাপন্ন হল না মোটেও। কারণ ঘরের ভেতরকার গরম আর বাইরের ঠাণ্ডার তফাতটা শ্বাসকষ্ট বাড়িয়ে দিতে পারে। বসার পর ধীরে ধীরে শ্বাসকষ্ট কমে আসছিল ভুলোমনার। এইসময় দরকার ছিল স্যালবেয়ার জাতীয় ইনহেলারের । যে ইনহেলারটা ভুলোমনার ওষুধের বাক্সে গাদাখানেক ওষুধের ভিড়ে পড়ে থাকে। সেটাকে দুচোক্ষে দেখতে পারে না ভুলোমনা। ওটার জন্য ওরাল থ্রাস হয় বলে ভুলোমনার ধারণা। 

 হঠাৎই ভুলোমনার ফিক্ করে একটু হাসি পেল। হাসির কারণ ইন্দ্রনাথ। ইন্দ্রনাথকে যদি এ সময় জিজ্ঞেস করা হত, কেমন আছেন, সে নির্ঘাৎ গলাটাকে বেমক্কা গম্ভীর করে উত্তর দিত, দিব্য আছি। ঘোরতর ঝকমারির মধ্যেও ইন্দ্রনাথের অভ্যেস হল, গর্বের সঙ্গে উত্তর দেওয়া আ-মি দিব্য আছি । ভুলোমনার মনে হত, ভীষণ ঝুটঝামেলা অপমান ও হেনস্থার মধ্যে আকাশের মেঘের ওপর বসে বসে পা দোলাচ্ছে ইন্দ্রনাথ।মেঘ এখানেও কত। গায়ের ওপর দিয়ে ভেসে ভেসে চলে যায়। হাত দিয়ে মেঘ ধরে দেখেছে ভুলোমনা। আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে যায়। নাক দিয়ে নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে দেখেছে। নাকের মধ্যে দিয়ে যদি কিছুটা মেঘ ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলা যায়। আঙুলের ফাঁকে ঢুকে থাকার মত অন্ধকারের ফাঁকে অন্ধকার সেঁধিয়ে থাকা এ রাতে একা একা ভুলোমনার আবার খুব হাসি পেল। হাসিটা পেল নিজের কথা ভেবে। নাক দিয়ে জবরদস্তি পেটে মেঘ ভরে ফেলার মত একটা প্রেমকেও ভুলোমনা নিজের মধ্যে আত্মসাৎ করার চেষ্টায় ছিল। প্রেমটা মেঘের মতনই ফস্কে গেছে। 

   হঠাৎ খুব জেদ চাপল ভুলোমনার ।এই যে আধ্যাখ্যাঁচড়া মনে পড়া, স্মৃতি খামচে বেড়ানো, এরকমভাবে আর কত! এর একটা সরাহা হওয়া দরকার। অতীত বলে একটা জিনিস আছে, যেটা ভুলোমনা প্রায় হারিয়ে বসে আছে। তার একটা বর্তমান আছে এবং বর্তমানটা তার কাছে যথেষ্ট। একটা ভবিষ্যৎ ওত পেতে বসে থাকার মত তার সামনে থাবা গেড়ে বসে আছে, যাকে নিয়ে ভুলোমনার মাথাব্যথা নেই আদৌ। সে বর্তমানে আছে, বর্তমানেই মজে আছে। এভাবে থেকে যাওয়া যায়। এই থাকাটা বেশ। এটা অনেকটা চিকুর মত থাকা। বর্তমান সর্বস্য জীবন। কিন্তু ভুলোমনা সমাজবদ্ধ জীব। অন্তত সমাজ মাঝে মাঝে উনুনের মধ্যেকার কয়লা উসকানোর মত এই কথাটা ভুলোমনাকে জানিয়ে দেয়। তখন ভুলোমনার মন উসখুস করে। তার একটা অতীত ছিল, যেটা খামচা খামচা করে মুছে গেছে। কোন এক সামন্ত তার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়ে বসে আছে। সেই সামন্ত মাঝে মধ্যে ফোন করে। টাকাকড়ির খোঁজখবর নেয়। ওষুধপত্রের।কখনও কখনও নতুন কোন খবর দেওয়ার  চেষ্টা করে। যেমন সোনামনিকে মনে আছে তো? সোনামণি? খুব ভালো গান করত। গান গাইতে গাইতে আপনা আপনি তার চোখ দিয়ে জল পড়ত। অথচ, গলা ধরে যেত না। আরে, যাকে তুমি বলতে জলজ্যান্ত সিনেমা। সিনেমাই বটে। কারণ, তোমার মনে হত ওরকম সিনেমাতেই হয়। দৌঁড়ায়, কাঁদে, নাচে, কিন্তু এতকিছুর সঙ্গে গান গাইতে গলা ধরে না, হাঁপায় না…একটু পজ দিয়ে সামন্ত বলল, মনে পড়ছে?

   খুব নিস্পৃহ গলায় বলল ভুলোমনা-তো, হয়েছেটা কি? সামন্ত আরও উৎসাহের সঙ্গে বলল, মনে পড়ছে ? ভুলোমনা আরও নিস্পৃহ গলায় বলল, প্লিজ, কাম টু দ্য পয়েন্ট। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। একটা ছোট্ট হাই তুলল ভুলোমনা। বেগতিক দেখে সামন্ত বলল, না, না, ঠিক আছে। ওই বলছিলাম আরকি! সোনামণির একটা বাচ্চা হয়েছে। তুমি দেখলে… শেষ করতে না দিয়ে ভুলোমনা বলল, আচ্ছা, রাখছি।খুবই ক্লান্ত লাগছিল তার। বড় ক্লান্তি! কি করত সে মানে মিঠুয়া, সোনামণির বাচ্চাকে দেখলে? সামন্ত এমন ভাবে বলছিল যেন হাড়িতে জল ভর্তি করে রাখা মাগুর মাছের মত খলবল খলবল করে উঠত।

 আরেকটা ছোট্ট হাই চাপতে চাপতে ভুলোমনা সুটকেস খুলল। সুটকেসটা সে বড় একটা খোলে না। কারণ, দরকারি সব জিনিসই থাকে তার ওয়ার্ডরোবে। সুটকেসে পড়ে থাকে কখনও সখনও দরকার হতে পারে এমন কিছু জিনিসপত্র। যেমন একটা দড়ি, মোমবাতি, দেশলাই একটা আপেল কাটার ছুরি, যত্ত সব। একটা ঢাউস এ্যালবাম আছে। তাতে মান্ধাতার আমল থেকে ইদানিংকাল অবধি বাছাই করা যত ছবি সাজিয়ে গুছিয়ে সামন্ত তাকে দিয়েছে। যদি এ্যালবাম উল্টে পাল্টে ভুলোমনার ভুলোপনা কিছু কমে। অ্যালবাম পারতপক্ষে ভুলোমনা দেখে না। দেখতে বিরক্তি লাগে। এ্যালবাম খোলামাত্রই সার সার মুখ বেরোলো। অনেক মুখ চেনা, আধ চেনা, অথবা চেনা-চেনা। কিন্তু মুখগুলো সম্পর্কে কোন আগ্রহবোধ করল না ভুলোমনা। এমন খটখটে শুকনো চড়া-পড়া মন কবে থেকে তার হল কে জানে! ঘটনাগুলো চেষ্টা করলেই মনে পড়বে। হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। কোলে ন্যাড়ামাথা পিকা। তার দাদার মেয়ে। তার মুখে ভাত হচ্ছে। তাকে সাতসকালে তার কচি মাথা দাড়ি কামানোর রেজার দিয়ে ন্যাড়া করেছিল বাবা। সে সময় বাবা বেদম টেনশনে ছিল।পিকাটা ছিল মহা বজ্জাত। ছোটবেলা থেকেই মেথরের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব ছিল। সে প্রায়ই মেথরটার ঝ্যাঁটা ধরে টানাটানি করত। আর মেথরটা পাছে ছোঁয়াছুঁয়ি হয়ে যায় সেই ভয়ে কাক তাড়ানোর মত করে হুস হুস করে পিকাকে তাড়াত। মেথরটার বদ্ধমূল ধারণা ছিল, সে নীচু জাত, তাকে পিকা ছুঁলে নিশ্চয় পিকার জাত যাবে। জাত আবার কোথায় যাবে! জাত কি করে যায়? পিকা নিশ্চিন্তমনে বেধড়ক বদমাইশি করে যেত।

বিষয়টা মজার। এরকম অসংখ্য মজার কিম্বা অমজার বিষয় অ্যালবামটার যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিল।

অ্যালবাম উল্টোতে উল্টোতে সেই বাড়িটা বেরোলো। যার বাথরুম পরিষ্কার করতে গিয়ে ভুলোমনা গোটা স্বপ্নটায় নাজেহাল হচ্ছিল। বাড়িটা ওরই । এই বাড়িটা চেনা। একসময় এই বাড়িটায় মহাসুখে দিন কেটেছে ভুলোমনার। একসময় বাড়িটার সামনে দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেন হচ্ছিল। সেই সুবাদে লম্বা লম্বা গর্ত খুঁড়ে দু-পাশে তাগাড় করা মাটি উঁচু করে রাখা ছিল। মাটিতে দেখতে পাওয়া যেত অজস্র শামুকের খোল।মিঠুয়াদের খেলাই ছিল রোজ বিকেলে সারা বিকেল জুড়ে সুন্দর সুন্দর শামুকের খোল খুঁজে বেড়ানো। সে যে কি এক নেশা চেপে বসেছিল। জীবনের সমস্ত উদ্দেশ্য যেন গিয়ে জড়ো হয়ে বসেছিল শামুকের পেছনে। এক বিকেলে বেভুল হয়ে ঝিনুক, শামুক খুঁজে মরছিল ভুলোমনা যে তখন আসলে মিঠুয়া ছিল। হঠাৎ পা স্লিপ করে হড়কে যায়। মোহিনীর পা ধরে ঝুলছিল সে। সেই পা-টা ছিল একমাত্র উঠে আসার রাস্তা। মোহিনীর চিৎকারে অন্যরা ছুটে এসে টেনে হিঁচড়ে তুলেছিল মিঠুয়াকে।

 সারা অ্যালবামে কোথাও ইন্দ্রনাথের ছবি নেই। থাকার কথাও নয় অবশ্য।ইন্দ্রনাথ ভুলোমনার কাছে ছিল লুকিয়ে রাখা জিনিস। সঙ্গোপনে। কোন প্রমাণ থাকবে না, তার আর ইন্দ্রনাথের মধ্যে কি হয়েছিল বা কি হতে হতেও হয়নি। ইন্দ্রনাথ ভুলোমনাকে আড়াল করে রাখত, তার জীবনে। তার কিছু কারণ হয়ত লিপি। লিপির সঙ্গে লিভ টুগেদারের ঝুটঝামলা ঢোকাতে ইন্দ্রনাথ চাইত না।অথচ এখন স্মৃতির টুকরোর সুতো ধরে গর্তে পড়ে থাকা ভুলেমনা অ্যালবামটাকে জলাঞ্জলি দিয়ে একমাত্র ইন্দ্রনাথের স্মৃতির টুকরো হাতড়ে হাঁচড়ো-পাঁচোড় করে উঠে আসার চেষ্টা করছে। শেষমেশ বাস্তবে ফিরে আসার একটা মরিয়া চেষ্টা ভুলোমনা করবেই, যদিও এখন সেই আন্ডরগ্রাউন্ড ড্রেন হওয়ার বিশাল টানেলটা, যেটা ছিল নোংরা জলে ভর্তি, অন্ধকার ও স্যাঁতসাঁতে,যাতে কিলবিল করছিল নানা ধরণের পোকা , ভুলোমনার মন সেখানেই আটকে ছিল ।  জীবনের প্রতি আর কোন আগ্রহ ভুলোমনা বোধ করছিল না। আবার মিঠুয়া হয়ে সেই জীবনে ফিরতে তার অসম্ভব ক্লান্ত লাগছিল। কিন্তু বাস্তবটা তার জানার এক অদম্য ইচ্ছে তাকে পেয়ে বসে ছিল। বাস্তবটাকে জেনে তারপর তাকে পোশাকের মত খুলে ফেলে সে এগিয়ে যেতে চাইছিল একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।কিন্তু ভুলোমনাকে ভাবনায় পেল। ছোটবেলায় ভাবনা। তার খেলুড়েদের ভাবনা।

 ছোটবেলায় তাদের মধ্যে একটা মজার খেলা ছিল। মোহিনী ছিল তাদের দলকর্তা। সে রোজ খানিকটা দৌড়ে গিয়ে তার বা-হাত আর ডান দুদিকে ছড়িয়ে দিত। আর ওরা ছুট্টে গিয়ে দুদিক থেকে দুজন মোহিনীর হাত ধরত। যারা যেদিন হাত ধরতে পারত তারা নিজেদের সেদিনকার মত গর্বিত বোধ করত। কত সহজেই তখন আনন্দগুলো ভুসভুস করে আকাশে উড়ে বেড়াত। হাত পাতলেই আনন্দরা উড়তে থাকা কার্পাস তুলোর মত হাতের চেটোয় এসে পড়ত।

 সেদিন গেছে। তবে সেসব দিনেও মধ্যে মধ্যে রাক্ষুসীরানীর অবির্ভাব ঘটত। বিভিন্ন রূপে । একবার খেলুড়েদের মধ্যে এক রাক্ষুসীরাণী এসে পড়ল।মোহিনীর ডানহাতের হকদার হল সে। মোহিনী বিনা প্রচেষ্টায় তার ডানহাতটা তাকে ছেড়ে দিয়ে কৃতার্থ বোধ করল। সেই রাক্ষুসী যথার্থ অর্থে রাক্ষুসীই ছিল যায় নাম ছিল মিলন। কেন কে জানে মিঠুয়ার ওপর সে উঠল ক্ষেপে। বলল, তার এমন লোক জানা আছে যে তাদের বাড়ি থেকে তাদের বাবা-মা শুদ্ধ ঘাড় ধরে উচ্ছেদ করতে পারে, তারপরেও সে ক্ষান্ত হল না, সে বলল, লরি ডেকে নাকি বাড়ির ইঁটগুলোও গুণে গুণে তুলে নিয়ে যেতে হবে। এই অসম্ভব ভয়ের কথায় মিঠুয়া প্রথমে শিহরিত হল, তারপর ঝরঝর কেঁদে ফেলল। দৌড়ে সে বাড়ি চলে গেল। অজানা ভয়ঙ্কর ভয়ে সে বারান্দায় এসে খেলুড়েদের দেখল। দেখল, মিলন ওকে ভ্যাঙচাচ্ছে। ‘একজনের বাড়ি ভাঙা হবে’। তাজ্জব হয়ে দেখল অন্যরা কেউ তার প্রতিবাদ করছে না। আবার তারা যে আদৌ খুব বিচলিত তা-ও মনে হচ্ছে না । যেন একটা অত্যন্ত আম ঘটনার মত এটা শেষ হবে।

    তারা প্রতিক্রিয়াহীন! মিঠুয়া আরেক চোট কাঁদল। তারপর মিঠুয়া কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে গিয়ে তাদের আসন্ন দুঃসময়ের কথা সবিস্তারে বলল। কিন্তু মা সামান্যই শুনলেন। আর অত্যন্ত ঠাণ্ডা গলায় বললেন, শুধু শুধু কেউ এরকম করবে কেন? লোকের খেয়ে-দেয়ে অনেক কাজ আছে। আর এসব করা এত সোজা নাকি? তুমি কত বোকা, কেঁদে মরছ!

 মিঠয়া  কেঁদে কেঁদে বলল, আমি ওদের সঙ্গে খেলব না। ততোধিক নিস্পৃহ গলায় মা বলল, খেলিস না যা। ঝামেলা মিটে গেল। মিঠুয়া যখন হাইড্রেনে পড়ে যাচ্ছিল।তখন কিন্তু এই মিলনই আরও খেলুড়েদের সঙ্গে পরিমড়ি দৌড়ে এসে হেঁইয়ো বলে মিঠুয়াকে টেনে তুলেছিল।

 অ্যালবামে খেলুড়েদের সকলের ছবি নেই। মিলনের একটা ছবি থাকলে ভাল হত। বড় হতে হতে বুঝেছিল মিঠয়া বড় দুঃখে না বুঝে-সুঝে মিলন রাক্ষুসীরাণী হয়ে গেছিল। সেটা আরেকটা গল্প।কিন্তু মিলনের জীবনের খুঁটিনাটি ভুলোমনার চোখের সামনে উঠে এল। একবার দেখা হলে সে মিলনের দিকে শুধু একবার তাকাত। সেই তাকানোর মধ্যে দিয়ে মিলনকে বলত, আমি আছি তোর জন্য।

 এমন একটা ঘোরতর সম্ভাবনা  ঘটবে কি ঘটবে না, তার নেই ঠিক, সম্ভাবনাটা ভুলোমনার ভাবনা হয়ে তার পাশে নেচে নেচে বেড়াচ্ছিল। ভুলোমনা মিছিমিছি বসে বসে ভাবনাটার সঙ্গে একটু কানামাছি ভোঁ ভোঁ খেলল। অ্যালবামে মা আছে। মায়ের ছবিগুলোর ওপরে হাত রাখল ভুলোমনা। ছবিটাকে ছুঁল সে। আর সঙ্গে সঙ্গে একরাশ ঘুম এসে ছেঁকে ধরল তাকে। মা মানে ঘুম।মা মানে মনের আরাম। মা মানে পরম শান্তি। মা মানে আর কিছু মনে না পড়া। মা মানে কিছু মনে পড়ার দরকার না হওয়া। পাহাড়ে তখনও চাঁদ ডোবেনি। অথচ সুর্যের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। প্রকৃতি পাশ ফিরছিল আসলে তাই ভুলোমনাও পাশ ফিরল। অ্যালবাম বন্ধ করে ছিল সে আবার তলিয়ে গেল গাঢ় ঘুমে।

পাঁচ

           সন্ধেবেলাটা ছিল মোমো বানানোর মরশুম। চাচীর কাছে টেকনিকটা শিখে নিচ্ছিল ভুলোমনা। ময়দার লেচিটা বেলতে হবে খুব পাতলা করে। তা নাহলে মোমো হবে মোটা । মোড়কের জায়গাটা বিচ্ছিরি হয়ে থাকবে। বেশী পুর দেওয়া যাবে না আবার। তাহলে মোমো সেদ্ধ হবার সময় ফেটে যাবার উপক্রম হবে। রাশি রাশি মোমো বানানো হল। তাল তাল ময়দা মাখাই ছিল। একজন ক্রমাগত লেচি কেটে গেল। একজন লেচিগুলোকে গোল্লা পাকালো। দুজন বেলতে থাকল। আর দুজন চাচী আর ভুলোমনা ক্রমাগত পুর পুরে মোমো বানিয়ে গেল। এক জন ফটাফট স্টাফ্ট মোমো গুলোকে সাজাতে লাগল। সাজানোর কাজগুলো করছিল দেবেন্দ্র আর আরেক ভাই হীর। সে ছিল খুবই গম্ভীর প্রকৃতির। কথা কম কাজ বেশী ছিল বোধহয় তার জীবনের মোটো । সে হাসতও কম।অবশ্য পাহাড়ীরা হাসে কম এটা লক্ষ্য করে দেখেছে ভুলোমনা। ভয়ঙ্কর সিরিয়াস মুখ করে থাকে। ব্যক্তিত্ব বজায় রাখে তারা ওইভাবে। অথচ রাস্তাঘাটে দেখো, যখন কাজে বেরিয়েছে একা , এমনিই হয়ত দাঁড়িয়ে আছে, তখন সাজির মত ব্যাগ নিয়ে সুন্দর সুন্দর হাওয়াই চটি-পরা মেয়েগুলো হেসে হেসেই সারা হয়। যাকে দেখে , তাকে দেখেই হাসে! বাচ্চাগুলোও তাই, কোত্থেকে যে এত হাসি তাদের পায় কে জানে? গাড়ি দেখলে লাফিয়ে লাফিয়ে হাততালি দিয়ে দিয়ে হাসে।

 গুরুং হাসে-টাসে।তবে গুরং-এর হাসি শহুরেদের হাসির মত। উচ্চশিক্ষিত পোঁচপড়া শহুরে ম্যানেজমেন্ট রপ্ত করার পর গুরং-এর হাসি পাল্টে গেছে খোদ পাহাড়ীদের হাসির থেকে। গুরং-এর সঙ্গে সঙ্গে ডাইনিং হলে অ্যাটেনেশনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা রাজ ভাইয়া সুরেন্দ্র ভাইয়া হীর বা বাকী সব এ বি সি ডি ছেলেদের দলও হাসে না। তারা নিঃশব্দে মানুষ বুঝে নেয় এবং কর্তব্যে অটল থাকে। এদের মধ্যে শহুরে ছাপ স্পষ্ট নয় তত, কিন্তু পড়াশুনোর ছাপ স্পষ্ট।

 এইসব অগাধ গাম্ভীর্য আর হাসিমুখ পাহাড়ীদের মাঝখানে ভুলোমনার ভুলোপনার শেষ হয় না। পাহাড় তাকে ডাকে, আয়, আয়। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সূর্য ডোবে। ঝুপ করে সন্ধ্যা নামে পাহাড়ে। হঠাৎ নিঝঝুম হয়ে যায় পাহাড়। আর বাড়িতে বাড়িতে কাজের ধরণ নিমেষে যায় বদলে।

 দেবেন্দ্র একাকার হয়ে থাকে, এসব কিছুর মধ্যে। মনের সুখে থাকে।খায়-দায়, গান গায়, তাইরে নাইরে না জীবন। তাইরে নাইরে না করতে করতেই পরিশ্রমও করে যায় দেবেন্দ্র। যেন যে কাজটা করছে সেটা এই প্রকৃতির মত স্বাভাবিক, স্বচ্ছন্দ।

 মোমো বানাতে বানাতে একসময় চাচী বলে, ব্যাস হয়ে গেছে।কত মোমো তখন বানানো হল কে জানে? চারশো পাচশো? বোর্ডাররা খাবে সব।ভুলোমনাকে নেশায় ধরেছিল মোমো বানানোর।মোমোর গঠনশৈলী নিয়ে গভীর ভাবনাচিন্তায় মগ্ন ছিল ভুলোমনা। কিন্তু চাচীর ‘ব্যস হয়ে গেছে’ বলার মধ্যে এমন একটা কম্যান্ড ছিল ভুলোমনাকে উঠতেই হল। এদের বাড়ির মহিলারা খুব সহজে কম্যান্ড করতে পারে। এটা বোধহয় বহুলোক একসঙ্গে একান্নবর্তী হয়ে থাকার ঝামেলায় স্ট্রাগল ফর এগজিসটেন্সের কারণে। স্ট্রাগল ফর এগজিসটেন্সে জিনিসটাকে খুব খারাপ লাগে ভুলোমনার। আমি এগজিস্ট করছি, সেটা স্বইচ্ছায় না অনিচ্ছায় সেটা সম্পর্কে কোন প্রমাণ নেই। প্রথমে, জবরদস্তি ধরে নিতেই হবে, আমার এগজিস্ট করাটাই দারুণ একটা বড়সড় ল্যাপার। ব্যাপারটার একটা গভীর অর্থ আছে।অর্থটা যে কি সেটা আমি বুঝি বা না বুঝি সেটার একটা নির্ঘাৎ অর্থ আছে। এটা একটা হাইপোথিসিস। তারপর আমার কাজ হল, সারাজীবন ধরে হাবিজাবি নানান ঝামেলায় জড়িয়ে সেই অর্থটাকে খুঁজে বের করা। খুঁজে বের করার প্রতিটা পদক্ষেপ বেশ স্ট্রাগলসাম। তবুও স্বইচ্ছায় সেই স্ট্রাগলকে ঘাড়ে করে নিয়ে খামোখা লড়াই করতে করতে বেঁচে থাকাকে বলে স্ট্রাগল ফর এগজিসটেন্স। 

 ভুলোমনা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে পাথুরে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে উঠতে দেখল, গুরুং হন্তদন্ত হয়ে অফিস ঘরের দিকে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে গুরুং নানা ধরণের কাজের মধ্যে আছে।ভুলোমনাকে দেখে হাসল গুরং।ভুলোমনা বলল, বুঝতে পেরে গেছি।

 গুরুং বলল, কি?

 দুটো হাতের চেটো দেখিয়ে ভুলোমনা বলল, মোমোর লেচিটা কতটা পাতলা করে বেলতে হবে সেটা।গুরুং হাসল।

অফিস ঘর আর গুরুংদের বাড়ির মদ্যিখানে লাগোয়া যে বৈঠকখানা ঘরটা আছে, সেখান থেকে চার-পাঁচজন লোক বেরিয়ে চলে যাচ্ছিল। লোকগুলো যেতে আশ্চর্যজনকভাবে মাথা নাড়াচ্ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল ওরা যেন নিজের মনে কি ভাবছে।কে জানে হয়ত, স্ট্রাগল ফর এগজিস্টেন্সের অর্থ খুঁজে বেড়াচ্ছে।মনে হচ্ছিল, অর্থটা সম্ভবত তখুনি তখুনি ওদের মাথায় ঢুকেছে ।তাদের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে ভুলোমনা গুরুংকে বলল, ওরা কারা?

-ওরা আশেপাশের লোকজন। কাছেপিঠেই থাকে।

-এখানে ওরা দল বেঁধে কি করছিল?

-ওরা ঠাকুরজীর কাছে এসেছিল।

এই সেই ঠাকুরজী যায় জন্য কিছুদিন আগেই তিনদিন ধরে সংকীর্তন চলছিল।সেই ভয়ানক জগঝম্প এখন থেমেছে। চতুর্দিক শান্ত এবং ঝলমলে। ভুলোমনা গুরুংকে জিজ্ঞেস করল,

-ঠাকুরজী মানুষটা আসলে কে?

প্রশ্নটা করার পর ভুলোমনা দেখল, গুরুং-এর মধ্যে আর সেই ব্যস্ত ব্যস্ত ভাবটা দেখা যাচ্ছে না।এমনিতেও ভুলোমনার সঙ্গে সবসময় গুরুং ধৈর্য্য ধরে কথা বলে। সম্ভবতঃ গুরুং-এর ধারণা ভুলোমনা একজন অসুস্থ মানুষ। তাই তার সঙ্গে কথাবার্তা বলাটা জরুরী । ডাক্তারেরা বলে থাকে, মানসিকরোগীদের পক্ষে একা থাকা নিরাপদ নয়।একা হলেই তারা প্রচুর আগদুম-বাগদুম ভাবনাচিন্তা করতে শুরু করতে পারে! তার কুফলস্বরূপ তার অসুস্থতা বেড়ে যেতে পারে। গুরুং লোকটা অতিরিক্ত বুদ্ধিমান। তাই এতসব মাথায় রাখতে পারে। আবার এও হতে পারে, যে সামন্ত হয়ত গুরুংকে এইসব বলে-কয়ে রেখেছে।গুরুং বেশ রয়ে সয়ে একটা পাথুরে বসার জায়গার ওপরে বসে ভুলোমনাকে বলল,

-ঠাকুরজী আসলে একজন রিমপোচে। উনি রি-ইনকারনেটেউ, মানে…

ভুলোমনা গুরুং-কে থামিয়ে বলল,

 -যিনি নিজের ইচ্ছেয় পুর্নবার জন্মগ্রহণ করেছেন, মুক্তপুরুষ হয়েও।

 -হ্যাঁ ।আই মিন, আমরা সকলেই বিশ্বাস করি উনি রি-ইনকারনেটেউ।

 -হয়ত, রি-ইনকারনেশন ব্যাপারটা হিন্দুধর্মে বা বৌদ্ধধর্মে থাকলেও অনেক হিন্দুই এটা তেমন বিশ্বাস করে না ।ভুলোমনা আবার গুরুংকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল, আমি করি! আমি মনে করি পুনর্জন্ম হয়। সজ্ঞানে, যা ওই রিমপোচের হয়েছে বা অজ্ঞানে যা আমার বা তোমার হয়েছে। কিন্ত, উনি যে একজন সত্যিকারের রি- ইনকারনেশন হওয়া মুক্ত বুদ্ধ আত্মা, তার প্রমাণ কি?

 গুরুং একটুও দ্বিধা না করে, শান্তস্বরে ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বলল, ‘উনি রি-ইনকারনেটেড, তার প্রমাণ আছে।

-যেরকম?

-সাধারণতঃ এরকম কেউ জন্মালে তার জন্মের পরেই তার বাবা-মা কোন না কোন কারণে মারা যায়। ওনার বাবা-মা মারা গেছিল!

এরকম কাণ্ড কাকতালীয় হতেই পারে। সাধারণ লোকে এগুলোকে কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের যুক্তিবাদী প্রমাণ করতে ভালবাসে।যেন সবার ওপরে যুক্তি শ্রেষ্ঠ তাহার ওপরে নাই।

ভুলোমনার গুরং-এর কথাগুলোকে কাকতালীয় ভাবতে ইচ্ছে করছিল না। তার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল ।  সে পুনর্জন্মে বিশ্বাস করে।এ জন্মের যে গাদাগুচ্ছের কথা সে ভুলে মেরে বসে আছে, পুনর্জন্মে চাইলে সে সব মনেও করা যেতে পারে। মনে করা যেতে পারে, এমনকি ছাতার মাথা হয়েছিল যে তার মস্তিষ্কের কিছুটা অংশ গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। ভুলোমনা হাত-পা নেড়ে জেগে নড়েচড়ে বেড়ালেও সে জাগছে না!

ভুলোমনা বলল, এ জন্মে বসে বসে পরের জন্মগুলোর  অ্যাকশন রিপ্লে দেখতে পাওয়া, ব্যাপারটা মজা পাওয়ার জন্য বেশ ভাল।বাবা-মা মারা যাওয়া ছাড়া আর কি কি প্রমাণ আছে যে, উনি রি-ইনকারনেটেড।

গুরুং বলল, আছে। শরীরের মধ্যে কিছু চিহ্ন, যেটা আমরা তেমন বুঝি না। আর কিছু ব্যবহার, যেমন রিমপোচে তিন বছর বয়সে আগাগোড়া গীতা মুখস্ত বলতেন।উনি উপনিষদ থেকে অনর্গল শ্লোক আবৃত্তি করতে পারতেন এবং তার মানে ব্যাখ্যা করে পণ্ডিতদেরও খুব সহজে বুঝিয়ে দিতে পারতেন। উনি ছিলেন অসম্ভব রকমের নির্লোভ। খুব ছোটো থেকেই কারুর অসুখ করলে অত্যন্ত সহজভাবে উনি তার সেবা-শুশ্রূষা করতেন।এ ব্যাপারে তাকে শিখিয়ে দিতে হত না। আর এছাড়া উনি ছিলেন শ্রুতিধর। যে কোন জিনিস একবার শুনলেই মনে রাখতে পারতেন, এখনও পারেন।

 এই সমস্ত কথাই ভুলোমনার ঘোরতর ভাবে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হল। সে বিশ্বাস করল। বিশ্বাস করার পর সে খুব আরাম বোধ করল। কোন সংশয় নেই। সব উপদ্রবকারী অবিশ্বাসগুলো ভয় পেয়ে পেছু হটে অশরীরীর মত মিলিয়ে গেছে। সেইসব ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া অবিশ্বাসগুলো বোকার মত ইতস্তত প্রকৃতিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।তারা এমন মানুষদের অপেক্ষায় আছে যাদের ঘাড়ে তারা ভুতের মতন ভর করতে পারে। তারপর সেই মানুষগুলোর মাথার পোকা নড়িয়ে তাদের অবিশ্বাসী বুদ্ধিগুলো দিয়ে চালিয়ে তারা মহানন্দে রাজত্ব করবে।তাদের মাথায় ঘিলু খুঁটে খেয়ে অবিশ্বাসগুলোর এত রমরমা হবে, যেন তারা চুলের মধ্যে, বাড়বাড়ন্ত হতে থাকা উকুন।

 ভুলোমনা এইসব বাজে অবিশ্বাসগুলোকে বিদায় করে গুরুংকে বলল, বিশ্বাসে মিলায়ে বস্ত্তু তর্কে বহুদূর! বলেই তার মনে পড়ে গেল, শিব যখন সতীকে কাঁধে নিয়ে ধেই ধেই করে তান্ডব নৃত্য জুড়েছিল, এসব গল্প ভুলোমনাকে বলত তার ঠাকুমা। ভুলোমনা কেবলই তাকে জিজ্ঞেস করত, এসব সত্যি ঘটেছে ? ঠাকুমা নির্দ্বিধায় বলত, হ্যাঁ, একেবারে সত্যি। ভুলোমনার রোখ চেপে যেত। কে বলেছে তোমায়? কেউ দেখেছে? ঠাকুমা তর্ক করতেন না।বলত, সব সত্যি। সমুদ্র মম্থন সত্যি। দক্ষযজ্ঞ সত্যি। নৃসিংহ অবতার সত্যি। সব সত্যি। তখন ঠাকুমার মুখে ভুলোমনা শুনেছিল ওই প্রবাদটা।বিশ্বাসে মিলায়ে বস্তু, তর্কে বহু দূর । সে গুরুংকে বলল, আমাকে দেখাবে রিমপোচে কে? গুরুং বলল, হ্যাঁ নিশ্চয়। কেন নয়? এসো। গুরুংকে দেখে মনে হচ্ছিল সে একটা কাজের মতো কাজ পেয়েছে এবং সেটা করতে চলেছে। আবার দু-পা হেঁটে ঘরে ঢুকে যদি দেখা যায় রিমপোচে নেই, তাহলেও গুরুং-এর কোনো আফশোস হবে না। সে ধরেই নেবে, রিমপোচেই জানে সে কখন কার সঙ্গে দেখা করবে বা আদৌ দেখা করবে কিনা! গুরুং-এর হাতে কিছুই নেই অতএব তার উদ্বেগের কিছু নেই।

 কিন্তু রিমপোচেকে পাওয়া গেল, ঘরের মধ্যেই। তিনি সশরীরে বসে আছেন ঘর আলো করে। একটা চৌকির ওপরে জাজিম পাতা। তার ওপর আসনের মত কিছু। রিমপোচে বসে আছেন বৌদ্ধ লামাদের মত হলুদ রঙের কাপড়ের ওপরে মেরুন রঙের জোব্বা ও চাদর গায়ে দিয়ে। গুরুংরা নাকি হিন্দু ? রিমপোচে তবে কি? হিন্দু না বৌদ্ধ? যাকগে, যা খুশী হোক সে, সেটা নিয়ে মাথা ঘামাবার মত কিছু নেই। তার ঘরে ফায়ারপ্লেসের তাকের ওপর ক্যান্ডেল স্ট্যান্ডের ওপর মোমবাতি লাগানো। কিউরিও শপে পাওয়া যাওয়া আইটেমগুলোর মত করে ঘরটা সাজানো। সারা ঘরে চাইনিজ ডিজাইনের কার্পেট পাতা। সোফা রয়েছে একধারে। সোফার ওপরেও কার্পেটের আসন পাতা। সারা ঘরে রমরম করছে শীতের ছোঁয়া। ভেড়ার লোমের চাদর, ইয়াকের হাড় দিয়ে তৈরি ডিব্বা, চামচে, ধূপদানী। সাদা সিল্কের মাফলার, যেগুলো কোনো বোর্ডার গেস্টহাউস ছেড়ে রওনা হওয়ার সময় গুরুংরা গলায় পরিয়ে দেয়। বলে, যাত্রা শুভ হোক। সাদা সিল্কের কাপড়ের মাফলারগুলো নাকি অত্যন্ত শুভ।

 রিমপোচে তাকাল ভুলোমনার দিকে।ভুলোমনা তাঁর পা ছুঁল।নিমেষে আসনের তলা থেকে বেরিয়ে এল তিনশ টাকা। ভুলোমনার হাতে দিয়ে রিমপোচে বলল, রাখো। ভোজবাজির মত। ভুলোমনা দেখল আসনের তলায় এরকম রাশি রাশি টাকা ছড়ানো আছে। আর স্বচ্ছন্দে সেগুলো রিমপোচে বিলিয়ে দিচ্ছে মানুষদের। মানুষরাই এরকম দশহাজার, বিশ হাজার টাকা প্রণামী হিসেবে রিমপোচেকে দিয়ে যায়। যেমন স্বচ্ছন্দে রিমপোচে সেসব গ্রহণ করে, তেমনি স্বচ্ছন্দে রিমপোচে সেগুলো দু-হাতে বিলোয়। বেশ মজাদার মানুষ একজন। ভুলোমনার মনে হল, সে এক মস্ত শিশুসুলভ ব্যক্তিত্বের সামনে এসে পড়েছে।

 রিমপোচে হাসলেন ভুলোমনাকে দেখে। বললেন, সমতলের মানুষ পাহাড়ে এসেছো ?  ভুলোমনা বলল, হ্যাঁ।

-কেমন লাগছে জায়গাখানা?

-ভুলোমনা বলল, বেশ। রিমপোচে হাসলেন। বললেন, কালই বেড়াতে বেরিয়ে এই দ্যাখো না, এই পাথরটা পেয়েছি। সাদার মধ্যে কালোর ছিটে। আমার ভাড়ী পছন্দ হল। তাই কুড়িয়ে নিয়ে এলাম। দেখবে, বেড়াতে বেরিয়ে আরও কত কি এরকম পছন্দসই জিনিস পাই। ওহে,ওই বাটিটা দাও তো। রিমপোচের হুকুম পাওয়ামাত্র একজন তটস্থ ভঙ্গিতে হুকুম পালন করার জন্য তৎপর হল। রিমপোচের হুকুম! সে কি যে সে কথা! ভয়, ভক্তি এবং শ্রদ্ধা মিশে সে এমন এক জগাখিচুড়ির মিশেল হয়েছিল তাজ্জব হয়ে গেল ভুলোমনা। সে ভাবল, এই শিশুর মত মানুষটিকে এরা এত ভয় পাচ্ছে কেন ? গুরুং সেখানে ছিল না। ভুলোমনাকে পৌঁছে দিয়েই পালিয়ে গেছিল।মানে, সেও বেজায় সম্ভ্রমে কাবু হয়ে পড়েছিল । 

 রিমপোচে বাটি পেয়ে মহাখুশী। বিভিন্ন সাইজ এবং শেপের একটা একটা করে পাথর তুলে দেখাতে লাগলেন ভুলোমনাকে। বাটি থেকে বেরোলো একটা ছিপি, কোনো বোতলের হবে হয়ত, অথচ চকচক করছে। এইটা পেয়েছি। তুলে ধরলেন রিমপোচে। ভুলোমনা কাছে এসে বসল। চৌকির কাছে। তার খুবই পছন্দ হচ্ছিল ব্যাপারস্যাপারগুলো।

 এই প্রত্যেকটা কুরিয়ে পাওয়া পাথর বা জিনিসগুলোর পেছনে একটা করে গল্প আছে। চাইলে আমরা সেই গল্পগুলো বানাতে পারি। সে বলল রিমপোচেকে। রিমপোচে বলল, কি মজার? একটা গল্প বল তো শুনি। এই ধর এইটা।

 তিনটে ফ্যাকড়া বেরোনো শুকনো মত ছোট একটা কাঠের টুকরো, কোন গাছের ডাল হবে সেইটা সে দিল ভুলোমনাকে। ভুলোমনা বলল, কাঠঠোকরা গর্ত করছিল গাছটার গায়ে থাকবে বলে। তখন কাঠঠোকরার ঠোঁটের আঘাতে খসে পড়ে একটা। দেখুন, কিরকম চেঁচে দেওয়া ভাব কাঠটায়। এটা পড়েছিল গাছের নিচে।তার ওপর শিশির পড়ে ভেজা ভেজা আর বৃষ্টি।তারপর একদিন এমন রোদ ওঠে, কাঠের টুকরো শুকিয়ে মুচমুচে হয়ে গেল। দুটো লোক তাকে মাড়িয়ে চলে গেল একজনের পায়ের ধাক্কায় সে একটু রাস্তার দিকে এসে পড়েছিল, এমন সময় তুমি ওকে পাও। 

 ছেলেমানুষের মত হাততালি দিয়ে হেসে উঠল রিমপোচে।আর ভুলোমনা অবাক হয়ে ভাবল, সমস্ত সম্ভ্রম ভুলে সে কিভাবে তুমি বলে ফেলল, রিমপোচেকে।

 দুজনে মিলে যখন এরকম ভীষণ খেলায় মশগুল, তখন রিমপোচে বলল, স্কোয়াশ, আদেশ পালনের মত করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে একটা গোটা স্কোয়াশের বোতল এনে হাজির করল। রিমপোচে বলল, ওকে দাও। ও মাঝে মাঝে খাবে।

তারপর রিমপোচে ওকে একটা সাদা সিক্লের মাফলার পরিয়ে দিল। ভুলোমনার মনে হচ্ছিল সে আর রিমপোচে বন্ধু হয়ে গেছে নিশ্চয়। কিন্তু মাফলার পরার সঙ্গে সঙ্গে একরাশ সম্ভ্রম গ্রাস করল ভুলোমনাকে। তার মনে হল, হঠাৎ কোত্থেকে একটা পাহার প্রমাণ দূরত্ব এসে দাঁড়িয়ে পড়ল, তাদের সামনে। রিমপোচের চোখে চোখ রাখল সে। আর কথাটা বলল, মনে মনে, কেন এরকম করলে?

 রিমপোচে তার দিকে তাকাল। একটা ধুনি এগিয়ে দিল তার সামনে। সেখানে থেকে অগরুর গন্ধ বেরোচ্ছিল। তার ভাপ নিল ভুলোমনার দুহাত বাড়িয়ে। মনে মনে, তাকে কে যেন বলল, দূরে না গেলে কাছে আসছ বুঝবে কি করে? চমকে উঠল ভুলোমনা। একটা চামর উঠিয়ে ভুলোমনার মাথায় ছোঁয়ালো রিমপোচে তখনই ভুলোমনা টের পেল, সে অনন্তকাল রিমপোচের সামনে বসে থাকলেও রিমপোচে ওকে যেতে বলবে না। আর তখনই সে উঠে পড়ল, টাকা আর স্কোয়াশ নিয়ে। সে রওনা হল তার ঘরের দিকে। তার খুব গভীরভাবে জন্মান্তরে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করল। আর তখনই দড়াম দড়াম করে হাতুড়ির ঘা পড়ল বুকে। ইন্দ্রনাথ জন্মান্তর মানে না।

ছয়

     ইন্দ্রনাথ জন্মান্তর মানে না।তার ইচ্ছে হয় না, তাই মানে না । মানবার মধ্যে সে কোনো যুক্তি খুঁজে পায় না। তার যা চাই, তা এই জন্মেই চাই। এই শরীরে চাই। এই মন দিয়ে সে সেই পাওয়াটাকে সেলিব্রেট করতে চায়। একবার এই দেহ নষ্ট হয়ে গেলে, তার তখন সব যাবে। সে তখন থাকল কি থাকল না, সেটা সে বুঝবে কিনা কে জানে? অতশত সুদুর ভাবনা তাই সে ভাবত না। তাকে হাসিল করতে হবে যা কিছু সে চায়, আর সেই হাসিল করার পদ্ধতি নিয়ে ভেবে ভেবে সে দিন কাটাত।

 ভুলোমনা যদিও তখন ভুলোমনা হয়নি সে ছিল মিঠুয়া , তবুও ভুলোমনার কাছে ইন্দ্রনাথ ছিল একটা চ্যাপ্টার, যাকে আদ্যপ্রান্ত পড়ে ফেলতে হবে।

 রিমপোচের কাছ থেকে ফিরতে ফিরতে ভুলোমনা দেখল ঘন কুয়াশা হয়েছে। মেঘ নেমে এসেছে চারপাশে। মনে হয় বৃষ্টি হবে। চোখের সামনে যে পাহাড়ের ঢাল সব ঢেকে গেছে ঘন কুয়াশায়। ধোঁয়া ধোঁয়া পৃথিবী, ধোঁয়া ধোঁয়া জগৎ, কে ভেদ করবে এর রহস্য !

 ভুলোমনা তার কেবিনে ঢুকে এল। কাঁচের শার্সি দিয়ে বাইরেটা দেখল। বাইরে সব হারানোর দেশ। অথচ সেখানে তার যা হারিয়ে গেছে, তাই খুঁজতে এসেছে সে। নিঃশ্বাসের ভাপ দিল সে শার্সিতে। সেখানটা উঠল ঘেমে। সেখানে, ভুলোমনা লিখল ইন্দ্রনাথ। বারবার ঘুরে ফিরে কেন ইন্দ্রনাথই আসে তার স্বপ্নে, চিন্তায়, মনে ! অ্যালবাম ভর্তি এত মানুষ, কই তারা তো এমন চোদ্দবার করে হানা দেয় না ভুলোমনার মাথায় ! সেই ঘেমে ওঠা শার্সিতে ভুলোমনা দেখতে পেল একটা টেবিলে মুখোমুখি ইন্দ্রনাথ আর সে বসে আছে। যেন তার পুর্বজন্ম!

 চেহারাটা ছিল ভুলোমনারই। আর ঘটনাগুলো গলগল করে কালো ধোঁয়ার মত বেরিয়ে আসছিল শার্সির ওপরে। পুর্বজন্মই বটে ! ভুলোমনার মত চেহারার এক মানুষী ইন্দ্রনাথ নামধারী এক মানুষের সঙ্গে বসে আছে।সিনেমার মত চেয়ারের সামনে কি সব নড়াচড়া করছে…ঘরটার উজ্জল আলো, টেবিলচেয়ার ইত্যাদি। কেমন অফিস অফিস পরিবেশ।গম্ভীর মুখে কড়া গলায় ইন্দ্রনাথ ওকে জিজ্ঞেস করছে আপনি স্মোক করেন? ড্রিঙ্ক করেন ? ভুলোমনা ভয় পাওয়া পাখির মতো ঘাড় নেড়ে নেড়ে কেঁপে কেঁপে না বলছে। অভিমানে ভারী হয়ে যাচ্ছে বুক। মনে হচ্ছে আমাকে দেখে কি এসব মনে হয় ! যেন বোঝা উচিত ছিল ও স্মোক করে না, ড্রিঙ্ক করে না। এসব যেন গায়ে লেখা থাকে। ভাল মেয়ে মার্কা একটা স্ট্যাম্প তার গায়ে মারা আছে বলেই তার ধারণা।তার সঙ্গে… স্মোকিং-ড্রিঙ্কিং এসব মোটে যায় না। সে যে ভাল মেয়ে এই সহজ সত্যিটা এই লোকটা বুঝতে পারছে না কেন? অবশেষে লোকটা নরম হয়ে পড়ে। লোকটা মানে অবধারিত ভাবেই ইন্দ্রনাথ। নরম সুরে সে বলে, আপনাকে আমি তুমিই বলছি। মনে হচ্ছে অনেক ছোট। আপনি কিছু মনে করছেন না তো?…

-না।(উহ্য) এতে মন করাকরির কি আছে?

-মনে করছেন না তো? বারবার তিনবার। তিন সত্যি করল ভুলোমনা। মনে করছে না সে কিছু।বেয়ারাটাকে ডেকে ইন্দ্রনাথ একটা কিছু কুরিয়্যর করতে পাঠাল।নাকি জেরক্স? নাকি অন্য কিছু। মনে পড়ছে না। ঘরের দরজাটাকে খুলে দিতে বলল। বেয়ারাটা ফিরে এলে দরজাটা বন্ধ করে দিতে বলল। এইরকম দরজা খোলা এবং বন্ধ পর্ব বারবার চলল। ভুলোমনার মনে হল, দরজা খোলা রাখা আর বন্ধ করা নিয়ে লোকটা অযথাই বেশী বাড়াবাড়ি করছে। বেয়ারাটা না থাকাকালীন দরজাটা খোলা রাখছে। যাতে সে বন্ধ ঘরে ইন্দ্রনাথেকে ভয় না পায়। এমনটাই মনে করল সে। এইসময় ইন্দ্রনাথ বলল, তোমার বাঁ হাতে যে চুড়িটা পরে আছো, সেটা সবসময় পরে থাকো তুমি? এইরকম একটা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন শুনে বেজায় অবাক হল ভুলোমনা। ভুলোমনা নয় মিঠুয়া। ওখানে যে গেছিল সে ভুলোমনা ছিল না, মিঠুয়া ছিল। মিঠুয়া দেখল চুড়িটাকে। বলল, এটা চুড়ি নয়। ইন্দ্রনাথ বলল, জানি, এটাকে বলে নোয়া। সবসময় পরে থাকো তুমি?

 এইসময় ঘরের আধো অন্ধকারের মধ্যে হতচকিত অবস্থায় ভুলোমনা নিজের বাঁ হাতটা হাতরালো । সেখানে নেই ওই চুড়িটা যার পোষাকি নাম নোয়া। 

           জোরে ধাক্কা খেল ভুলোমনা। বাইরে কড়কড় করে বাজ পড়ল যেন তুমুল দামাল এক পাহাড়ী ঝড় উঠেছে চতুর্দিকে । অন্ধকারে পাহাড়ের গায়ে আটকানো বিশাল আকৃতির গাছগুলো যেন মাথা ঠুকে ঠুকে মরছে। ঘরের মধ্যে নিজের একটা ভোঁতা হয়ে যাওয়া মাথা নিয়ে মিঠুয়ার শরীরের মধ্যে বসে থেকে থেকে ভুলোমনা ভাবল, সে কি বিবাহিত ছিল ?

 এক্ষুনি অ্যালবাম দেখা দরকার। কিন্তু অ্যালবাম খুলতে ইচ্ছে করছে না। আবার কতগুলো সারি সারি মুখের মিছিল দেখতে হবে। যে মুখগুলো মিঠুয়ার জগতে ছিল। তার জগতে নেই। আমি তবে কে? নিজেকে বড় অসহায়ের মত প্রশ্ন করল ভুলোমনা।

 মোবাইলে রিং বাজছে ভীষণভাবে। ভুলোমনা নিজের মোবাইলটা খুঁজল। না তার নয়। মিঠুয়ার মোবাইল বাজছে।স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে ইন্দ্রনাথ।ইন্দ্রনাথ ফোন করে কি হ্যাবজা-গ্যাবজা বলছে। কোন একটা প্রেমকাহিনী বলছে, যেটা বিরহেণ সমাপয়েৎ । ইন্দ্রনাথের বেশীরভাগ প্রেমকাহিনীই বিরহেণ সমাপয়েৎ। সব মেয়েই ভয়ঙ্কর ধরণের আকর্ষণীয়া। কোন না কোন দিক দিয়ে। অথচ তারা ইন্দ্রনাথের পেছনে দৌড়োদৌড়ি করছে, কাজকম্ম ছেড়ে এইরকম বক্তব্য ইন্দ্রনাথের। সেইরকম একটা মেয়ে একই কোচিনে পড়ত ইন্দ্রনাথের সঙ্গে। 

-তো কিভাবে প্রোপোজ করলেন বলুন?

-আমি প্রোপোজ করিনি। শোনো, একটা কথা জেনে রাখো। আমি আজ অবধি কোনো মেয়েকে কখনও প্রোপোজ করিনি।

-তবে কি তারা আপনাকে আদেখলার মত প্রোপোজ করেছে।

-অফ কোর্স।

-আচ্ছা, বলুন, এই শ্রেয়সী না কে, এ কিভাবে প্রোপোজ করল?

-আরে, আমি তো কোচিনে খাতা জমা দিয়েছিলাম। খাতার ওপর আমার বাড়ির ল্যান্ডলাইন নম্বরটা লিখে দিয়েছিলাম। তো শ্রেয়সী সেটা দেখে নেয়। ব্যস।

-ব্যস !

-তারপর ফোন করে নির্ঘাৎ বোকাবোকা কথা শুরু করলেন? 

-আমি করিনি। শ্রেয়সী করেছিল। ও একটু বোকা টাইপেরই ছিল।

-আপনি তো কিছুই করেননি। ধোয়া তুলসীপাতা কোথাকার। তো তারপর কি হল?

-শ্রেয়সীর ছোড়দা প্রচণ্ড রাগারাগি করে আমাকে গুন্ডা, বদমাশ ইত্যাদি বলল বাড়িতে।আর বাড়ির লোক শ্রেয়সীকে অন্য লোকের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিল।

-আর আপনি বসে বসে আঙুল চুষলেন?

-না না, তা কেন? আমি বিদিষার সঙ্গে প্রেম করতে শুরু করে দিলাম।

-বাঃ, ভাল ভাল। তা ইদানিং এই বুড়ো বয়সে শ্রেয়সী এসে আদিখ্যেতা করছে কেন?

-ও, প্রথমে বলতে এসেছিল যে, ও ভুল করেছিল। তারপর ও খুব ভাল রান্না করে তো? তাই আমাকে খাওয়াবে বলল। আর টিফিন কেরিয়ার ভর্তি করে নিজে রেঁধে নিয়ে এল।

-এই, এটা কিন্ত শরৎচন্দ্রমার্কা বোকা বোকা মেয়েগুলোর মতো হয়ে যাচ্ছে।        – হয়ে গেলে হয়ে যাচ্ছে। তুমি তো আর আমাকে বিশ্বাস করবে না।

   – আপনাকে বিশ্বাস করার মতো সত্যি কোনো কারণ ঘটেনি। আমি তো বুঝতেই পারছি না, মেয়েরা সারাক্ষণ আপনার পেছনে হেদিয়ে মরছে,আর আপনি কেন তবে আমায় পেছনে পড়ে আছেন?

   –সত্যি, কথা বলত তোমার ভয় করছে না? সিরিয়াস হল ইন্দ্রনাথ।

   –ভয় ? ভয় মানে… না তো? হাঁ, আমার আপনাকে দেখে ভয় ভয় করছে।

   –না, না। তোমার নিজেকে ভয় করছে না ?

   –নিজেকে ভয় করবে ? কেন ? আমি কি আমাকে কামড়ে দেব নাকি ?

   –করছে না বলছ ?

   –নাহ।

   –তুমি নিজেকে ভয় পাচ্ছ না এই ভেবে যে, তুমি আমার প্রেমে পড়ে যেতে পারো ?

ভীষণ আবাক হল মিঠুয়া। এতটাই অবাক হল যে, এটা একটা মোক্ষম হাসির কথা মনে হওয়া সত্ত্বেও সে হাসতে ভুলে গেল। 

ওঃ, ইন্দ্রনাথের নিজের সম্পর্কে কি সুউচ্চ আকাশছোঁয়া ধারণা,কি গভীর আত্মবিশ্বাস যা প্রায় বাড়াবাড়ির পর্যায় পৌঁছে গেছে। এত বেশী উচ্চমন্যতার পেছনে ঘাপটি মেরে আছে অতল অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা হীনমন্যতা!!! 

ইন্দ্রনাথ তার লেখা একটি প্রবন্ধ পড়তে দেয় মিঠুয়াকে। প্রবন্ধের নাম প্রেম। ইন্দ্রনাথের কাছে প্রেম মানে কি? তাই প্রবন্ধের বিষয়বস্তু। ইন্দ্রনাথের কাছে প্রেম মানে খুব পরিষ্কার। একটি মেয়ের সঙ্গে দেখা হবার পর চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে ফেলা। সানগ্লাস খুললেন কেন ? সে যদি জিজ্ঞেস করে, তাহলে বলা তোমায় ভাল করে দেখব বলে। এবং বার বার, চোদ্দবার যত মেয়ের সঙ্গে প্রেম করা হয়েছে, সবাইকার সঙ্গেই এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করা। এই সব বোকাবোকা কাজ করা। মিঠুয়া খুব গভীরভাবে ভাবতে থাকল এইসব নিয়ে। ভাবতে ভাবতে একসময় ইন্দ্রনাথকে বলল, প্রেম কি তাহলে শুধু কিছু টেকনিক? ইন্দ্রনাথ খুব গম্ভীর হয়ে গেল এবং নড়েচড়ে বসল। তার মনে হল তার ‘প্রেম’কে মিঠুয়া সিরিয়াসলি নিতে পারছে না। ইন্দ্রনাথ বলল, না প্রেম একটা প্যাশন। যার মধ্যে নানারকমের অস্থিরতা কাজ করে। কিন্তু প্রেমে গভীরতা বাড়তে বাড়তে একটা সময় আসে, যখন প্রেম একদম শান্ত, স্থির গভীর জলাশয়ের আকার ধারণ করে। তখন প্রেম হয়ে ওঠে একটা আশ্রয়, যাকে অবলম্বন করে বাঁচা যায়। সেটা তখন আর প্রেম থাকে না।

 যারপরনাই বিস্মিত হয়ে মিঠুয়া জিজ্ঞেস করল ,  প্রেম থাকে না? তাহলে বদলে গিয়ে কি বকচ্ছপ হয় ?

-প্রেম তখন ভালবাসা হয়ে ওঠে।

-প্রেম আর ভালবাসা আভিধানিক অর্থ তো এক।

-আমার কাছে নয়। প্রেম আমার কাছে যার মধ্যে ভাল লাগা, প্রচণ্ড মোহ ইত্যাদির সঙ্গে অস্থিরতা, বুক দুরুদুর ইত্যাদি জড়িয়ে থাকে । ভালবাসা আশ্রয়ের মতো, তাই তার মধ্যে কোনো অস্থিরতা নেই। মিঠুয়া গভীর চিন্তায় পড়ে যায়। সে ভীষণ ভাবতে থাকে। কি যে সাত-পাঁচ ভাবে সে নিজেই টের পায় না। ভাবতে ভাবতে একসময় সে আপনমনে হেসে ফেলে। আর ইন্দ্রনাথ আলতো করে তাকে বলে, হাসছ যে! ‘হাসছ যে’ শব্দটা ইলেকট্রিক কারেন্ট-এর মতো মিঠুয়ার কানকে স্পর্শ করে।কান থেকে সেটা চলে যায় মস্তিষ্কে । মস্তিষ্ক জাগায় মনকে।আর মিঠুয়া শিহরিত হয়ে ওঠে। একটা ‘হাসছ যে’ শব্দ তার ভেতরের সমস্ত সূক্ষ্মতাকে কাঁপিয়ে, নাড়িয়ে, ঝাঁকুনি দিয়ে তার অন্তরাত্মাকে স্পর্শ করে, একেবারে গোড়ায় সমূলে সজোরে শেকড়শুদ্ধ ঘুমিয়ে থাকা লিবিডোকে টোকা দেয়।মিঠুয়া আচ্ছন্ন হয়ে পড়তে থাকে, ‘হাসছ যে’ এই দুই শব্দের নেশা ধরানোর শক্তিতে। কি যেন ঘটে যায়।অলক্ষ্যে দুইজনের মধ্যে।   

   

      অতঃপর তারা সাহিত্যে উপন্যাসে, কবিতায় যত রাজ্যের প্রেম আছে, সেইসব বিভিন্নধর্মী প্রেমেদের নিয়ে পড়ে। ইন্দ্রনাথ একের পর এক কবিতা বলে যায়। ‘দূরে ছিলাম, কাছে গেলাম, ডেকে বললাম, খা, আঁখির আঠায় জড়িয়েছে বাঘ নড়ে বসছে না। ওইরকম একটা বাঘের স্বপ্ন দেখতে থাকে মিঠুয়া। ইন্দ্রনাথ বলে, আমি তার অলিখিত চিঠি মনে মনে পড়ে ছিঁড়ে ফেলি , মিঠুয়া নিস্তদ্ধ হয়ে যায়।

 ভুলোমনা দেখল গোট ঘরটা একটা বোঁদা অন্ধকারে গুমোট হয়ে আছে।গুমোট অন্ধকার উড়াউড়ি করছে স্মৃতিরা। ফরফর করে শোনা যাচ্ছে তাদের ডানার আওয়াজ। মনে মনে যে কোন একটাকে ধরে ফেললেই পাওয়া যাবে একপাতা স্মৃতি, যা তলিয়ে গিয়ে আবার ভেসে উঠতে চাইছে।অন্ধকার হাতড়ে ডায়েরিটা খুঁজে বার করল ভুলোমনা। একটা মোমবাতি জ্বালালো সে। দেবেন্দ্রই কখনও কোনদিন একসময় এসে রেখে গিয়েছিল। পাহাড়ে নাকি টর্চ, মোমবাতি, দেশলাই, দড়ি, ছুরি এসব হাতের কাছে রাখতে হয়।দড়ি আর ছুরি নিয়ে আমি কি করব?

 -আত্মরক্ষা ।

 এই না বলে দেবেন্দ্র ছুরি হাতেও খানিকক্ষণ কুংফু করতে করতে নাচানাচি করেছিল। তখন হাওয়াই চটীটা চট চট করে আওয়াজ করছিল।

ভুলোমনার মনে হচ্ছিল,ওর দড়িরও দরকার নেই, ছুরিরও না। কারণ বিপদের সময় ও জানে যে, ঠিক অন্ধকার ফুঁড়ে বিপদের মুর্তিমান যম হিসেবে উদয় হবে চিকু। তার চিকু আছে। গরীব মানুষদের যেমন ভগবান  থাকে তেমনি। চিকু প্রকৃতির অঙ্গ।প্রকৃতির মধ্যে মিশে থাকে সে। 

      ডায়েরির পাতা খুলে ভূলোমনা দেখল, সে শেষ ডায়েরি লিখেছে, এখানে আসার পর পর। মাত্র কয়েকটালাইন। “এখানে এলাম। সবাই বলে আমি অসুস্থ। এদেরও তাই বলা হয়েছে। সামন্ত এসে রেখে দিয়ে গেল।যাবার আগে গুরুং আর সামন্ত আলাদা অনেকক্ষণ কথা বলছিল। যাবার আগে সামন্ত সবকিছু ফুল প্রুফ হয়েছে কিনা, তাও দেখে নিচ্ছিল। যাবার আগে সামন্ত আরও আরেকটা জিনিস করছিল। সে আমার চোখের দিকে অনেকটা উদভ্রান্তের মত তাকিয়ে থাকছিল। মনে হচ্ছিল, পারলে সে আমাকে পট করে একটা চুমু খাবে। পাছে সে চুমু খায়, তাই আমি তাড়াতাড়ি বারান্দার কাঠের হাতল ধরে চারপাশটা দেখতে লাগলাম, মন দিয়ে। সে বলল, আসছি। আর তারপর আমি খুব হন্তদন্ত হয়ে হ্যাঁ, হ্যাঁ বলে সামন্তর বগলের কাছে নাকটা নিয়ে গিয়ে জোরে জোরে শুঁকলাম। পশুপ্রাণীরা যেমন শুঁকে থাকে আর কি! সামন্ত একটু হকচকিয়ে গেছিল, কিন্তু খুব বেশী না। সম্ভবত হকচকানোর মত এত ঘটনা ওর জীবনে ঘটেছে যে, কিছুতেই তাই ও তেমন বেশী হকচকায় না। আসলে আমি সামন্তর গায়ের গন্ধ শুঁকে দেখছিলাম, স্মৃতি জেগে উঠে জানিয়ে দেয় কিনা যে, সামন্ত আমার বেশ চেনা। সেরকম তো কিছু হল না। আমার মাথাটা একটা প্রাণহীন পাথরের মত শক্ত হয়ে রইল। ভাবলাম, আমার মাথাটা দেখছি, তেমন ফুলপ্রুফ ছিল না। সামন্ত রওনা হয়ে গেল মন খারাপের মত মুখ নিয়ে। ও রওনা হয়ে যেতেই আমার খচ্‌ খচ করে উঠল, সামন্তর নিজের মাথাটা ফুলপ্রফ তো! কেন জানি না, মনে হল, সামন্তর মাথাটা ফুলপ্রফ থাকা ভীষণ জরুরী ।” 

       এর পরে দেখা যাচ্ছে যে আর একদিনও ভুলোমনা লেখেনি। বেখাপ্পার মত একটা জায়গায় শুধু একটা লাইন দেখা গেল। “দেবেন্দ্র বেবুনের মত পাহাড়ে ওঠে।” লাইনটা একা একা দাঁড়িয়েছিল।ভুলোমনার মত। 

       এই একা একা থাকাটাকে নাড়াচাড়া করার ইছে হল ভুলোমনার। তার হাত চলতে শুরু করল ।সে লিখতে থাকল ..

    বোধহয় নয়, আমি স্থির নিশ্চিত যে তখন আমার সতেরো বছর বয়স। সেইসময় আমি বড় বিপদের মধ্যে ছিলাম। বিপদ মানে, খাওয়া-দাওয়ার কষ্ট থাকার জায়গার অভাব, বাবার চাকরি চলে যাওয়া বা মায়ের হার্ট অ্যাটাক করে প্যারালিসিস হয়ে পড়ে থাকার মত জীবন সংগ্রামের দুরূহ ও বাস্তবিক কোনো সমস্যা আমার ছিল না। আমি খেতে পরতে. পেতাম এবং ভালভাবে থাকতাম। মুখ শুকনো করে আমাকে ভবিষ্যতে বেঁচে থাকার জন্য ভয়  পেতে পেতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হত না।

 আমাকে জ্বালাতন করে তিতিবিরক্ত করে প্রায় স্থবির প্রায় করে তুলেছিল একটা নিদারুণ দুশ্চিন্তা। কোন  জীবনটা ভাল। কোন জীবনটা আমি বাঁচতে চাই ! সন্ন্যাস জীবন না গৃহীর জীবন। পথ কি? উচিত কি আর অনুচিতই বা কি? ঠিক কোনটা, কোনটাই বা বেঠিক?  

চুরি করা বা মিথ্যে কথা বলা, লোককে রেগে গালাগালি দেওয়া এসব যে খারাপ, খুব ছোটবেলাতেই আমি  বুঝে গেছিলাম। ভাল মেয়ে হতে গেলে বাধ্য হতে হয় আর ছেলেদের সঙ্গে বেশী মিশতে নেই। এসবও যেন কেমন করে বুঝে গেলাম। সারাক্ষণ টিভি. দেখা বা গুচ্ছের পাকাপাকা সিনেমা দেখা ভাল নয়। পাকামো করা ব্যাপারটা ভাল মেয়েদের সঙ্গে যায় না। ইত্যাদি ভজরং ভজরং কতগুলো নীতিবাগীশ ব্যাপার-স্যাপার আমার মাথায় ঢুকে গেছিল। তার মধ্যে অন্যতম প্রধাণ ছিল, কাম জ্বালায় প্রাণ যায় যায় হয়ে মরে গেলেও আমার জীবনের একমাত্র পুরুষ আমার বর ছাড়া আমাকে কেউ চুমু খাবে না। এদিকে যে আমার প্রেমিক হবে, সেই হবে আমার বর। জোরজবরদস্তি। বিয়ের আগেই প্রেম যদি চটকে মটকে যায়, তবে যে কি হবে, সে বিষয়ে আমার মোটে কোনো ভাবনা ছিল না। এইসব ধ্যান ধারণার বাইরে কিছু ঘটলে আমার চোখ কপালে উঠত। অনাসৃষ্টি কাণ্ড বলে মনে হত এবং ঘন ঘন শিহরণ হত। 

আমার সতেরো বছর বয়সটা ছিল সাংঘাতিক। আমি সেসময় হঠৎ টের পেয়ে যাই পৃথিবীটা হু হু করে বদলে যাচ্ছে এবং এটা সবসময়ই বদলাচ্ছিল। আমিই একটা গর্দভ ছিলাম। এতদিন ধরে মহাসুখে সবকিছু স্থিত ভাবছিলাম। নিজের বুদ্ধির উৎসে সে সময় আমি করাঘাত করছিলাম এবং গভীর বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন হয়েছিলাম এই ভেবে যে, এইরকম একটা পরিবর্তনশীল জগতে পরম সত্য তবে কি? যে সত্যিটা কোনদিন পরিবর্তিত হবে না। সর্বসময়, সবজায়গায় অটল অবিচল সত্যরূপে প্রতীত হবে। এমনি কোন কিছুই আমার চোখের সামনে ছিল না। আমার চোখের সামনে সর্বত্র অহরহ পরিবর্তনশীল একটা জগৎ ঘোরাফেরা করছিল, যেখানে মানুষ তার একখানা গোটা জীবন ধরে ক্রমশই বদলে যাচ্ছিল। এককালে গমগম করা মানুষভর্তি সুন্দর বাড়িগুলো ভেঙে ভেঙে পরে যাচ্ছিল। তাদের সারানো হচ্ছিল আর যেখানটা সারানো হচ্ছিল, সেখানটা হয়ে উঠছিল আখাম্বার মত আধুনিক এবং তা আদৌ বাড়ির পুরনো অংশগুলোর সঙ্গে সামন্জস্যপূর্ণ ছিল না। মানুষের ধ্যানধারণা বদলে যাচ্ছিল। পোষাক পরিচ্ছদ যতই আধুনিক হয়ে উঠছিল, ততই পুরনো ধাঁচের পোষাকগুলোকে বোকার মত মনে হচ্ছিল। বাদ অর্থাৎ মার্কসবাদ, অমুকবাদ তমুকবাদ, তা নিয়েও ঝামেলা হচ্ছিল বিস্তর। কলকাতায় দেখতাম সিপিএম এবং আরও বেশী প্রতিক্রিয়াশীল সি.পি.আই.এম এদিকে ধনতন্ত্রবাদ এদিকে গণতন্ত্রবাদ, আরেকদিকে সমাজবাদ ইত্যাদি, প্রভৃতি বাদের কোন শেষ ছিল না। বাদ নিয়ে বিবাদও কম ছিল না। ধর্ম নিয়ে দুরূহ সব প্রশ্ন আমাকে খাবলে খাবলে শেষ করে দিচ্ছিল। যত মত তত পথ মেনে নিলেও আমার পক্ষে কোনটা সঠিক পথ মাথা খুঁড়ে খুঁড়েও ভেবে পাচ্ছিলাম না। ভারী বিপর্যয়ের মধ্যে ছিলাম আমি। কোনদিকে যাব, কি করব এগুলো ছিল জ্বলন্ত প্রশ্ন। আর তার সঙ্গে এই ঘনঘন পরিবর্তনশীল জগৎ আমাকে বিষণ্ণতার শেষপ্রান্তে ছেড়ে দেয়। 

নিজের সঙ্গে একটা রফায় আসি অবশেষে । আমি এই এই করব, এই এই মানব, এগুলোকে সঠিক বলে জানব আর এইভাবে চলব। এইরকম একটা নির্দিষ্ট জীবন ধারা তৈরি করি নিজের জন্য। এবং সেগুলোকে নিয়ে যা বুঝেছি সার বুঝছি ভেবে নির্দিষ্ট পথে হাঁটতে থাকি। 

একরকম ভালই চলছিল সেটা। বেশ অনেকদিন সেটা ভালমত চলে। কিন্তু হঠাৎ একদিন আসে, যেদিন আমি চোখ খুলি এবং দেখতে পাই নিজেরই তৈরি করা সীমানার মধ্যে আমি দমবন্ধ হয়ে হাঁপিয়ে ঘেমে একসা হয়ে যাচ্ছি। আবার আসে আরেকদফা বিষণ্ণতার যুগ। এবং মনে হয়, আমাকে এইভাবেই চলতে হবে এই বাধ্যবাধকতাকে কে তৈরী করেছে? সে তো আমিই করেছি| যেটা আমি নিজেই ভেবেচিন্তে নিজের জন্য তৈরি করেছিলাম একদিন, আমার মনে হতে থাকে, তাতে আমি সন্তুষ্ট নই।

 তারপর থেকে আমি নিজেকে দু টুকরো করে ফেলি। আমার অর্ধেকটা ব্যস্ত থাকে রোজকার কাজকর্মে, আর আরেকটা আমি বেরিয়ে পড়ি একা একা জীবন খুঁজতে। প্রশ্নটা ছিল এই জীবন লইয়া কি করিব? 

          ভগবানই জানত কি করিব। তারপর একটা কি যে হয় সব ঘেঁটে যায়। আর আমি সব ভুলে যাই, শুধু ভুলিনা ওই প্রশ্নটা এ জীবন লইয়া কি করিব ?

 এর ফাঁকে নিশ্চয় সামন্ত এসে পড়েছিল আমার জীবনে। কিছু ভুলে যাবার পর যতবারই সামন্ত সম্পর্কে কিছু ভাবার চেষ্টা করি আবছা আবছা দেখতে পাই আমি  একটা সবুজ রঙের রান্নাঘরে চিকেন স্টু রাঁধছি । জুকিনি কেটে কেটে সঁতে করছি। কেন কে জানে? ও হ্যাঁ , সেদিন ঘুরতে ঘুরতে আমি গুরুংদের বিশাল ফার্মে এক

জায়গায় জুকিনির গাছ দেখেছি আর দেখেছি মাশরুমের চাষ। জুকিনিগুলো গাছে ঝুলছিল আর মাশরুমণ্ডলো নেট দিয়ে ঢাকা ছিল।

 সামন্ত সম্পর্কে এর বেশী কিছু মনে পড়ে না। জোর করে ভাবতে গেলে চিকেন স্টু-এর ছবিটা হিজিবিজি হয়ে ঘেঁটে কানের কাছে গ্যাঁও গ্যাওঁ করে অদ্ভুত একটা আওয়াজ হয়। আর তারপরই আমার হাই ওঠে। ভীষণ ঘুম পেয়ে যায় আমার। নিজেই তখন নিজেকে বলে ফেলি, নে বাবা, উঃ একটু ঘুমিয়ে বাঁচি। 

 কাজ খুঁজতে যাবার মত করে জীবনে খুঁজতে বেরনোর সময় আমার নিজের জন্য নির্দিষ্ট করা শিক্ষাদীক্ষার ঝুলিটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়েছিলাম। শিক্ষাদীক্ষার ঝুলিটা থাকায় একমাত্র সুবিধে এটাই হয়েছিল যে, লেখালেখির জগতে ঢুকে পড়তে আমার বেশী বেগ পেতে হয়নি, আর জীবন খুঁজতে খুঁজতে তার অভিজ্ঞতাগুলোও গল্পের আকারে লিখে ফেলা যাচ্ছিল। একদম একটা সাদা মন নিয়ে বেরোলে ভাল হত, নাকি শিক্ষাদীক্ষার ঝুলিটা থাকাটা বাঞ্ছনীয় ছিল সেটা নিয়ে আমার নানান সংশয় আছে। কিন্তু এখন অবস্থাটা হয়েছে এমন যে আপনা আপনিই খামচা খামচা করে অনেক কিছু সাদা হয়ে গেছে। নাঃ,ভুলে যাওয়া পর শিক্ষাদীক্ষার ঝুলিটাকে আমি

আর খুঁজে পাইনি। এই পাহাড়ে অন্ততঃ ওটা আর আমার সঙ্গে নেই। ওটা ছিল বিচ্ছিরি রকমের ভারী জগদ্দল পাথরের একটা বস্তার মত। নেহাতই একটা দায়।

 কিভাবে যে আমি ইন্দ্রনাথের খপ্পরে এসে পড়ি কে জানে। ইন্দ্রনাথও লেখালেখির জগতেরই একজন ছিল। যদিও তার সবসময় মনে হত, প্রতিভা অনুসারে সে যথেষ্ট স্বীকৃতি পাচ্ছে না। সে সময় ওই বোঝাখানা আমার

কাঁধে ছিল। ইন্দ্রনাথকে ওটা ধরতে দিয়ে একটু বাথরুম থেকে আসছি, বলে কেটে পড়লেই হত। তখন ইন্দ্রনাথ কেমন বোকা বনে যেত! ভারী মজা হত।

 এইসময়টায় আমি মাঝমধ্যেই বাথরুমের স্বপ্ন দেখতাম। আর দেখার পর পরই বিছানা থেকে ওঠার আগে স্বপ্নগুলো লিখে ফেলতাম ডায়েরিতে। এত বেশী বাথরুমের স্বপ্ন দেখেছি,কতগুলো তার কোন হিসেব নেই। সবকটা লিখেও রাখিনি। কিন্তু যে স্বপ্নগুলো ছিল ভয়ানক অস্বস্তিকর সেগুলো নিয়ে ভেবে ভেবে সেগুলো প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছিলাম এবং এইসব স্বপ্নগুলো আমার লেখক জীবনে কাজে লাগত। 

      একবার কনকনে শীতের দিনে এক বিয়ে বাড়িতে শাড়ি পরা অবস্থায় আমি কোন এক বাথরুমে ঢুকি। সেখানে বালতি, ড্রাম, সবেতেই জল ভর্তি করা ছিল। আমার শাড়ির তলাটা কিভাবে যেন একটু ভিজে গেল। ভেজা জায়গাটা স্যাঁতস্যাঁতে ঠাণ্ডা

হয়ে আমার পায়ে অস্বস্তির কারণ হচ্ছিল। খুবই বিরক্তিকর ছিল পরিস্থিতি। সবথেকে ভয়ের ব্যাপার হল তখন , যখন কমোডে পেচ্ছাপ করব বলে ভাবছি তখন দেখতে পেলাম ড্রামের পেছনে একটা থুত্থুরে বুড়ো বসে আমার দিকে লক্ষ্য করছে। ভয়ে এবং অশান্তিতে আমার শরীর হিম হয়ে এসেছিল। আসলে…কে যেন দরজায় টোকা

দিচ্ছে। হাই দি, ডিনার ইজ রেডি।

 দেবেন্দ্রর ডাকে ভুলোমনা খেয়াল করল তার খিদে পেয়েছে। ঘোরানো কাঠের সিঁড়িটা বেয়ে নেমে এল সে। বাইরে তখন বেজায় হিম পড়ছে। মুখ দিয়ে ভাপ বের হচ্ছে। এক হাত দূরে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না।

রহস্যময় জগৎ। খেতে শুরু করল ভুলোমনা। গুরুং আ্যালার্ট হয়ে থাকলেও ভেতরে ভেতরে রিল্যাক্সড্‌। বাকীসব ছেলেরা সুরেন্দ্র, রাজভাইয়া, দেবেন্দ্র সবাই আ্যাটেনেশনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে । মন দিয়ে খেতে হচ্ছিল ভুলোমনাকে। কারণ ডিনারে সার্ভ করা হয়েছিল নুড়ুলস্‌। শুধু তাই নয় সেই মোমবাতির আলো আর ঘোর ঘোর অন্ধকার পেয়ে বসেছিল ভুলোমনাকে। সে যেন স্বপ্নের ঘোর থেকে বেরোতেই পারেনি। আধাখ্যাঁচড়া ভুলে যাওয়া স্মৃতি তাকে ক্রমশঃ টানছিল অস্তঃসলিলা হতে। 

       চিলি গারলিক চিকেন যখন খেতে শুরু করল তার সাথে, তখন স্মৃতি তাকে খ্যাদাতে লাগল দূর অতীতে। একবার ইন্দ্রনাথ তাকে নিয়ে গেছিল কোথাও চাইনিজ খেতে।বেরোনোর আগে সে এতবার এস.এম.এস. করছিল সে রেডি হওয়া হয়ে উঠেছিল দায়। তখন ইন্দ্রনাথ এস.এম.এস. করল-দেরী হবে?

 মিঠুয়া নামক মেয়েটি উত্তর দিয়েছিল-এত এস.এম.এস. করলে তো হবেই। তখন কিছুক্ষণের জন্য রেহাই পাওয়া গেছিল।তারপর এইরকমই একটা চিলি গারলিক চিকেন ছিল যেন। সেইসময় ইন্দ্রনাথ এমন একটা ভাব করছিল যেন মিঠুয়ার সঙ্গে প্রেম করে।মিঠুয়া বলল, এত ধোঁয়া ধোঁয়া কথা বলার মানে কি?        –তুমি যে কিছুতেই একটা কথা বুঝতে চাইছ না, সেটা কি আমার দোষ? 

একটু ভেবে নিয়ে মিঠুয়া বলল, হ্যাঁ আপনার দোষ।        –আচ্ছা।

 মিঠুয়া ভাবছিল, ইন্দ্রনাথ আসলে চাইছেটা কি? প্রেম করতে? কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে প্রেম করতেই নয় ও আসলে ফ্লার্ট করতে চাইছে।নিদারুণ আকর্ষণীয় ওর ধুরন্দরপনা।

 ভাবনা-চিন্তা ছেড়ে মিঠুয়া কড়া গলায় বলল

-আপনি কি ভাবছেন, আপনি রুড হতে পারি না? চাইলে আমি যথেষ্ট রুড হতে পারি, কিন্তু সেটা আমি হচ্ছি না। 

 গালে হাত দিয়ে মিটিমিটি হাসতে হাসতে ইন্দ্রনাথ বলল, তাহলে রুড হও। মিঠুয়া মহা সমস্যায় পড়ে গেল। তার ধারণা রেগে গেলে সে বেশ রুড। কিন্তু এখন একজন মিচকে

টাইপের লোকের সামনে হট করে কি করে রুড হওয়া যায়? অনেক ভেবে এদিক-ওদিক তাকিয়ে সে বলল,

এখন রুড হতে ইচ্ছে করছে না।

 তখন ইন্দ্রনাথ জোরে জোরে হাসতে লাগল।

 বাইরে ভয়ঙ্কর কুয়াশার মধ্যে ইন্দ্রনাথের সেই হাসি ঘুরপাক খেতে লাগল গোল গোল। আর খাওয়াদাওয়া

ভুলে গভীর ধ্যানমগ্রতার সঙ্গে ভুলোমনা তাকিয়ে রইল সেই কুয়াশায়।

সাত

      কদিন পর ঘুম ভাঙল ঘোর ঘোর বিষণ্ণতা নিয়ে। খাওয়া, ঘুরে বেড়ানো, আগডুম বাগডুম ভাবার চেষ্টা করা, কিছু ওষুধ-পত্তর ওষুধ খাওয়ার মত করে গেলা, ঘুমিয়ে পড়া, কখনো বা ওষুধের ঘোরে আর কখনও বা শুধুই অভ্যেসে ঘুমিয়ে গেলে অস্বস্তিকর স্বপ্ন দেখা, এসব ছাড়া আর কি-ই বা করার আছে তার। তার মধ্যে যে বিচ্ছিরি একটা স্বপ্ন এই খোলা চোখের সামনেও নেমে বেড়াতে চাইছে মূর্তিমান বিপদের মতো, তার হাত থেকে মুক্তি পেতে গুটি গুটি রোদ পোয়াতে গেল ভুলোমনা রোদ, নানারকম ছায়ারা খেলা করে বেড়াচ্ছে। সেখানে সেই বাড়িটার ছায়া,যেটা স্বপ্নে ছিল। একটা বড় পাথুরে বাড়ি। পাথুরে রঙের। বাড়িটা দুর্গের মতো। ভুলোমনার মনে হল, বাড়িটাতে থাকা যায়। শুধু থাকা যায় না, থাকে সে। বাড়িটার গায়ে কুলুঙ্গির মতো ছোট ছোট জানলা। সন্ধ্যে হলে সে বাড়িটায় হ্যারিকেন জ্বালিয়ে বেড়ায়। তখন বাড়ির বাইরে থেকে জানলাগুলো অন্ধকারে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকে আর দূর্গ বাড়িটার জানলাগুলো দিয়ে আলো দেখা যায়। দুর্গের বাইরে ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে । সিঁড়ি থেকে শুরু হয়েছে বাড়ির ঝোপজঙ্গলে ভরা জায়গাটা। মাঝখান দিয়ে রাস্তা চলে গেছে গেট অবধি। লোহার বন্ধ করা গেট। এক চৌকিদার সেটা খোলা বন্ধ করে। দূর্গটাতে বড়জোর তিন চারজন লোক থাকে। সেদিন স্বপ্নে সন্ধ্যে হয়ে যাবার পর,গোটা পাহাড়ে যখন ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছে,তখন জঙ্গল থেকে বেরোলো কিছু বুনো খরগোশ। ভুলোমনা ভয়ে চেঁচিয়ে চৌকিদারকে ডাকল। চৌকিদার সেগুলোকে পিটিয়ে মেরে ফেলল। রাস্তাটার গায়ে তাদের রক্ত পড়ে থাকতে দেখা গেল। খরগোশগুলোকে যত না ভয় পেয়েছিল,  তার থেকে অনেক বেশী তাদের রক্ত এবং মৃত শরীরগুলোকে ভয় করল ভুলোমনার। শিরশিরিয়ে উঠল তার অন্তরাত্মা। স্বপ্নেই । আর ভীষণ অপরাধবোধ হল তার। 

       সারাদিন অপরাধবোধটা ভুলোমনার পেছন ছাড়ল না। ভয়ের জিনিস ধ্বংস-প্রাপ্ত হয়েছে। তবু মুক্তি পাচ্ছে না সে। কেন? তখন মায়া গ্রাস করছে মনকে। মায়া!! এই মহা মায়ার ভুলভুলাইয়ার কি শেষ নেই?

       সম্ভবত মহা মায়ার কবলে পড়েই মিঠুয়া এককালে জড়িয়ে পড়েছিল ইন্দ্রনাথের সঙ্গে। “হাসছ যে” কথাটা আদ্যপ্রান্ত সেই মহা প্রকৃতির কারসাজি ছাড়া কি ছিল? দুটো শব্দের মধ্যে কি ছিল যে, এমন কিছু রাসায়নিক গোলযোগ ঘটে গেল মস্তিষ্কে, সে ক্রমশঃই ডুবে যেতে থাকল অতলস্পর্শী অস্তিত্ব উৎখাতকারী নিশিডাকের মধ্যে। কোনো এক জায়গায় ভুলোমনা একবার পড়েছিল মেয়েরা প্রেমে পরে কানে শুনে। শ্রবণেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তাদের আবেগ জাগ্রত হয়। অথচ পুরুষ প্রেমে পড়ে চোখে দেখে। দৃষ্টিসুখ তাদের কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ ।সাধারণত। ব্যতিক্রমের কথা আলাদা। সেই কর্ণ- ইন্দ্রিয়  এমন বিশ্বাসঘাতকতা করল, কেবলই মনে হতে লাগল, সবই পূর্বনির্ধারিত।

একদিন ইন্দ্রনাথ ফোন করল রাত এগারোটায়। কি করছ?

       –এই রাত্তিরে আমি কি করি? নাচি বোধহয়।

       –নাচ জানো তুমি?

       –নাহ্ । শিখলাম আর কোথায়? শিখলে নিশ্চয় শিবের রুদ্ররূপের তাণ্ডব নাচতাম। আমার বহুদিনের ইচ্ছে। 

   –তাই ?

   –হ্যাঁ ।

   –কি করছ এখন?

আবার প্রশ্ন করল ইন্দ্রনাথ। নিজের দু-হাতের দুটো পাতা উল্টে-পাল্টে দেখল মিঠুয়া।        –এই , বই পড়ছিলাম । আপনি কি ড্রিঙ্ক করেছেন?

   –ড্রিঙ্ক ? করেছি। কি করে জানলে?

-মনে হল। 

কেন মনে হল? গন্ধ পেলে?        –না ।

ফোনে কি করে গন্ধ পাবো? অদ্ভুত তো লোকটা! স্বগতোক্তি করল মিঠুয়া।

–দেখতে পাচ্ছ তাহলে আমাকে? ”

-না তো।

-আমি দেখতে পাচ্ছি তোমায়। আমি চেষ্টা করলে দেখতে পাই তোমায়? বলব কি পরে আছো? 

-নাহ্‌। 

-তাহলে তোমার ঠোঁটটা  স্পর্শ করব একবার? 

ফোনে আর কি করে স্পর্শ করবে, তাই নিশ্চিন্তে__’ হাঁ’ বলল মিঠুয়া।

 -চোখ বোজো তবে?  

-কেন? 

-চোখ বোজো।  

চোখ বুজল সে। আর একটা কম্পমান কিন্তু আত্মবিশ্বাসী চুন্বনের আওয়াজ পেল সে। মুহূর্তেই শিউরে

উঠল কেঁপে কেঁপে। তার একটা মন বলল, এতদূর? আর একটা মন বলল, অদ্ভুত। 

দুদিন চুপচাপ। মোবাইল বাজলেই আঁতকে উঠছিল মিঠুয়া। এস.এম.এস.-এর আওয়াজে তার বুক ধকধক করত!

হঠাৎ রাত নটায় ফোন। ড্রাঙ্ক। – – -কি করছিলে ?

-রান্না! 

– শোন, রান্না করে কেউ বড় হয় না। বড় হতে গেলে প্রেম করতে হয়। প্রেম! তুমি তো প্রেম করবে না।তুমি তো প্রেম করবেই না। প্রেম না করলে কি করে বড় হবে, সোনা। আর যদি বড় হতে চাও, স্ক্যান্ডাল চাই,  স্ক্যান্ডাল !! কি পাগলের মত বকছে। মনে বলল মিঠুয়া।মুখে বলল, হ্যাঁ।তারপরই হঠাৎ রেগেমেগে ইন্দ্রনাথ ঘোষণা করল, শনিবার আমার কাছে আসবে। 

ঘাবড়ে গিয়ে মিঠুয়া বলে ফেলল, আচ্ছা। 

কথাটা হচ্ছে সে ঘাবড়ালো কেন? রোদ পোয়াতে পোয়াতে ভাবল ভুলোমনা। উত্তরটা নিজেই দিল সে।সে ঘাবড়াতে চেয়েছিল বলেই ঘাবড়ালো। 

রাতে আবার ফোন।

– আমায় একবার মেরেছিল ভীষণ।

-কে? 

-আমার স্কুলের ফাদার। তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি।

 -কেন? 

-আ্যালজেবরায় হায়েস্ট পেয়েছিলাম বলে।

-তার জন্য মারবে কেন?

-মেরেছিল আর বলেছিল, আ্যালজেবরা ভীষণ টাফ্‌ সাবজেক্ট।যে আলজেবরায় ভাল করবে, সে অন্য সাবজেক্টেও ভাল করতে পারে। তুমি অন্যগুলো ইচ্ছে করে ফাঁকি মেরে না পড়ে বাজে নম্বর পেয়েছ। বলেছিল আর মেরেছিল।

-তারপর?

-তারপর। আমি সেই ফাদার যেদিন মারা যান, সেদিন ক্রিমেশনের সময় পৌঁছোই ।

-তারপর?

-তারপর আর কিছু নেই। সব গোলমাল হয়ে যায় আমার।

-আপনার কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।

– আমার জীবনটাই যে জড়িয়ে গেছে গো!

-কেন কথা বলেন আমার সঙ্গে? 

-এক অমোঘ অনিবার্য আকর্ষণে।

অমোঘ শব্দটা চাবুক মারল মিঠুয়াকে। ওরা দুজনেই নিঃস্তব্ধ হয়ে গেল। যেন বাক্‌রোধ  হল ওদের। মিঠুয়ার কেবলই মনে হতে থাকল, কি অসুখী মানুষ একটা! কিসের অস্থিরতা মনে? সে কেবলই আঁকুপাঁকু করল আর চতুর্দিক হাতড়ে বেড়াল। যেন কি যেন একটা জিনিসের দরকার ছিল, সেটা পাওয়া গেলেই ইন্দ্রনাথকে ধরিয়ে দেবে ও। আর ইন্দ্রনাথের মন প্রশান্তিতে ভরে যাবে।

              এসব সেই মায়া নামক মহামায়াবী বস্তুটার মহা খেলা ছিল না তো কি? সে ছিল ত্রীড়নক মাত্র। হয়ত তার ঘাড় ধরে কিছু শেখাতে চাইছিল সেই চৈতন্যময়ী।

মিঠুয়ার একটা মন বলছিল, মুখ ফেরাও। অন্যদিকে তাকাও। আর একটা মন বলছিল, বিশ্বাস করি না ওকে, কিন্ত ফিরে আসব কি করে? এ যে ভবিতব্য। অতএব, অপ্রতিরোধ্য সেই ভবিতব্যের কবলে পড়ে ছারেখারে যাচ্ছিল মিঠুয়া একদিন।

     ঘাসের ওপরে হাত বুলোলো ভুলোমনা। এখনও শিশিরভেজা হয়ে আছে ঘাস। কি মায়াময়! ঘাসগুলোয় আঁকিবুঁকি কাটল সে। একদিন এক ভয়ানক ঘটনা ঘটেছিল। সে এমন ঘটনা যার বরাতে ঘটে সেই বোঝে। সে বুঝেছিল বৃন্দাবনের শ্রীরাধিকাকে কারণ তার বরাতে ঘটেছিল। 

    ঘটনাটা খুব সাধারণ, আকছার ঘটার মত একটা ঘটনা। দিনরাত এই পৃথিবীতে কারুর না কারুর সঙ্গে ঘটছে। আর যার সঙ্গে ঘটছে, সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।মিঠুয়াও পেয়েছিল।

           ইন্দ্রনাথ তার নানান বন্ধুবান্ধবের কথা বলত। তার নাকি কাঁড়ি, কাঁড়ি বন্ধু-বান্ধব  আর রাশি রাশি বান্ধবী। তারা সবাই পারলেই ইন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রেম করতে পারলে বাঁচে। ইন্দ্রনাথের আবার নাকি প্রেম হয় না সহজে।কিন্তু ইন্দ্রনাথ তার বন্ধুদের সঙ্গে মিঠুয়ার আলাপ করাত না বড় একটা। একবার কি একটা নাটক দেখতে গেছিল। সারাক্ষণ হাইপার ভিজিলেন্ট হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে বসেছিল। যখন নাটক চলছিল না,কে ঢুকছে আর কে বেরোচ্ছে উদ্গ্রীব হয়ে তাই লক্ষ্য করে বসেছিল । বুঝেই উঠতে পারছিল না, সে সহজ

স্বাভাবিক কেন নেই ! যত দেখছিল সে ইন্দ্রনাথকে, বিরক্তি উদ্রেক হচ্ছিল। গোটা সময়টাই একটা অস্বস্তিকর অমনোযোগী সময় ছিল সেটা। সারাক্ষণ ধরে ইন্দ্রনাথ ছিল অমনোযোগী আর সারাক্ষণ ধরে অস্বস্তিতে ভূগছিল মিঠুয়া।

      একদিন শান্তনুদার বাড়িতে গেল মিঠুয়া। শান্তনুদার বাড়িতেই প্রথম দেখা হয়েছিল মিঠুয়ার ইন্দ্রনাথের সঙ্গে। মিঠুয়ার এক দাদা সৌমিত্র মিঠুয়াকে নিয়ে শান্তনুদার সঙ্গে আলাপ করিয়েছিল। শান্তনুদা ছিল সহৃদয়

মানুষ। তার বাড়িতে নানারকম লোকের আনাগোনা ছিল। ফিল্মমেকার, লেখক, কবি, নাট্যকার এইরকম অনেকের। কারণ শান্তনুদার প্রয়োজন ছিল কিছু মানুষের। যারা সে যা কথা বলতে চায়, সেই কথাগুলো যতই বোরিং লাগুক শুনবে ধৈর্য্য ধরে। বিনিময়ে শান্তনুদা তাদের ভালই আপ্যায়ন করত। যেদিন মিঠুয়া প্রথম যায়, সেদিন গাদা গুচ্ছের লোক বসেছিল। আর ভয়ঙ্কর রকম শুঁটকিমাছের গল্প চলছিল। 

শিতল শুঁটকি  বাজারে নাকি ন’শো টাকা কেজি। বাংলাদেশ থেকে আসছে। গরীব-গুর্বো, মানে একটু কমা টাইপের একটা লোক সেখানে বসে ফুক ফুক করে সিগারেট ফুঁকছিল। তার নাম…তার নাম…ভবানী। ভবানী 

 কাঁচুমাঁচু মুখ করে বলল, একটা কথা বলব? কোনদিন খাইনি, একটু দেবেন, খেয়ে দেখব?

তাই শুনে সবাই হাসল। কেন হাসল, মিঠুয়া বুঝতে পারেনি।কিন্তু ইন্দ্রনাথ হাসতে হাসতে তাকে জড়িয়ে ধরল। সেটা চোখে পড়ল মিঠুয়ার আর মনে রয়ে গেল ।

হ্যাঁ । সারাজীবনের জন্য । কারণ আ্যামনেশিয়ার পরও দিব্যি মনে আছে দেখা যাচ্ছে। 

মিঠুয়ার মনে হল, লোকটা মানে ইন্দ্রনাথ লোকটা( তখনও ইন্দ্রনাথকে চিনত না মিঠুয়া) অবশ্যই সহৃদয়।  

এই ঘটনাটার কোথায় যেন ছবি উঠে গেল, ক্লিক, ক্লিক , ক্লিক ।

পরবর্তীকালে ইন্দ্রনাথের বিভিন্ন কান্ড-কারখানায় যখন ইন্দ্রনাথকে আদ্যপ্রান্ত আত্মসুখী স্বার্থপর মানুষ ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছে না, তখনও এই শুঁটকিমাছের এপিসোডের দৌলতে মিঠুয়ার কোথাও একটা গাঢ় বিশ্বাস 

রয়ে গিয়েছিল, মনের গভীর অতলে ইন্দ্রনাথের মধ্যে একটা ভালো মানুষের প্রবণতা  লুকিয়ে আছে, যা কোন না কোনদিন প্রকাশিত হবে। আর যদি প্রকাশিত নাও হয়, তবুও সে যথার্থই ভাল লোক, কারণ, যাবতীয় দুষ্টুমি,

নষ্টামি স্বার্থপরতা, তার অপরাধবোধকে উসকে দেয়, সে নিদারুণ কষ্ট পায়, কোথাও যেন, সেগুলো ড্রাঙ্ক অবস্থায় উগরে উঠে আসে অসহায়তার মোড়কে ।

     ভাবতে ভাবতে ভুলোমনা আবিষ্কার করল, সে এখনও নির্ঘাতভাবে বিশ্বাস করে ইন্দ্রনাথ একজন ভালো লোক। ইন্দ্রনাথকে ভালো ভাবতে ভাবতে ঘাসের ওপর বসে বসে রোদ পোয়াতে তার ভালই লাগল। কিন্তু তার শরীরের হাড়গোড় গুলো আটকে আটকে যাচ্ছিল। নড়াচড়া করা দরকার ভেবে ভুলোমনা উঠে দাঁড়াল। 

গুরুংদের কাউকেই এদিক-ওদিক দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু তারা নির্ঘাত হাত-পা চালিয়ে ভীষণ সব কাজেকর্মে ব্যস্ত। এরা কখনও শীতে জবুথবু হয়ে বসে থাকে না। এদের বুড়োরাও নয়। সব সময় নড়াচড়ার মধ্যে থাকে। ফলে এদের শীতে ধরে না। হাত-পা ছাড়াতে ছাড়াতে ভাবল ভুলোমনা, যত শীতে যেন ওকেই ধরে, শীতে ধরে যত , তত ঘুমেও ধরে।কাঁড়িখানেক ওষুধ খেতে হয় রাতে। মূর্তিমান আপদ ওগুলো। দূর হ। 

ডিসোসিয়েটিভ অ্যামনেশিয়া !! মুখ ভ্যাংচালো ভূলোমনা নিজেকেই। জুতো মারি এমন আ্যামনেশিয়ার মুখে।

মাথার মধ্যে যেন চোকলা করে করে চুল উঠে টাক পড়েছে। কিম্বা গালের মধ্যে গোল গোল ছুলি হয়েছে।

এমনি হল গিয়ে ব্রেনের মধ্যে আ্যামনেশিয়া । কিন্তু, মুশকিল হল, কে ভুলে গেছে? ভুলে গেছে ভুলোমনার মন।

কেউ তো কখনও বলে না ব্রেন ভূলে গেছে। কষ্ট যখন কেউ পায়  তার মনই তো কষ্ট পায়। কষ্ট পায় বলে ব্রেনের নিউরনগুলোর থেকে কিছু বিশেষ নিউরো ট্রা্ন্সমিটার বের হয়। ব্রেন থেকে কেমিক্যাল বেরোল বলে মনে দুঃখ হল এমন কি হয়? তবে, ব্রেনে কিছু ঝামেলা হয়েছে বলে ডাক্তার তাকে কেন মুঠো মুঠো ওষুধ খাওয়াচ্ছে? ঝামেলাটা মনে হয়েছে না ব্রেনে হয়েছে এই নিয়ে সাতসকালে ভুলোমনা ভীষণ ঝামেলায় পড়ে গেল।

ব্রেন আর মন কি এক? মন কোথায় থাকে? মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার স্থুলদেহ পড়ে থাকে। স্থূল দেহই গিয়ে মেশে পঞ্চভূতে । কিন্তু মন যাকে যোগীরা বলেন, সূক্ষ্মশরীর তা নাকি সঙ্গে যায়। এইজন্যই যোগীরা চেষ্টা করলে পূর্বজন্মের কথা মনে করতে পারেন । রিমপোচে পারে। রিমপোচে জানে, তার আগের আগের আগের জীবনের কথা। এরকম তার কত জন্মের কথা রিমপোচে জানে? আর ভুলোমনা কোন পাপে এ জন্মের কথাই ভুলে মেরে দিল তবে। কে ভুলে গেল? তার মন? না তার ব্রেন? ব্রেনকে তবু কতক আন্দাজ করা যায় !সে আছে ! সে যে আছে, তাকে যুক্তি বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয় দিয়ে বোঝা যায়, মাথার খুলি খুবলে দেখা যায়। কিন্তু মনকে দেখা যায় না। অথচ মন দিয়ে একজন আরেকজনের মনকে স্পর্শ করে। মন দিয়েই তো ইন্দ্রনাথ তাকে ধরেছিল ! মন দিয়েই ইন্দ্রনাথ তাকে গভীর আনন্দ দিয়েছিল, মন দিয়েই চরম দুঃখে ইন্দ্রনাথ তাকে ছুঁয়েছিল। 

আবার তার মন নিয়ে ইন্দ্রনাথ অসংখ্য বার অর্বাচীনের মত,. চূড়ান্ত নির্মমের মত খেলা করেছিল। যদি কথাটা এরকমভাবে বলা যায় যে ইন্দ্রনাথ তার ব্রেন নিয়ে খেলা করেছিল আর ব্রেনে কষ্ট দিয়েছিল, তবে সেটা কেমন

মজাদার বল লোফালুফির মত মনে হবে না ? 

      ভীষণ হাসি পেল ভুলোমনার। তাহলে ব্রেনে যদি কষ্ট না পেয়ে থাকে সে, আর কষ্টটা যদি মনেই পেয়ে থাকে, যার রেজাল্ট হল ট্রমা, স্ট্রেস, বার্ন আউট এবং ফাইনালি,

অ্যামনেশিয়া তাহলে ব্রেনের জন্য খামোখা এতগুলো ওষুধ সে খাচ্ছে কেন?

গুড কোয়েশ্চেন। নিজের মনে নিজেকেই বলল সে। এর ব্যাখ্যা খুঁজতে হবে।

এত কিছু খুঁজতে হবে কেন? নিজেকেই প্রশ্ন করল সে।

খুঁজতে চাই বলে? 

খুঁজে পাবে?

চেষ্টা চলুক!

বেশ চলুক।

কতদিন ধরে চলবে এই চেষ্টা! 

যতদিন না খুঁজে পাই।

অনন্ত অবসর থাকুক, কাজকম্ম থাকুক, দায়দায়িত্ব মাথার ওপর চিলের মতন চক্কর  খাক , পাক মেরে মেরে নেচে যাক সুখ-দুঃখ, কান্নাহাসির মত দৈনন্দিন জীবনের হতচ্ছাড়া বিষয়গুলো , অসুখ-বিসুখ এবং সেরে ওঠা,

সেরে ওঠার পর আবার অসুখ এবং বিসুখ চলতে থাকুক মূর্তিমান উপদ্রবের মত, কিন্তু খোঁজা চলতে থাকুক বিরামহীন অবিরত।

      কিন্ত নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ভুলোমনার মধ্যে থেকে। সে বলল, আর কতদিন?

সত্যিই আর কতদিন? প্রশ্নটা একটা বড়সড় বিদ্যুৎ ফলার মত আকাশ ফুঁড়ে বেরিয়ে এল যেন। চতুর্দিক থেকে রোদ চলে গেল। একে একে মেঘ জমতে শুরু করল। যেন আজ মেঘেদের বিশেষ জমায়েত আছে। পঞ্চায়েত গুরুতর মিটিং ডেকেছে। ক্রমে মেঘ কালো হতে শুরু করল। কালো এবং গম্ভীর। দুশ্চিন্তায় ঘন হয়ে  

এল মেঘের মুখ ! এত গভীর ছাইরঙা কালো হল সে রঙ, এখুনি যদি বৃষ্টি হয়ে ঝরে তারা না পড়ে যায়, জমে থেকে থেকে একসময় সে পাহাড় প্রমাণ ভারী হয়ে উঠবে আর বিস্ফোরণের মত ফেটে পড়বে প্রকৃতির বুকে।

ভুলোমনা দেখল, তার সামনে মেঘ, পেছনে মেঘ, ডাইনিং হলের লাগোয়া কলতলায় যেখানে বসে বাসন মাজে ঝি, সেই জায়গাটা ভ্যানিশ হয়ে গেছে। তার নাক, চোখ, মুখ দিয়ে ঢুকে পড়ছে মেঘ। মেঘ ঢুকে পড়ছে তার মাথার খুলির ভেতরে, যেখানে রয়েছে ঘিলু। ঘিলুর সঙ্গে মিশে যাচ্ছে মেঘ। আর আরও বেশী করে সব কিছু ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে তার মাথার মধ্যে। ফেরার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে যেন। রাস্তাটাই ভ্যানিশ, গোটা পথটাই মেঘ কবলিত আজ, সে তবে ফিরবে কিভাবে? কি যেন সব মনে পড়ার কথা ছিল, কিন্তু সব গভীর ধোঁয়ার জগতে হারিয়ে যাচ্ছে এক এক করে। সে পাগলের মত হাত নাড়াল। চোখের সামনে থেকে সরিয়ে দিতে চাইল আরও কিছু মেঘ। হাতের আন্দোলনে কিছু সরে গেল, তার জায়গা ভরাট করে নিল অন্য কিছু মেঘ।

      ভুলোমনা তড়বড় তড়বড় করে উঠতে লাগল, কাঠের সিঁড়ি বেয়ে। সিঁড়ি বেয়ে সে পড়ল বারান্দায়।

বারান্দায় কাঠের পাটাতনে শব্দ উঠল ঢ্যাব্‌  ঢ্যাব্‌। বারান্দা পেরিয়ে গেট পেরিয়ে সটান ঢুকে এল সে রিমপোচের ঘরে। রিমপাচে চোখ বন্ধ করে বসেছিলেন। একজন  দুঃখী মানুষ মনে হচ্ছিল তাকে। চোখ খুলে ভূলোমনাকে দেখতে পেয়ে তাকালেন তিনি। তাকালেন আর চেয়ে রইলেন। স্থানুর মত প্রস্তুরীবৎ হয়ে ঠায় চেয়ে রইলেন।

চেয়ে রইল ভুলোমনাও।

    ঠোঁট সামান্যমাত্র না নাড়িয়েই ভুলোমনা রিমপোচেকে বলতে থাকল।         –যেদিন প্রথম ‘হাসছ যে’-এই কথাটা আমাকে আমূল নাড়িয়ে দিয়েছিল, সেদিনই সম্ভবতঃ আমার বারোটা বেজে গেছিল।

কথাটা রিমপোচেকে বলার পরই তার মনে হল, রিমপোচে একটা প্রস্তরবৎ মূর্তিমাত্র যার নিঃশ্বাস পড়ছে কিনা, তাও পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে না। রিমপোচে উপলক্ষ মাত্র। কিন্তু বমির মত করে মনে পড়ে যাওয়া কথাগুলো বমি করা দরকার। কোথায়? এই কার্পেটপাতা, নানা রকমারি জিনিসে ভর্তি ঘরের মধ্যেই। সামনে বসে থাকা এই মানুষটা মহা কৃষ্ণগহ্বর  স্বরূপ হয়ে শুষে নেবে। আর একবার শুষে নিলেই ভুলোমনার আর কোনো দায় থাকবে না, কথাগুলো বয়ে বেড়ানোর। সে ভারমুক্ত হয়ে যাবে। এখন দারুণ বদহজমের সময়। তার এই কথার বদহজমে প্রকৃতিও ঘোরতর শ্বাসরোধী কৃষ্ণবর্ণ হয়ে উঠেছে। বিপদ আসছে…বিপদ। 

এক মহাবিপদের হাতে উলটপালট খেতে খেতে এদিক-ওদিক আছাড় খেয়ে পড়তে চাই না। বাঁচতে হবে। আমি বাঁচব। ঘোর প্রত্যয়ের সাথে একথা নিজেকে বলার সঙ্গে সঙ্গেই তার মনে পড়তে লাগল-সেদিন ইন্দ্রনাথ অফিস বয় ছোকরাটাকে দিয়ে পঁচিশবার দরজা বন্ধ করাচ্ছিল এবং খোলাচ্ছিল। 

-যাও, এটা জেরক্স করিয়ে আনো। আর শোনো যাবার সময় দরজাটা খুলে দিয়ে যাও।

– এনেছো জেরক্স করে? এবার এটা টাইপ করো, ওঘরে বসে আর দরজাটা বন্ধ করে দাও।

যত বার এই দরজা খোলা বন্ধের ঝকমারি ঘটছিল, এবং এত বেশিবার সেটা ঘটছিল, ততবারই ভুলোমনার সন্দেহ হচ্ছিল ইন্দ্রনাথের মনের মধ্যে কি যেন উঁকিঝুঁকি মারছে। কারণটা, যাইহোক এটা খুব স্বাভাবিক নয়। ইন্দ্রনাথ যেন অতিরিক্ত সচেতন হয়ে আছে যে, সে একটা মেয়ের সঙ্গে একা একটা ঘরের মধ্যে বসে আছে।তার বিরক্ত লাগা উচিত নাকি হাসি পাওয়া উচিত এই নিয়ে চিন্তাভাবনা করছিল সে। 

পরবর্তীকালে যখন সে ইন্দ্রনাথকে এই কথা বলেছিল সে, ইন্দ্রনাথ তার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল।

– আপনি বেশ ঝামেলার মধ্যে ছিলেন। 

-না, না। বাইরের দরজাটা যাতে দেখতে পাই, তাই আমি দরজা খুলে দিতে বলছিলাম। তোমাকে নিয়ে একা অফিসে বসে থাকার অস্বস্তিতে নয়।

-ও, তাই বুঝি।

 নাহ্‌। মিঠুয়ার সিদ্ধান্তটা বদলায়নি।

     সেসব দিনে ইন্দ্রনাথের প্রতি এক অমোঘ আকর্ষণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ইন্দ্রনাথকে সারাক্ষণ পর্যবেক্ষণ করা। এমনকি যখন দূরে থাকত, তখনও মিঠুয়া ইন্দ্রনাথের নীরবতাকে পর্যবেক্ষণ করত। যেন এক মজার টাইম পাস শুরু হয়েছে; যেটা আসলে একটা গোটা জীবনের পক্ষে একটা কাজের মত কাজ। 

এইসব দিনে ইন্দ্রনাথ ওর বান্ধবী সর্বানীকে নিয়ে আদিখ্যেতা করত। একদিন মিঠুয়া শুনল, সর্বানী একটা টয়োটা না কি, দামী ধরণের গাড়ি কিনতে চায়। সেটা কেনার ব্যাপারে তাকে সাহায্য করছে ইন্দ্রনাথ।

-আপনি কেন? ওর বর নেই?

-আছে।

-তবে, সে মাথা ঘামালেই তো পারে।

-সে, এসব ব্যাপারে মাথা ঘামায় না।

-আপনি বুঝি খুব করিৎকর্মা, এসব ব্যাপারে। 

-অফ কোর্স। 

ইন্দ্রনাথের সঙ্গে গাড়ি করে যাচ্ছিল মিঠুয়া। এমন সময় সর্বানীর ফোন এল। কিসব কথা বার্তা বলল। ইন্দ্রনাথ বলল, -হ্যাঁ, তাহলে বিকেল চারটে নাগাদই ফিক্স রাখো।

-আমার? তুমি যদি একটা সানগ্লাস দিতে পারো ভাল হয়৷

মিঠুয়া এত ভীষণ তাজ্জব হয়ে গেল। ইন্দ্রানাথ যে প্রচুর ভালবাসা, বন্ধুত্ব এসব নিয়ে বড় বড় লেকচার ঝড়ে, এটা তাহলে কি হচ্ছে, এই। গাড়ি কিনিয়ে দেবার হ্যাপা পোয়ানোর জন্য সানগ্লাস? বড় কটকট করে লাগছে চোখে ঘটনাটা।

     ছোটো থেকে শেখা এক কাঁড়ি জ্ঞানগমি পুরো পল্টন বেঁধে সার সার দাঁড়িয়ে গেল। কাউকে উপহার করে, বিনিময়ে কিছু আশা কোরো না। তখনই যারা এসব জ্ঞান বিতরণ করেছিল। মিঠুয়ার তাদের ওপর ঠাঁই করে রাগ হয় গেল। তারা  ছিল মিঠুয়ার বাড়ির লোকেরা।   আর তখনই তার মনে হল, কারুর উপকার করে বিনিময়ে কিছুই আশা করব  না, নিদেন পক্ষে ভালবাসাটাও না, এত উদার ও সহ্যশক্তি সম্পন্ন তারাও ছিল না। তারা হয়ত ইন্দ্রনাথের মত নির্লজ্জ হয়ে সানগ্লাস চাইত না। কিন্তু তার ছিল হিপোক্রিট। 

ইন্দ্রনাথটা হিপোক্রিট। আদিখ্যেতা করে বলে একরকম, আর করে আরেকরকম। ঠুসো মেরে দাঁত ভেঙে দিতে হয়। মিঠুয়ার ভেতরে আঁকুপাকু করে আমাকে বের কর আমাকে বের কর’ বলে কুঁই কুই করছিল একটা শব্দ। শাল্‌লা।শব্দটাকে মিঠুয়া  কোঁৎ করে গিলে ফেলল, কারণ আর কিছু না, ওই যত নষ্টের গোড়া সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা  জ্ঞানগর্ভ বাতেলাগুলো, ছোটবেলা থেকে জ্বালিয়ে যাচ্ছে। শাল্‌লা শব্দটা মুখ থেকে বার করলেই ব্যাটারা চোখ পাকিয়ে নির্ঘাৎ বলে বসত, কি অবনতি ! তোমার রুচিতে বাঁধলো না?  চেপে গেল মিঠুয়া।

    

    আরেকদিন ভীষণ হা-হা রবে হাসতে দেখল মিঠুয়া ইন্দ্রনাথকে ফোনে। এত  হাসির কি আছে?

-ইনি যিনি ফোন করেছিলেন, ইনি একজন এম.এল.এ। আমাকে খুব স্নেহ করেন।

মিঠুয়া ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়েছিল ইন্দ্রনাথের দিকে। স্নেহ করার আবার কি হল? এম.এল.এ জাতীয় লোকেরা আবার স্নেহ করতে জানে নাকি, ধান্দা ছাড়া?

-ওহ্ ! কিরকম স্নেহ ? 

এই ধর, হঠাৎ আজ আমার পঞ্চাশ হাজার টাকার দরকার হল, ইনি দিতে পারেন আমাকে।

 ইন্দ্রনাথ স্নেহ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত নাকি, সেই জনৈক ব্যক্তি ক্ষমতায় মুগ্ধ, গণ্ডগোল হয়ে গেল মিঠুয়ার।-ও। 

হ্যাঁ, শুধু ‘ও’-ই বলেছিল মিঠুয়া, ভাবল ভুলোমনা।   

আর তারপরই  ইন্দ্রনাথের জন্মদিন এসে গেল। মিঠুয়া মনে মনে চাইল ইন্দ্রনাথ তার সঙ্গে সময় কাটাক। 

আর ইন্দ্রনাথ কত বন্ধু-বান্ধব তাকে নিয়ে মাথায় তুলে নাচছে আর কারা সব তার বাড়িতে সন্ধ্যেবেলা খেতে আসছে, তাই জানাল। তাদের কারুর নাম সে জানাল না। সাধারণত, সে নাম জানাত না। মিঠুয়া প্রশ্ন করত-ওনার নাম? তখন নেহাতই বাধ্য হয়ে বলার মত করে ইন্দ্রনাথ তার নাম জানাত। সবসময়ই সে আধ্যাখ্যাঁচড়া ইনফরমেশন দেওয়া পছন্দ করত। আর সবসময়ই সে কিছুটা ইনফরমেশন চেপে রেখে দিত।এগুলো হল গিয়ে তার ধাত, ভাবত মিঠুয়া। কিন্তু উদ্দেশ্যগুলো পরিষ্কার হত না, তার কাছে।  

জন্মদিনে নেমন্তন্নের বহর  ভালই হবে হয়ত। এমনটা ভাবল সে আর তার সঙ্গে ঘোরতরভাবে এটাও পরিষ্কার হয়ে গেল, সেই আনন্দযজ্ঞে তার নিমন্ত্রণ নেই।

কাঁদতে লাগল সে। অসহ্য ক্রোধ আর অসহায় কান্নায় মাখামাখি হয়ে সে বলল ইন্দ্রনাথকে , নকল নিয়ে পড়ে আছেন আপনি, আসলের কি বুঝবেন? আপনার  কাছে তো ওইসব বাজে এম.এ.ল-রা জরুরী যারা কথায় কথায় আপনাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে পারে। আপনি ভাবেন, এরা সব আপনাকে ভালবাসে!

আপনমনে কাঁদতে লাগল মিঠুয়া।  

খুব কাতর গলায় ইন্দ্রনাথ বলল, কেঁদো না, আজকের দিনে কাঁদতে নেই। 

কতগুলো কথা আবার গিলে ফেলল মিঠুয়া। কেন আজকের দিনটা কি? আপনি কোন মহাপুরুষ জন্মেছেন বলে কৃতার্থ হয়ে থাকব? কি ন্যাকা রে বাবা! বেশ করব কাঁদব। আমার ইচ্ছে, আমি কাঁদব। দূর হোন, মূর্তিমান

বাজে লোক একটা। 

             

       এতগুলো-কথার কোনটাই তার মুখ দিয়ে বেরোলো না। বরং সে ফোন ছেড়ে উপুর হয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। কি ঘোরতর ছিল সেই উপেক্ষা! কি ঠাণ্ডা নির্মমতায় মোড়া। আর কি নিদারুণ সেই দুঃখবোধের আচ্ছন্নতা। নিজের মনে মিঠুয়া বলতে লাগল ইন্দ্রনাথ অজ্ঞান। ওর ধারণা নেই, কি বোকামি ও করছে। ওকে

ক্ষমা করাই উচিত। কিন্তু মহান যিশুখ্রিস্টের মত, সে কিছুতেই ক্রুশবিদ্ধের মত হৃদয় যন্ত্রণায় মরতে মরতে বলতে পারল না, প্রভু, ওরা জানে না, ওরা কি করছে। তুমি ওদের ক্ষমা করে দাও।

তার বদলে সে একটা সময় উঠে দাঁড়াল, এই ভেবে যে, ইন্দ্রনাথ শিতল শুঁটকি খেতে চাওয়া লোকটাকে জড়িয়ে ধরেছিল। তাই কোন না কোনদিন ওর হৃদয় সত্যের অনুসন্ধান করবেই করবে। মিঠুয়া বরং সেদিনের জন্য অপেক্ষা করবে।

          

         তখন শুরু হল এক বিরাট অপেক্ষা, যার জন্য নিজেকে বাজী ধরল মিঠুয়া। তবে, এরপর থেকে জন্মদিনগুলো ভুলে যেতে থাকে সে। প্রায় সকলেরই। যাদের যাদের সে চিনত। নিজের জন্মদিনটাকে ঘোরতর বিচ্ছিরি বলে মনে হচ্ছিল ওর। কোন পদের দিন ছিল না ওটা এরকমই বলত ও নিজেকে।

এইসময় একদিন ইন্দ্রনাথের সঙ্গে পার্কে বেড়াতে যায় ও। সেইসময় ইন্দ্রনাথের স্ত্রীর একটা ফোন আসে।

ইন্দ্রনাথ খুব অধিকার সঙ্গে তাকে প্রশ্ন করে, কোথায় যাচ্ছ? তারপর বলে, শরীর খারাপ? এই প্রশ্নটা সে দুবার করে। মিঠুয়া জিজ্ঞেস করে, ওনার কি হয়েছে? ওনার দু-মাস আগেই হিস্টেরেকটমি হয়েছে। মিঠুয়ার মনে হল,এই কথাটা ইন্দ্রনাথ তো ওকে বলেনি! কি আশ্চর্য! সেদিন নানা কথার মধ্যে দুজনে হাঁটছিল অনেকটা উদ্দেশ্যবিহীনভাবে। তখন ইন্দ্রনাথ ওর হাত ছুঁচ্ছিল-বারবার। ধরার জন্য! মিঠুয়া দিচ্ছিল না। এরকম ঘোরাঘুরির পর ইন্দ্রনাথ গাড়িতে উঠল। মিঠুয়া বলল, -আপনি কি চান? 

ইন্দ্রনাথ বলল, সেটা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলার দরকার আছে?

-আছে।

-কেন?

-আমি জানতে চাই, কিসের অভাব আপনি পুরণ করতে চাইছেন? ঠিকমত ভালবাসা পাননি জীবনে?

-পেয়েছি। আবার পেতে চাই। এতে অন্যায়টা কোথায়?

-আপনার স্ত্রী আছে, সে কি করবে?

-সেও থাকবে। তুমি আর আমি যদি দুজনে ভালবাসি, তাহলে তাদের সঙ্গে ভালবাসার, কর্তব্যের দায়িত্বের বিরোধ নেই।

-কেউ মেনে নেবে না। 

-জানবে না।

-জেনে ফেলতে পারে। এসব যেন কি করে জানাজানি হয়ে যায়।

-মনে হয় না।

-কিন্ত…

-বল?

-এটা একটা ঠকানোর মত কাজ না?

-না।

এটা নিজের একটা ব্যক্তিগত জীবন নিজের মধ্যেই রাখা। 

মিঠুয়া চুপ করে রইল।

তার কেন যেন মনে হতে লাগল, এভাবে দুজনকে সমান সমান ভালবাসা যায় না। কোন একজনের প্রতি ভালবাসাটা কম কম হয়ে যায়। সম্ভবত, সেটা পুরনোজনের প্রতিই হয়।

সে দোনামনা করে ইন্দ্রনাথকে বলল,

-আমার মনে হয়…আমার মনে হয়… 

– বল…

-আপনি আমাকে নষ্ট করবেন। 

গাড়িটা সাইড করে দাঁড় করানো ছিল। ইন্দ্রনাথ আস্তে আস্তে জানলার কাঁচ তুলতে শুরু করল আর মিঠুয়া প্রমাদ শুণল। মিঠুয়া বুঝতে পারল ইন্দ্রনাথ কি করতে চলেছে! কিন্তু সে হাঁ করে তাকিয়ে রইল।  

ইন্দ্রনাথ প্রথমে তার গালটা চেপে ধরল। তারপর আরেকটা হাত দিয়ে কাঁধটা জড়াল। কাঠ হয়ে গেল মিঠুয়া। নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ঘাড়টা শক্ত করে মুখ ঘুরিয়ে নিতে চাইল অন্যদিকে। কিন্তু ইন্দ্রনাথ জোর করে টেনে নিল মুখটা। পেরেও গেল। এবং আর কোথাও নয়, শুধু কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, ভয় পেয়ো না।

আমি নষ্ট করব না। মাথায় হাত বুলিয়ে দিল ইন্দ্রনাথ! আর মিঠুয়ার ইচ্ছে হল, ইন্দ্রনাথ কাঁধের ওপর এলিয়ে পড়ে। কিন্তু তার ওই জ্ঞানদায়ী মনটা মূর্তিমান বেয়াক্কেলের মত বলে উঠল, উঁহু উঁহু। হাউ ডেয়ার ইজ হি টাচিং

ইউ? ওর বোঝা উচিত, তোমাকে ছোঁয়া যায় না। তোমাকে ছুঁলে হাত জুলে যায়। ওর বোঝা উচিত এসব। তখন ইন্দ্রনাথ মিঠুয়াকে বলল, হাসো।

মিঠুয়া হাসতে পারল না। একটা উচিত হয়নি, উচিত হয়নি বোধ তাকে ভয়ানক জ্বালাতে লাগল। সে দুশ্চিন্তায় ডুবে গেল। আর দরজা খুলে নেমে সে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগল, একবারও পেছন না ফিরে।

     সেদিন রাতে ফোন করল ইন্দ্রনাথ । মিঠুয়া বলল, ব্যস্ত আছি ।ইন্দ্রনাথ ফোন ছেড়ে দিল। মিঠুয়ার মনে হল, ইন্দ্রনাথ যদি জোর করে নিজেকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করত, এর চেয়ে ঢের ভাল হত। কিন্তু মিঠুয়া যেমনটা চায়, যেমন ব্যবহার করলে ঠিক ঠিক ভালবাসা হচ্ছে, বলে মিঠুয়ার মনে হবে, তেমনটা ইন্দ্রনাথ কখনই করে না। পরদিন সে ইন্দ্রনাথকে ফোন করে জানাল, আমাকে সেই শুধু স্পর্শ করবে, যে আমার হাজব্যান্ড হবে, এমন আমার ইচ্ছে। আমি চাই না অন্য কেউ আমাকে স্পর্শ করুক !

নিমেষে ইন্দ্রনাথ বলল, এরকম শারমন দেওয়ার মত করে কথা বলছ কেন?

মিঠুয়া চুপ করে রইল।

ইন্দ্রনাথ বলল, তুমি তোমার শরীরকে পিওর রাখতে চাইছ। তোমার মনের পিওরিটির কি হবে? বাঁচাতে পারবে তোমাকে আমার হাত থেকে?

গভীর রাতে ইন্দ্রনাথ ফোন করল আবার। বলল, আমি তোমার প্রতি এত বেশী প্যাশন অনুভব করি, মনে হয়, তোমাকে জড়িয়ে আমার শরীরের মধ্যে সম্পূর্ণ মিশিয়ে ফেলি।    পরশু এসো শান্তনুদার বাড়ি। দেখা হবে। শান্তনুদার বাড়ি যাওয়ার দিনটা ছিল ঘোর দুর্যোগের দিন। কি কারণে যেন ইন্দ্রনাথ ব্যাজার মুখে বসেছিল। দেখে মনে হচ্ছিল ওর কিছু ভাল লাগছে না। বাইরে বারান্দায় কৌশিক ওকে বোঝাচ্ছিল শোন, তুই খেয়াল রাখিস। তুই একরাশ হাঙর কুমীরের মুখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছিস। এরা সবকটা ধান্দাবাজ। বেকায়দায় পেলেই তোকে খাবে। সাবধানে থাকিস। আসলে এই লেখালেখির লাইনটাই এরকম। এখানে শোয়াশুয়ি ছাড়া কিচ্ছু নেই।

-কেন বলত?

-দেখছিস না, মেয়ে দেখলেই এরা কেমন খাবলাতে চায়?

-কাকে খাবলেছে?

-সকলের খাবলানোর পার্টিকুলার লোক আছে। তাছাড়াও অন্য কাউকে পেলে চুপচাপ খানিকটা খেলে  নেয় ।

-কার কার পার্টিকুলার লোক আছে?

-সকলের।

-ইন্দ্রনাথ ?

মাথা নাড়ল কৌশিক, ইতস্তত হেসে।

-কে?

-নাম বলব না। জিজ্ঞেস করিস না।

কি করে ?

নানারকম কাজ আছে তার ?

-সে আবার কি ?

-হ্যাঁ গেস্টহাউস চালায়। ইন্টিরিয়র ডিজাইনিং-এর কাজ করে।

-লিপি ?

আবার মুচকি হেসে সম্মতি জানাল কৌশিক।

রাশি রাশি মেয়ের ভিড়ে মাত্র একবার ছোট্ট একটা প্রসঙ্গে লিপির কথা উল্লেখ করেছিল ইন্দ্রনাথ। খুব সামান্য। যেন কিছুই না। অফিসের কাজে কিছু গেস্ট এসে যেখানে আছে , সেখানে যাচ্ছি।

-কোন গেস্ট হাউস?

-আছে একটা, নিউটাউনের দিকে।

-কাদের ?

-এটা লিপি মিত্র নামে একটা মেয়ে চালায়।

এটুকুই। কোনো আদিখ্যেতা নেই। প্রেম প্রেম ভাব নেই। কিছু না।

সেই লিপি ! 

   মিঠুয়া ঘরে ঢুকে সকলের সামনে ইন্দ্রনাথের দিকে তাকায়। ইন্দ্রনাথ ওমনিই গুমসুম হয়ে আছে। কাল রা্ত্তিরের ফোনটা কি মিথ্যে ছিল? হতে পারে না ! একদিন হ্যাং-আউটে বসে আইমসক্রিম খাচ্ছিল মিঠুয়া।ইন্দ্রনাথ খাচ্ছিল কফি। চামচেটা রাখল মিঠুয়া।ইন্দ্রনাথ তুলে নিল সেটা। আইসক্রিম নিয়ে চামচেটা মুখে পুরল।

ইন্দ্রনাথ মিঠুয়ার দিকে তাকিয়ে। যেন চামচেটা নয়। মিঠুয়ার জিভটাকে মুখে পুরেছে ইন্দ্রনাথ। মিঠুয়া ঘোরতর লজ্জা পেল। চোখ সরিয়ে নিয়ে সে বলল, গরম কফির সঙ্গে ঠাণ্ডা আইসক্রিম খেলে ঠাণ্ডা লাগে ! চোখ না সরিয়ে ইন্দ্রনাথ বলল, লাগুক।-কাশি হয়।-হোক।

    মিঠুয়া লোকে গিসগিস করা ভরা হাটের মাঝে শান্তনুদার বাড়িতে মনে মনে প্রার্থনা জানাল, একবার বলুক ইন্দ্রনাথ। যা শুনেছি মিথ্যে।

ইন্দ্রনাথ গোমড়া হয়ে রইল।

আর তখনই পাহাড়ে দুদ্দাড় করে আওয়াজ হল। পরেরদিন সকালে মিঠুয়া যখন আয়নায় নিজের মুখ দেখেছিল , তখন তাকে গাধার মত লাগছিল, সে কথা মনে পড়ল ভুলোমনার। কি নির্বোধ, গবেট কোথাকার, বলেছিল সে নিজেকে। আবার সেই মুখটাকে উদ্দেশ্য করে ভুলোমনা বলল, গাধা।

         আর সঙ্গে সঙ্গেই রিমপোচের মুখ গাঢ় রক্তবর্ণ ধারণ করল। সেটা ক্রমে এত বেশী টকটকে লাল হয়ে গেল, মনে হল আগুন লেগে যাবে। হিমালয় ফুঁসে উঠে উগরে দেবে গরম লাভা চতুর্দিকে ত্রাহি ত্রাহি পড়ে যাবে। নির্দোষ মানুষজন সব ভয়ার্ত অবস্থায় ছুটতে শুরু করবে উদভ্রান্তর মত। চতুর্দিক থেকে শোনা যাবে-

‘আগুন আগুন’ গোটা পাহাড়ের প্রকৃতি তখন যেন আকাশ পরিব্যপ্ত করে ছড়িয়ে দেবে তার ঘোর কৃষ্ণবর্ণ  জটা ! হা-হা করে ভীষণ শব্দে হাসবে সেই পাগলিনী ঘোরা, মহাঘোরা, রোষবর্না  করালবদনা মহামায়া। মিঠুয়ার বিপুল দুঃখভারে অবনত, ভারাক্রান্ত ভুলোমনা অসহায়ের মত রোদন করতে লাগল। অকুল পাথারে পড়া মানুষের মত আকূল সে রোদন। ক্রমে ক্রমে রিমপোচের মুখ রক্তবর্ণ থেকে একটু একটু করে স্বাভাবিক সাদা হয়ে আসতে থাকল। তার চোখ হয়ে উঠল আর্দ্র! সেও অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকল ভুলোমনার সঙ্গে। বাইরে প্রকৃতিতে সদ্য শুরু হওয়া ঝড়ের তাণ্ডব হবার আগেই বিপুল পরিমাণে জমে থাকা মেঘেরা আরও নীচে নেমে এল। সঙ্গে সঙ্গে এ ওর গায়ে ধাক্কা লেগে ভারসাম্য হারিয়ে ঝর-ঝর বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ল পাহাড়ে। তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল  , কিন্তু বেঁচে গেল পাহাড়িরা একটা অবশ্যম্ভবী ধ্বসে বিপর্যস্ত হওয়ার হাত থেকে ! ঘরের মধ্যে জমে ওঠা গরম বাষ্প ঠাণ্ডা হয়ে গেল। তবু রিমপোচের দিকে তাকিয়ে থাকা ভুলোমনা আর ভুলোমনার দিকে তাকিয়ে প্রস্তরীবৎ বসে থাকা রিমপোচে তারা একে অপরের দিক থেকে চোখ সরাল না। তারা কেঁদেই চলল ততক্ষণ, যতক্ষণ বৃষ্টির বেগ কমে না আসল।

আট

    মিঠুয়ার প্রথমে ভীষণ দুঃখবোধ হয়েছিল। অহোরাত্র একটা দুঃখের বলয় তাকে ঘিরে রাখত সর্বত্র। ক্রমশঃ তা থেকে জন্ম নিল রাগ। একধরনের ঠকে যাওয়ার অনুভূতি। তাকে ঠকানো হয়েছে। অতএব, সে কোনো প্রশ্ন করবে না। কারণ, প্রশ্ন করলেই উত্তর দেবার একটা বাজে ধরণের প্রচেষ্টা হবে অথবা এড়িয়ে যাওয়ার। যাইহোক না কেন, এই সুযোগ সে দেবে না। সে চুপ করে থাকবে আর প্রতিমুহূর্ত ইন্দ্রনাথের সংশয় হবে, সে কি জানে, কতটা জানে। আর তাকে যে ঠকানো হয়েছে এই কথাটা সে চিরকাল মনে রাখবে।

মিঠুয়ার অতীতের সংকল্পের কথা ভেবে ভুলোমনা মাথা নাড়ল। হ্যাঁ, এরকম একটা কঠোর, কঠিন সংকল্প করা হয়েছিল বটে। ভাবতে ভাবতে চলতে শুরু করল ভুলোমনা। হঠাৎ কি ভেবে সে ঘরের দিকে গেল।আঠেরো হাতে নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল। এই হয়েছে এক ভ্বালা! মাঠের দিকে পাহাড়ের বাঁকে গোটা ছয়েক কুকুরছানা হয়েছে। মা কুকুরটা বাচ্চা পেড়ে মাঝেমধ্যে ওদের খোঁজখবর নেয়। আর মজার ব্যাপার ছ’টা কুকুর দল বেঁধে খেলা করে বেড়ায়। ভুলোমনা ওদের রোজ দুধ খাওয়াতে যায়। চক চক আওয়াজ করে দুধ খায় ওরা। সাদা সাদা দুধ মুখে লেগে থাকে।এখন প্রথমে দুধ কিনবে সে, তারপর, কুকুরছানাদের কাছে যাবে।

হাঁটতে হাঁটতে সে গুণতে শুরু করেছিল টোয়েন্টি, নাইন্টিন, এইট্টিন , সেভেনটিন অ্যান্ড  সিক্সটিন অ্যান্ড ফিফটিন ……থ্রি, টু, ওয়ান এন্ড জিরো! জিরো আসতে না আসতেই ভুলোমনার জিভ জড়িয়ে এল, চোখের মণি ওপরে উঠে গেল আর সে অতীতে প্রবেশ করল। গভীর অতীতে। যদিও তার পা দুটো সমানতালে চলতেই থাকল গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। গভীর রাত। ইন্দ্রনাথ ফোন করেছে। তোমাকে আদর করি ? -না।

-একটু করি?

-না।   

-ঘুম আসছে না ?

-না। 

-কেন? ঘুম আসছে না?

-এমনি

-কি মনে হচ্ছে?

-জানি না।

-আমার কাছে আসছে ইচ্ছে করছে?

-না।

-আমাকে জড়িয়ে ধরো।

-না।

 -ধরো। ঘুম পাড়িয়ে দেব তারপর।

মিঠুয়া একমুহূর্ত ভাবল। ইন্দ্রনাথ লোমশ শরীর। খসখসে চামড়া। অথচ অসুবিধেজনক কোন শারীরিক গন্ধ নেই। ভাবতেই একরাশ কাম যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। কাম থেকে জাগল প্রেম! জগৎ ভুল হয়ে যাওয়া মোহময়, সর্বত্র উথাল পাথাল করা এক প্রেম। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে মিঠুয়া ভাবল, ইন্দ্রনাথকে সে কি তীব্রভাবে ভালবাসে তবে!

-জড়িয়ে ধরেছো আমাকে?

-হুঁ।  

অন্যমনস্ক ভাবে বলল মিঠুয়া।

-মাথায় হাত বুলিয়ে দি।

-হুঁ।  

-চোখ বোজো। বুজেছো?

-হুঁ। 

চুমুর আওয়াজ পেল সে! চমকে উঠে অসহনীয় অস্বস্তিতে বলে বসল, 

-আমার ঘুম পেয়ে গেছে। রাখছি। 

বলেই ফোন কেটে দিল মিঠুয়া! 

   ফোনটা কেটে যেতেই কেঁউ কেঁউ আওয়াজ পেল ভুলোমনা। দেখল

ছ-ছ’টা কুকুরছানা তার আশেপাশে নেচে বেড়াচ্ছে। সে বসে আছে যে বাড়িটার পেছন দিকে কুকুরছানাগুলো থাকে সেখানে। একটা কলের পেছনে পাথরের বেদিতে থম মেরে বসে আছে সে। তিড়িং তিড়িং করে নেচে 

বেড়াচ্ছে ছানাগুলো। ভুলোমনার হাতে ধরা দুধের প্যাকেট তাই দেখে কেঁউ কেউ করে চ্যাঁচামেঁচি লাগিয়েছে। 

ভুলোমনা কাঁসিটাকে খুঁজল।কাঁসিটা যেটাতে ওরা খায়। সেটা একটু দূরে ঘাসের ওপর একপাশে পড়েছিল।ভুলোমনা সেটাকে জোগাড় করে কল থেকে ধুয়ে নিল । দাঁত দিয়ে  প্যাকেট কেটে দুধ ঢালল তাতে। তর সইছিল না ছানাগুলোর! চক চক আওয়াজ করে ছ’টা একসঙ্গে খাচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই খাওয়া শেষ করে মুখে গুচ্ছের দুধ মেখে লাফালাফি করতে লাগল ওরা। একটা আরেকটার ওপর চেপে বসবেই বসবে। সেও

দেবে না। আরেকটা ঢুকেছে একটা  গাড়ির তলায়। তার ল্যাজ ধরে টানছে আরেকটা। কোথা থেকে আরেকটা জুটে তিনটেতে একসঙ্গে গুটলি পাকিয়ে উল্টে পাল্টে গেল। এ্যাই,এ্যাই, কি হচ্ছে এ্যাঁ! চ্যাঁচালো ভুলোমনা। 

       একসাথে সবকটা আসতে শুরু করল। ছোট ছোট মুখ, ছোট মায়াবী চোখ…কি অপূর্ব! আর ছোট্ট টুকটুকে জিভ। ছানারা ছোট জিভ দিয়ে চেটে দিল ভুলোমনার হাত। এমনি সময়ে একটা লোক এসে হেঁকে হেঁকে বাচ্চাগুলোকে বলতে লাগল, বাউন্ডারিমে যাও। বাউন্ডারিমে যাও, রাস্তেমে খেলো গে, গাড়ি আ যায়েগা।

শুনেই বাঁশের বেড়া টপকে টপ টপ করে একেকটা বেড়ার ওধারে গিয়ে পড়তে লাগল।

-হ্যাঁ। উধার খেলো অব্‌। 

খুশী হয়ে লোকটা চলে গেল!

ভুলোমনা দেখল বেড়ার ওপাশে গিয়ে সবকটা আবার জড়ামড়ি করে পড়েছে। হুজ্জোতি করছে একে

অপরের সঙ্গে। ভয়ানক হাসি পেল ভুলোমনার। কিন্তু পাছে আবার ওকে দেখে সবকটা এপাশে চলে, আসে,তাই উঠে পড়ল ও।

তখন ইন্দ্রনাথের ফোন এল আবার মিঠুয়ার কাছে। মাতাল অবস্থায় ভুলোমনা আবার যেমন হাঁটছিল হাঁটতে লাগল।

-রোজ  ড্রিঙ্ক করেন কেন?  

– সঙ্গ পাবার জন্য।

-কার সঙ্গ?

-বন্ধুদের।

-তার মানে সঙ্গ পাবার জন্য আপনি সেইসব বন্ধুদের খোঁজেন যারা ড্রিঙ্ক করে ।

 আই মিন যাদের আপনার বন্ধু বলে মনে হয়?

-যাদের আমি বন্ধু ভাবি।

– সত্যি জানেন, তারা বন্ধু কিনা?

– জানিনা। মেনে নিই। আমার মৃত্যু কিরকম হবে জানো?

-কিরকম? 

-একটা ঘরে অনেক বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করব আমি। তারপর একসময় উঠে পাশের ঘরে চলে যাব।

মারা যাব। 

-হঠাৎ অতগুলো বন্ধুর সঙ্গে হট্টগোল করতে করতে মরবেন কেন?

-সবাই দেখবে। যারা আমাকে ভালবাসে।

-ভালবাসা ব্যাপারটা আপনার খুব দরকার, তাই না?

-হ্যাঁ আমি ভয় পাই যদি একা হয়ে যাই।  

-তাই কতগুলো লোক জুটিয়ে ড্রিঙ্ক করেন? 

উত্তর দিল না। ইন্দ্রনাথ।

বলল,-বাড়িতে যখন ড্রিঙ্ক করে ফিরি, আমার বউ যা বলে আমি মেনে নিই। এই যেমন মিনতির মায়ের মাইনেটা একশো টাকা বাড়ানো যায় কিনা। অমুক এই চাইছে, দেব কিনা। আমি সব হ্যাঁ বলে দিই। তারপর সকালবেলা সব ভুলে যাই। তখন বলি, কই বলিনি তো? আমার বউ কপাল চাপড়ায় আর বলে  এতগুলো বছর ধরে

একই ভুল করে আসছি আমি। 

খিক খিক করে হাসতে থাকে ইন্দ্রনাথ । 

-আপনি এরকম করেন কেন?

– ধুর, মদ খেলে একরকম বলি। মদ না খেলে আরেকরকম।

-আপনি কি হিপোক্রিউ!

-শোনো। লাইফ ইজ নাথিং বাট হিপোক্রেসী।

চড়াং করে রাগ হয়ে গেল মিঠুয়ার।

-হ্যাঁ , তাতো বলবেনই। কারণ আপনি নিজে হিপোক্রিট! 

-তাহলে, আমার সঙ্গে মেশো কেন?

-মিশি কারণ, আপনার মধ্যে কোথাও একটা জেনুইনিটি আনরিফাইন্ড অবস্থায় লুকিয়ে আছে দেখতে পাই।

-এরকম বোলো না। বলতে নেই। বরং বিশ্বাস করো, আমি ভাল লোক। যা বিশ্বাস করবে তাই দেখবে।বিলিভিং ইজ সিয়িং।

– না, বিশ্বাস করব না। সিয়িং ইজ বিলিভিং। আপনি ভালো লোক নন। কিন্তু ভালো হতে পারেন।

-কি করে ভালো করবে?

একমুহূর্ত ভাবল ভুলোমনা।

-নিজে ভালো থেকে দৃষ্টান্ত স্বরূপ হয়ে। 

-ওহ্‌।এইজন্য তোমাকে এত ভাল লাগে। সোনা, সোনা। মিঠ্‌ঠুমিয়া! 

গোমড়া মুখ করে রইল মিঠুয়া।

    বদমাইশ কোথাকার।যখন যেমন সুবিধে হবে বলবে। তারপর বলবে বিলিভিং ইজ সিয়িং। যেন ঈশ্বর।  

পিছমোড়া করে ঠ্যাঙাই অমন ছাতার ঈশ্বরকে। সত্যি সত্যি মিঠুয়ার বেধড়ক ঠ্যাঙাবার জন্য হাত নিশপিশ করতে লাগল। আর যত ঠ্যাঙাবার ইচ্ছে হল, তত ওর মনে হল ও ইন্দ্রনাথকে কি যে ভীষণ ভালবাসে। 

   যে সময় মিঠুয়া জানল লিপির কথা, সে বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে রইল। আর তার মনে হল, এমন অদ্ভুত ঘটনা পৃথিবীতে আর কোনদিন ঘটেনি। কোনকালে ঘটবেও না। সেই একমাত্র মানুষ যার বরাতে এমন অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে। 

       সে ভুলে গেল, বেমালুম বিস্মৃত হল, কতবার রাধারাণীর সঙ্গে এমন ভাগ্য বিড়ম্বনা হয়েছিল। বিড়ম্বিত ভাগ্যে ও কপালে করাঘাত করে সে কলহান্তরিতা নায়িকার মত রোদন করেছিল। বুক ফেটে ছিল। চোখে বাণ ডেকেছিল। কিন্ত প্রেম প্রেমের জায়গায় দাঁড়িয়েছিল অটল। 

     মিঠুয়া গাল পাড়ল নিজেকে গণ্ডমূর্খ বলে, তার আয়নায় দেখা

নিজেরই গাধার মত প্রতিবিন্ব হাজারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠল, তবু প্রেম টাল খেল না। আর ভালবাসব কি বাসব না এইরকম বিবাদ-বিতর্কে বাদী পক্ষের উকিল একনাগাড়ে প্রমাণ সহকারে সিদ্ধান্ত উপস্থিত করতে লাগল, ভালবাসার পাট  চোকানো দরকার। আর সে কেবলই বিবশ-বিহ্বল হয়ে বলতে লাগল, ভালবাসা বা ভাল না বাসা কি আমার হাতে? তর্কে বিতর্কে ক্রমাগত ভালবাসা জয়ী হতে লাগল। যতই ভালবাসা জয়লাভ

করল, মিঠুয়া দেখল সে নিজেই তার ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়ছে। অবশেষে আত্মসমর্পণ। ভালবাসার পায়ে। এই আগাগোড়া ঝামেলার সময়টায় ইন্দ্রনাথ কিসব মাথামুণ্ডু কাজে ব্যস্ত ছিল। মিঠুয়ার কাছে সেগুলো ছিল অল রাবিশ। তার ধারণা ছিল প্রেমের থেকে বেশী গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছুই জগতে থাকা উচিত না।

 এদিকে তখন ছিল বিয়ের মরশুম। প্রাণপণে সানাই বাজছিল তখন। জোড়ায় জোড়ায় মানুষ একসঙ্গে সুখী হবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। সেইরকম একটা ঘোরতর কর্মযজ্ঞে ভরা বাড়িতে বসে মিঠুয়া আবোলতাবোল ভাবছিল। যাদের বিয়ে হচ্ছে, তাদের দেখে মনে হচ্ছিল তারা বুঝি স্বর্গের চৌকাঠে পা রেঁখে দাঁড়িয়ে আছে। 

আপনমনেই বলল মিঠুয়া, স্বর্গে পৌঁছেছো ? স্বর্গ কত দূর?   

কাল অতিকষ্টে ইন্দ্রনাথ তাকে রাজি করিয়েছে দেখা করার জন্য। কারণ, ইন্দ্রনাথের বোধোদয় হয়েছে যে, এটা কিছু গণ্ডগোল হয়েছে। ইন্দ্রনাথ একদিন খুব ভয় প্রকাশ করেছিল। তার ভয় তার কারণে মিঠুয়া যদি কোনো কষ্ট পায়। মিঠুয়া আকাশ-পাতাল ভেবেছিল।একটা মানুষ এরকম ভয় পায় কেন? সেও কি একটা সম্পর্কের হাত ধরে স্বর্গে পৌঁছোতে চায়? পাছে স্বর্গ থেকে অধঃপতন হয়, তাই ভয় ? ইন্দ্রনাথের কাছে স্বর্গ মানে নীল মাঠ, হেমন্তের হলুদ শস্য, রামধনু রঙ, স্বর্গ মানে ছেলেবেলা, সন্দিগ্ধ চুন্বন, প্রথম। এক জীবনে কতবার স্বর্গে পৌঁছোতে হয় ? প্রত্যেকটা চুম্বন যদি প্রত্যেকটাই প্রথম চুম্বন হত…এমন সময় মোবাইলটা পিং করে। মিঠুয়া ইনবক্স খুলে দেখে, তিনটে শব্দ। 

-কেন…কেন..কেন?

অর্থাৎ এই নীরবতার অর্থ কি?

মিঠুয়ার দিশেহারা লাগল।

সেই বিয়েবাড়ির প্রাণপণ কর্মযজ্ঞ হারিয়ে যেতে বসল, চোখের সামনে। 

  

   পরদিন যখন সে ইন্দ্রনাথের কাছে পৌঁছেছিল সঙ্গে ছিল টিফিন ক্যারিয়ারে ফ্রায়েড রাইস । শরৎচন্দ্র মার্কা হয়ে যাচ্ছে। নিজের মনেই বলল মিঠুয়া। তবুও তার মধ্যে একধরণের শর্তহীন আবেগ কাজ করছিল।

    

    ইন্দ্রনাথ তাকে আপাদমস্তক দেখল। সরেজমিনে তদন্ত করার মত। আর তারপর বলল, তোমাকে এমন লাগছে যেন, আজ তোমার বৌভাত। কিছুক্ষণ এলোমেলো কথা হল। তারপর ইন্দ্রনাথ জিজ্ঞেস করল, তোমার কি হয়েছে? প্রশ্নটা সে করল সরাসরি মিঠুয়ার দিকে তাকিয়ে সত্যি সত্যি জানতে চাওয়ার ভঙ্গিতে। মিঠুয়া

ভাবল, এতদিন বাদে…? সে কথা খুঁজল। ঠিক কি বলবে সে? কি বলবে? সে কি বলবে, আপনি যা করেছেন, আমার ডিক্সনারিতে তাকে বলে ঠকানো । না কি সে চুপ করে থাকবে? কথা ঠিক কিভাবে শুরু করা উচিত।

প্রথম লাইনটা যদি ভেবে পাওয়া যেত! সে এদিক-ওদিক তাকাল। সারা ঘরে এ.সি.-র একটা ওঁ ওঁ শব্দ শোনা গেল। উত্তর পাওয়া গেল না। গোটা ঘরটা বোবা। গোটা ঘরের বোবা-ভাব সারা শহর ময় ছড়িয়ে পড়ছিল ধীরে ধীরে। কোথাও কোনো উত্তর নেই। চতুর্দিকে বিভিন্ন শব্দের ছড়াছড়ি আছে, অথচ একটা সঠিক শব্দ নেই যে শব্দটা মিঠুয়ার দরকার। ইন্দ্রনাথ মিঠুয়ার দিকে ঠায় চেয়ে ছিল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডই পার হয়েছে প্রশ্নটা মুখ থেকে বেরিয়ে মিঠুয়ার কান অবধি পৌঁছোনোর পর। মিঠুয়া এপাশ-ওপাশ হাতড়া-হাতড়ি করে ইন্দ্রনাথের দিকে তাকাল। আর হঠাৎ কেঁদে উঠল। তাতেই সব বলা হয়ে গেল।

ইন্দ্রনাথ উঠে এসেছিল চেয়ার থেকে। পকেট থেকে একটা রুমাল বার করছিল, কারণ সাধারণত সবাই সেটাই করে থাকে বলে। মিঠুয়া রুমাল নিয়েওছিল। কেন নিয়েছিল সে জানে না। না নিয়ে আর কি করা যেত?

রুমালটা কি ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া উচিত ছিল ঘৃণায়? প্রত্যাখ্যানের মত? কে জানে? ইন্দ্রনাথ একইসঙ্গে দুটো মানুষ হয়ে গেছিল। একজন ইন্দ্রনাথ ভাবছিল, যা হয়েছে তা ভাল হয়নি। সে কষ্ট পাচ্ছিল। সত্যি কথা বলতে কি, মিঠুয়ার কষ্ট দেখে তার বুকের ভেতরে হাঁচোড়-পাঁচোড় করছিল। আরেকজন ইন্দ্রনাথ তৈরি হচ্ছিল, যে ভাবছিল যা হবার তা তো হয়েছে । এবার মোকাবিলা করতে হবে শক্ত হাতে পুরুষকারের প্রচণ্ডতা দিয়ে কিছুক্ষণ পর ইন্দ্রনাথ বলল, দুটো আলাদা কম্পার্টমেন্ট। একটার সঙ্গে আরেকটার বিরোধ নেই। তুমি দুটোকে মিশিয়ে ফেলছ

কেন?

অনেক অনেক কথা গলগল করে বলা যেত। কথাগুলো সবাই জানে। জানা কথা। অধিকার বোধ, সততা,লয়ালটি, বেবফাঈ এসব নিয়ে আচ্ছা আচ্ছা ভাষণ দেওয়া যেত। কিন্তু মিঠুয়ার শুধু মনে হল, কি লাভ? সে ইন্দ্রনাথের একটা যুক্তিকে অগ্রাহ্য করে উঠতে পারল না কিছুতেই। একজনকে ভালবাসলে আরেকজনকে কি ভালবাসা যায় না ? মিঠুয়ার যুক্তি,বুদ্ধি আবেগ সবকিছু সায় দিয়ে বসে রইল। তা আর না যাবার কি আছে ? কিন্ত মিঠুয়ার ভেতরে জ্ঞানদায়ী মিঠুয়াটা ক্যাট ক্যাট করে উঠল,কিন্ত যে  কোন একজনের প্রতি মনোযোগ কমে যাবেই যাবে। নরম মিঠুয়াটা আবার মুষড়ে পড়ে তা ঠিক, তা ঠিক , বলে ফেলল। 

ইন্দ্রনাথ জিজ্ঞেস করল,

-তাহলে তুমি আর আমার সঙ্গে মিশবে না!

মিঠুয়া বলল, একটা সম্পর্ক সবসময় অনেক উত্থানপতনের মধ্যে দিয়ে গিয়েও যদি টিঁকে থাকে, তবে  বোঝা যায় সেটা খাঁটি কিনা। আমার মনে হয়, এরকম নানান ঘটনার মধ্যে দিয়ে এটা পরিক্ষিত হওয়া দরকার। 

হায় কপাল!

 সে এটা কেন বলল? মরতে? সে কেন বলল সে নিজে কি জানত! নাকি ধীরে ধীরে সে তার নিয়তি নির্ধারিত পথে একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছিল। সে পথ ছিল তার প্রতি ইন্দ্রনাথের আকর্ষণের মতোই অমোঘ,অনিবার্ধ। সেটা ছিল বিধাতার ডাক। নিশি পাওয়ার মতো সে ডাক। মিঠুয়া নিজের অজান্তেই পূর্বনির্ধারিত

বিধিলিপির টানে হয়ে পড়ল বিধাতার গ্রাস। ইন্দ্রনাথ ভ্যাবাচ্যাকার মত তার দিকে তাকিয়ে বলে বসল, 

-তোমাকে আজ ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। 

সমস্ত অন্যায়,শঠতা, মিথ্যাচারের মধ্যে দিয়েও এই কয়েকটা কথার গভীর সত্যতা মন্দিরের গম্ভীর  ঘণ্টাধ্বনির মত চরাচর কাঁপিয়ে শব্দ তুলল ঢং, ঢং, ঢং।

ইন্দ্রনাথ আবার বলল, 

-সব তো ঠিকই ছিল। কি হয়ে গেল না? মিঠুয়া বলল,

– সব ঠিক ছিল না।

-কি ঠিক ছিল না গো?

মিঠুয়া চুপ করে গেল। এটা তোমার দায়িত্ব ইন্দ্রনাথ নিজের মুখে স্পষ্ট করে আমাকে সবকিছু অবহিত করানো। যতক্ষণ তুমি তা না করছ, আমি এই মুহূর্তে জেহাদ ঘোষণা করলাম, তুমি আমার কাছ থেকে যা চাও, তা পাবে না।

    

   এক অসহনীয় ঠাণ্ডা লড়াই নিজে নিজেই শুরু করে দিল মিঠুয়া। সেই অসম অনাকাঙ্ক্ষিত ঠাণ্ডা লড়াইয়ে নিজেকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ইন্দ্রনাথের আমিত্বকে ছোট করে ছেঁটে দিল সে। আর ইন্দ্রনাথ শুরুয়াৎ থেকে একটু একটু করে মিঠুয়ার আড় ভাঙিয়ে এগোতে এগোতে দুম-দাড়াকা একটা বাধার সামনে পড়ে গেল। ইন্দ্রনাথের 

শরীর সর্বস্বতার মধ্যে ছিল আমিত্ব পরিপুষ্টির বন্দোবস্ত। সেইখানে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল মিঠুয়া। ইন্দ্রনাথ আবার বলল, -তোমাকে যেতে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে না। 

কথার মধ্যে মিথ্যে ছিল না। অথচ মিঠুয়া ভাবল, তার অপমানের কথা । যা তার প্রাপ্য ছিল না,কিন্তু তাকে পেতে হয়েছে। কিন্তু সে চলে গেল আপোষে।

-গাধী। জ্ঞানভাণ্ডার আগলে বসে থাকা মিঠুয়াটা ভেতর থেকে বলে উঠল।

– আসলে তুই মরেছিস।তুই দুর্বল হয়ে পড়েছিস এবং তুই সেকথা জানিস। দুর্বলতা ইজ ইক্যুয়াল টু ভয়, ভয় ইজ ইক্যুয়াল টু মরণ। যো ডর গ্যায়া সো মর গ্যয়া । মুই-মরবি। তুই মর। আফশোস করল মিঠুয়া।  

আপোষ করা হয়ে গেল নাকি?

 ভেংচি কাটল আরেকটা মিঠুয়া। গোল্লায় যা।

এইসময় ভীষণ চমকে উঠে ভুলোমনা ফিরে এল মিঠুয়া থেকে ভুলোমনাতে । পাহাড়ি ঠাণ্ডায় বসে বসে ভুলোমনা ভাবল, সামন্তটা এগজ্যাক্টলি কে? কিছুতেই মনে পড়ছে না। সামন্তও কি ইন্দ্রনাথের মত কেউ,যার সঙ্গে সে পরের এপিসোডে জড়িয়ে পড়েছে? সামন্তও কি ইন্দ্রনাথের মত ভালবাসার মোড়কে আসলে শরীর চায় আর শরীর পাওয়া হয়ে গেলে কতগুলো দায়িত্ব পালন করে শোধবোধ করে নেয় ? শরীর এবং দায়িত্ববোধ, দায়িত্ববোধ এবং শরীর এই ব্যাপারটাই কি পুরুষ প্রজাতি? গোটা ব্যাপারটাই একঘেয়ে আর বিরক্তিকর।সামন্তই বা আর কত মহান হবে। 

ভুলোমনার মনে হল, সামন্তের ব্যাপারে তার যথেষ্ট সাবধান হওয়া দরকার। এত যে দায়িত্ববোধ সামন্তের তার প্রতি তার বিনিময়ে সামন্ত কি আশা করে ? আশা তো নিশ্চয় কিছু করে। 

পৃথিবীর এই আদান-প্রদান, বিনিময় মূল্যর বাইরে সে কি কোনদিন পৌঁছতে পারবে? সেইখানে? যেখানে বিনিময়মূল্য নেই?

নয়

নিয়মমাফিক ফোন আসে। কথা হয় গতানুগতিক। ইন্দ্রনাথের| তেমন কোন অপেক্ষা নেই ভুলোমনার। কবে থেকে কি এক আশ্চর্য প্রক্রিয়ায় সব উচাটন শেষ হয়ে গেছে। মন কিরকম পাল্টি খায়। বহুরূপীর মতো রং বদলায় ! আশ্চর্য লাগে ভুলোমনার। 

 ইন্দ্রনাথ প্রশ্ন করে শরীর কেমন? কি করছো? কেমন আছো? এইসব। তারপর নিজের কি এক তাড়াহুড়োয় হড়বড় করে বলে ওঠে ইন্দ্রনাথ-ঠিক হয়ে যাবে। ঠিক হয়ে যাবে। যেন ঠিক না হয়ে উপায় নেই ভুলোমনার। ভুলোমনা ঠিক হলে ইন্দ্রনাথ যেন বাঁচবে।

 নিয়মমাফিক ফোন ধরতে ধরতে অনেক সময় ফোন ধরতে ভুলে যায় ভুলোমনা। ফোন ফেলে রেখে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায় ও। মিস্ড্‌ কল দেখতে পেলে কল করে নেয়। গোটা ব্যাপারটাই হয় কেমন যেন পানসে পানসে ভাবে। একটা কবিতা টোকা আছে তার পুরনো ডায়েরিতে। সেই কবিতাটার মত লাগে ভুলোমনার নিজেকে। আই ফ্যান্সিড ইউ উড রিটার্ন দ্য ওয়ে ইউ সেইড। বাট আই গ্রো ওলড্‌ এ্যান্ড ফরগেট ইওর নেইম। আই মেইড্‌ ইউ আপ্‌ ইনসাইড মাই হেড। সত্যি ইন্দ্রনাথ কি আর কোনদিন ফিরবে, তার জীবনে সেই আগেকার মতো থ্রিল নিয়ে? 

  তা আর সম্ভব নয়। তারচেয়ে এটাই যেন বড় বেশী সত্যি হবে যে ভূলোমনা ক্রমশঃ বুড়ি হয়ে উঠবে আর ভুলে যাবে ইন্দ্রনাথের নামধাম। এক গাঢ় আ্যামনেশিয়ায় সে মুক্তি দেবে ইন্দ্রনাথকে। আর মিঠুয়া; মিঠুয়া বলে যে কেউ ছিল , যে ইন্দ্রনাথকে রচনা করেছিল তার মনের মধ্যে, সে লুপ্ত হয়ে যাবে পৃথিবী থেকে।

 এখনও মিঠুয়া বেঁচেবর্তে আছে,সামন্তের তক্তাবধানে।ভুলোমনা দেখেছে,সামন্ত তাকে মিঠুয়া বলে ডাকে আর সবসময় তার কি দরকার তাই জিজ্ঞেস করে। তার একটা জীবনদর্শন দরকার,মনে হয় ভুলোমনার। সেই জীবনদর্শন অনুসারে সে দিনগুলোকে সাজিয়ে ফেলবে। এরকম ফ্যা-ফ্যা করে ঘুরে বেড়াবে না দিবা-রাত্র। কিন্তু সে কথা সামন্তকে কখনও বলে না ভুলোমনা যে আমাকে একটা জীবন-দর্শন পাঠিয়ে দিও। এদিকে সামন্ত পইপই করে তাগাদা দিতে থাকে, তার যা যা দরকার সে যেন বলে। সামন্ত নিজে এসে দিয়ে যাবে। একদিন কি ভেবে সামন্ত তাকে বলে, তার কি ওই বালাপোষটা দরকার,যেটা ছাড়া সে ঘুমোতে পারত না! ভুলোমনা আকাশ-পাতাল ভাবে , কোন বালাপোষের কথা বলছে সে ? তার এইরকম কোন আদরের বালাপোষ ছিল বুঝি? এককালে? যদি থাকেও, ওমা, সেটা ছাড়া তো দিব্যি বেঁচে থাকা যাচ্ছে। তাহলে আবার সেটা বয়ে বয়ে নিয়ে আসার কি দরকার এদিকে সামন্ত আবার চায় সেটা দিতে। বলে, চাও ? দিয়ে যাব ? ঝামেলা! এ ম্যাগো, এরকম একটা অপদার্থ জিনিস, যার মধ্যে না জানি কি কি স্মৃতি মিশে আছে, সেটা নিয়ে সে কি করবে। হঠাৎ গা বমিবমি করে ওয়াক্‌ ওঠে ভূলোমনার। সে ওয়াক্‌ তুলছে শুনতে পেয়ে, তড়িঘড়ি সামন্ত বলে, আচ্ছা,থাক,থাক। দরকার যখন নেই।

 কিন্তু গা বমি বমি ভাবটা কমে না ভুলোমনার। ওয়াক্‌ তুলে তুলে সে নিজেকে শেষ করতে থাকে। মুখে কনকনে ঠাণ্ডা জলের ঝাপটা মারে। ঘরের বাইরে এসে ঠাণ্ডা হাওয়া লাগায়। কতগুলো পুরনো জিনিসপত্র এমনি

দমবন্ধকর হতে পারে, হতে পারে এত বিবমিষা উদ্রেককারী এ যে ভাবা যায় না ! ভুলোমনাকে মাথা হেলিয়ে একা ভরসন্ধ্যাবেলায় বেঞ্চিতে বসে থাকতে দেখে সন্দেহ হয় গুরুং-এর। হনহনিয়ে আসে গুরুং ভুলোমনার কাছে। -শরীর খারাপ?

রক্তচক্ষু খুলে ভুলোমনা তাকায় গুরুং-এর দিকে। গুরুং জিজ্ঞেস করে-কি কষ্ট হচ্ছে?

-গা বমি বমি।

-হজম হয়নি, কি ব্যাপার বলত? তুমি তো তেমন কিছু খাওনি?

-না, মানে ওই আর কি। আসলে, মনে হচ্ছে কিছু জিনিসপত্র যেন আমায় চেপে ধরছে। যত চেপে ধরছে, তত গা-টা গুলিয়ে উঠছে।

-জিনিসপত্র?

 হতভম্ব হয়ে-যায় গুরুং। হাতটা ধরে ভুলোমনার পালস্‌ দেখে। তারপর বলে, ওঠো, এখানে ঠাণ্ডা লেগে যাবে। ভুলোমনা টলমল করে উঠে দাঁড়ায়। গুরুং বলে, চলো। আমি ধরছি। ভুলোমনা চলে।

 গুরুং তাকে নিয়ে যায় রিমপোচের ঘরে। সেখানে সাত-আটজন লোক বসে রিমপোচের কথা শুনছিল।

রিমপোচে একটা গল্প বলছিলেন। ভুলোমনাকে দেখে ঈশারায় বসতে বললেন। ভুলোমনা একটা সোফার ওপর গুটিশুটি হয়ে বসল। রিমপোচে আবার তার গল্প শুরু করলেন। “যীশুখ্রিস্টের নাম আপনারা শুনেছেন? উপস্থিত সকলে মাথা নাড়লেন। একবার এক ধনী লোক যীশুখ্রিস্টকে অবতার ভেবে জিজ্ঞাসা করলেন, শাশ্বত জীবন লাভের জন্য আমি কি করব? যীশু তাকে বললেন, “ফিরে যাও, যা কিছু আছে বিক্রি কর ও দরিদ্রকে দাও।তারপর এস, তোমার প্রাপ্য যন্ত্রণা ভোগ কর ও আমায় অনুসরণ কর।” এই শুনে ধনী লোকটি বিষাদাচ্ছন্ন হল । দুঃখিত হয়ে চলে গেল; কারণ তার বহু সম্পত্তি ছিল। সে ভাবল, যিশুর কাছে গিয়ে সম্পত্তি খুইয়ে লাভ কী? 

 উপস্থিত সকলে হেসে উঠল। ভুলোমনার মোটে হাসি পেল না সে তার পূর্ব দিনের সঞ্চিত মূল্যহীন,বহুমূল্য ও অমূল্য সব ধরণের জিনিসপত্রের নিলাম লাগিয়ে দিল মনে মনে। আর তখনই সে টের পেল তার গা-বমি ভাবটা চলে গিয়ে বদলে কি এক পরমশান্তি ঘুমের আকারে ধেয়ে আসছে তার দিকে। ঐ এল-ঐ এল।

চোখের সামনে সেই মহাঘুমের তরঙ্গকে ধেয়ে আসতে দেখল ভুলোমনা আর অচিরেই সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করল ঘুমের হাতে। রিমপোচের ঘরে বেহুঁশ হয়ে ঘুমোতে লাগল ভুলোমনা। জগৎ লয়প্রাপ্ত হল। সে আছে আর পরম শান্তি স্বরূপ এক অদৃশ্য অস্পর্শনীয়, ভাবনাহীন ঘুম আছে। যেন কতকাল নির্ঘুম একলা জেগে কাটিয়ে বহু তপস্যার ফলে এমন এক ঘুমের নাগাল পেয়েছে সে। বেহুঁশ ঘুমে আক্রান্ত ভুলোমনাকে ফেলে সকলে একে একে চলে যেতে লাগল। রিমপোচে ঈশারায় একজনকে ডেকে তার গায়ে একটা গরম কম্বল চাপা দিয়ে দিতে বললেন।

 পরদিন সকালটা ছিল পরম শান্তি দিয়ে মোড়া। মাথার ভেতরে কোলাহল যেন থেমে গেছে। পৃথিবী এমন এক অমোঘ নিয়মে তার কাজ করে চলেছে,কোথাও যেন কোন ছন্দপতন নেই ! দেবেন্দ্র কোথাও তার কাজে ব্যস্ত আছে। গুরুং ব্যস্ত। চাচীর ঢের কাজ বাকি । পিসির যেন মরবার সময় নেই। এতবড় একখানা সংসারের চাকা তার হাতেই ঘর্ঘর শব্দে ঘুরে চলেছে কিনা। 

 ফাঁকা মাথা, হাওয়া-হাওয়া মন নিয়ে ভুলোমনা হাঁটতে হাঁটতে গেটের সামনে এসে দাঁড়াল। চিকুর অনেকদিন দেখাপত্তর নেই, কোথায় লা-পাতা হয়ে আছে। চুরি-ডাকাতি করছে বোধহয়। সবই পেটের দায়ে

করে ও। এবার চিকু ফিরলে মোড়ের দোকান থেকে চিকুকে ভুলোমনা কেক কিনে খাওয়াবে। চিকুর ব্যাপারে সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ভুলোমনার কুকুরছানাগুলোর কথা মনে পড়ল। ওগুলোর আলাদা আলাদা করে নাম

দিতে হবে। সবকটাকে মার্কিং করে নাম দিতে হবে। নয়তো এত একরকমের দেখতে,গুলিয়ে যাবে। ভুলোমনা এক প্যাকেট দুধ কিনল ছানাগুলোর জন্য। দুধ কিনে হাঁটতে লাগল সেই মাঠটার দিকে। কিন্তু যাওয়ার পথে এক গ্রামবাসী সাইকেল নিয়ে যেতে যেতে ভুলোমনাকে এক অজীবসা খবর দিল। বো এক তো মরগয়্যা। দেখা নহী? কে আবার মরে গেল। এই পৃথিবীতে দুমদাম করে কেউ না কেউ মরে কেন?-কে?-আরে, বো কুত্তা, গাড়ি কা নীচে আ গয়্যা থা।-হোয়্যাটঃ! ভুলোমনা দৌড়তে শুরু করল। তীরবেগে। সে শর্টকাট মারল। বড় রাস্তা না ধরে আদাড়-পাদাড় পেরিয়ে সে বেড়ার ওপাশ দিয়ে ঢুকল। বাগানের ধার ঘেঁষে বাড়িটার সামনে একটা গাড়ি দাঁড় করানো আছে, ভুলোমনা উঁকি মেরে দেখল,গাড়ীটার তলায় সবকটা একসঙ্গে জড়ো হয়ে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে আছে। ওদের দৃষ্টি অনুসরণ করে ভুলোমনা দেখতে পেল দশ গজ দূরে মেঠো পথের ওপর ছানাটা মরে পড়ে আছে। সবচেয়ে তাগড়াটা। ওটা খেত বেশি আর ভয়ডরও কম ছিল একটু। সেই মোপেড চড়ে ঘুরে বেড়ানো লোকটাও যেতে যেতে বলে গেল, সবচেয়ে তাগড়া ছিল যেটা সেটাই গেল। লোকটা দুঃখিত ছিল, বোঝাই যাচ্ছিল। কিন্তু সে তাড়াহুড়োর মধ্যে ছিল। আর দুঃখ-টুঃখ দেখিয়ে বেড়ানো লোকটার অভ্যেসও ছিল না। লোকটা চলে যাবার পর চুপিসাড়ে ভুলোমনা মরা কুকুরছানাটার গায়ে হাত রাখল। মুখটা ফাঁক হয়ে দাঁত বেরিয়ে আছে। শক্ত হয়ে যাচ্ছে বলে বন্ধ করা সম্ভব নয়। দাঁত চেপে চেপে হাওয়ায় বলল সে, যা যা ভাগ। এখানে ঘুর ঘুর করিস না। গিয়ে আবার জন্মাগে যা। গাড়ীর তলা থেকে বাকী ছানাগুলো দেখছিল ওদের। কেউ ভুলোমনার কাছে দৌড়ে এল না। নেচে নেচে বেড়ালো না চারপাশে । ওরাও প্রথম মৃত্যু দেখেছে। ওরা ভাবতেই পারছে না, ওদের সঙ্গে খেলা করতে করতে ওদের একজন হঠাৎ এইভাবে মরে যেতে পারে। বেশ ঘাবড়ে আছে ওরা। মা কুকুরটা আজ পাড়া বেড়াচ্ছে না। কাছেই বসে আছে। আচ্ছা,ওর কি সন্তান হারানোর যন্ত্রণা 

হচ্ছে? নাকি ও অন্যগুলোকে প্রোটেকশন দিচ্ছে? দেখে মনে হচ্ছে ওর সম্ভান হারানোর যন্ত্রণা হচ্ছে। ও একবার দেখেই মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাচ্ছে। এরকম মানুষরাও করে। যাকে দেখে কষ্ট হচ্ছে, রাগ হচ্ছে ইত্যাদি সে জীবিতই হোক বা মৃত-তাকে একটু দেখেই মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিয়ে তাকিয়ে থাকে । ভুলোমনা গামলায় দুধ ঢালল। গামলাটা গাড়ির কাছে নিয়ে গিয়ে বলল, আয়। নড়তে চাইল না কেউ। তবুও ডেকে চলল ভুলোমনা। টুকটুক করে আসতে থাকল ছানারা। তারপর শুধু চুক চুক চুক চুক। পেটে দুধ পড়তেই ভয়টা কেমন কমে কমে যেতে লাগল, বুঝতেও পারল না ওরা। তখন আপনা আপনিই লেজগুলো নড়তে লাগল।

 ছানাগুলোকে নিরাপদে গাড়ির তলার শেল্টারে পাচার করে ভুলোমনার মনে পড়ল আরও দুটো লিকপিকে ছানার কথা। মনুষ্যছানা। এই মনুষ্যছানাগুলোর পেছু পেছু তার মনে পড়ল দেবারুণের কথা। এমন একটা সুন্দর সকালে এমন বিচ্ছিরি স্মৃতি মনে আসছে কেন? নিজের মনেই ভাবল সে। যাক গে, যা মনে পড়ছে, পড়ছে। ভেতরে আটকে থাকার চেয়ে মনে পড়ে বেরিয়ে মুক্ত হয়ে যাক তারা। যত্তসব।

 ছানাদের কথায় ভুলোমনা ভাবল, একবার যখন সে মিঠূয়া ছিল তখন, পাশের বাড়ির দুই যমজ মানুষছানার একজন যারপরনাই রোদন করেছিল। পুরো একদিন লাগাতার তার কান্না শোনার পর মিঠুয়া অস্থির হয়ে তাদের বাড়ি গিয়ে কড়া নাড়ে এবং তাকে কাঁধে ফেলে পিঠে ম্যাসাজ করতে থাকে। বাচ্চাটা বেশ কটা ঢেকুর তোলে এবং ঘুমিয়ে পড়ে। এই ঘটনায় আপ্লূত হয়ে মিঠুয়া ফোন করে ফেলে দেবারুণকে। দেবারুণ তখন তার শ্বশুরবাড়িতে ছিল, যেখানে তার শ্বশুরের মৃত্যু হয়েছিল। এতটা ভাবার পর ভুলোমনা সেই বাড়িটা যেখানে সে থাকত, সেটা মনে করার চেষ্টা করল। কিন্তু একটা নির্জন সিঁড়ির চাতাল ছাড়া বাড়িটার আর কিছুই মনে পড়ল না ভুলোমনার। অথচ দেবারুণের সঙ্গে কথপোকথনটা যে অতক্ষণ চালাবার মতো কিছুই ছিল না সেটা বেশ মনে পড়ছে। মাঝখানে দেবারুণ একবার ফোন ছেড়ে আবার ফোন করে আরও বেশীক্ষণ কথা বলেছিল, এটাও মনে পড়ছে। কথপোকথনের মূল বিষয়বস্তু ছিল বাচ্চাটার ঢেকুর তুলে ঘুমিয়ে পড়া এবং এটা পৃথিবীর কত সুন্দর ঘটনাদের অন্যতম হতে পারে এবং আরও নানাবিধ সুন্দর ঘটনার সঙ্গে এটাকে কিভাবে জোড়া দেওয়া যেতে পারে এবং কোন কোন চেনাশুনা মানুষের জীবনে এমন ঘটনা, ঘটনা হয়ে এসেছে এবং কাদের ক্ষেত্রে আসেনি এবং এই কথোপকথনের থেকে দেবারুণের সঙ্গে তার শ্বশুরের মরার সম্পর্ক কি তা কি করে বোঝা যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। মিঠুয়া দেখল, যে বাড়িতে একজন মারা গেছে এবং লোকজন আসা-যাওয়া করছে, সেখানে বসে কোনো কিছুতে মাথা না ঘামিয়ে কেবল আপনমনে তার সঙ্গে ফোনে কথা বলে চলেছে দেবারুণ।

 দেবারুণের সঙ্গে আলাপটা কিভাবে হয়েছিল, এটা কিছুতেই মনে পড়ছে না। প্রমিতের দৌলতে, এটা মনে পড়ছে। প্রমিত চেয়েছিল যে, মিঠুয়া দেবারুণের সঙ্গে আলাপ করুক। দেবারুণের সঙ্গে আলাপটা এবার মনে পড়ছে। প্রমিত যখন ফোন নম্বর দিয়েছিল সেটা মিঠুয়া লিখে রেখেছিল খবরের কাগজের ওপরে। তার দুদিন বাদে সে ফোন করে, মনের চিন্তাভাবনা কিভাবে শারিরীক ব্যাধি ডেকে আনে এই বিষয়ে জানতে। কারণ, দেবারুণ ছিল ডাক্তার ।

ফোনের পর কিছু টুকটাক কথা হয়। তারপর আবার কথা হবে বলে ছেড়ে দেওয়া হয়।

 আলাপের প্রথম কিছুদিন মনস্তত্ব এবং শারিরীক আদি ব্যাধির সঙ্গে মনের সম্পর্ক ছাড়াও দেবারুণ যে বিষয়টির বারবার উত্থাপন করেছিল, তা হল মিঠুয়াকে এটা বোঝানোর যে প্রমিত কত ভাল ছেলে, মোটেই খারাপ নয়।

 প্রমিত খারাপ নয়, তো মিঠুয়া কি করবে? ব্যাপারটা বিরক্তিকর। প্রায়ই প্রমিত ড্রিঙ্ক করে ফোন করে ভুলভাল বকে কান্নাকাটি করত।  এটা প্রমিতের স্বভাব। বিশ্বশুদ্ধ লোক জানত একথা যে ফোন করে প্রমিত ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে

কাঁদত। কাঁদতে কাঁদতে কি যে বলত কিচ্ছু বোঝা যেত না। বেশীরভাগটাই ইন্দ্রনাথের বদমাইশির কারণে, ও কত

অপমানিত হয়েছে, তার গানা গাইতে চেষ্টা করত। ওই সিমপ্যাথি আদায়ের ব্যাপার আর কি। মোদ্দা ব্যাপারটা ঠিক কি হয়েছে, তার আদ্যোপ্রান্ত কিছু বোঝা যেত না। প্রমিতের ধারণা,ধারণা নয় গভীর বিশ্বাস যে ইন্দ্রনাথের মতো আপাদমস্তক ধান্দাবাজ আর একটাও হয় না। মিঠুয়ারও তাই বিশ্বাস ছিল। তবে তফাৎটা এই যে মিঠুয়া চাইত এই বিশ্বাসটা একদিন বদলে যাবে। আর তার এই চাওয়াটাকে মিঠুয়া বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল। 

  প্রমিত কি চায় ও নিজেই জানত না। ও বেশ হড়হড় করে সব কথা বলে যেত। নিজেকে স্বচ্ছ দেখানোর চেস্টা করত। তাইতে কখনসখনও ধারণা হত লোকটা হিপোক্রিট নয়। এ হেন প্রমিতের তখন শখ হয়েছিল, মিঠুয়ার চোখে হেব্বি ভাল হবে। তাই কত ভাল ভাল লোক তাকে পাত্তা-টাত্তা দেয় এটা দেখানোর জন্য সে মিঠুয়ার সঙ্গে দেবারুণের আলাপ করিয়ে দিয়েছিল।

 দেবারুণের হয়ত মনে হয়েছিল…কে জানে কি গুষ্টির পিণ্ডি মনে হয়েছিল। সে একদিন আমতা আমতা করে মিঠুয়াকে বলে ফেলল,-প্রমিত ততটা খারাপ নয়, মদ-টদ ইত্যাদি খাওয়ার জন্য যতটা দেখতে লাগে।

  মিঠুয়া বলল, ও আচ্ছা।

  দেবারুণ তখন আবার বলল, প্রমিতের মনটা ভাল। মানে, বেশ ভাল। যথেষ্ট আন্তরিক ও। লোকে ওকে ভুল বোঝে।

  মিঠুয়া বলল, কি আর করা যাবে। কপাল!

   দেবারণ আবারও আমতা আমতা করে বলল, কিন্তু আর একজন আছে,সে একদম ভাল নয়। বড়ই ধান্দাবাজ!

  মিঠুয়া বলল, কে?

  -সে আছে একজন। আর তার যে ফিঁয়াসে সে তাকে এতই ভালবাসে, তবুও সে সেই ফিঁয়াসেকে নিজের সুবিধের জন্য ব্যবহার করে।

  -কে বলুন তো?

  -সে আছে, নামটা বলা যাবে না। তাছাড়া আরও অনেক মেয়ের সঙ্গেও সে নানাধরণের যোগাযোগ রাখে।

  মিঠুয়ার কেমন কেমন লাগল। সে হঠাৎ বলে ফেলল,

  -ইন্দ্রনাথ? ইন্দ্রনাথের কথা বলছেন তো?

  -না মানে হ্যাঁ। ওই আর কি? চেনো নাকি?

  -চিনি। 

  এমনি কিছুদিন চলল। দেবারুণ প্রমিতের গুণগান গাইত আর মিঠুয়াকে প্রমিতের প্রতি সদয় হলে অসুবিধে কিছু নেই, এরকম কিছু বোঝানোর চেষ্টা করত। মিঠুয়া একদিন বলল, ও তো আমার বন্ধু। মানে, আমি তো ওকে বন্ধুই ভাবি।যদিও ও একটা ঘোরতর মাতাল। প্রচুর বাওয়াল বাজ। মেয়েঘটিত গন্ডগোল পাকিয়ে তাই নিয়ে নিজের মুখেই বলে বেড়ায়। আর ওর জীবনের দুঃখ-কষ্ট, হতাশা,লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, ভোগান্তি, সংগ্রাম সবকিছুই যদিও বারোয়ারী, কিন্তু যখন যাকে বলে, তার মনে হয় বোধহয় শুধু আমাকেই বলছে। চ্যাংড়ার চূড়ান্ত । কিন্তু ভীষণ বুদ্ধিমান। ও যদিও মাঝে মাঝে খুবই অসহ্য তবুও বন্ধু ভাবি বলে, তাও সহ্য করি। এছাড়া আর কিভাবে সদয় হওয়া যায় বলুন তো? 

  -না, বলছিলাম আর কি। ঠিক আছে।

  মিঠুয়া সে যাত্রা চুপ করে গেছিল। কি ঠিক আছে আর কি যে ঠিক নেই, সে যদিও কিছুই সেদিন বুঝে উঠতে পারেনি। তখন তার একটাই কাজ ছিল, দেবারুণ বা প্রমিত ইন্দ্রনাথের সম্পর্কে কি বলে, তাই শোনা আর শুনতে শুনতে মিলিয়ে নেওয়া যে ইন্দ্রনাথ সম্পর্কে তার যা যা মনে হয়, তাদের সঙ্গে ওদের বলা কথাগুলো কতটা মেলে। ইন্দ্রনাথ কতবড় মেয়েছেলেবাজ আর সে কত ধান্দাবাজি করে আর লিপিকে সে কত ব্যবহার করে এসব সাতকাহন তার শোনা শুরু হল। লিপির ব্যাপারে দেবারুণ আর প্রমিতের বক্তব্য অল্প এদিক-ওদিক ছিল। প্রমিতের বক্তব্য ছিল, ওরা দুজনেই দুজনকে ব্যবহার করে,নিজেকে প্রমোট করার জন্য আর দেবারুণের বন্তব্য ছিল লিপি নিঃস্বার্থ ভালবাসায় ইন্দ্রনাথের জন্য যথাসর্বস্ব করতে পারে। তবে, ইন্দ্রনাথের দিক থেকে যে

ব্যাপারটা প্রেম নয়, আসলে রিলেশন ফর কনভেনিয়েন্স এ ব্যাপারটায় সুনিশ্চিত ওরা দুজনেই।

   প্রমিতের হয়ে অল্পসল্প দালালি করা ছাড়া তখন দেবারুণ আর যে কাজটা করত সেটা হল, ইন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে নানাবিধ কথা বলা। ক্রমশঃ দুটোই বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। কিন্তু দেবারুণ সুন্দর যুক্তি দিতে পারত। সব

কথা খোলসা করে বলার অভ্যেস ছিল। যুক্তিগুলো পরতে পরতে এমনভাবে সাজাত, মনে হত ঠিকই বলছে বোধহয় এবং তারপর সে যুক্তিগুলোকে ভেঙে ভেঙে বিশ্লেষণও করে দিত। এর থেকে মনে হত স্কুল লেভেলে

দেবারুণ নিশ্চয় ভাবসম্প্রসারণে ভাল ছিল। কিন্তু যেদিন মিঠুয়া জানতে পারল যে, দেবারুণ ভাবসম্প্রসারণে কেনদিন ভাল নম্বর পায়নি, কারণ সে লেখা শেষ করতে পারত না, তখন খুব তাজ্জব হয়েছিল সে। লেখা শেষ করতে না পারার সঙ্গে জড়িত ছিল, কোথায় থামতে হবে না জানা থাকা।এই কথাটা চট করে বুঝে নিয়ে তখন মিঠুয়ার সাবধান হওয়া উচিত ছিল। তার বদলে মিঠুয়ার মনে হয়েছিল, ইন্দ্রনাথ এরকম যুক্তি-বিচার বিশ্লেষণের সঙ্গে কথা বললে কত ভাল হত। 

      ইন্দ্রনাথের রকম ছিল এর থেকে অনেক অন্যরকম। কিছু জিজ্ঞেস করলেই সে বলত, আচ্ছা, এটা নিয়ে পরে ভালো করে আলোচনা করব। সেই ‘পরে’টা কখনও আসত না। কোনোদিনও না। নেহাত বেকায়দায় পড়লে, ইন্দ্রনাথ উত্তর দিত, তুমি কিছু বোঝো না। কিচ্ছু জানো না তুমি। আরেকটা পদ্ধতি

ছিল ইন্দ্রনাথের। কোণঠাসা হয়ে গেলে সে চুপ করে যেত। তখন আর তাকে কথা বলানো যেত না। আর তখন তাকে দেখতে লাগত, একটা পাথরের দেওয়ালের মত। 

  

     মিঠুয়া দেবারুণের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলত। দেবারুণের মধ্যে একটা আপাত বিচক্ষণতা ছিল। এতখানি ভাবার পর ভুলোমনার একটা বড়সড় হাই উঠল। হাই তুলতে তুলতে সে ভাবল, ইন্দ্রনাথ আর ইন্দ্রনাথ। এই ইন্দ্রনাথের সঙ্গে যদি দেখা না-ই হত, তাহলে কি হত? মোক্ষম কিছু অভিজ্ঞতা হত না। আর ভাল হোক বা মন্দ হোক, অভিজ্ঞতা জীবনে সবসময় কাজের। তবে দেবারুণের সঙ্গে দূরাভাষে কথপোকথনের এই সময়টায় মিঠুয়ার একবার মনে হয়েছিল বটে, ইন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপ না হলেই বোধহয় ভাল হত। আবেগগত কারণে আর স্বভাবের ধরণের জন্য ইন্দ্রনাথের সঙ্গে মিশতে গেলে প্রচুর স্ট্রেস তৈরি হয়। ইন্দ্রনাথ যেন এমন এক বালতি দুধে এ ফোঁটা চোনা পড়ে যাওয়ার মত। সবসময়ই ও এমন। আর দেবারুণ সবসময় সবকিছু পরিষ্কার করে বলে। বলার পর আবার তার ব্যাখ্যাও করে। এইরকম যখন ভাবনাচিন্তা চলছে, তখন একদিন দেবারুণ আমতা আমতা করে মিঠুয়াকে বলল, এদিকে আসার পরিকল্পনা কি একবছর বাদে আছে? মিঠুয়া মোটেই বুঝে উঠতে পারল না, দেবারুণ কি বলছে? সে বলল, এদিকে মানে কোথায়?

  -এই এদিকে। যেদিকে আমি রোজ সন্ধ্যেয় আসি।

  -ও আচ্ছা। মানে আপনার চেম্বারে?

  -হ্যাঁ।

  -না ওদিকে তো. আমার কোনো কাজ নেই। ভিড়-ভারাক্কার জায়গা।

  -তাহলে এমনি এলেই তো হয়।

  -ও.কে.। এমনিই আসব না হয়। 

  একটা দিন ঠিক হল। দিন ঠিক হওয়াটা বাঞ্ছনীয় ছিল  নাকি অবাঞ্ছনীয় ছিল , সে সম্পর্কে আজ আর কিছু মনে হল না। ওই সবকিছুকেই মনে হল একটা নিয়তি নির্ধারিত অভিজ্ঞতার অংশ যেন। সেই দিনটা মনে পড়ছে। খুব

ভালোভাবেই। দেবারুণের সঙ্গে প্রথম চাক্ষুষ সাক্ষাৎকার। মিঠুয়া চেম্বারে পৌঁছে গেছিল। যদি মিঠুয়া খুঁজে না পায় তাই দেবারুণ বাইরে দাঁড়িয়েছিল। দুজনের দেখা হয়নি। ফলে, চেম্বারে পৌঁছে দেবারুণকে না পেয়ে মিঠুয়া দেবারুণকে ফোন করে জানল সে বাইরে। সঙ্গে সঙ্গে মিঠুয়া বাইরে এল এবং দেখল একজন হেঁটে আসছে। তাকে মিঠুয়ার কিছুতেই দেবারুণ বলে মেনে নিতে ইচ্ছে হয়নি। ফলে সে তাকিয়েছিল। ওরা দুজনেই দুজনের দিকে তাকিয়েছিল। আর কাকতালীয়ভাবে দুজনেই একই রঙের জামা প্যান্ট পড়েছিল। কালো শার্ট এবং অফহোয়াইট প্যান্ট।

দোবারুণের চোখে একটা শূন্যতা ছিল নাকি আসলে তার চোখে ছিল তার ভেতরে জমে থাকা হতাশাজনিত আর্তনাদগুলো ? কিছু একটা ছিল দেবারুণের চোখেমুখে। যা মোটেই ভাল লাগছিল না। তারপর ওরা দুজন চেম্বারে এসে বসল। একজন ডাক্তারের চেম্বার কি সুন্দর গল্প করার জায়গা হয়ে উঠল। প্রথমেই দেবারুণ মিঠুয়াকে দুটো বার্থডে কার্ড দেখালো। দুটোই দেবারুণের জন্মদিনে তাকে দেওয়া দুটো মেয়ের উপহার। তারপর প্রথম প্রশ্ন হল, দেবারুণের মিঠুয়ার প্রতি,

  -এদের মধ্যে কে আমার বেশী কাছের?

  উত্তরটা এমন হতেই পারত, তা আমি কি করে জানব? কিন্তু তা না করে মিঠুয়া বেশ মনোযোগের সঙ্গে দেখে একটা রায় দিল। এ মনে হয় কাছের আর এ হয়ত একটু দূরের। দেবারুণ বলল,একদম ঠিক।

  দেবারুণ তখন যে কাছের সে কেন কাছের আর যে দূরের সে কতটা দূরের তার বৃত্তান্ত বলতে আরম্ভ করে। যে কাছের ছিল তার যেন কি একটা নাম ছিল? কি একটা নাম? নাতাশা। আর যে দূরের ছিল তার নাম ছিল ধূর নামে কি গুষ্টির পিণ্ডি এসে যায়? তার নাম ছিল আর্তি দত্ত। সেও ছিল, লেখালেখির জগতের লোক। আর নাতাশা চাইত সিনেমার হিরোইন হতে। সমস্যা হল চাইলেই তো আর সিনেমার হিরোইন হওয়া যায় না। যেমন চাইলেই লেখক হওয়া যায় না, কবি হওয়া যায় না।

 ইন্দ্রনাথ আর দেবারুণ দুজনেই যেমন ছিল কবি। ঢপের কবি নয়। ভাল কবি। তবে ওদের দুজনের কবিতার জন্ম দেওয়ার স্টাইল ছিল আলাদা আলাদা।

ইন্দ্রনাথকে কবিতার জন্ম দেবার জন্য পরিশ্রম করতে হত। আর দেবারুণ কবিতা লিখত অসাড়ে। হঠাৎ নিজের অজান্তেই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় কবিতা এসে ধরা দিত দেবারুণের কাছে। ভয়ঙ্কর একটা নির্মোহ ভঙ্গিতে দেবরুণ

সেটাকে ধরে ফেলতে পারত। সেই অর্থে দেবারুণ ছিল জাত কবি। আর ইন্দ্রনাথ ছিল খেটে তৈরি হওয়া কবি। 

  

   মিঠুয়া দেখেছিল লেখক এবং কবিদের জগত ভীষণ সংগ্রাম পূর্ণ । শুধু জীবন দেখা এবং সেখান থেকে শিখতে শিখতে, ক্ষত-বিক্ষত হতে হতে, নিজের ভেতর একটা লেখার জন্ম দেওয়ার পদ্ধতিটাই শুধুই এরকম ছিল

না। তার পরবর্তী ধাপ ছিল, লেখা বা কবিতাগুলোকে পাত্রস্থ করা অর্থাৎ ছাপানোর জন্য একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে যাওয়া। ওইরকম একটা ভয়াবহ কুরুচিকর পদ্ধতি বোধহয় গোটা পৃথিবীতেই বহাল আছে। প্রায় নিরুপায় হয়েই এরা সকলে সেই সিস্টেমের মধ্যে মাথা গলিয়ে ফেলেছিল। তাতে একেকজনের দশা হয়েছিল একেকরকম। যেমন, ইন্দ্রনাথ এই সিস্টেমে অবস্থান করত সরবে, সগর্বে, ঘোষণা করে। সেক্ষেত্রে মিঠুয়ার এই সিস্টেমে অবস্থানের ধরণটা অনেকটা ছিল, গিলোটিনে মাথা দিতে দিতে এপাশ-ওপাশটা দেখে নিয়ে কিভাবে বেঁচে পালানো যায়, তার ভাবনা ভাবা। দেবারুণ তিতিবিরক্ত হয়ে নিজেকে সরিয়ে নিতে নিতে কোণঠাসা করে ফেলেছিল। সে অপেক্ষা করত একজন মসীহার জন্য,যে কবিকুল এবং লেখককুলের একজন সর্বেসর্বা ব্যক্তি হবেন। হঠাৎ করে উদয় হয়ে যিনি ভাল কবি ও ভাল লেখক খুঁজে পেতে বার করে তাদের ঘাড় ধরে লিখিয়ে

নেবেন। লেখক এবং কবিদের নানা ভ্যানতারা,মুড, মেজাজ মর্জি, উল্টোপাল্টা ইগো এসব থাকে। সেসব ধর্তব্যের মধ্যে না ধরে বরং তাদের যাবতীয় বায়নাক্কা সম্পূর্ণ রকম সহ্য করে তিনি তাদের কাছ থেকে কাজটি

আদায় করে নেবেন। তারপর ছাপানোর এবং প্রপাগাণ্ডার যাবতীয় দায়িত্বভারও তিনিই নেবেন। দেবারুণের মত কবিরা খালি যখন তখন তাদের নানাবিধ মর্জি নিয়ে বিভিন্ন ধর্মী গোয়ার্তুমি করে যাবে আর সেইসব মর্জি-জাত অনুভব থেকে কবিতা উৎপাদন করেই খালাস হবে, এই ধরণের একটা আদর্শ ইউটোপিয়া এবং এক দেবদূতের স্বপ্ন দেখত দেবারুণ। যথারীতি বাজারে এমন একটি মনুষ্যের যারপরনাই অভাব থাকার জন্য দেবারুণের দারুণ হতাশাবোধ ছিল। হতাশাবোধ জনিত একধরণের ঘ্যানঘ্যান করাও তার স্বভাব ছিল। সেই ঘ্যানঘ্যান শোনানোর জন্য দেবারুণের কিছু বন্ধুকুলের প্রয়োজন ছিল। যাদের কাছে ঘ্যানঘ্যান এবং ঘ্যানঘ্যানানির পেছনের কারণের বিশ্লেষণ যুক্তি তর্ক সহযোগে ব্যাখ্যা ও আলোচনা করে দেবারুণ তার অবসর সময় যাপন করত। সেইসব বন্ধুকুল কবি বা অকবি, লেখক বা অলেখক যাইহোক না কেন,দেবারুণের কাছে চিকিৎসা করিয়ে পয়সা দিত না। 

  

   সেদিন যেদিন দেবারুণ আর মিঠুয়ার প্রথম সাক্ষাৎ হয় এবং আশ্চর্যজনকভাবে দুজনেই একরঙের জামা প্যান্ট পরে থাকে, সেদিন দেবারুণ মিঠুয়াকে নাতাশা এবং আর্তি দত্তের গল্প বলতে শুরু করেছিল। আর্তি দত্ত একসময় দেবারুণের প্রেমিকা ছিল। কেন সে আর প্রেমিকা থাকেনি তার গল্প। আর যখন আর্তি দত্ত আর প্রেমিকা থাকল না, তখন ঝাড়া দু’বছর দেবারুণ ভয়ঙ্কর একা হয়ে পড়েছিল। কারণ, আর্তি দত্তের কারণে সে তার স্ত্রীর সঙ্গে অনেকটা দূরত্ব এনে ফেলেছিল। এইরকম শূন্যতায় ভরা একাকিত্বের দিনে নাতাশা লাফাতে লাফাতে তার জীবনে আসে। বয়সে সে ছিল দেবারুণের থেকে অনেক ছোট। ওরা দুজনে মাঠে, ঘাটে, ক্ষেতে আল ধরে ধরে হেঁটে বেড়াতে থাকে, একগাদা সময় নষ্ট করে। ইদানিং নাতাশার সঙ্গে কি যেন এক দুর্বোধ্য ঠাণ্ডা লড়াইতে ব্যস্ত আছে দেবারুণ।

   বিরাট কাহিনী, প্রচুর গলিঘুঁজি, অজস্র জটিলতা। মিঠুয়া খানিক শুনল, খানিক বুঝল, কি যে মাথামুণ্ডু হচ্ছে ভাবল, তারপর নিজের আঙুলের আংটিটা এপাশ-ওপাশ ঘোরাতে ঘোরাতে চিন্তা করল, আংটিটা না পরলেই ভাল হত। হাতটা দেখতে দেখতে মনে করল, তার হাতটা আজকে যেন তার হাতের মতো দেখতে লাগছে না, ওই অংটিটার কারণে। মিঠুয়া দেবারুণকে জিজ্ঞেস করল, প্রথম দিনই আমাকে এত কিছু বলছেন কিভাবে? দেবারুণ বলল, আমি ইনস্টিঙ্কট থেকে কথা বলি। যাকে মনে হয় বলা যায় তাকে ইন্সটিঙ্কটিভলি বলে ফেলি।মিঠুয়ার আজব আজব লাগল। 

  ইন্সটিঙ্কটিভলি কথা বলার মানে কি? যাইহোক, কিছু একটা হবে বোধহয়। মিঠুয়ার শুধু এটাই ভাল লাগল, যে দেবারুণ বিশ্বাস করে সব কিছু বলল। অথচ ইন্দ্রনাথ এতদিনেও তা পারল না। এখনও ইন্দ্রনাথ লিপির কথা বলে উঠতে পারেনি। অবিশ্বাস, জড়তা, ভয়, আড়ষ্টতা,কোনটা এর কারণ?

  

      সেদিন বাড়ি ফেরার পথে মিঠুয়া একটা কথাই মন থেকে দেবারুণকে বলেছিল প্রেম, সম্পর্ক এসবের থেকে অনেক বড় হল বন্ধুত্ব এমন আমার ধারণা। কিছু তো থাকে না। বন্ধুত্ব থাকে। আমি একটা সহজ, সুন্দর বন্ধুত্ব চাই। দেবারুণ শুধু শুনেছিল। সম্ভবত মেয়েদের সঙ্গে ছেলেদের কোনমতেই আর যাইহোক বন্ধুত্ব হয়না, এরকম একটা মান্ধাতার আমলের ধারণা দেবারুণের ছিল। সেটা তখন বোঝা যায়নি। কার যে পেটে পেটে কি থাকে..এইসময় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ভুলোমনা। সব অলীক। ছবি ছবি লাগে। ভেসে ভেসে আসে। এসে ভেসে চলে যায়।

দশ

ভুলোমনা ভাবছিল জীবনটা সে কেন কাটাচ্ছে। এই যে এই মুহুর্তে সে তার বিছানায় একটা ধবধবে সাদা চাদর পেতেছে এবং সেখানে সকাল থেকে শুয়েই আছে, উঠছে না,কিছু করছে না, কিছু করবে বলে ভাবছে না। তার মনে হচ্ছে তার কিছুই করার নেই। কিছু করার কোন অর্থও নেই। জগতে একটা বিরাট কর্মযজ্ঞ চলে। এই গুরুংদের বাড়িতে একটা ভীষণ ব্যাপার রোজই নিয়মমাফিক চলতে থাকে; সেটা গুরুংদের কাছে খুবই

গুরুত্বূর্ণ। সেরকম গুরত্বপূর্ণ কিছু ভুলোমনার নেই? এটা কি খুবই আশ্চর্যের নয়? বাইরে একটা বিরাট জঙ্গল-পাহাড় কাচের জানলা দিয়ে তার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে অনেকক্ষণ ধরে। আর সে কিছুতেই ভেবে উঠতে পারছে না দিনগুলো সে কেন কাটাচ্ছে। দিনগুলো কি শুধু শুধু কাটানো যায় না? সবসময় কি তার কোন অর্থ থাকতেই হয়? আর অর্থ না পেলে বেঁচে থাকাটা কেন…কেন…কেন…এই প্রশ্ন কুরে কুরে খায়?‘এ জীবন লইয়া কি করিব’-এই একটা মহান প্রশ্ন সারাক্ষণ চাবকাতে থাকে?

  ‘এ জীবন লইয়া কি করিব’-এইরকম একটা প্রশ্ন ভুলোমনারই শুধু নয়, যখন ভুলোমনা মিঠুয়া ছিল এবং মিঠুয়া বেশ ছোট ছিল তখন থেকেই তার ছিল। তার সবসময় মনে হত আমি কে? আমি অন্য কোথাও

জন্মালেও তো পারতাম। তখন আমার পরিচয়টা অন্যরকম হত। যেখানে সে জন্মেছিল সেখানে যে সে খুব অসুখী ছিল, তা একেবারেই নয়। কিন্তু পরিচয়ের ব্যাপারটা জন্মানোর সঙ্গে জড়িয়েছিল বলেই তার এরকম মনে

হত।‘সে অন্য কোথাও জন্মালেও তো পারত’-কথাটা এমন ছিল যেন জন্মানোর আগেও সে ছিল এবং জন্মানোর ব্যাপারে তার নিজস্ব কোন চিন্তাভাবনা ছিল কি ছিল না, এ ব্যাপারে সে তেমন নিশ্চিত নয়। হতে

পারে হয়ত, নানারকম অপশনের একটা ব্যবস্থা তখন থাকলেও থাকতে পারে এবং তাকে পছন্দ করতে বলা হয়েছিল কোন জন্মটা সে বাছবে। তবে, মোটেই ব্যাপারটা এরকম নয়, কারণ তাহলে কেউই আর ভিখিরি অথবা গরিব বাবা-মায়ের কাছে জন্মানো পছন্দ করবে না আর তাহলে ভিখিরি বাবা মায়েদের পরিবার-পরিকল্পনা ছাড়াই বাচ্চা হওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। তবে, এই অপশনের ব্যাপারটা জন্মের আগে না-ই থাকতে পারে কিন্ত জন্মের পরে,অন্তত বোধবুদ্ধি হবার পরে থাকাই উচিত, এমন একটা কথা মিঠুয়ার মনে হত বলে মনে পড়ল ভুলোমনার। কারণ, মিঠুয়ার বারবার মনে হয়েছিল, মিঠুয়াকে যখন অল্পবিস্তর ভাল লাগতে থাকে ইন্দ্রনাথের এবং মিঠুয়ার সঙ্গে প্রেমঘটিত কোন একধরণের আবেগের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা যায় তখন ইন্দ্রনাথের উচিত ছিল লিপির ব্যাপারটা মিঠুয়াকে জানিয়ে দেওয়া। এমন একটা বোধ মিঠুয়ার সবসময়ই ছিল যে, তাকে আসলে ঠকানো হয়েছে। ঠকানোর কারণ, হয়ত ইন্দ্রনাথের সৎ সাহসের অভাব। এই সৎসাহসের অভাব যাদের থাকে, তাদের মিঠুয়া পছন্দ করত না। ভুলোমনা ভাবল, এটা নিশ্চিত যে মিঠুয়া ভাবত ইন্দ্রনাথ তাকে ঠকিয়েছে,অতএব ইন্দ্রনাথ একজন ঠকবাজ। ঠকবাজ ব্যাপারটাকে মিঠুয়া পছন্দ করত না। কিন্তু ঠকবাজদের সে কিভাবে দেখে? সাতপাঁচ ভেবে ভেবে ভুলোমনা দেখতে পেল, সবকিছু সম্পর্কেই তার বোধগুলো যেমন ভোঁতা,ফ্যাকাসে-ফ্যাকাসে ধরণের, এ সম্পর্কেও তেমনি। ভালমন্দ, খারাপ, উচিত-অনুচিত ইত্যাদি কিছুই তেমন পরিষ্কারভাবে বোধে আসে না তার।

  সব ব্যাপারেই ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া এইরকম একটা বোধ নিয়ে ভুলোমনা সেই মিঠুয়ার দিকে তাকাল, যখন মিঠুয়া তাকে অন্যায়ভাবে ঠকানো হয়েছে এইরকম একটা বোধে আক্রান্ত ছিল। যখন মিঠুয়া বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে ক্রমাগত লিপি ও ইন্দ্রনাথের সম্পর্কের সম্পর্কে আকথা-কুকথা শুনত,তখন মিঠুয়া খুব হয়রানির মধ্যে ছিল। কিন্ত মিঠুয়ার সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য ছিল এটাই যে, সে যে নিতান্তই অকারণে হয়রান হচ্ছে এটা সে বুঝতে পারত না। মিঠুয়া, লিপি এবং ইন্দ্রনাথের সম্পর্কটা নিয়ে কাটাছেঁড়া করতে করতে নিদারুণ অবাক হত এবং কোনরকম সিদ্ধান্তে  আসতে পারত না। তার কেবলই মনে হত,কোথাও একটা বড়সড় গোলমাল পাকিয়ে আছে যেটা তার জানা নেই,কিন্তু একদিন হয়ত সেটা তার কাছে উন্মোচিত হবে।

  

    উন্মোচিত হলেই বা কি আর না হলেই বা কি ভেবে ভুলোমনা চিত হয়ে শুয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

তার মনে হল, মিঠুয়া একটা সোজাসাপটা মানুষ ছিল, যার কাছে প্রেমটা ছিল প্রেম, বিয়েটা ছিল বিয়ে আর বন্ধুত্বটা ছিল বন্ধুত্ব। তার মাঝখানে এইসব কবি লেখক জাতীয় লোকেদের পাল্লায় পড়ে সে আরেকটা শব্দ

শিখেছিল ‘সম্পর্ক’। সেটা যে কি বস্তু, সেটা মিঠুয়ার সাদা-মাটা মাথায় ঢোকেনি। আর ভুলোমনার কাছে তার জীবনের মতোই সম্পর্ক ব্যাপারটারও কোনো অর্থ নেই। অবশ্য অনেকের কাছে হয়ত ভুলোমনার জীবনটার

একটা অর্থ আছে। তার সবকিছু মনে পড়ে যাবে, এবং সে সেরে উঠবে এই দীর্ঘ বিস্মৃতির কবল থেকে এটা তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা অনেকেই চায়। কিন্তু সবকিছু মনে পরে যাবার পর সে ঠিক কি করবে এটা ভুলোমনা কিছুতেই ভেবে পেল না।

   

    মিঠুয়া তখন আসলে জীবন নিয়ে এক ধরণের এক্সপেরিমেন্টে জড়িয়ে পড়েছিল।আবার সে সময় তার হাতে কেন যে একটা নোয়া পরা ছিল , সেটাও যেন কেমন গোলমেলে । তখন যেসব ঘটনা ঘটত,তা থেকে সে অদ্ভুত অদ্ভূত গল্প লিখতে পারত। আর সেই গল্পগুলো তার সহ্যশক্তিকে, ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলত। ডারউইনের থিওরির সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট-এর মতো মিঠুয়ারও মনে হত, ফিটেস্ট হতে গেলে সবচেয়ে আগে দরকার সহ্যশক্তির। সহ্য করতে না পারলে, সে টিকেই থাকবে না। অতএব মিঠুয়া ফিটেস্ট হবার থেকে বেশী চেষ্টা করত সহ্যশক্তি বাড়ানোর। আর তাকে সহ্যশক্তি বাড়ানোতে সাহায্য করত তার লেখা গল্পগুলো।সহাশক্তি এবং গল্পগুলো হাত ধরাধরি করে অবস্থান করত তার দিনগুলোয়। কারণ, মিঠুয়ার মনে ততদিনে বদ্ধমূল বিশ্বাস হয়ে গেছে যে, তাকে ঠকানো হয়েছে। তাকে ইন্দ্রনাথ আগেই যদি বলত লিপির সঙ্গে তার সম্পর্কের ব্যাপারটা, তাহলে হয়ত সে চিন্তাভাবনা করতে পারত ইন্দ্রনাথকে সে ভালবাসবে কি বাসবে না।ভালবাসতে বাসতে একটুখানি বেসেই সে পাততাড়ি গুটোতে পারত। কিন্তু তাকে কখনও ইন্দ্রনাথ কিছু জানায়নি এবং পরের মুখের ঝাল খেয়ে যখন সে জানতে পারে, তখন সে ইন্দ্রনাথের সঙ্গে একটা ভালবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। এটা অন্যায়। মিঠুয়ার মনে হয়েছিল এখানে তার একটা চয়েস থাকার কথা ছিল। তাকে অপশন দেওয়া উচিত ছিল। তাহলে সে ভেবে দেখত সে কি চায়। ভালবাসতে চায় নাকি সরে যেতে চায়।

      তখন মিঠুয়ার সমস্যাটা অনেকটা এরকম ছিল, সে ভাবছিল, ভালবাসবার আগেভাগে পরিস্থিতি জেনে যাওয়া ভাল। তখন নিজের ইচ্ছে অনুসারে যাহোক কিছু করা যায়। কিন্তু একবার ভালবেসে ফেললে তারপর ঠকানো হয়েছে জেনে তখন কি, থাক, তাহলে আর ভালবাসার দরকার নেই বলে, ফিরে আসা যায়? ইচ্ছেমত কোথাও মন ফেলা এবং ইচ্ছেমত মনকে উঠিয়ে নেওয়া এটা মিঠুয়ার জানা ছিল না। বোধহয় মনের ওপর এতখানি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চয় শেখার ব্যাপার। ব্যাপারটা তার শেখা ছিল না। ফলে মন মনের মত চলত আর মিঠুয়া মিঠুয়ার মত।

  

ভুলোমনাও ভাবছিল, সে-ও কি তার মত করেই চলছে না? সে কোন কিছু নিয়েই মাথা ঘামাচ্ছে না। কোন কিছুই তার তেমন অর্থবহ মনে হচ্ছে না এবং সে শুধু দুনিয়ার এই নড়া-চড়াটার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করছে না। এমনকি যা যা সে ভুলে গেছে সেসব যে সে খুব উঠে পড়ে ভেবে মনে পড়ানোর চেষ্টা করছে তাও নয়। মনে আপনিই কিছু আসছে। যা আসছে তাকে সে মন থেকে বার করে উড়িয়ে দিচ্ছে।

স্মৃতিগুলো যেন পাখি পোষার মত। মন থেকে খাঁচা খুলে উড়িয়ে দিলেই হল । মুক্ত হয়ে উড়ে যাবে। আর ফিরে আসবে না। সে খালি হয়ে যাবে। বস্তুত, ভুলোমনা খালি হয়ে যাবার অপেক্ষায় আছে। খালি হয়ে যাওয়া ছাড়া ভুলোমনার জীবনের আর হয়ত কোন উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু একদিন যখন সে মিঠুয়া ছিল, তখন তার জীবনের কোনো উদ্দেশ্য ছিল। সেই উদ্দেশ্যটা ঠিক কেমন ছিল…কে জানে কেমন ছিল? কি একটা খুঁজছিল মিঠুয়া। খোঁজার জন্যই যা কিছু করছিল সে, যা কিছু ঘটছিল। ঘটনাগুলো এমনভাবে ঘটছিল, যেন পরপর সাজানো আছে। আগে থেকে সেগুলো লেখা হয়ে গেছিল আর শুধু একটার পর একটা ঘটে সেটা যে ঘটারই ছিল,এই জানকারি দেওয়া ছাড়া ঘটনাগুলোর আর কিছু করার ছিল না। সেই ঘটনাগুলোই একদিন কিভাবে মিঠুয়াকে সব

ভুলিয়ে দিয়ে ভুলোমনা বানিয়ে দিল। এখন ভুলোমনার কাজ হচ্ছে সেই খননকার্যটা করে যাওয়া, যা চাপা পড়ে যাওয়া ঘটনাগুলোকে খুঁড়ে মুক্ত করে দেবে।

  সেই খননকার্যটা করতে গিয়ে আপনা থেকেই যে ঘটনাটা খসে পড়ল বিস্মৃতির খণ্ডহরের গা থেকে, সেটা হল পরিযায়ী নামে একটা নামকরা ম্যাগাজিনে তার একটা গল্প বেরোনোর পর ম্যাগাজিনটার উদ্বোধন নিয়ে।

বস্তত এই লেখালেখির জগতটা ছিল আজবরকমের খামখেয়ালিপনা আর খেয়ালিপনার খোলসের পেছনে লুকিয়ে থাকা হিংস্রতা, ঈর্ষা এবং অবাধ যৌনতার কাণ্ডকারখানায় ভরা এক অদ্ভুত জায়গা। সেখানে থাকতে গেলে ডুব সাঁতারে পটু হওয়ার দরকার ছিল। নাকে দুর্গন্ধ এলে হাসিমুখে মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস নিয়ে কাজ চালিয়ে দেওয়ার ক্ষমতার প্রয়োজন ছিল। সেখানে হাঁসের পালক গায়ে লাগিয়ে জলে ডুবতে হত, যাতে জল থেকে

উঠেই পালক ঝেড়ে ফেললে যেমনকার তেমন শুকনো ও সাদা দেখায়।

  ভুলোমনার মনে হচ্ছিল ও একটা সাদা মেঘের ওপর আরাম করে বসে আছে। সেই মেঘটা একটু একটু করে মাটির দিকে নামতে লাগল। ক্রমে মিঠুয়ার জীবনের এক জায়গায় এসে সেটা থেমে গেল। ভুলোমনা আকাশে মেঘটার ওপর বসে রইল। মেঘটা সেই ঘরটার ওপর এসে থামল। যেখানে পরিযায়ী নামে ম্যাগাজনিটার উদ্বোধন পর্ব চলছিল! ঘরটাকে নাট্যমঞ্চের স্টেজের মত দেখতে লাগছিল। সেখানে পরিষায়ীর

সম্পাদক লেখক ও কবিদের একটা একটা করে ফ্রি কপি বিতরণ করছিল। সকলেই সেখানে ভান করছিল যে সে একটা কেউকেটা। একটু আগেই সেই ঘরে ভাষণ-টাষণ দেওয়া হয়েছে। সাহিত্য মানুষের জীবনে কতটা জরুরী

এবং জরুরী মানসিক খাদ্য পরিবেশনে পরিযায়ীর সম্পাদক মহাশয় কতটা গুরু দায়িত্ব পালন করে চলেছেন ইত্যাদি। তারপর দীর্ঘ পুস্তক বিতরণ। মিঠুয়া পেছনে বসেছিল। তালিকায় মিঠুয়ার নাম ছিল না। পুস্তক বিতরণ

শেষ হলে মিঠুয়া উঠে দাঁড়াল এবং সবিনয় নিবেদন করল যে তার একটা বই প্রাপ্য ছিল। এইসব দেখতে দেখতে মেঘের ওপর থেকে ভুলোমনা একটা হাই তুলল। সম্পাদক অবাক হয়ে তাকালেন এবং নিমেষেই স্বীকার করলেন তার একটা ভুল হয়ে গেছে মিঠুয়ার নামটা খেয়াল করা হয়নি। মিঠুয়ার হাতে একটা বই দেওয়া হল। সেই ঘরে দেবারুণ ছিল। প্রমিত ছিল। এরপর কিছু বাছাই করা লোকের যাওয়ার কথা অনুষ্ঠানের পরবর্তী

ভেনুতে অর্থাৎ মদের আসরে। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করছিলেন, স্বনামধন্য লেখক ও সাহিত্যিক শশাঙ্ক সেনশর্মা। যথেষ্ট বয়স হয়েছে ওনার। সঙ্গে ওনার সমসাময়িক প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত যতীন রায়। এরা মোটামুটি হেভিওয়েট। এরপর পরই হেভিওয়েটের তালিকায় রয়েছে পরিষায়ীর সম্পাদক মানস ভৌমিক। এরা এখন

যেখানে যাচ্ছে, সেই ভেনু দেবারুণ ঠিক করে দিয়েছিল।

  

   ভুলোমনা আবার একটা হাই তুলল। মদের আসরে গিয়ে কি হবে,তার মোটামুটি মনে পড়ে গিয়েছে।আবার পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে করতে তার ভাল লাগছে না। ওখানে সবাই ভীষণভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টায় ছিল। হেভিওয়েটরা তাদের মতো করে, জমায়েতের মধ্যমণি হয়ে এবং চুনোপুটিরা তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জমায়েত বেশ ভাল জমে উঠেছিল। মিঠুয়াকে প্রচুর ফুর্তিতে থাকতে দেখা যাচ্ছিল। সে সমানেই প্রমিতের পেছনে লাগছিল। ভরা হাটের মাঝখানে মিঠুয়া প্রমিতের পেছনে লাগার কারণে প্রমিত খুব গর্বিত বোধ করছিল। মিঠুয়াকে চোখে চোখে রাখছিল শশাঙ্ক সেনশর্মা। প্রেমিক হিসেবে ওনার সুখ্যাতি কুখ্যাতি দুই-ই ছিল বাজারে। ওনার প্রেমের গল্প পল্লবিত হয়ে বাজারে ঘুরে বেড়াত। সেসব শুনে মানুষের মনে ধারণা

জন্মেছিল শশাঙ্ক সেনশর্মা বোধহয় প্রেমের খাতিরে জীবনটাকে দানছত্র করে দিয়েছেন। কিন্ত দুঃখের বিষয় এটাই ছিল লেখক-সাহিত্যিক ও কবিমাত্রই প্রেমের ব্যাপারে শশাঙ্ক সেনশর্মা হবার স্বপ্ন দেখত,চেষ্টাও চালাত। তবে, ওই যে বলা আছে,ট্যাঁশ গরু, গরু নয়,আসলে তে পাখী সে সেরকমই যারা শশাঙ্কদা শশাঙ্কদা করে তাকে মাথায় তার পদাঙ্ক অনুসরণের চেষ্টা করত, তারা কোনমতেই অরিজিনাল হয়ে উঠতে পারত না। গুচ্ছের কাঠখড় পুড়িয়ে শেষে তাদের কপি ক্যাটের জীবনযাপন করতে হত। এই ব্যাপারে মিঠুয়া লক্ষ্য করেছিল, সেই যে কৌশিক বলে ছেলেটি একদিন তার যে উপকার করেছিল,সে যা বলেছিল,তা ছিল মোক্ষম। সে এদের হাঙ্গর আর কুমীর বলেছিল।

   

    সেই মদের আসর যখন ভালই উত্তাল, তখন ইন্দ্রনাথ ফোন করে এবং সে যখন জানতে পারে, মিঠুয়া অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্যায়েতেও উপস্থিত তখন সে অত্যন্ত দুশ্চিন্তায় পড়ে। সে সমানেই মিঠুয়াকে মেসেজ পাঠাতে থাকে। বিভিন্ন ধরণের মানসিক চাপ বৃদ্ধিকারী কথা বলতে থাকে। যেমন সে লিখে পাঠায়,আমার যারা ক্ষতি করতে চায়,তুমি তাদের সঙ্গে থাকবে কেন? ইত্যাদি! বক্তব্য হল, প্রমিত এবং মানস ভৌমিক এরা নাকি ইন্দ্রনাথের ক্ষতি চায়। তার নামে বিভিন্ন জাগায় বিভিন্ন কথা বলে, তাকে হেয় করে,লোকের কান ভাঙায়। এসব নাকি ক্ষতি করা। মিঠুয়া বিরক্ত হয়ে ইন্দ্রনাথকে লিখে ফেলে, রাজ্যের লোক খামোখা কেন আপনার ক্ষতি করতে চায় সারাক্ষণ? ইন্দ্রনাথ পাল্টা বিভিন্ন ইমোশনাল কথা বলে, যা সবটাই মিঠুয়া যুক্তিহীন বলে নস্যাৎ করে দেয়। সে ইন্দ্রনাথকে সাফ সাফ জানিয়ে দেয় যে বেশ করেছি এসেছি। একশোবার আসব। আপনি তো অনেক জায়গায় যান। আমাকে তো নিয়ে যাননি কোনোদিন। (সঙ্গে করে লিপিকে নিয়ে যান-এই কথাটা উহ্য রাখে মিঠুয়া)। তবে আবার এত বকবক করছেন কেন? এরপর ইন্দ্রনাথ চুপ হয়ে যায়।

  এই সমস্তের পরে মিঠুয়া যে কিভাবে বাড়ি ফিরবে সেটা একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। শশাঙ্ক সেনশর্মা খোলাখুলি প্রস্তাব দেয় যে, তুমি আমার গাড়িতে যেতে পারো। খুবই বিপজ্জনক প্রস্তাব ছিল সেটা। কিন্তু তখন না বলার রাস্তা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছিল। শশাঙ্ক সেনশর্মাকে লোকের সামনে প্রত্যাখান করা মূর্খামি হত। সে অবশ্যই বদলা নিত এবং মিঠুয়াকে সাবাড় করতে তার কয়েক সেকেন্ড লাগত। অতএব মিঠুয়া রাজি হয়ে যায়।

   দেবারুণ দারুণ খুশী হয় এতে। তার এমন একটা মেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব আছে, যাকে শশাঙ্কদার মতো ব্যক্তিত্বের মনে ধরেছে ! প্রমিত অবশ্য চুপি চুপি দেবারুণকে বলে ফেলে, মিঠুয়াকে বাঘের গুহায় ছেড়ে দেওয়া হল নাকি? এইসময় মেঘের ওপর বসে ভুলোমনা বেশ মজা পায়। তার মেঘটা শশাঙ্ক সেনশর্মার গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে ছুটতে থাকে। গাড়িতে উঠেই শশাঙ্ক সেনশর্মা মিঠুয়াকে প্রশ্ন করে, তুমি জানো যে,আমি কেমন লোক। তা সত্বেও তুমি আমার সঙ্গে চলে এলে কেন? 

    

মিঠুয়া উত্তর দেয়, তার কারণ, আমি জানি যে, অনিচ্ছুক কাউকে আপনি জোর করে বাধ্য করবেন না। কথাটা ডাঁহা মিথ্যে কথা ছিল। শশাঙ্ক সেনশর্মার মাথায় ভূত চাপলে যথেষ্টই জোরজার করত। নিজের প্রতিপত্তিও খাটাত। 

   ফলে শশাঙ্ক সেনশর্মা যারপরনাই অবাক হয়ে বললেন, মানে? -মানে, এই আমি আপনার উপন্যাস ‘ছবির আত্মা পড়েছি। লোকে বলে, আপনি আপনার প্রেমিকাকে নিয়ে লিখেছিলেন।-সেখানে আপনার প্রেমিকা এমন

ছিল সে পছন্দ করত না, তার সম্মতি ছাড়া কেউ তাকে ছোঁয়।

  -হ্যাঁ, তবে আমি তো তাকে ছুঁতে পারতাম। 

  -হ্যাঁ,কিন্ত যে কেউ তাতে ছুঁতে পারত না। যে মেয়ে এইরকম, তাকে নিশ্চয় আপনি সন্মান করেন।

   শশাঙ্ক সান্যাল একটু প্যাঁচে পড়ে যান। এই মেয়েটাকে তার অনেকক্ষণ ধরে ভাল লাগছে। ভাল লাগলেই তার আবার যাকে ভাল লাগছে তার শরীর স্পর্শ করতে ইচ্ছে করে। কিন্ত এই মেয়ে আবার ‘গাড়িতে উঠে কিসব ফ্যাকড়া বের করে নিশ্চিন্তে বসে আছে !

  আমতা আমতা করে মাঝ থেকে উনি বলে ফেলেন, না,না,আমি অনিচ্ছুককে জোরজবরদস্তি করি না।

  

কিন্তু সমস্যা হল দামী হুইস্কির পর তার যথেষ্ট জোরজবরদস্তি করার ইচ্ছে করছিল। মোটেই ভালমানুষি দেখাতে ইচ্ছে করছিলনা। ওনার মনে হল মিঠুয়া সেটা বুঝতে পারছে । আর খামোখা জেদ ধরে বসে আছে।

এত জেদ কিসের সেই এই মেয়ের? আদেশের গলায় শশাঙ্ক সেনশর্মা বললেন, তোমার ব্যাগটা সরাও। আমি তোমার থাই-এর ওপর হাত রাখব। 

   মিঠুয়া দেখল, ড্রাইভার সব কথা শুনতে পাচ্ছে। তবে সে কিনা এমন অনেক দেখেছে, তাই সে মন দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। তার পেটে বোমা মারলেও পরে তার পেট থেকে একটাও কথা বেরোবে না, এমনি তার আনুগত্য। মিঠুয়া ড্রাইভারের পদ্ধতি অবলম্বন করল। শুনতে পেয়েও সে মন দিয়ে জানলা দিয়ে রাস্তা দেখতে লাগল। বিরক্ত হয়ে শশাঙ্ক সেনশর্মা নিজেই ব্যাগটা সরাতে গেলেন। মিঠুয়ার হাত ব্যাগটাকে চেপে ধরে ছিল

বলে পারলেন না। আরও বেশী বলপ্রয়োগের ব্যাপারটা তার আত্মসম্মানে লাগল। তিনি মিঠুয়ার কাঁধে হাত দিয়ে তাকে ধরে টেনে নিলেন। না, এটা মিঠুয়া সামলাতে পারল না। সে কিছুটা গায়ের ওপর পড়ে যেতে বাধ্য হল।শশাঙ্ক সেনশর্মা মিঠুয়ার হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে নিলেন। মিঠুয়া ভাবল,যাক হাতের ওপর দিয়ে যাক,যা করার। ভাবতে না ভাবতেই মিঠুয়া টের পেল এই বয়সেও শশাঙ্ক সেনশর্মার কি অপ্রতিহত প্যাশন। প্যাশনের সেনশর্মার সঙ্গে মিশ্রিত কাম এবং কামের সঙ্গে মিশ্রিত শিল্পবোধ। এই তিনটে যার মধ্যে একসঙ্গে সঠিক পরিমাণে মিশ্রিত থাকে,সে অপ্রতিহত প্রেমিক হয়। শশাঙ্ক সেনশর্মা সম্পর্কে যা শোনা যায় তা তাহলে মিথ্যে নয়, সত্যি তো বটেই, কালেদিনে তা কিংবদন্তি হয়ে দাঁড়াবে। নাঃ, এইলোক বয়সে কম হলে একে বেশিক্ষণ ঠেকানো কোনো মেয়ের পক্ষেই সম্ভব হত না। হাত ধরা এবং হাতে চাপ দেওয়ার ধরণ দেখেই বোঝা যাচ্ছে এ লোক নারীচরিত্রে দক্ষ,যা সচরাচর পুরষেরা হয় না। বেশীরভাগ পুরুষই নারীচরিত্র নিয়ে বিভ্রান্তিতে থাকে। আর ওই ইন্দ্রনাথ হতচ্ছাড়াটা নারীচরিত্রকে শুধুমাত্র নিজের কাজে লাগাতে জানে আর নিজেকে মিঠুয়ার হতভাগী-মনে হল ইন্দ্রনাথের ব্যাপার-স্যাপার বুঝতে পারলেও সেই ভালবাসার জায়গাটা থেকে সরে আসতে পারছে না বলে । এক ধরণের আহাম্মকি আর কি ! 

  আপাততঃ হাতে হাত রেখে শশাঙ্কদা সুন্দর গল্প করছেন। লেখালেখি,সাহিত্য,জীবন বিষয়ক। আর মধ্যবয়সী ছেলেছোকরাগুলো যে প্রেমের নামে বিচ্ছিরি মোচ্ছব করছে, সে সম্পর্কে মিঠুয়া কিভাবে গা বাঁচিয়ে থাকবে, তাই নিয়ে কিছু সদুপদেশ দিচ্ছেন। শুনতে শুনতে মিঠুয়ার কেমন ঘোর ঘোর লাগছে। মনে হচ্ছে,আহা ওনার মত একটা বিশাল পুরুষের কাছে যদি নিজেকে পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া যেত। তাহলে যে কি হত ! কি 

যে হত ভেবে মেঘের ওপর থেকে ভুলোমনার পেটের মধ্যে হাসি ঘুরপাক খেল-ছাতার মাথা হত, গুষ্টির পিণ্ডি হত আর…আর…ওনার জন্য তেলছাড়া রান্না করে আর ওনার চোখে ওষুধ লাগিয়ে, লেখার টেবিল গুছিয়ে রেখে..জামা-কাপড় ধোপার বাড়ি দিয়ে দিন কাটাতে হত। এনারা আবার,পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা যারা হয় তাদের মাঝে মাঝে কড়া ধমক দেন। সেরকম পিলে চমকানো ধমক খেতে হত মিঠুয়াকে। এই ধরণের বিগ শটদের বউ-এরা এদের সঙ্গে পাদপ্রদীপের আলোয় থাকার পর স্ট্যাটাস ভোগ করে,তার বদলে অন্যত্র তাদের অনেক মাশুল গুনতে হয়। নানান বিরক্তিকর অপ্রিয় পরিস্থিতির পরও হাসি হাসি মুখে কথা বলতে হয়,আর জোরজবরদস্তি জনসমক্ষে নিজেকে উদারতার প্রতিমূর্তি বানাতে হয় আর এত কিছু করতে না পারলে ব্যাগ গুছিয়ে চলে যেতে হয়,নয়তো মানসিক রুগী হয়ে যেতে হয়। যাক বাবা,মিঠুয়াকে এত কিছু করতে হয়নি। 

     

মেঘের ওপর থেকে একরকম হাঁফ ছাড়ল ভুলোমনা। কিন্তু তাও যে মিঠুয়া একদিন খাপছাড়াভাবে সব ভুলে মনোরুগীই হয়ে গেল…তবে? 

হ্যাঁ, এটা সত্যি কথা, সেদিন কিছুক্ষণের মধ্যে দুই অসমবয়সী প্রাচীন ও নবীন লেখক আন্তর্জাতিক মানের উপন্যাসের ধরণ নিয়ে এমন এক আলোচনার মধ্যে ঢুকে পড়েছিল,তাতে শুধু জীবনবোধের কথা ছিল, একটা জীবন কতভাবে নিংড়োলে তবে,জীবনকে ওভাবে দেখা সম্ভব হয়। শশাঙ্কদা মিঠুয়াকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে মিঠুয়ার বড় কোনো লেখায় হাত দেওয়া উচিত। উপন্যাসে। সে উপন্যাসের মানুষ,এটা তার বাক্যবিন্যাস দেখলে বোঝা যায়। এবং বিন্দুমাত্র ভয় না পেয়ে উপন্যাস লেখার ঝুঁকি নেওয়া দরকার,সে ঝুঁকি যৌনতা সংক্রান্তই হোক অথবা বিষয়সংক্রান্ত। শশাঙ্কদা আরও বলেছিল,সে যেন লেখার জন্য কোনোদিন কোথাও কমপ্রোমাইজ না করে। এই কথার নানাবিধ অর্থ হতে পারে। মিঠুয়া সঠিক অর্থটা বুঝে নিয়েছিল এবং মনে মনে শশাঙ্ক সেনশর্মাকে হৃদয় থেকে একটা ধন্যবাদ দিয়েছিল। তখন তার এমনও মনে হয়েছিল,যে চুমুটার জন্য উনি মিঠুয়ার ঠোঁট দুটো দু-আঙুলে টিপে ধরে বলেছিলেন, এত সুন্দর কেন তুই?-তাকে সেই বাকী থাকা চুমুটা দিয়ে দেওয়া যায়। তবে

তখনই মিঠুয়ার মনে হয়েছিল তাহলে বোধহয় কমপ্রোমাইজ করা হয়ে যাবে। 

 

এমনি একটা ঘটনাবহুল দিনের পর মিঠুয়া হাঁড়ির ভেতর রাখা কই মাছের মতো খলবল খলবল করেছিল।

ইন্দ্রনাথ গোঁসা করেছিল। সে অপমানিতও বোধ করেছিল। আর ইমোশনাল ব্ল্যাকমেলিং-এর ব্যাপারে ইন্দ্রনাথের পছন্দের পদ্ধতি ছিল চুপ করে ঘাপটি মেরে বসে থাকা,কিছুই হয়নি ভাব দেখানো,বেশী বেশী ড্রিঙ্ক করা। আর লিপির সঙ্গে নানাবিধ কাজে জড়িয়ে পড়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখা। আর জোর করে ভাবতে চেষ্টা করা এই পৃথিবীতে আমি কত অপরিহার্য । এসব ছাড়াও কোথাও তাকে কে বেশী গুরুত্ব দিচ্ছে,সেটা নিয়ে বেশী উৎফুল্ল হওয়া ইত্যাদি।

   

    মিঠুয়া এই সবই জানত। তবুও সে বারবার একই ভুল করত। একই ভুল। সে এই সাময়িক বিচ্ছেদে কাতর হয়ে পড়ত। ফলে কয়েকদিন বাদে সে একদিন ফোন করল। কিসব হাবিজাবি কথার ওপর জরুরী কথার মুখোশ চাপিয়ে বলল। ইন্দ্রনাথ বলল, তুমি আমাকে অপমান করেছো।

মিঠুয়া বলল,না,আমি যা সত্যি তাই বলেছি।

 -কিন্তু তুমি বিলো দ্য বেল্ট হিট করেছো।

 -তা হতে পারে।

ব্যস,সব মিটে গেল।

এগারো

          খাড়াই পাহাড়,জঙ্গল আর কুয়াশা যখন ভুলোমনার জীবন হয়ে উঠেছে,তখন ভুলোমনা হঠাৎ এই সত্যটা আবিষ্কার করল যে মিঠুয়া জানত এই পৃথিবীতে সে মোটেই অপরিহার্য নয়। তবুও আসলে তখন সে যা করছিল

সেটাকে এক কথায় বোধহয় এটাই বলা চলে নিজেকে সে যথেষ্ট পরিমাণে অপরিহার্য করে তোলার চেষ্টা করছিল। কি যে একধরনের পাঁচমিশালী জীবন কাটানো ছিল তখন…। কি ঠিক হয়েছিল আর কি ভুল এসবের কোনো মানে নেই এখন। সবটাই ছিল একটা অনবদ্য অভিজ্ঞতা আর সেই অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাটা ছাড়া সবটাই ছিল ছিবড়ে। তো সেই সার শিক্ষাটা শুধু নিলেই তো হত। খামোখা মনে একগাদা দাগা খেয়ে বিস্মরণের মধ্যে চলে যাবার কি ছিল? কিছুই তো থাকে না…কিছুই থাকে না…

   

দেবারুণের সঙ্গে ইন্দ্রনাথের বনিবনা ছিল না। কেন যে ছিল না, তার কোনো মাথামুণ্ডু নেই। একটা গাছের ডাল তুলে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিল ভুলোমনা। চিকুও যাচ্ছিল সঙ্গে সঙ্গে। কি আর করা যাবে? চিকুর

হাতে কোনো কাজ ছিল না। ভুলোমনারও না। পাহাড়িরা হাতে বোনা নাইলনের দড়ির বাস্কেট নিয়ে দোকান-বাজারের দিকে যাচ্ছিল কেউ কেউ। এরা সাজগোজের ব্যাপারে খুব পরিপাটি । আলুথালু এদের দেখা যায় না মোটে। সানসেট পয়েন্টের কাছে পৌঁছে একা একা বসেছিল ভুলোমনা। এখানে কত গাছগাছালি। জায়গাটা শুধু নির্জন নয়, ভীষণ নির্জন। চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে ভুলোমনার

শুধু পাতা নড়ার খসখস

আওয়াজ আর কিছু পাখির ডানার শব্দ, ঘরে ফিরছে যারা তাদের কিচির-মিচির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ কানে এল না। এগুলো সবই ওখানকার নিঃস্তদ্ধতাটাকে বাড়িয়ে তুলেছিল। ভুলোমনা নাক টানল। সে গন্ধ নেবার চেষ্টা করল। তার মনে হল, নিঃস্তব্ধতারও একটা গন্ধও আছে। নিঝুম হয়ে আসছিল পাহাড়। বিশাল বিশাল মহীরূহগুলোর সঙ্গে নীচে বুনো ঘাস,বুনো ফুলের গাছ,কাঁটা ঝোপ না জানি কতরকমের গাছ। ভুলোমনা কোনো গাছই চিনতে পারল না। পাইন, দেবদারু,বিশাল লিচু গাছ এসব তো আছেই। এছাড়া বড় একটা গাছের নাম জানা নেই তার। আগ্রহও নেই। সে গাছেদের বিভিন্ন ধর্ম জানে না। কিন্তু ভুলোমনার মনে হচ্ছিল সে গাছেদের সঙ্গে কথা বলতে পারে। গাছেদের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে। গাছেরা ঘুমোচ্ছে না জেগে আছে টের পায়। কোন গাছ দুঃখী তা অনুভব করতে পারে। গাছেরা তাকে বোঝে। তারা যে তার সঙ্গে আছে এটা বোঝাতে পারে। শুধু গাছ নয়, পাথর, আকাশ, মেঘ এরাও বোঝাতে পারে। ভুলোমনা পুরো সময়টাই এদের সঙ্গে ছিল। চিকুও ছিল তার সঙ্গে,যেমন ছিল এরা। নিঃশব্দে। সে ছিল আর তার সঙ্গে ছিল নিঃস্তব্ধতা । এই নিঃস্তব্ধতা এমন ছিল যা আস্তে আস্তে মনের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে। নিঃস্তব্ধতা যখন মনের মধ্যে ঢুকে পড়ে তখন মন সম্পূর্ণ খালি হয়ে যায়। আবার উল্টোটাও সত্যি ছিল ভুলোমনার কাছে। তার মনের ভেতর যেগুলো জমেছিল,সেগুলো খুলে উড়িয়ে দিতে পারলেও মনের ভেতর নিস্তব্ধতা ঢুকে পড়তে পারত।খুব নিঃশব্দে নিঃস্তব্তার কাছে এগিয়ে যাচ্ছিল ভুলোমনা। ওর অজান্তেই ও পা বাড়িয়ে দিয়েছিল এমন এক জগতের দিকে, যার বাইরে নিঃস্তব্ধতা,ভেতরে নিঃস্তব্ধতা। বোধহয় এটা ছিল তার নিয়তি। ভুলোমনাকে তার নিয়তি ডাকছিল। তার পা বাড়ানো ছিল নিয়তির দিকে। কিন্ত কিছু পিছুটান ছিল। পিছুটান ছিল তার ফেলে আসা জীবন। যা নদীর তলায় পলি পড়ে জমে থাকার মত তার মনের তলায় জমেছিল। মনকে খুঁড়ে সেসব জমে থাকা মুহূর্তগুলোকে উগরে বার করে ফেলতে না পারলে সে নিঃস্ব হবে না। সে নিঃস্ব না হলে মুক্ত হবে কি করে। এমনি একটা ভাবনা তার ছিল। সেই ভাবনায় ভর করে এই আসন্ন,সন্ধের নিঝুম হয়ে আসা পাহাড়ে সে দেবারুণ আর ইন্দ্রনাথের মধ্যে কি যেন একটা ইক্যুয়েশন ছিল, সেটা মনে করার চেষ্টা করল। মনে করতে গিয়ে সে আবিষ্কার করল যে এই ব্যাপারটা তার মনে আছে, কিন্তু ওখান থেকে সে এত দূরে সরে এসেছে , বহুদূর থেকে ওগুলোকে কেমন যেন ঝাপসা দেখাচ্ছে দূরে ক্রমশ মিলিয়ে যাওয়ার মত। কি যেন একটা বোকাবোকা ব্যাপার হয়েছিল ওদের মধ্যে। ইন্দ্রনাথই হোক আর প্রমিতই হোক আর দেবারুণই হোক,মেয়েদের ব্যাপারে একটা দুর্বলতা এদের সকলেরই ছিল। ইন্দ্রনাথ ভাব দেখাত সে একজন মারকাটারি প্রেমিক। তাকে দেখামাত্রই তার আদাকারি,নাজাকত ইত্যাদি প্রভৃতি দেখে মেয়েরা সব তখুনি উল্টেপাল্টে ধড়াস ধড়াস করে পড়ে যাবে। তারা নাকি ভীষণ ঝুলোঝুলি শুরু করে থাকে ইন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রেম করার জন্য। আর ইন্দ্রনাথ..ভগবান জানত ইন্দ্রনাথ কি করে? প্রচুর বোকামি করে নিশ্চয়। একবার ত্রিপুরায়  না কোথায় যেন,ত্রিপুরাটা ত্রিপুরা না হয়ে উড়িষ্যাও হতে পারে, ভাবল ভুলোমনা। ঠিক মনে পড়ছে না। ধুর, মরুক গে যাকগে।ত্রিপুরা না উড়িষ্যা, তাতে কি যায় আসে ! সেখানে একদল কবির সঙ্গে কবিতা পড়তে গিয়ে কে যেন এক মহিলা কি যেন তার গালভরা নাম, সে নাকি ইন্দ্রনাথকে জহরকোট পরিয়ে দিয়েছিল। তারপর তার পরেরদিন ইন্দ্রনাথের চিরপ্রেমিক ভাবমূর্তি নিয়ে আবেগভরা এস.এম.এস করেছিল ইন্দ্রনাথকে । পুলকিত হয়ে ইন্দ্রনাথ মিঠুয়াকে ফোন করে সাতকাহন করে বলছিল। বলছিল, দাঁড়াও তোমাকে এস.এম.এস-টা পাঠাচ্ছি। কিন্তু সে সময় মিঠুয়ার আলমারিতে জামাকাপড়ে বর্ষায় ছাতা ধরে গুমো গন্ধ বেরোচ্ছিল বলে মিঠুয়ার ভীষণ রাগ ধরছিল। তাই ও ইন্দ্রনাথকে সটান বলে দেয়,ওইরকম অন্তত আড়াইশোটা এস.এম.এস আমি এক্ষুনি আপনাকে ফরওয়ার্ড করতে পারি। তাই শুনে ইন্দ্রনাথ পাত্তা না পাওয়ার কারণে এত দুঃখিত হয়েছিল যে,আর এস.এম.এসটা ফরওয়ার্ড করেনি।বেচারা ! পাহাড়ে বসে বসে ভাবল ভুলোমনা।

   ইন্দ্রনাথ কেমন একটা সবাই ওকে ভীষণ ভালবাসবে,ডাকবে, মানবে,চিনবে,স্বীকতি দেবে এইরকম একটা ভীষণ চাহিদায় অনেক পরিশ্রম ও সময় নষ্ট করত। এই স্বীকৃতিটা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ও চাইলেও ইন্দ্রনাথের জীবনে প্রেম একটা স্বীকৃতি পাওয়ারই রূপক ছিল। সবাই নাকি তার প্রেমে পড়ে। মিঠুয়া বলেছিল,

কেন, কারুর কি খেয়ে দেয়ে কাজ নেই?

  -করিশ্মা, ডিয়ার করিশ্মা।

  -ও আচ্ছা । সবাই যদি আপনার প্রেমে পড়ে, তাহলে খামোখা আপনি আমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন কেন?

  -ওটা তো আসলে,আমি তোমাকে দেখাশুনা করছি।

  -ও আচ্ছা। 

   এরপর একদিন ইন্দ্রনাথের স্ত্রী সহেলির সঙ্গে মিঠুয়ার আলাপ হয়। একদিন দুদিন আলাপের পরেই সহেলি, লিপি যে কতবড় খতরনাক মেয়েছেলে, ইন্দ্রনাথ আর সহেলির জীবনের দুষ্টগ্রহ ইত্যাদি মিঠুয়াকে বলে বসে। তারপরেই জোর করে চোখ খুঁটে চার ফোঁটা কেঁদে মিঠুয়াকে বলে,অথচ,বিয়ের ঠিক হবার পর ইন্দ্রনাথ যখন আমাকে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে আমাকে বলেছিল হাতটা দাও,আমি হাতটা দিয়েছিলাম,আর তখন ও বলেছিল তোমার মনে হচ্ছে না কেউ একজন আছে? সেই ইন্দ্রনাথ কি করে যে এত পাল্টে গেল?

  সহেলির দজ্জাল,কুচুক্ষুরে আর মুখরা বলে বাজারে দুর্নাম ছিল। তাই সহেলিকে সেদিন বুক চাপড়াতে দেখে মিঠুয়া তাড়াতাড়ি ওখান থেকে সরে পড়ে। পরে একদিন সুযোগ সুবিধে মত মিঠুয়া ইন্দ্রনাথকে ডেকে পাঠায়।আসার সঙ্গে সঙ্গেই সে ইন্দ্রনাথকে জামার কলার ধরে দেওয়ালে ঠেসে ধরে বেধড়ক মার লাগায়। ইন্দ্রনাথ, -আরে কি করলাম,কি করলাম বলে চ্যাঁচাচ্ছিল তখন।

  -লিসন,সহেলি আমাকে বলেছে,আপনি প্রথমদিন বেড়াতে গিয়ে হাত চেয়ে,হাত ধরে বলেছিলেন,মনে হচ্ছে না জীবনে কেউ আছে?

  -অ্যাঁ…কি জানি বলেছি বোধহয়,মনে পড়ছে না।

  -মনে পড়াচ্ছি। আপনি আমাকেও কোন চুলোয় আউটিং-এ নিয়ে গিয়ে একই বোকা বোকা কথা বলেছেন।

  -ও তাই বুঝি! ইস্‌ খুব ভুল হয়ে গেছে।

  -এবার শুনুন। আমি তো আর সহেলির মত গাধা নই। তাই কি হয়েছিল শুনুন। আমি আপনমনে হাটঁছিলাম। খামোখা আপনি আমাকে বলছিলেন, তোমার হাতটা দেখি। আমি বললাম,কেন? আপনি বললেন,দাও, দিলেই বুঝতে পারবে ।

  -আহা,স্টাইলটা ভালো ছিল না বলার? বল? উঁ হুঁ হুঁ, বলতেই হবে…স্টাইল ছাড়া আমি…

   -চুপ। একদম চুপ। শুনুন।

   -আচ্ছা, শুনছি। শুনছি।

   -আমি কাঠখোট্টার মত হাতটা দিলাম। আপনি ধরে বললেন, কিছু মনে হচ্ছে না এবার। 

-না।

   -মনে হচ্ছে না একজন কেউ আছে।

   -সে তো আপনি আছেন,দেখতেই পাওয়া যাচ্ছে। শুধু শুধু মনে হবে কেন?

   -না, মনে হচ্ছে না, তোমার জীবনে সত্যিকারের কেউ তোমার পাশে আছে? খানিক ভেবে আমি বলেছিলাম ,

   -না,আমার এরকম কিছু মনে হচ্ছে না। 

খুব হতাশ হয়ে আপনি হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলেন, -আচ্ছা,একদিন মনে হবে। আমি বললাম , আচ্ছা ! 

আপনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন এবং একটা গান গাওয়ার চেষ্টা করেন

গুনগুন করে। কিন্তু সেটা খুব বেসুরো হয়েছিল।

   এইসময় দেওয়ালে ঠাসা অবস্থায় ইন্দ্রনাথ বলে ওঠে, -এই না। এরকম বললে চলবে না। গানটা আমি সুরটা একটু কম লাগলেও হৃদয় দিয়ে গাই।

  -মাথা গান। এরপর নিদারুণ বিরক্ত হয়ে আমি আপনাকে বলি,প্রেমটা কি শুধু টেকনিক নাকি? খুবই চিন্তিত হয়ে যান আপনি। কারণ, আপনি বুঝতে পারেন, আমাকে ঠিক কব্জা করতে পারছেন না। তাই গভীর স্বরে বলেন,না, প্রেমটা একটা প্যাশান।

  -এই তো। কেল্লাফতে করেছি তো? মানতেই হবে।

-কচু। আবার মার লাগাব। এই গোঁফ আর দাড়িগুলো যদি পটাস পটাস করে তুলতে থাকি কেমন লাগবে তখন?

-লাগবে বলছি। সিরিয়াসলি লাগবে! 

-আপনার লজ্জা করে না ? কবি হয়ে শব্দের এত আকাল হয়েছে যে..আপনি কচি বয়স থেকে বুড়ো বয়স ওবধি একই ডায়লগ মারছেন! এই আপনার  সৃজনশীলতা? সৃজনশীলতায় কোষ্ঠকাঠিন্য হয়েছে আপনার।

ক্রিইয়েটিভলি কনস্টিপেটড।লজ্জা করে না? 

-না,না।আমি আসলে পারসিয়ালিটি করতে চাই না। মাইরি বলছি।

ইন্দ্রনাথ অনেক ধানাই-পানাই করেছিল কিন্ত মিঠুয়াও অনেক মারধর করেছিল। রফা হয়েছিল, এবার প্রেমে পড়লে যথাযথ শব্দ এবং আবেগের নিত্যনতুন প্রয়োগপদ্ধতি এবং তার সমন্বয় সাধন করা চাই। তারপর ওরা ইন্দ্রনাথের মোবাইলে আসা এস.এম এস. পড়ে পড়ে খুব হাসাহাসি করছিল। তখন থেকে ওরা একটা খেলা খেলত। ইন্দ্রনাথ একটা এস.এম.এস পড়ত, সেটা কে পাঠিয়েছে মিঠুয়া  তার নাম আন্দাজ করে বলে দিত। কিন্ত এইসব এস.এম.এস.-এ লিপির এস.এম.এস কখনও থাকত না। আর মিঠুয়া ওর নিজের এস.এম.এস কক্ষনো ইন্দ্রনাথকে পড়াতো না, কারণ মিঠুয়া জানত ইন্দ্রনাথ সেগুলো বরদাস্ত করতে পারবে না।কারণ…কারণ…এর কারণ ব্যাখ্যা করত দেবারুণ।

     দেবারুণ সব কিছুরই একটা যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা এবং ব্যাখ্যার বিশ্লেষণ, বিশ্লেষণের বিশ্লেষণ এসব করে কাটাত। দেবারুণের ব্যাখ্যা ছিল, প্রত্যেক পুরুষের মধ্যেই নারীকে নিয়ন্ত্রণ করার এক আদিম প্রবণতা কাজ করে। কারনাল কনট্রোল। ডিক্সনারিতে কারনালের অর্থ দেখেছিল মিঠুয়া, কামজ, ইন্দ্রয়জ, এমনকি রক্তমাংস সংক্রান্ত এইসব লেখা আছে। ভয়ঙ্কর  ব্যাপার। মানে , লিবিডো দ্বারা পরিচালিত এবং লিবিডো আক্রান্ত মানুষ বিপরীত লিঙ্গের প্রতি লিবিডোনাল আকর্ষণ-বিকর্ষণ জনিত যে নিঃশব্দ সমীকরণ তৈরি করে, তাই। এইসব কারনাল কনট্রোল নাকি পৃথিবীতে চলে আসছে। দেবারুণ এও বলেছিল, কারনাল কনট্রোলের এই সমীকরণ নিঃশব্দে চলে বলেই কবিরা কবিতা লিখতে পারে। মিঠুয়ার মনে হয়েছিল, কি বীভৎস ব্যাপার। বাপরে! ভাগ্যিস ও কবিতা লিখতে পারে না!

  

   এইরকম কারনাল কনট্রোল যা নাকি একজন নারীর ওপর একজন পুরুষের প্রকৃত কনট্রোল, তা নাকি দেবারুনের আর্তি দত্তের ওপরে ছিল। নাতাশার ওপরেও ছিল। তো এইরকম কারনাল কনট্রোল চালাতে চালাতে  

দেবারুণ আর আর্তি দত্ত দুজনে কি যেন একটা ম্যাগাজিন বার করে ফেলেছিল। সেটা ইন্দ্রনাথ আর লিপি বইমেলায় নেড়েচেড়ে দেখছিল। ইন্দ্রনাথ বইটা দেখতে চাইলে দেবারুন বই-এর দাম চেয়েছিল। ইন্দ্রনাথ নিজেদের মধ্যে লিটল ম্যাগাজিন দাম দিয়ে কেন কিনবে ভেবে পায়নি বলে কেনেনি। তারপর ওদের মধ্যে সম্পর্ক খুব বাজে হয়ে যায়। কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যায় ইত্যাদি।

     

          ভুলোমনা বাড়ির দিকে ফিরতে লাগল। তখন পাহাড়ে চাঁদ উঠেছে। ফটফটে জ্যোৎস্না । পাহাড়ি রাস্তা ভেসে যাচ্ছিল চাঁদের আলোয়। যেন প্লাবন।  যারা সারা জীবন লেখালেখি নিয়ে কাটিয়ে হতাশা, অপমান,

অস্বীকৃতি, আর কিছু ছুটকো সম্পর্কে, ভুয়ো প্রেমের ফাঁদে পড়ে জীবন কাটাল, তাদের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছিল ভুলোমনার। এইসব মানুষেরা মিঠুয়াকে মুহূর্ত জমিয়ে জমিয়ে বাঁচতে শিখিয়েছিল। ছোট ছোট সুন্দর মুহূর্ত কত ছোট কবিতার মত, সুরের মত অভির্ভূত করে তুলতে পারে। শুধু মুহূর্তগুলো স্মৃতিতে সংগ্রহ করে কত ক্ষোভ, কত না পাওয়া বেমালুম ভুলে থাকা যায়, এরা সেটা দেখিয়েছিল। কিন্তু বাইরে থেকে দেখে মনে হয়, সারাক্ষণ

সবাই একটা জবরদস্তি প্রেম করার, প্রেমে পড়ার প্রতিযোগিতায় মও ছিল  হাস্যকরভাবে। সকলেরই বগলদাবা করে রাখার মত একটা করে প্রেমিকা বা প্রেমিক থাকতে হবে। থাকলেই তার সঙ্গে কিছু একটা কাজে জড়িয়ে পড়তে হবে, যাতে ফ্রুট হয় প্রেমটা ।

সাধারণত লোকে প্রেম করে বিয়ে করার জন্য, তারপর সংসার করে আর বাচ্চা ইত্যাদি হয়। এখানে সেসব ঝামেলা তো নেই। প্রায় সকলেই বিবাহিত। তাই বিয়ে করার দায় নেই। কিন্তু একাকীত্ব কাটানোর দায় আছে। আর প্রেম করতে করতে যাতে একঘেয়ে না হয়ে যায়, তাই একসঙ্গে কিছু কাজ করার আছে। যারা নাটক ইত্যাদি করে, তারা একসঙ্গে নাট্যভাবনা নিয়ে কাজ করে। কবিরা সাধারণত পট করে একটা লিটল ম্যগাজিন বার করে ফেলে।এটা মিঠুয়া অনেকবার দেখেছিল। কেউ প্রকাশনা খুলে ফেলে। এরকম যার যেখানে প্যাশন, সে  সেরকম কিছু করার চেষ্টা করে। এরকম করতে করতে অনেক প্রেম লোপাট হয়ে যায়, কিছু নুতুন প্রেম গজায় আর কিছু প্রেম টিঁকে যায়। টিঁকে যাওয়া প্রেমগুলো অভ্যাসে পরিণত হয় আর সেগুলো

মালগাড়ির মত চলতেই থাকে..আর চলতেই থাকে।

    

      দেবারুণ ইন্দ্রনাথ আর লিপির প্রেমকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছিল। সে বলত, লিপি ইন্দ্রনাথের জন্য,তাকে ভালবেসে নিজেকে দানছত্র করে দিয়েছিল। সে যা করে তা থেকে ইন্দ্রনাথ লাভবান হয়। সে যে সমস্ত ইভেন্ট,ইভেন্ট ম্যানেজার পরিচালিত করত, তাতে নাকি শুধু ইন্দ্রনাথকে প্রোমোট করা হত আর ইন্দ্রনাথের কনট্যাক্টট বাড়ত। আর ইন্দ্রনাথ নাকি এমন হতভাগা যে সে মোটেই লিপিকে ভালবাসত না, সে কেবল লিপিকে ব্যবহার করত। 

   এদিকে লিপি সম্পর্কে দেবারুন বলত, সে মহা সেয়ানা মেয়ে ভীষণ ধান্দবাজ। দারুণ অ্যাগ্রেসিভ ধরণের, অসৎ একজন মানুষ। সেই লিপি আবার ইন্দ্রনাথকে এমন ভালবাসে যে তারজন্য কত কি করে, এটা কেমন মেলাতে পারত না মিঠুয়া। ভীষণই ভজকট লাগত তার। 

তারপর দেবারুণ বলত, এমন কোনো মেয়ে পাওয়া যায়নি যে শুধু  দেবেরুণের জন্যই বাচঁবে ।তার কাছ থেকে কিছুই চাইবে না আর শুধু দেবে সেই মেয়ের নাম হবে কস্তরী। সে তার হরিণ চোখ পেতে দেবারুনের জন্য অপেক্ষা করবে। আসামাত্রই লেবু চা বা ক্যাপাচিনো কফি করে দেবে।সেটা খুব গরম। এই ‘গরম’ শব্দটা দেবারুণ উল্লেখ করতে কখনও ভুলতে না।তারপর সে  ইষদুষ্ণ জলে ওডিকোলন দিয়ে দেবারুণের গা স্পঞ্জ করে দেবে। তারপর….. কবিতা পড়বে বোধহয়।নাকি শুনবে। 

যাইহোক কবিতা হয় পড়বে নয়তো শুনবে তারপর সেই কবিতা নিয়ে আলোচনা করলে ওটা স্কুলের ভাবসস্প্রসারণের মত হয়ে যায়। কবিতাটায় রেশ থাকে না, তাই আলোচনাটা বাদ থাক। আর সবথেকে যেটা গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হল, সেই কস্তরীর আর কোন বন্ধু থাকবে না। মিঠুয়ায় মনে হল, শুধু বন্ধু কেন, তার তিনকূলে কেউ না থাকলে ভাল হয়। অর্থাৎ দেবারুনের জীবন- দর্শন ছিল, যে তার বন্ধু হবে, তার কোন বন্ধু নেই।  

 

      সেই হিসেবে দেখতে গেলে আর্তি দত্তের সঙ্গে দেবারুণের সম্পর্কটা ছিল ভীষণ চাপের। খুব দুঃখের একটা গল্প বলেছিল দেবারুণ। আর্তি দত্ত চাইত, মাঝে মাঝে দেবারুণ ওর সঙ্গে দূর অন্য কোন শহরে রাত্রিযাপনের জন্য বেড়াতে যাক। সঙ্গে কিছু কাজও থাকবে, কবিতা সংক্রান্ত। রথ দেখাও হবে কলা বেচাও। এমনি ভেবে তারা কোথাও একটা গেছল। অন্য কোন শহরে। সেখানে গিয়ে দেবারুণ টের পায় যে, তার স্ত্রী জেনে গেছে সে কোথায়। তার স্ত্রী তাকে ফোনে জানায়  সে সেখানে যা করতে গেছে, তা করে যেন বাড়ি ফিরে আসে। দেবারুণ অপরাধবোধ, অস্বস্তিকর অনুভূতি , বাড়ির আরামের অভাব , নিষিদ্ধ কাজের চাপ ইত্যাদির কারণে দারুণ শারিরীক কষ্টের শিকার হয়ে পড়ে। তার মাথা যন্ত্রণা করতে থাকে । জ্বর-জ্বর লাগে, বমি হয় এবং সবচেয়ে দুঃখের কথা রাত তিনটে পর্যন্ত সে বারবার টয়লেটে যায়।আর্তি দত্ত দামী হোটেল রুমের ডবল বেডে ঠায় বসে বসে একটা একটা করে বই-এর পাতা উল্টে যায়। অনেক পরে, লুজ মোশন একটু কমলে তারা একটু ভালবাসাবাসি করে। এই ঘটনা শুনে মিঠুয়া গভীর জলের তলার পড়ে থাকা পাথরের মত নিঝুম হয়ে গেছিল।

    ভুলোমনা গুরুং গেস্টহাউসে পৌঁছে গেছিল।সন্ধেবেলা গুরুং  গেস্টহাউস মোটামুটি সরগরম ছিল সুরেন্দ্র এবং রাজ একটা গিটার বাজিয়ে বাজিয়ে গেস্টহাউসের ড্রয়িংরুমে একদল বোর্ডারের বিনোদনের ব্যবস্থা করছিল। ঝ্যাং ঝ্যাং আওয়াজ আসছিল। ভুলোমনা নিজের রুমে যাওয়ার পথে হনিমুন স্যুইটটার দিকে আনমনে একবার তাকাল। তাকিয়েই রইল। মনে মনে বলল, ইন্দ্রনাথ আর লিপির নাম লিখে দিলাম ওই ঘরে।তোমাদেরই মানায় আমার জন্য নয় ওসব। আমার জন্য নয়। বহুদূরে চলে গেছি আমি। দূর আমায় হাতছানি দিচ্ছে। সুদূরের নেশা বড় ভয়ের। সে নেশা আর ফিরে আসতে দেয় না। ফেরার পথ বন্ধ করে দেয়।তোমরা ওখানে বসে বিয়ারের সঙ্গে তন্দুরি পমফ্রেট খেও। ও বাবা, এই পাহাড়ে পমফ্রেট কোথায় পাবে যাকগে, আর পাহাড়ে বিয়ারের চেয়ে স্কচই ভাল। সে তো ছিল সমুদ্রসৈকত। রোদ, বালি আর পমফ্রেট মাছের দেশ গোয়া । মুম্বইতে মিটিং সেরে দুদিনের জন্য স্ট্রেস ফ্রি হতে গোয়ায় গায়েব হয়ে যাওয়ার দিন।এমনিতেই তো জীবনে চাকরি-বাকরি আর সাংসারিক ঝামেলার ক্লান্তি। তার ওপর মানসিক খাদ্যজোগাড় করার জন্য নানাধরণের মেলামেশার ঝকমারি, আবার তার সঙ্গে পরকীয়া জীবনের কম হ্যাপা নাকি ? পরকীয়ার একটা বেশ হাঙ্গামা আছে। তা মোটেই কেবল সুখের সপ্তম স্বর্গে ভাসা নয়।বরং স্বর্গ নামক মরীচিকার পেছনে ছোটা। “স্বর্গে পৌঁছেছো? স্বর্গ কত দূর?’…. স্বর্গ কেবল মরিচিকার মত সরে সরে যায়। সেখানে সমুদ্রস্নানের পর কোল্ড বিয়ার সহযোগে তন্দুরি পমফ্রেট এত আনন্দদায়ী ছিল যে একমাত্র এই কথাটাই ইন্দ্রনাথ মিঠুয়াকে বলেছিল। মিঠুয়া জানত লিপি সঙ্গে আছে। কারণ ইন্দ্রনাথ তাকে সকাল সাতটার মধ্যে তাকে ফোন করে নিত। দায়িত্ববোধ একেই বলে। সবদিক সামলাতে হবে তো! কিন্তু তারপর ইন্দ্রনাথের মোবাইল অফ থাকত।মিঠুয়া চেক করেছিল।তার মানে, নির্ঘাত সকাল সাতটা পর্যন্ত লিপি ঘুমোত।

      ফেরার পর ইন্দ্রনাথ তন্দুরি পমফ্রেট আর বিয়ারের কথা বারকয়েক বলেছিল বটে। সে সময় তার চোখে ছিল ঘোর ঘোর ভাললাগা। আরামের ছোঁয়া। মনে হচ্ছিল, শুধুমাত্র এবং একমাত্র তন্দুরি পমফ্রেট আর কোল্ড বিয়ারের জন্য একটা উইক এন্ড ট্রিপ দারুণ ভালভাবে উতরে গেছে। তখন মিঠুয়ার এত অবাক লেগেছিল! তার কেবলই মনে হয়েছিল, একটা পুরোনো হয়ে যাওয়া বউ আর পুরোনো হয়ে যাওয়া পরকীয়া প্রেমিকার মধ্যে কোনই তফাত নেই।

       ডায়েরি খুলে খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল ভুলোমনা। এই যে মিঠুয়া, একে ভুলোমনা কি চেনে? যদি চিনত, তাহলে যে জীবন মিঠুয়া কাটাত একদিন তা কেন এত নিদারুণভাবে হাস্যকর মনে হচ্ছে ভুলোমনার ? সে ডায়েরিতে লিখল ,পয়েন্ট নাম্বার ওয়ান,একদিন মিঠুয়া জীবন খুঁজতে বেরিয়েছিল। তার সঙ্গে ছিল, তার রুচি,তার সৃষ্টির ক্ষমতা আর কিছু মূল্যবোধের পুঁজি। মানুষ দেখতে চেয়েছিল সে।  পয়েন্ট নাম্বার দুই- এইভাবে জীবন নিয়ে পরীক্ষামূলক কাজ করতে নেমে তার প্রথমেই মোলাকাত হয় ইন্দ্রনাথের সঙ্গে। সেটা দুর্ভাগ্য না সৌভাগ্য ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। বোধহয়, দুর্ভাগ্যও নয় সৌভাগ্যও নয়, ওটা জাস্ট একটা ঘটনা ছিল এবং ঘটনা সবসময়েই নিরপেক্ষ হয়। আমরা তাকে আমাদের আবেগ অনুসারে ভাল বা মন্দ তকমা দিই। পয়েন্ট নাম্বার তিন- এই ইন্দ্রনাথ যে মেয়ে দেখলেই খেলোয়াড় হয়ে উঠত, সে পাকেচক্রে সত্যি সত্যিই মিঠুয়ার প্রেমে পড়ে যদিও তার একজনের সঙ্গে বহু বছরের প্রেমসম্পর্ক ছিল। জনৈকার নাম ছিল লিপি। এই ইন্দ্রনাথ মিঠুয়ার কাছে তার এই সম্পর্কের কথা চেপে গেলেও মিঠুয়া নানাভাবে জানতে পারে। তার মনে হয় তাকে ঠকানো হয়েছে যেটা অন্যায় এবং অনুচিত। অথচ এই সম্পর্ক নিয়ে ইন্দ্রনাথের সঙ্গে তার কোনোদিন সরাসরি কথা হয় না !

     চার-ইতিমধ্যে মিঠুয়ার সঙ্গে দেখা হয়ে গেছিল প্রমিতের এবং প্রমিতের মাধ্যমে দেবারুণের সঙ্গে তার আলাপ হয়। এদেরও নানাবিধ সম্পর্কের কথা সে জানতে পারে। এরাই নিজেদের মুখে মিঠুয়াকে জানায় এবং সেই নিজের মুখে জানানোর ব্যাপারটা মিঠুয়ার ভাল লাগে।  

     পাঁচ-অদ্ভুত ব্যাপার হল, মিঠুয়া দেখতে পায় সকলেই ভীষণ প্রেমে পড়ার জন্য উন্মুখ। মেয়েদের কাছে প্রেমিক হিসেবে স্বীকৃতি কোথাও একটা এদের পুরুষত্ব বোধকে আনন্দ দেয়। শুধু আনন্দই দেয় না এরা অযথা প্রেমে পড়ার নেশায় আসক্ত। আর এরা প্রেমিকে প্রেম বলে না, বলে সম্পর্ক। কেন সেটাকে প্রেম না বলে সম্পর্ক বলা হবে, এ বিষয়ে এরা নানান ব্যাখ্যা দেয়।কিন্তু শেষপর্যন্ত মিঠুয়া এই বিষয়টা বুঝে উঠতে পারেনি। পয়েন্ট নাম্বার ছয় হল এটাই যে, এদের মাধ্যমে এদের প্রেমিকদের সঙ্গেও মিঠুয়ার মোলাকাত হয়। মিঠুয়া দেখতে পায়, এরা সকলেই খুব সাধারণ হয়েও কোথাও একটা অসাধারণ। প্রত্যেকের জীবনের প্রতি মিঠুয়ার একধরনের আগ্রহ তৈরি হয়। এরা গড়পড়তা সুখী লোকেদের মতো জীবন কাটায় না। প্রতি মুহূর্তে ঝুঁকি নেয়, নিয়ম ভাঙে, বারবার মুখ থুবড়ে পড়ে ও উঠে দঁড়ায়। এদের জীবনবোধ অদ্ভুত, প্রতি মুহূর্তেই এরা জীবনবোধ তৈরি করে ও ভাঙে আবার নতুন ভঙ্গিতে জীবনকে দেখে। হ্যাঁ, একথা খুব সত্যি এদের এইসব হাস্যকর প্রেমাসক্ত জীবনের অপর্যাপ্ত ফ্যালাসি দেখতে দেখতে মিঠুয়া নিজেও সৃষ্টির আনন্দে মেতে ওঠে। পয়েন্ট নাম্বার সাত তাহলে এটা যে, দেবারুণ আর প্রমিত ও মিঠুয়ার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির মনোভাব রাখত যদিও তারা ইন্দ্রনাথের মত চিটিংবাজি না করে সাতপুরোনো বাতিল হয়ে যাওয়া প্রেমিকাদের গল্পও মিঠুয়ার কাছে করেছিল। তাদেরও সঙ্গে দেখা হলে আলাপও করিয়েছিল।কারুর সঙ্গে মিঠুয়ার মেলামেশা ইন্দ্রনাথ পছন্দ করত না।সে চাইত মিঠুয়া তার চোখ দিয়ে জীবনকে দেখতে শিখবে।ফলে, মিঠুয়ার সঙ্গে ইন্দ্রনাথের একটা ব্যক্তিত্বের সংঘাত ছিলই। 

     এতদূর অবধি লিখে ভুলোমনা ডায়েরির পাতাটাকে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে দিল।তার মনে হচ্ছিল,যাক বাবা, এটুকু থেকে মুক্ত হওয়া গেছে।কিছুটা আরাম হচ্ছিল তার।সে দরজা খুলে বাইরে কাঠের বারান্দায় এল। বাইরে গাঢ় সন্ধ্যে। তরওপর শীতের সাদা পরত পড়েছে। সে ঠাণ্ডা  হাওয়া নিল। হালকা পায়ে সে রান্নাঘরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকল। উঁকি মেরে দেখল, রান্নাঘরে তখন যজ্ঞি চলছে। চাচীই হেড কুক। কিন্তু আজ নতুন কিছু মহিলাও আছে যাদের কাজের হাত চলছে দ্রুত। রান্নাঘরের দরজার বাইরে কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে ভুলোমনা ভাবল, এদের মধ্যে নিশ্চয় দেবেন্দ্রর মা আছে। এতদিনে সে একবারও দেবেন্দ্রর মাকে দেখেনি। বাবাকেও না। অবশ্য গুরুং পরিবারের বয়স্ক ছেলেদের কখনই দেখা যেত না, একমাত্র গুরুং ছাড়া। কমবয়সী ছেলেদের, রাজ, সুরেন্দ্র, দেবেন্দ্র এদের গুরুং- এর সঙ্গে দেখতে পাওয়া যেত। মহিলাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল চাচী আর পিসী। বোধহয় পিসীই সর্বেসর্বা ছিল। হাবভাব দেখে তাই মনে হত। দেখে মনে হত তার একচ্ছত্র দাপট সবাই মেনে নিয়েছে। 

     ভুলোমনা দরজার বাইরে কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের দেখতে লাগল, কিন্তু ভেতরে ঢুকল না। ও খেয়াল করে দেখেছে এদের বাড়ির মেয়েরা তেমন বন্ধুত্বপূর্ণ নয় বোর্ডারদের সঙ্গে। যদিও ভুলোমনা বহুদিন ধরে আছে, অন্য বোর্ডারদের মত কদিনের জন্য এসে চলে যায় না। তাই ওকে সবাই চেনে। অসুস্থ বলে খানিকটা করুণার ভাবও আছে,কিন্ত বন্ধুত্ব  নয়। তবে কে বন্ধুভাব দেখালো আর কে দেখালো না, তাতে আর 

ভুলোমনার বেশী কিছু এসে যায় না। সে তার ঘোরের জগতে বেশ আছে। এমনি সময় দেবেন্দ্র বেরোলো,হাওয়াই চটি ফটফটিয়ে। ভুলোমনা দেবেন্দ্রকে জিজ্ঞেস করল,        – অ্যাই দেবেন্দ্র, তোমার মা কোথায়? তোমার মা কি এখানে আছে?

দেবেন্দ্র মাথা নাড়ল।-নহী।

-কখনও দেখি না কেন, তোমার মাকে? 

-ও এখানে থাকে না।

-কোথায় থাকে?

-জানিনা।

-তুমি তোমার মা কোথায় থাকে জানো না?

-না।

-কেন?

-ও এ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।

-কোথায় চলে গেছে? ভুলোমনার ভয় করতে লাগল, দেবেন্দ্রর মা মারা গেছে?

-অন্য বাড়িতে, আরেকজনকে বিয়ে করে।

দেবেন্দ্র আর দাঁড়াল না। চলে গেল চটি ফটফটিয়ে।কিন্তু ভুলোমনা দাঁড়িয়েই রইল। জোরকা ঝটকা কেমন

ধীরেসে দিয়ে চলে গেল দেবেন্দ্র, অবশ হয়ে গেল সে। ক্রমাগত বিড়বিড় করে নিজের মনে আওড়াতে লাগল,

আউট বিয়ন্ড আইডিয়াস অব্‌ রং ডুয়িং এ্যন্ড রাইট ডুইং

দেয়ার ইজ আ ফিল্ড আই উইল মিট ইউ দেয়ার… 

বারো

      পরপর চারদিন ভুলোমনা কেবল শুয়ে রইল। সে কবে এই বিস্মরণের হাত থেকে মুক্তি পাবে আর মুক্তি পেলেই সে অন্য কোথাও চলে যাবে।কিন্তু কোথায় যাবে সে জানে না। পুরনো জীবন, মানুষ, ঘটনা তার গা থেকে

খোলসের মত খুলে খুলে পড়ে যাচ্ছে। শুধু বিস্মরণের মুহূর্তটাই যা মনে পড়া বাকী।

নতুন জীবনে সেটা আচমকা মূর্তিমান আপদের মত তার মনে উদয় হয়ে নতুন কোনো অঘটন বাঁধিয়ে না বসে, তাই এই চিন্তা। তাই এখান থেকে পাততাড়ি গোটানোর আগে সেই ঘটনাটার মুক্তি পাওয়া দরকার। কিন্তু সেটা যে কবে হবে তা কে জানে? 

   সে বিছানা থেকে উঠে জানলার কাছে দাঁড়াল। একরকম একঘেয়ে প্রকৃতি,একভাবে বয়ে চলা জীবন, একঘেয়ে সব কিছু পাহাড়ি ধুনের মত। সে জানলার কাছে একটা চেয়ার নিয়ে বসে সেখানেই ক্লান্ত সৈনিকের মত পড়ে রইল। যেন তার অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে গেছে যুদ্ধে। মাঝে মাঝে উঠে সে রিমপোচের ঘরে যাবার চেষ্টা করল। 

কিন্ত বারবার চেষ্টা করেও বারবার সে ফিরে এল। অবশেষে চারদিন বাদ পাঁচদিনের দিন সে একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে রিমপোচের ঘরে গিয়ে কার্পেটের ওপর বসে পড়ল। দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে। সিধে হয়ে বসার মত শক্তিও তার ছিল না। কিন্ত ক্লান্ত চোখে রিমপোচের চোখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তার খুব আরাম লাগছিল।

রিমপোচে তার দিকে তাকিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করল, কি চাও?

-পুরনো জীবনের কথা আর না ভাবতে। কেই বা চায় কোনকিছু ভাবতে। ভাবনা মনেই গোলকধাঁধা!

ভুলোমনার দু চোখ বেয়ে জল পড়তে লাগল। দেখো এই পৃথিবীতে আমি বেমানান। এখানে আর কিছু না হোক,টিঁকে থাকার যোগ্যতা দরকার। আমি পারিনি। আমি পারি না।

রিমপোচে ভুলোমনার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে ছিল করুণা, বুদ্ধের মত লাগছিল তাকে। 

-ভুলোমনা , মিঠুয়াকে ডাকো,ওর সঙ্গে কথা বল। 

রিমপোচে বলল । 

দূর থেকে একটা গান ভেসে আসছিল… ধীরে ধীরে ধীরেএ সবকুছ হোয়ে….রিমপোচে ঢিমে ঢিমে দুলছিল গানের সঙ্গে। তার সঙ্গে ছিল ঘোর|সেই ঘোর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। ভুলোমনার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিল ঘোর।হঠাৎ তার মধ্যে থেকে অনেকদিনের আগের মিঠুয়া বেরিয়ে মুখোমুখি দাঁড়াল।ভুলোমনা হঠাৎ ভীষণ হকচকিয়ে গেল।এখন কি করবে সে? কি করা উচিত? তার হঠাৎ ভীষণ ভয় করতে লাগল। মনে হল সব এই মুহূর্তে বোমা ফাটার মত ফেটে ছিটকে বেরিয়ে পড়াবে।সে ধাক্কায় ছিটকে যাবে ও নিজেও। কিন্তু তক্ষুনি তার চোখ পড়ল রিমপোচের দিকে। রিমপোচে ছিল স্থির।

শান্ত। তার চোখে ছিল অদ্ভুত শান্ততার সঙ্গে অভয়ের সংমিশ্রণে তৈরি হওয়া ভয়হীনতরটা মত একটা কিছু। ভুলোমনা বেশীক্ষণ ভয় পেতে পারল না। শরীর থেকে ঘাম ঝরে ঝরে পড়ে যাওয়ার মত ভয় একসময় ঝরে পড়ে গেল।এমনভাবে যে ভুলোমনা তার আশেপাশে ভয়ের খোলসটাকেও খুঁজে পেল না।

মিঠুয়া হাসল।-চিনতে পারো?

ভুলোমনা সহসা হ্যাঁ বা না কিছু বলতে পারল না।

মিঠুয়া বলল,তুমি কি খুঁড়ে বার করতে চাইছ? শুধুই কিছু ঘটনা না তোমার ভুলগুলো?

ভীষণ অবাক হয়ে গেল ভুলোমনা।-আমার ভুল? -তোমার ভুল নয়?

-তুমি আর আমি যে এক এটাই তো তুমি ভুলে গেছ। মনে করে দেখো ভুলোমনা আমি তোমার অতীত, তুমি এখন এই ঘরে এই মুহূর্তে বর্তমান আর আরেকজন আসছে যে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।

-সে কবে আসবে? 

-সে আসবে।তুমি নিজেকে পুরো খুলে ফেলতে পারলেই সে আসবে।

-কিভাবে খুলে ফেলব আমি নিজে ?

-আঁতিপাতি করে খুঁজে।

-কি খুঁজব,আমি ভুলে গেছি গো। আমার যে কিছুতেই মনে পড়ছে না।

-আমার দিকে তাকাও মনে পড়বে।দেখো, আমি একটা ভালবাসা চেয়েছিলাম। তুমি একটা ভালোবাসা চেয়েছিলে। এমন একটা ভালবাসা যেটা পানসে হয় না। সবসময় টাটকা। সবসময় সেই প্রেমের ভেতর বাঁশীর ডাক।তুমি জীবন পণ করে অভিসারে চলেছ , তোমার মনে রাধার উত্তেজনা, মীরার অপেক্ষা। ছমছম মল্‌ যাতে পায়ে না বাজে,নুপূর খুলে ফেলেছ তুমি।রাধা সবকিছু দাঁও পে লাগিয়ে দিয়েছিল।তুমি কি পেরেছিলে? আমি কি পেরেছিলাম? ভেবে দেখো।

না, আমি পারিনি।

পরক্ষণে গর্জে উঠল ভুলোমনা।

-কেন পারব? কি করে পারব? এত আত্মসুখী, নার্সিসিস্ট একজন মানুষ ছিল সে। রাধা পেরেছিল কারণ আর যাই হোক কৃষ্ণ আত্মসুখী ছিল না।

-তুমিও কি আত্মসুখী ছিলে না? আমিও কি ছিলাম না? ভেবে দেখো।

– না। মিঠুয়া, আত্মসুখী নয়। আমরা রেসিপ্রোকেশন চাইতাম। প্রপার আদান-প্রদান।কমিটমেন্ট। লয়ালটি। 

বফাদারী। বেবফাঈ নয়।

-হাসালে। কৃষ্ণ তো সবচেয়ে বড় বেবফা ছিল।এখনও পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে তার চেয়ে বড় বেবফা তো আর কেউ আসেনি।তাহলে রাধা কি করেছিল?

-রাধা আবার কি করবে? রাধা ভাল লাগা,মন্দ লাগা, মান অভিমানের ওপারে নিজেকে নিয়ে গেছিল।

ওই আউট বিয়ন্ড আইডিয়াস অব রং ডুইং এ্যান্ড রাইট ডুইং, দেয়ার ইজ আ ফিল্ড আই উইল মিট ইউ,

দেয়ার…ওখানে।

– সেটা আমরা পারিনি।

-না আমরা পারিনি!

-তুমি একটা দিব্যসত্তা খুঁজেছিলে…যা তোমাকে সীমাহীন প্রেমস্বরূপের সঙ্গে মোলাকাত ঘটিয়ে দেবে। তা

সম্ভব ছিল না। যারা ভীষণ বেশী মানুষ হয়ে আছে, তাদের মধ্যে দিব্য প্রেম খুঁজতে গেলে শুধু তার সীমাবদ্ধতার সঙ্গেই বারবার মোলাকাত হয়। তাই হয়েছিল।   

-তোমার মনে নেই, মাঝখানে প্রমিত আর ইন্দ্রনাথের মধ্যে কিসব লাফড়া চলছিল, সবটা মনে নেই, এরা ছিল খুবই সম্পর্ক কাতর মানুষ, বলা যায় সম্পর্ক অবসেসড্‌।

– হ্যাঁ, হ্যাঁ মনে পড়ছে বৈকি। হেসে ফেলল ভুলোমনা। কি যে সব কাণ্ড হত ! আমি শুধু দেখতে চেয়েছিলাম যে এরকমও একটা পৃথিবী আছে। হ্যাঁ, সেটা আমি প্রাণভরে দেখেছি, যথেষ্ট দেখেছি।সম্পর্ক বুভুক্ষু কাতর নরনারী সব…নিজেদের মধ্যে রেষারেষিতে মগ্ন। অবাস্তব আমিত্বে ভরা উচ্চকিত কন্ঠস্বর সব।একদিন হল কি…কোথায় যেন কবিতা পাঠ শুনতে যাওয়ার কথা প্রমিতের সঙ্গে। প্রমিত লিখত ভাল। খুবই ভাল। তবে ওর গদ্য লেখার হাতটা ছিল বেশী সহজ। তো ভরা পার্কস্ট্রিটে খুব হুড়োতাড়া করে প্রমিত আমাকে

একটা ট্যাক্সিতে উঠিয়ে ফেলল। কবিতা পাট লাটে উঠল। সেখান থেকে সোজা কোন এক রেস্টুরেন্টে। নামটা মনে নেই। প্রমিত সেখানে কেবলই ড্রিঙ্ক করতে লাগল পেগের পর পেগ। আর ভীষণ কাঁদতে লাগল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ওর চোখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোনোর মত জল ঝরছে। কাঁদতে কাঁদতে নিজেকে ও বলতে লাগল, আমি খুব আধুনিক। তারপর আরও কাঁদতে লাগল। বলতে লাগল ওদের মধ্যে বন্ধুতটা নষ্ট

করে দিল লিপি শোয়াশুয়ি করে। ওদের মানে ইন্দ্রনাথের সঙ্গে ওর। তারপর বীভৎস বর্ণনা দিতে লাগল ইন্দ্রনাথ ও লিপির প্রেমকাহিনীর। ও তখন ছিল প্রত্যক্ষদর্শী। এইসব আর কি !

     তারপর আমি বাড়ি চলে এলাম জোর করে। বাড়ি ফেরার পর প্রমিত ক্রমাগত ফোন করতে লাগল।বিরক্ত হয়ে আমি ফোন সুইচ অফ করে দিলাম। রাত একটায় পড়াশুনো সেরে আবার ফোন অন করেছি, সঙ্গে সঙ্গে ফোন বাজতে লাগল।প্রমিত।ও কি পাগল নাকি? এমনিভাবে ফোন করে চলা কি করে সুস্থ মানুষের লক্ষণ হতে পারে, বলো। আমি ফোন ধরলাম। প্রমিত থমথমে গলায় বলল,  আমি জানি আপনি প্রেম, সম্পর্ক, এসবে বিশ্বাস করেন না, কিন্তু আমি তো আপনাকে ভালবেসে ফেলেছি ম্যাডাম। আমি কি করব ? হ্যাঁ প্রমিতের 

গলার মধ্যে আমি অসহায়তা দেখেছিলাম।ওই রাত একটায় ওটা সত্যি ছিল। হয়ত পরেরদিন সকালেই ওটা আর সত্যি থাকবে না। অন্যকিছু হয়ে যাবে।আসলে, কিছু কিছু সত্য মুহূর্ত এসেছিল। কিন্তু ওগুলো জুড়ে জুড়ে মালা গাঁথতে যাওয়াটা হল চরম বোকামি। 

     -হ্যাঁ, আমি ভীষণ অবাক হয়েছিলাম প্রেম নিয়ে এইরকম বাতিকগ্রস্তের মত ব্যবহার দেখে।এমন ধরণের মনুষ্য প্রজাতি আমি আগে কখনও দেখিনি। তাই বড় অবাক লাগত। মনে হত, এরকম কেন করে? মনের ভেতর কে কামড়ায়? এইসব ভাবতাম।তারপর অবশ্য আর ভাবতাম না। অভ্যেস হয়ে গেছল।

-এরপর কি হল মনে পড়ে? 

-মনে পড়ে মিঠুয়া। বোধহয় তোমাকে দেখে মনে পড়ে গেল। তোমাকে হাঁটতে চলতে ফিরতে দেখছি ওইসময়ে। যখন সেদিন তুমি ঘুমিয়ে পড়লে পরদিন ভোর সাড়ে পাচঁটায় ফোন এল ইন্দ্রনাথের উদ্বিগ্ন । চরম অস্থির।

-তারপর?

-আঁতিপাতি করে প্রশ্ন করল, কবিতা পাঠ শুনতে আসিনি কেন? বললাম, শরীর খারাপ লাগছিল।বলল, ফোন কেন বন্ধ ছিল।বললাম, ওই প্রমিত বারবার ফোন করছিল তাই। 

-এরপর কিসের যেন অশান্তির বাষ্প চারদিক ছেয়ে গেছিল।

-হ্যাঁ, আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কি যে আসলে ঘটছে। সবকিছুই ছিল ভীষণ দুর্বোধ্য। আমার ওদের কিশোর বয়সের উদভ্রান্ত প্রেমিকদের মত লাগাছিল। আসলে তা নয়। ওরা যেযার নিজেদের  স্বার্থ নিয়ে লড়ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে ওরা মোহরা হিসেবে ব্যবহার করছিল আমাকে। 

-সত্যি কথা বলতে কি, আমরা ছিলাম আদ্যপান্ত হাঁ করা একটা মেয়ে। এই দেখাগুলোতে নাজেহাল না  হয়ে, শুধু দর্শক হিসেবে দেখলেই তো হত !

-এই পাহাড়ে, এই প্রকৃতির মাঝে ওগুলোকে যে কত তুচ্ছ, কত সময় ও শক্তির অপব্যয় ও হাস্যকর বলে মনে হয় আর মনে পড়াতেও ইচ্ছে করে না। মনে পড়ে গেছে। এবার ওগুলো উড়ে যাক হাওয়ায়, আকাশে, বাতাসে। আমি আর ওদের বহন করতে চাই না।

-একদিন এই পাহাড়ে এমনিভাবে প্রকৃতির ভেতর দিয়ে তোমার নিজেরই উন্মোচন হবে, তা কি তুমি

জানতে না ?

-সঠিক হয়তো জানা ছিল না। কিন্তু আভাস তো পেয়েছিলাম। মন খুব খারাপ ছিল তখন। মানুষদের মধ্যে এত স্বার্থের সংঘাত, শুধুমাত্র সাহিত্যের জগতে নিজের নাম প্রতিষ্ঠার জন্যই তো ! আর তো কিছু না।

মানুষের ভেতর থেকে ছায়ামূর্তির প্রেত, পিশাচের মতো দাঁত নখ বের করা অন্ধকারের প্রবৃত্তিরা হানা দিত।একে অপরকে খুবলে নিত। শুধুমাত্র টিঁকে থাকার জন্য।তার লেখার পাঠক পাবার জন্য। কিছু পুরষ্কারের জন্য।

নামের মোহের জন্য। এরাও তো সর্বস্ব পণ করেছিল শুধু সাহিত্যের জন্য। পিছিয়ে পড়তে বা হারতে চাইত না কেউ। তাই বারবার হারতে হত ওদের।

      কষ্ট হচ্ছিল আমার। সত্যিকারের কষ্ট। ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছিলাম এসবে। বারবার মুখে চোখে জল দিচ্ছিলাম আমি। কোথায় এসে পড়লাম, এমনিই ঘুরতে ঘুরতে। ভারী অদ্ভুত জায়গা তো। ভারী অদ্ভুত আচরণ মানুষের।

এরকম মানুষ আমি আগে কখনো দেখিনি। আমার কষ্ট হচ্ছিল। ভীষণ কষ্ট কষ্টটা বুকে চেপে ঘুমিয়ে পড়লাম

আমি। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। ঘরে উৎকট দমচাপা ভাব। দেখলাম কারেন্ট চলে গেছে। দরজা খুলে পায়ে

পায়ে পাশের ঘরে এলাম। খোলা জানলার কাছে গিয়ে বাইরে তাকালাম। গভীর নিশুতি রাত বাইরে। শহরে রাস্তার আলো নিবে যাওয়ার জন্য রাতটাকে বহু শতাব্দী পেছনে চলে যাওয়া এক আদিম রাতের মত লাগছিল।

সামনের মাঠে বিশাল বিশাল মহীরূহ ডালপালা বিস্তার করে দাঁড়িয়েছিল। তাদের শাখা-প্রশাখায় রাতের আকাশ ছেয়েছিল। গাছেদের রঙ ছিল গভীর কালো। তাদের কালোর গভীরতা রাতের আকাশকে হার মানিয়ে দিয়েছিল।আমি ওই কালো কালো ডালপালায় ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে যাই। কি অপূর্ব, কি মোহময়! এ তো প্রেম ! এর কাছে কোথায় লাগে প্রেমাম্পদের প্রথম চুম্বন।

      সেই প্রথম আমি দেখেছিলাম নিজেকে নিঃশব্দ ইথারের মতো প্রকৃতির মধ্যে মিশে যেতে। আমি  হুঁশহারা হয়েছিলাম। এক সময় আমি শুয়ে পড়ি আর বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে অবিরাম বয়ে চলা নিরবচ্ছিন্ন প্রেম, আমার ওপর

দিয়ে হাওয়ার মতো বয়ে চলে। আমি পড়ে থাকি চুপচাপ। ক্রমে আলো ফুটে ওঠে ও শহর আড়মোড়া ভাঙে।আর আমার মনে হয়, রাস্তায় শুয়ে থাকা গৃহহীন ভিখারিদের ঘুম থেকে ডেকে বলি, চলো উৎসব করি।

অবশেষে এর জন্য আমি মনে মনে ধন্যবাদ দিই প্রমিত এবং ইন্দ্রনাথকে। তারা এভাবে আমাকে মুখোশ খুলে মানুষের মুখ না দেখালে আমার এইভাবে একটা রাতের বোধ হত না। বিশ্বের সর্বত্র কোণে কোণে কানায়  কানায় ভরে আছে প্রেম, হাত ভরে তুলে নিঃশ্বাসে ভরে নাও। এ বোধে আমি পৌঁছতাম না। আমি বিশ্বে ভরা-ভরতি প্রেমের মতো ভর্তি হৃদয় দিয়ে ধন্যবাদ দিয়েছিলাম ওদের।

  আনমনে মিঠুয়া বলল, হুঁ। কিন্তু যাইহোক আর তাইহোক, বড্ড বোকা ছিলাম আমরা।

  -বোকা ছিলাম। পুনরাবৃত্তি করল ভুলোমনা।

  -শিখতে সময় লাগছিল। কতরকম জীবন হয়। মানুষদের ধারণাগুলোও কত ধরণের হয়। বাক্তিগত ধারণা অনুযায়ী ব্যক্তিগত জীবন পরিচালিত হয়। তার মধ্যে ভাল-মন্দ বিচারের ঝুলি কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার

জন্য আমরা কে? প্রতি পদে পদে নিজের ধারণা অনুযায়ী অন্যদের ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করাটা উচিত হয়নি ।

   মিঠুয়া চুপ করে রইল।

   কিছুক্ষণ পর মিঠুয়া বলল, কি করা উচিত ছিল?

   -জানি না। তুমি একটা প্রেম খুঁজছিলে মিঠুয়া। এমন একটা প্রেম যা পুরনো হয়ে যায় না। অভ্যেসে পরিণত হয় না। কোনো শর্তের ওপর নির্ভর করে না। যে প্রেম সত্যে প্রতিষ্ঠিত থাকে এবং সবসময় চিরনতুন থাকে।

   -হ্যাঁ, ঠিক এটাই…এটাই। একমাত্র এটাই চেয়েছিলাম। সেইজন্য চেয়েছিলাম, ইন্দ্রনাথ মিথ্যে কথা বলাটা বন্ধ করুক। সত্যি কথা বলুক। তারপর যা হয় দেখা যাবে। কিন্তু লিপির ব্যাপারে যেহেতু ও গোপন করতে চাইত,তাই মিথ্যে কথাটাও ওকে বলতে হত।

   -ও ভয় পেত মিঠুয়া। আসলে ভীষণ ভিতু ছিল ইন্দ্রনাথ। একটা শক্তপোক্ত পুরুষালি ব্যক্তিত্বের আড়ালে একটা ডরপোক দুর্বল মানুষ দাঁড়িয়েছিল।

   -একটা কথা ও বলত বটে। মনে আছে তোমার? ও বলত, ওর একা হয়ে যেতে ভয় করে। আমি ওকে বলতাম, আমরা সকলেই তো একা। খামোখাই কিছু সম্পর্ক বন্ধুত্ব ইত্যাদি পাতিয়ে একটা মিলিত সময় কাটাচ্ছি। কিন্তু একা হয়ে যাওয়ার খা-খা ভাব কখনোই মুছে যাচ্ছে না। স্বজনহীন,বান্ধবহীন খালিপন,শুন্যতা কাটাতে আমাকেও .. হয়ত তাই ছিল এত তোড়জোড়…এত প্রেম অন্বেষণ।

   -আমি নিজে নিজেই একটা অপেক্ষা তৈরি করে নিয়েছিলাম। সৎ হওয়ার অপেক্ষা যেদিন ইন্দ্রনাথ সৎ হবে সেদিন সে সাহসীও হবে। গোপনীয়তা আর মিথ্যাচার থেকে বেরিয়ে আসবে।

  ভীষণ হাসি পেল ভুলোমনার। কষ্টের হাসি, কান্না মেশানো হাসি।

  -এটা কি খুব জরুরী ছিল মিঠুয়া? কেন তুমি প্রেমের মধ্যে শর্ত টেনে এনেছিলে? সব শর্ত তো ভাঙতেই চেয়েছিলে তুমি ! না ?

   মিঠুয়া মাথা নীচু করে রইল। চলতে চলতে তারপর এমন একটা দিন এল একদিন, যেদিন হঠাৎ ইন্দ্রনাথ ফোন করল এক অদ্ভুত সুরে। এটা সেই দিনটা ছিল যেদিনের অপেক্ষায় ছিল মিঠুয়া। ফলে ইন্দ্রনাথ যখন কোনো এক ফাইন মরনিং মিঠুয়াকে ফোন করে জানাল,-তোমার যত না-বলা অভিযোগ ছিল, সব মুছে দেব আমি। মিঠুয়া ভাবল, হল কি?

   ইন্দ্রানাথ বলে উঠল, আমার যে সম্পকর্টা ছিল, ওসব আর নেই।

   …আর নেই।

   মিঠুয়া ভাবল, তবে কি সত্যের জয় হয়েছে?

   কারণ দেবারুণ আর প্রমিত যে স্থির প্রত্যয়ের সাথে বলত, যে সম্পর্কে দুজনেই দুজনকে নৈতিকভাবে ব্যবহার করে, সে সম্পর্ক একদিন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এরকমই ধারণা নিয়ে ওরা সকলেই বড় হয়েছিল। এই মূল্যবোধ ওদের ধমনীতে নীরবে বয়ে চলেছিল।

   মিঠুয়া ভুলোমনাকে প্রশ্ন করল, তুমি জানো, কোনটা নৈতিক আর কোনটাই বা অনৈতিক?

  ভুলোমনা যদিও হঠাৎ কোন উত্তর দিতে পারল না, কিন্তু একটু পরেই সে জানাল যে, না সে জানে না। তবে হ্যাঁ, ভুলোমনার মনে পড়ছে এইরকম একটা বিপজ্জনক সময়ে ইন্দ্রনাথ তার সঙ্গে এমন ব্যবহার করেছিল

যার স্বপ্ন সে দেখেছিল শুরু থেকেই। ফলে, তার অবস্থাটা দাঁড়িয়েছিল অনেকটা হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো। তার মনে পড়ল, দিনে চারবার ফোন করে ইন্দ্রনাথ কি যে সব বলত। সে মাঝেমধ্যে হাহাকার করত, কখনও ভীষণ ক্রূদ্ধ, কখনও শাপশাপান্ত করত , আর মিঠুয়ারূপী সে হাঁ করে ভাবত, হলটা কি? এইরকম এক হাহাকারের দিনে ইন্দ্রনাথ একদিন হতাশার মধ্যে ঘোষণা করল, লিপি জীবনে যা করেছে, তা ইন্দ্রনাথের সহযোগিতা ছাড়া সম্ভব ছিল না। এখন ওর মাথার ওপরে ইন্দ্রনাথের সহযোগিতার হাত না থাকায় ও দ্রুতগতিতে পতনের দিকে ধাবিত হবে। 

   পতনের দিকে ধাবিত হবে কি হবে না, সে সম্পর্ক মিঠুয়ার কিছু জানাই ছিল না। সে বুঝতে পারেনি দিনে দিনে আর্সলে শুধু সে দর্শকে পরিণত হতে চলেছে। তাই যা তার অভিজ্ঞতায় কোনদিন ঘটেনি,কেবল তাকে স্বাক্ষীস্বরূপ হয়ে দেখে যাওয়া ছাড়া তার আর কিছু করার নেই। সেসময় কয়েকদিন ইন্দ্রনাথ তাকে নিয়ে সর্বত্র ঘুরে বেড়াতে চাইত, সভা সমিতি ও আড্ডার আসরে। মিঠুয়া খুব অবাক হয়ে উপলব্ধি করেছিল,

ইন্দ্রনাথের চাহিদামত এত দৌড়ঝাঁপ তার পোষাচ্ছে না। আর ইন্দ্রনাথ বেশ নাছোড়বান্দা।এইসময় ইন্দ্রনাথ মিঠুয়াকে দ্বিতীয় লিপি হিসেবে গড়ে তোলার কসরত চালাচ্ছিল আর মিঠুয়া ঘোরতরভাবে বুঝতে পারছিল যে তার পক্ষে লিপি হয়ে ওঠা একেবারে অসম্ভব। সে ইন্দ্রনাথকে বলল, এই যে হঠাৎ পালাবদল, এর কারণটা আমি জানতে চাই।

  ইন্দ্রনাথ জানাল যে, সেও বলতে চায়, তবে তাকে কয়েকটা দিন সময় দিতে হবে। তবে সে বলবে যখন বলেছে, তখন বলবেই। পাঁচদিন অসাক্ষাতের পর ইন্দ্রনাথের কাছে লিপি এল। ইন্দ্রনাথ আগে থেকেই মিঠুয়াকে জানিয়ে রেখেছিল। সাক্ষাৎ প্রায় তিন ঘণ্টা যাবৎ চলেছিল। তারপর আবার ইন্দ্রনাথ মিঠুয়াকে জানিয়েছিল। তবে মিঠুয়া যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছিল। সে অপেক্ষা করছিল। আবার আর একটা অপেক্ষা ইন্দ্রনাথ যখন তাকে বিশ্বাস করে সবকিছু খুলে বলতে পারবে সেই দিনের অপেক্ষা।

  

    সেই দিন এলে তবে সে পুরোপুরি ইন্দ্রনাথের হবে। সেইদিন আর আসেনি। তার বদলে ইন্দ্রনাথের ফোনে লিপির মেসেজ এসেছিল। “ইট’স রেনিং। এগজ্যাক্ট টাইম বলো। নয়তো ভিজে যাব’। ইন্দ্রনাথ ফোন বাড়িতে ফেলে তড়িঘড়ি বেরিয়ে গ্রেছিল গাড়ি নিয়ে। একটুখানি গিয়েই তার মনে পড়ে সে ফোন ফেলে গেছে। ফোনে লিপির মেসেজ আসে এবং মেসেটা দ্যাখে সহেলি। ফোন নিতে এসে ইন্দ্রনাথ বাড়িতে আটকা পড়ে। সে বাথরুমে ঢুকে ছড়ছড় করে কল খুলে দেয় এবং মিঠুয়াকে ফোন করে

জানায়। তবে সে, সত্য বলেনি, অনেকখানি মিথ্যে মিশিয়ে বলেছিল। কারণ লিপির সঙ্গে দেখা করার পরেই তার মিঠুয়ার সঙ্গে দেখা করার ছিল। মিঠুয়াকে ফোন করে লিপির মেসেজের কথা জানায় সহেলি। আবার ইন্দ্রনাথ মিথ্যের আশ্রয় নিতে আরম্ভ করে।

    

    এই ঘটনার পর মিঠুয়া একেবারে থমথমে হয়ে যায়। সে এক গভীর ভাবনার জগতে ঢুকে পড়ে। অবসর সময়ে সে শুধুই বুঝতে চেষ্টা করত, যা ঘটছে, আসলে তার স্বরূপ কি। এইভাবে ভাবতে ভাবতে বছর দুই পার হয়ে গেছিল।ইন্দ্রনাথ আসত,যেত। সে ইন্দ্রনাথের সঙ্গে খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করত।পুরোনো স্মৃতির মধুর হাতছানি মাঝে মাঝে তাঁকে নাড়া দিয়ে যেত। সে শুধু বোঝার চেষ্টা করত কোনটা কতটা সত্যি ছিল আর

কোনটা ছিল কতটা মিথ্যে।

  

তেরো

    ব্যাপারটা সম্পর্ক না প্রেম নাকি আশ্রয় না ভালবাসা না কি ছাতার মাথা এ সমস্তই একটা সময়ে তালগোল পাকিয়ে গেছিল। ব্যাপারটা তখন নিয়মমাফিক একবার ফোনে দাঁড়িয়ে গেছিল। সেই ফোনটা মাঝে মাঝে হত

অনেকটা এরকম। ইন্দ্রনাথ ফোন করল,_কি করছ?

  -গল্পটা এডিট করছি।

  -গল্পটা লেখা হয়ে গেছে? শেষটা কি করলে?

  -শেষটাতে…

  -আচ্ছা, দাঁড়াও আমি তোমাকে আবার ফোন করছি।

ফোন কেটে গেল।

দশ মিনিট পর আবার ফোন।

   -মিহিদানা কিনতে এসেছি।

   -আপনি মিহিদানা খাবেন ?

  -হ্যাঁ

  -লজ্জা করে না? আপনার না মিষ্টি খাওয়া বারণ?

-লজ্জা করবে কেন, আমি তা জামাকাপড় পরে আছি আচ্ছা, দাঁড়াও, তোমাকে আবার ফোন করছি।এ। এ.টি.এম-এ ঢুকব। টাকা তুলে নিই তারপর।পাঁচমিনিট বাদে আবার ফোন।

  -হ্যাঁ, তারপর বলো, গল্পটার শেষটা কি দাঁড়াল?

  -শেষে আবার প্রথম সিনটা ফিরে এল।

  -প্রথম সিনটা যেন কি ছিল?

  -ওয়ালযার রিভলবার দিয়ে ও নিজেকে শ্যুট করছিল।

  -ও হ্যাঁ সুইসাইড করছিল তো?

  এইরকম চলত। মাঝে মাঝে ইন্দ্রনাথ সিরিয়াস ফোন করত। সাধারণত কবিতা লেখার পর ইন্দ্রনাথ খুব সিরিয়াস হয়ে থাকত। তখন সে ঘন ঘন মিঠুয়াকে ফোন করত। কবিতার দর্শন,শব্দচয় ইত্যাদি নিয়ে কথাবার্তা

হত। ক্রমশঃ মিঠুয়া বুঝতে পারছিল ইন্দ্রনাথের অসহায়তার কথা। সে প্রাণপণে চাইত, সকলের কাছ থেকে মিঠুয়া লুকিয়ে রাখতে, পাছে কেউ মিঠুয়া সম্পর্কে কিছু বলে,আর যদি সেই কথা লিপির কানে পৌঁছোয়। এটা

ইন্দ্রনাথ কখনই চাইত না বটে, কিন্তু এটা সম্পর্কে সে যে ভীষণ সাবধানী এ ব্যাপারেও সে কখনও কিছু বলত না। এতদিক রক্ষা করতে হলে যে কেউ কাহিল হয়ে গড়বে, এমনই ভাবত মিঠুয়া এবং এই ভাবনার মধ্যে সত্যতা ছিল। সেইসব দিনে সত্য এবং মিথ্যে এমন পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়েছিল, সত্য আর মিথ্যেকে আলাদা করে চেনা ছিল দুষ্কর।

   

     ভুলোমনা রিমপোচের  ঘরে বসে বসে, মিঠুয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে অনেক সময় পার করে ফেলেছিল। এমনকি তার এটাও বোধ ছিল না,অনেক সময় পেরিয়ে গেছে না অল্প সময়। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে আসছিল এবং কিছু কিছু গ্রামবাসী রিমপোচের ঘরে এসে বসছিল। এইসময় ভুলোমনা উঠে দাঁড়াল, সে মিঠুয়াকে রিমপোচের ঘরে রেখে একা একা বাইরে এল। সে এমনভাবে মিঠুয়াকে রিমপোচের কাছে রেখে এসেছিল যেন মনে হচ্ছিল, সে চিরকালের মত মিঠুয়াকে ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। বাস্তবিকই, মিঠুয়ার জীবন থেকে বিদায় নিয়ে ভুলোমনা হাঁটতে শুরু করল আপন মনে।

   সে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে চলতে চলতে নেমে গেছিল জঙ্গলের মধ্যে। জঙ্গলের মধ্যে পায়ের চাপে পাতার ওপর আওয়াজ উঠছিল মস মস। দূর থেকে এক ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসছিল ঢং ঢং ঢং ঢং। হয়তো কোনও মন্দিরের হবে। সে ঘণ্টাধ্বনি অনুসরণ করতে করতে চলছিল। যেতে যেতে সে কেবলই একটা কবিতা বলছিল আপনমনে।‘আই শাট মাই আইজ এ্যান্ড  অল দ্য ওয়ার্ল্ড ড্রপ ডেড। আই লিফ্ট লিডস এ্যান্ড অল ইজ বর্ন এগেইন। আই থিঙ্ক আই মেড ইউ আপ ইনসাইড মাই হেড। হাঁটতে হাঁটতে সে একটা গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। পাহাড়ের ঢালে সিঁড়ির মত ধাপ কেটে বাড়ি বানানো। কাঠের সরু সরু বারান্দা। গ্রামটার মধ্যে স্থির হাঁটতে হাঁটতে একটা পাথরের ওপর বসল ভুলোমনা। অনেকদিন পাহাড়ে থাকতে থাকতে সে কিছুটা পাহাড়িদের মত হয়ে গেছে। পাহাড়ে চলতে ফিরতে আর তেমন হাঁপায় না। আগে হাঁপিয়ে যেত। দেবেন্দ্রর সঙ্গে বেড়াতে বেড়িয়ে প্রায়ই দেবেন্দ্রকে বলত দাঁড়াতে। ওর জন্য অপেক্ষা করতে। আজ তার মনে হল, ওর জন্য কারুর অপেক্ষা করার আর দরকার নেই। ও নিজেও আর কারুর জন্য অপেক্ষা করে না। পাথরটার ওপর|বসে থাকতে থাকতে সে বিড়বিড় করে আবার কবিতাটা আওড়ালো, -স্টারস গো ওয়াল্টজিং আউট ইনব্লুএ্যান্ড,রেড।এ্যান্ড আরবিট্রারি ব্ল্যাকনেস গ্যালপস্‌ ইন্‌। আই শাট মাই আইজ্‌ এ্যান্ড অল্‌ দ্য ওয়ার্ল্ড ড্রপ্‌ ডেড । বিড়বিড় করতে করতে সে দেখতে পেল সে আর ইন্দ্রনাথ একটা বাড়ির আশেপাশে লুকোচুরি খেলছে। সে বিড়বিড় করে বলছিল নিজের মনে নিজেকেই, খুব বেশী বায়নাবাজ প্রেমিকা কেনো বয়স্ক প্রেমিকেরই সহ্য হয় না। তাদের আরও নানা একগাদা কমিটমেন্ট থাকে। আর তাছাড়া তারা নিজেরাই হয় ভীষণ বায়নাদেড়ে। কিন্ত যখন থেকে আমি নানা ধরণের আবদার ও মান-অভিমান ইত্যাদি বন্ধ করে কেবলমাত্র বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানে অবস্থান করতে লাগলাম, তখন থেকেই আমাদের প্রেমটা একেবারেই দরকচা মেরে গেছিল। অথচ ইন্দ্রনাথ নিয়ম করে ফোন করত। নিয়ম করে ফোন করার অর্থ নিয়ম করে জানান দেওয়া যে আমাদের মধ্যে কিছু একটা

আছে, যা মেইনটেইনড্‌ হচ্ছে। আমাকে ও ছেড়ে চলে যাচ্ছিল না। আবার এও হতে পারে, ছেড়ে যাবার মত মুরোদ ও হারিয়ে বসেছিল। বা হয়ত ভয়ঙ্কর কিছু ঘটলে তবেই ছাড়াছাড়ি হয়। সম্ভবত তেমন ভয়ঙর কিছু তখনও পর্যন্ত ঘটেনি। আমাদের মধ্যে সম্পর্ক ব্যাপারটা ছিল, ভগ্নাংশের মত। এদিকে ভগ্নাংশ ব্যাপারটা আমাদের মাথা জুড়ে বসে আমাদের অধিকারবোধকে ক্রমাগত খর্ব করে চলেছিল। ইন্দ্রনাথ লিপিকে হয়ত ৩/৪

অংশ ভালবাসত, আমাকে বাসত ১/৩, এইরকম কিছু একটা হবে। আবার কেউ হয়ত ওর কাছে ২/৩ জুড়ে বসেছিল। আমি চাইছিলাম একটা গোটা এক। পাচ্ছিলাম না। ওটা আমার হ্যাংলামো হয়ে যাচ্ছিল হয়ত। আসলে ভালবাসা ব্যাপারটায় ভগ্নাংশ ঢুকে পড়ার ফলে আমার যতটা না অসুবিধে হত, তারচেয়ে অনেক বেশী অসুবিধে হত মিথ্যে কথা বলার কারণে। তবে, সব সত্যি কথা বলাটা হয়ত সম্ভব ছিল না, এটা আমার বোঝা উচিত ছিল। আর কেউ কিছু একটা বলতে না চাইতেই পারে, এই গণতান্ত্রিক অধিকার তার থাকা উচিত।

     

    ইন্দ্রনাথ আমাকে কিছুটা ভালবাসত। এটা সত্যি ছিল। লিপিকেও ভালবাসত। তার ওপর আবার লিপিকে ওর বেশী দরকার ছিল। আরও কিছু কিছু জিনিসও জীবনে ওর দরকার ছিল। সেগুলোও সত্যি ছিল। 

  সবকিছুই এত সত্যি আবার সবকিছুই একইসঙ্গে মিথ্যে ছিল। এই সত্যি-মিথ্যের মহা সংকটে একদিন আমি ঘোরতর বিদ্রোহ করে ফেলেছিলাম। বলেছিলাম, এসব নিয়ে নাও। যাও। আমার এভাবে চাই না। ইন্দ্রনাথ উত্তর না দিয়ে চলে যেতে লাগল। আমি দেখলাম, আমি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছি। কতবার…কতবার এইভাবে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থেকেছি। আবার উঠেছি। আবার ভালবেসেছি। ভালবাসা পেয়েছি । আর এটাও ঠিক এই ভালবাসা পাওয়া না পাওয়া সবটাই ছিল ভয়ানক মিথ্যে আর ঘোরতর সত্যি। আমি সত্য মিথ্যের এই মহা ঘুর্ণিচকে পিষ্ট হতে হতে চিৎকার করে বলতে চাইলাম। চাই না, এসব চাই না, কিছু চাই না। যেনাহাং নামৃতা

শ্যাম, কিমহং তেন কুর্যাম? আমি অমৃতা না হব, তা নিয়ে আমি কি করব? আওয়াজটা ঘুরেফিরে প্রতিধ্বনি হয়ে আমার কাছেই ফিরেছিল। আমি চাইছিলাম, আওয়াজটা ইন্দ্রনাথের কানে পৌঁছিয়ে দিই। যখনই এমন মনে হয়েছিল, তখনই প্রবল ভয়ে কে যেন ভেতর থেকে বলে উঠেছিল, সহ্যের,বাড়া গুণ নাই।সহ্য কর,সহ্য করলে জগৎ তোমার। আমি ভয়ে কুঁকড়ে মিইয়ে যেতাম, যেন নোংরা পোঁছা ন্যাতা।

    নোংরা পৌঁছা ন্যাতা…শব্দ বন্ধটা মনে মনে বারবার আওড়েছিল ভুলোমনা। অবশেষে একদিন আমি সত্যি সত্যিই নোংরা পৌঁছা ন্যাতা হয়ে গেলাম…বলল সে। 

    বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল ভুলোমনা। আর চলতে লাগল। পাহাড় বেয়ে ওপর দিকে উঠছিল সে। গ্রামটা শেষ হয়ে গেছিল। গ্রামের শেষে কখানা বাড়ির পেছনে লম্বা লম্বা বাঁশের আগায় সাদা সাদা পতাকা লাগানো ছিল। পরিবারের যারা মৃত তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। সেইখানে ইন্দ্রনাথকে একা একা জীবনের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে দিয়ে সে এগিয়ে গেল।

   

       নোংরা পৌঁছা ন্যাতা…কি যেন ঘটেছিল। ইন্দ্রনাথ একটা ফ্ল্যাট কিনেছিল। সে মিঠুয়াকে বারবার বলছিল,ফ্ল্যাট দেখাতে নিয়ে যাবে আর কোথায় কেমন সাজানো যায় সে নিয়ে কথা বলবে। কিছুদিন বাদে দেখা গেল, ফ্ল্যাটটা লিপি মনের মত করে সাজাতে শুরু করেছে। তার কাছে ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি। ইন্দ্রনাথ আরও কিছু বন্ধুকে ফ্ল্যাট দেখিয়ে আনল। সবাই বেজায় খুশী। তারপর আর কারা যেন দেখতে চলল। সবকিছুই ইন্দ্রনাথ অত্যন্ত ঘটা করে মিঠুয়াকে জানাল। একদিন ইন্দ্রনাথ বলল, সে মিঠুয়ার কাছে সন্ধে নাগাদ এসে ডিনার করতে পারে। কিন্ত সন্ধে নাগাদ ইন্দ্রনাথ  ফোন করে প্রথমে একটা বেসুরো গান শোনালো। তারপর ভীষণ ফুর্তিতে লাফালাফি করতে করতে বলল, সীমাকে নিয়ে যাচ্ছি ফ্ল্যাট দেখাতে। সীমা ইন্দ্রনাথ ও লিপির বন্ধু ছিল। ওরা খুবই ভালবাসত সীমাকে। ইন্দ্রনাথ বলল, তারপর আমি আর সীমা চায়না টাউনে ডিনার করব। এতদিনের রপ্ত করা নিস্পৃহতা, আয়ত্ব করা উদাসীনতা, বন্ধুত্বপূর্ণ ভাবের কি হল কে জানে, সব তোলপাড় হয়ে গেল। মিঠুয়া আচমকা বলে বসল, হাউ ক্যান ইউ ডু দ্যাট? ইন্দ্রনাথ এত ভয় পেয়ে গেল…ভয়ে সে ফোন ছেড়ে দিল। কে জানে ইন্দ্রনাথ এত ভয় পেয়েছিল কেন? আর মিঠুয়া?

  ভুলোমনা ঘন কুয়াশার মধ্যে দিয়ে পথ হাতড়ে হাতড়ে পাহাড়ের ওপরে উঠছিল। একটা করে পদক্ষেপ তার সেইদিনের একটা করে মুহূর্তকে মনে পড়িয়ে দিচ্ছিল। সে ফোন ছাড়বার পর অনেকক্ষণ চিৎকার করেছিল। চিৎকার করতে করতে একসময় সে গোঙানির মধ্যে চলে গেছিল। সে তার হাঁটুদুটো মুড়ে বুকের কাছে জড়ো করে বিছানাময় কাতরাচ্ছিল। দেড় দিন বাদে ঘুম ভেঙে সে দেখে কারা যেন ভীষণ বেল টিপছে আর দরজা ধাক্কাধাক্কি করছে। সে দরজা খুলে সামন্তকে দেখতে পেয়েছিল।

    

       সামন্ত তাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। কিন্ত সে সামন্তের কোন কথা বুঝতে পারেনি। তখন থেকে সে শুধু বসে থাকত একা একা। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে, ওর কিছুই মনে পড়ত না। ফলে, কি উত্তর দেবে ও কিছু বুঝতে পারত না। তাই ও শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত। সে যে প্রকাশনার অফিসে কাজ করত, সামন্ত ছিল তার মালিক। ডাক্তার বলেছিল, মিঠুয়াকে এই শহর থেকে সরিয়ে ফেলতে। ফলে মিঠুয়ার দাদা ও বৌদি এসে তড়িঘড়ি সামন্তর সঙ্গে মিঠুয়ার বিয়ে দিয়ে দেয়।

   মিঠুয়ার স্বাধীনচেতা ভাব আর জীবনকে নিজের হাতে নেড়েচেড়ে দেখার ইচ্ছেটাকে মিঠুয়ার সখ করে বিয়ে করা আই.এ.এস বরের পাগলামি ছাড়া কিছু মনে না হওয়ার কারণে একসময় ওদের মিউচুয়াল ডিভোর্স হয়ে গেছিল । 

      সামন্ত মিঠুয়ার সব দায়িত্ব নিতে চেয়েছিল নিজে থেকেই। হয়ত সে বহুদিন ধরেই মিঠুয়াকে বিয়ে করতে চাইছিল, এমনি কিছু একটা হবে। সেই বিয়েটা কেমন ছিল? সেরকম কিছু ছিল না। একটা রেজিস্ট্রি মত হয়েছিল। একই জায়গায় কাজ করার সুবাদে ওদের কিছু বন্ধুবান্ধব ছিল। তারা কয়েকজন এসেছিল। সামন্তর কয়েকজন বাড়ির লোক আর মিঠুয়ার দাদা ও বৌদি। মিঠুয়ার খুব ঘুম পেয়েছিল। সে আধো ঘুমে আধো জাগরণে সইটা করে দেয়। কিছুদিনের মধ্যেই সামন্ত তাকে গুরুং গেস্টহাউসে দিয়ে যায়।

  আকাশটা এমনভাবে নেমে এসেছিল পাহাড়ের ওপর পুরো পাহাড়টাই মেঘেদের রাজত্বে চলে গেছিল। ঘন সাদা মেঘের আচ্ছাদনে নীচের গ্রামটা গায়েব হয়ে গেছিল। ভুলোমনা একভাবে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছিল। সে

ঘণ্টাধ্বনির উৎস খুঁজে বেড়াচ্ছিল। পাহাড়ের ওপর অবধি এসে সে দেখল, সেখান থেকে একটা রাস্তা শুরু হয়েছে। সে রাস্তায় উঠে দাঁড়াল। সেখান থেকে নীচের পাহাড়টা পুরোটাই মেঘের কবলে চলে গিয়েছিল।

সামনে ছিল আরও অসংখ্য পাহাড়ের সারি। ঘণ্টাধ্বনি পাহাড়দের মাথা ছুঁড়ে ছুঁয়ে দূর দূর ছড়িয়ে পড়ছিল। চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছিল। ভীষণ বিষন্নতায় ভরা মেঘলা ভারাক্রান্ত একটা সন্ধ্যে শুরু হতে যাচ্ছিল।

সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভুলোমনা কেবল ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পেল। যতদূর দেখা যায় দূর দূর পাড়ি দিচ্ছিল ঘণ্টাধ্বনি শুনতে শুনতে ভুলোমনার মনে হল, ঘণ্টাধ্বনি আর কোথাও নয়, যেন তার মাথার ভেতরই বাজছে। 

বেজে চলেছে ঢং ঢং ঢং ঢং। ভুলোমনা বিড়বিড় করতে লাগল, আই থিঙ্ক আই মেড ইউ আপ ইনসাইড মাই হেড। ক্রমে সন্ধ্যে নেমে এল। ঘোর অন্ধকারে কুয়াশা ঘেরা পাহাড়ে থমকে দাঁড়িয়ে ভুলোমনা কেবল ঘণ্টাধ্বনি শুনতে লাগল। তার মনে হচ্ছিল, তার শরীরটা মন্দির। ঘণ্টাধ্বনি তার ভেতরে। মুহুর্মূহু নাভীকুণ্ড উজাড় করে উত্থিত হচ্ছে অনাহত নাদ। সেই নাদ ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে বাতাসে, জলে ,অন্তরীক্ষে, মানুষ থেকে মানুষে আর মনুষ্যেতর প্রজাতিতে। এর যেন বিরাম নেই। বিরাম হীন প্রেমসর্বন্ব এক জগৎ, যেখানে প্রেম ছাড়া আর কিছুই নেই। তার মাথার ওপরে ছিল মহাকাশ। পায়ের নীচে ছিল সমগ্র পৃথিবী। নিকষ অন্ধকারে ভরা ছিল সে জগৎ। অন্ধকার মন্থন করলে একমাত্র প্রাপ্যস্বরূপ উঠে আসত প্রেম। আর বাকী সবকিছুই যা আসত তার আগে সেসবই ছিল ভীষণ তুচ্ছ। তুচ্ছতায় ভরা জগৎ , তুচ্ছতায় ভরা মহাবিশ্ব। নামেই শুনতে লাগে এত এত বিস্ফোরণ, ধামাকার মত। জগৎ যেন এক অতিকায় তিমি, বিশাল হাঁ-এর মধ্যে সব তুচ্ছতাকে গপাগপ গিলছে। সেই তুচ্ছতার মধ্যে রয়েছে এতদিনের যাবতীয় ছেলেখেলা,ছোটাছুটি, অহেতুক মান-অভিমান আর কাজের নামে জড়ো করে রাখা যত পন্ডশ্রম। সবকিছু দানছত্র করে দিল ভুলোমনা সেই আকাশের তলায় দাঁডিয়ে। পায়ের তলায় পৃথিবী রইল তার সাক্ষী।

    

    এমনিভাবে অনেকক্ষণ কেটেছিল নাকি অল্পক্ষণ, হঠাৎ ভুলোমনা শুনতে পেল গুরুং-এর গলার আওয়াজ।তার নাম ধরে ডাকছে। সঙ্গে দেবেন্দ্রর গলাও। ওদের হাতে টর্চ। ক্রমে টর্চ হাতে ওরা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে এল ভুলোমনার কাছে। বলল, বাড়ি চলো। বাড়ি? কার বাড়ি? কারা থাকে? তার কি কোন বাড়ি আছে? তার কি কোন বাড়ি ছিল কোনোদিন? তবুও কোন কথা না বলে ভুলোমনা নিঃশব্দে ফিরতে লাগল ওদের সঙ্গে।অনেক রাতে সে তার রুমের দরজায় টকটক আওয়াজ পেল। গুরুং। দরজা খুলতে গুরুং জানাল ঠাকুরজী মানে রিমপোচে তাকে ডাকছে। একটা শাল জড়িয়ে ভুলোমনা রিমপোচের ঘরে এল। রিমপোচের ঘরে শুধু একটা মোমবাতি জ্বলছিল টিমটিম করে। বাইরে ছিল গভীর রাত। চারদিকের পাহাড়ের মতই স্তব্ধ হয়ে থেমে ছিল সে রাত।

  ভুলোমনা দেখল রিমপোচের মুখে অদ্ভুত এক উজ্জ্বলতা। যেন তার চারপাশ দিয়ে আলো বেরোচ্ছে। ধীরে গিয়ে ভুলোমনা ফুঁ দিয়ে মোমবাতিটা নিভিয়ে দিল। চাঁদের আলোর মত হালকা সাদা আলোয় ঘর ভরে গেল। ভুলোমনা দেখল, রিমপোচে যেন আয়নার মত। রিমপোচের দিকে তাকালে সে নিজেকে দেখতে পাচ্ছে। আজ ভুলোমনার সমস্ত আমির সত্ত্বায় অদ্ভুত এক শান্ত শূন্যতা। রিমপোচের মধ্যেও তাই। ভুলোমনা রিমপোচেকে বলল,

আমার আর না..আজ সব মনে পড়ে গেছে।

  -তবে, আর কেন?

  রিমপোচে বলল।

  -আমি ওদের পাখির মত আকাশে উড়িয়ে দিয়েছি। মুক্ত করে দিয়েছি।

  -বেশ করেছো। ঠিক করেছো?

একটুখানি চুপ থেকে রিমপোচে বলল, তাইতো বলি, তবে আর কেন?

  -তুমি আমাকে কি করতে বলো?

  -সময় চলে যাচ্ছে। সময়কে চলে যেতে দিও না।

  -কি করব আমি?

  -ডাক শুনতে পাও না? আকাশে…বাতাসে, অন্তরীক্ষে সর্বত্র সেই চিরপ্রেমিকের ডাক। শুনতে পাও না?

  -শুনেছি। আমি সেই ডাক শুনতে পেয়েছি। আমাকে সে ডাকে।

 বলতে বলতে ভুলোমনা কাঁদতে লাগল, কেন কাঁদছে না জেনেই। সে নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করল, কেন কাঁদছি? উত্তর পেল না। শুধু শুধু তার ভেতরটা উথাল-পাথাল করতে লাগল। সে দেখতে পেল রিমপোচেরও গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। সে আরও কাঁদল। রিমপোচেও আরও কাঁদল। নিস্তব্ধ রাত আরও গভীর, গম্ভীর হয়ে এল। সে রিমপোচের মধ্যে সেই নিঃস্তব্ধ রাতের ছায়াও দেখতে পেল। নিঃস্তব্ধতার ছবিও দেখতে পেল তার মধ্যে। আশ্চর্য হয়ে সে রিমপোচেকে জিজ্ঞেস করল,

  -তুমি কে?

  -আমি কেউ না।

  -লোকে বলে তুমি বারবার জন্মাও। সত্যি?

  -সবাই বারবার জন্মায় তুমিও। তফাৎ হল এই যে আমি যে বারবার জন্মই সেটা আমি জানি। তোমারটা তুমি জানো না।

  -তোমার বয়স কত?

  -আমার বয়সের আদি অন্ত নেই। আমি তো মহাকাশ, আমিই মহাবিশ্ব। আমিই আলোকতরঙ্গ, অথবা  কসমিক স্রোত । আমি দূর থেকে ভেসে আসা ঘণ্টাধ্বনি। আমি কৃষ্ণের বাঁশির সুর এবং বুদ্ধের করুণা। আমি কেবল প্রবাহিত হই। শুধু জেনে রাখো আমি কর্তা নই।

  -তুমি আমার ঘণ্টাধ্বনির কথা কি করে জানলে?

  -রিমপোচে একটু মুচকি হাসল।

  -তোমাকে দেখে। তুমি নিজেই তো তোমার ঘণ্টাধ্বনি। ওই শব্দ অবিরাম তোমার মধ্যে থেকে উত্থিত হচ্ছে। শুনতে পাচ্ছো না? আবার আমিও তো তুমিই।

    ভুলোমনার মনে ঘরের দেওয়ালগুলো সরতে সরতে কোথায় ভ্যানিশ হয়ে গেল। এক নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে সে দাঁড়িয়ে একা। সে মুর্ছিত হয়ে পড়ে গেল।

   অনেকক্ষণ কেটেছিল নাকি অল্পক্ষণ কে জানে? একসময় সে চোখ খুলে দেখেছিল, রিমপোচের ফাঁকা ঘরে সে একা কার্পেটের ওপর পড়ে আছে। রিমপোচে নেই। তখনও রাত। সময়ের জ্ঞান নেই তার। সময় এগিয়ে

চলছিল না থেমে গেছিল, তাও জানত না সে। ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে রাত ঠেলে ঠেলে সে এগিয়ে গেল।

    ভুলোমনা একটা ছেঁড়া পাতায় লিখল, “তোমাদের দেখতে চাই না… তোমাদের দেখতে চাই মানে…ভেবো না, তোমাদের ভালবাসি না। আসলে যা যা করি, আমি ঠিক তার উল্টোটাই।’

    সামন্ত কে সঙ্গে নিয়ে গুরুং ভুলোমনার ঘরের দরজার লক যেদিন চাবি দিয়ে ঘুরিয়ে খোলে, তখন ভুলোমনার মোবাইল তারস্বরে বাজছিল। মনে হচ্ছিল, ফোনটা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে গলা ভেঙে ফেলেছে। সামন্ত মোবাইল তুলে দেখল, উনত্রিশটা মিসড কল ইন্দ্রনাথের। সামন্ত মুখ কুঁচকেছিল বোধহয়। বিছানার ওপর বাক্স উপুড় করে পড়েছিল ওষুধগুলো।

   ওরা একসাথে রিমপোচের ঘরে গেছিল। এটা জানাতে যে ভুলোমনা নামক যে মেয়েটি এখানে ছিল, তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। এখন কি করা উচিত। 

   ঘরে রিমপোচে ছিল না। গুরুং অনেক খোঁজাখুঁজি করেছিল। সামন্ত বাধ্য হয়ে ওখানে থেকে গেছিল আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে। তারা আবার রিমপোচের মতামত জানতে গেছিল। রিমপোচে ছিল না। তার ঘরে

পুলিশ অফিসারের দেওয়া দশ হাজার টাকা, বিভিন্ন মানুষের দেওয়া হাজার হাজার টাকা তার আসনের তলায় ছিল। তার থেকে অনেক টাকাই রিমপোচে দুহাতে গরিবদের দিয়েছিল। ঘরে তার জমা করা বোতলের ছিপি

সবই ছিল সেই বাটিতে। ছিল না শুধু রিমপোচের সঙ্গে করে নিয়ে আসা ঝোলাটা আর তার পাদুকা দুটো।

   ভুলোমনা হেঁটে চলেছিল পাহাড় থেকে পাহাড়ে। তার পিঠে ছিল ছোট একটা ব্যাগ আর তাতে সামান্য কিছু গরমজামা। পাহাড়ে কুয়াশা জমছিল। কুয়াশারা নেমে আসছিল ক্রমশঃ । ভুলোমনা শুধু আরও উঁচু পাহাড়ে আরও গভীর কুয়াশার রাজ্যে হেঁটে চলেছিল। সে ভুলোমনা নামটাকেও ফেলে এসেছিল। তার ছিল না আর কোন নাম। সে নামহীন হয়ে কেবল কুয়াশা থেকে গভীরতর কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছিল। কিছুই সে সঙ্গে আনেনি। স্থৃতিদের সে উড়িয়ে দিয়েছিল। 

কিন্তু তার অজান্তে খুব নিঃশব্দে তাকে অনুসরণ করেছিল একজন । সে চিকু, সামান্য একটি কুকুর মাত্র …. 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>