| 22 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
প্রবন্ধ সাহিত্য

প্রবন্ধ: মনই সমাজের মস্তিষ্ক । শর্মিষ্ঠা ঘোষ

আনুমানিক পঠনকাল: 11 মিনিট

ভূমিকা :

“মনেতেই বদ্ধ মনেতেই মুক্ত”

                                         ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

মন ব্যক্তি ও সমাজের পরিচালক বা নিয়ন্ত্রক। মনকে জয় করলেই জগৎকে জয় করা যায়। বৃহদারণ্যক উপনিষদে মনের প্রাধান্য ঘোষণা করে বলা হয়েছে, “মনো বৈ ব্রহ্মেতি অমনসো হি কি স্যাৎ”। অর্থাৎ মনই ব্রহ্ম; মন-হীনের কী সিদ্ধ হতে পারে? শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যা কিছুই আমরা এখন বাস্তবে দেখতে পাচ্ছি, এইরূপ যেকোন সৃষ্টিমূলক কাজের ধারণা প্রথম এসেছে মনে। মনের ধারণার বীজই পরবর্তীতে পত্র-পুষ্পে প্রস্ফুটিত হয়ে বাস্তব রূপ নিয়েছে। এই মন মানুষের জীবনকে আনন্দে ভরিয়ে তুলতে পারে, উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। আবার এই মনই মানুষকে নীচের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। একজন প্রতিভাবান ও একজন সাধারণ মানুষের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে প্রতিভাবান ব্যক্তি মনের শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজস্ব সৃজনশীল কাজে একাগ্রতার সঙ্গে মনোনিবেশ করে নতুন কিছু সৃষ্টি করে। আর সাধারণ মানুষ মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায়, মন বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ছুটে বেড়ায়; কোন নির্দিষ্ট কাজে মনোনিবেশ করতে পারে না। সভ্যতার উষালগ্ন থেকেই জ্ঞানীরা মনকে নিয়ন্ত্রণ ও মনের শক্তিকে সৃজনশীল কাজে লাগিয়ে এসেছেন। এই ফলশ্রুতিতে কেউ হয়েছেন সাহিত্যিক, আবিষ্কারক, বিজ্ঞানী, শিল্পি, সাধু, সন্ত প্রমুখ। আবার কেউ হয়েছেন মহাপুরুষ। মন নামক অন্তরিন্দ্রিয়টি সকল ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্ত্রক। আমাদের সচেতন মনের দুটি অংশ – চেতন ও অবচেতন। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “আমাদের চেতন মনের অতি সামান্য অংশই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতে বিচরণ করে এবং ঐ সামান্য ইন্দ্রিয়জ জ্ঞানকেই জীবন ও মনের সব কিছু বলিইয়া আমরা কল্পনা করি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের অবচেতন মনের বিশাল সমুদ্রে উহা একটি সামান্য বিন্দুমাত্র”।(স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, তৃতীয় খন্ড, ১৩৮০, উদ্বোধন কার্যালয়, পৃ ৩৯৭) বাহ্য-ইন্দ্রিয় ও বাহ্য-বিষয় এই চেতন মনের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার ফলে কামনা, বাসনা উদ্ভব হয়। এই কামনা, বাসনাই অবচেতন মনে উপাদান; যা অবচেতন স্তরে আরও শক্তিশালী হয় এবং নিজ উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। যা অদৃষ্ট বা Destiny রূপে আমাদের কাছে ফিরে আসে। তাই চেতন মনকে নিয়ন্ত্রিত করে সৎ উদ্দেশ্যে সৎ পথে পরিচালিত করতে হবে, তাহলেই অবচেতন মন সৃষ্টশীল, সদর্থক পরিবেশ সৃষ্টি করবে; তাতে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়েরই বিকাশ সাধিত হবে। চঞ্চল ও বিক্ষিপ্ত মন ব্যক্তি ও সমাজকে বিপথে নিয়ে যায়, মনুষ্য জীবনে এনে দেয় নিদারুণ অশান্তি, অতৃপ্তি এবং জীবনসংগ্রামের প্রতি পদে পরাজয়; এতে মনের শক্তির অবক্ষয় ও অপব্যবহার হয়। 

আমাদের স্থূল শরীরের অভ্যন্তরে যে সূক্ষ্ম শরীর আছে তাকেই মন বলে। এই মন প্রত্যক্ষযোগ্য নয়। চিন্তন, অনুভূতি এবং ইচ্ছা – এই তিনটি মানসিক ক্রিয়া দ্বারা মনকে উপলব্ধি করা যায়। প্রত্যক্ষযোগ্য না হওয়ার জন্যই মন সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান স্বল্প। মানুষ সর্বদা বাহ্য প্রত্যক্ষকৃত বিষয়ের প্রতি ধাবিত হচ্ছে, বিষয়-আশয়, অর্থ, খ্যাতি প্রমুখ। কিন্তু মননে মনীষা অর্থাৎ মনের জ্ঞান লাভ করার লিপ্ত কতজন! মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মনের জ্ঞান প্রয়োজন। বঙ্কিমচন্দ্র ‘আমার মন’ নামক প্রবন্ধে বলেছেন, “কি ইংরেজি, কি বাঙ্গালা, কি সম্বাদ-পত্র, সাময়িক পত্র, স্পীচ, ডিবেট, লেকচার, যাহা কিছু পড়ি বা শুনি, তাহাতে এই বাহ্য সম্পদ ভিন্ন আর কোন বিষয়ের কোন কথা দেখিতে পাই না। হর হর বম্‌ বম্‌! বাহ্য সম্পদের পূজা কর। হর হর বম্‌ বম্‌! টাকার রাশির উপর টাকা ঢাল! টাকা ভক্তি, টাকা মুক্তি, টাকা নতি, টাকা গতি! ………………টাকার ঝন্‌ঝনিতে ভারতবর্ষ পুরিয়া যাউক! মন! মন আবার কি”? (বঙ্কিম রচনাবলী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ ২১) একথা সত্য বাহ্য প্রত্যক্ষকৃত জগৎ নিয়ে সকলে ব্যস্ত। কিন্তু এই বাহ্য বিষয় কি আত্মবিকাশের সহায়ক হতে পারে? না, কখনই পারে না। বাহ্য-ইন্দ্রিয় মনকে বাসনার জালে আবদ্ধ করে কামনার পথে নিয়ে যায়। তাই আত্মবিকাশ ও আত্মোন্নতির জন্য প্রয়োজন মনের যথাযথ জ্ঞান, একাগ্রতা বৃদ্ধি, সর্বোপরি মনে সু-নিয়ন্ত্রণ। আর মনের নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন আধ্যাত্মিকতার পথ অবলম্বন করা।  

মানব জীবনের সুখদুঃখ, পাপপুণ্য, শুভাশুভ, ক্ষতিবৃদ্ধি এমন কি বন্ধন মোক্ষও মনোমূলক বলেই সেই প্রাচীনকাল থেকে মনের প্রাধান্য দেখতে পাওয়া যায়। মনের স্বরূপ, ধর্ম ও ব্যাপারসমূহ সম্বন্ধে অবগত হতে পারলে এবং তারপর যথাযোগ্য শিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের দ্বারা মনকে সুপথে চালিত করতে পারলে, মনই ব্যক্তি ও সমাজকে আলোকিত করে বিকাশ ও উন্নতির পথে নিয়ে যাবে। ঋগ্বেদ সংহিতায় মনকে জ্যোতিস্বরূপ বলা হয়েছে। ব্যক্তির সুনিয়ন্ত্রিত মনই সমাজে উন্নত, সুস্থ, প্রাণোচ্ছল, আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। তাই ব্যক্তি তথা সমাজের পরিচালক বা নিয়ন্ত্রক হল মন। তাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ  ঠাকুর যথাথই বলেছেন ‘মনই সমাজের মস্তিষ্ক’। বর্তমানদিনে ভাবান্দোলনের মূল কান্ডারী ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীমা, ও স্বামী বিবেকানন্দ মনের শক্তি ও প্রাধান্যকে স্বীকার করে নিয়ে মনের সুনিয়ন্ত্রণের মধ্যে দিয়ে সমাজের বিকাশের পথ দেখিয়েছেন। এই প্রবন্ধে বর্তমান সমাজের অবস্থার নিরীক্ষে মনের শক্তি ও তার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে দিয়ে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে কিভাবে সমাজকে বিকাশের পথ দেখানো যায় সেই বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। 

মনের স্বরূপ ও মনের শক্তি :

মনোবিদ্যার আলোচ্য বিষয় হল ‘মন’। তবে ‘মন’ দর্শনশাস্ত্রেরও একটি অন্যতম কেন্দ্রীয় ধারণা। মন বলতে সাধারণত বোঝায় যে, বুদ্ধি এবং বিবেকবোধের এক সমষ্টিগত রূপ যা চিন্তা, অনুভূতি, আবেগ, ইচ্ছা এবং কল্পনার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। মন কি, কিভাবে কাজ করে বা তার শক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন রকম তত্ত্ব প্রচলিত আছে। মনের একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া প্রায় অসম্ভব।  ন্যায়-বৈশেষিক মতে নবম দ্রব্য হল মন এবং এই মন নিত্য, অণু পরিমাণ সংখ্যায় বহু। এছাড়া ন্যায়-বৈশেষিক মতে মনের ক্রিয়া আছে, মন অত্যন্ত চঞ্চল, অত্যন্ত দ্রুতগামী দ্রব্য। মনের লক্ষণ দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, যে দ্রব্য স্পর্শ শূন্য কিন্তু ক্রিয়া বিশিষ্ট তাই মন। ন্যায়-বৈশেষিক স্বীকৃত দ্রব্যের মধ্যে পৃথিবী, জল, তেজ, বায়ু ও মন এই পাঁচটি দ্রব্যে ক্রিয়া আছে। তবে পৃথিবী, জল, তেজ ও বায়ুতে স্পর্শ আছে, কিন্তু মনে স্পর্শ নেই। তাই স্পর্শশূন্য ক্রিয়াবান দ্রব্যই মন। অন্তরিন্দ্রিয় মন প্রত্যক্ষগোচর নয়, অনুমানের দ্বারাই মনের অস্তিত্ব সিদ্ধ হয়। আত্মার গুণ সুখ, দুঃখ প্রত্যক্ষ করা হয় যে অন্তরিন্দ্রিয়ের মাধ্যমে, সেই অন্তরিন্দ্রিয়ই মন। তবে মন নামক ইন্দ্রিয়টি যে শুধুমাত্র সুখ, দুঃখ ইত্যাদি আন্তর বিষয়ের প্রত্যক্ষের জন্যই প্রয়োজন; তা নয়। মন ছাড়া বাহ্য-ইন্দ্রিয় দ্বারা বাহ্য বিষয়ের প্রত্যক্ষও সম্ভব নয়। শ্রীমা সারদা দেবীও বলেছেন, “বাবা, ক্রমে হাত মুখ সব বন্ধ হয়ে যাবে, কেবল মনে চলবে। মনই শেষে গুরু হবে”।(শ্রীশ্রীমায়ের কথা, পৃ ২৯০) প্রকৃতপক্ষে মন অন্য ইন্দ্রিয়াদির নিয়ন্ত্রক এবং নিজেরও নিয়ন্ত্রক। তাই মনকে সকল ইন্দ্রিয়ের প্রভু বলা যেতে পারে।

চরক সংহিতা শরীর স্থানে ‘মন’ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “জ্ঞানের অভাব ও ভাব(অস্তিত্ব) মনের লক্ষণ। কারণ আত্মা ইন্দ্রিয় ও ইন্দ্রিয়ের বিষয় ইহাদের সন্নিকর্ষ থাকিলেও, যদি তাহাতে মনের সংযোগ না থাকে, তবে সে বিষয়ের জ্ঞান জন্মে না, এবং তাহাতে মনের সংযোগ থাকিলে জ্ঞান জন্মিয়া থাকে। অণুত্ব(অতিসুক্ষ্মত্ব) ও একত্ব এই দুইটি মনের গুণ অর্থাৎ মন অণুপরিমিতি এবং এক। চিন্ত্য, বিচার্য্য, তর্ক্য, ধ্যেয়, সঙ্কল্প্য প্রভৃতি যেসকল বিষয় মনের জ্ঞেয়, তাহাদিগকে মনের অর্থ অর্থাৎ গ্রাহ্য বিষয় বলা যায়। ইন্দ্রিয়াভিগ্রহ ও ইন্দ্রিয়নিগ্রহ অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ার্থগ্রহণে প্রবৃত্তি বা নিবৃত্তি এই দুইটি মনের কর্ম্ম”। (চরকসংহিতা, শ্রীসতীশচন্দ্র শর্ম্মা, ১৩১১, পৃ ৪৮৩) 

আমাদের স্থূল শরীরের ভিতরে যে সূক্ষ্ম শরীর আছে তাকেই মন বলে। উপনিষদে জড় পদার্থের মনে পরিবর্তিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ছান্দোগ্যোপনিষদে ঋষি উদ্দালক তাঁর পুত্র শ্বেতকেতুকে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন যে, কিভাবে খাদ্য মনে পরিবর্তিত হয়। “হে সৌম্য, দধি যখন মথিত হয়, তখন তার যেটি সূক্ষ্মাংশ, তা উপরে উঠে এবং উহা ঘৃতে পরিণত হয়। ঠিক এইরূপেই ভক্ষ্যমান অন্নের যেটি সূক্ষ্মাংশ, তা উপরে উঠে এবং তা মনে পরিণত হয়। পীয়মান জলের যেটি সূক্ষ্মাংশ, তা উপরে উঠে এবং তা প্রাণ হয়। ভুজ্যমান তেজের যেটি সূক্ষ্মাংশ, তা উপরে উঠে এবং তা বাক্‌ হয়। অতএব, হে সৌম্য, মন অন্নময়, প্রাণ জলময়, বাক্‌ তেজোময়ী”(স্বামী গম্ভীরানন্দ, ছান্দোগ্যোপনিষদ ৬/৬/১-২, উদ্বোধন কার্যালয়, কলিকাতা )। 

ভারতীয় প্রাচীনশাস্ত্রানুযায়ী মনের তিনটি উপাদান হল সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ। “সত্ত্ব হলো ভারসাম্য বা স্থৈর্যের তত্ত্ব যা পবিত্রতা, জ্ঞান এবং আনন্দ সঞ্চারিত করে। রজঃ হলো গতির তত্ত্ব যার থেকে কর্মতৎপরতা, কাম এবং অস্থিরতার উৎপত্তি হয়। আর তমঃ জড়তার তত্ত্ব যা নিষ্ক্রিয়তা, অবসাদ আর ভ্রান্তির জন্ম দেয়। তমোগুণ মনকে নিচু স্তরে  ধরে রাখে। রজোগুণ মনকে নানা দিকে ছড়িয়ে দেয় আর চঞ্চল করে তোলে। সত্ত্বগুণ মহৎ উদ্দেশ্যের দিকে মনকে পরিচালিত করে। ……………… ব্যক্তি মনের গঠন এই গুলির নানা রকম সংযোগ বিয়োগ দ্বারাই নির্ধারিত হয়। এর ফলেই মানব চরিত্রে বৈচিত্র্য মানব মনের দোদুল্যমান অবস্থার প্রকাশ দেখা যায়”।(স্বামী বুধানন্দ, মন ও তার নিয়ন্ত্রণ, পৃ ১৩) 

Dr Joseph Marfi “The Power Of Your Subconscious” গ্রন্থে বলেছেন “আপনার মন আপনার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। এটি সবসময়ই আপনার সঙ্গে আছে তবে এর অত্যাশ্চর্য শক্তির অধিকারী তখনই হতে পারবেন যখন এটিকে ব্যবহার করতে শিখবেন। আমরা দেখেছি মনের দুটি লেভেল বা মাত্রা রয়েছে – একটি হল চেতন বা বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন লেভেল, অপরটি অবচেতন বা অবিচারবুদ্ধিসম্পন্ন লেভেল। আপনি আপনার চেতন মন নিয়ে চিন্তা করেন এবং আপনি যা ভাবতে অভ্যস্ত তা আপনার অবচেতন মনের কাছে পৌঁছে যায় এবং আপনার চিন্তার প্রকৃতি অনুযায়ী তা পরিবেশ তৈরি করে। এটি সৃষ্টিশীল মন। আপনি সুচিন্তা করলে ভালো কিছু আপনাকে অনুসরণ করবে; আপনি কুচিন্তা করলে খারাপ কিছু আপনার পিছু নেবে। এভাবেই আপনার মন কাজ করে”।(ডঃ জোসেফ মারফি, দ্য পাওয়ার অব ইউর সাবকনশাস মাইন্ড, অনুবাদক : অনীশ দাস অপু, ২০১৫, মুক্তদেশ প্রকাশন, ঢাকা ১১০০, পৃ ৪৪) স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “অসংযত ও উচ্ছৃঙ্খল মন আমাদিগকে নিয়ত নিম্ন হইতে নিম্নতর স্তরে লইয়া যাইবে এবং চরমে আমাদিগকে বিধ্বস্ত করিবে, ধ্বংস করিবে। আর সংযত ও সুনিয়ন্ত্রিত মন আমাদিগকে রক্ষা করিবে, মুক্তিদান করিবে”।(স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, তৃতীয় খন্ড, উদ্বোধন কার্যালয়, ১৯৭৫, পৃ ৩৯৯) 

মনের চেতন স্তর যা বাহ্য ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে যুক্ত; বাহ্য ইন্দ্রিয় কামনা বাসনা চেতন মন দ্বারা চালিত হয়। মন সংযত হলে কামনা বাসনা সংযত হয় এবং চেতন মনের সদর্থক চিন্তা-ভাবনা অবচেতন মনে পৌঁছায়; অবচেতন মন যেহেতু সৃষ্টিশীল মন সেহেতু সে ঐ সদর্থক চিন্তা-ভাবনা্র সুন্দর পরিবেশ তৈরী করে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেন, “মন সর্বব্যাপী। তোমার মন, আমার মন, ছোট ছোট এই সব মনই সেই এক বিরাট মনের ক্ষুদ্র অংশ মাত্র, একই মানস সমুদ্রের কয়েকটি ছোট ছোট তরঙ্গ”।(স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, তৃতীয় খন্ড, উদ্বোধন কার্যালয়, পৃ ৪০৬) তাই মনের সর্দথক চিন্তা-ভাবনা, সৎ কর্ম শুধু ব্যক্তি মানুষকেই প্রভাবিত করে না, সমাজ কেও প্রভাবিত করে। মনের এত শক্তি যা আমাদের বেশীরভাগ মানুষের কাছে অজ্ঞাত। মনের এই ক্ষমতা ও শক্তির জন্যই স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “আমরা সকলেই নিজেদের মনের ক্রীতদাস এবং অপরের মনেরও”।(বাণী ও রচনা, পৃ ৩৯৮) 

বর্তমান সমাজে মনের প্রভাব :

বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে শিক্ষা, রাজনীতি, সমাজনীতি, বিচারব্যবস্থা প্রমুখ ক্ষেত্রে নৈতিকতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটতে। এই নৈতিকতা বা মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণ মননশীলতার অভাব। বর্তমান দিনে যেকোন কার্যের ক্ষেত্রে মননশীলতা, একনিষ্ঠভাবে মনসংযোগ কমে যাচ্ছে, এর ফলে শুধু ব্যক্তি নয়, সমাজও বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্থ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন “মনই সমাজের মস্তিষ্ক”। মানব দেহকে চালনা করে মস্তিষ্ক। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধে বলেছেন “গুরুতর রোগে যখন রোগীর মস্তিষ্ক বিকল হয় তখনি ডাক্তার ভয় পায়। তাহার কারণ, শরীরের মধ্যে রোগের আক্রমণ প্রতিরোধের যে ব্যবস্থা তাহা মস্তিষ্কই করিয়া থাকে, সে যখন অভিভূত হইয়া পড়ে তখন বৈদ্যের ঔষধ তাহার সর্বপ্রধান সহায় হইতে বঞ্চিত হয়”(স্বদেশী সমাজ, পৃ ৩৯)। রবীন্দ্রনাথ এখানে মস্তিষ্কের সঙ্গে মনকে আর দেহের সঙ্গে সমাজের তুলনা করেছেন। মস্তিষ্ক যেমন দেহের চালক, তেমননি মন সমাজের চালক। 

মনের সদর্থক শক্তি সদর্থক চিন্তাভাবনার, সদাচারের জনক হয়; তা সমাজের উন্নতির সহায়ক হয়, তেমনি মনের নঞর্থক শক্তি এর বিপরীত কার্য ঘটায়। তড়িৎ সম্বন্ধে আধুনিক মত এই যে, ঐ শক্তি বিদ্যুৎদাধার যন্ত্র(Dynamo) থেকে উৎপন্ন হয়ে আবার সেই যন্ত্রে প্রত্যাবৃত্ত হয়, ঘৃণা ভালোবাসা মনের এই গুণগুলিও ঠিক সেইরূপ। যে মন সমুদয় গুণগুলির উৎসস্থল সেখানেই আবার ফিরে আসে। এপ্রসঙ্গে স্বামীজি বলেছেন, “অতএব কাহাকেও ঘৃণা করিও না, কারণ যে ঘৃণা তোমা হইতে বহির্গত হয়, তাহা কালে তোমারই নিকট ফিরিয়া আসিবে। যদি তুমি ভালোবাসা, তবে এই ভালোবাসাও তোমার নিকট ফিরে আসিবে। ইহা অতি নিশ্চিত যে, মানুষের অন্তঃকরণ হইতে যে ঘৃণা বহির্গত হয়, তাহার অণুপরমাণু ফিরিয়া আসিয়া আসিয়া তাহার উপর পূর্ণ বিক্রমে প্রভাব বিস্তার করিবে। কেহই ইহার গতি রোধ করিতে পারে না। একইভাবে ভালোবাসার প্রতিটি স্পন্দনও ফিরিয়া আসিবে”(বাণী ও রচনা, প্রথম খন্ড, পৃ ২২৭)। অর্থাৎ ঘৃণা, হিংসা মনে উৎপন্ন হলে তা শুধু পরম বিক্রমে নিজের কাছেই ফিরে আসে এমন নয়, তা সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে নঞর্থক শক্তি উদ্বোধক হয়। অন্য দিকে ভালোবাসা, স্নেহ, মায়া-মমতা, শ্রদ্ধা কে মনে স্থান দিলে, সমাজে বিতরণ করলে সদর্থক শক্তি বিস্তার লাভ করবে। তাই মন-ই সমাজের মস্তিষ্ক বা চালক। 

মানুষ বাহ্যজগত অর্থাৎ প্রত্যক্ষকৃত জগতকেই বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় মন আর মুখ এক নয়। অর্থাৎ মুখ থেকে নির্গত কথা গুলো মনের কথা নয়, তাই কথা কতগুলো কেবল কিছু শব্দ সমষ্টিতে পরিণত হয়েছে। কথা যখন মন থেকে নির্গত হয় তখন তাতে মনের শক্তি নিহিত থাকে। যেমন জলে চিনি মিশালে জল মিষ্টি হয়, খেয়ে সেই মিষ্টত্ব অনুভব করে থাকি; আবার জলে চিরতা মেশালে জল তিতকুটে হয়, খেয়ে সেই তিতকুটে ভাব অনুভব করে থাকি। শব্দও তাই; শব্দের সঙ্গে যখন মনের সদর্থক গুণ ভালোবাসা, মায়া-মমতা, শ্রদ্ধা মিশে থাকে, সেই শব্দ শ্রবণ করলে আনন্দ অনুভূত হয়; আবার শব্দের সঙ্গে যখন নঞর্থক গুণ ঘৃণা, হিংসা প্রমুখ মিশে থাকে, সেই শব্দ শুনলে খারাপ অনুভূত হয়। এই বিষয়ে স্বামী বিবেকানন্দ দেওয়া একটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা যেতে পারে, “কেহ হয়তো আসিলেন, যাঁহাকে তুমি সুপন্ডিত বলিয়া জান এবং যাঁহার ভাষা মনোরম; ঘন্টাখানেক ধরিয়া তিনি তোমার সঙ্গে কথা বলিলেন। কিন্তু তিনি তোমার মনে রেখাপাত করিতে পারিলেন না। আর একজন আসিয়া কয়েকটি মাত্র কথা বলিলেন, তাও সুসংবদ্ধ ভাষায় নয়, হয়তো বা ব্যাকরণের ভুলও রহিয়াছে; কিন্তু তাহা সত্ত্বেও তিনি তোমার মনের উপর গভীর রেখাপাত করিলেন। তোমরা অনেকেই ইহা লক্ষ্য করিয়াছ। কাজেই বেশ বোঝা যাইতেছে যে, শুধু কথা সব সময় মনে দাগ কাটিতে পারে না”। সমস্যা হচ্ছে কথাগুলো যখন মন থেকে বলা হয় না, তখন মনের সদর্থক বা নঞর্থক কোন শক্তিই যুক্ত হয় না। নিছক বাহ্যিক পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করে তাৎক্ষণিক রূপে কোন স্বার্থ বা উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে, অন্তরের সঙ্গে তার কোন লেনদেন হয় না, তাই তা মনের গভীরে পৌঁছাতে পারে না, মনে দাগ কাটতে পারেনা। শিক্ষা, রাজনীতি প্রমুখ ক্ষেত্রে তাই আজ খুব কম মানুষ আদর্শ হয়ে উঠতে পারে।  

বর্তমান দিনে খুব সহজেই সম্পর্কগুলো ভেঙে যেতে দেখা যায়। এর মূল কারণ সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা সর্বোপরি মনের আন্তরিকতা বিলুপ্ত হচ্ছে। আজকাল চারিদিকে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ, সব সময় এই সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে ব্যস্ত সকলে, ফোন ভর্তি বন্ধু-বান্ধব, তবে কতজনের সঙ্গে সম্পর্কটি সত্যিকারের আন্তরিক? কতজনের সঙ্গে মনের কথা প্রকাশ করতে পারি? অনেক সময় এত লোকের মধ্যে একজনকেও পাওয়া যায় না, যাকে ভরসা করে মনের কথাগুলো বলা যায়। তাই তো ভীড়ের মধ্যে আজ মানুষ বড় একা। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মানুষ আরও বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে, হতাশা গ্রাস করছে, ঐ যে ‘ভীড়ের মধ্যে একা’ হয়ে জীবন অতিবাহিত হচ্ছে। মূল কথা স্বচ্ছরূপে মনের যে আদান প্রদান সেটা হচ্ছে না। এখানেও সেই মননশীলতার অভাব। নিজের মনকয়ে জানতে না পারলে, নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে, অপরের মনকে কিভাবে জানবে!! এখন দায়হীন ভালোবাসার কথা শোনা যায়, ভালোবাসাও নাকি প্রয়োজনে হয়! সেখানে কোন দায়িত্ব বা কর্তব্য থাকে না। সত্যি কি সম্ভব শ্রদ্ধাহীন ভালোবাসা বা দায়িত্বহীন ভালোবাসা! মনের এই ধর্মগুলি একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাই মনের এই ধর্মগুলিকে নিয়ে যখন কেউ অঙ্কের হিসাব কষতে যায় তখন হয়তো স্বচ্ছরূপে কোন ধর্মই মনে অবশিষ্ট থাকে না। এই কারণেই আজ পিতা-মাতা সঙ্গে সন্তান, স্বামী স্ত্রীর মধ্যের সম্পর্ক, বন্ধুদের সম্পর্কের মধ্য এত দূরত্ব। আসলে বর্তমান দিনে সবই দেখনদারীর জন্য, যা প্রত্যক্ষ করি তারই অস্তিত্ব আছে; যা প্রত্যক্ষে পাওয়া যায় না তার অস্তিত্ব যেন আমরা স্বীকার করতে চাই না। মন ও তার ধর্ম যেমন, ভালোবাসা থেকে বিশ্বাসযোগ্যতা সবই দেখাতে চায় মানুষ আজ; মন ও মনের ধর্মগুলি বাহ্য ইন্দ্রিয়ের দ্বারা প্রত্যক্ষ করা সম্ভব নয়। আবার মন নামক ইন্দ্রিয়ের বিষয়গুলিকে, চক্ষু নামক ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রত্যক্ষ করতে চাইলে সমস্যা দেখা দেয় এবং তাই দিচ্ছে। মনের যে অসীম শক্তি তা ব্যবহার করা হচ্ছে না, যেকোন কাজে মনের একাগ্রতা চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে আমাদের অবচেতন মন ২৪ ঘন্টাই কাজ করে চলেছে, তাই সচেতন মন যখন মনোযোগ বা একাগ্র চিত্তে কোন কাজ করছে না, অর্থাৎ সচেতন মন অবচেতন মনকে সদর্থক পথে চালিত করছে না, তখন অবচেতন মন কোন নঞর্থক কাজে লিপ্ত হচ্ছে, যেমন কারো ক্ষতি করা, সমালোচনা করা প্রমুখ নঞর্থক কাজ। এইভাবে বর্তমান দিনে মনের শক্তি ব্যক্তি তথা সমাজের উন্নতির কাজে যথাযথরূপে ব্যবহার করা হচ্ছে না বলেই বর্তমান সমাজের এই চিত্র দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।  

প্রাণীকুলের সর্বশ্রেষ্ঠ জীব রূপে পরিচিত মনুষত্ববিশিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন মানুষ এবং এই মানুষ নিজেকে অন্যন্য প্রানী থেকে পৃথক করতে পারে আবেগ, অনুভূতিপ্রবণতা, সহানুভূতিশীলতা প্রমুখ মনের এই সকল ধর্ম দ্বারা। আজ যদি মানুষের সেই সকল ধর্মের বিনাশ হয় তাহলে মানুষকে আর ‘মানুষ’ শব্দের দ্বারা কি আর চিহ্নিত করা যাবে? শিক্ষা, রাজনীতি – সকল ক্ষেত্রেই আজ মননশীলতা, একাগ্রতা, ভালোবাসার অভাব দেখা দিচ্ছে। মানুষ অন্য কোন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য শিক্ষা বা রাজনীতি প্রাঙ্গণে অবতীর্ণ হচ্ছে। যেমন চাকরীর জন্য শিক্ষা, নিজেকে সমৃদ্ধ করা বা বুদ্ধিবৃত্তি বিকাশের জন্য শিক্ষা গ্রহণ আজ আর কেউ করে না। নম্বর বা চাকরীর উদ্দেশ্যেই শিক্ষা গ্রহণ, ফলত চাকরী পাওয়ার পর আর শিক্ষার কোন প্রয়োজন রইলো না। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, “পশুস্তর হইতে যতই আমরা উপরে উঠিতে থাকি, আমাদের ইন্দ্রিয়সুখ-বাসনা ততই হ্রাস পাইতে থাকে এবং বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক বোধের সহিত আমাদের ভোগাঙ্ক্ষা সূক্ষ্মতর হইতে থাকে এবং ‘জ্ঞানের জন্যই জ্ঞানের অনুশীলন’-এই ভাবটি ইন্দ্রিয়সুখ নিরপেক্ষ হইয়া মনের পরম আনন্দের বিষয় হইয়া উঠে”।(বাণী ও রচনা, পৃ ৩৯৭) ‘জ্ঞানের জন্য জ্ঞান’, ‘আদর্শের জন্য রাজনীতি’ এসব আজ অনেকাংশে কথার কথায় পর্যবসিত হয়েছে। তাই ইন্দ্রিয়সুখ নিরপেক্ষ মনের পরম আনন্দ ভোগ বিরল হয়ে পড়েছে। 

মনের নিয়ন্ত্রণ :

বর্তমান দিনের সমাজের যে চিত্র পাওয়া যায় তা সম্পূর্ণ পরিবর্তন সম্ভব হবে যদি ব্যক্তি নিজ নিজ মনকে সংযত ও নিয়ন্তিত করতে পারে। চেতন মন যখন সৃষ্টশীল অবচেতন মনকে সদর্থক, গঠনমূলক কাজে নিযুক্ত করতে পারে। আর এই কাজ সহজতর হতে পারে আধ্যত্মিকতার পথ ধরে। আধ্যাত্মিকতা ভারতের প্রাণস্বরূপ; ত্যাগ, সেবা, প্রেম, ক্ষমা, সত্য, ও সংযমের নিরলস চর্চা ভারতের মৌলিক আদর্শ। ভারতীয় ধর্ম শুধু আধ্যাত্মিক সত্তাকেই জাগ্রত করে না, মানুষের অন্তরের দেবত্বকে জাগ্রত করে ব্যক্তিকে তার নিজ স্বরূপ সম্পর্কে জাগ্রত করে। ভেতরের সেই দেবত্ব শক্তি, মনের শক্তি যা আমাদের এগিয়ে চলার পাথেয়, সেই দেবত্ব শক্তি বা মনের শক্তি কোথাও যেন আজ অবলুপ্ত, সেই শক্তির উন্মোচন দরকার। স্বামী গম্ভীরানন্দকেও এই একই কথা বলতে দেখা যায়, “আধুনিক এই মনোরাজ্যের সংগ্রাম পৌরাণিক দেবদানবের যুদ্ধ অপেক্ষাও ঘোরতর। অতীতের সংঘর্ষ সাধারণতঃ স্থূল জগতের গন্ডি অতিক্রম করিত না, কিন্তু আধুনিক দ্বন্দ্ব অন্তর্জগতে উদ্ভূত ও দৈনন্দিন জীবনে প্রসারিত হইয়া মানবের মনুষ্যত্বের মূলে কুঠারাঘাত করিতে উদ্যত হইয়াছে। সুতরাং বর্তমানে শক্তির ক্রিয়া এবং অসুরসংহার প্রধানতঃ মানসিক ক্ষেত্রে হওয়া আবশ্যক। আধুনিক জগতে সর্বাধিক প্রয়োজন নৈতিক উন্নতি এবং আধ্যত্মিক অনুভূতির। অন্তরে একবার ভক্তি, বিশ্বাস ও পবিত্রতা পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হইলে বাহিরের অবস্থা স্বতই তদনুযায়ী পরিবর্তিত হবে”।একথা একদম সত্য যে, বর্তমান দিনের যুদ্ধ স্থূল বাহ্য জগতের নয়, মন জগতের। মনকে নিয়ন্ত্রণ করে মনের মধ্যে যে অসুর অর্থাৎ দুষ্ট চিন্তা-ভাবনার সংহার প্রয়োজন। 

মনের স্বভাব চঞ্চল। এই সদাচঞ্চল মনকে স্থির করা, নিয়ন্ত্রণ করা সহজসাধ্য নয়। প্রাচীনশাস্ত্র শ্রীমদ্ভগবদগীতার ষষ্ঠ অধ্যায়ে বলা হয়েছে – 

চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবদ্দঢ়ম্‌।

তস্যাহং নিগ্রহং মন্যে বায়োরির সুদুষ্করম।।৩৪।।

এর অর্থ “হে কৃষ্ণ, যেহেতু মন স্বভাবত চঞ্চল ও প্রমাথি অর্থাৎ ইন্দ্রিয়গণের ক্ষোভকারক এবং প্রবল ও দৃঢ়, তাই আমি বায়ুর নিরোধের মতো তার (অর্থাৎ ঐ মনের) নিরোধও দুঃসাধ্যজ্ঞান করি”।(শ্রীমদ্ভগবদগীতা, স্বামী অপূর্বানন্দ অনূদিত ও সম্পাদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, ২০১৩, পৃ ১৫৭) অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বলেন, বায়ুকে রুদ্ধ করার মতোই মনকে নিরুদ্ধ করাও দুঃসাধ্য। শ্রীকৃষ্ণ এর উত্তরে বললেন –

“অসংশয়ং মহাবাহো মনো দুর্নিগ্রহং চলম্‌।

অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেণ চ গৃহ্যতে।।৩৫।।

এর অর্থ “হে মহাবাহো, সদাঞ্চল মনকে নিরোধ করা যে দুঃসাধ্য তাতে সংশয়ের লেশমাত্র নেই; কিন্তু হে কৌন্তেয়, অভ্যাস ও বৈরাগ্য দ্বারা তা নিগৃহীত হয়”। (শ্রীমদ্ভগবদগীতা, স্বামী অপূর্বানন্দ অনূদিত ও সম্পাদিত, উদ্বোধন কার্যালয়, ২০১৩, পৃ ১৫৯) অর্থাৎ সদাচঞ্চল মনকে নিরোধ করা দুঃসাধ্য হলেও, অভ্যাস ও বৈরাগ্য দ্বারা তা নিরোধ করা সম্ভব। 

মনকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলেও সম্ভব, একথা প্রাচীন কাল থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত সকল মুনি ঋষিরা বলে এসেছেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন মনকে যেভাবে চালাবে সেভাবে চলবে, অর্থাৎ মনকে নিয়ন্ত্রিত করে সৎ পথে চালাতে চাইলে তা চালনা করা সম্ভব। তিনি বলেছেন “যোগ অভ্যাস কর। দেখবে মনকে যেদিকে নিয়ে যাবে সেই দিকেই যাবে। মন ধোপা ঘরের কাপড়। লালে ছোপাও লাল, নীলে ছোপাও নীল। যে রঙে ছোপাবে সেই রঙ হয়ে যাবে”(শ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত)। মনের উপরই সব নির্ভর করে, মন শুদ্ধ হলেই জগৎসংসার শুদ্ধ হয়ে যায়।  শ্রীমা বলেছেন। “যার শুদ্ধ মন, সে সব শুদ্ধ দেখে”। আমরা নিজেরাও দেখে থাকি মন ভালো তো শরীরও ভালো থাকে। মনের উপরই এই শরীর তথা প্রত্যক্ষকৃত জগতের সব কিছুর ভালো থাকা নির্ভরশীল। শ্রীমা এপ্রসঙ্গে আরও বলেছেন, “ভগবান লাভ হলে কি আর হয়? দুটো কি শিং বেরোয়? না, মন শুদ্ধ হয়। শুদ্ধ মনে জ্ঞানচৈতন্য লাভ হয়”। 

উপসংহার :

সমাজের শুদ্ধতার জন্য আজ মনের চর্চা, মননশীলতা বা মননের মনীষার খুবই প্রয়োজন। মনের সদর্থক শক্তি বৃদ্ধি সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। সদর্থক চিন্তাভাবনা, একাগ্রতা, নিষ্ঠা, ভালোবাসা, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা – মনের এই ধর্মগুলোকে বিকশিত করতে হবে এবং বুঝতে হবে এই ধর্মগুলোকে বাহ্য-ইন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধি করা সম্ভব নয়; তাই মন দিয়ে অনুভব করতে হবে এবং সেক্ষেত্রেই মননে মনীষা সম্বন্ধে যথাযথ অবগত হওয়া সম্ভব হবে।

তবে মনকে নিয়ন্ত্রণ করা, ধ্যান, অভ্যাস, বৈরাগ্য সাধারণ মানুষের পক্ষে হঠাৎ করে করা সম্ভব নয়। তবে সৎ চিন্তা, সৎ কার্য, সদর্থক কথাবার্তা, উপকার না করতে পারলেও অন্য মানুষের খারাপ না করা – এই সামান্য বিষয়গুলো অল্প অল্প করে অভ্যাস করা যেতেই পারে, যা মনকে পবিত্র করে। ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস, ভক্তি, ভালোবাসা মনের কলুষতা দূর করতে সাহায্য করে, মনকে পবিত্র করে। তাই আশা করা যায় আধ্যত্মিকতার পথ ধরে মনের শুদ্ধতাকে অবলম্বন করে একদিন ভারতীয় সমাজের কলুষতা দূর করে শুদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। তাই বলাই যায় মনই মস্তিষ্ক এই সমাজের।      

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত