মন্দিরা

পুনর্পাঠ গল্প: তিস্তা টাইগার । শক্তি চট্টোপাধ্যায়

Reading Time: 6 minutes

সন্ধে থেকেই আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছিলো। বৈশাখের প্রথম দিকটা এমনই হয়। দুপুরে রোদের তেজ তেমন ছিলো না—অসহ্য গুমোটে ভাব ছিলো।

মন্দিরার স্কুল ছুটি হলেও কমিটি মিটিংয়ে আটকে গিয়েছিলো সন্ধে পর্যন্ত। মিটিংয়ের কথাবার্তার একবর্ণও তার কানে ঢোকেনি। জানলা দিয়ে আড়চোখে বাইরের আকাশ কেবল দেখেছে আর ভেবেছে বাড়ি ফেরার দফা গয়া আজ। এখনো পুরোদমে সভা চলছে। সভা না ছাই। মাস্টারনী জ্বালানো সভা। কর্মকর্তাদের অধিকাংশই স্থানীয় লোক-মন্দিরা আসে জলপাইগুড়ি থেকে—অতসী আসে বুঝি বীরপাড়া থেকে। দুজনেই সোমবার সকালে আসে, যায় শনিবার। বাকি সবাই হস্টেলে থাকে। নলিনী দিদিমণির বাড়ি তো এখানেই। ওঁর স্বামী ময়নাগুড়ির ধনী ব্যবসায়ীদের একজন। এঁদের আর কি, চলুক না মিটিং দুপুর রাত পর্যন্ত। মিটিংটা অবশ্য খুবই জরুরি—মাইনে বাড়ানোর জন্যে জবরদস্ত ধর্মঘট। শুধু ময়নাগুড়িতেই নয়। উত্তর বাংলার স্কুলগুলোতেই নয় কেবল, সারা পশ্চিমবঙ্গে।।

মন্দিরার যেটা খারাপ লাগছে, তা হলো ধর্মঘট হবে তো হবে, তার আবার এতো ছোটবড়ো বক্তৃতার আছে কি? কেউ তো আর ছেলেমানুষ নয়! সকলেই একমত—মাইনে কম বেঁচে থাকার পক্ষে, ভালো থাকার পক্ষে এ কিছুই নয়—আন্দোলন করো যাতে মাইনে বাড়ে। অন্য খাত থেকে এখাতে ঢালল। কেননা এখাতের সুস্থতার উপর দেশের সর্বাঙ্গীণ সুস্থতা ভর করে আছে। মন্দিরা অতোশতো বক্তৃতার ধার ধারে না। যেকথা বোঝার সেকথা সোজা ভাবেই বুঝতে চায়।

ময়নাগুড়ি থেকে বাসে যখন বার্নেশ ঘাটে পৌঁছুলো মন্দিরা—তখন ভাবলো তার আসাটাই ভুল হয়েছে। চারদিকে কুপকুপ করছে অন্ধকার। আকাশে মেঘের দরুন একফোঁটা আলো নেই। তারাগুলো লুকিয়ে গেছে। বার্নেশের দোকানপাট কখন থেকে বন্ধ। ঝড়ের পূর্বাভাষ। থেকে থেকে বুড়ি তিস্তা হুংকার দিয়ে উঠছে। মন্দিরা বালুতে পা টিপে টিপে নদীর ধারে পৌঁছলো। আকাশের কোণে চিকুর দিয়ে উঠলো হঠাৎ। মন্দিরা দিশাহারা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। পিছন ফিরে দেখলো বাসে তার সঙ্গে জনদুই ব্যাপারী শ্রেণীর লোক নেমেছিলো তারা গেলো কোথায়? এই ভয়ঙ্কর রাতে মানুষের সঙ্গের জন্য মন্দিরা আকুল হয়ে পড়লো। মনে হলো তার পায়ের তলা থেকে ভিজে বালু ক্রমশই সরে যাচ্ছে। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তিস্তার ঘােরালো জলধারার দিকে। অস্ফুট কানে আসছে মানুষের কথা।

মন্দিরা যেন সম্বিৎ হারিয়ে ফেলেছিলো কয়েক মুহূর্তের জন্য।

ওপারে যাবেন তো?

হ্যাঁ। আপনারা? মন্দিরা শুধোয় ভয়ে ভয়ে।

তাই তো মাঝি ডেকে আনলুম। এই রেতের বেলা আপনি যাবেন কোথা?

উকিলপাড়া যাবো। লোকজনের কথায় তার সাহস ফিরে এসেছে এতক্ষণে—তাই শুধায়, ঝড় উঠবে না তো মাঝি মাঝনদীতে?

সে বুড়ি জানে হামকো কেয়া মালুম।

লোক-দুজনকে বলে রাতমে ফেরী বিলকুল বন্ধ হ্যায়। এক রুপিয়া লাগেগা, তিনো আদমী কোনেই তো নেহি হোগা সিধা বাৎ।

ওদের হয়ে মন্দিরাই কথা বলে—আচ্ছা আচ্ছা এক রুপিয়াই দেবো—ঠিকসে পার করে দাওঝড় না হয় মাঝপথে।

হ্যাঁ, ঝড় তো হোবেই—ভোজপুরী মাঝি নিশ্চিন্তে এইসব বিপজ্জনক কথা বলে চলে। মন্দিরা আরো গুটিয়ে আসে।

মাঝি লগি ঠেলে পার ছেড়ে আসে। তিস্তা আছড়ে পড়ে অন্ধকার নৌকার চতুর্দিকে— দুলে ওঠে নৌকা মাঝি চিৎকার করে ওঠে—হিলাইয়ে মৎ, ঠিকসে বইঠ রহিয়ে—পাঁচ মিল্টমে পৌঁছায় দেগা-বুঢ়ী মাইকো পূজা দেনে হোগা দো-দো পইসা।

মন্দিরা ভাবে পার পর্যন্ত পৌঁছলে তবেই পয়সা। তার মনে হয় এই অন্ধকার রাতে তিস্তার ঝড়ে-বাতাসে মেতে-ওঠা কোল ছেড়ে ওপারে চরে গিয়ে পৌঁছুনো কিছুতেই সম্ভব নয়। মন্দিরা সব আশা ত্যাগ করে জবুথবু হয়ে বসেছিলো। প্রকৃতপক্ষে তার কোনো বাহ্যজ্ঞান ছিলো। কত সময় কেটেছে ঠিক মনে নেই তার—যেন দুঃস্বপ্নের পর জেগে উঠে দেখলো সে চরের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। কখন থেকে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে এমনভাবে? মাঝি আর লোকজন তার দিকে ভয়ে-বিস্ময়ে তাকিয়ে রয়েছে। মন্দিরা হঠাই সচেতন হয়ে পড়ে। সচেতন হয়ে শুধোয় মাঝিকে, কতো দেবো?


আরো পড়ুন: গল্প: ভস্মশেষ । প্রেমেন্দ্র মিত্র


খুসিসে দে মাইজী। মন্দিরা টাকা বের করে—শুধোয়, এই দেড় মাইল চর ভেঙ্গে যাবো কী করে? মাঝি তোমার আলো আছে?

আলো কঁহা মিলবে মাইজীবলে এদিক-ওদিক তাকায়। হঠাৎ নজর পড়ে চর ভেদ করে বাঘের জ্বলন্ত দুটো চোখ এদিকে দৌড়ে আসছে—তুর বরাত আচ্ছা চাইজী—মোটার আসে।

সত্যিই চোখ মেলে দেখলো মন্দিরা চরের আঁধার থেকে ভেসে আসছে চোখজুলা চরের গাড়ি তিস্তা টাইগার।

মন্দিরা চিৎকার করে বলে মাঝি তই দাঁড়া। দেখে যা বার্নেশের লোক আছে গাড়িতে মন্দিরা এই আঁধারকে আঁধার নয় মনে করে ঐ দুটো প্রোজ্জ্বল চোখের প্রতীক্ষা করতে থাকলো। পিছনে মাঝি হারিয়ে গেলো কোথায়—ওপারের সঙ্গী দুজন ব্যাপারী সামনের আঁধারে গেলো মিশে। মন্দিরা দাঁড়িয়ে রইলো একা। আলো যখন দেখেছে, তখন আর ভয় নেই তার। সে, পিছনে বুড়ি তিস্তা, সামনে অনন্ত চরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইলো নির্ভয়ে, একা।

তুষার রেইঞ্জ ছাড়াও জলপাইগুড়ি আর ডুয়ার্সের জঙ্গলমহালের কাঠ তিস্তায় ভেসে আসে। ঠিক বর্ষার আগের মুহুর্তে কাঠ কেটে মার্কা মেরে তিস্তায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়। অনেক সময় সেই মজুরী আর সেই পরিশ্রম বাদ দিয়ে জঙ্গলের ভেতরেই রাখা হয় ফেলে, তিস্তা নিজেই ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সুযােগ-সুবিধা আর অবস্থা অনুযায়ী এই সব বিবেচনা আর কাজ কর্ম করা হয়ে থাকে। কাঠের গুড়ি-বোল্ডারে ক্রুদ্ধ তিস্তায় তখন নৌকা নামে না। নৌকা নামানো ভীষণ বিপজ্জনক। জলপাইগুড়ি শহরেও একবুক জল জমে যায়। কেঁদো গুঁড়ি পাকিয়ে আসে পাহাড়ি সাপ। বাঘ গুড়ির মাথায় বসে আসে রাজার হালে। প্রতি বছরই চরে বাঘ আসে। গরুটা ভেড়াটার ওপরই লোভ তাদের—মানুষকে ভয়। কেন না মানুষ রি-অ্যাকট করে, গরু-ভেড়া করে না। এখন যে এই বিপুল চর জেগে আছে চৌদিকে তখন তার চিহ্ন মাত্র থাকে না—হুংকার করে জল, শুধু জল। সাময়িক গোলপাতার ঘর-বাড়ি যায় ভেসে, পাট ক্ষেতের উপর বেনোজল খেলা করে, বাঁধ উজিয়ে জল ঢুকে পড়ে শহরে। ফোর্ড সায়েবের নিজের হাতের তৈরি চরের গাছগুলো কোথায় অদৃশ্য হয়ে যায়। জল শুকোলে আবার ভেসে ওঠে হঠাৎ একদিন। তাদের অন্যত্র সরিয়ে। ফেলে আবার বর্ষার পর চরের উপর জেগে ওঠা, মনে হয়, মানুষের দৃষ্টির আড়ালে ঘটে যায়। জলপাইগুড়ির ইস্কুল পাঠশালা ভর্তি হয়ে যায় চরের শরণার্থীর ভিড়ে লঙ্গরখানা খোলা হয়, চঁাদা ভোলা হয় সারা শহর ঘুরে। প্রতি বছরই এক অবস্থা। প্রতিবছরই মানুষ বুড়ি তিস্তার কাছে গো-হারান হারে। কিছুতে এঁটে উঠতে পারে না বুড়িকে। বুড়ি মানুষের চোখের সামনে বছরের ঐ দুটো-একটা মাসই নিজের ভুলে-যাওয়া যৌবনের দিনগুলো জাগিয়ে তোলে। মানুষ ভয় পায়। বুড়ি তাতে মহা খুশি। হৈ-হৈ গর্জনে শহর আছড়াতে আছড়াতে এগিয়ে চলে।

কাল রাতে ঝড় হয়েছিলো। তিস্তার কামান ফাটার শব্দ হয়েছিলো। ময়নাগুড়ি থেকে মন্দিরাদের সকলে শুনেছে। শুনেছে আর বুকের মধ্যে রক্ত জমাট বেঁধে গেছে সকলের। নতুন নয়, তবুও নতুন। তিস্তা প্রতিবারই নতুন। আর নতুন বলেই ভয়। হয়তো গোটা জলপাইগুড়ি শহর, মন্দিরার প্যারালিটিক বাপ, ভাই-বোন সকলেই ভেসে গেছে। তাদের উঠোনের সেই তুলসীমঞ্চ, গেটের চূড়ায় মাধবীলতা, বৈঠকখানার পাশের বাগানের ব্লিডিং হার্ট, ক্যাকটাসের টবগুলো ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে। মন্দিরা সে রাত্রে ঘুমোতে পারে না। পরদিন সকালেই খবর আসে, নাঃ ঠিক আছে, তিস্তার জল এখনো চরে ওঠেনি, বাঁধ উপচিয়ে শহরে ঢোকা তো পরের কথা, এবার নাকি বাঁধ বাঁধা হয়েছে মোক্ষম। স্বয়ং বিশ্বকর্মার স্পর্শ লেগে তাকে দুর্ভেদ্য করেছে। এবার শহর বাঁচলো।

অন্ধকারে মন্দিরার মুখে একরূপ বাঁকা হাসি ফুটেছিলো এখন। ট্যাক্সি এসে কাছে দাঁড়িয়েছে। অপেক্ষা করছে, মন্দিরা পায়ে পায়ে এগিয়ে চললো। জলপাইগুড়ি শহর বেঁচে গেছে কাল। তার বাড়ি-ঘরদোর, বাপ-ভাই-বোনে বেঁচেছে সকলে। ভালো। কিন্তু এই দুর্দান্ত অন্ধকারে পিছনে বুড়ি তিস্তার তাড়া খেয়ে—সে বাঁচবে কিনা শেষ পর্যন্ত, কে জানে। যদি না বাঁচে কেমন হয়! যদি বাঁচে তাতেই বা কি হয়? মন্দিরার সর্বশরীরে আটাশ বছরের শীত-বর্ষা-বসন্ত এসে খাবলাতে লাগলো। শেষ কোথায়? মাথার উপর চিক্কর দিলো। আকাশ এমুড়ো-ওমুড়ো ভাগাভাগি হয়ে গেলেও, তৎক্ষণাৎ মেঘে-আঁধারে গেলো ভরে। মন্দিরার ভিতরে তিস্তার মতো দুঃসাহস উঠলো জেগে সব কিছু ভেসে ভাসিয়ে নিয়ে যাবার দুর্দমনীয় লোভ হলো। মনে হলো পায়ের তলায় হিলহিলিয়ে উঠলো কালো জল, সাদা ফেনা তিস্তার কিংবা পাহাড়ি সাপ কোননা, সাপের দল। মন্দিরা একদৌড়ে লাফিয়ে উঠলো ট্যাক্সিতে। মন্দিরা পিছনের সিটে ছিলো বসে। ট্যাক্সিওলা চরে নেমে দরজা দড়ি দিয়ে বেঁধে দিলো। কাতার দড়িতে কর্কশ শব্দ উঠলো। মন্দিরা তাও শুনতে পেলো, কেননা এখন ঝড়ের কোনো শব্দ নেই। ঝড় নেই। তাছাড়াও, কাছের শব্দ শােনার জন্য মন্দিরার মন উন্মুখ হয়েছিলো। বড়ো শব্দ সব সময় ছোট শব্দকে খেয়ে ফেলতে পারে না। লোকটা মন্দিরার বাঁপাশে এলো। চুপচাপ দাঁড়ালো খানিকক্ষণ। কাতার দড়ি বাঁধা আছে। বেশ শক্ত করে, তবু মনে হলো—তাতে আরো দৃঢ় দু-একটি পাক সে দিতে চায়। পিছনে সিটের কাঠের উপর মন্দিরা বসে ছিলো। তার ভয় করছিলো না। বরং কৌতুক বোধ হচ্ছিলো। অথচ, এই কিছুক্ষণ পূর্বে সে ভয়ে আধমরা হয়ে গিয়েছিলো, সন্দেহ নেই। মানুষ অবশ্য সঙ্গী হিসাবে সামান্য বিড়ালকে পেলে ভয় জয় করতে পারে। কিন্তু এই ড্রাইভারটি বিড়াল নয়। উদ্ বিড়াল? না, তাও নয়। মন্দিরার কৌতুক তাই। কোথায় কোন শিরীষ গাছের মাথায় বাজ পড়লো। মন্দিরার সেদিকে মোটেই দৃষ্টি ছিলো না। সে জালের মাঝখানে বসে মাকড়শা-রাণীর মতো ড্রাইভারের মুখের দিকে তাকিয়েছিলো। চোখাচোখি হতে মন্দিরা হেসে ফেললো—

এ গাড়ি চলবে তো?

মন্দিরার এই প্রশ্নে নিরুত্তর ড্রাইভার চাবি লাগিয়ে হ্যান্ডেল মারতে গেলো। তার বাহুর জোরে দুলে দুলে উঠতে লাগলো মন্দিরা। স্টার্ট নিতেই মন্দিরা হেসে উঠলো খিলখিল করে। ড্রাইভার মাথা ঘুরিয়ে দেখলো শুধু। তারপর স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে বালুর উপর চাকা চারটে চঞ্চল করে তুললো। মন্দিরাকে আজ যেন ভূতে ধরেছে। কৌতুকবোধ ভয় ছাপিয়ে উঠছে তার। গুন গুন করে গান ধরেছে সে হঠাৎ। হয়তো পাগল হয়ে গেছে মন্দিরা। এই দারুণ আঁধার-ঝড়জল-মৃত্যুর মুখোমুখি তার অস্বাভাবিক আচরণ কি ভাবেই বা বিচার করা যায়। হয়তো এমনই হয়—এ-কৌতুকটুকু না থাকলে হয়তো সে আসন্ন বিপদের চিন্তাতেই পাথর হয়ে যেতো।

তিস্তা-টাইগার! চার-চারটে টায়ারের থাবা, থাবার গায়ে নখের বদলে বিশ-তিরিশটা ধারালো দাঁতচরের বালি কামড়ে ধরে। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ডানদিক বাঁদিক মুহুর্তে ঘুরে যেতে পারে। স্থলে-জলে সর্বত্র সমান গতি, সমান নৈপুণ্য। গায়ের চামড়া ঘেয়ো কুকুরের মতো, রোঁয়া-ওঠা, পালিশ-হারা—দেখলেই মনে হবে সর্বত্র জরার কামড় লেগেছে। কিন্তু এই দুর্দান্ত চরে যৌবনের স্থান নেই—পােড়-খাওয়া, সর্বজ্ঞ বাঘ ছাড়া এই চর সাঁতার দেবে এমন সাধ্য কার। মাথার হুড় নেই, বসার তুলোর আসন নেই। পেট্রোল লাগে না,—তিস্তারই জলে চলে। তিস্তার জল ছাড়া অন্য কোনো জলে চলে না, তিস্তা-টাইগার। ফোর্ড সায়েবের নিজের হাতের তৈরি এই বিশ-চব্বিশটি প্রাণী যে না দেখেছে তার পক্ষে বিশ্বাস করা শক্ত। যেমন গর্জন, তেমনই তার আভিজাত্য, স্বকীয়তা, স্বাধীনতা-বোধ।

টাইগার হুংকার করে কিং-সায়েবের ঘাটে এসে লাগলো যখন, তখন রাতের ঠিক-ঠিকানা নেই কোনো। চারদিকে ঘুটঘুটি অন্ধকার। মানুষজন দূরের কথা, কাকপক্ষী নেই কোথাও। অদূরে তিস্তা থেকে কামানের গোলা ভাঙ্গার শব্দ আসছে কানে। বর্ষার আগে এমন শব্দ ওঠে তিস্তা থেকে। আকাশ মেঘে ডুবে রয়েছে। হাওয়া উঠলো জোর। গাড়ি ঘাটে এসে লাগতেও মন্দিরা নামার কোনো উদ্যোগ করে না দেখে ড্রাইভার দরজার কাছে এগিয়ে যায় সহসা বাজ পড়ে দূরে। নাঃ বাজ নয়-আকাশে তেড়াবেঁকা বিদ্যুৎ ঝলসে ওঠে। সেই বিদ্যুতের তীব্র আর রহস্যময় আলোয় ড্রাইভারের মুখ দেখে মন্দিরা। কালো, গভীর ব্রনে-ভরা, খোদাই করা পাথরের মুখ। মন্দিরা এতে কর্তব্যময়, কঠিন মুখ দ্যাখেনি জীবনে। সারা শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে তার। বুকের ভিতর ‘ধ্বংস ধ্বংস’ শব্দ বেজে ওঠে। মরিয়া হয়ে বলে ওঠে সে, হাত ব্যাগটা চরে পড়ে গেছে —

কোথায়? ড্রাইভারের ভূকুটি প্রশ্নের ভিতরে বোঝা যায়, অন্ধকারে নয় কোথায় কী করে হাওয়ায় উড়ে গেছে।

হাওয়া ছিলো জোর। হঠাৎ সব বন্ধ হয়ে গেছে মনে হয়। মনে হয় ভারী কোনো পাহাড়ের মাথা পড়বে ভেঙ্গে। তারই জন্য চারিদিকের এই সহসা নিস্তব্ধতা।

মন্দিরা চুপ করে থাকে। দুহাতে ধরে থাকে সামনের সীটের কিনার প্রাণপণে, যেন নেমে যেতে না হয়। যেন সেই পাহাড়ের মাথা ভেঙ্গে পড়ার আওয়াজ শুনতে পায় সে।

লোকটা পকেট থেকে বিড়ি বের করে ধরায়। দেশলাই কাঠির আগুনে তার মুখে অদ্ভুত রহস্যময় হাসি দ্যাখে মন্দিরা। লোকটা নারকোলের দড়ি খুলে দরজা হাট করে দিতে মন্দিরা বাইরের দিকে পা বাড়ালেই লোকটা বেণীসুদ্ধ মন্দিরার ঘাড় দাঁতে কামড়ে দৌড়ে চরের আঁধারে মিলিয়ে যায়। আবার চিক্কুর দেয় আকাশে। ঘাড় ফিরিয়ে মন্দিরা দ্যাখে—সে বাঘের বুকের তলায়। এমন মৃত্যুই সে চেয়েছিলো। নিশ্চিন্তে চোখ বোজে। আঁধারে তার চেতনা এতক্ষণে মিলে-মিশে যায়।

       

অমৃত ২৯ অক্টোবর ১৯৬৫

     

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>