| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: ব্যারিকেড । স্মৃতি ভদ্র

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

শেষ ট্রেন চলে যাবার পরেও মরিয়ম কান পেতে থাকে প্রায়ই। যদি আরও একটি ট্রেন আসে। যদি ভুল করে চলে আসা সেই ট্রেনে ঠিক স্টেশনে নেমে পড়ে মানুষটি। মরিয়ম  এসব ভাবনার আড়ালেই শীতের কয়েকটা মরা পাতা খসখস শব্দ তুলে ঝরে পড়লো। গাছের পাতা, শীতের বাতাস এসব কোনোকিছুই মরিয়মকে তাঁর ভাবনার কেন্দ্র থেকে দূরে সরাতে পারে না।

আচ্ছা, মানুষ হারিয়ে গেলে কোথায় যায়?

কতদিন হয়ে গেলো এই একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছে মরিয়ম। এমনো হয় ফটকের কড়া নাড়ার আওয়াজে মরিয়ম চমকে ওঠে। ভাবে, ফিরে এলো মনে হয় মানুষটি।

তবে দরজার আড়াল ভেঙে আর যাই হোক মানুষটি কিন্তু ফিরে আসে না। অপেক্ষা শব্দটিকে অনন্ত করে দিয়ে মানুষটি থেকে যায় হারিয়ে যাবার তালিকায় একটা সংখ্যা হয়ে।

তবে এই শব্দের সাথে মরিয়মের পরিচয় প্রথম নয়। সেই কিশোরীকাল থেকেই ‘হারিয়ে যাওয়া’ শব্দবন্ধের সাথে মরিয়মের আত্মীয়তা হয়ে গেছে। আর একইসাথে আত্মীয়তা হয়ে গেছে রাতের শেষ ট্রেনের সাথেও।

সেদিন নিরিবিলি শহরে কিশোরী মরিয়ম বাবা-মা আর বড়ভাইয়ের সাথে রাতের শেষ ট্রেনেই নেমেছিলো। শীত জর্জর শহর একান্তই বাবার চাকরির পোষ্টিং হিসেবেই রয়ে যাবার কথা ছিল। কিন্তু নির্ঝঞ্ঝাট শহরের বছর খানেক সময় মরিয়মকে সংযোগ ঘটিয়ে দিলো ওর ভবিষ্যতের সাথে।

মফস্বলি গন্ধমাখা শহরটি তখন ছিল একদম আনকোরা। গা থেকে মফস্বলের আমেজ না খুলেই শহুরে লেবাস পড়ে নিয়েছে সবেমাত্র। তাই সেই শহরের মোড়ে মোড়ে তখনও শীতকাতুরে লোকেরা জড়ো হতো খরের আগুনে তাপ পোহাতে। আর নদী থেকে উঠে আসা ঘন কুয়াশায় পলান টুক টুক খেলতে খেলতে মানুষগুলো ঘরের ভেতর লুকিয়ে পড়তো সিনেমা হলগুলোর ইভিনিং শো শেষ হতে না হতেই।

এরপর শহরের নিস্তব্ধতা ভেঙে এসে দাঁড়াতো রাতের শেষ ট্রেন।

এরকমই এক ট্রেনে বাজার স্টেশনে নেমে মরিয়ম যখন মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল, তখন স্টেশনের অন্যদিকে নতুন গজিয়ে ওঠা পাইপের ঘরগুলোর পাশ থেকে অপলক তাকে দেখে নিয়েছিলো অতীশ নামের এক সদ্য যুবক।

সেই গল্প অবশ্য মরিয়ম বেশ কয়েকমাস পড়ে জানতে পেরেছিলো। ততদিনে শহরটাতে সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে গেছে। আর সেই ঘটনার জেরে শুধু মরিয়ম নয়, ওদের পুরো পরিবারকেই শহরটি আত্মীয় বানিয়ে নিয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে শীতের এক সন্ধ্যায়। চারপাশের তড়তড় করে বেড়ে ওঠা ইউক্যালিপটাসের ফাঁক ফোঁকরে কুয়াশা খুব চুপচাপ এলিয়ে পড়েছিলো দিনের আলো নিভে যেতেই। নিয়ম মেনে শহরটি সারাদিনের কর্মব্যস্ততায় দাড়ি টানার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো সব ফেলে। ঠিক তখনি কলেজ রোডের টিচার্স কোয়াটারের নির্বিবাদী রাস্তা কেঁপে উঠেছিলো ভ্যানের আওয়াজে। জলপাই রঙের ভ্যান।  ভ্যানটি এসে থেমেছিলো প-২৪ নম্বরের বাড়ির সামনে। এরপর খানিক সময় কাঠের দরজায় দুম দুম ধাক্কার আওয়াজ। তারপর খুলে যাওয়া দরজার এপাশে গুমরে কেঁদে ওঠার আওয়াজ। এর কিছুসময় পরেই বিচ্ছিন্ন আর্তনাদ আর চিৎকার পেছনে ফেলে জলপাই রঙের ভ্যান হারিয়ে গেলো কুয়াশামাখা অন্ধকারে।

বোবা নিস্পলক চোখে সেসবকিছু দেখতে দেখতেই মরিয়ম নিজের জীবনের সাথে যুক্ত করে নিলো ‘ হারিয়ে যাওয়া’ শব্দবদ্ধটি। হারিয়ে গেলো বড় ভাই নতুন শহরে আসার মাসখানেকের মাথায়। শহরটি সেদিনের আগে এমনকিছু দেখেনি।

তবে কোনো অবিচ্ছেদ্য কারণে সেদিনের পর মাস কয়েকের মধ্যে এমন ঘটনায় বেশ পরিচিত হয়ে উঠলো শহরটি। অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে পরপর ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনায় শহরটি এমনভাবে আতংকিত হয়ে উঠলো জলপাই রঙের গাড়ি দেখলেই যে যার বাড়ির দরজার হুড়কো তুলে দিতো তখন।

এমন কোনো আতংকিত এক সন্ধ্যাতেই অতীশের সাথে মরিয়মের পরিচয়। বড় ভাইয়ের হারিয়ে যাওয়ার দিনকতক পার হয়েছে তখন। মরিয়মের বাবা এ শহর ও শহর করে বেড়াচ্ছে ছেলে ফিরে পাবার আশায়। আর মরিয়মের মা জায়নামাজে দিন পার করছে ছেলেকে ফিরে পাবার প্রার্থনায়। সেদিন শেষ শীতের একটা আলটপকা আড়ষ্টতা গেঁথে ছিল শহরের গায়। আত্মীয় স্বজনের অনাহুত বিলাপ, জল্পনাকল্পনায় বিরক্ত প-২৪ নম্বরের বাড়িটা থেকে কলেজ রোডের শেষ মাথায় এসে দাঁড়িয়েছিলো মরিয়ম। নিরিবিলি সেই জায়গাটায় মরিয়ম বড় ভাইয়ের সাথে আসতো সাইকেল চালানো শিখতে। সাইকেলের প্যাডেল ঘুরানো শিখিয়ে দিতে দিতেই বড় ভাই গল্প করেছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের। বলেছিলো, বন্ধুরা মিলে কীভাবে খরচের টাকা বাঁচিয়ে পোস্টার আর লিফলেট বানিয়েছে। শিখিয়েছিল, শ্বেত ব্যারিকেড ভেঙে ফেলো লাল ব্যারিকেড গড়ে তোলোর সেই শ্লোগান। কিন্তু কিশোরী মরিয়ম অতকিছু বুঝতে না পারলেও বড় ভাই অন্তত এতটুকু বুঝাতে পেরেছিলো যে, এই দেশের প্রতিটা মানুষকে নিয়ে বড় ভাই স্বপ্ন দেখে।

সেই স্বপ্ন দেখা মানুষটিকে ওরা কোথায় রেখেছে, ওরা কি বড় ভাইকে খুব মারছে নাকী গরম পানি ঢালছে বড় ভাইয়ের নাকে মুখে? এসব মরিয়ম শুনেছে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে আসা এক আত্মীয়ের কাছ থেকে। ওখানে বন্দী সবাইকে নাকী এমন করেই টর্চার করা হয়। এসব ভাবতে ভাবতে মরিয়ম যখন ডুকরে কেঁদে উঠেছিলো তখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিলো অতীশ,

তোমার বড় ভাইয়ের মতো আদনান ভাইকেও ওরা ধরে নিয়ে গেছে।

এটাই ছিল অতীশ আর মরিয়মের বন্ধুত্বের শুরু। সেদিন শীত ফুরিয়ে আসা বিকেলে দাঁড়িয়ে মরিয়ম বুঝতে পেরেছিলো সেই শহরে হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণা শুধু ওর একার নয়। সমব্যথী  সেই মানুষটিই হয়ে উঠলো মরিয়মের জীবনের ভবিতব্য।

অতীশ সেদিন বলেছিলো আদনান ভাই ওর আপন ভাই না হলেও আপনের চেয়ে বেশী। এলাকার নামকরা ফুটবলার আদনান ভাইয়ের কাছেই অতীশ শিখেছিলো কীভাবে ড্রিবলিং করতে হয়। তবে অতীশের শিক্ষাটা অতটুকুতে থেমে থাকেনি। আদনান ভাই শিখিয়েছেন কীভাবে গলা চড়িয়ে বলতে হয়,

লড়াই লড়াই লড়াই চাই

লড়াই করে বাঁচতে চাই…..

লড়াকু আদনান ভাইকে ওরা তুলে নিয়ে  গিয়েছিলো বড়পুলের ওপর থেকে। অন্যদিনের মতো সেদিনও সন্ধ্যায়  কাটাখালের উপরে ঝুলে থাকা বড়পুলে আড্ডা জমে উঠেছিলো। সেখানে সিগারেটের ধোঁয়ায় রিং বানাতে বানাতে আদনান ভাই আওড়ে নিচ্ছিল,

You start dying slowly if you do not travel,

if you do not read, If you do not listen to the sounds of life,

If you do not appreciate yourself.

তখনি শহরের চারমাথার মোড়ে এসে থেমেছিলো দুটি জলপাই রঙের ভ্যান। ভ্যান থেকে বেরিয়ে কয়েকজন  গটগট করে হেঁটে গিয়ে থেমেছিলো একদম আদনান ভাইয়ের সামনে,

আদনান হোসেন?

একটু থেমে আবার বলে উঠেছিলো, আদনান হোসেন?

ঘাড় নেড়ে আদনান ভাই শুধু বলেছিলো,

You start dying slowly

When you kill your self-esteem….

ওরা আর দেরী করেনি। ঝটপট আদনান ভাইকে তুলে নিয়েছিলো ভ্যানে। এরপর সন্ধ্যার কুয়াশায় আরোও খানিক অন্ধকার ঢেলে জলপাই রঙের ভ্যান শহর ছেড়েছিলো। কোথায় সেদিন ওরা আদনান ভাইকে নিয়ে গিয়েছিলো কেউ কখনো জানতে পারেনি। আদনান ভাইয়ের বয়োবৃদ্ধ বাবা এ শহর ও শহর করেও ছেলের হদিস করতে পারেননি। রাজশাহী রংপুর যেখানেই গিয়েছে একই উত্তর পেয়েছেন,

আমরা তো কাউকে ধরে আনিনি….

ব্যস, নিখোঁজ হয়ে গেলেন সেদিনের পর আদনান ভাই।

অতীশের কাছ থেকে সেদিনের পর যতবার আদনান ভাইয়ের হারিয়ে যাবার গল্প  শুনেছে ততবারই বড় ভাইয়ের কথা মনে করে মরিয়ম চোখ ভিজিয়েছে।

তবে সেই শহরে ঋতুর মতো  দিন বদলে গিয়েছিলো দ্রুতই। মরিয়মদের বাড়ির মতো সেই শহরের সবাই আস্তে আস্তে মেনে নিয়েছিলো ছেলেগুলোর হারিয়ে যাওয়া। অপেক্ষাও ফুরিয়েছিলো সবার।

 শুধুমাত্র অতীশ আর মরিয়মের বিকেলগুলোকে জড়িয়ে রাখতো ছেলেগুলোর কথা।

তবে মফস্বলি গন্ধমাখা সেই শহরে কিশোরী মরিয়ম আর কৈশোর উত্তীর্ণ অতীশের বিকেল ভাগাভাগি করে নেওয়া খুব সহজ ছিল না। ব্যাচে প্রাইভেট পড়া ওদের সেই সুযোগ করে দিয়েছিলো। দিবাকর স্যারের কাছ থেকে ইংরেজি পড়ে ওরা দু’জন যখন কড়ইতলা পেরিয়ে কলেজ রোড ধরতো তখন কড়ইগাছে ফুল ফুটতে শুরু করেছে। রাস্তার পাশের টং দোকানে একঘেয়ে বেজে চলতো তখন ট্রানজিস্টার। অমনোযোগী সেই শহরের বিকেল ভাগাভাগি করতে করতে মরিয়ম আর অতীশের মনোযোগ বাড়তো একে অন্যের প্রতি। আস্তে আস্তে সেসব বিকেলের গল্পে বড় ভাই, আদনান ভাইয়ের সাথে সাথে যোগ হতে থাকতো ওদের দু’জনের গল্প। সেসব গল্প বিকেল গড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছিলো নীরব রাতেও।

রাতে বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে অতীশ আর মরিয়ম একে অন্যকে লিখতে বসতো। সাদা পাতা ভরে যেতো নিমিষেই দু’জনের রূপকথায়। তারপর শহরের আলসে বিকেলে প্রাইভেট পড়ে ওরা যখন নবদ্বীপ পুল পেরিয়ে নীলা সিনেমা হলের পাশের রাস্তায় উঠতো তখনই এদিক ওদিক দেখে হাতবদল হতো সেসব রূপকথার। শহরের সবার অজান্তেই অতীশ আর মরিয়ম সামান্য প্রতিবেশী থেকে হয়ে উঠেছিলো একে অন্যের দরদিয়া। ফাল্গুনের মরা পাতার শহরে দু’জন হয়ে উঠেছিলো

একে অন্যের নিভৃত ডাকঘর।

ততদিনে জলপাই রঙাদের দৌড়াত্ম আরোও বেড়ে গিয়েছে। তবে মনের বিতৃষ্ণা ভুলে গোল্ডফিশের মেমোরি হয়ে উঠেছে শহরটি। তাই তো জলপাইরঙাদের ভজন কীর্তনে অভ্যস্ত শহরটি ভুলেই গিয়েছে ততদিনে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া ছেলেদের মর্মান্তিক মৃত্যূর কথা।

হ্যাঁ মরিয়মের বড় ভাই লাশ বা জ্যান্ত কোনোভাবে না ফিরলেও আদনান ভাই ফিরেছিলো বাক্সবন্দী লাশ হয়ে। আরোও ফিরেছিলো বাহিরগোলার রঞ্জু ভাই, চালপট্টির রতন দা আর বাজার স্টেশনের রতু ভাই। শাদা কাপড়ে ঢাকা মানুষগুলো নাকী লাশ হয়েছে পালাতে গিয়ে। নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য ওদের গুলি না করে কোনো উপায় ছিল না জলপাইরঙা সাহসী মানুষগুলোর।

বিনা প্রতিবাদে সে শহর মেনে নিয়েছিলো সেসব গল্প। শুধু মেনে নিতে পেরেছিলো না অতীশ। মালসাপাড়ায় আদনান ভাইয়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হয়েছিলো অতীশের। জলপাইরঙাদের শাসনের  প্রতি সমস্ত ঘৃণা জমেছিলো অতীশের দু’চোখে।

মরিয়মকে লেখা চিঠিতে সেসব কথা বলতো অতীশ। বলতো, আদনান ভাই যে লড়াই করার স্বপ্ন দেখাতেন এই শহরকে সেই স্বপ্নের কথা সবাই ভুলে গেছে মরিয়ম।

চিঠি পড়তে পড়তে মরিয়মের মনে হতো বড় ভাই আর আদনান ভাই একই মানুষ। বড় ভাই-ও এমন করেই স্বপ্ন দেখতো। বলতো, যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি মরিয়ম। স্বাধীনতার ভাগ সবাই পেলে তবেই  যুদ্ধ শেষ হবে।

বসন্তের সে শহর মরিয়মকে বড় ভাইয়ের কথা বারবার মনে করিয়ে দিতো। রাতের ঝকঝকে আকাশে মরিয়ম খুঁজে চলতো তারা হয়ে যাওয়া বড় ভাইকে। হারিয়ে যাওয়া মানেই যে  মৃত্যূ এটা আন্দাজ করেও কান পেতে থাকতো ফটক খোলার আওয়াজে।

তারপর একদিন গভীর রাতে ফটক খুলে বড় ভাই নয়, এসেছিলো কলেজের প্লিন্সিপ্যাল। আব্বার কাছে একটা অনুরোধ নিয়ে। অনুরোধ ছিল শহরের সেই সময়কালের বড় একটি অনুষ্ঠানে গান গাইবার। মরিয়মের আব্বা গাইতেন ঠিকই তবে গান তাঁর কাছে ছিল প্রার্থনার মতো। তাই সময়ের সবচেয়ে বড় শত্রুদের অভ্যর্থনায় গান গাওয়া তাঁর কাছে ছিল অপরাধের সমান। তবুও সেই অপরাধটি তাঁকে করতে হয়েছিলো কলুষিত সময়ের প্রান্তে দাঁড়িয়ে।

সেদিন ওদের অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান থেকে  ফিরে মরিয়মের মুক্তিযোদ্ধা বাবা কেঁদেছিলো হু হু করে। তবে সেই কান্না থেমে গিয়েছিলো হুট করেই। কারণ ভালো কোনো শহরে পোস্টিং এর জন্য মরিয়মের আব্বাকে খানিক পরেই সুপারিশ করতে যেতে হয়েছিলো শহরে আগত সামরিক সেই অতিথির কাছেই আবার।

নিরিবিলি সেই মফস্বলি শহরকে ফেলে চলে যেতে মরিয়মের কোনো আপত্তি ছিল না, কিন্তু কড়ইতলায় জমানো সেইসব চিঠিসময়কে উপেক্ষা করার সাধ্য যে ততদিনে হারিয়েছিলো মরিয়ম।

 এজন্যই কড়কড়ে এক নির্জন দুপুরে অতীশের সাথে পালিয়ে গিয়েছিলো মরিয়ম।

বাজার স্টেশন থেকে লালচে রঙের ট্রেনে সেদিন অতীশের সাথে মরিয়ম চেপে বসেছিলো অজানা এক অন্তরঙ্গ ভবিষ্যতের আশায়। তবে আজকের এই অজানা সময়ের মতো ওদের যাত্রা অজানায় হয়নি। এ স্টেশন ও স্টেশন ঘুরে দু’জনেই ফিরেছিলো সেই শহরেই। মফস্বলি শহরটি আর কিছু না পারুক সবাইকে আশ্রয় অন্তত দিতে পারে। হোক তা ঘরহীন মানুষ। নদীভাঙা সে শহর ওদেরকে গড়ে দিয়েছিলো স্নেহময় এক সংসার। স্কুল পড়ুয়া ছোটবোন, স্পিনিং মিলে কাজ করা বাবা আর ঘরে থাকা মা সবটুকু দিয়ে বরণ করেছিলো মরিয়ম আর অতীশকে। আশেপাশের দু’চার পরিবার নিয়ে নিজেদের সঙ্গতি মেপেই  করেছিলো বৌ বরণের অনুষ্ঠান অতীশের পরিবার।

তবে সেই শহরে ছেলে আর মেয়েকে হারিয়ে অন্য কোনো শহরে ততদিনে চলে গিয়েছিলো মরিয়মের আব্বা আর মা।

শহরে আবার ফেরে শীত। শহরে আবার ফেরে অবিরত কুয়াশার দিন। ফেরে শিশিরে ভেজা কলেজ রোড। ততদিনে অতীশ আর মরিয়মের কলেজ শেষ হয়ে গেছে। ফুরিয়ে গেছে ওদের ব্যাচে পড়ার বিকালগুলো। তবে বছর কয়েক আগে শুরু হওয়া ওদের চিঠিসময় ফুরিয়ে যায়নি অবশ্য কখনই। তবে ফুলস্কেপ পাতাভরা রূপকথার গল্পের জায়গা ততদিন দখল করে নিয়েছে সময়ের সাম্প্রতিক গল্পগুলো।

জলপাইরঙাদের চেহারা বদলে গেছে তখন।তবে ওই যে, চেহারা যতই বদল হোক কাজগুলো সবার একইরকম। আদনান ভাইয়ের শোক মেনে নিয়েই অতীশ তখন আরেকজন আদনান হোসেন হয়ে উঠেছে। সময়ের কাছে প্রশ্ন অতীশের তখন একটাই,

শোষণমুক্ত সময় আসবে কবে?

শহরের অনেক পুরোনো বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক মরিয়ম সেই প্রশ্নের পাশে রাখতো আরেকটি প্রশ্ন,

যে স্বপ্ন বড় ভাইকে নিখোঁজ করে দিলো সেই স্বপ্ন কবে পূরণ হবে?

না, মরিয়ম ভুল ছিল। বড় ভাই, আদনান ভাই, রতু ভাইদের রেখে যাওয়া স্বপ্ন  পূরণ হবার জন্য অপেক্ষা করলে হবে না। সেটা ছিনিয়ে আনতে হবে,  তাই তো আদনান ভাইয়ের শিখিয়ে দেওয়া মন্ত্রটাই সে সময় বারবার আওড়ে গেছে অতীশ,

ইউ স্টার্ট ডাইং স্লোলি

হোয়েন ইউ কিল ইউর সেল্ফ এস্টিম……

শহরের শিশির মাখা সেইসব সন্ধ্যায় গুটিকয়েক মানুষকে নিয়ে অতীশ পার হতো মাড়োয়াড়িপট্টির চার রাস্তা, পার হতো খলিফাপট্টি, পার হতো কালিবাড়ির মোড়। গলায় থাকতো একটাই সুর,

লড়াই লড়াই চাই

লড়াই করে বাঁচতে চাই…..

সেই লড়াই খুব অসম লড়াই ছিল সেসময়। মাঝেমাঝে মরিয়মের ভয় হতো যদি বড় ভাইয়ের মতো অতীশও হারিয়ে যায়। তবে সেসব ভয় মরিয়মের ভেতর গেড়ে বসার আগেই অতীশ শোনাতো নতুন দিনের কথা। শিখিয়ে দিতো নতুন সময়ের কবিতা,

সব শালা কবি হবে,

 পিঁপড়ে গোঁ ধরেছে উড়বেই,

দাঁতাল শুয়োর এসে রাজাসনে বসবেই….

শীতের কড়া কুয়াশায় যমুনা যখন স্রোতহীন নিস্প্রাণ, তখন ঘরের ভেতর লুকিয়ে মরিয়ম এই কবিতা আওড়াতো। আর অতীশ শহরের চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে শ্লোগান দিতো,

নিপাত যাক….নিপাত যাক…..

হ্যাঁ অতীশের ইচ্ছে পূরণ হয়েছিলো। নিপাত গিয়েছিলো জান্তাদের দিন। শহরের বুকে কুয়াশা ভেঙে সেদিন রোদ উঠেছিলো অনেকদিন পর। আর অনেকদিন পর বড় ভাইয়ের জন্য প্রাণখুলে কেঁদেছিলো মরিয়ম। ভেবেছিলো, শোষণহীন সময়ের দ্বারপ্রান্তে এটাই হবে ওর শেষ অশ্রু বিসর্জন।

শহরের মতো ওদের জীবনেও দারুণ সময় আসে। অসম সময় শেষ হবার খুশীতে অতীশ জীবন ভরে বয়ে চলা স্লোগানগুলোকে ছুটি দেয় সেসময় খুব খুশী মনেই। কড়ইগাছ ফুলে ভরিয়ে শহরে আসে উষ্ণ দিন। আসে মরিয়ম আর অতীশের স্বপ্ন ছিনিয়ে আনার দিন।

কিন্তু সেসবকিছুই যেন ছিল  মরীচিকা। কিছুদিন পরই তপ্ত শহরের বুকে দাঁড়িয়ে অতীশ বুঝতে পারলো লড়াই শেষ হয়ে যায়নি ওর। সময়ের বিপন্নতায় নিজেকে অসহায় মনে হতে শুরু অতীশের। দখল হয়ে যাওয়া কাটাখাল, যমুনার চর আর জলপাইরঙের জায়গায় কালোরঙাদের দৌরাত্ম্য অতীশকে কোণঠাসা করে তুলতে থাকে বারবার।

নিপাত যাবার যে দৃশ্যকল্প অতীশ আর মরিয়মের কল্পনায় ছিল সে জায়গা দখল করে নিলো প্রতিহিংসার এক রূঢ় সময়। অতীশ বুঝতে পারলো বড় ভাইয়ের সেই শ্বেত ব্যারিকেড এখনও সময়ের বুকে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। আর এজন্যই ন্যাপথলিনে জোড়ানো সেই শ্লোগানগুলো আবার গলায় তুলে নিলো অতীশ। শহরের অলিগলিতে আবার ছড়িয়ে দিতে লাগলো লড়াই করার সাহস।

সেদিন সন্ধ্যার পর এমনই এক রাত ছিল যখন লাল ব্যারিকেডের নিচ্ছিদ্র স্বপ্ন নিয়ে খলিফাপট্টির মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিলো অতীশ। হঠাৎ চারপাশের বাড়িঘর আর দোকানপাটের বাতি নিভে গিয়েছিলো শহরে আগত নতুন শব্দ লোডশেডিং-এর নামে। থমথমে হয়ে উঠেছিলো আচমকাই সেই মহল্লা। অস্বস্তিকর সেই সময়ের বুকে হুট করে এসে দাঁড়িয়েছিলো এলিট ফোর্সের গাড়ি। বলিষ্ঠভাবে এসে দাঁড়িয়েছিলো অতীশের সামনে,

অতীশ তালুকদার?

একটু থেমে আবার,

অতীশ তালুকদার?

উত্তর  না দিয়ে অতীশ শুধু আওড়েছিলো,

ইউ স্টার্ট ডাইং স্লোলি

হোয়েন ইউ কিল ইউর সেল্ফ এস্টিম……

ব্যস্, বিপন্ন সময়ের বুকে উপহাস হয়ে নিখোঁজ হয়ে গেলো অতীশ। নিখোঁজ হয়ে গেলো মরিয়মের ডাকঘর। নিখোঁজ হয়ে গেলো ন্যাপথলিনের গন্ধ মাখা বড় ভাই আদনান ভাইয়ের লাল ব্যারিকেডের স্বপ্ন।

সেদিন থেকে আজ অব্দি মরিয়ম নিখোঁজ অতীশের অপেক্ষায়। খবরের কাগজে ক্রসফায়ারের খবরগুলো খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ে বারবার। কারণ মরিয়ম এখন জেনে গেছে বড় ভাই কিংবা অতীশকে ক্রসফায়ারেই মরতে হয়।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত