| 28 মে 2024
Categories
ফিচার্ড পোস্ট লোকসংস্কৃতি

কমল ভট্টাচার্য: নবদ্বীপ কুটির শিল্পাশ্রম । ভজন দত্ত

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

খাদি ও গ্রামোদ্যোগ উন্নয়ন বিভাগের জেলা আধিকারিক বয়সে তরুণ।খাদি ও কুটিরশিল্প সমৃদ্ধ বর্ধমান জেলায় পোস্টিং পাওয়ার পর এখানের গ্রামীণ  শিল্পের নাড়ি নক্ষত্র জানতে নিজে মাঠে নেমে এখানে-ওখানে তথ্য সংগ্রহ করছেন যখন, তখন একদিন  সন্ধান পেলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী কমল ভট্টাচার্য প্রতিষ্ঠিত নবদ্বীপ কুটির শিল্পাশ্রমের। তিনি প্রাথমিক ভাবে  জানতে পারলেন উনি আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ছাত্র। গান্ধিজির আদর্শে বর্তমান গ্রাম স্বরাজের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। রসায়নের মেধাবী ছাত্র ছিলেন বলেই মসলিন সুতো রং করার জন্য রং নির্বাচন ও সুতোয় রং তিনি  নিজের হাতে করতেন। 

এরপরই একদিন ছুটির দিন দেখে গেলেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত আশ্রমে। খবর গেল ওঁর কাছে, জেলা খাদি ‘অফিসার’ দেখা করতে চান তাঁর সঙ্গে।

তিনি বললেন, বলে দাও আমি কোনও সরকারি অফিসারের সঙ্গে দেখা করি না।

খবরদাতা এসে তাকে সেই রকমই বললেন। এদিকে ঐ  আধিকারিক ভাবছেন এতদূর থেকে এসে মানুষটির সঙ্গে দেখা হবে না। জেলায় আসার পর অনেকেই বলেছেন তাঁর উদ্যোগের কথা। স্বাধীনতা সংগ্রামী যে মানুষটি স্বাধীনতার পর গান্ধিজির আহ্বানে  কংগ্রেস দল ও রাজনীতি থেকে সমস্ত সংশ্রব ছিন্ন করে গ্রাম উন্নয়ন ও গ্রাম স্বরাজের লক্ষ্য নিয়ে গড়ে তুলেছেন এই প্রতিষ্ঠান। বাংলার গৌরব মসলিন পুনরুদ্ধারের ব্রত গ্রহণ করে তার উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি করেছেন, সেখানে এত কাছে এসে সে সম্পর্কে কিছু না জেনে,তাঁকে প্রণাম না জানিয়ে তিনি ফিরে যাবেন! আচ্ছা,  তিনি যদি সরকারি আধিকারিক না হতেন! এসব ভাবতে ভাবতেই তিনি কর্মীটির অনুমতি না নিয়েই  প্রবেশ করলেন কমল বাবু যে ঘরে ছিলেন সেই ঘরে। বাহুল্যহীন একটি ঘরে অতি  সাধারণ একটি তক্তপোশ, তার উপর কম্বল পাতা। তিনি তার উপর বসে একমনে সুতো নিয়ে কিছু কাজ করছিলেন।

 আধিকারিক ঘরে প্রবেশ করেই তার পা ছুঁয়ে  প্রণাম করতেই তিনি ঘুরে তাকালেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, কে আপনি?

– ক্ষমা করবেন। আমিই সেই ব্যক্তি, যার সঙ্গে আপনি দেখা করবেন না বলেছেন।

-হ্যাঁ বলেইছি তো, আমি কোনও সরকারি আধিকারিকের দেখা করব না।দেখা করি না।

– আমি আধিকারিক হিসেবে নয়, সামান্য একজন ব্যক্তি হিসেবেই আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। আমি জানি, অনেক শুনেছি আপনার কথা, তাই ছুটির দিন দেখেই আপনার কাছে এসেছি, আপনার অভিজ্ঞতা জানবো, শুনবো বলে। আমি অনেক আশা নিয়ে এসেছি, দয়া করে আমাকে ফেরাবেন না।

উনি কিছুক্ষণ কি ভাবলেন, তারপর বললেন,

– বেশ বসুন। বলুন কি জানতে চান?

– আমি এই মসলিন উৎপাদন ও আপনার এই  আশ্রম গড়ে তোলা সম্পর্কে জানতে চাই।

তিনি তখন পাল্টা প্রশ্ন করলেন,

-মসলিন! তুমি জানো কত কাউন্টের সুতোয় মসলিন তৈরি হয়? জানো ময়ূরকণ্ঠী রং, চেনো ময়ূরকণ্ঠী!

– মসলিন, তা ২০০/২৫০ কাউন্টের!

– ঐ তো তোমাদের বিদ্যা! শোনো, মসলিন তৈরি করতে ৪৫০ কাউন্টের সুতো লাগে। সে সুতো কাটার সময় হাঁচি-কাশি হলে, সুতো ছিঁড়ে যায়। তা এতোই সূক্ষ্ম যে,সুতো কাটার জন্য আলাদা ঘর লাগে। যারা বোনেন তাদের নীচে ছাতার কালো কাপড় রেখে কাজ করতে হয়, নাহলে এর সুতো চোখে দেখা যায় না।

এই বলে তিনি তাঁর স্ত্রীকে ডাক দিলেন। উনি এলে, একটি মসলিনের শাড়ি ও একটি ময়ূরকন্ঠী রংয়ের শাড়ি বের করে দিতে বললেন। তাঁর স্ত্রী পুরোনো লোহার আলমারি থেকে দুটো শাড়ি বের করে দিলেই তিনি বললেন,

– হাতের আংটিটি দাও।

আধিকারিক তাঁর নির্দেশমত সদ্য বিবাহে যৌতুক হিসেবে পাওয়া আংটি খুলে তার হাতে দিতেই তিনি মসলিনের শাড়িটির ভাঁজ খুলে তার ভেতরে গলিয়ে দেখালেন।

-দেখো। একসময় দেশলাই বাক্সের ভেতর ভরা যেত একটি শাড়ি। সেই তুলো,সেই কারিগর, সেই চোখ এখন আর নেই। তবুও চেষ্টা করছি, যতদিন বাঁচবো চেষ্টা করে যাবো। এই শাড়ির দাম এদেশে পাওয়া যায় না। আমার সব উৎপাদন চলে যায় জাপানে। জাপানের মেয়েদের কাছে এর কদরই আলাদা।

আর এই দেখো এই হচ্ছে আসল ময়ূরকণ্ঠী রংয়ের শাড়ি। ময়ূরকণ্ঠী কাপড় কাকে বলে তা বুঝতে হলে তোমাকে বুঝতে হবে আলোর খেলাটা।

এই বলে তিনি ঘরের বিভিন্ন কোণে কাপড়টা মেলে ধরছেন আর বলছেন, ‘ঐদিকের জানালাটা বন্ধ করে দেখ, কি রং দেখছো?’

এভাবে ঘরের চার কোণে চার রকম ভাবে তিনি শাড়িটি মেলে ধরলেন আর আধিকারিক চার রকম রংয়ের বাহার দেখলেন।

উনি বললেন -এটাই হচ্ছে ময়ূরকণ্ঠী রংয়ের শাড়ির বা কাপড়ের বৈশিষ্ট্য। এই রং আমার নিজের হাতে করা।


আরো পড়ুন: ঢাকাই মসলিনের ঐতিহ্য । মহাকাল


শ্রদ্ধায় ঝুঁকে আসে আধিকারিকের মাথা,সামনে যিনি বসে আছেন, যাঁর সঙ্গে তিনি কথা বলছেন, তিনি কে! স্বাধীনতা সংগ্রামী! গ্রাম পুনর্গঠনে গান্ধিজির আদর্শে অবিচল সৈনিক! আচার্যের আদর্শে দীক্ষিত উদ্যোগপতি! রসায়ন বিজ্ঞানী! নাকি একজন শিল্পী — এসব কিছু তার মাথায় ঘুরপাক খেতে খেতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

-আচ্ছা মসলিনের জন্য কি বিশেষ ধরনের তুলো ব্যবহার করা হয়?

– সাধারণ তুলোয় মসলিনের সুতো হয় না। এর জন্য তামিলনাড়ু থেকে তুলো আসে। একে ‘সাদা-সোনা’ বলেন কেউ কেউ। কথাটা ভুল নয়! একটা তুলো আনাই যার নাম  সুভিন কটন (Suvin cotton), এই তুলোতেই মসলিনের কাজ সব থেকে ভালো হয়।

– আচ্ছা, আপনি এই যে আশ্রমটি গড়ে তুলেছেন এর মূলধন কোথা থেকে কীভাবে এলো,যদি বলেন।

– সে এক গল্প আছে বুঝলে। প্রথমে তো আমার স্ত্রীর যেটুকু সোনাদানা ছিল তাই বিক্রি করে শুরু করেছিলাম। বুড়ো-বুড়ির চলে যেত কোনোরকমে। কিছু লোককে কাজ দিতে হবে এই চিন্তাটাই মাথায় ছিলো। প্রথম প্রথম নিজেই সুতো কাটতাম, সুতোয় এখনো ডাই-এর কাজ আমি নিজের হাতে করি, সেটাও জেনে রাখো। তো,একদিন সরকারের লোক এসে বললো মুখ্যমন্ত্রী নাকি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন! আমি বললাম আমার তো সময় নেই। উনি যদি আসেন তো ভালো হয়। তারপর বুঝলে, আমাকে মাসে একবার হলেও কাটোয়া লোকাল ধরে যাওয়া-আসা করতে হত কোলকাতায়। কোলকাতার বড়বাজারে যেতে হত রং কেনার জন্য। লোক দিয়ে এইকাজ হয় না।

তো বেশকিছু দিন পর হঠাৎ মনে পড়লো, আরে মুখ্যমন্ত্রী তো আমাকে ডেকেছিলেন! হাতে একটু সময় ছিল, চলে গেলাম রাইটার্সে। কিন্তু গেটে অনেক পুলিশ, তারা পাশ দেখতে চাইলে, আমি বললাম, ওসব তো আমার কাছে নেই!  তিনি, মানে আপনাদের মুখ্যমন্ত্রী  আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন তাই এসেছি। যান তাকে গিয়ে বলুন নবদ্বীপ থেকে কমল ভট্টাচার্য এসেছেন। গেটে যারা ছিলেন তারা কি ভাবলেন কে জানে! একটু অপেক্ষা করার পর, খবর পাওয়ার পরই দেখি স্বয়ং বিধান চন্দ্র রায় আমার সামনে দাঁড়িয়ে! তিনি পুলিশদের একটু বকাঝকা করে আমাকে লিফটে চাপিয়ে নিয়ে গেলেন তাঁর চেম্বারে। কুশল বিনিময়ের পর তিনি বললেন,আপনার আশ্রমের কথা আমি শুনেছি, তার জন্য যদি কিছু করতে পারি তাহলে ভালো লাগবে।

আমার তখন একটু টানাটানি চলছিল বুঝলে। কয়েকটি যন্ত্র ও কাঁচামালের অভাবে যেটা করতে চাইছিলাম, সেটা ঠিক করতে পারছিলাম না। তো,আমি হিসাব করে বললাম যদি পারো তবে আমাকে আজকের মধ্যেই ছ’হাজার টাকা হাওলাতের ব্যবস্থা করে দাও। আমাকে কিন্তু বিকেলের কাটোয়া লোকাল ধরে ফিরতে হবে।

মুখ্যমন্ত্রী বললেন,আপনি অন্য কিছু বললে, আমার হাতে ছিল এরকম কিছু…  তারপর তিনি একটু ভেবে নিয়ে ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার এমডি সেনশর্মা সাহেবকে জরুরি তলব করে এখুনি একবার রাইটার্সে এসে দেখা করার জন্য বললেন। খানিক পরে সেনশর্মা সাহেব এসে সবশুনে টাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে বললেন। মুখ্যমন্ত্রী বললেন, ওনার যে আজই লাগবে! সেনশর্মা সাহেব বললেন চিন্তা করবেন না আমি সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

বুঝলে,এভাবে সেই ছ’হাজার টাকা পাওয়ার পর আর ফিরে দেখতে হয়নি। আশ্রম দাঁড়িয়ে গেল। কত লোকের কাজ হলো। আমাদের উৎপাদিত মসলিনের চাহিদা আছে কিন্তু কোয়ালিটির সঙ্গে আপোষ করা যায় না। এ এমন জিনিস চাইলেও কোয়ালিটি ঠিক রেখে যার উৎপাদন ইচ্ছে মতন বাড়ানো যায় না। তা নাহলে এতদিন ধরে জাপান আমাদের ক্রেতা হয়ে থাকতো না।

আধিকারিক এক মনে গিলছিলেন কমল বাবুর কথা। পরের প্রশ্ন কি করবেন বলে ঠিক করেছিলেন, সব গুলিয়ে যায় তার। তারমধ্যেও তিনি প্রশ্ন করলেন,

– আচ্ছা মসলিন তৈরিতে কি পরিবেশের কোনো প্রভাব আছে।

– একদম আছে। একটু জলাবাতাস,আর্দ্রতা যা বাংলাদেশের আবহাওয়াতেই পাওয়া যায় তা মসলিনের সুতোকে মজবুত করতে সাহায্য করে। ভাগীরথী নদীর তীরে এই পরিবেশে এই যে আশ্রম গড়ে তুলেছি সেটাও একটা কারণ।

মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধায় নত হয়ে আসে আধিকারিকের মাথা।এই মানুষগুলির জন্যই আজ আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামে জয়ী হয়েছি, অথচ ক’জন জানেন তাঁর অবদান। তিনি আবারও তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে, আবার আসবেন জানিয়ে বিদায় নিলেন যখন,তখন ভাগীরথী  নদীর বুকে সূর্য অস্ত যাচ্ছে।সোনালি জলের বুকে অজস্র স্মৃতি ভেসে গিয়ে এখনই আঁধার নেমে আসবে পৃথিবীতে, তবুও কমল ভট্টাচার্যর মতো মানুষেরা জেগে থাকেন, জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করেন আমাদের। কিন্তু আমরা কি দিনদিন আরও বেশি করে  ঘুমের কোলে ঢলে পড়ছি না! আকাশে বিস্ময়চিহ্নের মত নক্ষত্ররা প্রকাশিত হয় একে একে।

(গল্প সূত্রঃ দীপক ঘোষ, প্রাক্তন জেলা আধিকারিক, খাদি ও গ্রামোদ্যোগ বিভাগ।)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত