| 12 জুলাই 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: সতী । রোহিণী ধর্মপাল

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট
মহর্ষি স্থুলকেশের আশ্রমটি জমজমাট। বিদ্যার্থীরা তো আছেই। আছে আশ্রমকন্যারা। আর সমমনা আরও মুনিরা। সেখানে সকাল সন্ধ্যা হোম হতেই থাকে। বড় ছেলেরা আশ্রমের একটি কোণে সমিধের স্তূপ তৈরি রাখে। গোশালার গরু দুয়ে বড় বড় বালতি ভর্তি করে রাখে মেয়েরা। সেই দুধ অর্ধেক আলাদা করে ফোটানো হয়। টগবগ করে সেই দুধ ফুটে আরও অর্ধেক হয়। ঘন হয়ে যাওয়ার পর সেই দুধ তুলে রাখা হয় রাতের জন্য। সবার পাতে পাতে পড়ে এক বাটি সেই সরভর্তি মধুর মতো ঘন দুধ। আর বাকি অর্ধেকটা দুধের সর তুলে তোলে ঘি তোলা হয়। মস্ত বড় বড় লোহার কড়াইতে যখন ঘি তৈরি হয়, সেই গন্ধেই ছোটদের খিদে পেয়ে যায়। আর মুখ জলে ভরে ওঠে ঘিয়ের চাঁচি ভাতের পাতে পাবে বলে। সেই চাঁদরঙা ঘি দিয়ে যেমন তৈরি হয় নানা মিষ্টান্ন, তেমন সেই ঘিই আবার কাজে লাগে হোমাগ্নিতে আহুতি হিসেবে। আর সেই ঘি আগুনে পড়ার পর আগুনটি এমন হু হু করে জ্বলে ওঠে যেন স্বয়ং অগ্নিদেব ঘিয়ের স্বাদ নিতে উতলা হয়ে উঠেছেন।
 আশ্রম জেগে ওঠে শ্যামাপাখির ডাকে। তারপরেই কচিকাঁচাদের হইহইতে। মহর্ষি স্থুলকেশ আর তাঁর সহধর্মিনী আত্রেয়ী বড় ভালোবাসেন ছোটদের। সবথেকে বড় দুজনের প্রশ্রয় পেয়ে তাই ছোট ছেলেমেয়েরা একটু দুরন্ত বেশি। এই সরসর করে গাছে উঠে পড়ে ফল পাড়ছে, এই আশ্রমের হরিণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে, এই বাছুরদের সরিয়ে গরুর বাঁটে মুখ দিয়ে চোঁ করে দুধ খেয়ে নিচ্ছে; এই এখানে, পরক্ষণেই আরেক খানে। শুধু দুটি সময় তারা শান্ত। যেদিন আত্রেয়ী মা তাদের নিয়ে গান শেখাতে বসেন, ওরা চুপ করে সমস্ত মনের কানটি পেতে সেই অনির্বচনীয় গলাটি শুনতে থাকে। চেষ্টা করে সেই সুরের সঙ্গে গলা মেলাতে। আর সম্মিলিত সেই সুরের জাদুতে পুরো আশ্রম বিভোর হয়ে যায়। যে যার ঘরে বসে শুনতে থাকে সেই সুরের অনুরণন। হোম করছেন যাঁরা, সেদিন তাঁদের মন আরও একীভূত হয়ে যায়। গান শেখা শেষ হলে সেদিন যেন আর কিছু করার ক্ষমতা থাকে না কারুর। আশ্রমের পশুপাখিরাও ঘুমিয়ে পড়ে। গভীরভাবে।
 আর ওরা চুপ করে থাকে,   যেদিন মহর্ষি স্বয়ং ছোটদের নিয়ে হোম করতে বসেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে পরিবেশ ছোটদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী শিক্ষার পথ তাতে প্রশস্ত হয়। ওই যে খানিকটা সময় স্থির হয়ে বসা,  একটু নিজের মনে ভাবার অভ্যাস, ওই যে হোমের ঘি-কপ্পুর-চন্দন মেশানো গন্ধটা, গম্ভীর অথচ সুললিত মন্ত্রোচ্চারণ, ছন্দতাললয় মিলিয়ে উচ্চারণ ওদের ভেতর থেকে শান্ত করে তুলতে সাহায্য করবে। সত্যিই হয়ও তাই। হোমশেষে রাতের আহারের সময় সেই সেই দিনগুলি পাকশাল নীরব থাকে। সবাই ধীরে আসে, আসনটি পেতে বসে, চুপটি করে খেয়ে, পাতাটি গুটিয়ে, আসনটি ভাঁজ করে কুটিরে ফিরে শুয়ে পড়ে। আর মনটা কেমন ভরে থাকে। পরিষ্কার ভাবে সবাই ওরা ভাবতে না পারলেও কেমন যেন মনে হয় এই বিশ্বের সঙ্গে ওরাও জুড়ে আছে। ওদেরও কিছু করার আছে। কেউ কম নয়। কেউ অবহেলার নয়।
 পুরো আশ্রমের সবাই তাই খুব আনন্দে দিন কাটান। মহর্ষি আর তাঁর পত্নী সবার প্রতি সমদৃষ্টি সমস্নেহ রেখে চলেন। শুধু একটাই দুঃখ তাঁদের। এত শিশু ভালোবাসেন দুজনেই। অথচ তাঁদের সন্তান নেই। এই নিয়ে কাকেই বা বলবেন। তাই নিজেদের দুঃখ নিজেদের মনে রেখেই সব কিছু করে চলেন দুজনে। মনে করে নেন যে আশ্রমের সবাই, গাছপালা পশুপাখিরাও তাঁদের সন্তানসম। তবু মাঝে মাঝে বুকের ভেতর কেমন ফাঁকা থাকে।
মেনকা। অপরূপ সুন্দরী এই অপ্সরা। দেবরাজ ইন্দ্রের সবচেয়ে পছন্দের অপ্সরা হলেন উর্বশী। তারপরেই মেনকা। যত দুর্জয় তপস্যা করা মুনিঋষিদের ধ্যান ভাঙাতে এই দুজনেরই ডাক পড়ে বেশি। বেশিরভাগ মুনিই বৃদ্ধ হন। ফোকলা মুখে, মস্ত খরখরে দাড়িতে, কাদামাটি লাগা শরীরে তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়েন অপ্সরাদের সুগন্ধি, কোমল, আদুরে শরীরে। কিভাবে একটি নারীকে জাগাতে হয়, কিভাবে তাকে পরিতৃপ্ত করতে হয়, অধিকাংশই জানেন না। তাই উর্বশী মেনকাদের ভাগ্যে সত্যিকারের ভালোবাসা কমই জোটে। অপ্সরাদের পছন্দ রাজাদের। অথবা গন্ধর্বদের। তাঁদের মতোই গন্ধর্বরা নাচ গান বাদ্য জানেন, বোঝেন। নিজের শরীরকে কীভাবে সুন্দর রাখা যায়, কেমন করে রমণ করলে নারীশরীরেও তৃপ্তি আসে, সেসব কলাকৌশল তাঁদের ভালো করেই জানা। তাই ফাঁক পেলেই মেনকা এবং অন্যান্য অপ্সরারা গন্ধর্বদের সঙ্গে মেতে ওঠেন। কটা দিন তো দেবতাদের আদেশ বা বুড়ো বুড়ো ঋষিমুনিদের মন ঘোরানোর থেকে রেহাই! তা এইভাবেই একবার মেনকা গন্ধর্বদের প্রধান বিশ্বাবসুর প্রেমে পড়লেন। সে ঘোর প্রেম। এঁকে ছাড়া ওঁর যেন চলে না! মেনকার অঙ্গসৌষ্ঠব দেখে মুগ্ধ বিশ্বাবসু। আবার বিশ্বাবসুর পাখোয়াজ বাদনে বিস্মিত মেনকা। তাঁর পা যেন আপনি নেচে ওঠে, যখন বিশ্বাবসু বোল তোলেন বাদ্যে। দুই সুরপিপাসু সৌন্দর্য্য পিপাসু নারী পুরুষের মিলনে জন্ম নিল এক কন্যা। সদ্যোজাত শিশুর চোখধাঁধানো সৌন্দর্য্য দেখে অবাক হতে হয়। 
“এই মেয়েকে নিয়ে কী করা যায়”? মেনকা আকুল হয়ে প্রশ্ন করেন বিশ্বাবসুকে। “এখানে থাকলে তো অপ্সরার জীবন বেছে নিতে হবে। এই মেয়েকে আমি স্বর্গে রাখতে চাই না কিছুতেই”।
“দাঁড়াও মেনকা। একটু ভাবতে দাও আমায়। এখানে রাখবে না বলে যেখানে সেখানে তো ফেলে আসা যায় না! এমন আশ্রয় খুঁজতে হবে, যেখানে ওর কোনরকম অযত্ন হবে না। একটা সুন্দর জীবন যাতে ও পায়, সেই ব্যবস্থা দেখতে হবে। তাড়াহুড়ো কোরো না। আমাকে একটু খোঁজ নিতে দাও।”
সেইদিনই বিশ্বাবসুর চরেরা খোঁজ শুরু করল। পৃথিবীতে কে এমন আছেন যাঁরা সন্তানহীন? যাঁদের মনে ছোটদের প্রতি ভালোবাসা আছে? বেশি সময় লাগল না। সাতদিনের মধ্যেই বিশ্বাবসুর কাছে মহর্ষি স্থুলকেশ আর আত্রেয়ীর কথা জানালো চরেরা।
 একদিন ভোরেরও আগে, সবে পূবদিকের ঘন আঁধার কেটে একটু যেন গোলাপী আলোর আভাসটুকু দেখা যাচ্ছে, এমন সময়, মেয়েকে সুন্দর করে কাপড় পরিয়ে, মেনকা নেমে এলেন স্থুলকেশের আশ্রমের কাছে। আশ্রমের সবাই তখনও ঘুমিয়ে। একটি বিরাট অশ্বত্থ গাছের তলায়, গালিচার মতো নরম সবুজ ঘাসের ওপর একটি আসন পেতে মেয়েকে শুইয়ে দিলেন। স্নেহভরা চোখে আদর মেখে দিলেন তার সর্বাঙ্গে। 
আত্রেয়ী ঘুমিয়ে ছিলেন। আগের দিন একটু বেশি ক্লান্ত ছিলেন তিনি। ছোটদের জন্য ক্ষীরের নাড়ু তৈরি করেছেন সারাটি দুপুর ধরে। সে কী সোজা খাটুনি! ঘন ক্ষীর করে, হাতে একটু ঘি লাগিয়ে এলাচ গুঁড়ো আর কপ্পুর মিশিয়ে একটা একটা করে নাড়ু পাকানো। জানেন তিনি, যে বড়রা মুখে না বললেও আশা করে থাকবেই। একটি রাশ নাড়ু পাকিয়ে যখন উঠলেন, কোমরটি টনটন করেছিল। বয়স হচ্ছে কিনা! সেদিন পাকশালার পরিবেশনের ভার বড়দের দিয়ে তিনি চলে এসেছিলেন কুটিরে। শীতলপাটি বিছিয়ে শুতে না শুতে ঘুম। কখন মহর্ষি এসেছেন, পাশে শুয়েছেন, কোনও কিছুই টের পাননি আর।
আগের দিন তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বলেই বোধহয় একটু আগেই ঘুম ভেঙে গেল আত্রেয়ীর। আর কেমন যেন একটা হাল্কা আওয়াজ পেলেন উঠেই। কেউ কি হাসছে? এতো একদম ছোট্ট শিশুর খলবলে হাসির শব্দ! এত ছোট শিশু তো এখন আশ্রমে নেই! “ভুল শুনছি কি? নাঃ! এতো একেবারে স্পষ্ট ধ্বনি!” 
স্থুলকেশকে জাগিয়ে দিলেন তিনি। 
“শুনছেন, একটু উঠুন। একটা ছোট্ট শিশুর হাসির আওয়াজ পাচ্ছি আমি। চলুন না আমার সঙ্গে। একটু দেখে আসি কোথা থেকে আসছে এই শব্দ?”
কুটির থেকে বাইরে বেরিয়েই দুজনে থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপরেই আত্রেয়ী ছুটে গেলেন অশত্থতলার দিকে। লাল টুকটুকে কাপড়ে মোড়া লালচে আভাযুক্ত এক সদ্যোজাত শিশু। আপন মনেই হাতপা নাড়ছে আর নিদন্ত মুখে খিলখিল করে হেসে উঠছে।
আলুথালু হেসে শিশুটিকে কোলে তুলে নিলেন আত্রেয়ী। স্থুলকেশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ থেকে এই শিশু আমার। এত সুন্দর এই কন্যাশিশু, আমি নাম দিলাম প্রমদ্বরা। এই কন্যাকে বরণ করে নিলাম আমি। আপনার আপত্তি থাকলেও শুনব না।”
মৃদু হেসে বললেন মহর্ষি, “আমার আপত্তি থাকবে কেন? বরং আমাদের এতদিনের স্বপ্ন আজ পূর্ণ হল ঈশ্বরের কৃপায়। চল, সবাইকে সুখবরটি জানাই।”
 এইভাবেই মেনকাপুত্রী বড় যত্নে স্নেহে বড় হয়ে উঠতে থাকল আত্রেয়ী আর স্থুলকেশের আশ্রমে। যত দুষ্টু, ততো মেধা মেয়েটির। আর সেই সঙ্গে গানের গলাটি। আত্রেয়ীর মন ভরে যায় যখন প্রমদ্বরা সুর ধরে। সেই সুর যেন নিস্তব্ধ প্রকৃতিতে দূর থেকে আসা ঝর্ণার জলের আওয়াজ। যেন বিরহী কোকিল কোকিলাকে ডাকছে। যেন বর্ষার মেঘে বিদ্যুতের ঝলক। বাবার কাছে পাঠ নিতে বসে সেই মেয়ে শান্ত। বাবা যখন স্তোত্র পাঠ করেন, সেও সেই পাঠে গলা মেলায়।  
পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণম্ উদচ্যতে
পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে। ।।
ও-ও ভরা এ-ও ভরা
উপচে ভরা পড়ছে ভরা একি!
ভরার থেকে ভরা নিলে ভরা-ই থাকে বাকি!
রাতে প্রমদ্বরা মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “মা আজ তোমার কথা পড়লাম।” আত্রেয়ী চমকে ওঠেন। “সেকী রে! উপনিষদ পড়তে গিয়ে আমার কথা কোথায় পেলি”! 
“কেন মা? ওই যে, ভরার থেকে ভরা নিলে ভরাই থাকে বাকি! এতো তোমারই কথা। এত আদর দাও সবাইকে, আমাকে, কই, কিছু তো খালি হয় না। তোমার ভেতর তো সবসময় ভরাই থাকে মা গো”। মেয়ের কথা শুনে গভীর আনন্দে মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন আত্রেয়ী।
আবার দুষ্টুমিতেও সেরা যেন সেই মেয়ে। সমবয়সী ছেলেমেয়েদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়নো, গাছে ওঠা, কাঠ কুড়নো, গাছ ঝাঁকিয়ে ফুল পাড়া, রাতের বেলা তারা দেখা, অমাবস্যার অন্ধকারে চুপিচুপি আগুন জ্বেলে বসে থাকা, সব কিছুতেই প্রমদ্বরা সবার আগে।
এইরকমই একদিন প্রমদ্বরা বন্ধুদের সঙ্গে জঙ্গলে গেছে, কী মনে হতে বন্ধুদের ছেড়ে খানিক এগিয়ে গেছে। খানিক দূর গিয়ে একটা অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য দেখে থমকে গেল সে। যদিও তপোবনের মধ্যে এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখে। কিন্তু বনেও! বনের হরিণও এমন শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে মানুষের হাতে খায়! যতক্ষণ না খাওয়াটি শেষ হল, সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। খাওয়া শেষ হওয়ার পর যে তরুণ মুনিকুমার খাওয়াচ্ছিল, সে উঠে দাঁড়াল। হরিণটির পিঠে হাত বুলিয়ে পেছন ফিরতেই মুখোমুখি হল অপরূপ প্রমদ্বরার। দুজনেই স্তব্ধ দুজনকে দেখেতে থাকে। কিছুক্ষণ পর স্তব্ধতা ভেঙে প্রমদ্বরাই জিজ্ঞেস করল তরুণকে, “তুমি কে? এই বনে আগে তো দেখিনি! তোমার মা বাবার নাম কী? এখানে এলেই বা কী করে?”
স্মিত হাসল সেই তরুণ, “একসঙ্গে এতগুলি প্রশ্ন? আচ্ছা। এক এক করে উত্তর দিচ্ছি। আমি রুরু। আমার মা সুকন্যা। বাবা চ্যবন মুনি। আমরা তো এখানে থাকি না। তাই আগে দেখনি। আমার মা পাঠিয়েছেন আমাকে মহর্ষি স্থুলকেশের আশ্রমে। তাঁর সহধর্মিনী আত্রেয়ীদেবীর সঙ্গে তাঁর ভালো পরিচয় ছিল। তাঁর কুশল জানতেই আমি এসেছি।”
“তুমি মায়ের কাছে এসেছ! কী দারুণ মজা! চলো চলো। আমিই তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি।” এই বলে রুরুর হাত ধরে ছুটতে শুরু করল প্রমদ্বরা। আত্রেয়ী তখন পাকশালে সেদিনের রান্নাবান্না বোঝাচ্ছিলেন। সেইখানে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল সে, “মা। এ রুরু। তোমার বন্ধু সুকন্যা দেবীর ছেলে। তোমার খোঁজখবর নিতে এসেছে।” আত্রেয়ী অবাক হয়ে দেখলেন, উত্তেজিত মেয়ের ঘর্মাক্ত মুখ। সঙ্গে সৌম্যকান্তি এক তরুণ। ছোটার ফলে সেও ঘর্মাক্ত। 
“তুই কি পাগল হলি! এইরকম ছুটিয়ে অতিথিকে নিয়ে আসতে হয়! ছি ছি! তুমি কিছু মনে করো না বাবা। আমার মেয়েটি একটু অদ্ভুত। তুমি বসো তো। ও বসুধা, শিগগিরই একটু লেবু দিয়ে সরবত দে তো আমাদের এই কিশোর অতিথকে। বসো বাবা। বসো।”
সন্ধ্যা নেমেছে। আকাশে একটি দুটি করে তারা ফুটে উঠছে। আত্রেয়ী তাঁর কুটিরের সামনে একটি মস্ত বড় পাটি বিছিয়েছেন। সেখানে বসে আছে রুরু, প্রমদ্বরা এবং আশ্রমের আরো অনেকে। আত্রেয়ীআর  রুরু কথা বলছেন। বাকিরা শুনছে। মাঝে মাঝে তারাও নানা প্রশ্ন করছেন। এমন সময় মহর্ষি এলেন। রুরু উঠে তাঁকে প্রণাম করল। প্রমদ্বরা উত্তেজিত কন্ঠে বলল, “বাবা জানো, রুরু বনের হরিণদেরও বশ করতে পারে! ওরাও চুপ করে ওর হাতে খায়। আমি নিজে দেখেছি”! আশ্রমের এক বৃদ্ধা বললেন, “বনের হরিণ চুপ করতে পারে! তবে তোকে চুপ করানো কারুর সাধ্য নয়।” সবাই হেসে উঠলেন। স্থুলকেশ মেয়ের মাথায় হাতটি রেখে বললেন, “একবার পূরবী রাগটা ধর্ তো মা!” যেই মুহূর্তে প্রমদ্বরা কোমলে ধৈবতটি ধরল, রুরুর মনে হল তার সমস্ত শরীর আর মনটা যেন ঠাণ্ডা হয়ে গেল। এমন হতে পারে সঙ্গীত! মনের সঙ্গে শরীরেও অনুভব করা যায়! আর এই চঞ্চল মেয়েটি এমন সম্মোহক সুর ধরতে পারে!!
যে কটা দিন রুরু আশ্রমে রইল, প্রমদ্বরা তার পিছু পিছু ঘুরতে লাগলো। কী যেন একটা অদম্য অমোঘ আকর্ষণ! রুরু একটু একটু লজ্জা পাচ্ছিল। কিন্তু মনটা সুখে আনন্দে ভরে উঠছিল। এই মেয়েটি কী আশ্চর্য! মনটা কী অদ্ভুত সরল। যা ওর মনে হয়, তা করতে বা বলতে একটুও ওর দ্বিধা নেই। সবার সামনে নিঃসঙ্কোচে ও রুরুর হাত ধরে। দূর থেকে রুরুকে ডাকে। রু বলে। রুউউউউউউউ……. সেই ডাক যেন আলাদাই সঙ্গীত। রুরুর বুকের ভেতর গুড়গুড় করে। 
পুরো সাতদিন রুরু সেই আশ্রমে থাকল। সবাই ছেলেটিকে ভালোবেসে ফেলেছে ওই কদিনে। এবার যাওয়ার পালা। রুরুর মনটা কেমন ফাঁকা ঠেকছে। এই সাতদিনে ও নিজেও যেন এই আশ্রমের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে গেছে। আর প্রমদ্বরা! ওকে না দেখে থাকার কথা ভাবলেই বুকটা ভারী হয়ে যাচ্ছে। চাপ লাগছে রীতিমত। অথচ ওকে ফিরতেই হবে। মা বাবা অপেক্ষা করে থাকবেন। আর যেতে তো হবেই আজ বা কাল!
যেদিন চলে যাচ্ছে রুরু, আশ্রমে সকলের মুখ ভার। প্রমদ্বরার চোখ ছলছল। ছোট বাচ্চারাও সেদিন কেমন যেন চুপ করে গেছে। রুরুদাদার সঙ্গে তাদের তো কিছু কম ভাব হয়নি। আত্রেয়ী রুরুকে যাওয়ার পথের জন্য খাবারের ছাঁদা বেঁধে দিলেন যত্ন করে। আর বললেন, “ভেতরে সুকন্যার জন্য একটা পত্র আছে দিস।” স্থূলকেশ রুরুর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন “শিগগিরই আবার দেখা হবে”। নিজের মনও তখন এতটাই খারাপ যে মহর্ষির বাক্যটি পুরোপুরি অনুধাবনও করতে পারল না রুরু। সবাইকে বিদায় জানিয়ে পেছনের দিকে একবারও না তাকিয়ে হাঁটা দিল সামনের দিকে।
 টানা তিন দিন তিন রাত্তির পর পৌঁছল বাবা মায়ের কাছে। সুকন্যা দূর থেকে রুরুকে দেখেই বুঝলেন কিছু একটা হয়েছে। ও কী ওখানে যত্ন পায় নি! কোনও কারণে অভিমান করেছে নাকি! এমন কিছু তো হওয়ার কথা নয়! তবে– এইসব ভাবতে ভাবতেই রুরু কাছে চলে এলো। ক্লান্ত স্বরে দাওয়ায় বসে বলল, “মা খেতে দাও। বড্ড খিদে পেয়েছে। আর এই পুঁটলিতে আত্রেয়ীমার দেওয়া খাবার আর একটা চিঠি আছে তোমার জন্য।” “সেকী রে! তোর জন্য খাবার করে দিয়েছেন আত্রেয়ী, তুই খাসনি? কী খেলি তবে বাছা!”
সুকন্যার ইশারায় পাকশাল থেকে গরম দুধ এলো। সঙ্গে ধামা করে মুড়ি নারকেলের নাড়ু আর গুড়। রুরু যতক্ষণ খাচ্ছে, সুকন্যা বন্ধুর দেওয়া পুঁটুলি খুললেন। দেখলেন যত্ন করে আত্রেয়ী রুরুর জন্য খাবার সাজিয়ে দিয়েছে। ঘিয়ে ভাজা শুকনো মালপোয়া, চিঁড়েভাজা বাদাম দিয়ে, ডালের পুর দেওয়া কচুরি, মধু দিয়ে মাখা যবচূর্ণ। আলাদা আলাদা করে। আর সবার শেষে একটা চিঠি। খাবারগুলি পাকশালে রেখে বন্ধুর চিঠি নিয়ে সুকন্যা সোজা গেলেন চ্যবনের কাছে। একসঙ্গেই পড়বেন চিঠিটা। চ্যবন মুনি ধ্যানে বসেছিলেন। অপেক্ষা করলেন সুকন্যা। ধ্যান শেষে চোখ খুলে স্ত্রীকে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার সুকন্যা? আমাদের রুরু ফিরেছে? কী সংবাদ এনেছে ? ওকে ডাকো। ওর মুখ থেকেই শুনব।”
“একটু ধৈর্য্য ধরুন স্বামী। বন্ধু আত্রেয়ী চিঠি পাঠিয়েছেন। আমি আপনের সামনেই পড়তে চাই। তারপর রুরুকে ডাকব।”
সখা সুকন্যা, 
সবার আগে জড়িয়ে ধরে তোমাকে আলিঙ্গন। কত কতদিন পর তোমার খবর পেলাম। ঠিক তোমার মতো দেখতে তোমার পুত্রের কাছে। চ্যবনদাদাকে আমার প্রণাম। স্থূলকেশ দাদার পক্ষ থেকে তোমাদের সবাইকে আশীর্বাদ। রুরুর কাছে আমাদের সকলের খবর তো বিস্তারিত জানবেই। কিন্তু একটি বিশেষ কথা, যা হয়ত রুরু বলতে লজ্জা পাবে, সেটি বলার জন্যই এই চিঠির অবতারণা। আমাদের কন্যা প্রমদ্বরা গুণে রূপে বড় ভালো মেয়ে। রুরুকে ওর বড্ড পছন্দ হয়েছে। আর রুরুর হাবভাব দেখে মনে হয়েছে ওও প্রেমে পড়েছে আমাদের মেয়ের। এখন তোমাদের আপত্তি না থাকলে এই প্রেম পরিণতি পাক, এই আমাদের ইচ্ছে। এবার তোমরা বলো। দ্রুত উত্তরের আশায় রইলাম। 
ইতি 
আত্রেয়ী। তোমাদের চির শুভাকাঙ্খী।
“এই জন্যই রুরু এমন উদ্ভ্রান্ত। এইবার বুঝলাম।” হেসে বলেন সুকন্যা। “ছেলে আমাদের প্রেমে পড়েছে গো। বলতে পারছে না লজ্জায়। আমরাও যে ভালোবেসেছি দুজনকে কত, তা কি বোঝে না ছেলেটা? ওকে ডাকছি। তুমিই বলো। লজ্জা না পেয়ে ওর মনের কথাটা স্পষ্ট জানাতে। তারপর এই চিঠির উত্তর হয়ে আমরাই যাই চলো।”
 রুরুকে ডাক পাঠানো হল। রুরু এসে মা বাবাকে প্রণাম করে বসল। চ্যবন জিজ্ঞেস করলেন, বাবা, তুমি ক্লান্ত জানি। তবু আমাদের একটু মহর্ষির কথা, তাঁর সহধর্মিনীর কথা জানাও। আশ্রম কেমন দেখলে, সেসব কথা বলো। আমরা উৎসুক হয়ে আছি।
রুরু বলতে শুরু করল আশ্রমের কথা দিয়ে, কিন্তু নিজের অজান্তেই কখন যে চলে গেল প্রমদ্বরার কথায়, নিজেই বুঝতে পারল না। যার কথাই হচ্ছে, প্রমদ্বরার কথা জুড়ে যাচ্ছে। আর যখন গানের কথা শুরু হল, রুরুর ক্লান্তি কোথায় উধাও হয়ে গেল। অনেকক্ষণ পর যখন ওর খেয়াল হল মা বাবা মৃদু মৃদু হাসছেন, তখন ও থামল। সুকন্যা বললেন, “প্রমদ্বরা দেখছি বড্ড গুণী মেয়ে! তোর কথায় তো শুধু ওকেই চিনলাম!” চ্যবন বললেন একটু গম্ভীর হয়ে, “রুরু, তোমার আত্রেয়ী মাসী একটি চিঠি দিয়েছেন আমাদের। তাতে তোমাদের বিয়ের কথা বলেছেন। তুমি কি তাতে রাজি? তুমি জানো তো, একজন মানুষের দায়িত্ব গ্রহণ করা সহজ নয়।”
রুরু উত্তর দেবে কী! ওর সমস্ত মন রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। যে কথাটি ভেবে ভেবে ও  দিশেহারা হয়ে উঠেছিল, সেই মনের কথাটি আত্রেয়ীমাসী জেনে গেলেন! আর মা বাবাও দিব্যি রাজি! বড়রা এত ভালো হন! ও খানিক লজ্জায় আর আনন্দের আতিশয্যে মাকে জড়িয়ে ধরল! সুকন্যা বললেন স্বামীকে, “আমাদের ছেলেটি এখনও শিশুই রয়ে গেল! কেমন লজ্জা পাচ্ছে দেখুন!”
চ্যবন বললেন, “এখনই আমাদের উত্তর পাঠিয়ে দাও আশ্রমে। এখানেও সবাইকে জানিয়ে দাও। তোমার বন্ধুকে বলো একটি দিন স্থির করতে। দিনটি পূর্ণিমা হলে বেশ হয়। জোছনার আলোতে দুটি হৃদয়ের মিলন হোক। আমরা সবাই যাব ওদের আশ্রমে।”
সুকুন্যা তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালেন। প্রচুর কাজ সামনে। বন্ধুকে চিঠি লেখা। আশ্রমের সবার মিষ্টির ব্যবস্থা। বিয়ের দিনের জন্য মিষ্টান্ন প্রস্তুত করা। প্রমদ্বরার জন্য, আত্রেয়ীর জন্য, স্থূলকেশের জন্য, আশ্রমের সকলের জন্য উপহার স্থির করা। রুরুর কুটিরটিকে নতুন করে লেপন করে আলপনা দেওয়ানো। পুরো আশ্রমটিকে আরও একবার পরিষ্কার করানো। কয়েকদিন আগেই তাঁরা যাবেন, সেইমতো পেটিকা গোছানো। এক মুহূর্ত আর বসে থাকার সময় নেই।
 মহর্ষি স্থুলকেশের আশ্রম জমজমাট একেবারে। আগামী পূর্ণিমা, যার আর মাত্র চোদ্দ দিন বাকি, সকলের আদরের প্রমদ্বরা আর রুরুর বিয়ে। সবার মনে আনন্দ। আশ্রমের হাওয়ায় আনন্দ। পাতার সবুজ যেন আরও সবুজ, আকাশের নীল যেন আরও নীল, জল যেন আরও স্বচ্ছ, বাতাসে যেন বসন্তের গন্ধ। আশ্রমের বড় ছেলেরা মেয়েদের সঙ্গে মায়েদের সঙ্গে পাকশালে সমানভাবে হাত লাগিয়েছে। কুটনো কোটা মশলা বাটা দুধ ফোটানো এতজনের জন্য। দুই আশ্রম এক জায়গায়।
 সবার সঙ্গে সঙ্গে রুরু আর প্রমদ্বরাও মহানন্দে কাজ করে বেড়াচ্ছে। যেন বিয়ে তো নয়, সবাই মিলে একটা উৎসব। প্রমদ্বরা আবার খুব সুন্দর ফুলপাতা দিয়ে আলপনা দিতে পারে। আত্রেয়ী বলেই রেখেছেন, “বিয়ের মণ্ডপের আলপনাটা তুইই দিস রে। আগের দিন বন্ধুরা মিলে ফুল পাতা নিয়ে আসিস।” সেই মতো পূর্ণিমার আগের সকালে প্রমদ্বরা বন্ধুদের নিয়ে মহা উৎসাহে চলে গেল জঙ্গলের ভেতর। জঙ্গলের এক জায়গায় ছোট ছোট সবুজ পাতার ঝোপ দেখেছে, যার মধ্যে লাল সাদা ছিট ছিট দাগ। ঠিক যেন রক্তচন্দনের ফোঁটা। ওই পাতাগুলি দিয়ে যজ্ঞবেদীর চারপাশটি সাজাবে ও। আর মাঝখানে মাঝখানে দেবে শ্বেতকরবী আর রক্তকরবী ফুলের ছোট ছোট গুচ্ছ। আলো হয়ে যাবে হোমের জায়গাটা।
“প্রমদ্বরা তো অনেকক্ষণ বেরিয়েছে ! না খেয়ে গেছে! এখনও তো কই এলো না!” সুকন্যার উদ্বেগ ভরা কন্ঠ শুনে হেসে ফেললেন আত্রেয়ী।
 “আরে! আমার মেয়েটা একটু পাগল আছে। দেখ গে ফুলপাতা যোগাড় করতে গিয়ে জঙ্গলের কোন ভেতরে চলে গেছে! সেখানে আবার নদীতে হয়ত ঝাঁপাই জুড়েছে সবাই মিলে। এতো ভেব না। ওরা ঠিক চলে আসবে।” এই বলে, নিজের ঘাড়েও তো প্রচুর কাজ–কাল বিয়ে, অতিথরা সবাই প্রায় এসে গেছেন, তাঁদের দেখাশোনা করা, রান্নাবান্নার সবটা দেখা, আশ্রমের প্রতিদিনের কাজ তো আছেই, আত্রেয়ী পা চালিয়ে এগোলেন।
রুরু কাছেই ছিল। প্রমদ্বরা ওকে নিয়ে যায় নি বলে একটু অভিমান করেই বসে ছিল। মায়ের গলার স্বরে চিন্তা টের পেয়ে তড়িতবেগে এসে মাকে বলল, 
“মা, আমি তবে একটু দেখে আসি?”
“সে যা! কিন্তু তুই জানবি কী করে যে ওরা কোন দিকটা গেছে? আবার তোকে খুঁজতে লোক পাঠাতে না হয়!”
“আমি জানি ওরা কোন দিকে গেছে। তুমি একটুও ভেব না মা। ওকে নিয়ে আমি এক প্রহরের মধ্যেই ফিরে আসছি।”
 রুরু জানত প্রমদ্বরা কোন দিকে গেছে। ও দ্রুত পা চালালো। বেশ কিছুটা গিয়ে সবুজের আড়ালে রঙ দেখা গেল। ওই তো প্রমদ্বরার বন্ধুরা! কিন্তু অমন কাঠের মতো সবাই দাঁড়িয়ে কেন? আর এত নীরব কেন? গাছের পাতাটিও যেন নড়ছে না! কী যেন হয়েছে! প্রকৃতিও তার আশ্চর্য নৈঃশব্দ নিয়ে তাই বুঝিয়ে দিচ্ছে! বুকের ভেতর যেন ঢেঁকির পাড় পড়তে লাগল রুরুর! পা ফেলতে গিয়ে কাঁপতে লাগল শরীর! ধীরে ধীরে সামনে গিয়ে দেখল, কালো হয়ে যাওয়া শরীরে শুয়ে। নিথর দেহ। তার চারপাশে সবটাই চুপ, সবকিছুই চুপ। সময় যেন থমকে গেছে। রুরু আস্তে আস্তে হাঁটু ভেঙে ওখানেই বসে পড়ল।
রুরুকে দেখে যেন নড়ে উঠল প্রমদ্বরাকে ঘিরে দাঁড়ানো বন্ধুরা।তাদের মধ্যে একজন ছুটল আশ্রমের দিকে। যতক্ষণে আত্রেয়ী স্থূলকেশ, সুকন্যা চ্যবন এলেন, রুরু ততক্ষণে আর্তনাদ করতে করতে আরও গভীর জঙ্গলে ঢুকে গেছে। প্রতিটি গাছে মাথা ঠুকে ঠুকে বলছে, “আমার ভালোবাসার ধনকে ফিরিয়ে দাও। আমার সব কিছু নিয়ে নাও। কিছু চাই না আমি। প্রমদ্বরাকে ছাড়া আমার জীবন ব্যর্থ। এই অন্ধকার নিয়ে আমি কী করব! ফিরিয়ে দাও। ওকে ফিরিয়ে দাও।”
পুরো জঙ্গলে, আকাশে, বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল সেই বিষণ্ন প্রার্থনা। রোদের তীব্রতা কমে ছায়া নামল চারিদিকে। মেঘেরা জমাট বাঁধল। অদ্ভুত এক আঁধার ঘনিয়ে এল চারদিক জুড়ে। আত্রেয়ী বসে আছেন মেয়ের মাথাটি কোলে নিয়ে। সুকন্যা বন্ধুর পাশে মাটিতেই বসে পড়েছেন। স্থূলকেশ প্রার্থনা করতেও ভুলে গেছেন। সবার মনে শুধু ধ্বনিত হচ্ছে রুরুর কাতর আকুল সেই ডাক।
রুরুর গলা অনুসরণ করে চ্যবন ছেলের কাছে গিয়ে পৌঁছলেন। বললেন, “এসো রুরু। প্রমদ্বরার কাছে এসে তোমার ভালোবাসার কথা বলো। দেখো না, তোমার প্রেম যদি সত্য হয়, তবে অলৌকিক কিছু হতেও তো পারে! এমন উন্মাদ হয়ে ঘুরে বেরিয়ে তো লাভ নেই!”
বাবার কথা শুনে হঠাৎই রুরু কেমন যেন শান্ত হয়ে গেল। 
চ্যবনের পিছুপিছু এসে প্রমদ্বরার হাতটি ধরে বসল। চোখটি বোজা। কী যেন বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছে। বেশ খানিকটা সময় কেটে গেল। তারপর দেখা গেল একজন সুন্দর পোষাক পরিহিত মানুষ ঝোপঝাড় সরিয়ে এগিয়ে আসছেন। “এ কী, কী হয়েছে এখানে? দেখি, দেখি। সরুন তো একটু। দেখতে দিন। আরে, এই মেয়েটিকে তো সাপে কামড়েছে! আর আপনারা সবাই এইভাবে বসে আছেন!” এই বলতে বলতে অচেনা মানুষটি এসে প্রমদ্বরার হাতটি ধরলেন। একটু পরে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, “কেউ কি আপনারা দেখেছেন কোন সাপ কামড়েছে? না চিনলেও যদি বর্ণনা দিতে পারেন?”
একটি মেয়ে, কাঁদতে কাঁদতে চোখটি ফোলা, বলল, “আমি দেখেছি। সাক্ষাৎ গোখরো। মাথায় খড়মের ছাপটি পর্যন্ত দেখেছি। সখীকে কামড়ানোর পর আমিই প্রথম সাপটিকে দেখে চিৎকার করে উঠেছিলাম ‘গোখরো’ ‘গোখরো’ বলে। সেটি শুনেই সখীর দেহটি এলিয়ে পড়ে গেল!”
মানুষটি এবার রুরুর দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বললেন, “তুমি কি এই কন্যাকে ভালোবাসো? কী দিতে পারো এর প্রাণ ফেরানোর বদলে? তোমার আয়ুর অর্ধেক যদি দাও, তবেই একমাত্র এই মেয়েটিকে আমি বাঁচিয়ে দিতে পারি।”
সচকিত হয়ে উঠলেন উপস্থিত সবাই। এ কেমন প্রস্তাব! স্থূলকেশ চ্যবনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “চ্যবন, আপনি রুরুকে চুপ করে থাকতে বলুন। এ কেমন প্রস্তাব! এক শোকে আমরা মূহ্যমান হয়ে আছি! তার ওপর এমন কথা!” চ্যবন একবার তাকালেন সুকন্যার দিকে। তারপর বললেন শান্ত স্বরে, “ঠিক আছে। দেখিনা রুরু কী বলে। সুকন্যার পুত্র রুরু।  প্রেমের মর্যাদা দিতে পারে কিনা, দেখাই যাক না!”
বাবার কথা শুনে রুরু উঠে দাঁড়াল। দৃঢ় স্বরে বলল, “আমি প্রমদ্বরাকে ভালোবাসি। যদি আমার অর্ধেক আয়ু দিয়ে ওকে ফিরিয়ে আনা যায়, তবে এতো সামান্য। আমার সবটুকুই আমি দিয়ে দিতে রাজি।”
রুরুর কথা শুনে মানুষটির মুখে হাসি ফুটল। সামনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমাকে কেউ একটু জল দেবেন?” চ্যবন তাড়াতাড়ি কমণ্ডলুটা এগিয়ে দিলেন। সেখান থেকে একটু জল নিয়ে প্রমদ্বরার মুখেচোখে ছিটিয়ে বললেন, “ওঠো মা। ভয়ের কিছু নেই। তুমি একদম ঠিক আছ। ওঠো।” আর সবার বিস্মিত চোখের সামনে প্রমদ্বরা তার পদ্মপলাশের মতো চোখদুটি ধীরে ধীরে মেলে ধরল।
মানুষটি বুঝলেন সকলেই হতবাক। তিনি নমস্কার জানিয়ে বললেন, “এমন অবাক হবেন না। আমি অলৌকিক শক্তিধারী নই। আমি একজন চিকিৎসক মাত্র। আমার নাম সুশ্রুত।আমি মেয়েটির পায়ে কামড়ের দাগ আর শরীরে লক্ষণ দেখেই বুঝেছিলাম ওকে সাপে কামড়েছে মাত্র। বিষটি ঢালেনি। সাপকে আমরা ক্রুর ভাবি। অথচ সাপও সহজে বিষ ঢালে না। আমরা ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাই। এই মেয়েটিরও তাইই হয়েছিল। গোখরো সাপে কামড়েছে জানার পরেই ভয়ে ওর মনে ছড়িয়ে যায়। ভয় ঈর্ষা লোভ কাম এসব কিছুই আসলে সাপের বিষের চেয়েও মারাত্মক। আমি মেয়েটির জ্ঞান ফিরিয়েছি শুধু। আর কিছুই নয়।”
আনন্দে ততক্ষণে সকলের চোখ আবার ভেজা। আত্রেয়ী আর সুকন্যা হাত জোড় করে কোনও রকমে বললেন, “কাল ওদের দুজনের মিলনোৎসব। আপনি দয়া করে আমাদের আশ্রমে থেকে যাবেন। আপনার আশীর্বাদ ছাড়া ওদের জীবন পরিপূর্ণ হবে না।”
error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত