| 12 জুলাই 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য ভ্রমণ: মার্কিন ভিসা ভ্রমণের দুঃখ সুখ । মাহমুদ হাফিজ

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

সানফ্রানসিস্কো এয়ারপোর্টের টার্মিনাল টু থেকে সিয়াটলের উদ্দেশে আলাস্কা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট নম্বর ৩১৪৮ ছেড়ে যাবে বেলা পৌণে তিনটায়। আড়াই মাস আগে টিকেট কেটে সেই ফ্লাইটের যাত্রীখাতায় নাম তুলে রে্খেছি। এখন বেলা সোয়া বারোটা। হাতে পাক্কা আড়াইঘন্টা। সীমান্তের ‘কাঁটাতার’ অতিক্রম সময়ের ব্যাপার ! খোদা না খাস্তা কানেক্টিং ফ্লাইট যদি মিস করি ! তাড়াহুড়োই্ করছি তাই। কিন্তু জীবনের প্রথম বিমান মিসই হয়ে গেল শেষাবধি। দরজায় দাঁড়ানো পরাক্রান্ত সহিস ঘোড়ার পিঠে আমাদের না চড়িয়েই লাগাম ছুটিয়ে চলে গেছে। ভরঅপরাহ্নে বোর্ডিংগেটে কাকপক্ষীও নেই। টানা চল্লিশঘন্টার ভ্রমণক্লান্ত শরীর ফাঁকা সোফায় এলিয়ে আমি এতোক্ষণ ঘটে যাওয়া ভজঘটের জাবর কাটছি। ভাবছেন- ‘ক্যামনে কী’? তবে শুনুন !

আকাশের অসীম থেকে সানফ্রানসিস্কোর সীমান্ত সসীমে নামি বেলা নয়টা নাগাদ। চাকাওলা লাগেজ আলগোছে টানতে টানতে ইমিগ্রেশন কাউন্টারের দিকে হাঁটি। মার্কিন মুলুকের সীমান্ত সুরক্ষক হচ্ছে ফেডারেল সরকারি সংস্থা ‘কাস্টমস এ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন’-সিবিপি (আমাদের কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ- সিপিবি নয় )। নীল ইউনিফর্ম আর কোমরের বেল্টে গোঁজা স্বয়ংক্রিয় রিভলবারে সিবিপি কর্মকর্তারা কথাবার্তায় চৌকষ। চলনে রোবটীয় গাম্ভীর্যে অটল। একদম অভিজাত সেনাবাহিনীর জাঁদরেল অফিসারদের মতো।

ইমিগ্রেশন হলের প্রবেশমুখ গ্রিণকার্ড ও ভিসাধারী নামে দুটি লাইন রিবনবিভক্ত। আমরা দাঁড়িয়েছি ফিতে টাঙানো ভিসাধারীদের লাইনে। আমার বুকপকেটে মার্কিন প্রবেশের সবুজ সঙ্কেত নেই। ‘আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনকালে সঞ্চয় করিনি’ বলে অভিবাসনেচ্ছু হইনি কোনদিন। লাইনে দাঁড়িয়ে তাই ভাবছি এরকম খাপছাড়া নানা ভাবনা। ভরদুপুরে টার্কিশ এয়ারই শুধু উড়ে এসে এ পোতে নোঙর করেছে। এই মার্কিনী সকালে অন্য কোন উড়োজাহাজের আগমন দেখতে পাইনি । হলঘরে যে শ’ তিনেক আবালবৃদ্ধবণিতা অপেক্ষমান সীমান্ত অতিক্রমের অভিপ্রায়ে; তারা এখানে ‘ইস্তাম্বুলের যাত্রী’।

ইমিগ্রেশন হলে কাউন্টার আশিটির ওপরে। গোটা দশেক কাউন্টার খোলা রেখে তুর্কি দেশ থেকে আগত যাত্রীদের সীমান্তপ্রক্রিয়া সম্পন্নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগে সানফ্রানসিস্কো এয়ারপোর্টেই স্বয়ংক্রিয় মেশিনে ব্যক্তিগত তথ্যের ইনপুট দিয়ে চোখের পলকে পার হয়েছি। করোনা-কোভিড বিশ্বকে এমন করুণাকরুন দিন উপহার দিয়েছে যে, প্রযুক্তিশীর্ষের দেশ আমেরিকাও যন্ত্রকে আপাত: গুডবাই বলে পাশে সরিয়ে রেখেছে। আমরা যেখানে লাইন দিয়েছি, তার অদূরের দেয়ালঘেঁষে  মেশিনের সারি আলস্যে ঝিমোচ্ছে। আগে মানুষের বদলে মেশিন বসেছিল, এখন মেশিনের বদলে মানুষ।


মার্কিন

শ্লথ গতিতে আগুয়ান লাইন থেকেই স্বচ্ছ কাঁচঘেরা কাউন্টারে বসা সিবিপি কর্মকর্তা আর মার্কিন মুলুকমুখো যাত্রীর কথোপোকথন স্পষ্ট শোনা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশাধিকার দেয়া না দেয়া সিবিপি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ডিসক্রেশন ক্ষমতাভূক্ত। তাদের অভিরুচি ও বিচারবিবেচনাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিভেদে সিদ্ধান্তের ইতি-নেতির ইতিহাস প্রবেশেচ্ছুদের সম্যক জানা। লাইনে দাঁড়ানো সবার মনে এখন একই উদ্বেগ, রোবটসদৃশ কর্মকর্তার বদলে ভাগ্যে যেন সহাস্যবদন কর্মকর্তা পড়ে। সিদ্ধান্ত সময়সাপেক্ষ ও জটিল না হয়ে যেন সহজ হয়! ইমিগ্রেশন লা্ইনের অপেক্ষমানদের নিম্নকন্ঠের গুঞ্জনে উদ্বেগ-আশঙ্কার কথাই ভাসছে। কারণ সামনের স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে সব। পাসপোর্টে সিল দিয়ে ‘ওয়েলকাম টু ইউনাইটেড স্টেটস’ বললে হাসিমুখে যাত্রী বামদিকের হলঘরের দিকে লাগেজ সংগ্রহে যাচ্ছে। সিল না পড়লে ডানদিকের হলঘরের শেষপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বিশেষ কেতার স্বচ্ছ বক্সে পাসপোর্ট তালাবদ্ধ করে পাসপোর্টধারীর হাতে দিয়ে কর্মকর্তারা আরও বেশি ইন্টারোগেশনের জন্য দক্ষিনপন্থী হচ্ছেন।  

ভাবি, জগতের আকাশ বাতাসে পশুপাখির উড়ালকে কেন্দ্র করে দেশের সীমানা নিয়ে যুদ্ধংদেহীদের কোন মাথাব্যাথা নেই। সীমান্তঅতিক্রমী নদীস্রোত অনায়অসে পাড়ি দিচ্ছে এক দেশ থেকে আরেক দেশ।  দুইদেশ বিস্তৃত একই বনের পশুপাখি অনায়াসে ভূগোলরেখা ভাঙছে নিয়ত। দেশগুলোর মাথাব্যথা কেবল সৃষ্টির সেরা মানুষের প্রবেশে! এ কোন কঠিন পৃথিবীতে আমাদের  বসবাস? সীমান্ত নামের এই ধীরগতির লাইনে দাঁড়িয়ে মন তাই দুরু দুরু। এমন বিশ্ব ভ্রমণিয়া বোধ হয় নেই, ইমিগ্রেশনের সামনে দাঁড়িয়ে যার চিন্তা হয়নি- ভিতরে ঢুকতে দেবে তো! যে আমি একুশ বছর ধরে মার্কিন মুলুকের পূর্ব সাগরপ্রান্ত অতলান্ত আর পশ্চিমের প্রশান্ত পর্যন্ত গতায়াত করছি, তার মধ্যেও আজ এক আসোয়াস্তি।

ভ্রমণসঙ্গী কনিষ্ঠ পুত্রধন তুসু পাশের কাউন্টারে মহিলা সিবিপি কর্মকর্তার সামনে, আমি আর গৃহবন্ধু জলি পুরুষ কর্মকর্তার কাউন্টারে দাঁড়িয়েছি। পাসপোর্টে নাম দেখেই কর্মকর্তার জিজ্ঞাসা-

: মাহমুদ, তুমি তুর্কি থেকে এসেছো?

জবাবের তোয়াক্কা না করেই আবার বলে – ‘তোমার কাছে খাবার, মসলা, মিষ্টি এসব আছে?’

ভাবলাম আমার লাগেজে কি আছে না আছে তা কে তুললো মার্কিন মুলুকের এই কর্মকর্তার কানে? ইমিগ্রেশনে বসে সে কাস্টমস কর্মকর্তার মতো প্রশ্ন করছেই বা কেন? আমার লাগেজে সবই আছে। এমনকি শুকনো গরুর মাংস ভূনাও থাকতে পারে স্ত্রীর লাগেজের গোপন কুঠরিতে। সরাসরি জবাব না দিয়ে একটু ডিপ্লোম্যাসির আশ্রয় নিই-

: ইয়েস, উই আর কামিইং ফ্রম ইস্তাম্বুল। ইউ সী, আই এ্যাম এ্যাওয়ার এ্যাবাউট ইওর বর্ডার রুলস। আই মে হ্যাভ সাম হাফ কুকড সী ফুড। ফিস, পিকেলস এটসেটরা-হুইচ আর ইউ নো, এ্যালাওয়েবল।

কর্মকর্তার কম্পিউটার পর্দায় সিদ্ধান্ত লেখাই ছিল। সিল না দিয়ে সে দু’জনের চারটি পাসপোর্ট দু’টি স্বচ্ছ বক্সে ঢুকিয়ে তালা মারলো। চেয়ার থেকে উঠে তালামারা পাসপোর্ট বক্সটি বগলদাবা করে ‘প্লিজ, কাম উইথ মি’ বলে ডানদিকে হাঁটা শুরু করলো। ভাবলাম, ‘কাম উইথ মি’ বলে রিমান্ডে তলব করে কোথায় নিয়ে যেতে চায় এই মার্কিন সিবিপি স্টাফ! বুঝলাম, চলেছি সেদিকে, যেদিকে চলে গেছে পূর্ব ও উত্তরপুরুষগণ। পড়লাম-‘ ইহদিনাস সিরাত্বল মুস্তাকিম, সিরাত্বল লাজিনা আনআ’মতা আলাইহিম’( প্রভু, সোজা পথ দেখাও, যে পথে তোমার অনুগ্রহপ্রাপ্তরা গেছে চলে)। মোদ্দাকথা, আজকের তুর্কিশ এয়ারে অবতরণ করা আড়াইশ’র মধ্যে একশ’য়ের মতো যাত্রীকে আমার মতো দক্ষিনপন্থী করা হয়েছে। সামনে যেন ‘পুলসিরাত’ অপেক্ষমান। যদিও দক্ষিণপন্থীদের পারের আশ্বাস স্পষ্ট। বিনা বাক্যব্যয়ে সিবিপি কর্তা সিলটি মারলে বামপন্থী হতে পারতাম !

হলঘরের শেষপ্রান্তে ওয়েটিং এরিয়া। শেষপ্রান্ত লাগোয়া ছোট হলে চলছে তুসুর কাগজপত্র চেক। আমাদেরও সেই হলেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। সে ঘরে লোকে টইটুম্বুর। ‘ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই ছোট সে তরী’ অবস্থা বলে সামনের ওয়েটিং এরিয়াতেও বসানো হয়েছে সেকেন্ডারি ইন্টারভিউ’র ব্যবস্থা। কাগজপত্র ও পরিচয়ের অস্পস্টতা দূর ও সন্দেহভাজনদের ওপর থেকে সন্দেহ অপনোদনে এই কালক্ষয়ের এন্তেজাম। ইমিগ্রেশন হলের শেষ কাউন্টারের সামনে পাতা বড় বড় সোফা। বোঝাই যায়,প্রতিদিনই তাতে নিয়মিত ডেকে আনাদের বসানো হয়। ফলে ভারী সোফার মেমোরি ফোমও বহুউপবিষ্টের চাপে দেবে গেছে। সেই দেবে যাওয়া সোফার ফোকরে আমি ধপাস করে বসে পড়লাম। জলি আমার অনুসরণ করেছে।  কর্মকর্তা তালামারা বক্স হস্তান্তর করলো কাউন্টারে বসা আরেক কর্মকর্তার হাতে। নতুন জন বেঁটেখাটো, পেশিবহুল। রীতিমতো ওয়ার্কআউটের রুটিন সেরে তবেই চেয়ারে এসে বসেছে। তার শারিরী ভাষায় দৃঢ় ও কঠোরতার ছাপ।

তালা খুলে পাসপোর্ট বের করে আমার কাছ থেকে কিছু তথ্য নিলেন। মিনিট দশেক পর বললেন, ‘তোমার জন্ম তো বাঙ্গালোর’। হেসে বললাম, ‘বাংলাদেশ। ড্রপডাউন মেন্যু স্ক্রল করতে গিয়ে বাংলাদেশে না থেমে তুমি মনে হয় বাঙ্গালোরের ওপর কার্সার রেখেছো  মশাই’।  

কর্মকর্তা যখন চুলচেরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করছেন, অন্য কর্মকর্তাকে ডেকে এনে কম্পিউটার স্ক্রিন দেখাচ্ছেন কিংবা ঘন ঘন ভেতরের হলে তার উর্ধ্বতন কর্মকতার কাছে যাওয়া আসা করছেন, তখন জলি উদ্বিগ্নকন্ঠে অসহায়চোখে বার বার আমার দিকে তাকাচ্ছে। বেচারি মার্কিনমুলুকে নাড়িছেঁড়া ধন দেখতে এসে এরকম বিড়্ম্বনার কথা কল্পনায়ও আনেনি। তার চোখেমুখে দীর্ঘ ভ্রমণক্লান্তির ছাপের ওপর নতুন উদ্বেগের ছায়া। আমি কোন উদ্বেগকে পাত্তা না দিয়ে কেউ না শোনে এমনভাবে গেয়ে চলেছি ‘আমি অপার হয়ে বসে আছি, ওগো দয়াময়…পারে লয়ে যাও আমায়….আমি একা রইলাম ঘাটে, ভানু সে বসিল পাটে…তোমা বিনে ঘোর সঙ্কটে… না দেখি উপায়…পারে…’।

বাউলভাবনাবুঁদ আমার সম্বিত ফেরালো ওই কর্মকর্তা। ‘নো ওয়ে, নো ওয়ে, ইউ ক্যান নট গো ইন’, ইউ ক্যান নট গো ইন’ বলে আমাদের দিকে এগিয়ে আসলেন। পাসপোর্ট খুলে আমাদের হাতে ধরিয়ে ডিপোর্টের এন্তেজাম করার স্পষ্ট আভাস। আমি আর্গু করতে থাকি। শেষমেষ মার্কিন মুলুকের একটা পোস্টকোড হয়ে ওঠে গেম চেঞ্জার। কর্মকর্তা বলে তোমার কোন আত্মীয় এ মুল্লুকে থাকলে তার ঠিকানা বলো। আমি বলে পোস্টকোডটি জানাই। বলি; এই ঠিকানায় আমার আত্মার আত্মীয়রা থাকে। কর্মকর্তা ‘আরইউ শিওর’বলে চোখ কপালে তুলে প্রশ্ন করেই কম্পিউটারে কোডটি চালান করে দেয়। সে দেখতে পায়, আমার ফাস্টনেমের নিমসেক বা মিতারাই ওই ঠিকানার বাসিন্দা। কর্মকর্তা ঢুকতে না দেয়ার আর কোন যুক্তি খুজে পায় না। এরপরও কিছু বললে আমি শেষ কামানটি দাগতাম। তা হচ্ছে ‘ওকে মাই লইয়ার উইল টক টু লেটার’। এরকম বাক্যে নাকি কর্মকর্তাদের বেজায় ভয়।

যাহোক, মহোদয় ঘ্যাটাং করে সিল মেরে মার্কিন মাটিতে পদার্পণের অনুমতি দেন বটে, কিন্তু  পাসপোর্টগুলো পূর্ববৎ তালাবদ্ধই থাকে। সে বলেন,  কাস্টমস হলের ‘বি’ লাইন ধরে যেতে বেরিয়ে যেতে হবে তোমাদের।


মার্কিনভেতরের হলঘরে ততোক্ষণে তুসুর ইন্টারভিউও শেষ। সে এসেছে এ দেশে ভর্তির এন্তেজামে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাশ শুরুর একমাসের একদিন আগে কেন এলো, সে প্রশ্ন ও উত্তরই ভাসছিল হলঘরের কয়েকঘন্টার বাতাসে । তুসুকে সঙ্গে নিয়ে আমরা  হলঘর থেকে বিজয়ীর বেশে বাইরের কাস্টমস হলে যাওয়ার সরু প্যাসেজ দিয়ে বেরিয়ে আসি। তালা মারা পাসপোর্টের বক্স আমার বগলদাবা। মেজাজ ফুরফুরে। আকস্মিক আবদুর রহমান বয়াতির কথা মনে পড়ে যায়। এই অসাধারণ গায়েনকে বিভিন্ন মঞ্চে গাইতে দেখেছি। আমিও গাইতে থাকি-

‘একটা চাবি মাইরা দিছে ছাইড়া জনম ভরে ঘুরতে আছে

মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি কোন মিস্তরি বানাইয়াছে….

মন আমার দেহ ঘ….ড়ি।‘

বাইরে এসে দেখি লাগেজগুলো এতিমের মতো বেল্টে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত। এরা বিমান চড়েছে দুদিন আগে ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে। কাপড় চোপড় ছাড়া বয়ে আনা খাদ্যের এখন চাই জিরো ডিগ্রির শীতলতা। ভাগ্যিস, পকেটে গুনে গুনে আট টাকা পাওয়া গেল। তুসুর হাতে দিলে সে মেশিনে ফেলে একটা লাগেজ ট্রলি দীর্ঘসারির তালাবদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত করে আনলো। এই এক ঝামেলা  যুক্তরাষ্ট্রে। লাখ লাখ ডলার কাটছে এয়ারপোর্ট খরচা বাবদ, ‘বিনা রণে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনি’র মতো বিনা অর্থে ট্রলির ব্যবস্থা নেই। আর বাপু, এয়ারপোর্টে নামার পর কি লোকজনের কাছে সে দেশের কড়ি থাকে?

ছোট বড় মিলিয়ে আমাদের ব্যাগপত্র- লাগেজ সংখ্যা একটু বেশিই। ট্রলিতে উঠিয়ে তুসু ঠেলতে থাকে কয়েকটা ব্যাগ। লাগজদের বড় ভাইদের ঘাড়ে ছোটদের একটি দুটি করে চাপিয়ে দিই। তিনজনের দল বিরাট লটবহর নিয়ে অগ্রসর হই কাস্টমস হলের বি জোনের দিকে।

গানে গানে মেজাজ ফুরফুরেই ছিল। গোল বাধালো বেরসিক কাস্টমস কর্মকর্তারা। তিনজনের লাগেজের চালটা, মুলোটা, ডালটা, মাছ ভাজিটা, নাড়ু, বাতাসা,চানাচুর, আমসত্ত্ব যা আছে, ঘোষণা দিতে হবে এক ফরমে। আরেক ফরমে মালকড়ি কী আছে তার ঘোষণা। এসব নিয়ে যে কালক্ষয় হলো সে গল্প অনেকখানি লম্বা। এই ধাপ পেরুলে নাক বরাবর গাড়ি বারান্দা, বামে ডোমেস্টিক ট্রান্সফার ও কানেকশন্স। এবার বামপন্থী হয়ে লাগেজপত্র ঠেলেঠুলে অনেকটা পথ আসি। আলাস্কা বলতেই এক বিমানপোতকর্মী পথনির্দেশ করতে শাহাদত আঙুল ওঠায়। পৌঁছে দেখি ভৌগলিক আলাস্কামুখো ফ্লাইটের লাগেজ চেক ইন করছে এক এয়ারপোর্ট কর্মী। আমরা আলাস্কা যাবো না, যাবো আলাস্কা এয়ালাইন্সে সিয়াটল। আবার উল্টোপথে আধ কিলোমিটারে বেশি হেঁটে আলাস্কা এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে পৌঁছাই।  

নির্ধারিত ফ্লাইট টেকঅফ সময়ের খুব বেশি বাঁকি নেই। এটা তো আর বন্ধুর মোটরবাইক বা ‘পাঠাও’ না যে উঠলাম, স্টার্ট দিলাম আর পৌঁছে গেলাম। টিকেট বাগিয়ে ধরতেই কাউন্টারকর্মী বললেন, তোমাদের ফ্লাইট মিস। এখন তা টেকঅপের দৌড়ে আছে। ভাবতে হয়নি, কারণ একই রুটে আরও ফ্লাইট আছে কয়েকঘন্টা পর পর। পরবর্তী ফ্লাইটেও তিনজনের আসন হলো না। শেষ ফ্লাইট রাত পৌণে আটটায়। ঘন্টা চারেক এয়ারপোর্টবাস করতে হবে। আমাদের সঙ্গে প্যারিশেবল গুডস ফ্রিজের শীতলতা চাচ্ছে। এ সব মাছ মিষ্টি খাওয়া হবে সিয়াটলে। না হলে এয়ারপোর্ট থেকে সোজা আলামেদা আইল্যান্ডে বন্ধু আতিয়ার রহমান লাবু আর শাহানা ভাবীর আতিথেয়তাময় বাড়িতে গিয়ে উঠতাম। শাহানা ভাবীর হেঁসেলের রান্নার কথা ভোলা যায় না। 

লম্বা সময় থাকার পরও কানেক্টিং ফ্লাইট মিস করায় ইমিগ্রেশন ও কাস্টসমস কর্মকর্তাদের ওপর অভিমান হলো বড়। ভাবলাম, মার্কিন মুলককে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব তো তাদের ওপরই, পেশাগত দায়িত্ব তো তারা সুচারুরূপেই পালন করবে। তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে যা পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা ।

আর ঝুঁকি নিতে চাইলাম না। আমাদের বোর্ডিং গেট ডি ৭। সামনেই সিকিউরিটি চেক। নিরাপত্তা চেক করে ডোমেস্টিকে ঢুকতে জলির জন্য গোল বাধবে জানাই ছিল। ছোটবেলায় তার অপারেশন হওয়ার জেরে এয়ারপোর্টে ফুলবডি স্ক্যানিংয়ের সময় মেশিন ভুল রিডিং করে থাকে সবসময়। জানি না, চাঁদসী ডাক্তার ফোঁড়া পায়ের ফোঁড়া অস্ত্রোপচার করে ভিতরে সুঁচ টুচ রেখে দিয়েছে কী না ! ম্যানুয়েল চেকিংয়ে ব্যাখ্যার পর সে ছাড়া পায় বার বার। সেসব ঝক্কিশেষে স্ক্যানার পেরিয়ে ভেতরেই যেতেই লাস্যময়ী হাস্যময়ীর ডাক-এই ব্যাগ কার? দেখি অধমের ব্যাগটিই পাশে নামিয়ে রাখা। লাস্যময়ী বলে, তোমার ব্যাগে লিকুইড আছে। আমি বলি নেই। সে বলে আছে। আমি বলি নেই।  আছে নেই, আছে নেই করতে করতে কয়েক মিনিট কাটে। তারপর সে অনমুতি নিয়ে ব্যাগ খোলে। দেখা যায়, তুর্কিশ এয়ারের সৌজন্য পাণীয় ব্যাগে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে এয়ারপোর্টে ঢোকার পাঁয়তারা করছে! এতোসব ভজঘটে ভুলেই গিয়েছিলাম তুর্কিশ এয়ার পাণীয় উপহার দিয়েছিল, তা ব্যাগের কোটরে পুরে রেখেছি।

এবার লাস্যময়ী নিরাপত্তাকর্মীর অনুরোধ, ‘ তুমি বাইরে যাও। এটা খাও, পেটে পুরে আবার স্ক্যানার দিয়ে ফিরে আসো’।

তাকিয়ে দেখি পেছনে বেজায় লাইন। বেরিয়ে আবার ঢুকতে গেলে অনেক অপেক্ষা করতে হবে, এখন আর প্রহর গোণার অবস্থা শরীর ও মনের নেই।

ভ্রামণিক জাফর ভাই বলেছিলেন, এ ধরনের পরিস্থিতে আফ্রিকায় নাকি একটা টার্ম ব্যবহার হয়-‘প্লিজ মেক এ প্ল্যান’। এর পারিভাষিক অর্থ ‘একটা ব্যবস্থা করো’।

‘প্লিজ মেক এ প্ল্যান’ শব্দটি মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলে লাস্যময়ী চীৎকার করে ওঠে ‘হোয়াট’। কোমলকন্ঠে বলি-

‘যদি এখানে এটা রেখে যাই, বা তোমাকে উপহার দিই….!’

এরপর আর বাক্যব্যয় করতে হয় না। আলগোছে ভিতরে ঢুকে যাই।


মার্কিন


এখন ক্ষুৎপিপাসায় কাতর সবাই। গেটমুখে যাওয়ার পথে ছোট ছোট কফিশপ- ভারী বা হালকা খাওয়ার আয়োজন। পকেটে প্রায়োরিটি পাস নামের যে সেবিকা রয়েছে, তা এস্তেমাল করতে ব্যর্থ হই। স্থান কাল ও পাত্র ঠিক নেই। জীবনে এ তিনটি জিনিসের মেলবন্ধন বড় প্রয়োজন। অগত্যা এক কফিশপ থেকে পানি কিনি, কিছু নাস্তা অর্ডার করি। পানি পিপাসায় জলির ছাতি ফাটছে। তাই  দোকানের সামনের ফুডকোর্টে বসেই আমরা গোগ্রাসে খেতে থাকি। তারপর আমাদের নির্ধারিত ফ্লাই্টের গেটমুখের দিকে এগিয়ে যাই।

এখানে এখন কাকপক্ষীও নেই। এখন চারটার মতো বাজে। বোর্ডিংগেটের কাউন্টার খুলবে ফ্লাইট ছাড়ার ঘন্টাকাল আগে, পৌণে সাতটায়। তার মানে আমাদের হাতে ঘন্টা তিনেক সময়। জলি ঘুমচোখে সোফায় এলিয়ে পড়ে। সামনে উড়োজাহাজের ওঠানামা দেখতে দেখতে আমি গত কয়েকঘন্টায় ঘটনার কার্যকারণ বের করার জন্য স্মৃতির জাবর কাটি।

এ্ই স্মৃতির জাবরে ধরা পড়ে- আমি যে টেপে প্যাঁচানো বক্সে মাছ-মিস্টি এনেছি-তাই হয়তো আজকের ভজঘট-বিড়ম্বনার নেপথ্যে। ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্টে মার্কিনমুখো ফ্লাইটে ওঠানোর সময় আমার প্রোফাইলে রেডফ্ল্যাগ পড়ে থাকতে পারে। মানে আমি এখানে পৌঁছানোর আগেই এখানে চলে এসেছে লাগেজের বিবরণ। অতএব সাধু সাবধান!

বিড়ম্বনার কথা ভেবে মন খারাপ না করে আমি বরং উড়োজাহাজ টেকঅফ ও ল্যান্ডিং দৃশ্যে মনোনিবেশ করি। এখন বিড়্ম্বনার অপমানের জাবরকাটার বদলে ভ্রমণের ইতিবাচক মজা বড় প্রয়োজন।

ছবি কৃতজ্ঞতা: লেখক

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত