Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,মায়মুনা

শারদ সংখ্যা গল্প: হননীয় । সাঈদ আজাদ

Reading Time: 9 minutes

ক. মায়মুনা, আজকেও দেরি করলে! জানো, আমি সকাল সকাল কলেজে যাই। কলেজে তো তোমার মতো কাজ না। যখন ইচ্ছা গেলাম। দু-চার মিনিট দেরির জন্যও কথা শুনতে হয়। এমন করলে তুমি অন্য জায়গায় কাজ দেখো। তোমাকে তিনজনের টাকা দিয়ে রেখেও যখন লাভ হচ্ছে না। দরজা খুলেই একনাগাড়ে বলেন ফারজানা। ভাবি, মাইয়্যাডার লাইগ্যাঅই দেরি অইয়্যা গেল। কালউকার থাইক্যা আর দেরি হইত না। জানেন অইদঅ মাইয়্যার বাপটা বিছানায়। মাইয়্যাডারে যে দেখবঅ তার এমন শক্তি নাই। নিজে নিজে কিছুই করতে পারে না। তার কাজঅ আমারেঅই কইরা দিতে অয়। … আৎকা মাইয়্যাডার জ¦র আইল রাইতে। জ্বরের ঘোরে কেমন জানি কাঁপতাছিল। খেঁথা বালিস বিছ্না- সব আইগ্যা-মুইত্যা নোংরা কইরা লাইছিল। সকলে সব ধুইয়্যা শুকাইতে দিয়া আইতে আইতে দেরি অইয়্যা গেল। প্রতিদিনই তো বল, কাল থেকে দেরি হবে না। কিন্তু হয়। দেরি হয় প্রতিদিনই তোমার। তোমার তো এটা চাকরি না কি? তুমি যদি টাইমত নাই-ই আসো, তোমাকে রেখে আমার লাভ কী! আর এসব সমস্যাতো তোমার নতুন নয়। বরাবরই ছিল।…আজকে বিশেষভাবে বলেছিলাম তাড়াতাড়ি আসতে, আমাকে সকাল সাতটার আগেই যেতে হবে কলেজে। নতুন যারা ভর্তি হয়েছে তাদের নিয়ে একটা প্রোগ্রাম আছে। নাস্তাটা আর করা হলো না। মায়মুনা ফারজানার অভিযোগের আর কোনো কৈফিয়ত দেওয়ার চেষ্টা করে না। কাজে লেগে যায়। আসলেই তো, প্রতিদিন তার দেরি হয়েই যায়। ফারজানা ভাবি কলেজে পড়ান। ক্লাসে ঠিকমতো না গেলে, তাঁরও তো কথা শুনতে হয়। প্লেট ধুতে ধুতে বলে, চট্ কইরা একটা ডিম ভাইজ্জা দিমু ভাবি? না, এখন খাওয়ার সময় নেই, জুতা পায়ে দিতে দিতে ফারজানা বলেন। তুমি রান্না শেষে সবকিছু ভালোমতো ঢেকে রেখে যেও। আমি চাবি নিয়ে গেলাম। যাওয়ার সময় মনে করে বাইরে থেকে তালা দিয়ে যেও। …দেখো, সেদিনের মতো আবার ভুলে যেও না যেন। সেদিন তো আমি আরেকটু দেরি করে ফিরলে বাসার সব খোয়াতে হতো। না ভাবি, এমন ভুল আর জীবনে অয়! মায়মুনা দরজা বন্ধ করে ফের কাজে মন দেয়। আজ তারও ফেরার তাড়া আছে। মেয়েটার জ¦র আবার বাড়ল কি-না। মেয়েটা কেন যে অত কাঁপছিল! হঠাৎ হঠাৎ মায়মুনাকে কেমন জড়িয়ে ধরছিল। কখনও তো অমন করে না। মেয়ের কাঁপুনিটা স্বাভাবিক ছিল না যেন। … আসার সময় সকালে অবশ্য অনেকটাই স্বাভাবিকই দেখে এসেছে। বাইরেই তো বসে ছিল। এখন কী অবস্থা কে জানে! কাজে নেওয়ার আগেই ভাবি বার বার সতর্ক করেছেন, সকাল বেলা আসতে হবে। প্রতিদিনই সাতটার মধ্যে। দেরি করা যাবে না। যাওয়ার সময় না হয় প্রয়োজন হলে একটু আগে গেলে। তবে, আসতে হবে সাতটার মধ্যেই। ভাবি প্রথম দিনই বলেছেন, আমার কলেজে যেতে হয় সাড়ে আটটার মধ্যে। বেসরকারি কলেজ। তার ওপর নতুন চাকরি। যেতে কোনো দিন দেরি হলে প্রিন্সিপালের কাছে কথা শুনতে হয়। নিজের গাফিলতির জন্য কারও কাছে কৈফিয়ত দিতে আমার ভালো লাগে না। সে জন্য তোমাকে রাখা। না হলে আমি নিজের কাজ নিজেই করতে পারি। তোমার ভাই মাসে একবার আসে দু’দিনের জন্য। আমার একার আর তেমন কী কাজ। … তোমাকে অন্যদের চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে রাখছি। সেটা মনে রাখবে। এই টাকায় আমি তিনজনকে রাখতে পারি। হ্যাঁ, টাকাটা অন্যদের চেয়ে বেশিই। তাই মায়মুনা এ কাজটা ছাড়তে চায় না। কেই-বা ছাড়বে! তিন বাসার কাজ করে যা পাওয়া যেত, এখানে তাই দেন ভাবি। তার ওপর এটা-সেটা বাড়তি খাবার তো আছেই। আবার কাজও করা যায় স্বাধীনভাবে। ফারজানা সকালে বের হয়ে যান। মায়মুনা নিজের মতো কাজ করে, শেষ হলে দরজায় তালা দিয়ে চলে যায়। …আগে কখনও দেরি হয়নি। ইদানীং দেরি হচ্ছে। দেরি হচ্ছে গত এক সপ্তাহ ধরেই। প্রায় প্রতিদিনই। হচ্ছে মেয়েটার জন্যই। শরীরের সেই বিশেষ ব্যাপারটার পর থেকেই মেয়েটা কেমন এলোমেলো আচরণ করছে। এমনিতেই হাবাগোবা মেয়ে। তার ওপর বয়সের ডাকটা যেন তাকে আরও অসহায় করে দিয়েছে। গত রাতে আবার অমন জ¦রটা আসলো! কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে মায়মুনা অন্যমনস্ক হয়। চিন্তা বাড়ে তার। মেয়েটা কাঁপছিল কেন? দিনের বেলা কি কোনো কিছু দেখে ভয় পেয়েছিল? ছোট থেকেই তো একা একা থাকে। ভয় আজ নতুন করে পাবে কেন? নাকি জ¦রেই কাঁপছিল। হয়তো মায়মুনা মা বলেই বেশি বেশি ভাবছে। আবার মনে হয় মায়মুনার, মায়ের মন বলেই হয়তো মেয়ের ভয়টা নিয়ে মনের খচখচানিটা যাচ্ছে না। ক’দিন আগেও মেয়েটা ইচ্ছেমতো ঘুরত আঁদাড়-পাঁদাড়ে। এ-বাড়ি ও-বাড়ি যেত। সারাদিনই বাইরে। খাওয়া নাওয়ার ঠিক নেই। বেশভ‚ষার ছিরি নেই। …কিন্তু এখন মায়মুনা কোথাও যেতে দেয় না মেয়েকে। শাসনে রাখে। আটকে রাখে ছোট বাড়ির চৌহদ্দিতেই। উঠানের ধারে পেয়ারা গাছে বেঁধে রাখে নিজে না ফেরা পর্যন্ত। মেয়ে এখন আর ছোটো নেই। কোথায় গিয়ে কোন বিপদে পড়বে! বাপ-মায়ের কাছে না হয় সে আদরের শিশু। অবুঝ। হাবাগোবা। কিন্তু পুরুষের চোখ দেখবে আদুরির বাড়ন্ত দেহ। পুরুষের লোভী চোখের কাছে গতরই সব।…গতর! গতরের জন্যই তো বয়সকালে মায়মুনার জীবনটা বিপর্যস্ত হয়েছিল! তছনছ হয়েছিল কিশোরীর স্বপ্নের সময়। সেসব দিনের কথা ভাবলে তার মরতে ইচ্ছে হয় এখনও। মরে না, মেয়ে আছে বলে। যদিও সেসব দিনের জের এই মেয়ে। তাহলেও, এই মেয়েই তার মাতৃত্বের তিয়াস মিটিয়েছে।

খ. আদুরি! মেয়ের নাম। জন্মের পর পর মেয়ের চাঁদমুখ দেখে এই নামটা রেখেছিল মায়মুনার মা, আদুরির নানি। মায়মুনার মা আদুরির জন্মের বছরখানেকের মাথায় মারা যায়। …মেয়ের সংসারেই থাকত মা। তখন বড় সুখের সংসার ছিল তার। তালেব রোজগার করত। কামলা খাটলেও রোজগার ভালো ছিল। সদ্য মা হওয়া মায়মুনা মেয়েকে নিয়ে মেতে থাকত। মায়মুনার মা-ই সামলাতো সংসার। কিন্তু সুখ কি আর তার মতো মানুষের কপালে সয়! বৈশাখের ঝড়ে মেহগনি গাছের ডাল পড়ে চাল ভাঙল। সেই চালের নিচে চাপা পড়ল তালেব। চাপা পড়ল মায়মুনার সুখ। চাপা পড়ল তার স্বপ্ন। চাপা পড়ল তার সচ্ছলতা। টলে উঠল পায়ের তলের মাটি। চলা বন্ধ হয়ে গেল তালেবের। রোজগার বন্ধ হয়ে গেল। ঘরের বাইরে বের হতে হলো মায়মুনাকে। কোমর থেকে নিচ পর্যন্ত শরীর অবশ হয়ে তালেব পড়ল বিছানায়। মাও ক’দিন জ¦রে ভুগে হুট করে মরে গেল। মরে গিয়ে হয়তো বেঁচেছে মা। কিন্তু মায়মুনাকে রেখে গেল বিপদের মধ্যে। মা বেঁচে থাকলে মেয়েটাকে অন্তত দেখে রাখতে পারত। তালেবের দু-একজন আত্মীয়ের সাথে যা হোক কিছুটা সম্পর্ক ছিল। বিপদ দেখে তালেবের স্বজনরাও সরে গেল দূরে। সংসারের জোয়াল পড়ল মায়মুনার একার কাঁধে। দেরি যেন না হয়ে যায়, সে জন্য আজ সকালে মায়মুনা তাড়াহুড়া করছে খুব। ঠিকমতো ভাতটাও খাওয়নি। কাপড় বদলিয়েই বের হয়েছিল। তা হলেও, আসতে দেরিই হয়ে গেল। আসার সময় দেখে এসেছে মেয়েটা বসে আছে হাত-পা ছড়িয়ে। জ¦রো মেয়েটা মলিন মুখে বসে বসে মুড়ি খাচ্ছে। এলোমেলোভাবে মাটিতে বসে থাকাটা চোখে ঠেকছিল। ফ্রকটা উঠে গেছে কোমরের কাছে। পেট দেখা যাচ্ছে। মেয়ের শরীরে বয়সের ডাক এসেছে মাত্র। কিন্তু এমনই কপাল, শরীরটা বেশ বাড়ন্ত। তেরো বছরের মেয়েকে দেখায় আঠারো বছর যেন! ক’দিন মেয়েটাকে দেখে দেখে ইদানীং একটা ভয় ঢুকেছে মায়মুনার মনে। রাতে খেতে বসে সে প্রসঙ্গই উত্থাপন করে সে স্বামীর কাছে। তালেব মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে মন দিয়ে খাচ্ছে। মাইয়্যাডারে খেয়াল কইরা দেখছেন এই কয়দিন? দেখতাম না কা! আমিদঅ সারাদিনঅই বাইত থাহি। আদুরি আমার চোহের সামনে অইদঅ থাহে। আগে তঅ এনো হেনো যাইত। অনেদঅ তুমি মাইডয়্যারে বাড়ির বাইর অইতেঅই দেও না। খেল কইরা দেখলে বুঝতেন, কিয়ারে বাইর অইতে দেই না।… মাইয়্যাদঅ বড় অইয়্য গেল! দিন গেলে মানু বড় অয়অই। তুমি আমি বুড়া অইতাছি না! …তই তুমি কী কইতে চাও ইেইডা আমি বুজজ্জি। মাইয়্যার বড় অওয়াডাই তোমার কাছে ডয়ের কারণ, এইদঅ? বয়স কী আর আটকাইয়্যা রাহন যায়? মাইয়্যারে বাঁইন্ধ্যা রাহো, বয়সদঅ আর বাঁইন্ধ্যা রাকতা পারতা না। জোয়ান ছেড়ারা বাড়ির আশপাশে ঘুরঘুর করন শুরু করছে। মাঝে মধ্যে দেহি মাইয়্যাডার লগে কথা কইতে চায়। আসলে আদুরির বয়সের তুলনায় শইলডা বেশি বাড়ন্ত, ইডাও সমস্যা। আপনে দেহি আমার চেয়ে বেশি খেল করেন মাইয়্যাডারে। তইলেদঅ কী কইতে চাই বুঝতেঅই পারছেন? পারছি। কইলাম না, বদমাইশের বাচ্চারা সব ঘুরঘুর শুরু করছে মাইয়্যাডার চাইরপাশে। আমি অচল মানু। উইঠ্যা গিয়া যে বাধা দিমু হেইডাও পারি না। বজ্জাতডিয়ে হেইডা জানে বইল্যাঅই আরো সাহস পায়। …মামুনা, আমি হুইয়্যা হুইয়্যা কয়দিন ধইরা একটা বিষয় ভাবছি। কী ভাবছেন? কথাডা হুইন্যো মাথা ঠান্ডা কইরা। হুইন্যা আবার চেঁচামিচি শুরু কইরো না। আমি বাপ বইল্যাঅই কই। কই একজন পুরুষ বইল্যাঅই। পুরুষের চোউখ দিয়া দেখলে মাইয়্যা আঙ্গ মাইয়্যা না। বিপদ। … একবার মাথাডা ঠান্ডা কইরা ভাবো। আমরা মইরা গেলে মাইয়্যাডার ভাইগ্যে কী ঘটব। তুমিদঅ সারাদিনঅই কইতে গেলে বাড়ি থাহো না। মাইয়্যার আশপাশে অনেঅই ছেড়েরা আনাগোনা শুরু করছে। কহন কোন বিপদ ঘইট্যা যায়, কওন যায় নাকি! তহন সামলাইবা কেইমনে? বাপ মা অইয়্যাঅ কীসব কথা ভাবতে অয় আঙ্গ। না অইলে, বয়সী মাইয়্যা কার বাড়িতে না আছে! তারা প্রজাপতির লাহান দিনভর যেমন উইড়া বেড়ায়! আছে। ঘরে ঘরেঅই আছে বয়সী মাইয়্যা। তই, তারা কেউ তোমার আমার মাইয়্যার মতো প্রতিবন্ধী না। হাবাগোবা না।…হোন মামুনা, অনে একটা বহুত খারাপ কথা কমু তোমারে। মাইয়্যাডারে লইয়্যা একটা ব্যাপার ভাবছি আমি। কথাডা হুইন্যা খুব রাগ অইব আমার উপ্রে। জানি আমি। কথাডাও খুব খারাপঅই।…হুইন্যা তুমি মাথা খারাপ কইরো না। চিল্লাচিল্লি কইরো না। কথাটা ভাইব্যো। ঠান্ডা মাথায় ভাইব্যো। কী কথা! মায়মুনা খাওয়া থামিয়ে স্বামীর দিকে তাকায়। চকিতে ঘুমন্ত মেয়ের দিকেও তাকায় একবার। আবারঅ কই, কথাটা হুইন্যা মাথা গরম করবা না। ঠান্ডা মাথায় ভাববা। অত প্যাঁচাইতাছেন কা! কী কইবেন কন না। জানি, কথাডা তুমি ভালোভাবে নিবা না। তাই এত প্যাঁচাইতাছি। আর কথাডা ভালোভাবে নেওয়ারও না। হোন মামুনা, মাইয়্যাডারে আঙ্গ উচিত মাইরা ফেলা। কাজডা যত তাড়াতাড়ি করন যায় ততঅই ভালা। মায়মুনার খাওয়া থেমে যায়। লোকমা উঠাতে গিয়ে হাত থেমে যায়। ভয়ার্ত চোখে একবার ঘুমন্ত মেয়ের দিকে তাকায়। পরে স্বামীর দিকে তাকায়। তাকিয়ে থাকে। অপলক… খানিকক্ষণ পরে, অস্পষ্ট স্বরে বলে, আপনে কেইমনে টের পাইলেন? কেইমনে! কী টের পামু মামুনা! তুমি কী টের পাওয়ার কথা কও? আমি মনে মনে কয়দিন ধইরা ভাবতাছি, অনেকবার ভাবছি, হুইতে বসতে খাইতে গিয়া ভাবছি, যদি মাইয়্যাডা মইরা যাইত। হঅ, মা হই্যায়ও, জন্মদাত্রী হইয়্যাও আমি বহুতবার এই কথা ভাবছি। … কিন্তু হেইডাদঅ মনের একটা চিন্তা মাত্র। আপনে কি কইতাছেন, হিডা বুঝতে পারছেন! বুুইজ্যা শুইন্যাঅই কইতাছি। আমিঅ হুইয়্যা হুইয়্যা অনেকদিন ভাবছি। মাইয়্যাডা অবস্থা দেখ্যাঅই ভাবছি। ইডাঅই সব থাইক্যা ভালা অইব। আমরা না থাকলে আদুরির কী অইব। ভাবতেঅ বুক কাঁপে?। খোদার কী মর্জি! একটা ভাই-বইনও নাই যে দেখব। আর ভাই-বইন থাকলেও, তারা কি সারাজীবন টানত? বয়স অইলে সবাই নিজের সংসার লইয়্যা মাইত্যা থাকত। প্রত্যেক দিন গু-মুত সাফ করা, মুখে তুইল্যা খাওয়ানো, গোসল করানো, কাপড় পাল্টানোÑ এইসব করতে করতে মাঝে মধ্যে দেহি তুমিও বিরক্ত অইয়া যাও। দুনিয়ার আর কে এমন কইরা আদুরিরে যতœ করব। আমি যা কই তাই-ই করো মামুনা। নিজের মাইয়্যারে খুন করতাম, কেউ জানতে পারলে কী অইবো? মামুনা স্থির চোখে তালেবের দিকে তাকিয়ে থাকে। আঙ্গ খোঁজ কেই-বা রাহে! আমরা একঘরে! গ্রামের এক মাথায় পইড়া আছি। মাইয়্যাডারে কবরস্থানে গিয়া কবর দিয়া আইলে কে জানব। আদুরিরে না দেখলে হয়তো দুই একজন জিজ্ঞাইব আদুরি কই গেল। তারপর সবাই ভুইল্যা যাইব। জীবন যেমন চলতাছে, চলব। যতডা সহজ ভাবছেন, ততডা সহজ না। মায়মুনা সহজ স্বরে বলে। আদুরির কিছু লোক আছে চিনাজানা। তারা আদুরির খোঁজ-খবর লয় মাঝে মধ্যে। অবইশ্য, মইরা গেলে কেউইদঅ জানব না কেমনে মারা গেল। কয়দিন ঘরে আটকাইয়্যা রাখতে অইব। মানুষরে কইতে অইব, আদুরির অসুখ অইছিল। ভুইগ্যা ভুইগ্যা মইরা গেছে। ভালা বুদ্ধি। আরেকটা কাজ করলে কেমন অয়? ঘরের ভিত্রে কবর দিয়া দিলে? ঘরের মাঝখানঅ গর্ত কইরা কবর দিয়া দিলাম। মায়মুনা স্থির চোখে তাকিয়েই ছিল তালেবের দিকে। তালেব কথার বলতে বলতে থেমে গিয়ে বলে, কী অইল? এমন কইরা চাইয়্যা রইছো! আঙ্গ একটা মাত্র মাইয়্যা, তারে মারার লাইগ্যা আমরা এত বুদ্ধি করতাছি! দশটা মাস যারে আমি পেটঅ ধরেছি। কত কষ্ট করছি পেটঅ লইয়্যা। এতবড় করছি নিজে না খাইয়্যা, মাইয়্যাডারে খাওইয়্যা। সেই মাইয়্যারে নিজের আতে মারমু! ঘরের ভিত্রে কবর দিয়া হেই কবরের উপ্রে হুউয়্যা থাকমু! বলতে বলতে দু-চোখ জলে ভরে ওঠে মায়মুনার। দেহো মামুনা, তালেব হেঁচড়ে হেঁচড়ে মায়মুনার দিকে এগিয়ে আসে। আদুরিদঅ আমারও ঝি নাকি? মায়াদঅ আমারও অয়। কিন্তু, আমি অনেক ভাবছি। ভাইব্যা দেখলাম, আমরা মরার আগেঅই মাইয়্যাডার মরা দরকার। অনে আমার কথায় তোমার রাগ ঘিন্না যাই-ই অউক, এক সময় দেখবা আমি ঠিক কাজঅই করতে কইছিলাম। মায়মুনা আর কিছু বলে না। স্থির চোখে চেয়েই থাকে স্বামীর দিকে। কিন্তু সে তালেবকে দেখে না। দেখে যেন অন্য কিছু। অন্য কোনো দৃশ্য।

গ. মেয়ের ভয়টা যখন মায়মুনার ভেতরে চলে এলো, তখন মায়মুনা সিদ্ধান্ত নেয় খুনটা সে করবেই। হয়তো খুনটা আরও আগেই করা উচিত ছিল। সাহসে কুলায়নি বলেই করেনি। এখন তালেবের কথায় মনে হয়, পৃথিবীটা সবার জন্য হলেও, এখানে সবাই জন্মালেও, এখানে বসবাসের অধিকার সবার থাকে না। কেউ কেউ নিজের কর্মফলেই সে অধিকার হারায়। গত দুই মাসের প্রতিটা দিনই অপেক্ষা করেছে মায়মুনা। লক্ষ্য করেছে বিপর্যস্ত মেয়েটাকে। আর অপেক্ষা করেছে খুন করার সাহস সঞ্চয়ের জন্য। কত রাতে ভেবেছে কাজটা করবে। স্বামী সন্তান যখন ঘুমে, মায়মুনা শোয়া থেকে উঠে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল অন্ধকারে। সাহস হয়নি বালিশটা হাতে নিয়ে ঘুমন্ত ঘৃণিত মুখটার ওপর চেপে ধরতে। তবে, আজ রাতে মায়মুনা কাজটা করবেই। মনে মনে সংকল্প দৃঢ় করে। দু’মাস আগেই মায়মুনা টের পেয়েছে তার আশংকা সত্য। মেয়ের পেটে বাচ্চা। মায়মুনার অবাক লাগে, দিনে দুপুরে মেয়েটার সর্বনাশ হলো অথচ প্রতিবেশীরা কেউ দেখল না! হয়তো কোনো বাড়ির কানাচেই ঘটনাটা ঘটেছে। হয়তো… হয়তো এই বাড়ির উঠানেই ঘটনাটা ঘটেছে। …তা প্রতিবেশীরা দেখবেই-বা কে? তার বাড়ির দিকে কেউ তাকায়! তাদের মেয়ের দিকে তাকায় কেউ। সবাই বলে, বাপ-মায়ের পাপেই অমন মেয়ে হয়েছে। …না পাপতো তারা করেছেই। সে পাপের আজ শেষ করবে মায়মুনা। মায়মুনা নিজের শিথানের বালিশটাই হাতে নেয়। সব দেখে শুনে, তালেব ক’দিন আগেও বলেছে খুব, মেয়েটাকে মেরে ফেলতে। মায়মুনা প্রথম দিকে তার জবাবে এটা সেটা বলেছে। ক’দিন ধরে মায়মুনা কোনো কথাই বলছে না দেখে, তালেব আর বলে না মেয়েকে মারার কথা। ঘুমন্ত মেয়েটার মুখ দেখা যাচ্ছে আবছা চাঁদের আলোতেও। পাশে শুয়ে আছে তালেব। মেয়ের মুখ যেন বাবার মুখ কেটে বসানো। অস্পষ্ট আলোয়ও যেন পষ্ট দেখে মায়মুনা। ঘুমন্ত মেয়ের ঠোঁটের কাছে নিচু হয়ে চুমু খায়। দু-হাতে বালিশটা নিয়ে বসে থাকে চুপচাপ। কাটে অনেকক্ষণ। …তালেব কাত হয়ে শুয়ে ছিল। চিৎ হয়ে শোয়। মৃদু নাক ডাকছে তালেবের।… মেয়েটা একবার গোঙ্গায়। বাইরে ঝিঁঝিরা চিৎকার থামায় ক্ষণিকের তরে। ফের শুরু হয় তাদের চিৎকার। মেয়েটা যতদিন বাঁচবে মায়মুনাকে ভোগাবে। মায়ের কাছে সে আদরের পুতুল। কিন্তু পুরুষের কাছে? কামুক পুরুষের কাছে লোভের মাংস। পুরুষ পশুরও চেয়েও অধম হয়ে যায় কখনও কখনও! মায়মুনাও তো চৌদ্দ বছর আগে তালেবের কাছে লোভের মাংসই ছিল। … সে রাতের কথা কি এত অল্প সময়ে ভুলে যাবে মায়মুনা!.. হ্যাঁ, অন্যের কাছে তা চৌদ্দ বছর হলেও মায়মুনার কাছে সেটা গতকালের ঘটনা যেন। সব মনে আছে যে তার। থাকবে না! নারী তার ইজ্জত হারানোর ব্যথা কোনোদিন ভুলতে পারে! গ্রামের সালিশে সেদিন মায়মুনার অসহায় বাপ মাতবরের রায় মেনে নিয়ে মেয়েকে তালেবের সাথেই বিয়ে দিয়েছিল। মনে রয়ে গেছে মায়মুনার। সব। সব দুঃখ, সব অপমান জমাট পাথর হয়ে বুকে চেপে আছে। চৌদ্দ বছর ধরে বুকে সে পাথর নিয়েই সংসার করছে। এখন তো মায়মুনাই তালেবকে খাওয়া-পরায়। যতœআত্তি করে। মেয়ের মতোই সেও তো বোঝা এখন। মেয়ে চলে গেলে তালেব রয়ে যাবে। বোঝাতো তার কমবে না! এক সময় সে তার পৌরুষ-বিষ ঢুকিয়ে বিষাক্ত করেছিল অসহায় কিশোরীর সারা শরীর। ভাগ্যের মার খেয়ে এখন সে নিস্তেজ। অক্ষম। অথর্ব। কত বছর ধরে পৌরুষহীন শুয়ে থাকে মায়মুনার পাশে। ঠান্ডা হয়ে ঘুমায়। প্রতিশোধ বোধহয় অলক্ষ্যে কেউ নেয়-ই। সেদিন মাতবর সাহেব জোর করে ধর্ষকের সাথে বিয়ে না দিলে হয়তো জীবন থেকে সব আলো হারিয়ে যেত না মায়মুনার। হয়তো জীবনটা এমন কালো হয়ে যেত না। লোকেরা যে বলে, পাপেই নাকি এমন মেয়ে হয়েছে তার, হয়তো ঠিকই বলে। তবে পাপ করেছিল তালেব একাই। মায়মুনা নয়। তা হলেও সমাজের লোকেরা, গ্রামের লোকেরা তাকেও সমান দোষী ভাবে! সে কারণে সালিশ ডেকে বিচার করে তাদের গ্রামের লোকেরা একঘরেই করে রেখেছে। কত দুঃখ, কত অপমানে জীবন পার করছে মায়মুনা! মেয়েও কি তার জীবনের ছায়ায় জীবন কাটাবে? মেয়েটার জীবনাকাশ এমনিতেই তো মেঘাচ্ছন্ন। সে আকাশের কোণে এখন চলছে প্রবল ঝড়ের প্রস্তুতি। অবুঝ মেয়ে কি পারবে সে ঝড়ের মুখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে? …বাইরে রাত গভীর হয়। মায়মুনার মনে এলোমেলো চিন্তারা দৌড়াদৌড়ি করতেই থাকে। …ঘুমের ঘোরে তালেব এক হাত বাড়িয়ে দেয় মায়মুনার দিকে। তালেবের হাতের ছোঁয়ায় যেন কেঁপে ওঠে মায়মুনার শরীর। আচমকাই যেন স্থির হয় মায়মুনার মন। মনের সংকল্প সফল বাস্তবায়নের দিকে এগোয়। মন থেকে মায়মুনা সব দ্বিধা ছুড়ে ফেলে। হাতে ধরা বালিশটা চেপে ধরে তালেবের মুখে। অথর্ব তালেব চেষ্টা করে নিশ^াস নিতে। পারে না। হাত ছোড়ে, মায়মুনাকে খামচে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। পারে না। কোন এক শক্তি যেন অথর্ব শরীরকে ছেড়ে যেতে চায় না। …মায়মুনা চেপেই ধরে রাখে বালিশ। সর্বশক্তিতে। অতীতের সমস্ত ঘৃণা মনে নিয়ে। অতীতের সব দুঃখ বুকে নিয়ে। মেয়ের দিকে তাকিয়ে শরীরে শক্তি সঞ্চয় করে। বুক জুড়ে থাকা পাথরটা সরাতে, সর্বশক্তি জড়ো করে দু-হাতের কবজিতে।…একসময় নিস্তেজ হয় তালেব। অনেকক্ষণ পরেই হয়। মায়মুনার সারা শরীর ঘামে ভিজে উঠেছে ততক্ষণে। চৌদ্দ বছরের ভারী পাথরটা যেন কখন সরে গেছে বুক থেকে! মায়মুনা এখন ঘরের মেঝেতে কবর দিয়ে দেবে সেই পাথরটাকে। মানুষজন জানে, পঙ্গু তালেব দিনের পর দিন ঘরেই শুয়ে থাকে। কেউ খুঁজতে আসবে না, তালেব কই হারাল বলে। মেয়েটা তালেবের পাশে শুয়েও টের পায়নি কিছু। কেমন অসহায় ভঙ্গিতে হাত-পা কুঁকড়ে শুয়ে আছে। মায়মুনা মেয়ের গাল হাত ছোঁয়ায়। আদুরি আরেকটু সরে আসে মায়ের দিকে। মায়মুনা মেয়ের পাশে শুয়ে জড়িয়ে ধরে মেয়েকে। …আদুরির গায়ের গন্ধ নিতে নিতে ভাবে, পেটের বিষটাকে সময় থাকতেই শেষ করে দিতে হবে। … মেয়ের ওপর যারা অত্যাচারটা করেছে তাদের হয়তো শাস্তি দিতে পারবে না মায়মুনা। তবে, তাদেরই মতো একজনকে তো শেষ করতে পেরেছে। এখন তার কপালে যা আছে তাই হবে। চৌদ্দ বছর বুকে চেপে বসা পাথরটাকে এখন সে পুঁতে রাখবে মাটির নিচে। অনেক অনেক দিন পর নিজেকে কেমন ভারমুক্ত লাগে মায়মুনার।

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>