| 21 এপ্রিল 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প

অনুবাদ উপন্যাস: সুবালা (পর্ব-৪) । হোমেন বরগোহাঞি

প্রচ্ছদশিল্পী: শৌনক দত্ত
আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

লেখক পরিচিতি-১৯৩২ সনে লখিমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোটো গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক  রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়। সুবালা লেখকের প্রথম উপন্যাস।


(৭)

      এই অবিস্মরণীয় যুদ্ধের বিষয়ে একটা কথা আমি বলে রাখতে  চাই। না হলে পরে বলার সময় পাব না বা ভুলে যাব। জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতারই একটা মূল্য আছে। সেদিনের সেই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও পরবর্তী জীবনে আমাকে অনেক ক্ষেত্রে অনেক সাহায্য করেছিল। সেদিনই আমি একটি কথা ভালোভাবে বুঝতে শিখলাম যে যুদ্ধে নিজের গা বাঁচাতে হলে বা প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে হলে প্রতিপক্ষের বা নিজের প্রতি হৃদয়ে বিন্দুমাত্র মমতা রাখা উচিত নয়। মরবো বা মারবো বলে মন ঠিক করে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলে পরাজয়ের কোনো ভয় থাকে না। মায়ের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধে আমার বিদ্যারম্ভ হল— তারপরেও অন্য অনেকের সঙ্গেই আমাকৈ যে কত যুদ্ধ করতে হয়েছে তার হিসেব নেই। সম্মুখ যুদ্ধে আজ পর্যন্ত কেউ আমার সঙ্গে পেরে ওঠেনি। কিন্তু মায়ের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধে আমি যদি সেদিন একই আঁচড়ে মাথার একমুঠো চুল উপড়ে ফেলতে না পারতাম , তাহলে আমার জীবন কাহিনী লিখতে আজ পর্যন্ত আমি বেঁচে থাকতাম না।

(৮)

      সেদিন আমি মাকে কেন মেরে ফেললাম না সে কথা ভেবে মাঝেমধ্যে আমার অনুতাপ হয়। তাঁর ভালোর জন্যই আমি পারলে সেদিন তাকে মেরে ফেলা উচিত ছিল। কারণ তিনি আর মানুষ ছিলেন না, কারো পৈশাচিক মন্ত্রের প্রভাবে তিনি যেন ডাইনীতে পরিণত হয়েছিলেন। অর্জুন সিং পাঞ্জাবি একদিন সত্যিই দিদিকে কীভাবে নিয়ে গেল, আমি এখন সে কথা বলব। একদিন দুপুরবেলা দুপুরের খাবার খেয়ে মা গ্রামে বেড়াতে যাবার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। মাঝেমধ্যে মা এভাবে বেড়াতে যেতেন, তাই তা নিয়ে কার ও কিছু বলার ছিল না। কিন্তু বিকেল পর্যন্ত যখন মা ফিরে এল না, আমাদের মনে নানা সন্দেহ এবং দুশ্চিন্তার উদয় হল। দিদি আমি বলাবলি করতে লাগলাম, বিনা কারণে মা মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ানোর মানুষ নয় আর আশেপাশের কোনো বাড়িতে গেলে ফিরে আসতে তার এত দেরি হত না। তিনি নিশ্চয় দূরে কোথাও গিয়েছেন। কিন্তু কেন? ভাইয়ের মৃত্যুর পরে মা লোকের বাড়িতে কাজকর্ম করা একেবারে ছেড়ে দিয়েছিলেন। তাই আজ যে হঠাৎ তিনি মানুষের বাড়িতে কাজের খোঁজে যাবেন সে কথা ভাবার মতো কোনো যুক্তি নেই। তিনি নিশ্চয়ই দূরের কোন জায়গায় গিয়েছেন, আর বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু কী সেই উদ্দেশ্য? আমরা নানান কথা ভাবতে শুরু করলাম। কিছুদিন থেকে মায়ের কান্ডকারখানা দেখে তার মস্তিষ্কের সুস্থতা সম্পর্কে আমরা সন্দেহ করতে শুরু করেছিলাম। এইরকম অবস্থায় তিনি হঠাৎ বাড়ি ছেড়ে কোথাও চলে যাওয়াটা আশ্চর্যের কথা নয় । কিন্তু সেই অশুভ সম্ভাবনার কথা আমাদের বেশিক্ষণ ভাবতে হল না । স্বস্তির একটা নিশ্বাস ফেলে আমরা লক্ষ্য করলাম বাড়ির সামনের একটা গেট দিয়ে মা বাড়িতে প্রবেশ করছে।

      মা নিরবে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে অবশ হবে আগুনের সামনে বসে পড়ল। আমরা কৌতুহলী দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকাতে লাগলাম। আমাদের মনে হল , তিনি যেন আমাদের দৃষ্টির বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠেছেন এবং মনে মনে খুব বিব্রত অনুভব করছেন। স্বাভাবিক এবং সহজ হওয়ার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করার ফলে তার মুখের ভাব বেশি অস্বাভাবিক হয়ে পড়েছে। তিনি যে কিছু একটা কথা আমাদের থেকে গোপন করার চেষ্টা করছেন এবং আমরা তাকে কোনো প্রশ্ন করব বলে ভেবে ভয় পাচ্ছেন সেই বিষয়ে আমাদের মনে কোনো সন্দেহ ছিল না। বেশি সময় রহস্যের মধ্যে থাকার মতো ধৈর্য আমার ছিল না, আমি সোজাসুজি তাকে প্রশ্ন করলাম, শআজ তুমি কোথায় গিয়েছিলে মা?’

      আমি আশা করেছিলাম ক্রোধে  যে উন্মক্ত হয়ে কিছু একটা বলে তিনি আমার মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু তিনি তার পক্ষে অস্বাভাবিক শান্ত এবং কোমলকন্ঠে  উত্তর দিলেন,’ কি আর বলবি মা, গিয়েছিলাম মধু মহাজনের বাড়িতে ১০০ টাকা ধার চাইতে।’ আমার দ্বিতীয় প্রশ্নের আগেই অনুমান করে তিনি এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন( আমার তখনই তাকে সন্দেহ করা উচিত ছিল), দিদির বিয়েটা এই বছরই দিতে হবে। কিন্তু হাতে একটিও পয়সা না নিয়ে কীভাবে বিয়ের আয়োজন করব? ভাতের হাঁড়িটা তুলে দে। আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে। দেখি সুবালা, ওই ঘটিটা আমার দিকে এগিয়ে দে তো। খুব চেষ্টা পেয়েছে। কম রাস্তা যেতে হবে কি? ‘


আরো পড়ুন: সুবালা (পর্ব-৩) । হোমেন বরগোহাঞি


 

      আমরা দুজনেই একেবারে স্তব্ধ, হতভম্ব। মায়ের মুখে একসঙ্গে এতগুলো কথা সারা জীবনে আমরা কখন ও শুনিনি। কিন্তু তার কথায় আমি আর কোনো সন্দেহ করলাম না। কেবল সামান্য সন্দেহ করলাম যে এসব বোধহয় তার  পাগল হতে চলারই লক্ষণ । তাকে আর কোন প্রশ্ন না করে আমি ভাত রান্নায় ব্যস্ত হলাম ।

      মধ্যরাতে একটা আকস্মিক আঘাতে চমকে উঠে জেগে চিৎকার করতে যেতেই আমি ভীষণ আতঙ্কে আবিস্কার করলাম যে আমার মুখটা কেউ খুব জোরে কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেলেছে। ঠিক এরকম একটি মুহূর্তে অন্য কেউ একজন আমার হাত এবং দুটি পা নড়াচড়া করতে না পারার মতো বেঁধে ফেলল। নিজেকে মুক্ত করার বৃথা চেষ্টা না করে আমি বিছানায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মা ওরা আছে কিনা পরীক্ষা করে দেখলাম। ওদের কেউ নেই। আমি তখন স্থির হয়ে কানের মাধ্যমে ঘটনাটার আভাস পেতে চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণের জন্য ঘরের বাইরে আমি কয়েক জোড়া পায়ের ব্যস্ত ভাবে এদিক ওদিকে আসা যাওয়ার শব্দ শুনতে পেলাম। কিছুক্ষণ পরে পায়ের শব্দগুলি ক্রমান্বয়ে দূরে মিলিয়ে গেল। তারপরে সমস্ত কিছু নীরব।

      এত আচম্বিতে এবং এত কম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন ঘটনাটা ঘটে গেল যে কিছু সময়ের জন্য আমি কোনো কথা ভাবতেই পারলাম না। এমনকি আমি যতটা ভয় পাওয়া উচিত ছিল ততটুকু ভয় পেলাম না। হঠাৎ একটা আশ্চর্য অবসাদ আমাকে ঘিরে ধরল। জীবনে যেন কোনো বিষয়ে চিন্তা করার কোনো দরকার নেই, সমস্ত চিন্তাই অর্থহীন, যা ঘটছে শেষ পর্যন্ত তাকে ঘটতে দেওয়াই একমাত্র কর্তব্য–’ এরকম একটা ভাবে আচ্ছন্ন হয়ে আমি অসার হয়ে পড়ে রইলাম।

      কিছুক্ষণ পরে আমি অনুভব করলাম,কেউ আমার হাত পায়ের বাঁধনগুলি খুলে দিয়েছে।শ্বাস-প্রশ্বাসের পরিচিত শব্দে আমি অনুমান করলাম,আমার মা।মুখের কাপড়টা সরানোর সঙ্গে সঙ্গেই দেখলাম,ঘরটা অন্ধকার নয়,মা ইতিমধ্যে আলো জ্বালিয়েছে।মুখটা খুলতে পারলেই আমি মাকে কী জিজ্ঞেস করব আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম।বিছানায় বসেই এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম—‘তোমার হাত-পা বাঁধা ছিল না?’

      এক মুহূর্ত সময় নিয়ে তিনি কিছু একটা ভাবলেন।সত্যি বলবেন না মিথ্যা বলবেন তাই বোধ হয় ভেবে নিলেন।স্বাভাবিকভাবে সত্যি কথা বলাটা সেই মুহূর্তে তাঁর জন্য সহজ এবং নিরাপদ ছিল,তাই তিনি সত্যি কথা বলাটাই ঠিক করলেন,‘আমাকে কেন বাঁধবে?’

      ভেতরে ভেতরে একটা প্রচণ্ড ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর ক্রোধে আমি জ্বলে যাচ্ছিলাম,কিন্তু বাইরে যতটা সম্ভব শান্ত হয়ে আমি পুনরায় প্রশ্ন করলাম,‘দিদি কোথায় গেল?’

      ‘শোন সুবালা’—হঠাৎ খুব কঠোর শাসনের সুরে মা বলে উঠল—‘দিদির আজ অর্জুন সিঙের সঙ্গে বিয়ে দিলাম।আমাকে আর কোনো প্রশ্ন করবি না,করলে তোর মুখ ভেঙ্গে গুঁড়ো করে দেব।এখন চুপ করে শুয়ে থাক।’

      ফুঁ দিয়ে মা আলোটা নিভিয়ে দিল।

     

 

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত