| 23 জুলাই 2024
Categories
শারদ অর্ঘ্য ২০২৩

শারদ অর্ঘ্য গল্প: মূর্তি । দেবাশিস গঙ্গোপাধ্যায়

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

                                                                                    

রামরতন সাধাসিধে লোক। লোকে তাকে একটু বোকা হাবাই ভাবে।দোকানে গেলে জিনিষপত্র ভুলে যান। গিন্নী তিরস্কার করে বলে ‘ উফ। তোমাকে নিয়ে পারা গেল না। আনতে বললাম জিরে। নিয়ে এলে চিঁড়ে। কবে যে মাথায় বুদ্ধি খুলবে। চিরকাল বোকাহাবাই থেকে গেলে।

ছেলেমেয়েও পাত্তা দেয় না। মোবাইল বোঝেন না। নড়াচড়া করলে ছেলে বলে ‘শোনো। তোমার যা আইকিউ লেভেল। তাতে এসব বুঝবে না। বরং টিভি দ্যাখো।‘

মেয়ে আরো উপরে। ওর ফেসক্রিম একবার দাঁড়ি কাটবার জন্য ভুল করে দিয়ে ফেলেছিলেন। মেয়ে রেগে লাল। যাচ্ছেতাই চিৎকার করে সে বলেই ফেলল ‘ বুড়ো হয়েছ। দাঁড়ি কাটবার দরকার কি? কে দেখবে তোমাকে।‘

পাড়ার বন্ধুরা তো দেখলেই পিনিক দেয়। হেডমাষ্টার শশধর তার বন্ধু। মাঝেমাঝেই তার মাথায় চাঁটি মেরে বলে্ন,” চিরকাল গবেট রয়ে গেলি। গাধা আর কাকে বলে।‘

মোটকথা রামরতনকে কেউ পাত্তা দেয় না। অবশ্য তাই নিয়ে তাঁর দু;খ নেই। সন্ধ্যেবেলা বাগানে বসেই  তিনি সময় কাটান।

বাগানে  বসে থাকতে থাকতেই  রামরতনের একদিন একটা সখ জাগল।  সখটার কথা ভেবে তিনি বেশিক্ষন বসে থাকতে পারলেন না। হাঁটাচলা শুরু করলেন। এই একটা কাজ তিনি করবেন। কারুকে বলবে্ন না। বাগানে  একটা মূর্তি বসাবেন।  তাঁর নিজের মূর্তি!

যেমন ভাবা তেমন কাজ। রামরতন চুপিচুপি ব্যাপারটা সারলেন।  এক শিল্পীর কাছে গেলেন। শিল্পীর সঙ্গে কথা হয়ে গেল। মাসদুয়েক পরে মূর্তি পাবার দিন ঠিক হল।

দেখতে দেখতে দুমাস পেরোল। মূর্তি নিয়ে আসার তোড়জোর শুরু করল। আনবার দিন রাতে রামরতন গিন্নীর কাছে খোলসা করলেন ।

গিন্নী বলল ‘ মূর্তি?কার?’

রামরতন বুক চিতিয়ে বললেন ‘আমার’

‘তোমার? অ্যা। তুমি কি পাগল? টুবলু। সোনাই। দ্যাখ তোর বাবা কি বলছে।‘

ছেলে মেয়ে যথারীতি  এল। ছেলে বলল ‘ মূর্তি? তোমার?  কি বলছ কি? লজ্জায় মুখ দেখান যাবে? ফালতু ব্যাপার।‘

মেয়ে বলল  ‘বাবা। প্লিজ। এসব কর না। তোমার জন্য আমার দুজন বয়ফ্রেন্ড পালিয়েছে। এসব শুনলে  সোহমও  চলে যাবে।এমনিতেই ও তোমার উপর খেপে।‘

রামরতন বললেন  ‘ কেন সোহম রাগল কেন?’

‘রাগবে না?’কি বোকা বোকা কথা বলছিলে সোহমের সঙ্গে। ওর চুল দেখে? ‘

‘’আহা। ওর টিকি দেখে জিজ্ঞেস করেছিলাম  মানত আছে কিনা?

‘উফ! ওটা স্টাইল। বাবা। ওটাকে পনিটেল বলে।‘

‘ঘোড়ার লেজ।‘

শুনে মেয়ে আরো রেগে গেল। যাবার আগে সাবধান করল ‘ ওইসব মূর্তি আনবে না বাবা।‘

 রামরতন  বোকা হলে কি হবে  জেদ কম নয়। সুতরাং পরেরদিন কারুকে না পেয়ে একাই তিনি মূর্তি আনলেন। মুখ ঢেকে নিয়ে এলেন।  ভাল একটা দিন দেখে মুর্তি বসাবেন।

এরমধ্যে গিন্নী চুপ করে বসে থাকেন নি।সকালবিকেল তার বিলাপ, চিৎকার কাজের মেয়ে পুঁটি শুনেছে। তার মারফত  পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে খবর চলে গেছে। বন্ধু হেডমাষ্টার শশধরদের বাড়িতেও পুঁটি কাজ করে। সে শশধরকে খবর দিল সর্বনাশ হয়েছে। রামরতন পাগল হয়ে গেছে।

শশধর কাগজ পড়ছিলেন। তিনি বললেন ‘ কেন?  গর্দভটা কি করল?’

‘মূর্তি বসাচ্ছে। ‘

‘মূর্তি? কার মূর্তি?’

‘সে কি আর জানি? গিন্নীমা বলল  নিজের মূর্তিই বসাচ্ছে। গিন্নী মা আপনাকে যেতে বলেছেন।‘

শশধরের কাগজ পড়া বন্ধ। রামরতনের বরাবর উদ্ভট কাজ করেছে। তিনি গুটিগুটি পায়ে  হাজির হলেন। তিনি দেখলেন রামরতন বাগানে ঘুরছেন। একটা জায়গা বেদী করেছেন।

রামরতন তাকে দেখে বললেন ‘ আয়। আয়।‘

শশধর বললেন ‘এ কি কান্ড শুনছি?’

‘ শুনেছিস। ‘ওই আর কি?’

‘মানে এমন একটা উদ্ভট শখ হল কেন তোর?’

রামরতন বললেন ‘  আহা। ইচ্ছে হয় না?’

‘তা বলে এমন ইচ্ছে?’ লোকে কি বলবে বল তো?’

‘লোকে কি বলবে?

শশধর বললেন  ‘ লোকে অনেককিছু বলতে পারে। হাসতে পারে।বলতে পারে তুই কি মহাপুরুষ?’

‘আহা। চারদিকে ভর্তি ভর্তি সাইনবোর্ড দেখি। কাকা কাকু, দিদি দাদার ছবি। তারা কি সব মহাপুরুষ? সেসব বাদ দে।  তুই এসেছিস যখন ভালই হয়েছে। তোকে দিয়েই উদবোধন করার।‘

‘আমি?’

রামরতন বললেন ‘ আচ্ছা। এক প্লেট বিরিয়ানী খাওয়াব। ওপেনিং করে দে বাবা।‘  তুই হেডু বলে কথা।‘

শশধর গলে গেলেন। ভারি একটা মূর্তি। তিনি বললেন ‘ ছবি তুলবি তো?

‘সব হবে।‘

কিন্তু শশধরের ওপেন করা হল না।  তারমধ্যেই  কিছু লোক রামরতনের বাড়ি হঠাৎ ঢুকে পড়ল।সামনে  চশমাপরা, ধুতি পরা লোকটিকে রামরতন চেনেন। নেতা মানুষ। কেষ্ট বিশ্বাস।

রামরতন বললেন ‘ আসুন। আসুন।‘

কেষ্ট বিশ্বাস বললেন ‘ আপনি রামরতনবাবু?’

‘হ্যা।‘

‘শুনলাম। আপনি কি একটা মুর্তি বসাচ্ছেন?’

‘আজ্ঞে।‘

‘কার মূর্তি?’

‘আজ্ঞে আমার?’

কেষ্ট বিশ্বাস বলল  ‘ হঠাৎ মূর্তি বসাচ্ছেন কেন?  এটা খুব খারাপ কাজ করেছেন।অগ্ণতান্ত্রিক কাজ।‘

রামরতন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন। তিনি মাথা চুলকে বললেন ‘ আমার অপরাধ কি?

‘দেশে এত লোক থাকতে আপনি নিজের মূর্তি স্থাপন করবেন ছি! ছি!’

ভিড় থেকেও কথাটার প্রতিধনি উঠল।  কয়েকজন সমস্বরে বলল ‘ আপনি কোন হনুদাস  যে মূর্তি স্থাপন করবেন ? তাও যদি আপনি কেষ্টদার মূর্তি স্থাপন করতেন!’

কেষ্ট বিশ্বাসের দলবল চিৎকার-চেঁচামেচি বাড়াল।  একজন বলল ‘ কেষ্টদা থাকতে আপনার মূর্তি বসবে? এত সাহস’।

রামরতন ইনিয়েবিনিয়ে কিছু বলতে চাইলেন। তাঁর কথা কেউ শুনল না।

এরমধ্যে খবর পেয়ে কেষ্ট বিশ্বাসের বিরোধী দল হাজির। তাদের নেতা হরিবাবু। তারাও চিৎকার শুরু করল।  তাদের দাবিও একটাই। হরিবাবুর মূর্তি স্থাপন করতে হবে।

দুদলের প্রায় মারপিট লেগে গেল। চারদিকে প্রবল হইচই। চিৎকার।  শশধর বিপদ বুঝে পুলিশকে ফোন করলেন। দশ মিনিটের মধ্যেই পুলিশ হাজির।পুলিশকে দেখে গন্ডোগোল একটু থামল।

পুলিশ  অফিসার কেষ্টবাবু ও হরিবাবুর সঙ্গে আলাদা করে কথা বললেন। কথা বলার পর রামরতনকে ধরলেন। তিনি ধমক দিয়ে বললেন ‘ আপনি তো ডেনজার লোক মশাই।‘

রামরতন বললেন ‘ ডেঞ্জার?

 ‘ইয়েস। আপনার লাইসেন্স কোথায়? দেখান?’

‘লাইসেন্স?’

‘হ্যাঁ। মূর্তি ব্যাপারটাই খুব সেনসিটিভ। মূর্তির মধ্যে দিয়েই সোনা রুপা তামা সবকিছু পাচার করা হয়। আপনি যে কিছু লুকোচ্ছেন তা কি করে বুঝব?’

রামরতন ভ্যাবাচাকা খেয়ে বললেন ‘ বিশ্বাস করুন। কিছু নেই এর মধ্যে’

‘আপনি বললে তো হবে না। মূর্তি ভাঙ্গতে হবে। দেখতে হবে কোনো কিছু লুকান আছে কিনা?’

রামরতন আঁতকে উঠে বললেন ‘ ‘ সে কি!’

পুলিশ অফিসার একটা মোড়ায় বসে বললেন ‘ এমন একটা কেলেঙ্কারী কান্ড কেন ঘটালেন আপনি? আপনার সেন্স নেই কোনো? জীবিত লোক কেউ মূর্তি করায়?’

পুলিশ অফিসার কেষ্টবাবু ও হরিবাবুর সঙ্গে শলাপরামর্শ করলেন।  তিনি বললেন ‘ তাহলে মূর্তি ভেঙ্গে ফেলি কি বলেন?’

কেষ্টবাবু বললেন ‘ উহু। মূর্তি ভাঙ্গা ঠিক হবে না। কি বলেন হরিবাবু?’

হরিবাবু বললেন ‘ হু। সেটা করলে আবার বাজে ব্যাপার হবে’ ব্যক্তিস্বাধীনতা না কিসব বলে তাতে হস্তক্ষেপ হবে!’

পুলিশ বললেন ‘ তাহলে?’

কেষ্টবাবু বলল  শুনুন। যার খুসী মূর্তি বসাক। বিনা পয়সায় বসাতে দেবেন না।‘

 পুলিশ অফিসারের মুখ উজ্জ্বল হল। তিনি বললেন  ‘ এতক্ষণে একটা কথা বলেছেন। হরিদা কি বলেন?’

‘ফাইন করুন। ফাইন।‘

পুলিশ অফিসার চাপা স্বরে বললেন  ‘ শুনুন। যা ভিড়। এখন চট করে ওইসব বলা যাবে না। দিনকাল বোঝেন তো। কোথায় কি ভাইরাল হয়ে যাবে। কে কাকে টাকা দিচ্ছে দেখে ফেলবে।ওই দেখুন মিডিয়াও চলে এসেছে। তার চেয়ে এখন অনুষ্ঠান বন্ধ করে দি। তারপর ঝোপ বুঝে কোপ মারা যাবে।‘

কেষ্টবাবুরা তার কথায় সায় দিলেন।পুলিশ অফিসার  রামরতনের কাছে গিয়ে বললেন “ আজ ওপেনিং হবে না।‘

‘ইয়ে। কেন?’

‘হুম। আমরা আগে তদন্ত করব। দেখব মূর্তিটা নিরামিষ কিনা মানে এর মধ্যে বোমা আছে কিনা? তারপর সিদ্ধান্ত।‘

রামরতন মুষড়ে পড়লেন।

পুলিশ অফিসার যাবার পরই মিডিয়া ঝাঁপাল। রামরতন  বিষন্ন হয়ে বসে আছে্ন দেখে তাকে হাজার প্রশ্ন শুরু করল। একজন বুম লাগিয়ে বলতে শুরু করল ‘এইমাত্র পুলিশ মুর্তি স্থাপন আটকে দিল। ভাবুন আপনারা। রামরতনবাবুকে দেখুন। আর তার মুর্তিকে দেখুন। দুজনেই কেমন কষ্টে রয়েছে।‘

একটি মহিলা সাংবাদিক জিজ্ঞেস করল  ‘আচ্ছা। রামরতনবাবু। আপনার মূর্তি স্থাপন করতে পারছেন না। আপনার কেমন লাগছে? মাথা ব্যাথা? পেট খারাপ। নাকি মন খারাপ। না। না এড়িয়ে যাবেন না। সারা দেশ আপনার পাশে আছে। আপনি বলুন স্যার।‘

রামরতন  উত্তর দিলেন না।

সাংবাদিক বলল ‘ দেখুন। উনি কথা বলতে পারছেন না। বোবা হয়ে গেছেন। ভাবুন। একটা লোক নিজের মূর্তি বসাতে পারছে না?তাও  অন্যের নয়। নিজের!’

সন্ধ্যের পর সবকটা চ্যানেল খবর একটাই।রামরতনের মূর্তির খবর।ঘন্টায় ঘন্টায় মিনিটে মিনিটে  তা দেখানো হল।চ্যানেলে লোক বসে গেল। আলোচনা শুরু হল সম্ভাব্য মূর্তির হাইট কেমন।  তা কি দিয়ে তৈরি।  মূর্তিটা বসে আছে না দাঁড়িয়ে।বিতর্ক শুরু হয়ে গেল। কেউ রামরতনকে সাপোর্ট করল। কেউ তার বিরোধিতা করল। সঞ্চালক জিজ্ঞাসা ছূঁড়ে দিলেন ‘ আইন কি বলে?’ কেউ যদি নিজের মূর্তি বসাতে চায় তা কি  অপরাধ?’

আইনজ্ঞরা কেউ পক্ষে। কেউ বিপক্ষে। পাবলিক ঘরে বসে, চায়ের দোকানে  মাঝেমাঝে রামরতনকে দেখল।  দেখল বাগানের মধ্যে  ঢাকা মূর্তি। সাংবাদিকরা বারবার  বললেন ‘  পুলিশ কি পারমিশন দেবে? দিলে কবে দেবে? নাকি  তারা মূর্তি ভেঙ্গে দেবে?  আদৌ কি রামরতনবাবু নিজের মূর্তি উদবোধন করতে পারবেন? কারা কি বলছে দেখুন? চোখ রাখুন পর্দায়।‘

পাবলিকের মধ্যেও দুটো দল । তারা কেউ রামরতনের পক্ষে। কেউ বিপক্ষে।

রামরতনের বাড়ির সামনে ভিড়ে ভিড়।কেউ এখনো ঠিক করতে পারে নি কি হবে? সন্ধ্যে থেকে রাত গড়াল। ভীড় দেখে একজন ভ্রাম্যমান চা নিয়ে ঘুরল। দুজন আলুকাবরী। ছেলেমেয়েরা গঙ্গাধারে  প্রেম করতে যেত। তার বদলে তারাও এখানে চলে এল। বুঁদি পটকাকে বলল ‘ পুরুষরা কেমন স্বার্থপর হয় দ্যাখ?’

‘কেন?’

‘দাদু কেমন নিজের মূর্তি বসিয়েছে। দিদিমা কই?’

পটকা আবেগে ভেসে  বলল ‘ ভাবিস না। আমি তোর মূর্তি বসাব’।

বুঁদি বলল ‘ খবরদার। মূর্তি বসাবি না।‘

‘কেন?’

‘মূর্তির মাথায় দেখিস না পাখীরা অ্যা করে। ছ্যা।‘

পুলিশ দুদিন ঝুলিয়ে রাখল।দুদিন ধরে ব্যাপারটা চলল।এই দুদিন চারদিক থেকে লোক আসছে। রামরতনের বাড়ির সামনে সামিয়ানা টাঙানো হল। পাবলিক। গায়ক। প্রতিবাদী ব্রান্ড।  মাইকিং হচ্ছে।  কবি কবিতা পড়ছে। 

‘আজ জেগে উঠেছে সব/ আমরা সবাই বসাব মূর্তি।

কে দেবে বাধা  মূর্তির পাশে বসে করব  ফুর্তি।‘

কে একজন বলল ‘ হচ্ছে না। আরো স্ট্রং কবিতা চাই।‘

কবি বলল ‘ ওকে ওকে।  এবার দ্যাখ।  ‘

‘– ‘কে দিবি বাধাবে?মুর্তি বসাবাই শালা।

রামরতনের গলায় পরাব ঘুটের মালা।সরি সরি  রজনিগন্ধার মালা।‘’

ব্রাণ্ডে গিটার বাজিয়ে গাইছে।  ‘ ওরা আমাদের মুর্তি  বসাতে দেয় না বোকা ভাই আমার  রামবাবু। / আমরা বসাবোই আমরা বসাবোই——-।

 পাশে একটা প্রাইমারী স্কুল ছিল। মাষ্টারশুদ্ধ ছাত্ররা সারাদুপর এখানে কাটাল। কলেজে কেটে ছেলেরা এল। দু একটা মিছিল শুরু হল। তাতে রামরতনের বিদ্ধস্ত ছবি।  স্লোগান লেখা হল ‘ নিজমূর্তি বাচাঁও আন্দোলন।

রামরতন বিখ্যাত হয়ে গেলেন। কিন্তু পুলিশ এখনোও সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।

শেষপযন্ত অবশ্য  সবকিছু পাল্টে গেল।দুদিন বাদে এল  বিসনেস ম্যান।বিরাট চেহারার   সত্যবান বাবু।  সত্যবানের জিনিষপত্র কেনাবেচা  পেশা। সে এসে বলল ‘ রামবাবু। আমি জানি এ  মুর্তি খুব দামী আছে। নইলে কি এমন ভাইরাল হয়? আপনি পুরো দেশ কাঁপিয়ে দিয়েছেন।‘

রামরতন বলেন ‘ না। না’

‘আমাকে ফাঁকি দিতে পারবেন না।আপনি চালাক লোক আছেন। ‘

রামরতনবাবু  কি বলবেন ভেবে পেলেন না। এই প্রথম কেউ তাকে চালাক বলছে।‘ ‘চালাক?’

‘হ্যাঁ। চালাক না হলে এমন করে।আমি ঠিক বুঝছি এটা নিশ্চয়  দামী কোন মুর্তি বা পেন্ট।‘

‘না। না।‘

‘আমি জানি রামবাবু।দুনিয়ায় যত ভাল মুর্তি সব আমার চাই।  এ মূর্তিও আমি চাই।  আপনি আমাকে দিয়ে দিন মূর্তিটা। আপনাকে  পাঁচ লাখ দেব। পাঁচ নয় আচ্ছা  দশ  দিতে পারি।‘

রামরতন  চোখে ভিমড়ি খেল। এত টাকা !

‘এ মূর্তি  কোথাও থেকে পেয়েছেন নিশ্চয়।  পরশপাথরের মতো  দামী মুর্তি।  নিলাম হবে। দেশবিদেশ ঘুরতে যাবে। বিশ দশ পার্সেন্টেজ পাবেন। ভাবুন।ভাবুন।‘

‘সে তো বটেই’।

গিন্নী  ছেলেমেয়ে পাশে ছিল। তারা  ইশারা করে বলল রাজি হয়ে যাও।

‘রাজি তো হব। মূর্তি দেখবেন না?’

‘সে তো দেখব। কিছু চিন্তা করবেন না। আমি সব ব্যবস্থা করছি। আপনি ওপেন করুন। যারা আপনার পেছন লাগছে সব ছোট লিডার। আমি উচুঁ মাথায় ফোন করছি। আজকেই ওপেন করুন। তবে আপনাকে কথা দিতে হবে মূর্তি পছন্দ হলে আমাকে দিতে হবে।‘

‘আচ্ছা। তাই।‘

সত্যবান  একটু দেখলেন রামরতনবাবুকে। তারপর বললেন ‘ আপনার মূর্তি?

‘হ্যা।‘

সত্যবান  ফিসফিস করে বলল ‘ মূর্তিটা কি সোনার ? রামরতনবাবু?’

রামরতনবাবু বললেন ‘ কি যে বলেন?’

আচ্ছা। দেখি তো। কিছু তো একটা হবেই। ‘

মিডিয়া ইতিমধ্যে খবর ভাইরাল করে দিয়েছে। মূর্তি নাকি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবাদীরা স্লোগান তুলল, দেশের জিনিষ বিক্রি করা যাবে না। সত্যবান দুর হটো।

কিন্তু  সত্যবানের জোর অনেক বেশী।সে মূর্তি ওপেন করার ব্যাবস্থা করল। বিকেলে ওপেন হবে। চারদিকে সাজো সাজো রব। বাগানে একটা ফিক্সড ক্যামেরা বসে গেল। লাইভ টেলিকাষ্ট হবে।কেষ্ট ও হরি , হেডমাষ্টার এরমধ্যেই  সত্যবানের কথায় কাত হয়ে গেছে। তারা একশ আশি ডিগ্রী ঘুরে গেছে। সকলের  ইচ্ছে মূর্তি তারা ওপেন করবে।

টিভির সামনে শশধর বাইট দিলেন। রামরতনের পিঠ চাপড়ে বললেন ‘ আমার বন্ধু রামরতন। দারুন ইন্টেলিজেন্ট।‘

‘ওর বুদ্ধির যদি একটা গল্প বলেন?’

শশধর বললেন  ‘একটা কেন? দশটা বলতে পারি।একবার একটা ঘুড়ি আটকে গেছিল মগডালে। কেউ আনতে পারছে না। রামরতনই গেল।‘

‘মগডালে?’

‘হ্যা। ঘুড়িও পাড়ল। ও নিজেও  পড়ল। ভাবুন কি বুদ্ধি!মূর্তিটা আমিই ওপেন করব। কবে থেকে বলছে। ছোটবেলার বন্ধু না করতে পারি!’

 কেষ্ট মুকুর্জেকে মিডীয়া ধরল।  সে বলল ‘ আমি ছাড়া কে ওপেন করবে? আমি রামরতনদার ঘরের লোক। যে কোন কাজে আমি সবসময় আছি।‘

হরিবাবুও  ছাড় দিল না। সে মুখ বেঁকিয়ে বলল  ‘কেষ্টবাবু রামরতনকে চেনেই না। আমি সেবার পাড়ায় নিয়ে গিয়ে সংবদ্ধনা দিয়েছিলাম।‘

কেষ্টবাবু বলল ‘ মিথ্যে কথা বলছে। রামরতনবাবুকে ক্লাবে নিয়ে গিয়ে আটকে রেখেছিল। টাকা চেয়েছিল। সত্য কখনো গোপন থাকে না।‘

‘আপনি কি করেছিলেন? পুজোর সময় চাঁদার জন্য থ্রেট দিয়েছিলেন।‘

ঘরেও একচোট বদল হয়েছে। ছেলের হাতে সরবত। তার পিছু পিছু ঘুরছে। সে ফিসফিস করে বলছে।  ‘উফ। বাবা। চারদিকে চ্যানেল। আমিই কিন্তু  মুখাগ্নি করব।‘

‘মুখাগ্নি?’

ইস! স্লিপ অফ টাং বাবা। কিছু মনে কর না। তবে  অগ্নি না থাক তোমার মুখ তো আছে। চান্সটা কিন্তু আমাকে দেবে’ ‘

মেয়েও কম যায় না।  সে বাবাকে জড়িয়ে আদর করতে করতে বলল ‘ বাবা। সোহম এসেছে।‘

‘আচ্ছা।‘

‘ওর পনিটেলটা কেটে দিয়েছে।‘

‘কেটেছে?’

‘হ্যাঁ। বলল  কাকুর যখন পছন্দ নয় রাখব কেন?’

‘বাহ।‘

মেয়ে বলল ‘ বাবা ও চাইছে ওপেনিং-এ থাকতে। আমি আর সোহম ওপেনিং করব হ্যা। বাবা।‘

কিন্তু  সত্যবান সব উড়িয়ে দিল।সে কারুকে পাত্তা দিল না। সে বলল  অন্য কেউ করবে কেন? ওপেন রামরতনবাবুই করবে।

তাই হল। পুলিশ রেডী।  মিড়িয়া হামলে ছবি তুলছে। রামরতন  ধীরে ধীরে মূর্তি ওপেন করলেন।

রুদ্ধশ্বাস মুহুর্ত। টিভিতে লাইভ টেলিকাষ্ট হচ্ছে। রামরতন   ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন। তিনি চারদিক দেখলেন। দুচারদিন  খান নি। মুখটা শুকিয়ে গেছে।

পুলিস পাবলিক সরাচ্ছে।  চিৎকার চলছে। তারমধ্যেই  রামরতন মূর্তি  ওপেন করলেন।

চারদিক একমুহুর্ত স্তব্ধ।

মূর্তিটা একটা গাধার!

চারদিকের লোকজন প্রথমে অবাক তারপর উল্লাসে ফেটে পড়ল।  গাধা। গাধা!

রামরতনকে মিডিয়া ছেঁকে ধরেছে।‘ আপনি বলেছিলেন আপনার মূর্তি?’

রামরতন বললেন ‘ আমারই তো। আমাকে কে না বোকা হাবা গাধা বলে। বন্ধুরা বলে।বাপ মা বলত, স্কুলের মাষ্টার বলত। বউ  সারাক্ষণ বলে।ছেলেমেয়েরাও তাই ভাবে। তাই একটা নিজের মূর্তি বসালাম। কিন্তু বসিয়ে সুখ পেলাম না!’

‘কেন?’

‘আমি তো ভাবতাম আমিই একা গাধা। কিন্তু যা  দেখলাম  গাধার পাল চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নইলে এমন কান্ড হয় ?’

কথাটা শেষ হতে না হতে  সত্যবান  থেকে শুরু করে পুলিশ , কেষ্টবাবু , শশধর  গিন্নী, ছেলে, মেয়ে সব যত তাড়াতাড়ি পারল কেটে পড়ল।এমনকি মিডিয়াও!

বাগানে  তখন রামরতনবাবুর দিকে তাকিয়ে গাধাটা ফিকফিক করে হাসছে।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত