| 29 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

ইরাবতী গল্প: ধর্ম সঙ্কট । দিলীপ কুমার ঘোষ

আনুমানিক পঠনকাল: 11 মিনিট

  

  ইদানীং মেয়েটির মনে হয় সে ছেলেটিকে ভালবাসে না। অন্তত তেমন ভালবাসে না যে-ভালবাসা থাকলে সর্বস্ব ত্যাগ করা যায়। যদিও ছেলেটি মেয়েটিকে বোঝায়, ভাল তুমি অবশ্যই বাসো, কিন্তু তোমার ভালবাসা কখনও আত্মসুখ পাওয়াকেই পরম বলে মনে করে না। মেয়েটি বলে, সে তুমি যাই বোঝাও না কেন, আমি নিজেকে বুঝি। আমার কেন জানি না মনে হয় ভালবাসার চরম বিন্দুকে আমি বোধহয় কিছুতেই স্পর্শ করতে পারছি না।

 ছেলেটি জানে তারা কখনও ঘটা করে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হবে না। মেয়েটিও জানে মজলিশি শাদি তাদের বরাতে নেই। হ্যাঁ, ছেলেটি হিন্দু, মেয়েটি মুসলিম। এবং এটা অবশ্যই একবিংশ শতাব্দী। তবু শুধু ধর্ম আলাদা হওয়ার কারণে সকলকে নিয়ে সম্মানের সঙ্গে তারা ঘর বাঁধতে পারছে না।

 ছেলেটি ধর্মভীরু বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। অবশ্য একাধিক সন্তানের অন্যতম হলেও যে সমস্যা হত না তা নয়। মুসলিম মেয়ের সঙ্গে ছেলের প্রেমের সম্পর্ক জানাজানি হওয়ার পর থেকেই বাবা-ছেলের কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, দু’জনের চোখাচোখি হওয়াটাও যতটা সম্ভব এড়িয়ে যেতে পারলেই ভাল হয়। বাবা মাকে জানিয়ে দিয়েছেন, ছেলে যদি ওই মেয়েটিকে বিয়ে করে, তা হলে ছেলেকে ত্যাজ্যপুত্র করে সমস্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করবেন। শুধু তাই নয়, তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে যেন মুখাগ্নিও না করে।

 ছেলেটি এসব জেনেও পিছপা হয়নি এতটুকু। বরং মেয়েটি তাকে অনেক করে বুঝিয়েছে, এমন করতে নেই সোনা। ওঁদের জায়গাটা একটু ভেবে দেখো। সমাজ-সংসার তো আর ফেলনা নয়। এই বয়সে সমাজ থেকে প্রায় নির্বাসিত হয়ে ওঁরা দাঁড়াবেন কোথায়?

 কে বলেছে ওদের ওই গ্রাম-সমাজে পড়ে থাকতে? আমি তো মাকে কতবার বলেছি, গ্রামের বিষয়-সম্পত্তি সব বিক্রি করে শহরে চলে আসতে। তা হলে তো আর কোনও সমস্যা হয় না।

 তা হলেই সব সমস্যার সমাধান! তুমি মাঝে মাঝে এমন বোকার মতো কথা বলো না! কে বলেছে তোমাকে শহরে কোনও সমস্যা নেই? সমস্যা তো কোনও জায়গায় থাকে না, সমস্যা থাকে মানুষের মনে।

 তুমি কেন এমন ভেবে নিচ্ছ— সমস্যা যে স্থান-নিরপেক্ষ, সেটা আমি জানি না! আমি সেটা জানি। কিন্তু গ্রামে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়েও সমাজের যে ইন্টারফিয়ারেন্স, শহরে তো আর সেই হ্যাপা সামলাতে হয় না।

 তোমার কথা আমি মানছি। কিন্তু তুমি একবার ওঁদের কথাটা ভেবে দেখো। ওঁরা তো জীবনের বেশিরভাগটাই গ্রামে কাটিয়েছেন। এখন শেষ বয়সে সব ছেড়ে ওঁরা শহরে থাকবেন কী করে বলো তো?

 দেখো তুমি যদি ওদের হয়ে ওকালতি করতে চাও আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু আমি যা বলছি সেটা কি নতুন কিছু? কত বয়স্ক মানুষজনই তো গ্রাম ছেড়ে শহরে থাকছেন। কই তাতে তো তাঁদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে যাচ্ছে না।

 তুমি-আমি আর দূর থেকে কতটুকু বুঝি তাঁদের সমস্যা!… সে যা-ই হোক, আমি কখনওই ওঁদের হয়ে ওকালতি করছি না। আমি শুধু ওঁদের জায়গায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে বাস্তব সমস্যাগুলো উপলব্ধি করার চেষ্টা করছি। তুমি শুধু নিজের কথা ভাবছ কেন? তোমাকে একান্ত বাধ্য হয়ে ছাড়তে হলে আমারও যে কতটা কষ্ট হবে, তা একবার বোঝার চেষ্টা করো।

 হ্যাঁ, বুঝি বলেই তো কোনও অবস্থাতেই আমি তোমাকে ছাড়তে রাজি নই। আর তার জন্য আমি শেষ পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত।

 মেয়েটির পরিবারে ছেলেটিকে নিয়ে তেমন কোনও সমস্যা নেই। কেবল একটা শর্ত পালিত হলেই চলবে। ছেলেটিকে ধর্মান্তরিত হয়ে মেয়েটিকে গ্রহণ করতে হবে। ছেলেটির মনে প্রথমে যে একটু দ্বিধা ছিল না— সে কথা বললে সত্যের অপলাপ হবে। যতই সে নাস্তিক হোক এবং নিজের ধর্মের প্রতি আলাদা করে কোনও মোহ না-থাক, কিন্তু একটা আজন্ম লালিত সংস্কারের বাইরে বেরতে তার প্রথমে যে একটু মানসিক অসুবিধা হচ্ছিল না, তা নয়। কিন্তু সত্যিই সে মেয়েটির জন্য সব পারে। তাই প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে ওঠার পর, ধর্ম পরিবর্তনের শর্তে তার শেষ পর্যন্ত আর কোনও আপত্তি ছিল না।

 আর তার আপত্তি নেই বলেই মেয়েটির কোথাও একটু বাধছে। মেয়েটির মধ্যে সব সময় একটা শুদ্ধশীল ধর্মবোধ কাজ করে। ধর্মের সমস্ত অনুশাসনের মধ্যে সে শুভবোধ খুঁজে পায়। তার বিশ্বাস সমস্ত ধর্মেই মানুষের ভাল চাওয়া হয়েছে। তাই কেউ তার কুলধর্ম ত্যাগ করুক, এটা সে অন্তর থেকে মানতে পারে না। বিষয়টা তার খুব পছন্দের নয়।

 ছেলেটিকে সে বলেওছে, তুমি আমার জন্য কেন নিজের ধর্ম ত্যাগ দিতে চাইছ?

 ছেলেটি খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে জানিয়েছে, তুমি তো জানো ধর্ম নিয়ে আমার কখনওই কোনও মাথাব্যথা নেই। অনেকে দেখবে গঙ্গা পেরনোর সময় অথবা চলার পথে ধর্মস্থান চোখে পড়লে হাত তুলে প্রণাম করে। আমি কিন্তু করি না। করি না বললে ভুল বলা হবে, আসলে আমি ভিতর থেকে তাগিদই অনুভব করি না। তুমি তো দেখেওছ মন্দিরে গেলে প্রতিমা দর্শন না-করে আমি কেমন গঙ্গার ধারে বসে থাকি। আলাদা করে ধর্ম আমাকে একদম টানে না।

 অথচ সেই তুমিই তোমাদের ওখানে কালীপুজোর সময় মানত করে খালি পায়ে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার হেঁটে গঙ্গাজল নিয়ে আসো এবং প্রায় চব্বিশ ঘন্টা উপবাসে কাটাও। দেখো, নাস্তিক হওয়া অত সোজা নয়। আস্তিক হতে গেলে যেমন সাধনা লাগে তেমন নাস্তিক হতে গেলেও সংকল্প লাগে। আমি জানি তথাকথিত ধর্মের প্রতি সেই অর্থে তোমার কোনও দুর্বলতা বা আকর্ষণ নেই। কিন্তু তুমি যে সকল সংস্কারের ঊর্ধ্বে তা কিন্তু কখনও নয়। তুমি বললেও আমাকে বিশ্বাস করাতে পারবে না। আর সংস্কারটাই তো ধর্ম। তাই নয় কি?

 আমি অতশত জানিও না, বুঝিও না। আমি শুধু বুঝি তোমাকে। তুমি ছাড়া আমার কোনও ঈশ্বর নেই— নেই কোনও মন্দির-মসজিদ-গির্জা। তুমিই আমার কাছে ধর্ম। আর সেই শাশ্বত ধর্মানুশীলনে আমার কোনও ফাঁকি নেই। এই একটি ক্ষেত্রে আমি ভীষণ একনিষ্ঠ এবং আমার আনুগত্য প্রশ্নাতীত।

 এসব কথায় মেয়েটির বুক কাঁপে এবং সময় সময় ভয়ও লাগে। যে ছেলে ভালবাসার জন্য বাবা-মা-জাত-ধর্ম থেকে আরম্ভ করে সর্বস্ব ত্যাগ করতে রাজি হয়ে যায় তার ভালবাসা হয়তো প্রশ্নাতীত কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব কি সত্যিই ভরসা করার মতো? কে জানে! মেয়েটি তাই ছেলেটির ভালবাসায় সিঞ্চিত হতে হতেও নিজের ভিতরে জাগতে থাকা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। এসব প্রশ্ন মনে জাগলে তার নিজের একটুও ভাল লাগে না। ছেলেটি যেমন তাকে ভালবাসে, সে-ও ছেলেটিকে ততোধিক ভালবাসে এবং কোনওভাবেই তাকে সে হারাতে চায় না। হারানোর কথা ভাবলে তার সর্ব অঙ্গ যেন কেমন অবশ হয়ে আসতে থাকে। চোখে যেন সে অন্ধকার দেখতে আরম্ভ করে।


আরো পড়ুন: অচ্ছেদ্য । পার্থ ঘোষ


 ছেলেটি নানা উদাহরণ এনে হাজির করে। বিখ্যাত সাহিত্যিক, সফল রাজনীতিবিদ, খ্যাতনামা চিকিৎসকদের কথা বলে— যাঁরা তার মতোই হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম কন্যার পাণিগ্রহণ করে বহাল তবিয়তে ছিলেন বা রয়েছেন। মেয়েটি শোনে এবং তারপর মুখ টিপে হেসে ছেলেটিকে বলে, সফল এবং সেলিব্রিটিদের জগৎ আলাদা সোনা। কেউ খুব বিখ্যাত হয়ে গেলে সমাজে আপনা-আপনিই তাঁর মান্যতা তৈরি হয়। তখন তাঁর যে-কোনও ব্যক্তিগত বিষয় তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন বা নিয়ন্ত্রণ করার মতো জায়গায় তিনি অবস্থান করেন। সমাজকে তাঁর সব ব্যাপারে পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। উল্টে সমাজই তখন তাঁকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য হামলে পড়ে। তুমিও যদি কোনও বিষয়ে খুব সাফল্য পাও এবং বিখ্যাত হয়ে উঠতে পারো, তা হলে দেখবে আমাদের বিয়েতেও কোনও সমস্যা দেখা দেবে না। সব কিছু ঘটা করে মসৃণ ভাবে হয়ে যাবে।

 মেয়েটি তিন বোনের মধ্যে মেজ। দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছে তা প্রায় দশ বছর হতে চলল। বোন তার থেকে তিন বছরের ছোট। সবে এমএ পাশ করেছে। মেয়েটি নিজে এমএ, বিএড করে এসএসসি দিয়ে বসে আছে। ভেবেছিল স্কুলে পড়ানোর চাকরি তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবে। কিন্তু কোথায় কী!

 এসএসসি পরীক্ষার পর পরই মা একদিন মেয়েটিকে জানালেন, আব্বা তার বিয়ে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছেন। মেয়েটি প্রথমে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কিছুই বলেনি। মাস তিনেক পরে মা যখন একই কথা আবার বললেন তখন মেয়েটি পরীক্ষার রেজাল্টের দোহাই দিয়ে মাকে সাময়িক ভাবে ঠেকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু আরও মাস চারেক কাটার পর মা বললেন, তোর আব্বা কিন্তু আর দেরি করতে রাজি নন। মেয়েটি তখন ছেলেটির সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা মায়ের কাছে খুলে বলতে একপ্রকার বাধ্য হয়েছিল। স্বাভাবিক কারণেই মায়ের বিষয়টি ভাল লাগেনি। আব্বা শুনে প্রথমে মারাত্মক চমকে যান এবং পরে ভীষণ রাগারাগি শুরু করেন। পরে মেয়ের মুখ চেয়ে, তখনই কোনও সিদ্ধান্ত না-নিয়ে ধীরে চলো নীতি অবলম্বন করেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, মেয়েটির এই সম্পর্ক নিয়ে সবচেয়ে বেশি আপত্তি জানায় মেয়েটির বোন। মেয়েটি বাড়িতে কোনঠাসা হয়ে পড়তে থাকে। সে যখন নিজের অবস্থানে অনড় থাকার কারণে ভীষণ চাপের মধ্যে রয়েছে সেই সময় তার দিদি সকলকে বোঝানোর ভার নেয়। ষোলো বছর বয়সে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর যে-দিদির বিয়ে হয়ে গিয়েছিল— তিন সন্তানের মা যে-দিদি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ পড়ে— সে যে তার পাশে এভাবে এসে দাঁড়াবে মেয়েটি ভাবতে পারেনি। মেয়েটির মুখ থেকে সব কথা শুনে দিদি শুধু একবারই আক্ষেপ করে বলেছিল, ছেলেটি যদি মুসলিম হত! তারপর বোনের সিদ্ধান্ত নিয়ে আর একটিও বাক্যব্যয় না-করে সম্ভাব্য সমাধানসূত্র কী হতে পারে সে ব্যাপারে সকলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছিল। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয় ছেলেটি যদি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তা হলে মেয়েটির সঙ্গে শাদিতে পরিবারের কোনও আপত্তি নেই।

 ছেলেটি এখনও স্বাবলম্বী নয়। নেট কোয়ালিফাই করেছে কিন্তু তাতে তো আর চাকরি পাওয়া যায় না। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য তার অবশ্য চেষ্টার কসুর নেই। বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছে। সরকারি চাকরির ভরসায় না থেকে অন্যান্য জায়গাতেও কাজের চেষ্টা করছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সুবিধামতো কিছু হয়ে উঠছে না। সে নিশ্চিত মেয়েটিকে নিয়ে ঘর বাঁধতে গেলে তাকে বাড়ি ছাড়তেই হবে। অন্য দিকে মেয়েটির বাড়ি থেকে কোনও রকম আর্থিক সহায়তা নেওয়ার কথা সে ভাবতেই পারে না। সুতরাং, মেয়েটিকে নিয়ে জীবন পথে পাড়ি দিতে গেলে তাকেই যেমন ভাবে হোক সম্মান বজায় রেখে স্থায়ী এবং ভাল রোজগার করতে হবে। আর সেই রোজগারের বন্দোবস্ত করে ওঠাটা বর্তমানে ছেলেটির প্রয়োজনের তালিকায় একদম প্রথম সারিতে উঠে এসেছে।

 বিয়ের আগে, ইচ্ছা থাকলেও মেয়েটির পক্ষে ছেলেটির পাশে দাঁড়িয়ে আর্থিক অবলম্বন হয়ে ওঠা সম্ভবপর হয়ে উঠছে না। শিক্ষকতা ছাড়া মেয়ের অন্য কোনও চাকরির কথা মেয়েটির বাড়ির চিন্তা-ভাবনাতেই নেই। কিন্তু তাদের বোঝাবে কে, আজকের বাজারে শুধু নির্দিষ্ট একটা চাকরির আশায় বসে থাকলে চলে না! তার উপর মেয়েটি পড়াশোনায় অসাধারন কিছু নয়। ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি থাকলেও সহজেই প্রতিযোগিতার গন্ডি পেরিয়ে তার পক্ষে শিক্ষকতা জোগাড় করে ওঠা মুশকিল। কিন্তু বাড়িতে থেকে মেয়েটির পক্ষে অন্য চাকরির চেষ্টা করা এক প্রকার অসম্ভব।

 এদিকে তাদের গ্রামে এমন একটা ঘটনা ঘটল যা-তে ছেলেটা এই প্রথম ভিতর থেকে ঘাবড়ে গেল। গ্রামের যে-অংশে তাদের বসতবাটি সেই জয়চন্ডীতলা বারোয়ারি প্রায় দু’শো বছরের পুরনো বারোয়ারি। গ্রাম পঞ্চায়েতের মতো প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান না-হয়েও ক্ষমতাশালী সমান্তরাল সংগঠন। অনেকটা খাপ পঞ্চায়েতের মতো। গ্রামের লোক আজও যে-কোনও ঝামেলা-ঝঞ্ঝাটে আলোচনা-পরামর্শ অথবা সমাধানের জন্য পঞ্চায়েত বা থানায় যাওয়ার আগে বারোয়ারিতে যায়। প্রায় চারশোটি পরিবার এই বারোয়ারির অন্তর্ভুক্ত।

 তাদের সেই জয়চন্ডীতলা বারোয়ারিতে দেখা দেয় এক অভূতপূর্ব সঙ্কট— অভিনব সমস্যা। সমস্যা কেন্দ্রীভূত হয় বারোয়ারির সম্পাদককে ঘিরে। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে সম্পাদক নন, সম্পাদকের পিতৃত্বকে ঘিরে। সম্পাদকের বড় ছেলে মাস দশেক নিখোঁজ ছিল। কানাঘুষো শোনা যাচ্ছিল ছেলেটি নাকি কোন এক মুসলিম মেয়েকে বিয়ে করে অন্যত্র বসবাস করছে। ছেলেটি বাড়িতে না-থাকায় এবং প্রকৃত ঘটনা কী, সেটা সম্পর্কে কারও পরিষ্কার ধারণা না-থাকায় বিশেষ কোনও সমস্যা দেখা দেয়নি। ছেলেটির রোজগারপাতি তেমন কিছু ছিল না। স্থায়ী রোজগার না-থাকা ছেলে কোথায় আছে, কেমন আছে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছেলেটির মা এবং দাদু-ঠাকুরমা বাড়িতে কান্নাকাটি করতে আরম্ভ করায় সম্পাদক ভদ্রলোক এক প্রকার বাধ্য হন ঠিকানা জোগাড় করে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তারপর শুভদিন দেখে পয়লা বৈশাখ ছেলে-বউমাকে বাড়ি নিয়ে আসেন। এটাই তাঁর পক্ষে কাল হয়। ছেলেকে, তার মুসলিম স্ত্রীসহ, বাড়িতে ফিরিয়ে আনার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামে নিন্দার ঝড় বইতে আরম্ভ করে। মাতব্বররা বিষয়টি নিয়ে চাপ তৈরি করতে শুরু করে যা-তে বারোয়ারি এ-বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। চাপে পড়ে বারোয়ারির সভাপতি আপৎকালীন ভিত্তিতে জরুরি সভা ডাকতে প্রকারান্তরে বাধ্য হন। সভায় আলোচনার একটাই বিষয়বস্তু— সম্পাদকের অবিবেচনাপ্রসূত পুত্রস্নেহ। আলোচনা সভায় চরম অপমানের সম্মুখীন হন সম্পাদক। তাঁর বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হয়। একুশ সদস্যের কার্যকরী সমিতির সেই সভায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সম্পাদকের পরিবার আর বারোয়ারির সদস্য থাকতে পারবেন কি না সেই বিষয়ে। আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় সম্পাদক নীরব থাকেন। উপস্থিত একুশজনের মধ্যে উনিশজন সদস্য তাঁর পরিবারের সদস্যপদ খারিজের পক্ষে রায় দেন। ছেলের কৃতকর্মের জন্য পুরো পরিবারের বারোয়ারি থেকে বাদ যাওয়ার প্রস্তাবের বিপক্ষে বলেন শুধু চন্ডীমাতার পুরোহিত।

 একটা প্রতিপত্তিশালী পরিবারকে পুরোপুরি একঘরে হয়ে যেতে হয়। এককালের দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার পরিবারের উত্তরসূরীদের জন্য যে এমন পরিণাম অপেক্ষা করেছিল তা ভাবা যায় না। শেষ পর্যন্ত যতদূর শোনা যায় পরিবারটি গ্রামের পাট উঠিয়ে নিয়ে পাততাড়ি গুটিয়ে শহরেই স্থায়ী ভাবে আশ্রয় নেওয়ার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেছে। একেই বোধহয় বলে ইতিহাসের পরিহাস!

 ছেলেটি মেয়েটিকে বেশ চিন্তান্বিত স্বরে বলল, গণতন্ত্রের এই অপার মহিমা দেখে আমি কিন্তু যথেষ্ট ঘাবড়ে গেছি। এটা কেমন গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত! এতে কি প্রকৃত গণতন্ত্রের জয় হল, না পরাজয়?

 মেয়েটি বলল, তোমার কাছ থেকে যতদূর শুনলাম তাতে তো মনে হচ্ছে তোমাদের বারোয়ারির কার্যকরী সমিতির সদস্যরা সাধারণ মানুষের দ্বারা মনোনীত। সুতরাং সাধারণ মানুষ যেহেতু এর সঙ্গে জড়িয়ে, তাই কার্যকরী সমিতির সিদ্ধান্তকে আমরা গণতান্ত্রিক বলতে বাধ্য। এখন সিদ্ধান্তের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুমি তুলতেই পারো কিন্তু তাতে সিদ্ধান্ত তো আর বদলাবে না।

 এখানে একটা বড় ভরসা ছেলে-মেয়েটিকে পরিবার ত্যাগ করেনি। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কী হতে পারে ভেবে দেখেছ! এক তো পরিবারে ফেরার জায়গা নেই। তার উপর পরিবার যদি কোনও দিন ফিরিয়ে নেয়-ও, আমাদের কিন্তু গ্রাম-সমাজে সেই একঘরে হয়েই থাকতে হবে।

 ছেলেটিকে দুশ্চিন্তায় পড়তে দেখে মেয়েটি আন্তরিক ভাবে বলল, তোমাকে এখনও বলছি তাড়াহুড়ো করে কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ো না। সময় নাও। ভাবো। শুধু এটুকু নিশ্চিত জেনো, তোমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমি এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেব না, যা তোমার সিদ্ধান্তকে কোনও ভাবে প্রভাবিত করে। আমার বাড়িও আমাকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াতে বাধ্য করতে পারবে না। তুমি আমার উপর সম্পূর্ণ ভরসা রাখতে পারো।

 নতুন করে আবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কী আছে! সিদ্ধান্ত তো আমার নেওয়াই আছে এবং সেই সিদ্ধান্ত তো তুমি জানোও। তোমাকে আমি কোনও ভাবেই হারাতে রাজি নই। কিন্তু এখন দেখছি তোমাকে গ্রহণ করার রাস্তাটা যত সহজ ভেবেছিলাম, ততটা সহজ নয়। রাস্তাটা যেন ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।

 রাস্তাটা প্রথম থেকেই এমন জটিল ছিল। তুমি তখন এই ভাবে দেখোনি বলে বুঝতে পারোনি। আমি তোমাকে অনেকবার বলেওছি বোধহয় যে, জীবন কিন্তু বেশ বড় পরীক্ষা নিয়ে হাজির হচ্ছে। তুমি তো তখন পাত্তাই দাওনি। তোমার অবচেতনে হয়তো এই ভাবনা কাজ করেছে যে, স্রোত সব সময়ই অনুকূলে থাকবে। আবারও বলছি, আমার জন্য একান্ত বাধ্য হয়ে কোনও হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ো না।

 এর কয়েক মাস পরে ঘটা দু’টি ঘটনায় অবশ্য মেয়েটির কাছে ছবিটা অনেক পরিষ্কার হয়ে গেল। ছেলেটি টিউশন ধরেছিল। বছর দুয়েকের মধ্যেই তার টিউশনের বাজার ভাল জমে উঠল। দিনে তিন-চারটে ব্যাচ পড়তে আসে। সেই কারণে মেয়েটির সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎও আগের থেকে অনেক কমেছে। যোগাযোগ এখন অনেকটাই মোবাইল মারফত।

 সে বার মাস তিনেক পর দেখা। বসন্ত কেবিন থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বউবাজারের মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে তারা। ছেলেটি মেয়েটির কাছে একটি হিন্দি শব্দের অর্থ জানতে চাইল। মেয়েটির অর্থটা জানা থাকায় সে সেটা বলে জানতে চাইল, তোমার হঠাৎ এই শব্দের অর্থ জানার কী প্রয়োজন পড়ল? ছেলেটি মোবাইল অন করে হোয়াটসঅ্যাপের একটা মেসেজ মেয়েটাকে দেখাল। মেয়েটি একটা শ্বাস ছেড়ে জানতে চাইল, কে পাঠিয়েছে তোমাকে এই মেসেজটা? ছেলেটি বলল তার কাছে পড়তে আসা ক্লাস ইলেভেনের একটা মেয়ে সেটা পাঠিয়েছে। মেয়েটি শুনে বলে উঠল, তাই…! তোমার মোবাইলটা এক বার আমাকে দেবে। ছেলেটির বাড়িয়ে দেওয়া মোবাইল মেয়েটি হাতে নিল। তারপর সে তার পাঠানো যত মেসেজ ছেলেটির মোবাইলে ছিল সব এক এক করে ডিলিট করতে আরম্ভ করল। ছেলেটি প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে না-পেরে জিজ্ঞাসা করল, কী করছ? কোনও জবাব না-দিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে মেয়েটি চুপচাপ তার নিজের টেক্সট মেসেজগুলো মুছে দিতে থাকল। ছেলেটি উঁকি দিয়ে মেয়েটি কী করছে সেটা দেখে মোবাইলটা নিতে গেল। মেয়েটি কিন্তু সব ক’টা মেসেজ ডিলিট না-করা পর্যন্ত মোবাইলটা ছেলেটির হাতে ফিরিয়ে দিল না।

 প্রথম ঘটনাটা অবশ্য এর মাস চারেক আগে ঘটেছিল। সেদিন কফি হাউস থেকে বেরিয়ে তারা হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট পেরিয়ে চারমুখী ক্রসিংটায়। এ বার সেখানে পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছেলেটি সোজা ডানদিকে হেঁটে গিয়ে উঠবে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ আর মেয়েটি পিছন ফিরে সোজা এমজি রোডে। বিদায়ের সময় এসে গিয়েছে! একে অপরকে বিদায় জানিয়ে যে-যার পথে রওয়ানা দিয়েছে। মেয়েটির ভীষণ মন খারাপ করছিল। একটু হেঁটেই, হাঁটা থামিয়ে, সে আবার পিছন ফিরে ইউনিভার্সিটি ক্রসিংটায় চলে এল। ছেলেটি তখন সোজা সামনে হেঁটে যাচ্ছে। ফুরফুরে দৃপ্ত ভঙ্গিতে! দেখে মনে হয় কোথাও মন খারাপের কোনও ব্যাপার নেই। মেয়েটি তেমন কিছু না-ভেবেই ছেলেটির পিছনে হাঁটতে শুরু করল। ছেলেটি এক বারও পিছন ফিরে তাকাচ্ছে না। মেয়েটি মোবাইল বের করে ছেলেটিকে রিং করতে আরম্ভ করল। গাড়ির আওয়াজে ছেলেটি বোধহয় শুনতে পেল না। মেয়েটির মনে হল দৌড়ে যায়। কিন্তু রুচিতে বাধায় সে অনেক কষ্টে নিজেকে দমন করল। তার ভেতরটা তখন হুহু করছে। ছেলেটি সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে গিয়ে উঠল। মেয়েটি একটানা রিং করেই যাচ্ছিল। মেয়েটি একটু দূর থেকে দেখতে পেল ছেলেটি এ বার প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাচ্ছে। ছেলেটি কল রিসিভ করে বলল, হ্যাঁ, বলো। কী ব্যাপার? মেয়েটি বলল, নাহ্… এমনি। ছেলেটি বলল, বাস আসছে… এখন রাখি। তারপর কী মনে করে একবার পিছন ফিরে তাকাল। দেখল মেয়েটি একটু দূরে। মোবাইল কানে চেপে ধরে হেঁটে আসছে। তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ছেলেটি মোবাইলে বলল, কী হয়েছে? আমি কি বাসে উঠব না? মেয়েটি বলল, না, না… কিছু হয়নি। তুমি বাসে উঠে পড়ো। ছেলেটি বাসে উঠে গেল। বাসটা যখন তাদের হেঁটে আসা রাস্তাটা আড়াআড়ি পেরিয়ে যাচ্ছে, মেয়েটি তখনও হাঁটতে হাঁটতে আরও কিছুটা রাস্তা এগিয়ে এসেছে। বাসটা পেরিয়ে যেতে মেয়েটি দাঁড়িয়ে পড়ল। দাঁড়িয়েই রইল। তার দু’চোখে তখন অবিরল জলের ধারা। ছেলেটি বাসটা চেপে এগিয়ে যেতে থাকল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ পেরিয়ে ধর্মতলার উদ্দেশে।

 চার মাসের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এই দু’টো ঘটনায় ছ’বছরে এই প্রথম মেয়েটির মনে ছেলেটির ভালবাসা নিয়ে একটা অনিশ্চয়তাবোধ তৈরি হল। সে ভীষণ নিশ্চিন্ত ছিল। ছেলেটির প্রেম তার মধ্যে যে নিশ্চয়তাবোধ তৈরি করে দিয়েছিল সেটাই ছিল তার অনেকগুলো লড়াইয়ের রসদ। তাদের অতি রক্ষণশীল পরিবার। এমন রক্ষণশীলতা যে সেখানে বিয়ের আগে ভালবাসাতেই কেউ বিশ্বাস করে না। আর সেখানে তার কিনা হিন্দু ছেলের সঙ্গে প্রেমজ সম্পর্ক! এ রকম পরিবারে থেকে এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যে কত কঠিন তা সে-ই জানে। তাদের পরিবারে মেয়েদের কুড়ির আগেই বিয়ে হয়ে যায়। সেখানে সে শুধু পড়াশোনার দোহাই দিয়ে তার বিয়েটা এতদিন আটকে রেখেছিল। এদিকে তার পড়াশোনাও শেষ হয়ে গিয়েছে দু’বছর হতে চলল। অনেক কষ্টে সে ছেলেটির সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারে তার বাড়ির লোকের সম্মতি আদায় করতে পেরেছে। কিন্তু তার বাড়ি আর অপেক্ষা করতে রাজি নয়। মেয়েটির উপর বিয়ের জন্য চাপ ক্রমশ বাড়ছে। ছেলেটিকে ডেকে তার বাড়ি বোঝাপড়া করে নিতে চাইছে। ছেলেটির সিদ্ধান্ত মেয়েটির জানা ছিল। সে শুধু ছেলেটিকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য সময় দিচ্ছিল। কিন্তু এই প্রথম তার মনে হচ্ছে, তাদের সম্পর্কটাও কি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো পোক্ত!

 মেয়েটির কেমন মর্যাদাতেও বাধছে। এখন তার মন বলছে, নিজের কাছেই তার একটু সময় নেওয়া উচিত ছিল। ছেলেটির প্রেম প্রকাশের আড়ম্বরে, প্রতিশ্রুতির আতিশয্যে ভেসে গিয়ে সে মনে হয় নিজেরও খানিকটা অমর্যাদা করেছে। তাকে যে ছেলেটির খুব ভাল লাগে, সে বিষয়ে তার মনে আজও কোনও সন্দেহ নেই। ছেলেটি তার সঙ্গ ভীষণ পছন্দ করে, তার প্রতিটি ব্যাপার খেয়াল রাখে এবং তার প্রতি ছেলেটির যত্নও অসীম। কিন্তু… ছেলেটি তাকে ভালবাসে কি? ভাল লাগা, সঙ্গ, স্নেহ— সবই পরিবর্তনশীল। একমাত্র ভালবাসাই অপরিবর্তণীয় এবং অন্ধ। ভালবাসাকেই একমাত্র চোখ বুজে ভরসা করা যায়। বিশেষ করে তাদের লড়াইটা যেখানে এত কঠোর এবং দীর্ঘ, সেখানে সৎ ভালবাসা ছাড়া একটা পা ফেলাও মূর্খামি।

 মেয়েটি উপলব্ধি করে চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কিন্তু এসে গিয়েছে। এরপর আর দেরি করলে সে যেমন ছেলেটির সঙ্গে অন্যায় করবে, তেমন নিজের প্রতিও সুবিচার করবে না। ছেলেটির সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনায় বসার জন্য সে গভীর আকুলতা অনুভব করে। সে অন্তর থেকে বিশ্বাস করতে চায় তার সমস্ত আশঙ্কা যেন ছেলেটির সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার পর ভুল এবং মিথ্যা বলে প্রতিপন্ন হয়। ছেলেটি যেন বোঝাতে পারে সে তাকে ভুল বুঝেছিল। মেয়েটির প্রতি তার ভালবাসা অগ্নিশুদ্ধ।

 মেয়েটি চাইছিল ছেলেটির সঙ্গে সাক্ষাতে তার সমস্ত সংশয় দূর করে নিতে। কিন্তু আগের মতো ছেলেটি আর মেয়েটিকে দেখা করতে বলে না। মেয়েটির মনে বিষাদের মেঘ ঘনিয়ে আসতে থাকে। ছেলেটি তার সঙ্গে ফোনে নিয়মিত কথা বলার পরও তার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারছে না দেখে মেয়েটি ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়তে থাকে। মাঝখানে কেটে যায় বেশ কিছু দিন। ফোনে যোগাযোগও অনিয়মিত হয়ে উঠতে থাকে। কয়েকদিন মেয়েটি রাতের দিকে ছেলেটির ফোন বিজি পায়। পরে ফোন করে সে আর এর কারণ জানতে চায় না, এ বিষয়ে কোনও প্রশ্নও করে না। প্রশ্ন করা তার অভ্যাসও নয়।

 একদিন ছেলেটি মেয়েটিকে দেখা করার জন্য বলল। মেয়েটি জানাল সে দেখা করবে না। ছেলেটি বলল, কেন? মেয়েটি কোনও অজুহাত দিল না। সরাসরি জানাল তার অন্যত্র বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। ছেলেটি চমকে উঠল। কিছুটা সময় নিয়ে স্তিমিত স্বরে বলল, সে কী, তুমি আমাকে জানানোর প্রয়োজন পর্যন্ত বোধ করোনি!

 ফোন এত বিজি থাকলে কি আর জানানো যায়! তার উপর… তুমিও তো আর ফোন করে আগের মতো সব কিছু খুঁটিয়ে জানতে চাও না।

 তা বলে তুমি বিয়ে করে নেবে…! আমার কী হবে?

 মেয়েটি ফোন ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। প্রকৃত ভালবাসতে পারলেই বোধহয় এমন কান্না কেউ কাঁদতে পারে। মেয়েটি আবারও উপলব্ধি করল সে ছেলেটিকে সত্যিই কত ভালবাসে! ছেলেটিও যে কেন তাকে তার মতো করে ভালবাসতে পারল না! তাদের প্রেমধর্মে যে কেন এমন প্রভেদ তৈরি হল!

 মেয়েটি গলা থেকে কান্না মুছে নিয়ে বলল, তোমার বন্ধন মুক্তি ঘটবে।

             

  

             

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত