Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,মোহনবাগান

স্পর্ধার আলোকে মোহনবাগান । শুভজিৎ পাড়ুই

Reading Time: 6 minutes

‘মেকলে মিনিটস’ এবং ‘ব্রাউন সাহেব’ তৈরীর পরিকল্পনা হঠাৎ করেই বাঙালির সত্তাকে ‘স্বাবালক’ করে তুলেছিলো। এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসতে পারে হঠাৎ কেনই বা এই কথা? কী প্রসঙ্গেই বা ‘স্বাবালক’ এর মতো অত্যন্ত একটি গম্ভীর এবং অর্থবহ শব্দের প্রয়োগ হলো। ব্রিটিশ সরকারের আদ্যপ্রান্ত সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্যকরণ নীতি কীভাবেই বা এমন শব্দের বুনন তৈরী করতে পারে ইত্যাদি। উত্তর খুঁজতে হলে টাইম মেশিনে চড়ে আমাদের ফিরে যেতে হবে, ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের সরকারী দপ্তর গুলিতে। ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সংহতি সাধন করে চালচলন, রুচি, নিয়মানুবর্তিতা এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে ঠিক ইংরেজদের মতো ভারতীয়রা ইংরেজদের কাছেই ছিলো উপহাসের পাত্র। শরীরকেন্দ্রিক অক্ষমতার প্রসঙ্গ টেনে এনে নানা শ্লেষ, ব্যঙ্গোক্তি, কুৎসা এবং টিপ্পনীতে আবদ্ধ ছিলো বাঙালির দাপ্তরিক জীবন। ঊনবিংশ শতকের ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং লেখনীতে বারবার সেই প্রসঙ্গই উঠে এসেছে।

১৮৫৭-এর সিপাই বিদ্রোহের পরেই এই বাঙালির শরীর-স্বাস্থ্য-সাহস এবং পৌরুষ নিয়ে সাহেবদের টিকা-টিপ্পুনি-অবজ্ঞা-তাচ্ছিল্য ক্রমেই বাড়তে থাকলো। বঙ্গীয় রেনেসাঁসের সন্তান, এনলাইটমেন্টের সারথী নব্যসম্প্রদায় ‘বাঙালি মধ্যবিত্ত’ ভদ্রলোকের কাছে ক্রমাগত অপমান এবং মননচোট’ই ছিলো শরীর সংস্কৃতি এবং আখড়া চর্চায় নিজেদের নিয়োজিত করার প্রধান এবং একমাত্র কারণ। ঠেস দেওয়া অপমানের জবাব দিতে বাঙালি পুরুষ আহত হৃদয় এবং বিদীর্ণ বুকে ইংরেজি জ্ঞানভাণ্ডারকে পাশে সরিয়ে রেখে হাতে তুলে নিলো মুগুর ডাম্বেল বারবেল। তবে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ব্যায়ামাগার বা আখড়াগুলি বিংশ শতকের অগ্নিপূজকের সম্মাননা পেলেও আখড়া কেন্দ্রিক শরীর সংস্কৃতির প্রভাব বাঙালির মধ্যে গভীর বা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। নব উদ্যমে বাঙালি যুবসম্প্রদায় আবার অনুসন্ধান করতে লাগলো এমন এক বহ্নিশিখার যার অনলে কেবলমাত্র নিজেদের স্নাত করাই হবেনা, ইংরেজদের’ও শরীরস্পর্শী স্পর্ধায় নিজেদের আধিপত্য জানান দেওয়া যাবে, তাদের সরাসরি অস্থি মজ্জায় এবং সত্তায় আঘাত হানা যাবে। এমন অবস্থায় একদিন ঠাকুমাকে নিয়ে গঙ্গাস্নানে বেরিয়ে হেয়ার স্কুলের ছাত্র নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী হঠাৎ গাড়ি থামাতে বললেন ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লা সংলগ্ন ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাবের মাঠে। সেখানে তিনি দেখতে পেলেন একটি গোলাকার চামড়ার পিন্ড নিয়ে কিছু ব্রিটিশ অফিসার লাথালাথি করছেন। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা নগেন্দ্রনাথের পায়ের সামনে একসময় চলে এলো গোলাকার চামড়ার পিন্ডটি। ব্রিটিশ অফিসার বললেন – ‘কিক টু মি’, সপাটে সেই পিন্ডটিতে লাথি মারার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির রক্তে প্রতিভাত হলো ফুটবল সংস্কৃতি।

ইংরেজরা এর আগেই Imperial tool হিসেবে ক্রিকেট, ফুটবল, হকির মতো পাশ্চাত্য খেলাগুলিকে উপনিবেশ দেশগুলিতে ছড়িয়ে দিতে শুরু করেছে। উত্তর ও পূর্ব ভারতের বিভিন্ন বিদ্যালয় এবং তাদের পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এই ‘সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের’ ধারক প্রতীচ্যের খেলাগুলি। ইংরেজ নাবিক, সওদাগরি কোম্পানির সাহেব ও ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর আঁচলে পাশ্চাত্য খেলাগুলি লালিত পালিত হলেও ফুটবলের সাথে টেনিস বা ক্রিকেটের একটা ব্যবধান জন্মলগ্ন থেকেই ছিলো। ইংল্যান্ডে যেমন পাবলিক স্কুল ছেড়ে ফুটবল হয়ে ওঠে শ্রমিক বস্তির ঘিঞ্জি, নোংরা নর্দমার জল কিংবা এঁটোকাঁটা ঘাঁটা হুল্লোরবাজ ভবঘুরেদের অবসর জীবনে বিনোদনের শান্তির নীড়, ঠিক তেমনই বাংলাতেও ফুটবল হয়ে ওঠে প্রণয়িনী। নগরবাসের হাড়ভাঙা খাটুনির শেষে পাড়ায় সদ্য গজানো শুঁড়িখানা কিংবা ধাপিতে, বেঞ্চিতে, টেবিল চাপড়ে নবউদ্যমে ‘তর্কপ্রিয় বাঙালি’ গ্রহণ করেছিলো গোলাকার চামড়ার পিন্ডটিকে। যার পিছনে ছিলো মার খাওয়া বাঙালির ঘুরে দাঁড়িয়ে ‘পালটা মারের’ সংকল্প এবং ‘বডি কন্ট্যাক্ট’ থিওরি। ফুটবল এমন একটি খেলা যার প্রতিটা স্পন্দনে থাকে উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা, আক্রমণ – প্রতিআক্রমণ, আঘাত-প্রতিঘাত, অবরোধ-প্রতিরোধের বিস্ফারিত আন্দোলন। নগেন্দ্রপ্রসাদের পায়েই যেমন বাঙালির ফুটবল যাত্রার সূচনা তেমনই নগেন্দ্রপ্রসাদের হাতে ধরেই ফুটবল বিকেল বেলার মাঠের সীমাবদ্ধতা ছেড়ে সংঘবদ্ধ সংগঠনের মধ্যে উঠে আসে। হেয়ার স্কুলে সহপাঠীদের নিয়ে তিনি গঠন করেন ‘বয়েজ ক্লাব’, যা সম্ভবত বাঙালির প্রথম ফুটবল সংগঠন। অল্পদিনের ব্যবধানেই তাঁর হাতেই প্রতিষ্ঠা পায় ফ্রেন্ডস ক্লাব, ওয়েলিংটন ক্লাব এবং প্রেসিডেন্সি ক্লাব। এই উন্মাদনা মহানগর ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের শহরতলি ও মফঃস্বলে। স্থানীয় যুবকদের হাতে জন্ম নেয় হাওড়া স্পোর্টিং, খিদিরপুর এবং চুঁচুড়ার ক্লাবগুলি। ১৮৮৭ সালে পথ চলা শুরু হয় শোভাবাজার ক্লাবের। কিছুদিনের মধ্যেই বয়েজ, প্রেসিডেন্সি এবং ফ্রেন্ডস ক্লাব ভেঙে সবাই যুক্ত হন শোভাবাজার ক্লাবে। কোচবিহারের মহারাজা ভূপ্রেন্দ্রনাথ ভূপ বাহাদুর ছিলেন এই ক্লাবের সভাপতি। জাত ধর্ম বর্ণ সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে সদস্যপদ ছিলো সবার জন্য উন্মুক্ত। ১৮৮৯ সালেই শুরু হয় কোলকাতার প্রথম মুক্ত ফুটবল প্রতিযোগিতা ট্রেডস কাপ। ইউরোপীয় দল গুলির কাছে বাংলার ক্লাবগুলি সাফল্যের মুখ প্রাথমিক পর্বে না দেখলেও ১৮৯২ সালে শোভাবাজার ক্লাব হারিয়ে দেয় দুর্দান্ত শক্তিশালী ব্রিটিশ সামরিক দল ইস্ট সারেকে। কোচবিহারে রাজার দ্বারা বিশেষ আমন্ত্রিত এবং সম্মানিত হন নগেন্দ্রপ্রসাদ। এটাই ছিলো বাঙালির ক্রীড়া জাতীয়তাবাদের প্রথম আত্মপ্রকাশ।

১৮৮০র দশকের মাঝামাঝি দুখীরাম মজুমদার তৈরী করলেন স্টুডেন্ট ইউনিয়ন। শ্যামবাজারের কাছেই কীর্তি মিত্রের বাড়িতে শুরু হয় ফুটবল যজ্ঞ। কিন্তু দলের মধ্যেই মতানৈক্য চরমে উঠলে স্টুডেন্ট ইউনিয়নে ভাঙন ধরে। দুখীরাম দল ছেড়ে বেরিয়ে গঠন করলেন এরিয়ান ক্লাব। আরো একটা দল বেরিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করলো বাগবাজার ক্লাব। অবশিষ্ট দল অভিভাবকহীন ভাবেই থেকে গেলো কীর্তি মিত্রের বাড়িতে। সেই সংগঠনহীন অভিভাবকহীন লক্ষ্যহীন ছেলেদের পাশে দাঁড়িয়েছিলো কোলকাতার তিনটি বিখ্যাত বনেদি পরিবার, বসু-সেন-মিত্র। সেই কীর্তি মিত্রের বাড়িতেই এই অবশিষ্ট ছেলেদের নিয়ে গঠন হলো মোহনবাগান স্পোর্টিং ক্লাব, দিনটা ছিল ১৮৮৯ এর ১৫ই আগস্ট। সভাপতি হলেন ভূপেন্দ্রনাথ বসু। কীর্তি মিত্রের বাড়ির নাম হয়ে দাঁড়ালো ‘মোহনবাগান ভিলা’, এই ভিলা থেকেই মোহনবাগানের পথ চলা।

নৈতিক সামাজিক শিক্ষাদান এবং উচ্চ আদর্শের ভিত্তিভূমি হিসেবে পরিচিত ছিলো মোহনবাগান। কঠিন নিয়ম শৃঙ্খলা এবং আচরণবিধি মানলেই মিলতো সদস্যপদ। ক্লাব প্রতিষ্ঠার প্রথম বার্ষিকীতেই ক্লাবের নাম বদলালো, হলো মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব। ১৮৯৩ সালে কোচবিহারের মহারাজা শুধুমাত্র ভারতীয় দল গুলির অংশগ্রহণের জন্য প্রবর্তন করলেন কোচবিহার কাপের। মোহনবাগান’ও সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলো। কোচবিহার কাপে প্রথম ছ’বারের মধ্যে চার’বার চাম্পিয়ন হয় মন্মথ গাঙ্গুলীর ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন। ১৯০০ সালে মোহনবাগানের সম্পাদক পদে আসীন হন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৪৯ রেজিমেন্টের মেজর শৈলেন বসু, জোর দেওয়া হয় শক্তিশালী দল গঠনে, ফলাফল’ও মেলে হাতেনাতে। ১৯০৪ সালে কোচবিহার কাপ জয়ের মাধ্যমেই যাত্রা শুরু করে মোহনবাগানের বিজয় রথ।

১৯০৫ সাল, কোলকাতার পাড়ায়-পাড়ায়, দুয়ারে-দুয়ারে ফুটবল চলে এসেছে। ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মায় ভোগা ডাল-ভাতের বাঙালির পাতে নতুন নেশা ফুটবল। ব্রিটিশ সরকার’ও বুঝলো বাংলার যুব সমাজে ক্রমাগত যে বারুদের স্তুপ মজুত হচ্ছে তার থেকে মুক্তির উপায় বাঙালির আত্মাকে ভাগ, আসলে চাইলো দেড়শো বছর ধরে ক্রমশ ক্ষয়ে চলা মেরুদণ্ডটা যাতে আর সোজা হতে না পারে। লোকের মুখে মুখে তখন বঙ্গভঙ্গ বিরোধী তীব্র প্রতিক্রিয়া। যাদের একটা দলের হাতে ছিলো বোমা, আর একটা দলের পায়ে ছিলো ফুটবল। মাইলের পর মাইল হেঁটে আসা, পেটরোগা বাঙালি স্বপ্ন ছিনতাইবাজেরা পায়ে বল নিয়ে নেমে পড়লেন মাঠে, যাদের পরনে ছিলো সবুজ মেরুন জার্সি। বঙ্গভঙ্গ থেকে রদ, এই গোটা যুগটাই এই সবুজ মেরুন রঙের আধিপত্য, চোখে চোখ রেখে কথা বলার তীব্র প্রত্যয়। এগারোজন বাঙালির মুষ্টিবদ্ধ হাতের মুঠোয় ছিলো খেলার মাঠের ক্ষুদিরাম প্রফুল্লের স্বপ্ন।


আরো পড়ুন: ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের জন্ম ঘটি বাঙাল ঝগড়া থেকে নয় । গৌতম রায়


বঙ্গভঙ্গের মধ্যেই শুরু হলো কঠিন প্রতিযোগিতা গ্ল্যাডস্টোন কাপ। সারা বাংলা তখন ক্ষোভে রাগে অপমানে ফুঁসছে। একের পর এক ইউরোপীয় দলকে হারিয়ে মোহনবাগান পৌঁছালো ফাইনালে। চুঁচুড়ায় তাদের প্রতিপক্ষ সদ্য আই.এফ.এ শিল্ড বিজয়ী ডালহৌসি অ্যাথলেটিক ক্লাব। যাত্রাপথ ছিলো শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে নৈহাটি এবং তারপর হুগলী নদী পেরিয়ে চুঁচুড়া। কাকতালীয় ভাবেই ডালহৌসি দলের সঙ্গে একই ট্রেনে দেখা হয়ে গেলো মোহনবাগানের ফুটবল সচিব শৈলেন বসু’র। কিন্তু এ কী? ডালহৌসি দলে মাত্র সাত জন ফুটবলার! নিতান্ত কৌতূহলবশত বাকি খেলোয়াড়দের কথা জানতে চাওয়ায় এক সাহেব অবজ্ঞা ভরে বলেছিলেন ‘মোহনবাগানের মতো দলকে হারানোর জন্য তাদের সাতজনই যথেষ্ট’। এই তাচ্ছিল্যের জবাব মোহনবাগানের এগারোজন বাঙালি সেদিন মাঠেই দিয়ে এসেছিলেন। ব্রিটিশ দলটির দম্ভ অহংকার এবং ঔদ্ধত্য ভূলুণ্ঠিত করে মোহনবাগান ৬-১ গোলে জিতে নেয় গ্ল্যাডস্টোন কাপের ফাইনাল। ১৯০৬ এ মোহনবাগানের ঘরে এলো ট্রেডস কাপ, সেই ধারা বজায় থাকলো পরপর তিনবছর। স্বদেশি আন্দোলন এবং তারসাথেই পাল্লা দিয়ে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সমলগ্নে আবির্ভাব হওয়া এই জয়োচ্ছ্বাসের প্রবল প্রভাব পড়েছিলো বাঙালি মধ্যবিত্ত, এলিট ও ভদ্রলোকের মনে। মোহনবাগান হয়ে উঠেছিলো বাংলার ক্রীড়া আধিপত্যবাদ এবং জাতীয়তাবাদের সোপান, বাঙালির সেন্টিমেন্ট।

১৯০৯ এ মোহনবাগান সিদ্ধান্ত নেয় আই.এফ.এ শিল্ড খেলার। প্রথম রাউন্ডে ইউরোপীয় দল ওয়াই.এম.সি.এ কে হারালেও পরের রাউন্ডে গর্ডন হাইল্যান্ডার্সের কাছে হেরে বিদায় নেয়। এই হারের মধুর প্রতিশোধ অবশ্য কিছুদিনের মধ্যেই নেয় মোহনবাগান। লক্ষ্মীবিলাস কাপের ফাইনালে হাইল্যান্ডার্সদের মোহনবাগান হারিয়ে দিলো। পরের বছরেও লক্ষ্মীবিলাস কাপ এবং আমানুল্লাহ চ্যালেঞ্জ কাপ জয় করে মোহনবাগান। শুরু হয় ১৯১১ এর আই.এফ.এ শিল্ড। প্রথম রাউন্ডে মোহনবাগানের মুখোমুখি সেন্ট জেভিয়ার্স, কিন্তু মোহনবাগানকে খেলতে হয় দশজনে। সুধীর চ্যাটার্জীর অর্ধদিবসের ছুটি মঞ্জুর করেনি তৎকালীন ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান। তবে ফলাফল হয় মোহনবাগানের পক্ষে ৩-০। পরের ম্যাচেও রেঞ্জার্স-কে হারিয়ে দেয় ২-০ গোলে। এবার কোয়ার্টার ফাইনালে মোহনবাগানের মুখোমুখি রাইফেল ব্রিগেড, যাদের মোহনবাগান এর আগে কখনো হারাতে পারেনি। কিন্তু বিজয়দাস ভাদুড়ীর একমাত্র গোলে সেমিফাইনালে যায় মোহনবাগান। প্রবল শক্তিশালী ফার্স্ট মিডলসেক্স রেজিমেন্টের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচ ১-১ গোলে অমীমাংসিত ভাবেই শেষ হয়। ফিরতি ম্যাচে মোহনবাগান দারুণ ভাবে ফিরে আসে, এবং ৩-১ গোলে জিতে আই.এফ.এ শিল্ডের ফাইনালে চলে যায়। ফাইনালের উদ্দীপনা সম্পর্কে বোম্বের Times of India illustrated Weekly লেখে ‘বৃহস্পতি ও শুক্রবার বাঙালিরা মাথা উঁচু করে সগর্বে ছিলেন। ট্রামে, অফিসে যেখানেই বাবুরা জড়ো হন, সেখানেই আলোচ্য বিষয় ছিলো খালি পায়ে খেলে বাঙালি ছেলেদের বুটপরা সাহেবদের পরাস্ত করা’।

অবশেষে ২৯শে জুলাই এর ঐতিহাসিক ফাইনাল ম্যাচ। দেড়শো বছরের বেশি সময় ধরে লাঞ্ছিত হওয়া একটা জাতির প্রতিনিধি মোহনবাগান। সেখানে এপার-ওপার, ধর্ম-বর্ণ, হিন্দু-মুসলমানের বিভেদ নেই। ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, খুলনা, যশোর, রাজশাহী, মেদিনীপুর, হুগলী, ২৪ পরগনা সহ সমগ্র বাংলার জাগরণের জয়গান মোহনবাগান। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের বিজয়দিনে মোহনবাগানের প্রতিপক্ষ ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট। সেদিন ময়দানে উপস্থিত দর্শক প্রায় এক লক্ষ জন। প্রদর্শনী ম্যাচ ঘোষণা করায় টিকিটের দাম বাড়লো, তার সাথে চলতে থাকলো টিকিটের দেদার কালোবাজারি। খেলার পনেরো মিনিটেই জ্যাকসনের গোলে পিছিয়ে পড়ে মোহনবাগান, কিন্তু তারপরেই দারুণ ভাবে ম্যাচে ফেরে, প্রথমে শিবদাস এবং পরে অভিলাষ ঘোষের দুরন্ত গোলে ২-১ এ আই.এফ.এ শিল্ড ফাইনাল জেতে মোহনবাগান। প্রথম ভারতীয় ক্লাব হিসেবে এই সাফল্য শুধু যে নতুন ইতিহাস রচনা করেছিলো তাই’ই নয় দেশবিদেশের নানা সংবাদপত্রে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এই সংবাদ। আকাশে উড়তে থাকে বিজয় নিশান। সারা মাঠ জুড়ে তুমুল চিৎকারে বর্ষিত হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের দেবমন্ত্র ‘বন্দেমাতরম’। কথিত আছে মাঠ ছাড়ার সময় এক উপবীতধারী ব্রাহ্মণ সুধীর চ্যাটার্জীকে বলেন ‘আই.এফ.এ শিল্ড তো হলো,কিন্তু ঐ ইউনিয়ন জ্যাক কবে নামবে’, জবাবে সুধীর চ্যাটার্জী বলেন, “যেদিন মোহনবাগান আবার শিল্ড জিতবে”। কাকতালীয়ভাবে মোহনবাগান দ্বিতীয়বার শিল্ড জিতে ছিলো ১৯৪৭ সালে, এবং সে বছরই ভারত স্বাধীনতা লাভ করে, ইউনিয়ন জ্যাক চিরদিনের জন্য বিদায় নেয়।

এই শিল্ড জয় গভীর ভাবে বাঙালির হৃদয়ে দাগ কেটেছিলো। কারণ সবুজ ময়দান এখন গোলাকার পিন্ড আর শক্তি-স্কিলের কসরত নয়, ক্রমশ হয়ে উঠেছে মুক্তি সংগ্রামের রণক্ষেত্র। বয়কট, স্বদেশি বা মানিকতলা বোমা মামলার মতোই মোহনবাগান হয়ে ওঠে জাতীয়তাবাদী ইভেন্ট। জাতস্পর্ধী ব্রিটিশদের কাছে মোহনবাগান নামটাই যেন অশনী সংকেত। বাঙালি যে দুর্বল, ভীতু এবং কাপুরুষ এই মিথটা ভেঙে দেয় বাংলায় চরমপন্থি বিপ্লবী আন্দোলন। এগারোজন বাঙালির খালি পা সেই আন্দোলনকে যে বাড়তি মাইলেজ দিয়েছিলো, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। খেলার মাঠকে স্বাধীনতা মন্ত্রে দীক্ষিত করে মুক্তির ভাষার নাম  ‘একাদশে সূর্যোদয়’। যার নেপথ্যে মোহনবাগান।

তথ্যসূত্র 

Barefoot to Boots – Novy kapadia

In search of an Identity : History of Football in Colonial Calcutta – Soumen Mitra

মোহনবাগান দর্পণ

খেলা যখন ইতিহাস : সমাজ সংস্কৃতি রাজনীতি – কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়

History of Chinsurah Town club

   

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>