| 22 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

ইরাবতী গল্প: নতুন হাওয়া । সুজাতা কর

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

 

 
 
 
মৌলি একবার ফেসবুক, একবার ইউ টিউব তারপর একবার হোয়াটস অ্যাপে ঢুকল। কিছু নেই তার মন ভালো করে দেওয়ার মত। ফোনটা অফ করে একটু জোরে সামনের দিকে ছুঁড়ে রাখল। কাল থেকে একটা গল্প পড়া শুরু করেছে, দু’পাতা পড়ল। ভালো লাগলো না। মন বসল না। বন্ধ করে পাশে রেখে দিল। অহনা পাশে ঘুমোচ্ছে। একটু পরে উঠে পড়তে বসবে। মৌলির পরীক্ষা গতকাল শেষ হয়েছে। সেকেন্ড সেমিস্টার শেষ হল তার। অহনার শেষ হলে পরীক্ষা ক’দিনের জন্য তারা বাড়ি যাবে। সিগারেটের প্যাকেটটা টেনে নিল। একটা সিগারেট ধরালো। ফোনটা বেজে উঠল। মৌলি হাত বাড়িয়ে ফোনটা টেনে নিল। নিলয়।
-কী করছিস?
-কিছু না, বোর হচ্ছি। অহনাটা নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। এরপর সারা রাত জাগবে।
-পরশু যাবি এক জায়গায়?
-কোথায়?
-চল না, গেলে দেখতে পাবি।
-অহনার পরীক্ষা কাল শেষ হচ্ছে। ওকেও নেব তাহলে।
-ঠিক আছে।
কথার আওয়াজে অহনার ঘুম ভাঙে। লাল লাল চোখ খুলে মৌলির দিকে তাকায়। তারপর উঠে বসে, “ক’টা বাজে রে?”
-এগারোটা।
-ডাকিসনি কেন?
-এখন উঠে পড়। আর ঘুমোস না। 
-হুম।
উমড়ো-ঝুমড়ো চুল নিয়ে অহনা ওয়াশ রুমে যায়।
 
               নিলয় দরজা খোলে। মৌলি আর অহনা ভেতরে ঢুকে দেখে আরো জনা ছয়েক তাদেরই বয়সী ছেলে মেয়ে বসে আছে। একটি ছেলের হাতে গিটার। নিলয় একগাল হেসে বলল, “আয়। এটা অভিদের বাড়ি। অভির সঙ্গে তোদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।” গিটার হাতে ছেলেটি অভি। মৌলি আর অহনা গুছিয়ে বসল। অভি গিটার বাজিয়ে গান ধরল। গান শেষ হলে অভি উঠে বোতল থেকে কোল্ড ড্রিংক ঢেলে মৌলি আর অহনার সামনে ধরল। নিলয় সিগারেট বের করল। অহনা আর মৌলিও একটা করে প্যাকেট থেকে নিল। টুকটাক গল্প চলতে থাকল। অভি নিলয়ের দিকে তাকাল, “চল এবার যাই। যেজন্য আজ এখানে তোদের ডেকেছি। বাবা- মা গেছে দু’দিনের জন্য মেদিনীপুর। পুরো স্বাধীনতা। আমাকেও যেতে বলছিল। খুব বোরিং বড়দের সঙ্গে সময় কাটানো। বলেছি খুব পড়ার চাপ। যাওয়া হয়ে উঠবে না। বন্ধুরা অপেক্ষা করো তোমরা। আমরা বাইরে থেকে ঘুরে আসছি একটু পরে। দেন সারপ্রাইজ।” অভি মৌলির দিকে তাকাল, “যাবি আমাদের সঙ্গে?” মৌলি ঘাড় নাড়ল, “হ্যাঁ, যাব। অহনা যাবি?” অহনা মাথা নাড়ল,” নানা আমি বের হচ্ছি না। তোরা যা।” অভিদের ফ্ল্যাট বাইপাসের একটি আবাসনে। সামনে ছড়ানো- ছিটানো বাজার। মুর্গির দোকান, সবজির দোকান, সিগারেট- বিড়ির দোকান, চায়ের দোকান। ওরা একটু হাঁটল। মেন গেট থেকে অভিদের ফ্ল্যাট একটু দূরে। গেট দিয়ে বের হয়ে ওরা এগিয়ে গেল পান -সিগারেটের দোকানের দিকে। তিনজনে দাঁড়াল দোকানের সামনে। অভি পকেট থেকে টাকা বের করল। দোকানে একটি বাচ্চা ছেলে বসে। হিন্দি গান শুনছে। অভি টাকাটা এগিয়ে ধরে,” ভাই দু প্যাকেট পুরিয়া দে। ছেলেটি তাকে রাখা চকোলেটের বয়াম সরায়। পেছনে একটি প্লাস্টিকের কৌটো। বের করে দুটো প্যাকেট। অভি চটপট পকেটে চালান করে পুরিয়া দুটো। তিনজন চুপচাপ বাড়ির রাস্তা ধরে। ফ্ল্যাটে ঢুকে গোল হয়ে বসে দলটা। টোব্যাকো রোলিং পেপার নিয়ে আসে অভি। পকেট থেকে বের করে পুরিয়া দুটো। হাতে নিয়ে ঘষে নেয়। তারপর সিগারেট তৈরি করে আটটি। প্রত্যেকের হাতে একটি করে দেয়। উঠে গিয়ে মিউজিক সিস্টেমে লাগায় ‘পিঙ্ক ফ্লয়েড’। লাইটার দিয়ে জ্বালিয়ে নেয় সবাই। পর্দা টানা অন্ধকার ঘরে আটটি আগুনের ফুলকি। ধীরে ধীরে কথার স্রোত কমে আসে। ডেভিড গিলমোরের কন্ঠ ছড়িয়ে যেতে লাগল ঘরের কোনে কোনে,” শাইন অন ইউ ক্রেজি ডায়মন্ড।”
 
 
ঠক ঠক ঠক। মৌলির ঘুমটা ভেঙে গেল। অহনা পাশের বিছানায় গভীর ঘুমে। মৌলি ধড়ফড় করে উঠে বসে। চোখ মুছে দরজা খুলে দেখে পিজির ওনার। সঙ্গে একটি ভীষণ রোগা মেয়ে। পাশে রাখা একটা স্যুটকেস। ওনার মহিমা দি বলে, “মৌলি ও সুবর্ণা। আজ থেকে তোমাদের ঘরে থাকবে। ফার্স্ট ইয়ার। ওকে একটু হেল্প করো।” সুবর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে,” যা দরকার এই দিদিদের বলবে। যাও বিছানাটা গুছিয়ে নাও।” ঘরে তিনটে সিঙ্গল বেড। পাশে একটা করে স্টাডি টেবল, ড্রয়ার সুদ্ধ। একটা কমন আলনা। মৌলি এই ধাক্কাটার জন্য প্রস্তুত ছিল না। অত্যন্ত বিরক্ত হল। তার আর অহনার এই ঘরটা ভীষণভাবে নিজেদের। সমস্ত কথা তারা একে অপরকে শেয়ার করে। এই রোগা মেয়েটাকে তার  খুব অপছন্দ হল। মেয়েটি ঘরে ঢুকে স্যুটকেস বিছানার পাশে রাখল। বিছানায় বসে হাসল, “আমার নাম সুবর্ণা সরকার।ফার্স্ট ইয়ার, সাইকোলজি অনার্স। বারুইপুর বাড়ি। যাতায়াতে অসুবিধা বলে এখানে থাকতে এসেছি। জানলাটা খুলে দিই? এখন বেশ রোদ বাইরে। এই ঘরটা খুব অন্ধকার লাগছে।” মৌলি মাথা নাড়ে। বিরক্তি ভরা গলায় অহনাকে ডাকে, “অহনা ওঠ। আমাদের নতুন রুমমেট এসেছে। সুবর্ণা।” অহনা ঘুম ভাঙা চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। 
 
 
কলেজের সামনের চায়ের ঠেকে মৌলি এসে দেখল নিলয়, অর্জুন, বিরসা বসে চা খাচ্ছে আর ভীষণ রকম তর্ক করছে। ওদের তর্কের বিষয় ওদের আর ভোট দেওয়া উচিত কিনা। অর্জুন, বিরসা একটা রাজনৈতিক দলের সমর্থক। ওরা গলা ফাটাচ্ছে, “ভোট না দিলে পরিবর্তন আসবে না। আমাদের লক্ষ্য দিন পরিবর্তন। সুশাসন আনা। পশ্চিমবঙ্গকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।” নিলয় প্রশ্ন তুলেছে পরিবর্তন কাকে বলে আগে ঠিক করা উচিত। মানুষকে ঘুষ দেবার নাম কি পরিবর্তন? কল- কারখানা নেই, চাকরি নেই, স্কুল সার্ভিস কমিশন নেই। পাশ করে বের হওয়ার পর ভবিষ্যৎ নেই। প্রতি বছর একটা করে বিরাট ছাত্র গোষ্ঠী পাশ করে বের হচ্ছে। ওপরের লেয়ারের ছাত্ররা যারা অত্যন্ত মেধাবী তারা বাইরের রাজ্যে চলে যাচ্ছে। আর যারা মধ্য মানের তারা অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। কল সেন্টারে, ফাস্ট ফুড সেন্টারে যারা চাকরি করছে তাদের যাওয়া আসার খরচ কুলোতেই স্যালারি শেষ হয়ে যাচ্ছে। সে নিজেও জানে না কলেজের পর সে কী করবে ! মৌলি এক কাপ চা নিল। বসে কিছুক্ষণ তর্কটা শুনল। তারপর নিলয়ের পিঠে হাত রেখে বলল, “কাম ডাউন নিলয়। আর কিছু না হলে আমরা ক’ জন মিলে কোচিং সেন্টার খুলব। কিছু নিশ্চয়ই করে নেব নিজেদের জন্য। এত হতাশ হোস না এখনই।” নিলয় থামে। অবাক চোখে তাকায় মৌলির দিকে, “তুই থাকবি আমার সঙ্গে? সত্যি?” মৌলি হাসে, মাথা ঝাঁকায়, “হ্যাঁ, থাকব।”অর্জুন- বিরসার আর একটু তর্ক করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু মৌলি নিলয়ের হাত ধরে টানে, “চল, চল মেলা বকেছিস। আমার খিদে পেয়েছে। বড্ড ক্লান্ত লাগছে। ক্যান্টিনে গিয়ে কিছু খাই চল।” মৌলি চাইছিল না নিলয় আর তর্কে জড়ায়। অর্জুন- বিরসা পার্টির মদতপুষ্ট, কখন যে নিলয় একটা বাজে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়বে তার ঠিক নেই। নিলয় বারবিশা বলে একটা ছোট জায়গা থেকে এসেছে। ওর মধ্যে এখনো গ্রাম্য সরলতা আছে। 
 
 
লাইটারটা চার- পাঁচবার ক্লিক- ক্লিক করে আওয়াজ করল। কিন্তু আগুন বের হলো না। মৌলি লাইটারটা “ধুরছাই” বলে বিছানার একপাশে ছুঁড়ে দিল। অহনা দু’ দিন হোল বাড়ি গেছে। সুবর্ণা এখনো ফেরেনি। মেয়েটা ফেরে প্রায় ন’টা- সাড়ে ন’টায়। কলেজের পর সম্ভবত টিউশন নেয় বা পড়ায়। গতকাল যখন সুবর্ণা ফিরল রাতে মৌলি দেখে অবাক হয়ে গেছিল, সুবর্ণার পরনে মৌলির টপ। মৌলিকে দেখে হেসে বলল, ” কিছু পরার পাচ্ছিলাম না। তোমার টপ টা আলনায় ছিল। ভারী সুন্দর। এটাই পরে নিলাম।” মৌলির গা জ্বলে গেছিল। কিন্তু মুখে কিছু বলেনি। ব্যাগ থেকে একটা ডানহিলের প্যাকেট বের করে মৌলিকে দিয়েছিল সুবর্ণা, “তোমার জন্য।” মৌলি অবাক হয়েছিল। নিয়মিত ডানহিল খাওয়ার ক্ষমতা মৌলির নেই। পরশু দিনটা ছিল কনকনে ঠান্ডা। সকাল থেকে কুয়াশার চাদরে ঢাকা শহর। সূর্য স্তিমিত। ঠিকের বউটি এল কোনো কিছু গায়ে না দিয়ে। ঠান্ডা জল দিয়ে সে যখন ঘর মুছছিল মৌলি দেখল ওর হাত সাদা হয়ে গেছে। মৌলির ভীষণ খারাপ লাগছিল। মৌলি বলেছিল,” ছেড়ে দাও উমাদি,  আজ আর তোমাকে ঘর মুছতে হবে না। সুবর্ণা বিছানায় বসে পড়ছিল। সে কিছুক্ষণ উমার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর নিজের স্যুটকেস খুলে একটা ভালো সোয়েটার বের করল। উমার কাছে গিয়ে বলল, “দাঁড়াও তো উমা দি।” তারপর নিজের হাতে সোয়েটারটা পরিয়ে দিল। উমাদি থতমত খেয়ে বলতে লাগল,” নানা আমার ঠান্ডা লাগছিল না।” সুবর্ণা বলল,” কাল থেকে যেন তোমাকে দেখি তুমি সোয়েটারটা পরে কাজে এসেছ।” মৌলি বিছানা থেকে নেমে এবার সুবর্ণার টেবিলে যায়। পড়ার বইগুলো সুন্দর গুছিয়ে রাখা। মৌলি টেনে ড্রয়ার খোলে। বিভিন্ন জিনিস রাখা। নেল কাটার, লিপস্টিক, লিপবাম, পারফিউম, ক্লিপস, হেডফোন। আর হ্যাঁ , একটা সুদৃশ্য লাইটারও। কিন্তু পাশে এটা কী? একটা ওষুধের স্ট্রিপ। একপাতা কনট্রাসেপটিভ পিলস। মৌলির চেনা। প্রায়ই এর অ্যাড চোখে পড়ে। মৌলি লাইটারটা আর নেয় না। ড্রয়ার বন্ধ করে বিছানায় এসে বসে। দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ। মৌলি দরজা খোলে। সুবর্ণা দাঁড়িয়ে। উদ্বিগ্ন মুখ। কোলে একটা বিড়ালের বাচ্চা, “দেখ  না দিদি কে যেন পিজির সামনে ফেলে গেছে। যে কোনো সময় গাড়ি চাপা পড়ত। মহিমাদি আজ রাতে রাখার পারমিশন দিয়েছেন। কাল আমি একে নিয়ে বাড়ি যাব। বাড়িতে রেখে আসব। আমাদের বাড়িতে জান পাঁচটা বিড়াল আছে। তোমার কী হয়েছে? কিছু বলছ না কেন? ” মৌলি মাথা নাড়ে,”নানা কিছু হয়নি। তুই ঘরে আয়। অহনার বিছানায় ওকে শুইয়ে দে। মহিমাদিকে বল একটু দুধ দিতে ওর জন্য।” 
-থ্যাংক ইউ দিদি। তোমার কোনো অসুবিধা হবে নাতো? আমি কাল সকালেই ওকে নিয়ে বেরিয়ে যাব।”
 
 
লেকের ধারে বেঞ্চে মৌলি আর নিলয় এই বিকেলেও বসার জায়গা পেয়ে গেল। ভাবেনি দুজনেই এত সহজেই একটা পুরো বেঞ্চ পেয়ে যাবে। 
– মৌলি তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
-বল
-সেদিন যে তুই বলেছিলি আমি আর তুই কিছু না হলে কোচিং সেন্টার খুলব, সেটা কি সিরিয়াসলি বলেছিলি না তর্ক থামানোর জন্য বলেছিলি? 
মৌলি হাসে,”আমি সিরিয়াসলি-ই বলেছিলাম। হ্যাঁ, যদি তুই বারবিশা না ফিরে যাস তাহলেই।”
-তুই যদি সিরিয়াস হোস তাহলে আমি ফিরে যাব না। তুই কি সিরিয়াস?
– তোর কি মনে হয় আমি সিরিয়াস না হলে এত বন্ধু থাকতে এমনি এমনি তোর সাথে লেকের ধারে এসে বসেছি? নিলয় মৌলির চোখের দিকে তাকায়।পড়তে চেষ্টা করে, “পিছিয়ে যাবি নাতো কোনদিন? পালাবি নাতো?” মৌলি নিলয়ের হাতটা টেনে নেয়, “তুই পালাবি নাতো? আমি চাই তোর সাথে সারাটা জীবন কাটাতে।” নিলয় দুষ্টুমি ভরা চোখে জিজ্ঞেস করে,” ক’টা ছেলে- মেয়ে হবে আমাদের?” 
-একটাও না। উই উইল গো ফর অ্যাডপশন।
-ডান
ছেলে-মেয়ে দুটি স্বপ্নের জাল বুনে চলল অদূর ভবিষ্যতের। সামনের লেক, গাছপালা, আকাশ মৃদু , মৃদু হাসতে লাগল। বড্ড অচেনা এরা, বড্ড নতুন।
error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত