ইরাবতীর মুখোমুখি কবি ও কথাসাহিত্যিক যশোধরা রায়চৌধুরী

Reading Time: 14 minutes
প্রায় দু দশক ধরে বাংলা কবিতার জগতে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বাতিওয়ালার ভূমিকায়। তিনি শব্দ যাদুকর, মায়াজাল বিছিয়ে দিয়েছেন কথাসাহিত্য ও অনুবাদ জগতেও, তাঁর লেখা কখনো সপাট চাবুকে কুম্ভঘুম ভাঙ্গিয়ে দেখিয়ে দেন আমরা আদতে কেমন আছি।  সাহিত্য জগত এক ডাকে চেনে তাঁকে, তিনি যশোধরা রায়চৌধুরী । তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শৌনক দত্ত।
   

শৌনক দত্ত: কবি নাকি কথাসাহিত্যিক কোনটা নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকতে চাইবে?কেন?

যশোধরা রায়চৌধুরী: আমি ত কবিই। আমার ভ্রমণের শুরু ১৯৯৩ সালে। আসলে তারও বহু আগে থেকে শব্দের মধ্যে দিয়ে নিজেকে প্রকাশের নিদারুণ চাহিদা থাকত।

হ্যাঁ কবিতা , তার নির্মাণ , তার ছন্দ বোধ, এগুলো কানে তুলে নিয়েছি হয়ত অন্য কবিতা পড়ে। তারপর ভেতরের অন্ধকার ল্যাবরেটরিতে অনেক দিনের জারণের ফল। অল্প শব্দে নিজেকে প্রকাশ করতে শিখেছি চির কাল। অনেক লিখে চলায় চিরকালের আলস্য ছিল। পাঠক বোঝা্নো, ছেলে ভোলানো লেখা লিখতে আলস্য ছিল।

শুরুর দিকে আমি গল্প লিখলেও তা মেধা দিয়ে বাস্তব দেখাকে কেটে কেটে চিরে চিরে দেখার এক ধরণের অনুশীলনী হিসেবেই লিখতাম। সংখ্যায় কম। । ২০০৫ পরবর্তী সময়ে ক্রমশ খবরের কাগজের উত্তর সম্পাদকীয় লেখা শুরু হল। তার পাশাপাশি অন্যান্য গদ্য অনেক বেশি করে। রাগী লেখা, মন খারাপের লেখা, শ্লেষের লেখা… এগুলোই আমার প্রথমদিকের আবেগ। এই তাড়নায় আমাকে অনেক লিখিয়ে নিল। এখনো সবচেয়ে ভালবাসি নারী অভিমুখী লেখা লিখতে। আর ভালবাসি আমাদের হারিয়ে যাওয়া সময়কে লিপিবদ্ধ করতে। গল্পকার যরাচৌ হারিয়ে গেলেও আমার মনে হয় শ্রী শ্রী অন্নপূর্ণা ভান্ডারের বা হারিয়ে যাওয়া গানের খাতার যরাচৌ কোথাও থেকেই যাবে। আমাদের মধ্যবিত্ত মননে, সমধর্মাদেরও গল্প এগুলো আসলে।

নানা ধরণের বই পড়ার অভিজ্ঞতা ছিল আশৈশব। আপাতত আমি কবির কেন্দ্র থেকে বাহিরে নানা রকমের গদ্য লিখছি। এক এক বয়সে পাঠকের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ইচ্ছা করে। কবি হিসেবে যে অতি ক্ষুদ্র সংখ্যক নিবিষ্ট পাঠক পেয়েছি তাদের ঠকাতে চাইনা। তবে কবিকেও নিজেকে বার বার রিনিউ করে নিতে হয়। নিজের ক্ষমতার সীমানার বাইরের দিকে বেরিয়ে গিয়ে পড়তে হয়, ভাবতে হয়, দেখার সীমানা বাড়িয়ে নিতে হয়। প্রকরণ, বিষয় সবেই নতুন নতুন দিক খুলতে হয়। নাহলে আত্ম পুনরুক্তিদোষে দুষ্ট হয়ে যাবে সে।

প্রশ্ন: জীবনের কোন্ ঘটনা তোমার বিশ্বাস গঠনে প্রভাব ফেলেছে?

যশোধরা রায়চৌধুরী: জীবনের সমান্তরালেই ত বয়ে যায় লেখা। তবে হ্যাঁ, আপাতদৃষ্টিতে মধ্যবিত্ত, অতি যত্নে বাড়া গাছের মত জীবন দেখালেও, আমার আশৈশবের ব্রোকেন ফ্যামিলিতে বড় হবার অভিজ্ঞতা চিরতরে ছাপ রেখেছে। বাবা একেবারে জ্ঞান চক্ষু উন্মীলিত হবার আগেই মারা যান, মাকে একা সংসারে আমাকে ও আমার দিদিকে মানুষ করতে হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা খুবই অনন্য, ভয়ানকও কিছুটা।

একাকী মায়ের লড়াই দেখা, আবার মায়ের দ্বারাই বারংবার উৎপীড়নের বোধ, যা অবধারিত ছিল… প্রতিটি ব্যক্তিগত বিষয় ছাপ ফেলেছে। তাছাড়া আমাদের পারিপার্শ্বিক, সমাজ, নারীশিশুর প্রতি কুৎসিৎ হাত বাড়ানো পুরুষেরা… এরাও ছাপ ফেলেছে বইকি। ভারতীয় বা এশীয় মেয়েদের ত সেক্সুয়াল অ্যাবিউজের অভিজ্ঞতা থাকেই। ভাষা পরে এসেছে আমার কাছে একটা স্বক্ষমতা হিসেবে। পাওয়ার হিসেবে। ভাষা আমার অনেক না বলা যাতনাকে মুখ দিয়েছে, বলার সুযোগ করে দিয়েছে। অন্য মেয়েদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া গেছে যাতনাগুলি।

যদিও অনেক সুখস্মৃতিও আছে শৈশবের। ভরাট এক মাসি পিসি মামা কাকা ভর্তি ছোটবেলা আমার। সেগুলো হয়ত আমাকে পরবর্তীকালে সঠিক বন্ধুতা করতে সহায়ক হয়েছে।

 

প্রশ্ন: কোন কোন বই, কোন কোন লেখক তোমার বিশ্বাসকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে, কেন?

যশোধরা রায়চৌধুরী: আশৈশব নানা ধরণের বই পড়েছি। রবীন্দ্র অবগাহনেই তো বড় হয়েছি। তারপর অনেক পরে এসেছেন জীবনানন্দ অমোঘ, অনস্বীকার্য। তার আগে কবিতাকে দেখার চোখ গড়ে দিয়েছিলেন সমর সেন , সুভাষ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বা বুদ্ধদেব বসুর কবিতাবিষয়ক গদ্যগুলি। গল্প উপন্যাস বা গদ্যের ভেতরে ছোটবেলায় উপেন্দ্রকিশোর-সুকুমার-সত্যজিৎ, আর বড় হতে হতে বিভূতিভূষণ আর শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় । নরেন্দ্রনাথ মিত্র আর সুবোধ ঘোষ একেবারে গায়ে গায়ে। বিমল কর অমোঘভাবে আমাকে আক্রান্ত করেছিলেন তাঁর উপন্যাস দিয়ে। গোগ্রাসে পড়েছি দিব্যেন্দু পালিত শীর্ষেন্দু বা সমরেশ বসু, কিন্তু প্রথম প্রেম বিমল কর।

এভাবে বলাই যায় না আসলে। আমার আছে অসংখ্য বাংলা লেখকের ঋণ। আশাপূর্ণা মহাশ্বেতা থেকে হালের লেখক, কেউই বাদ ছিলেন না। আর কবিতায়, হ্যাঁ , তেরো বছর বয়সে কবিতা সিং হ-কে পড়া, আর বিদেশি এক গোছা নারীবাদী বই পড়া। জীবন বদলে দিয়েছিল, তার ফল অনেক পরে আমার জীবনবৃক্ষে ফলেছে বটে। তবে চেতনা ও শিরদাঁড়া কবিতা সিং হের দেওয়া বললে অত্যুক্তি হয়না।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,যশোধরা রায়চৌধুরী

প্রশ্ন: একটি গান,একটি চলচ্চিত্র, একটি নাটক, একটি বই অথবা তার অংশ বিশেষ- যা তুমি অন্যকে শুনতে, দেখতে বা পড়তে উৎসাহিত করবে?

যশোধরা রায়চৌধুরী: এভাবে বলা যায়না। এ অন্যায় হবে। আসলে এক হাতের সবকটি আঙুলে গোণা যায় না। করেও গোণা যায়না। তবে হ্যাঁ, বলতেই পারি যে নতুন রকমের গানের ভেতরে কালোমানুষের গাওয়া ব্লুজ, চলচ্চিত্রের ভেতরে অসম্ভব মেধাবী সত্যজিৎ রায়ের ছবিগুলো, নাটকের মধ্যে শাঁওলি মিত্রের নাথবতী অনাথবৎ… এগুলো তবু যদি বা তালিকাভুক্ত করা যায়, বইয়ের ক্ষেত্রে কারুকেই বাদ দিতে রাজি নই। সব প্রিয় বই আবার কোন জন্মে ফিরে পড়তে চাই, সময় বের করে।

 

প্রশ্ন: তোমার প্রথম লেখাটির কথা মনে আছে? সেই লেখার সময়টা তোমার বেড়ে ওঠা, পরিবার নিয়ে জানতে চাই?

যশোধরা রায়চৌধুরী: প্রথম লেখা বলতে ইস্কুল ম্যাগাজিনে লিখতাম নিয়মিত। একেবারে ছোট থেকেই। সপ্তম শ্রেণীর কবিতাটি এই সেদিন খুঁজে পেলাম। বেশ গোছানো আর পাকা হাতের মনে হয় এখন। আসলে আশৈশবের পরিমন্ডলের দান। চারিদিকে দেখার আর শেখার উপকরণ অনেক ছিল।

তবে বড় হয়ে খুব একাচোরা হয়ে যাই। একা ছাতে বসে থাকতাম। আমাদের বাড়িটার সব কোণে কোণে ছিল আমার একাকীর রাজত্ব। একটা মাদুর দিয়ে বোনা খাতা ছিল আমার… সেই সব লেখা বড় প্রিয়। অধিকাংশই অপ্রকাশিত। বুকে করে রাখতাম ডায়েরিটা। অনেক পরে জয় গোস্বামীকে দেখাই ও প্রায় অমোঘভাবে প্রতিটির ওপর পেনসিলে মন্তব্য লিখে ফেরত দেন। মা খুব খুঁতখুঁতে ছিলেন। ছোট থেকে নানা কিছু লিখতে বলতেন। নিজের মানুষদের চিঠি লিখলেও মা সেগুলো কারেকশন করতেন। তাতে আমার বেজায় রাগ হত। এখন বুঝি আজকের ভাষায় এটাই গ্রুমিং। সেই সময়কার কবিতাগুলো ভাষায় ভারিক্কি ছিল বেজায়! হাসি পেলেও, সেটা হাত পাকাবার সময় ছিল এটাও বুঝি। পরে, ৯০ দশকে এতটাই ভাষাভাঙচুর করা, প্রতিস্পর্ধী লেখা লিখলাম যে মা রেগে বললেন, তুই অশ্লীল কবিতা লিখিস। তোরা যা লিখিস আমি কিছু বুঝিনা। আবার ২০০৫-০৬ নাগাদ মা বললেন, এবার তোর লেখা বুঝতে পারছি। এই সব নানা ফেজ। পাঠকেরা অন্তরালে থেকেও অনেক প্রশ্রয় দিয়েছেন ১৯৯৩ পরবর্তী সময় থেকেই।

প্রশ্ন: তোমার তো পারিবারিকভাবেই সাহিত্যের একটা পরিমন্ডল ছিল সেটাই কি তোমাকে সাহিত্যের প্রতি টেনে নিয়েছে নাকি অন্য কোন ভালবাসা অন্য কোন গল্প?

যশোধরা রায়চৌধুরী: হ্যাঁ আমার কাকা মানস রায়চৌধুরী কবি ছিলেন, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্নেহধন্য, তাছাড়া শতভিষা ও কৃত্তিবাসে লিখতেন। তবে আমি তাঁর হাত ধরে সাহিত্য জগতে পা রাখিনি। আর, আমার লেখার ধরণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আগেই বলেছি, অনেকটা ভাষা ভাঙা, প্রতিস্পর্ধা, উচ্চকিত এক রকমের বয়ানে লিখেছি প্রথম দিকে। নিজের রাস্তা কেটে বেরুনোর বাসনায়।

প্রশ্ন: একেবারে প্রথমদিকের কবিতা রচনার দিনগুলো সম্পর্কে, কবিতাগুলো সম্পর্কে জানতে খুব ইচ্ছে হয়। যদি একটু বলো?

যশোধরা রায়চৌধুরী: আগেই বললাম।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,যশোধরা রায়চৌধুরী
 

প্রশ্ন: তোমার সমকাল এবং পরবর্তী দশকগুলোতে বাংলা কবিতার পরিবর্তনটা কিভাবে দেখো?

যশোধরা রায়চৌধুরী: আমাদের শুরু, অন্তত ছাপাছাপির শুরু, ৯০ এর মাঝামাঝি। অর্থনৈতিকভাবে নয় দশক ছিল নতুনের দশক, ঝাঁকুনির দশক । উদারীকরণ ও গোলকায়নের দশক। তার আগের দশকে বাংলায় প্রচুর কাজ হয়েছে। মনস্ক, নিষ্ঠ, অতি ভাষা সচেতন কবিদের দশক আশির দশক। তখন আমি খোলস ছেড়ে বেরই নি, তবে ওই অনুশীলনের ভেতরে হয়ত আমিও ছিলাম। নব্বইতে আমার বেশ বেশি বয়সেই এই পথে পা দেওয়া। যার ফলে প্রবীন সম্পাদক জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এতদিন কোথায় ছিলেন। প্রস্তুতি নিয়েই আসা।

নয়ের র দশকে আবার আশ্চর্যভাবে, অনেক কবি, আমরা সবাই এক রকম লিখছিলাম। রাণা রায়চৌধুরীর হিউমার, ব্যঙ্গ, চন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায় বা সেবন্তী ঘোষের অতীতের ভাষা নিয়ে নতুন করে দুমড়েমুচড়ে কাজ, শ্বেতা চক্রবর্তী, সাম্যব্রত জোয়ারদার প্রসূন রূপক শিবাশিস পিণাকী বিভাস হিন্দোল বিনায়ক, এই যে ভাষার ভেতরে নানা রকমের কাজ… নতুন কিছু একটা ঘটছিল কবিতাশরীরে। সেই জিনিস লক্ষ করতে মজাও লাগছিল। নিন্দামন্দও প্রচুর হচ্ছিল। কারণ আমরা হিন্দি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করছি, প্রচলিত কথ্য ভাষার কাছে আনছি কবিতাকে। আগের দশকের দুরূহতা ঝেড়ে কবিতা আবার জনপ্রিয় হচ্ছিল। এর পর পর এল শ্রীজাত ও মন্দাক্রান্তা। নব্বইয়ের দুই শিখর কবি। আবার সম্পূর্ণ অন্য ধারায় বিভাস রায়চৌধুরী লিখে চললেন নিজস্ব ভাষাজগত নির্মাণ করে। আমার বা অন্য অনেকের শহুরে ভাষা বলয় থেকে দূরে এক মফস্বলের, সারাবাংলার সত্ত্বা তৈরি হল। হিন্দোলের দার্শনিক নতুনতা । অংশুমানের মফস্বল থেকে উঠে আসা অন্য নাগরিকতা। এইসব … সে সময়ে নাটমন্দিরের মত মফস্বলের কাগজ ভীষণ চোখ ও মন টানত। তাছাড়া বিজল্প, কৃত্তিবাস , কাহ্ন, কর্ণ এগুলি তো ছিলই।

এর পরের ২০০০ এর দশক আমরা চোখের ওপর দেখলাম । নানা উৎসাহী নতুন কন্ঠ এল। তা নিয়ে দীর্ঘ লেখাও লিখেছি। তবে এই সময়টা ডিজিটাল জমানা শুরু হয়ে গেছে পুরোপুরি। আমাদের চোখের ওপর ঘটল সেসব। শ্রীদর্শিনী রাকা সম্রাজ্ঞী অর্পিতা দেবর্ষি দীপান্বিতাদের কবিতাকে দেখে আশা পেয়েছিলাম। আমাদের পরের প্রজন্মে যারা প্রথম চমক দিয়েছিল তাদের মাত্র কয়েকটি নাম রাখলাম।

২০১০ পরবর্তী দশকে বিশাল স্থান নিয়েছে ফেসবুকের কবিতা। সোশ্যাল মিডিয়ার কবিতা। কবিতা যেভাবে লেখা হয় যেভাবে ছাপা হয় সবটা এত পাল্টে গেছে, যে, এখন এই ক্লাটারিং এর সময়ে কবিতার কোন এক রৈখিক ধারাই খুঁজে পাব না। ফলে মূল্যায়ণ করা প্রায় অসম্ভব। এটা এখনকার কবিদের দুর্ভাগ্য বলব না সৌভাগ্য জানিনা। তাঁরা লেবেলড হবেন না আর। আবার তেমন করে চোখেও কি পড়বেন? তাঁদের জন্য কোন পত্রিকা সম্পাদক দ্বাররক্ষকের মত বসে নেই। যে নাকি তাঁদের কবিতাকে ভাল বা মন্দ বলে দেগে দেবে। সবটাই আত্ম-প্রকাশিত কবিতা এখন। ইচ্ছা করলেই লিখে বের করে দেওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এর ফলে, অতি ফলনের অসুবিধাও হচ্ছে, আর পত্র পত্রিকা অসংখ্য হয়ে যাওয়ায় কার লেখা কোথায় ছাপা হচ্ছে বা কোন ওয়েব পত্রিকায় বেরুচ্ছে বোঝা দুরূহ।

প্রশ্ন: বাংলা কবিতার বাঁক পরিবর্তনের দিশারী বললে কাদের কথা বলবে? কেন?

যশোধরা রায়চৌধুরী: উত্তর দেব না। কারণ যাদের নাম করতে ভুলে যাব তাঁরা চিরতরে শত্রু হয়ে যাবেন। আর নাম তো একটা নয়। বহুস্বরের যুগে আছি আমরা। তবে যে সব তরুণ কবি দিশেহারা হয়ে আছেন, কাকে পড়বেন, কাকে পড়বেন না ভেবে, তাদের জন্য একটা ছোট তালিকা করাই যায়। আমাদের আগেকার কবিদের যাঁদের না পড়ে বাংলা কবিতায় এগুনো যাবেইনা, তাঁদের মধ্যে প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, ভাস্কর চক্রবর্তী, উৎপল কুমার বসু, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় এঁদের নাম করব। তারাপদ রায় । শঙ্খ ঘোষ শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, পড়তেই হবে, তাঁদের নাম আলাদা করে বলছি না। বিজয়া মুখোপাধ্যায়, দেবারতি মিত্র, কবিতা সিংহ। খুঁজে খুঁজে পড়তে হবে শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়, বা নিশীথ ভড়ের লেখাগুলো। পরবর্তী আজকের যে সব সূর্য গ্রহ তারকা আছেন তাঁদের নাম করছি না।

প্রশ্ন: পণ্যসংহিতা প্রকাশের পরে দুবছর বিরতি তারপর পিশাচিনী কাব্য, রেডিও বিতানের পরে একবছর কিন্তু আবার প্রথম থেকে পড় প্রকাশের পরে চার বছরের দীর্ঘ বিরতির পরে এল মেয়েদের প্রজাতন্ত্র, তোমার বাড়ি গেছিলাম তুমি দিয়েছিলে বইটি,তোমাকে পড়ে মনে হয়েছিল এই কবিতার বিনির্মান, ভাষার মোচড়, ইমেজারিতে ব্যাপক পরিবর্তন। এর পেছনে রয়েছে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বা আজকের পরিভাষায় যাকে বলা যায় Projectwork?

যশোধরা রায়চৌধুরী: না। জীবনের বাঁকবদল। জয় গোস্বামী বলেছিলেন, জীবনে যা যা ঘটছে তার সঙ্গে সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কবিতাকে আমি পাল্টে নিয়েছিলাম। আবার অন্য কেউ বলেছিলেন, প্রেম করলাম বিয়ে করলাম সন্তান হল, সন্তান বড় হল… সবটাই আমার কবিতা পড়ে বোঝা যাচ্ছে। যেটাই হোক, পরিকল্পিত ছিল না। ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে গেছিল ভাষা, ভাষার খাত।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,যশোধরা রায়চৌধুরী


প্রশ্ন: উত্তর আধুনিকতা ও পোস্টমডার্নিটি, পোস্ট কলোনিয়াল এবং সাবঅল্টার্ন লিটারেচার ইত্যাদি সম্পর্কে তোমার ভাবনা বা মতামত কি?

যশোধরা রায়চৌধুরী: এত ছোট পরিসরে বলা যাবেনা। এটা বলতে পারি, আমাদের সম সময়ে দাঁড়িয়ে সম সময়ের লেখাকে এভাবে দেখতে পারা কঠিন। কিন্তু পারি। নব্বইকে নিয়ে অনেক লেখাপড়াও হয়েছে। নানা ধরনের আলোচনা। তাতেও এসেছে এসব কথা।

যেমন পোস্ট মডার্ন যুগলক্ষণের একটি, প্রচুর পাসতিশ, বা ঠাট্টা ইয়ার্কি, বা প্যারডি , আমাদের সময়ের লেখাতে হয়েছে। হয়েই চলেছে। নানা রকমের উপাদান নিয়ে , পুরনো কবিতার পুনঃপাঠ নিয়ে আমরা কাজ করেই চলেছি। একটা মজার খেলা, বা প্যাচওয়ার্ক। আমাদের লেখালেখি অনেকটা হয়ে যাবার পরে এসেছেন চন্দ্রিল ভট্টাচার্য , তাঁর মূল অভিমুখ এই ধরণের প্যারডি ছিল। একটা রসিকতাযুগ এসেছে বাংলা সাহিত্যে এর পর। খুব গুরুগম্ভীর মুখ করে কোন কাজ আর করা যাচ্ছে না।

 

প্রশ্ন: একজন নবীন কবি নিজেকে তৈরি করতে কি ধরনের পড়ালেখা করতে পারে?

যশোধরা রায়চৌধুরী: আগেই বেশ কিছু কবির নাম বললাম। গদ্যের ক্ষেত্রেও সমান্তরালে একটি দীর্ঘ তালিকা হতে পারে। ক্রমাগত নিজেকে আপডেট করে যাওয়া দরকার। পড়া দরকার সমগ্রভাবে। পাঠের সমগ্রতা ছাড়া কিছুতেই কোথাও কোন দিশা পাওয়া যাবেনা। গোগ্রাসে পড়তে হবে।

কিছুদিন পড়ার পর নিজের আন্দাজ তৈরি হবে।

প্রশ্ন: কবি বা লেখক কতটা প্রতিভার কতটা প্রস্তুতির বলে তুমি মনে কর?

যশোধরা রায়চৌধুরী: প্রস্তুতির ৯০%। প্রতিভা থাকা মানে আকাশ থেকে পড়া কিছু নয়। ক্লাসরুমের ৪০ টি বালকবালিকার ভেতর ৩৪ টি হাই তোলে, ৬ টি কবিতা শুনে ভেতরে দুলে ওঠে,বুকের মধ্যে টনটনিয়ে ওঠে। ঐ ৬ টি শিশুকে সঠিক যত্ন করো, দু জন অন্তত বড় হয়ে কবিতা লিখবে। কিন্তু কবির সংখ্যা কম, এটা ভাল। এটাই স্বাভাবিক। শক্তি বলেছিলেন , এত কবি কেন? আমরা এখন দেখছি, অদৃশ্য কোন সহজ দ্যুতি পেতে কবি হয়ে উঠতে চাইছে অনেকে, কিন্তু প্রস্তুতি নিতে চাইছে না। ভালবাসা, প্যাশন জনিত পরিশ্রম থাকা প্রয়োজন।

প্রশ্ন: জীবনানন্দ দাশের কবিতার ভাষা পরবর্তী বাংলা কবিতাকে কিভাবে প্রভাবিত করেছে?

যশোধরা রায়চৌধুরী: আজো আমরা জীবনানন্দ বলয়েই আছি। সেই মহাপয়ার। অক্ষর বৃত্ত। ছন্দের দিক দিয়ে আধুনিক কবিদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসুর প্রধান সাধনা ছিল বাক্ ছন্দের সঙ্গে কাব্য ছন্দের মিলন। বুদ্ধদেব দেখলেন বাক রীতির সঙ্গে কাব্যরীতি মেলাতে হলে পয়ারই শ্রেষ্ঠ বাহন। বস্তুত বাঙালীর কথা বলবার স্বাভাবিক ছন্দই পয়ার ছন্দ। তার কারণ পয়ারের স্থিতিস্থাপকতা গুণ, অফুরন্ত সঙ্কোচন-সম্প্রসারণশীলতা। জীবনানন্দ এটাকেই একটা চূড়ান্ত জায়গায় নিয়ে এলেন। লেখার মধ্যে মধ্যে ত্রিবিন্দু দিয়ে… কথ্য ভাষার কাছে আনলেন। শ্বাসাঘাতের জন্য অনেকটা জায়গা ছেড়ে দিলেন।

একমাত্র এই ছন্দেই লঘু ও ভারবান, দ্রুত ও মন্থর, গভীর ও চপল সবকটি সুরই বাজানো চলে। পয়ারের পরেই পড়ার ছন্দ। এই ছন্দই আমাদের মৌলিক ভাষার সবচেয়ে কাছাকাছি। লেখার ভাষা আর মুখের ভাষা নিকটবর্তী যেমন যেমন হচ্ছে, বৃত্ত ছন্দের আর সব ছেড়ে শুধু মহাপয়ার বা অক্ষরবৃত্ত, তানপ্রধান টানা অক্ষরবৃত্তের কাজকে তিনি প্রতিষ্ঠা দিচ্ছেন। সুরেলা আর জমকালো রাবীন্দ্রিক ছন্দের খেলা ছেড়ে, তিনি নিচ্ছেন নিঃশ্বাসের সঙ্গে ওঠাপড়া হয় এমন এক কথ্য ভাষাকে ধারণ করার ছন্দকে । আর এর মধ্যে দিয়ে তিনি বলে যাচ্ছেন পরবর্তী কবিতার ভাষা কীরকম হবে।

জীবনানন্দের কবিতাকে , সে অর্থে জীবনবেদ বলব কি আমরা? আমাদের সময়ে , বিক্ষত সময়ে, দ্বিতীয় যুদ্ধ পরবর্তী, চল্লিশ পরবর্তী বিক্ষোভী, চলমান, ক্ষয়িষ্ণু কিন্ত ক্রম পরিবর্তনশীল, যুযুধান ও একইসঙ্গে ভালোর খোঁজে নিবদ্ধচক্ষু সমাজ সময়ে যে ভাঙন অবিশ্বাসের শুরু, যে আত্মপ্রশ্নের শুরু, সেই সময়েই আমার জন্মও। আমাদের প্রজন্ম তাই জীবনানন্দকেও মন্ত্র করতে পারে। বলতে পারে, তিমির বিনাশে তবু অগ্রসর হয়ে/ আমরা কি তিমিরবিলাসী ? / আমরা ত তিমিরবিনাশী হতে চাই/ আমরা ত তিমিরবিনাশী।

প্রশ্ন: একজন কবি,কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক হিসেবে নিজের প্রস্তুতি ও নির্মাণ কৌশলটা যদি বলো।

যশোধরা রায়চৌধুরী: অনুবাদ হল যখন মৌলিক লেখা হচ্ছেনা তখন শব্দের অনুধ্যানে থাকার সুযোগ নেওয়া। সম্ভবত এটাও বুদ্ধদেব বসুর বলা। অন্যের ভাবকে ধার করে নিজের ভাইক্যারিয়াস প্লেজার। কথাসাহিত্যিক হল পাঠককে মাথায় রেখে লেখা। নির্মাণে পরিশ্রম চাই। কবিতা সম্পূর্ণ নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন। এরকমই ভাবি।

 

প্রশ্ন: অনেক সময় এমন হয় লেখা আসছে না কিছুতেই তখন কি কর?

যশোধরা রায়চৌধুরী: ঐ যে বললাম, অনুবাদ করা, পুরনো লেখা ঝাড়াইবাছাই করা। আমার অধিকাংশ কবিতা লেখা হয় ছেঁড়া খামের পেছনে। এখন অবশ্য ফোনে হয়। তারপর ফেলে রাখা, তার অনেক পরে তাকে মেরামতি। ধীরে ধীরে অবয়ব ফুটে ওঠা।

এখন আমি উপন্যাস এর খাঁচা তৈরি করি। তারপর তাতে খড়মাটি, রং ভরি। এই কাজটা আমাকে ইদানিং খুব খুব পরিতৃপ্তি দেয়। এক রকমের আরাম দেয়। যেন আমি নিজের জন্য একটা বাড়ি তৈরি করলাম। যেখানে আমি থাকব।

কোভিড অতিমারীর ভয়াবহ দু তিনটে ঢেউ এর মধ্যখানে আমি অনেক গদ্য লিখেছি। আমার ভ্রমণ গদ্য উড়ান অফুরান প্রথম দেশে দেশে মোর ঘর হিসেবে বেরুল ওই সময়ে। আর অন্য আরেক দীর্ঘ গদ্য ৩৫ টি পর্বে লিখলাম , হারিয়ে যাওয়া গানের খাতা। এই লেখাগুলো ছিল ওই দুঃসময়ে আমার রিলিফ। খুব আরাম পেয়েছি। ৭০০০০ শব্দ লিখে ফেলেছি প্রায় এই পর্বগুলিতে। আসলে ভেতরের জমে থাকা কথাগুলি নির্বাণ লাভ করেছে এভাবে। একটি বড় উপন্যাস প্রকল্পে হাত দিয়েছিলাম ২০১৭ সালে। সেটি আমার পিতৃদেবের জীবন ঘিরে… অদ্রীশ বর্ধন প্রেমেন্দ্র মিত্রদের কল্পবিজ্ঞান নিয়ে মাতামাতির প্রকল্পটিকে ঘিরে। এখনো কাজ চলছে। বই কবে হবে জানা নেই। তবে এইভাবে ছড়িয়ে দিতে খুব ভাল লাগছে । লেখা আসতেই থাকে। “লেখা আসছে না” কথাটা আসলে নিজের একটা বদ্ধ অবস্থা। এ থেকে বেরুতে লেখার কাছেই ফিরতে হয়।

 

প্রশ্ন: কবিতা ছাড়াও তোমার গল্প, প্রবন্ধ বা গদ্য সমান গতিশীল,কী ভাবে এবং কখন বুঝতে পারো যে একটা লেখা হয়ে উঠলো?

যশোধরা রায়চৌধুরী: কখনওই তা বোঝা যায়না। ফেলে রাখা দরকার। অনেক পরে আবার পড়তে হয় পাঠকের চোখে। লিখেই সঙ্গে সঙ্গে ছাপানো অতি বড় ভুল। আমার একটি ছোট বই আছে তিনটি নভেলার। বইটির নাম ছায়াশরীরিণী। এই বইতে দুহাজার পরবর্তী একটা সময়ের প্রেক্ষিতে একটি ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা গদ্য লিখতে চেয়েছিলাম। ভয়াবহ এক ঢেউ আসছিল ডিজিটালের। সেটাকেই ধরতে চেয়েছিলাম। এখন মনে হয় ওগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে হয়ে উঠছিল তাই লিখেছিলাম। আবার একইসঙ্গে বহুদিন ঘষামাজা করে লেখা আমার “মেয়েদের কিছু একটা হয়েছে” বলে গল্পগ্রন্থের প্রতি গল্প। আবার ঊর্ণনাভ বইটি যা অতিসাম্প্রতিক, তার গল্পগুলো নানা সময়ের যাপনের ইতিহাস। লেখাটা শুধু তার কালিক রেস্পন্সিভনেস বা এই মুহূর্তের দলিল হিসেবে হয়ে উঠেছে বলে মনে করছি। এভাবেই …

প্রশ্ন: তোমার কবিতা যাপন মুহূর্ত বা রচনার মুহূর্ত জানতে ইচ্ছে করে…কবিতায় তোমার নিবিষ্ট যে ভ্রমণ… একান্ত যে বিচরণ সেগুলোর কথা।

যশোধরা রায়চৌধুরী: একা একা বড় হয়েছি, অনেকটা সময় একা থেকেই কৈশোর যৌবন কেটেছে। তাই লেখায় সেই জলের মত ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়েছি। একটা কবিতাকে ঘিরে দীর্ঘ প্রজনন প্রক্রিয়া ছিল, সেই গল্পটা বলি। কবিতার নাম, অপর পুরুষ। “একদিন গল্পের শুরু । তোমার একাকী সন্ধে তখন সামান্য সিরিয়ালে/ মজে আছে । এমন সময়ে/ঘরে ঢুকল পর্দা সরিয়ে/অন্ধকার মুখচ্ছবি, কালো জার্সি, শক্ত, পেশল/অব্যর্থ পুরুষ , যার অতর্কিত ফাঁস/ তোমার গলায় বসল – আর তুমি উঠে পড়লে কি জানি কি ভেবে/ সোফা থেকে – সাঁৎ করে সে-ও সরে গেল/ বারন্দায় বয়ে গেল এলোমেলো হাওয়ার ঝলক/ তুমি গেলে রান্নাঘরে- হাত যায় অন্বেষণে – ফ্রিজে/ টিংগোর চুইং গাম, ডার্ক চকোলেট/ লুকিয়ে আস্বাদ করলে – টিংগো গেছে টিউশনে , শমিতও ফিরবে না/ অফিসের চাপ খুব মার্চ মাসে – কৃষ্ণসন্ধ্যায়/ তুমি আজ পুরোপুরি একা ও স্বাধীন/ কফি খাও উঁচু মগে, টিভি দেখো, চুল আঁচড়াও/ ধীরে ধীরে ঢুকে যাও আস্বাদনের ঘোর জালে …/ সঙ্গে থাকে অপর পুরুষ সঙ্গে থাকে অদৃশ্যশরীর সেই কালো ছায়া , পেছনে পেছনে ফলো করে, হেঁটে আসে একেবারে বিছানা অবধি ওরই তুমি ক্রীতদাসী, আকাংক্ষাশ্রমিক ও তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করে তার অঙ্গুলিহেলনে …সে তোমার মেগাকৃষ্ণ, সে তোমার আসল, আপন সে তোমার একমাত্র প্রেমিক, অশরীরী গল্পের শুরুটা এই-ই । পরবর্তী এপিসোডে সে তোমাকে জড়িয়ে ধরেছে নিজের পোষাক করে পরে নিচ্ছে তোমার শরীরই !”

এই কবিতাটি ২০১০ সালে অর্থাৎ বাংলা ১৪১৭-র শারদ সংখ্যা দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হবার আগে আমি অন্তত ৬-৭ বার লিখেছি। এতবার বোধ হয় আমার কোন কবিতাই মাজা ঘষা নাড়া ঘাঁটা হয়নি। সেদিক থেকে এই কবিতাটি উল্লেখনীয় । এতবার বদলানোর ইতিহাস আমার কবিতায় বেশি নেই। প্রতিটি স্বতঃস্ফূর্ত লেখনই যে কবিতা হয়ে ওঠে না সে কথা আমার থেকে বেশি আর কেই বা জানে? মাজাঘষা করতে করতেই ডায়েরিতে, ‘এমনি” লিখে ফেলে রাখা লাইনগুলির আকরিক হীরকের দ্যুতি পেয়ে যেতেই পারে, একথা সব কবির জানা। শিল্প তখনই আমরা বলি তাকে, যখন এইসব ঘষামাজা পেরিয়ে লেখাটি রসোত্তীর্ণ হয়। এই কবিতাটির প্রথম ড্রাফট হয়েছিল ২০০২ সালে । অনেকদিন এটি এর দৈর্ঘ্য এবং বিষয়গত নানা সম্ভাবনা সত্ত্বেও, ঠিকঠাক কবিতা হয়ে উঠতে না পারার কারণে পড়ে ছিল ডায়েরিতে, ফার্স্ট ড্রাফট হিসেবেই। ফাঁকা ফাঁকা একটি পাড়ায়, গাছপালা ঘেরা নিরিবিলি স্টীল অথরিটির কলোনির ভেতরে আমরা তখন থাকি। সন্ধে হলেই চরাচর ঢেকে যায় অন্ধকারে, বাংলোর চারিপাশে ছোট বাগান ও লন ভরে ওঠে কুয়াশাচ্ছন্নতায়। ঘরের মধ্যে আমরা পরিবারের শুধুমাত্র মহিলাসদস্য, শাশুড়িমা, আমি, মেয়ে ও কাজের মেয়েতি, দরজা জানালা এঁটে বসে থাকি টিভি চালিয়ে। সন্ধ্যা নাবার পর কোন ক্রিয়াকর্ম নেই। বাজার-হাট যাওয়া হয়না । সিনেমা থিয়েটারও নেই। সুতরাং পালাবার পথ টিভি। টিভি সিরিয়ালের ভেতরে অনেক অনেক নারীচরিত্রের লড়াই-আবেগ-সক্ষমতা-অক্ষমতার মিডিয়াচর্চিত নতুন ট্রেন্ড দেখছিলাম, সচেতনে বুঝে নিতে চাইছিলাম আমার পরিপার্শ্বের মেয়েদের কথা। টিভি-নারীদের ভিড়ে আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম একটা চেনা প্যাটার্ন। জীবনের সাফল্য আর অসাফল্যর নিরিখগুলো যাদের দ্রুত পালটে যাচ্ছে। যারা বেশি বেশি করে আত্মকেন্দ্রিক ও আত্মসচেতন। স্বামী বা সন্তানকে বাদ দিয়েও যাদের কামনার বস্তু হয়ে উঠছে অন্য অনেক কিছু। আর সমাজ তাদের সেই অনুমোদনও কোথায় যেন দিয়ে দিচ্ছে, নিজের জন্য বাঁচো, নিজেকে সুখ দাও, নিজের মত করে আনন্দ পাও। আবার, চেহারা বা ফ্যাশনেও যারা ক্রমশ একই ছাঁচের হয়ে উঠতে চাইছে। একই রকম জামাকাপড় পরতে চাইছে, একই রকম করে চুল কাটতে চাইছে। একই রকম করে চুলে ক্লিপ আটকাচ্ছে। হঠাত একদিন লক্ষ্য করলাম, আমি নিজে যে রকম চুলের ক্লিপ আগে লাগাতাম সেইরকম আর লাগাচ্ছি না। আমার চুলে উঠে এসেছে পুরনো ধাঁচের ক্লিপের বদলে বাজারে নতুন বেরনো এমন একটা ক্লাচ, দাঁতনখ বার করা , কাঁটা কাঁটা একরকমের ক্লিপ , যা ছোট করে কাটা চুলের অবাধ্য গোছাকে যে কোন মুহূর্তে হাত দিয়ে মুচড়ে পেছনে নিয়ে গিয়ে গুটিয়ে একটা খোঁপার মত করে তাতে লাগিয়ে ফেলা যায় মুহূর্তের মধ্যে, আয়না-চিরুণি কিছুই লাগে না। এই যে চটজলদি সমাধানের মত জীবনের গতির সঙ্গে সঙ্গে পালটানো চুল-ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থাটি, এটা কোথায় থেকে যেন উড়ে এসে জুড়ে বসেছিল আমাদের মেয়েজীবনে। আমাদের চাকরি, পরিবার, স্বামী সন্তান ম্যানেজ করার সমস্যার সঙ্গে সঙ্গে চুল ম্যানেজ করার সমস্যাও তো একটা ব্যাপার। সেই একটা অন্তত সমস্যা খুব সহজেই সমাধান করে দিচ্ছিল ওই উঁচু চূড়ো করে চুল বাঁধার ক্লিপ বা ক্লাচ। যা বাঁধতে গেলে প্রথমত চুলটাকে ঘাড় অব্দি হতে হয়, বেশ খানিকটা ছোট, আর চুলে শ্যাম্পু করাও বাধ্যতামূলক। তো নিজের কিছু কিছু অভ্যাস এইভাবে পাল্টাতে দেখেছি ঈষত অন্যমনস্কভাবেই। হঠাত একদিন লক্ষ্য করলাম ঐসব সিরিয়ালের নায়িকারাও একই রকম ক্লাচ ব্যবহার করে। জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হল যেন আমার। বুঝতে পারলাম, আমার প্রতিটি জেশ্চার, শরীরের প্রতিটি ভঙ্গিমা, প্রতিটি অভ্যাস আসলে কোন না কোন সূত্র থেকে কপি করা। তারপর থেকে সত্তর দশকের মেয়েদের সকলের চেহারার প্রতিসাম্য, ষাট বা আশির দশকের… সব দেখি, লক্ষ্য করি। যে কোন পুরনো সিনেমায় নায়িকার হাবভাব দেখি, আর বুঝি , সেই সময়ের প্রতিটি মেয়ের মধ্যে বয়ে গেছে সেই একই অদৃশ্য কানুনের ঢেউ, একই রকম আচার বিচার অভ্যাস । প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের সময় আমাদের ফ্যাশনকে, জীবনচর্যাকে, আমাদের ব্যবহারকে অভ্যাসকে কী ভাবে আড়াল থেকে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে প্রভাবিত করেছে। কী ভয়াল তার অঙ্গুলিহেলন। আমরা তার ক্রীড়নক, তার দাসী। এই সময়ের প্রেক্ষিতেই এবার আমি ভাল করে, ম্যাগনিফাইং গ্লাসের তলায় রেখে দেখি, আমার সময় আমাকে , আমার চারিপাশের আর সব মেয়েদের, কীভাবে নিয়ন্ত্রন করে চলেছে। আশে পাশে ২০০০ থেকে গজিয়ে ওঠা বড় বড় শপিং মল, তাদের রেডিমেড পোষাকের রেঞ্জ নিয়ে এসে আমাদের অনায়াসে বলে দিচ্ছে কী পরতে হবে কেমন ভাবে পরতে হবে। আর আমাদের সময়ের চিন্তার আবহ আরো বেশি আড়াল থেকে আমাদের বলে দিচ্ছে , কী বিশ্বাস করতে হবে। কী স্বপ্ন দেখতে হবে। কীভাবে আকাংক্ষা করতে হবে। কাকে আকাংক্ষা করতে হবে। কতটা ভাল থাকতে হবে। কতটা খারাপ থাকতে হবে। আমরাও আকাংক্ষাশ্রমিক হয়ে উঠছি। এইসব লিখতে গিয়েছিলাম সেই ডায়েরির প্রথম ড্রাফটে, পারিনি। রেখে দিয়েছিলাম। তারপর আর কয়েক বছর কেটে গেল। ২০০৯-এর কোন এক সময়ে আমি যখন গৌহাটিতে, তখন কবিতাটি আবার বার করি। আবার মাজাঘষা শুরু হয়। একা একা কফি খাচ্ছে একটি বিবাহিতা মেয়ে , আমার ফার্স্ট ড্রাফটে এই ছবিটাকেই খুব ক্যাচি, সেক্সি, চিত্তাকর্ষক বলে মনে হয়েছিল। তাছাড়া নানা জায়গায় এমন সব অপ্রত্যাশিত ব্যাপার ছিল যা থেকে আমার মনে হয়েছিল এই লিখে ফেলা লাইনগুলির কবিতাসম্ভাবনা আছে। ঘষামাজার সময়ে আমি যে লেখাটি দাঁড় করিয়েছিলাম, তাতে “সময়” এই শব্দটা , লক্ষ্যনীয়, বার বার এসেছিল, যাকে , আমি, আমার মতে, আমাদের সর্বপ্রধান প্রেমিক/নিয়ন্ত্রক/ক্ষমতাময় চালক ভেবে কবিতাটি প্রথমবার ড্রাফট করি।

প্রশ্ন: প্রতিটি শিল্পের সাথে যাপন মিশে থাকে, জীবনের অভিজ্ঞতা থাকে-তোমার কী রকম? কবিতায় তোমার যাপন কতটা পায় পাঠক?

যশোধরা রায়চৌধুরী: আগেই বললাম এক যাপন কথা। আমরা ত নব্বই দশকে “যাপনের কবিতা” বা “যাপিত কবিতা” লিখতাম। প্রতি মুহূর্তের বেঁচে থাকাকে কবিতায় অনুবাদ করব, এমন একটা স্পর্ধা ছিল। এখন পদ্ধতি পাল্টে ফেলেছি। অনেক বেশি করে আদর্শ, বিমূর্ত ভাবনা লিখি। যাপন মিশে তাতেও যায়। তবে তা সরাসরি না। ছেঁড়া ছেঁড়া যাপনের তুলো বা আঁশ দিয়ে বুনে তুলি আমার কবিতার মাদুর বা লেপ। টানা গদ্যে লেখা কবিতা নিয়ে তোমার ভাবনা কী? অনেকে এ ধরনের কবিতাকে কাব্যিক দুর্বলতা ঢাকার উপায় বলে ধরে নেন… এ ব্যাপারে তোমার মন্তব্য শুনতে চাই। রান অন বা টানা গদ্যে কবিতা লেখা অনেক কঠিন। কিছু লেখা ওভাবেই আসে। ছন্দ জ্ঞান এখানেও চাই। ফ্লো অব্যাহত থাকবে, বক্তব্যধর্মী হলেও স্লোগান বা স্টেটমেন্ট হবে না। কবিতাই হয়ে উঠবে। দুর্বলতা নয়, সবলতার লেখা প্রচুর আছে এই ধরণে। রণজিৎ দাশের বেশ কিছু বিখ্যাত লেখা এভাবে লেখা।

রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রত্যক্ষ উপস্থাপনা কবিতাকে বিনষ্ট করে। এ ধরনের একটি মত বহুদিন ধরেই বঙ্গীয় কবিতাবলয়ে প্রচলিত। বিশেষ করে আধুনিকতাবাদীরা এরকম ভেবে থাকেন। তোমার ভাবনা কী? সহমত। বিনষ্ট না করলেও দুর্বল করে। তাৎক্ষণিক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় লেখা কবিতা আমিও লিখেছি। ইদানীঙ যে কোন একটা ঘটনাতেই সঙ্গে সঙ্গে লিখে ফেলাকে, খুব সৎ মনে হয়না, এও যেন অভ্যাস চারণ কবিদের । তবে , অনেক ঘটনায় অনেক সময় সবাই এক সংগে কবিতা লিখে ফেলেছেন অনেক কবি… এটা ঘটনার অভিঘাতের ওপর নির্ভর করে। চুপ করে থাকা চলে না, অথচ রাস্তায় নামতেও পারছি না। তখন কবিতাই সম্বল।

প্রশ্ন: কল্পবিজ্ঞান নিয়ে বাংলায় সেভাবে কাজ হয়নি বলে মনে কর?

যশোধরা রায়চৌধুরী: ৬০ দশকে অনেক কাজ হচ্ছিল। তারপর একটা ভাঁটা আসে। আমার পিতৃদেব দিলীপ ৬৬ তে মারা যান। ৭০ দশকে অদ্রীশ বর্ধনের স্ত্রীবিয়োগ হয়। ফলত তার পর আশ্চর্য! পত্রিকায় ভাঁটা পড়ে। অদ্রীশ বর্ধনের হাতেই কল্পবিজ্ঞানের রমরমার যুগ প্রথমে বাংলায় আসে। এখন আবার নতুন করে অনেক কাজ হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ইংরেজিতে কল্পবিজ্ঞানের বিশাল সংখ্যক পাঠক আছে আমাদের আশেপাশে। তারা কেন বাংলা কল্পবিজ্ঞান পড়বেন, যদি না ভাল লেখা তাঁদের হাতে তুলে দিই? আমাদের আরো খাটতে হবে। আমাদের কল্পবিজ্ঞানে নতুন এক পৃথিবীর কথা বলব, কিন্তু তা যেন বাঙালি পৃথিবী হয়। তা যেন সেই অন্য গ্রহের প্রাণী বা মহাকাশযানের বাইরে অন্য কিছু গল্পও বলে। আমি এখন সেইরকম লেখা লিখতে চেষ্টা করে চলি ক্রমাগত। আর চাই, কল্পবিজ্ঞানের ওই স্বর্ণ যুগ নিয়ে লিখতে। ফাল্গুনের গান নামের এক উপন্যাসে সেটাই লিখতে চেষ্টা করছি এখন।

প্রশ্ন: সামাজিক মাধ্যম ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে প্রতিদিন একজন চাইলে একশজন কবির কবিতা পড়তে পারছে, এই অধিক পাঠ কি সেই কবির মনজগতে ও লেখায় প্রভাব ফেলছে বলে মনে কর?

যশোধরা রায়চৌধুরী: ক্লাটারিং এর কথা আগেই বলেছি। তৎক্ষণাৎ প্রকাশের বাধ্যতা কবিতার ক্ষতি করছেই কিছুটা। তবে ধৈর্য তো কারুর কিছুতেই নেই এখন।

প্রশ্ন: ভবিষ্যতে কি মানুষ কবিতা লিখবে–পড়বে? কবিতার কি আর প্রয়োজন হবে ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে?

যশোধরা রায়চৌধুরী: অবশ্যই হবে। কবিতা অস্তিত্বের নির্যাসিত রূপ। চিরদিন নানা রূপে থেকে যাবে। সিনেমায়, গানে, গল্পে , কবিতা ব্যবহৃত হয়, দেখনি ? কবিতা মৃত্যুহীন। নির্যাসিত ছোট লেখাগুলি থেকে যাবে।

   

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>