ধারাবাহিক: খোলা দরজা (পর্ব-৩৫)। সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

Reading Time: 2 minutes 

সেসময়ের ভ্রমণের সবটাই ভালো ছিল একথা বলব না অনেক অসুবিধা ছিল, অনেক না পাওয়া ছিল,তার অনেকটাই হয়ত বড়রা নিজেরা নিয়ে আমাদের বাঁচানোর চেষ্টা করতেন কিন্তু আমরা যাবার আগে,যাবার পরে যে উত্তেজনায় থাকতাম ,তার শিহরণ এই ‘প্যাকেজ ট্যুরিং’এর যুগে কোথায় পাব?মনে আছে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হবার পরীক্ষা আছে বলে আমার ছোটকাকার সঙ্গে একা পাটনা থেকে ফিরছিসিট রিজার্ভ নেইসারা রাস্তা কাকা কোনমতে একটা সিটে বসে, আর একটা সামনের সিটে আমাকে বসিয়ে চলেছেনরাতে ঘুম পেলে বসে বসেই ঘুমোচ্ছি দুজনে

ট্রেনে কোনকালেই আমার ঘুম হয়নারাতে জেগে বসে  যখন একটার পর একটা ঘুমন্ত স্টেশন চলে যেতে দেখি,যখন সবে ভোর হওয়া আলোয় স্টেশনে, ‘চা, গরম চা’ শুনি, সেইসব পুরনো দিন মনে পড়ে চারপাশের শত পরিবর্তনেও রাতের ট্রেনের ওই ‘নিঝুম ভুতুড়ে স্টেশনে’র,বা ভোরের ‘গরম চায়ের হাঁক’এর কোনো বদল হয়নি ভাগ্যিস!ওর ফাঁক গলে পুরনো সেই ছোটবেলাটা তাই মাথা গলিয়ে দিতে পারে

আমার এখনো মনে আছে, মুসৌরীর রাস্তায় ঘোড়া ছোটানোর কথামনে আছে প্রথম হরিদ্বারে স্নানের সেই কনকনে ঠান্ডা জলে কেঁপে ওঠার কথা,প্রথম দেখা দিল্লীর লাল কেল্লার সেই বিরাট আকৃতির কথা রাস্তার মোড় ঘুরতেই পুরীর নীল সমুদ্রের হাতছানি, পাহাড়ি পথের পাকদন্ডীর অপূর্ব অভিজ্ঞতা, ওসব পাওয়ার জন্য বিলাসী  ভ্রমণের প্রয়োজন হয়নি ট্রেনের ওপরের বাঙ্কে ভাইবোনেদের সঙ্গে খেলা করতে করতে,গরমে ঘামতে ঘামতে ঘুমিয়ে পড়ার সুখস্মৃতি কোনো শীতল কামরার নরম গদিই ফিরিয়ে দিতে পারেনা 

এখনকার ভ্রমণের চেহারা পাল্টেছে।মধ্যবিত্তের বিয়েতে আগেকার দিনে সবজি কোটা বা পান সাজার জন্য পাড়াঘরের মহিলারা আসতেন দলবেঁধে। ছাদের প্যান্ডেলে পাড়ার লোকেরা পরিবেষণ করত।এখন প্যাকেজে বিয়ে হয়।টাকা ফেলে দিলে পরিসেবা মেলে, কারো দরকার পড়েনা।সেভাবেই চলছে ভ্রমণ। বেড়ানোর কদিন আগেই ফোন করুন, বয়স ,নাম, ঠিকানা  জানিয়ে বলুন কোথায় যেতে চান?কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী অথবা হনুলুলু থেকে মিশর, টিকিট,গাড়ি সব আপনার দুয়ারে হাজির।তারপর সী বিচেই যান বা হিমালয়ে উঠুন কোনো ঝামেলা নেই।শোওয়ার গদী থেকে ওড়ার হেলিকপ্টার সব দেবে কোম্পানী।

আপনার পকেট কতটা ভারী, কতটা আপনি দিতে চান আর কতটাই বা নিতে চান একবার মুখফুটে বলার অপেক্ষা, মুশকিল আসান আলাদিন সামনে হাজির! 

তাহলে কি সব ফুরিয়ে গেল? আগের সেই  হই হই চই চই, সেই যাবো যাবো ভাব, রাতের লুচি আলুচচ্চরির টিফিন কৌটো গুছিয়ে ,জলের বোতলে ,ফ্লাস্ক হাতে বঙ্গ সন্তানের লটবহর সমেত ট্রেনে ওঠা, নামা,  সিট নিয়ে তর্কাতর্কি বাঁধানো,সব কি মুছে গেল একেবারে? স্লেট মোছার মত সব সুখই কি প্যাকেজ কবলস্থ? 

না না, তা কখনো হয়?ভাইবোন,আত্মীয়স্বজন মিলে নিজেদের ব্যবস্থায় ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন অনেকেই এখনও। শীতের বারাণসী বা গরমের দার্জিলিং, কিছুই বাদ থাকেনা।পুরুলিয়া,তারাপীঠের ভ্রমণ তো লেগেই আছে।দলবেঁধে বন্ধুরা মিলে বকখালি,বা সুন্দরবন, এখনও সর্বত্রই চলছে।সেখানে নিজেদের ব্যবস্থাপনায় রান্নাবান্না করেও খান অনেকে।সেসব আনন্দ মুছে যায়নি।আগেও ছিল, এখনও আছে।

নতুন বিয়ের পর রেস্ত ছুটি দু’ইই  থাকলে সুইজারল্যান্ড বা প্যারিসে যুগলের  ভ্রমণ সংবাদ ইদানিং আর চমকে দেয়না।নিদেনপক্ষে হয়ে গিয়েছে কাশ্মীর বা নৈ্নিতাল।পুরী,দীঘা ধর্তব্যে আসেনা।

এরই মধ্যে আমার বাড়ির কর্মসঙ্গিনী বায়না ধরেন, “সামনের সপ্তাহে তিনদিন ছুটি নেব।দীঘা যাচ্ছি,বাসে।” মাথায় বাজ ভেঙে পড়লেও সে ছুটি মঞ্জুর করতে হয়।

আমার নিজের অভিজ্ঞতার  একটা  গল্প বলে শেষ করি ।কয়েকবছর আগে, আমার তাঁর কাছে বায়না ধরেছিলাম, “দেশে অনেক হল,এবার বিদেশ যাব।নিদেনপক্ষে ঢাকা ,রাজশাহী নিয়ে চল।”

তিনি বললেন, “দাঁড়াও পাসপোর্ট করি।তারপরে দেখছি।”

পরের দিন আমার রান্নার মেয়ে  বলল, “দিদি কিছু টাকা ধার নেব।মা বাংলাদেশ যাবে।”

আমি বলি, “বাংলাদেশ? পাসপোর্ট আছে?”

সে  বলে, “ওসব আমাদের লাগে না।আমরা বর্ডার পেরিয়ে এমনি চলে যাই।বেড়া গলতে মোটা  পয়সা লাগে শুধু।”

“বলিস কি? ধরা পড়লে?”

“ধরা পড়লে তো? কেউ ধরা পড়েনা বুঝলে!”

আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি,সত্যিই তো,ওটাও তো বাংলাদেশ, ওখানে যেতেও আমাদের পাসপোর্ট লাগবে কেন?বেড়া গলেই তো চলে যাওয়া যায়।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>