| 23 জুলাই 2024
Categories
ধারাবাহিক

ধারাবাহিক: একাকিনী শেষের কথা (পর্ব-৩) । রোহিণী ধর্মপাল

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট
কৃষ্ণ বলরামকে নিয়ে হাঁটতে লাগলেন দ্রুত। কিছুটা গিয়েই দেখলেন একটা বড় দল মহানন্দে চাদর ওড়াতে ওড়াতে চলেছে। যত বন এগিয়ে আসতে লাগল, সেই দল একটু একটু করে ফাঁকা হতে লাগল। কৃষ্ণ একটু ধীর লয় হলেন। তিনি দেখতে চান দ্রৌপদীকে নিয়ে পঞ্চ পাণ্ডব কী সিদ্ধান্ত নেন। তাই আগেই সামনে যেতে চান না।
দ্রৌপদী তো কৃষ্ণের কথা কিছুই জানেন না। তাঁর মন তখন অদ্ভুত এক দোলাচলে। কিছুদিন আগেই যিনি ছিলেন এক বনের কিশোরী, কিভাবে দৈবের বশে চলে এলেন রাজার প্রাসাদে। আদবে কায়দায়  পোশাকে প্রসাধনীতে খাওয়ায় শোওয়ায় এমনকী কথা বলাতেও কত পরিবর্তন এল। একমাত্র আগেও যেভাবে দৃপ্ত পায়ে হাঁটতেন, সেই অভ্যাস বদলায়নি। তাই তো এইভাবে পাঁচ ভাইয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হেঁটে চলেছেন। তিনি ততক্ষণে বুঝে গেছেন যে দ্রুপদ যা চাইছিলেন, ঠিক তাই হয়েছে। অর্জুনই   লক্ষ্যভেদ করেছেন। এই পাঁচ ভাইই দ্রুপদের কাঙ্খিত সেই পঞ্চ পাণ্ডব।  তাঁর মনে একবার দ্রুপদের কথাগুলো ভেসে আসছে । আবার সেসব তলিয়ে গিয়ে ভেসে উঠছে অর্জুনের মুখাবয়ব। দ্রুপদ যখন বলতেন তাঁর অপমানের কথা, কিশোর অর্জুন তাঁকে কিভাবে পরাজিত করেছিল, সেইসব কথা, কিভাবে তিনি চান অর্জুনকে নিজের পক্ষে পেতে, কিভাবে অর্জুনকে দিয়েই দ্রোণকে না মারতে পারলে তাঁর শান্তি নেই, কৃষ্ণা শুধু শুনতেন মন দিয়ে। আর ভাবতেন, এতো রাগ, এতো প্রতিশোধের কামনা কেন? মানুষ কেন এত অসুখী? এই অসুখী হওয়াটাও কি একটা অসুখ? তাঁরা তো কতো কম পাওয়াতেই কতখানি আনন্দে থাকতেন। মা তিনি আর ভাইটি।  মা তাঁকে ডাকতেন কালী বলে। বলতেন, “রঙ কালো বলে নয় রে মা। আমি চাই তুই কালীর মতো করালবদনী হ। কালীর মতো উগ্রতেজা হ। নয়ত তোর এই রূপের জন্যই একদিন ধ্বংস হয়ে যাবি। পুরুষ শুধু শরীর বোঝে রে। কিন্তু তোকে এমন হতে হবে, যে ভেতর থেকে আগুন জ্বলবে। তাই তুই আমার কালী”। সেই কালী রাজপ্রাসাদে গিয়ে হল কৃষ্ণা। কিন্তু যে কাজের জন্য তিনি নিযুক্ত হলেন, সেই কাজে তাঁকে মনে মনে কালীই থাকতে হবে, একথা তিনি ভালো করেই জানতেন। ধ্বংসের জন্যই তিনি নির্বাচিত। যদিও কাজটুকু তাঁর কখনোই কঠিন মনে হয় নি এতদিন। কিন্তু আজ হচ্ছে। অর্জুন যে এত সুন্দর, তা তো আগে কেউ তাঁকে বলে নি। মহাবীর, অসাধারণ তীরন্দাজ, অব্যর্থ লক্ষ্য, এসব শুনেছেন। শুধু এই কালো রূপের কথা তাঁর মনের হিসেবে ছিল না। আহা! মরি মরি! কী রূপ নেহারি! ওই রূপ দেখতে দেখতে জন্ম শেষ হয়ে যায়! সব কিছু তছনছ করতেই যদি তিনি এসে থাকেন, এই রূপ পান করবেন কখন!

আরো পড়ুন: একাকিনী শেষের কথা (পর্ব-২) । রোহিণী ধর্মপাল


ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলেন তিনি। হঠাৎই যুধিষ্ঠিরের কথা কানে গেল তাঁর। “মা, আমরা ভিক্ষা এনেছি”। দ্রৌপদী চমকে উঠলেন! তিনি! আর ভিক্ষা! তিনি যখন বনে ছিলেন, তখনও সেখানে রাণীর মতোই বিচরণ করতেন। তিনি আর ভাই। ভাই তাঁকে এতোটাই মান্য করত, এখনও করে, যে দিদির কোনও কথার কখনও অবাধ্য হয় নি। যখন যা বলেছেন, নির্দ্বিধায় করেছে। এমনকী, মা যেদিন ওদের রাজার কাছে চলে যাওয়ার কথা বলল, ভাই শুধু দিদি দিকেই চেয়েছিল। কৃষ্ণা উত্তেজিত হয়েছিলেন মায়ের কথা শুনে। পুরো ব্যাপারটাই  কিশোর মনে দুরন্ত এক অভিযানের মতো শুনিয়েছিল। এক রাজার ছেলেকে বশ করতে হবে। তাহলেই বাকি চার ভাইও নাকি বশ হয়ে যাবে। আর সেই পাঁচ ভাই আর পাঞ্চাল রাজ্যের রাজা মিলে আরও এক বড় রাজ্য দখল করবে। আর সেই বিরাট রাজ্যের রাণী  হবেন তিনি। বনের মেয়ে কালী। হ্যাঁ। একটু মন খারাপ হবে বইকী। এই বিরাট জঙ্গলকে সে বড় ভালো বাসে। মাকেও। মা কত যত্ন করে তাঁদের আগলে রাখে, কত গল্প করে রাতের বেলায়! এমনকী, যাঁর কাছে মা সারা দিন থাকত, সেই ঋষিকেও!  ওদের দুই ভাইবোনকে ওই ঋষিদাদু কত কী শেখাতেন। কত আদর করতেন। ওরা মাছ ধরে আনত। বন থেকে কন্দ আনত। উনি ওদের দুজনকে কত রকম  মিষ্টি দিতেন। ফল দিতেন। সেই সব কিছুর জন্য ফাঁকা ফাঁকা লাগবে বইকী! তবু, এমন দুর্দান্ত অভিযানের সুযোগ ছাড়া যায় নাকি! তিনি রাজি হতেই ভাইও ঘাড় হেলিয়েছিল।
তারপরে যেন নতুন জগতে ঢুকে পড়েছিল দুজন। রাজপ্রাসাদে প্রথম বেশ কয়েকদিন তো লেগেছিল দুজনের চোখ সইয়ে নিতে। ঐশ্বর্যের ধাঁধানো আলো অভ্যাস হতে তো সময় লাগে। আর এখানে তো সবটাই নতুন করে শিখতে হচ্ছিল। যদিও ঋষিদাদু অনেকটাই চলা-বলা শিখিয়েছিলেন এক বছর ধরে, রাজপুত্র রাজকন্যাকে কেমন স্বরে কার সঙ্গে কথা বলতে হয়, রাজনীতি বিদ্যার খুঁটিনাটি, রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলের চালচলন সবব। কিন্তু মুখে শোনা আর একেবারে সেই পরিবেশে গিয়ে পড়া তো এক বিষয় নয়। যজ্ঞের ধোঁয়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসার পর দ্রুপদ যদিও রীতিমত সযত্নে, আর অন্য সকলের থেকে বাঁচিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন প্রাসাদের ভেতরে। সম্পূর্ণ আলাদা একটা মহলে।
 তবে রাজপ্রাসাদের আদবকায়দা শিখে নিতে দেরি হয়নি দুজনের কারোরই। ধৃষ্টদ্যুম্ন মন দিয়েছিল অস্ত্রশিক্ষায়। কৃষ্ণা শাস্ত্রশিক্ষায়। কালী থেকে কৃষ্ণা এবং যাজ্ঞসেনী হয়ে উঠতে খুব বেশি সময় লাগেনি। আদিম অনুভবে তিনি বুঝে গেছিলেন নগরের নারীদের থেকে তিনি সহস্রগুণ মোহময়ী। তার সঙ্গে যদি তিনি কামশাস্ত্রে নিপুণ হতে পারেন, তবে রান্নাশাল থেকে ধনাগার থেকে শয্যা, কোনও কিছুতেই তাঁকে সহজে আর কেউ ছুঁতে পারবে না। দুই ভাইবোন যখন মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, ঋষিদাদুর ইশারার অপেক্ষায়, মা আদর করে তাঁকে চুমু খেয়ে বলেছিলেন, “নিজের ওপর ভরসা রাখিস”। মায়ের শেষ কথা এই ছিল। তিনি ভরসা রেখেছিলেনও। কিন্তু জ্যেষ্ঠ পাণ্ডবের ভিক্ষা শুনে তিনি কেমন থমকে গেলেন। এবং পরক্ষণেই ঘরের ভেতর থেকে এক নারী কন্ঠ ভেসে এল, “যা এনেছিস, তোরা ভাগ করে নিয়ে নে বাছারা। ভুঙ্ক্তেতি সমেত্য সর্বে”(আদিপর্ব, ১৮৪ তম অধ্যায়, শ্লোক ২ )। কুন্তীর এই কথা শুনে চমকে উঠলেন যুধিষ্ঠির। চমকে উঠলেন আবার কৃষ্ণা নিজেও। আর এই প্রথম তাকালেন অর্জুন ছাড়া বাকি ভাইদের দিকেও। কারণ যুধিষ্ঠির মায়ের ভাগের কথা শুনেও প্রথমে অর্জুনকেই বলেছিলেন, “দ্রৌপদী পাওয়ার জন্য যে শর্ত, তা তুমিই পূরণ করেছ। তাই তোমারই উচিত এঁকে বিয়ে করা”। অর্জুন অথচ, দ্রৌপদীকে স্তম্ভিত করে উত্তর দিলেন, “বড় দুই ভাই থাকতে আমি বিয়ে করতে পারি না। তা একেবারেই আচার বিরুদ্ধ, ধর্ম বিরুদ্ধও। আগে আপনি, তারপর মেজদাদা, তারপরে আমার পালা আসতে পারে। তার আগে কখনোই নয়”। তখনও দ্রৌপদী হিড়িম্বার কথা জানতেন না। পরে যখন জেনেছিলেন অবাক হয়ে ভীমকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হে মধ্যম পার্থ, তবে কি আপনি হিড়িম্বাকে ভালো বাসেন নি? কেন তবে অর্জুন প্রথম দিনে বলেছিলেন মহারাজ যুধিষ্ঠির আর আপনি দুজনেই অবিবাহিত? হিড়িম্বা জঙ্গলের কন্যা বলে তাকে স্ত্রী বলে স্বীকৃতি দেওয়া যায় নি? আপনারা আসলে এতোটাই নিষ্ঠুর? আর যে মহারাজ যুধিষ্ঠির কে আমরা সততা আর সুবিচারক বলে জানি, তিনি ভেতরে ভেতরে এতটাই ভেদে বিশ্বাসী”?
error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত